ঠিক সেই সময় হন্তদন্ত হয়ে অ্যারিস সেখানে এসে হাজির হলো। তার বিধ্বস্ত চেহারা, রক্তাক্ত সারা শরীর, হাত আর চোখের বন্য দৃষ্টি দেখে সবাই শিউরে উঠল। অ্যারিস এসেই পাগলের মতো আদিয়ানের কলার চেপে ধরেছে আর জিজ্ঞেস করছে, "আমার ইনায়া কোথায়? তোমরা ওকে লুকিয়ে রেখেছ কেন? আদিয়ান ভাইয়া, বলো না ও কোথায়?"
আদিয়ান নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার চোখেমুখে গাঢ় অন্ধকার, মুখে কোনো সান্ত্বনার ভাষা নেই।
অ্যারিসের দুচোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে যেন নিজেকে কোনো অদেখা শক্তির কাছে বিচার চাইছে।
ইভান এগিয়ে এসে আমতা আমতা করতে করতে বলে, "ভাইয়া, ৪০ জন পুলিশ সেই রাত থেকে এখন পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজছে, কিন্তু কিছু পায়নি। ওখানে নাকি অনেক গভীর খাদ আছে আর সেখানে বিশাল জঙ্গল তারা ভাবছেন ভাবী কে কোনো বন্য প্রাণী........."
ইভানের কথা শেষ হওয়ার আগেই বাতাসের গতিতে অ্যারিসের হাতটা নেমে এল তার গালে। প্রচণ্ড শব্দে থাপ্পড় খেয়ে ইভান দুই পা পিছিয়ে গেল। ইভানের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেলো। অ্যারিসের চোখ তখন রক্তবর্ণ, যন্ত্রণায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য।
"আর একটাও বাজে কথা বলবি, তোরে এখানেই পুঁত রেখে যাব!" অ্যারিস দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল। "আমার ইনায়ার কিছু হয়নি! ও ঠিক আছে, ও কোথাও লুকিয়ে আছে... ও আসবে!"
ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশ দল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। তাদের একজনের হাতে স্বচ্ছ একটি প্যাকেটে ভরা এক টুকরো কাপড়। নীল শাড়ির সেই চেনা অংশ, যার অর্ধেকের বেশি জায়গায় এখন জমাটবদ্ধ কালচে রক্ত। অ্যারিস দেখামাত্রই চিনে ফেলল— গতকাল রাতে এই শাড়িটা পরেই ইনায়া তার জন্য কেক নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে এই শাড়ির ওপরই মুখ লুকিয়েছিল কয়েক ঘণ্টা আগে।
কাপড়টা দেখা মাত্রই অ্যারিস ডুকরে কেঁদে উঠল। তার সেই বুকফাটা আর্তনাদে যেন আকাশ-বাতাসও কেঁদে উঠল। আফরিন সুলতানা মাটির ওপর আছাড় খেয়ে পড়লেন, তার কলিজার টুকরো মেয়েটা যে এভাবে রক্তমাখা এক টুকরো কাপড়ে পরিণত হবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। ইভান কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আফরিন সুলতানাকে সামলায়, আর আদিয়ান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে বন্ধ করে কাঁদতে লাগল।
অফিসার রাকিব ইতস্তত বোধ করে, করুণ সুরে বললেন, "মিস্টার অ্যারিস, আমরা ইনায়ার দেহ কোথাও খুঁজে পাইনি। শুধু খাদের কিনারায় ছোপ ছোপ রক্ত আর এই কাপড়টা। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো ক্লু নেই। আমাদের ধারণা, বন্য কোনো প্রাণী হয়তো তাকে......"
কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। অ্যারিসের বজ্রকঠিন ঘুষি সরাসরি তার মুখে আছাড় পড়ল।
—"ইনায়াকে যদি না পাস, তোকেও এই খাদের নিচে জ্যান্ত পুঁতে দিয়ে আসব আমি!" অ্যারিসের উন্মাদনা দেখে বাকি পুলিশরা পিছিয়ে গেল। তারা আবার ড্রোন, আরো পুলিশ নিয়ে তল্লাশিতে নামল, আদিয়ান ও পুলিশদের সাথে যায়।
কিছুক্ষণ পর আদিয়ান আর মাহি ফিরে আসে। সেই রাত থেকে পুলিশদের সাথে মিলে ইনায়াকে খুঁজছে মাহি।
— "লুকিয়ে রেখেছ না তোমরা? ও কি আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলছে? আদিয়ান ভাইয়া, বলো না ও কোথায়! আইরা কাঁদছে, ও তো মাকে ছাড়া থাকতে পারে না......" অ্যারিসের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভেঙে আসছিল।
আদিয়ান দুহাতে অ্যারিসের কাঁধ জড়িয়ে ধরল, তার নিজের চোখেও তখন লোনা জলে ভাসছে।
মাহি এগিয়ে এসে ষ অস্ফুট স্বরে বলল, "বস, নিজেকে সামলান। মাত্র পুলিশ ড্রোন দিয়ে দেখেছে খাদের পাশের নদীটা খুব খরস্রোতা ছিল কাল রাতে......"
কথা শেষ করার আগেই অ্যারিস মাহিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। "নদী? ইনায়া নদীতে নামতে যাবে কেন? ও সাঁতার জানে না তো! ও তো আমায় ছাড়া কোথাও যায় না!"
আফরিন সুলতানা তখন মাটির ওপর বসে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মেয়ের শাড়ির সেই ছিঁড়ে যাওয়া অংশ তিনি সেটা বুকে চেপে ধরেছেন।
" আমার ইনায়া! মা আমার, আমাকে ছেড়ে কিভাবে চলে গেলি? একটুও কি এই মায়ের কথা মনে পড়ে নি? আমি যে তোকে ভীষণ ভালোবাসি! তোকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো মা। আমায় এইভাবে কেনো নিঃস্ব করলি? এখন আমি কি নিয়ে থাকবো? "
অ্যারিস টলতে টলতে সেই খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে ঘোলাটে জল বয়ে যাচ্ছে আপন বেগে।
"ইনায়া!" অ্যারিস চিৎকার করে ডাকল, সেই ডাকা কোথাও ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল প্রতিধ্বনি হয়ে, কিন্তু ইনায়ার কণ্ঠস্বর শোনা গেল না।
পুলিশ অফিসাররা এগিয়ে এসে অ্যারিসকে সরিয়ে নিতে চাইলেন। "মিস্টার অ্যারিস, আপনি আহত। হাসপাতালে চলুন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
অ্যারিস হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে একজনের কলার চেপে ধরল, "তোমাদের চেষ্টা দিয়ে আমি কী করব? আমার ইনায়াকে এনে দাও! নইলে এই খাদের নিচে আমি নিজেই ঝাঁপ দেব!"