চারপাশে সবুজের গালিচা, আর দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের আনাগোনা। প্রকৃতি যেন নিজের সবটুকু রূপ এখানে উজার করে দিয়েছে। ইভান আর সায়মা এই অপূর্ব নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে হাঁটছিল। চীনের এই জায়গাটা এতই সুন্দর যে মনে হচ্ছে কোনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। সায়মা মুগ্ধ চোখে চারপাশটা দেখছিল। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ে ইভানের দিকে তাকিয়ে আবদারের সুরে বলল, "জায়গাটা কি দারুণ, তাই না? আমাকে এখানকার দাঁড়িয়ে কিছু পিকচার ক্লিক করে দাও না!"
ইভান পকেট থেকে ফোনটা বের করে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। "এ আর এমন কী? পোজ দাও তুমি, আজ তোমাকে একদম মডেল বানিয়ে দেব। আমার ক্যামেরার লেন্সে তোমাকে যা দেখাবে না!" সে বেশ উৎসাহের সাথে ক্যামেরা সেট করতে শুরু করল। সায়মা একটা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে একরাশ হেসে পোজ দিল। পেছনে বিশাল আকাশ আর পাহাড়ের হাতছানি। একটি বিশেষ পোজ দেওয়ার সময়ে সে কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ফ্রেমটা কি ঠিক আছে? ক্যামেরা কি পেছনের আকাশটাকেও কভার করছে?"
ইভান ক্যামেরার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে ধীর গলায় বলল, "পেছনে আকাশ আসুক আর না আসুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আসলে আমার ক্যামেরা শুধুমাত্র তোমার ওপর ফোকাস করে। বাকি সব তো স্রেফ ঘোলাটে ব্যাকগ্রাউন্ড।" কথাটা বলেই ইভান সায়মার চোখের দিকে তাকাল। সেই চাহিনীতে এক গভীর মুগ্ধতা ছিল, যা সায়মার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল। সায়মার গালের ওপর হালকা লাল আভা ফুটে উঠল। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে লোক দেখানো ধমকের সুরে বলল, "আহ! বাজে কথা বলবে না তো! সবসময় ফাজলামি ভালো লাগে না। ঠিকঠাক ছবি তোলো।"
ইভান হাসল, এক চিলতে দুষ্টুমিতে ভরা হাসি। সে জানে সায়মার এই লজ্জাটুকু তার জন্য কত বড় প্রাপ্তি। সে আবারও ক্যামেরায় মনোযোগ দিল।
সারাদিন তিন দম্পতি মিলে বেইজিংয়ের সেই চমৎকার জায়গায় আড্ডা দিল, মজার সব চাইনিজ খাবার টেস্ট করল আর প্রচুর ছবি তুলল। ইনায়া আর অ্যারিসকে আজ আগের মতো প্রাণবন্ত দেখে সবারই মনটা শান্তিতে ভরে উঠল। আইরা সারা দিন বাবার কোল আর মায়ের আঁচল নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
সন্ধ্যার পর সবাই অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এল, সবাই সোফাতে বসে আড্ডা দিতে দিতে টুকটাক কথা বলছে। ইনায়া একটু ইতস্তত করে বলল, "আমি আগামী দুই-একদিনের মধ্যে বাংলাদেশে যাব।"
অ্যারিস একমুহূর্ত দেরি না করে সটান জবাব দিল, "ইম্পসিবল।"
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল, "আমার ওখানে জরুরি কাজ আছে।"
অ্যারিস সোফায় হেলান দিয়ে শীতল গলায় বলল, "যতই থাকুক তুমি যাচ্ছো না।"
"প্লিজ, আমার কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো।" ইনায়ার কণ্ঠে অনুনয়।
অ্যারিস এবার সোজা হয়ে বসে বলল, "সব বুঝলাম, বাংলাদেশে যাওয়া বাদে আর যা বলবে সব শুনতে রাজি, এবার বলো।"
ইনায়া নাক-মুখ কুঁচকে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের এই খুনসুটি আর তর্কাতর্কি দেখে ইভান আর আদিয়ানরা মুখ টিপে হাসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে 'অফিসার রাকিব' নামটা দেখে ইনায়া রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে রাকিব বললেন, "ম্যাম, আমরা ইষান, আজমল শাহকে গ্রেফতার করেছি। আপনি বাংলাদেশে এলেই আমরা কোর্টে কেস তুলব। আপনি কবে আসছেন?"
ইনায়া শান্ত গলায় বলল, "আমি একটু পর জানাচ্ছি।" ফোনটা কেটে সে অ্যারিসের দিকে তাকাল। অ্যারিসের হাত ধরে নাকী গলায় বলল, "প্লিজ রাজি হয়ে যাও না প্লিজ প্লিজ প্লিজ।"
অ্যারিস প্রথমে মুখ ঘুরিয়ে থাকলেও ইনায়ার জেদ আর পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজি হয়ে গেল।