কয়েক মাস পর.....
বেইজিংয়ের সেই পেন্টহাউসে এখন সুখের সংসার। ইনায়া এখন পুরোপুরি সুস্থ, ছোট আইরা এখন টলমল পায়ে সারা বাড়ি হেঁটে বেড়াচ্ছে। সারাদিন আইরাকে নিয়ে থাকে ইনায়া।
সুবার মেডিকেল এক্সাম শেষ হয়েছে, সে এখন মনোযোগ দিয়ে পরবর্তী পড়াশোনা করছে। সায়মাকে বেইজিংয়ের একটা কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। ইভান নিজের দায়িত্ব মেনে প্রতিদিন তাকে কলেজে দিয়ে আসে আর নিয়ে আসে।
অ্যারিস এখন আগের মতোই খ্যাপাটে আছে, সে তার বিজনেস এখান থেকেই সামলাচ্ছে। আর আদিয়ান বাংলাদেশে ব্যাক ইউনিভার্সিটির লেকচারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন পুরোপুরি ভাবে "ইন গ্রুপ অফ কোম্পানিজ"-এর হাল ধরেছে তার সাথে রেহানও। কোনো সমস্যা হলে ইনায়া সাহায্য করে।
সবাই যখন সুখে আছে, তখন ওদিকে বাংলাদেশে ইষানের অবস্থা শোচনীয়। ইনায়াকে হারিয়ে সে আক্ষরিক অর্থেই উন্মাদ হয়ে গেছে। যে মায়ার জাল আর বিয়ের মিথ্যেয় সে ইনায়াকে বন্দি রাখতে চেয়েছিল, আজ সেই নিঃসঙ্গতা তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।
আজ চাইনিজ নিউ ইয়ার। চারদিকে উৎসবের আমেজ, আকাশটা একদম পরিষ্কার, তাই সবাই মিলে ঠিক করল বেইজিংয়ের বাইরে কোনো এক মনোরম জায়গায় ঘুরতে যাবে।
ইনায়া একটা আকাশী নীল রঙের ড্রেস পরেছে, আইরাকে ঠিক তার মায়ের মতোই সাজানো হয়েছে— আকাশী নীল আর সাদার কম্বিনেশনে এক ফ্রক, মাথায় ছোট একটা ক্লিপ। অ্যারিস সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট।
আদিয়ান সাদা গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট, আর সুবা পরেছে নীল রঙের সুন্দর এক ড্রেস। অন্যদিকে ইভান ক্রিম কালারের গেঞ্জি আর কালো প্যান্টে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে, আর সায়মা তার সাথে মিলিয়ে ক্রিম কালারের একটা ড্রেস পরেছে।
সবাই যখন সেই সুন্দর জায়গাটায় পৌঁছালো, চারপাশের লেক আর সবুজ পাহাড় দেখে মনটা জুড়িয়ে গেল। বডিগার্ডরা কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। সবাই আলাদা হয়ে ঘুরছে।
আদিয়ান আর সুবা দুজনে হাত ধরাধরি করে লেকের ধার দিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ আদিয়ান সুবার হাতের বাঁধনটা একটু শক্ত করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা সুবা, তোমার কি কখনো রিগ্রের্ট ফিল হয়?"
সুবা অবাক হয়ে তাকাল, "কোন বিষয়ে?"
—"আমাকে বিয়ে করার বিষয়ে?"
সুবা মৃদু হেসে বলল, "না তো, একদমই না। কিন্তু হঠাৎ এই কথা কেন?"
আদিয়ান এবার থামল. সুবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি যদি ভেবে থাকো শুধু আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে বলে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি, তবে ভুল ভাবছ। সত্যটা তুমি এখনো জানো না।"
সুবা উৎসুক হয়ে শুনছিল। আদিয়ান বলতে লাগল, "ইনায়ার ডেলিভারির পর বিজনেসের কাজে চায়নাতে আসি। অফিসের কাজ শেষ করে একটু বাইরে বের হয়ে বাস স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। বাইরে তখন ঝিরঝিরে তুষারপাত হচ্ছিল। হঠাৎ আমার নজর গেল তোমার ওপর। তুমি বাসের অপেক্ষায় বসে ছিলে... সেই ইনোসেন্ট মিষ্টি হাসি, চোখের পাতায় তুষার কণা লেগে ছিল আর তুমি বারবার চোখ নাচড়াচ্ছিলে, ঠিক যেন 'স্নো কুইন' ! তুমি হাত বাড়িয়ে তুষার স্পর্শ করছিলে আর আমি দূর থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। বিশ্বাস করো সুবা, সেদিন আমার হার্টবিট মনে হয় ২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।"
সুবা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সে কল্পনাও করতে পারেনি তাদের গল্পের শুরুটা ওখান থেকে।
আদিয়ান হাসল, এক চিলতে সুখের হাসি। "সেদিনই তোমাকে দেখে আমার 'লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট' হয়ে গিয়েছিল। আমি তোমাকে দুইবার প্রস্তাবও করেছিলাম, কিন্তু তুমি সোজাসুজি রিজেক্ট করে দিলে। আমি তখনও জানতাম না যে সেদিন বিপদের হাত থেকে বাঁচানো মেয়েটা আর তুমি একই মানুষ। আমি শুনেছিলাম ইনায়ার বান্ধবী , তবে কোন বান্ধবী সেটা দেখি নি।
এরপর যখন ইনায়া তোমার ছবি পাঠিয়ে বলল তুমিই আমার লাইফ-সেভিয়ার, তখন আমি ডাবল ইমপ্রেসড হয়ে যাই। মনে হলো ভাগ্যই তোমাকে আমার জন্য লিখে রেখেছে। যখন দেখলাম থার্ড টাইম প্রপোজ করার পরেও তুমি আমাকে ঘুরাচ্ছো, তখন ভাবলাম— ধুর! তার এত রিজেকশন খাবো ?! তার চেয়ে একেবারে বিয়ে করে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়! তাই তোমাকে জোর জবরদস্তি করে বিয়ে করে নিলাম।" আদিয়ানের এই অকপট স্বীকারোক্তি শুনে সুবা হা হা করে হেসে ফেলল।
"আসলে আমি সত্যি জানতাম না তুমি ইনায়ার ভাই! বিয়ের সব কাজ শেষ হওয়ার পর যখন ইনায়া তোমাকে কল দিল তখন বুঝতে পেরেছিলাম আমি। সত্যি বলতে, মনে মনে খুব ভয়ে ছিলাম— যদি তোমার ফ্যামিলি আমাকে মেনে না নেয়? কিন্তু সব ভয় ভুল প্রমাণিত হলো যখন দেখলাম শাশুড়ি আম্মু নিজেই আমাকে মিষ্টি খাইয়ে দিলেন। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমাকে কোনো কাজই করতে দেন নি। আমার যত্নেরও কোনো ত্রুটি রাখেন নি তিনি। আমি সত্যি অনেক লাকি যে এমন একটা শ্বশুরবাড়ি পেয়েছি।"
পুরোনো স্মৃতির সেই জট খুলতে খুলতে দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল।