রাতের নিস্তব্ধতা যখন পুরো বাড়িতে জাঁকে বসেছে, নীলার শরীরে তখন নিঃশব্দে বাসা বাঁধছে এক প্রচণ্ড দহন। হাড়কাঁপানো শীতের মতো এক অনুভূতি নিয়ে তার জ্বর এল। অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে নীলা কাঁপছিল, আর তার তপ্ত মস্তিষ্কে বারবার কিছু খটকা উঁকি দিচ্ছিল। সে ভাবছিল, ইষান যদি সত্যিই আমার স্বামী হয়, তবে ও পাশের রুমে কেন থাকে? স্বামী-স্ত্রীরা তো একসাথেই ঘুমায়! বাড়ির বাকি মানুষগুলোর আচরণ, তাদের চোখের ভাষা— সবই যেন নীলার কাছে এক গোলমেলে ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। এক বুক তৃষ্ণা আর কপালে আগুনের মতো উত্তাপ নিয়ে সে কোনোমতে উঠে বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল দিল। কিন্তু শরীর এতটাই দুর্বল যে, আবার ফিরে এসে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল সে।
সকাল হলো। সূর্যের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকলেও নীলার দুনিয়া তখনো অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ইষান দরজায় উঁকি দিয়ে দেখল নীলা চাদর মুড়ি দিয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে ভাবল, হয়তো বৃষ্টির ক্লান্তি যাচ্ছে, তাই আর বিরক্ত না করে চলে গেল।
কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর ছুঁইছুঁই, তখন ইষানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এতটা সময় নীলা কখনো ঘুমিয়ে থাকে না। সে দ্রুত রুমে ঢুকে নীলার কপালে হাত দিতেই চমকে উঠল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, আর মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
"—নীলা! নীলা, চোখ খোলো!" ইষান আকুল হয়ে ডাকল, কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
দ্রুত ফ্যামিলি ডক্টরকে খবর দেওয়া হলো। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, "জ্বর অনেক বেশি, আর উনি অনেক আগে থেকেই সেন্সলেস হয়ে আছেন। মাথায় চোটের ইতিহাস আছে, তাই এভাবে অজ্ঞান হওয়াটা ভালো লক্ষণ নয়।"
ইষানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। নীলাকে হারানোর ভয় তাকে আবারও গ্রাস করতে চাইল। সে অধীর হয়ে বলল, "আপনি সব ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা করুন।"
ডক্টর মাথা নেড়ে বললেন, "সবগুলো বড় চেকআপ করাতে হবে, বিশেষ করে ব্রেইন স্ক্যান। কিন্তু বাসায় বসে তো আর ওসব সম্ভব নয়।"
ইষান তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বলল, "আমি যা খরচ লাগে দেব, আপনি সব মেশিন বাসায় আনার ব্যবস্থা করেন।"
ডক্টর এবার একটু অবাক হয়ে ইষানের দিকে তাকালেন। তারপর নিচু স্বরে বললেন, "আপনি কি ভুলে গেছেন, আফরিন সুলতানা সারা বাংলাদেশে পুলিশ প্রোটেকশন দিয়েছে। এত বড় বড় মেডিকেল ইকুইপমেন্ট যদি আপনাদের বাসায় আনা হয়, পুলিশের সব সন্দেহ আপনার দিকে আসবে। তাছাড়া কিছু ইমার্জেন্সি টেস্টের জন্য হসপিটালের এনভায়রনমেন্ট জরুরি।"
ইষান চুপ হয়ে গেল। ডাক্তারের কথায় যুক্তি আছে। এভাবে গৃহবন্দি করে আর কতদিন রাখা যাবে? বাইরে বের করলেই যদি কেউ চিনে ফেলে? যদি ইনায়ার পরিবারের কারো নজরে পড়ে যায়? ডক্টর চলে যাওয়ার পর ইষান নীলার নিথর হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সাজানো মিথ্যে সাম্রাজ্য কি তবে এবার বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য হবে? ইষান বিড়বিড় করে বলল, "তোমাকে আমি কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেব না নীলা... কিছুতেই না।"
নীলার জ্বর কমার কোনো লক্ষণই নেই, বরং শরীর আরও ভেঙে পড়ছে। কাশির সাথে তাজা রক্ত দেখে ইষান আর স্থির থাকতে পারল না। নীলার দুই-একবার জ্ঞান হারানোর ঘটনায় সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই সে নীলাকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে পরিচয় গোপন করার জন্য সে নীলাকে বোরকা আর নিকাব পরিয়ে দিল। বাইরের পৃথিবীর কাছে সে কেবল একজোড়া বিষণ্ণ চোখের অধিকারী এক নারী, যাকে চেনার কোনো উপায় নেই। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন। আরও কিছু জটিল টেস্টের জন্য পরের দিন আসতে বলা হলো। ডাক্তার যখন ভেতর রুমে রিপোর্টের প্রাথমিক আলোচনা করছিলেন, তখন নীলা হাঁপিয়ে উঠে একটু বাইরে পায়চারি করার অনুমতি চাইল। ইষান অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো।