ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা ভিন্ন। সবার মুখ থমথমে! সবাই ইনায়া কে নিয়ে টেনশন করছে । সত্যিই কি এইটা ইনায়া? কেনো যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না ।
আদিয়ান — আমার মনে হয় ওইটা ইনায়া'ই .....!
ইভান হেসে বলে, "ভাইয়া তোমার মনে হচ্ছে? যেহেতু বড় ভাইয়া ওনাকে নিয়ে এসেছে তাহলে শিওর থাকো ওইটাই ভাবী । আমাদের চিনতে ভুল হতে পারে তবে বড় ভাইয়ার হবে না। "
ব্যাপারটা তে সবাই এক মত হয়.. আফরিন সুলতানার বিস্ময় কাটাতে পারছেন না সত্যিই তার মেয়ে ফিরে এসেছে? তার ইনায়া .. তার মনে হচ্ছে সে কোনো স্বপ্ন দেখছেন , হয়তো জেগে গেলে ইনায়া ও চলে যাবে । সবাই শুধু এইটা নিয়েই আলোচনা করছে ।
ইভান পরিবেশ হালকা করতে বলে, "আচ্ছা আম্মু ভাইয়ার মনে কী চলছে জানো?"
সবাই কৌতূহলী হয়ে ইভানের দিকে তাকাল, সায়মা খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী চলছে?"
ইভান কোনো ভূমিকা না করেই গান শুরু করল—
"তোর মতোন আর নেই তো বেঈমান
আমায় গেলি ভুলে,
মধু পানে করে বেড়াস বসে ফুলে ফুলে
হোসকায় নিয়ে পোচকে দিলি,
মধু খেয়ে ভুলে গেলি
তোকে ধরতে পারলে কোমরে দেবো দড়ি রে!
মন যে আমার করলি রে তুই চুরি, চুরি রে...
হৃদয়ে মারলি প্রেমের ছুরি রে।"
গানের কথা আর ইভানের গাওয়ার ঢং— সব মিলিয়ে যেন এক চিলতে হাসির হাওয়া বয়ে গেল ওই গুমোট পরিবেশে। সায়মা নিজের হাসি ধরে রাখতে না পেরে মুখে হাত চেপে হাসতে লাগল।
অ্যারিস নীলাকে নিয়ে গিয়ে তাদের বিয়ের অ্যালবাম, হানিমুনের ছবি, ইনায়া যখন প্রেগন্যান্ট ছিল সেই সময়ের ছবি, ভিডিও— সব একে একে দেখাতে শুরু করল। নীলা অবাক হয়ে সব দেখছে। হঠাৎ নীলার শরীরটা রীতির মতো কাঁপতে শুরু করল। সে কিছু বলতে চাইল কিন্তু পারল না, চোখের পলকে তার মুখ দিয়ে অঝোরে রক্ত পড়তে শুরু করল। টকটকে লাল রক্তে নীলার সাদা ওড়না ভিজে একাকার।
অ্যারিস চিৎকার করে উঠল, "ইনায়া! কী হচ্ছে তোমার? আদিয়ান! ইভান! জলদি আয়!"
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। দ্রুত গাড়িতে উঠিয়ে তাকে এক প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘণ্টাখানিক পর ডাক্তার যখন রিপোর্ট নিয়ে কেবিন থেকে বের হলেন, তার মুখটা ছিল গম্ভীর ও স্তম্ভিত। তিনি অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মিস্টার অ্যারিস, এই মেয়েটা যে এখনো বেঁচে আছে, এটাই একটা মিরাকেল। স্বাভাবিকভাবে এতক্ষণে ওর মারা যাওয়ার কথা ছিল।"
সবাই রুদ্ধশ্বাসে ডাক্তারের কথা শুনছে। ডাক্তার ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "১৭ দিন আগের অ্যাক্সিডেন্টে ওর মাথায় বেশ বড় চোট লেগেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখনি ওর স্মৃতি হারায়নি। অ্যাক্সিডেন্টের পর ওর শরীরে নিউরো-ব্লকার ড্রাগস অবিশ্বাস্য পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ড্রাগ সরাসরি ওর মস্তিষ্কের নিউরনে আঘাত করেছে, যার ফলে উনি সবকিছু ভুলে গেছেন। আর এই ড্রাগস ও ওভারডোজের কারণেই ওর মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। বিশ্বাস করুন, আর একবার এই ড্রাগ দেওয়া হলে মেয়েটা চিরতরে শেষ হয়ে যেত।"
ডাক্তারের কথাগুলো যেন অ্যারিসের কানে সপাটে চড়ের মতো লাগল। ডাক্তার আশ্বাস করে, "এখন বিপদমুক্ত। কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখলে আর এই বিষাক্ত ড্রাগের প্রভাব কাটলে ওর স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসবে। তবে এখন ওকে স্ট্রেস থেকে দূরে রাখতে হবে।"
অ্যারিস কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে, ওর দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। চোখের মণি অঙ্গারের মতো জ্বলছে। আদিয়ান কপালে হাত দিয়ে বলল, "এই ড্রাগ তো ডক্টর রাব্বী আমাকে ও দিত, কিন্তু লোকটা তো এখন বেঁচে নেই। তাহলে ইনায়ার শরীরে এই ড্রাগ কীভাবে এল?"