ইষানের এই আকুতি শুনে অ্যারিসের মেজাজ সপ্তমে চড়ল। সে ইষানের বাম হাতের কাছে জ্বলন্ত রডটা এগিয়ে নিয়ে বলল, "তুই আমার বউকে মারতে চেয়েছিলি, আর ড্রাগ ও দিয়েছিলি, তোর বিচার হবে, তবে আইন নয়, আজ বিচার হবে অ্যারিস ফেং-এর আদালতে।"
অ্যারিসের হাতের রডটা ইষানের কব্জির চামড়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, পোড়া মাংসের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
পরিত্যক্ত কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে ইষানের গগনবিদারী চিৎকার দেওয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ছে, আশেপাশে কোনো জনবসতি নেই, তাই এই নরকীয় যন্ত্রণার সাক্ষী কেবল এই চার দেওয়াল। পাশে আজমল শাহর কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে; তিনি বুঝতে পারছেন, আজ আর কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বা অর্থ তাকে এই যমদূতদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। অ্যারিস জ্বলন্ত রডটা ইষানের বাম হাতের ওপর এত জোরে চেপে ধরেছে যে, চামড়া আর পেশি পুড়ে গিয়ে সাদা হাড় উঁকি দিচ্ছে, অ্যারিসের চোখে কোনো দয়া নেই, কেবল এক পৈশাচিক তৃপ্তি।
ইষান যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলে উঠল, "তুই কি মানুষ? শয়তান একটা! এভাবে মারলে তো মারা যাব ...... ..."
অ্যারিস রডটা আরও একটু গভীরে ঢুকিয়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "তোকে কি বাঁচিয়ে রাখব নাকি? ইনায়ার গলা যখন টিপে ধরেছিলি, তখন ওর দম আটকে আসছিল। ওই সময় ও যে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেছিল, তার ১০০ গুণ সুদে-আসলে আজ তোকে ফেরত দেব।"
ইষান তখনো প্রলাপ বকছে, "তোর মতো এক বাচ্চার বাপকে ইনায়া কেন ভালোবাসবে? ও শুধু আমার! ও আমাকেই ভালোবাসে..."
ইনায়া বজ্রগম্ভীর গলায় বলল, "ভুল! আইরা আমাদের নিজেদের সন্তান।"
কথাটা ইষানের কানে বিষের মতো লাগল। সে মাথা নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে উঠল, "না! না! এটা হতে পারে না! ইনায়া শুধু আমার। অ্যারিস আর কথা বাড়াল না। আগুনের কুন্ডলী থেকে দ্বিতীয় রডটা বের করে সে সরাসরি ইষানের পায়ের হাঁটুর ভেতর আড়াআড়ি ঢুকিয়ে দিল। হাড় আর মাংস পোড়ার সেই শব্দ আর অসহ্য যন্ত্রণা ইষান আর নিতে পারল না, এক দীর্ঘ আর্তনাদ করে সে চেয়ারের ওপরই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
আদিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল। এবার সে আজমল শাহের দিকে এগিয়ে গেল। আজমল শাহের চোখে তখন সাক্ষাৎ মৃত্যুভয়। আদিয়ান তার চোখে চোখ রেখে বলল, "তোর ওই নোংরা লোভের জন্য আমি কতগুলো বছর নিজের বাবা-মায়ের থেকে দূরে থেকেছি, চিনতে পর্যন্ত পারিনি। তোর ড্রাগ ব্যবসার খুব শখ, তাই না? মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে খেলা করতে খুব ভালো লাগে তোর?"
আদিয়ান রোহানকে ইশারা করতেই সে একটা বড় ড্রাম নিয়ে সামনে এল। ড্রামটি খুলতেই দেখা গেল কয়েক লিটার নিউরো-ব্লকার ড্রাগ । আজমল শাহর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। তিনি বুঝলেন পারলেন, যে বিষ তিনি অন্যের জীবনে মিলিয়েছিলেন, আজ সেই বিষ দিয়েই তাঁর শেষ বিদায়ের আয়োজন করা হয়েছে।
আদিয়ান একটি সিরিঞ্জে ড্রাগ ভরে নিয়ে আজমল শাহের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। আদিয়ান নিজের হাতে দুই-তিন সিরিঞ্জ ড্রাগ ওঁর শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আজমল শাহের চোখের মণি এখন স্থির হয়ে আসছে, স্নায়ুগুলো অবশ হতে শুরু করেছে, তবে ধুকপুকানি মরে না।
রোহান দুই বালতি ঠান্ডা পানি ইষানের মুখে ছুড়ে মারতেই সে প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ মেলল। ইষান ঝাপসা চোখে সামনে ইনায়াকে দেখে আবারও সেই বিকৃত হাসি হাসল। ইনায়া কঠিন কণ্ঠে বলল, "সেদিন লোক ভাড়া করে ট্রাক দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছিলে। ভেবেছিলে কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না?"
ইষান দাঁতে দাঁত চেপে বলে, "আমি জাস্ট ওই শয়তানটাকে মারতে চেয়েছিলাম। তোমার ওই গাড়িতে ওঠার কথা ছিল না ইনায়া, তোমার এক্সিডেন্ট হবে আমি বুঝতে পারিনি।"
নিজের স্বামীকে 'শয়তান' বলায় ইনায়া রোহানকে চোখের ইশারা করল। রোহান আগুনের কুন্ডলী থেকে ১০ ইঞ্চির একটি লম্বা সূই বের করল, যা এতক্ষণ আগুনে পুড়ে টকটকে লাল হয়ে ছিল। সে জ্বলন্ত সূইটি ইষানের বুকের বাম পাশে গেঁথে দিল।
'আইহহহহহহহহ!'
ইষানের কলিজা ফাটানো চিৎকার চারদিকের দেওয়াল কাঁপিয়ে দিল। তার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। যন্ত্রণায় তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "মেরেই ফেলো আমাকে! প্লিজ, একবারে মেরে ফেলো! কেন এত কষ্ট দিচ্ছ? আমার আর সহ্য হচ্ছে না... প্লিজ!..." বলতে বলতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
ইনায়া শক্ত গলায় জবাব দিল, না, এত সহজে না। তোর ওই নোংরা লোভের জন্য আমার সাজানো সংসারটা ছারখার হয়ে যেতে বসেছিল। আমি আমার অস্তিত্ব ভুলে গিয়েছিলাম। তোকে মারবো তিলে তিলে।"
ইষানকে অজ্ঞান হতে দেখে আদিয়ান এবার আজমল শাহের দিকে ফিরল, তার কপাল বরাবর বন্দুক তাক করল। তার আঙুল ট্রিগারে চাপ দেওয়ার সাথে সাথে পুরো ঘর কাঁপিয়ে বিকট শব্দে গুলি চলল।
ঠাস...
আজমল মাহারের দেহ নিথর হয়ে গেল। কিন্তু ইনায়া লক্ষ্য করল আদিয়ান মাত্র একটি গুলি ছুড়েছে, অথচ আজমল শাহের বুকে দুটি গুলির চিহ্ন। ইনায়া পিছন ফিরতেই ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলেন আফরিন সুলতানা। তার হাতে একটি অটোমেটিক পিস্তল, নল দিয়ে এখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
ইনায়া স্তম্ভিত হয়ে বলল, "আম্মু! তুমি এখানে?"