অ্যারিস শান্ত কিন্তু পাথরের মতো দৃঢ় গলায় বলল, "ডক্টর বলেছেন ইনায়াকে হাসিখুশি আর ড্রাগ থেকে দূরে রাখতে। আর এই দেশে থাকা মানেই ওর জীবনের ঝুঁকি। আমি ইনায়াকে নিয়ে চায়না চলে যাব।"
আদিয়ান চমকে উঠে বলল, "হঠাৎ চায়না কীভাবে সম্ভব?"
অ্যারিস অগ্নিদৃষ্টিতে আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি কারো কাছে পারমিশন চাচ্ছি না। আমি আমার সিদ্ধান্ত জানালাম।"
ইভান বুঝতে পারে অ্যারিসকে এখন আটকানো সম্ভব নয়। সে বলল, "ভাইয়া আমিও ভাবছিলাম চায়না চলে যাব। বাবা একা বিজনেস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমি ওখানে থাকলে বিজনেসও সামলানো হবে, আর সায়মাকে ওখানে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে পারব।"
আদিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "সুবার সামনে মেডিকেল এক্সাম আছে, ও তো ওখানেই থাকবে। তোরা সবাই চলে গেলে আমি একা বাংলাদেশে থেকে কী করব? ঠিক আছে, আমিও যাব। আমরা সবাই একসাথেই মুভ করব।"
অ্যারিস এবার ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল, "দেরি করার সময় নেই। সায়মা আর আইরার ইমার্জেন্সি পাসপোর্টের ব্যবস্থা কর। বাকি সবার তো আছেই, খুব দ্রুত সব গোছাতে হবে।"
ইভান মাথা নেড়ে সায় দিল, "ঠিক আছে ভাইয়া, আমি এখনই সায়মাকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি। সব কাগজপত্র আর পাসপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করছি।"
ইভান সায়মাকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।
~~•~~
ইষান নীলাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে পাচ্ছিল না, তার শ্বাস দ্রুত ওঠা-নামা করতে করতে শ্বাসকষ্টে উঠে যায়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে তাকে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হয়েছে। পার্কিং লটে পড়ে থাকা নীলার ফোনটাই এখন তার একমাত্র সম্বল। অসাড় চেতনায় ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে সে বিড়বিড় করছে, যেন এই যন্ত্রটার ভেতরেই নীলার অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে। সে জানে না, তার সাজানো তাসের ঘর এখন ঝড়ের মুখে।
অন্যদিকে, অ্যারিসের বাড়িতে প্রস্তুতি চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। অ্যারিস যখন সবাইকে চায়না শিফট হওয়ার কথা জানাল কেউ দ্বিমত পোষণ করল না, আর করলেও অ্যারিস তা শুনত না।
অ্যারিস আফরিন সুলতানাকে বলল, "মা, আপনি এদিকটা সামলান। ইনায়াকে আগের মতো সুস্থ করে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার। আমি কথা দিচ্ছি, ও আবার আপনাকে 'মা' বলে ডাকবে।"
আফরিন সুলতানা চোখের জল মুছে বলে, "বাবা, আমার মেয়েটাকে তুই রক্ষা করিস। ওর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে।"
বিকেলের মধ্যেই সায়মা আর আইরার ইমার্জেন্সি পাসপোর্ট ও ভিসার কাজ শেষ হয়ে গেল।
পরদিন ভোরের ৪:৩০টা...
পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে, বাইরে ইনায়ার খোঁজ অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। বাড়ির কেউ তাদের বিদায় জানাতে এয়ারপোর্ট আসেনি যাতে গোয়েন্দা বা শত্রু পক্ষ টের না পায়। অ্যারিস নীলাকে কোলে নিয়ে গাড়িতে তুলল। নীলার জ্ঞান ফিরলেও ওষুধের প্রভাবে সে এখনো ভীষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন। ঝাপসা চোখে সে দেখছে তারা এয়ারপোর্টের রানওয়ে দিয়ে এগোচ্ছে; কিন্তু তার প্রতিবাদ করার মতো শক্তি নেই। পাশে আইরা তার পুতুল নিয়ে খেলছে।
প্রাইভেট জেটের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অ্যারিস একবার পেছন ফিরে তাকাল বাংলাদেশের মাটির দিকে। তার চোখে তখন ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞা।
মনে মনে বলল, "তুই যে বিষ আমার ইনায়ার শরীরে দিয়েছিস, তাঁর প্রতিটা ফোঁটার হিসাব আমি নেব। তবে এখন আমার প্রথম কাজ ওকে সুস্থ করা।"
মেঘের রাজ্য ভেদ করে বিমানটি যখন আকাশে ডানা মেলল, তখন নিচে পড়ে রইল এক ধোঁয়াশাপূর্ণ অতীত।
ইঞ্জিনের গর্জন থামিয়ে প্রাইভেট জেটটা যখন স্থির হলো, তখন চীনের হিমশীতল বাতাস যেন এক নতুন গল্পের জানান দিচ্ছিল। বিমানবন্দরের রানওয়েতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কালো স্যুটে মোড়া বডিগার্ডদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অ্যারিস এখানে কতটা প্রভাবশালী। ভিআইপি গেট দিয়ে কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই তারা বেরিয়ে এল বাইরে। বাইরে তখন অপেক্ষমাণ তিনটি চকচকে কালো Mercedes-Maybach। তিন দম্পতি আলাদা তিনটি গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি যখন বেইজিংয়ের মসৃণ হাইওয়েতে উঠল, জানালার বাইরে দিয়ে বিদ্যুৎবেগে পিছিয়ে যাচ্ছিল কাঁচ আর ইস্পাতে ঘেরা আধুনিক স্থাপত্যের সব নিদর্শন। কোনো শব্দ নেই, কেবল মসৃণ গতিতে গাড়িগুলো শহরের বুক চিরে এগিয়ে চলল। সায়মা প্রথমবারের মতো চীনে এসেছে, তাই জানালার বাইরে বড় বড় স্ক্রিন আর নিয়ন আলোর রোশনাই দেখে তার চোখ ছানাবড়া।
গাড়ি এসে থামল বেইজিংয়ের অভিজাত 'রয়্যাল অ্যাপার্টমেন্ট'— এর সামনে। লিফট থেকে ২০ তলায় নামতেই সামনে পড়ল বিশাল এক মেহগনি কাঠের দরজা। সেটা খুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ও টি বেডরুমের এক সুবিশাল পেন্টহাউজ, যেখান থেকে পুরো বেইজিং শহরকে এক পলকে দেখা যায়। পুরো বিল্ডিংটাই অ্যারিসের, তবে থাকার জন্যে ২০ তলায় ঠিক করেছে!
সুবা এত বড় আর রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট দেখে বিস্ময় লুকাতে পারল না। অ্যারিস কারো দিকে না তাকিয়ে ক্লান্ত ইনায়া আর ছোট্ট আইরাকে নিয়ে তার মাস্টার বেডরুমে ঢুকে পড়ল। আদিয়ান আর সুবাকে তাদের পাশের একটা রুম দেওয়া হলো। ইভান সায়মাকে নিয়ে গেল তার নির্ধারিত রুমে।
এই অ্যাপার্টমেন্টটি অ্যারিসের নিজের সাম্রাজ্য। এখানে প্রতিটি ছোটখাটো কাজের জন্য আলাদা আলাদা মেইড রাখা হয়েছে। অ্যারিস চায় না তার ইনায়া এক মুহূর্তের জন্যও কোনো শারীরিক পরিশ্রমে জড়াক। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য— ইনায়াকে এইখানে রেখেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনা।
নীলা নরম বিছানায় শুয়ে ঘরের ইন্টেরিয়র দেখছিল। তার মনে হচ্ছে, সে কোনো মুভির সেটে চলে এসেছে। অ্যারিস পাশে বসে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "এখানে তোমাকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না ইনু, তুমি স্রেফ বিশ্রাম নাও।"
নীলা কিছু না বলে অ্যারিসের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে শাসন যেমন আছে, তার চেয়েও অনেক বেশি আছে মায়া। নীলা মনে মনে বলল, 'মানুষটা আসলে খুব একটা খারাপ নয়'।