বাসার তেমন কারো সাথে নীলা কথা বলে না, শুধু একটু-আধটু ইষানের সাথে কথা বলে। নীলার আলমারি দামী দামী ড্রেস, জুতো আর নামী ব্র্যান্ডের মেকআপে বোঝাই। ইষান নীলার জন্য সব কিছু এনে রেখেছে, যাতে নীলার মনে এক মুহূর্তের জন্যও অভাববোধ তৈরি না হয়।
বিকেলের আকাশটা আজ একটু পরিষ্কার। ইষান ছাদে বসে কফি খাচ্ছিল, এমন সময় নীলা সেখানে হাজির হলো। ইষান নীলাকে দেখে একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,
"—কিছু লাগবে তোমার?"
নীলা মাথা ওপর-নিচ করল। মানে, তার কিছু চাই।
"—বলো, কী লাগবে?" ইষানের গলায় প্রশ্রয়।
নীলা একটু শরীর দুলিয়ে লাজুক কিন্তু আবদারের সুরে বলল, "একটু ফুচকা খেতে......"
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইষান উঠে দাঁড়াল, "তুমি বসো, আমি এখনই নিয়ে আসছি।"
নীলা একটু উৎসাহিত হয়ে বলল, "আমিও সাথে আসি?"
ইষানের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই পাল্টে গেল, সে বেশ শক্ত গলায় বলল, "না বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি রুমে গিয়ে বসো, আমি এনে দিচ্ছি।"
নীলা একটা বিমর্ষ মুখভঙ্গি করে গাল ফুলিয়ে ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে ফিরে গেল। ইষানও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল ফুচকার সন্ধানে।
রুমে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল নীলা। হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
"—হ্যালো! আমি সায়রা।"
নীলা চমকে পেছনে ফিরল। দেখল একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে— পরনে সালোয়ার কামিজ, গায়ের রঙ দুধে-আলতা, কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা চুল আর টানাটানা চোখ। মেয়েটির চেহারায় একটা স্নিগ্ধতা আছে, বয়স হবে ১৪/১৫, উচ্চতা ৫.১" হবে হয়তো।
নীলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কে?"
মেয়েটি হাসিমুখে জবাব দিল, "আমি তোমার হাজব্যান্ডের বোন, তোমার ননদ।"
"ওহ আচ্ছা। বসো।" নীলা একটু আড়ষ্ট হয়ে বলল।
"—না ভাবী, আজ বসতে পারছি না। আমার টিউটর চলে এসেছেন। এতদিন খালার বাসায় ছিলাম তো, তাই তুমি ফেরার পর দেখা করতে আসতে পারিনি। জাস্ট একবার হাই বলতে এলাম।"
নীলা একটা মলিন হাসি দিল। সায়রা 'বাই' বলে দ্রুত পায়ে নিজের পড়ার ঘরের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরই ইষান রুমে ঢুকল, হাতে টক-ঝাল ফুচকা।
"—এই নাও তোমার ফুচকা। খেয়ে নাও, আমি পাশের রুমেই আছি; কোনো কিছু দরকার হলে ওখানেই এসো।"
নীলা শুধু বলল, 'ওকে'।
ইষান চলে যেতেই নীলা ফুচকা খেতে শুরু করল। টক-ঝাল স্বাদের সেই চেনা অনুভূতিটা জিভে লাগতেই মনের ভেতর কেমন একটা অজানা ভালোলাগা খেলে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপর। সকালে গোসলের পর ইষান নিজেই তার পুরোনো ব্যান্ডেজ খুলে নতুন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু এখন আয়নার প্রতিফলনে দেখা যাচ্ছে, সাদা ধবধবে সেই ব্যান্ডেজের মাঝখানে হালকা রক্ত ভেসে উঠেছে। ক্ষতটা হয়তো এখনো কাঁচা, তাই সামান্য নড়াচড়াতেই রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ফুচকার প্লেটের দিকে মন দিল।