বাইরে দূর থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে আসছিল।
প্রথমে ক্ষীণ… তারপর ধীরে ধীরে কাছে।
সিফাত জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— “পুলিশ এসে গেছে।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ আবার নীরবতা নেমে এল।
মেঝেতে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। চারপাশ এলোমেলো। ভাঙা কাঁচ, উল্টে থাকা চেয়ার— সব মিলিয়ে কিছুক্ষণ আগেও এখানে কী হয়েছিল সেটা বোঝা যায়।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—
ঘরের মাঝখানে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে সাজেদ খান।
ইফরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল—
— “ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেই তো সব শেষ।”
কিন্তু ইয়েরিন কোনো উত্তর দিল না।
সে কয়েক সেকেন্ড সাজেদের দিকে তাকিয়ে রইল।
সাজেদও তাকিয়ে আছে।
অদ্ভুত একটা শান্ত ভাব তার চোখে।
যেন সে ভয় পায়নি।
যেন সে জানে— পুলিশ এলে কিছু একটা হবে।
সিফাত ধীরে বলল—
— “ওকে দিলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হবে না।”
ইফরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “মানে?”
ইয়েরিন এবার ধীরে বলল—
— “এমন মানুষ একা আসে না।”
ইফরা বুঝতে পারল না।
সিফাত নিচু গলায় বলল—
— “পুলিশ যদি ওকে এখান থেকে নেয়, কাল সকাল হওয়ার আগেই হয়তো ও বের হয়ে যাবে। তারপর?”
কথাটা শেষ করল না।
ইফরা চুপ হয়ে গেল।
সাজেদ হালকা হেসে বলল—
— “অবশেষে কেউ একজন বুঝল।”
ইয়েরিন তার দিকে তাকাল।
— “চুপ থাকুন।”
সাজেদ আবার হেসে বলল—
— “আমাকে লুকিয়ে রাখবে?”
ইয়েরিন এবার সিফাতের দিকে তাকাল।
দুজনের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড কথা ছাড়াই যেন সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।
সিফাত দ্রুত চারপাশ দেখে বলল—
— “স্টোর রুম।”
ইফরা অবাক হয়ে তাকাল।
— “কি?!”
কিন্তু তখন আর সময় নেই।
সাইরেনের শব্দ একদম সামনে।
বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজও শোনা যাচ্ছে।
ইয়েরিন এগিয়ে গিয়ে সাজেদের হাতের বাঁধন শক্ত করল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
— “আজ না।”
সাজেদ কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
সিফাত আর ইয়েরিন মিলে তাকে দ্রুত ভেতরের পুরোনো স্টোর রুমে নিয়ে গেল।
ওই ঘরটা বহুদিন ব্যবহার হয় না।
দেয়ালজুড়ে পুরোনো বাক্স, কাঠের আলমারি আর ঢাকা দেওয়া জিনিসপত্র।
ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইরে বড় একটা ক্যাবিনেট ঠেলে আনা হলো।
সবকিছু শেষ হতে না হতেই—
টক টক।
সামনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ।
সিফাত গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলল।
পুলিশ ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখে প্রশ্ন শুরু করল।
— “কল কে করেছিলেন?”
— “আমি।”
সিফাত শান্তভাবে উত্তর দিল।
পুলিশ ঘর ঘুরে দেখল।
মেঝেতে পড়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দেখল।
প্রশ্ন করল—
— “এরা কারা?”
ইয়েরিন উত্তর দিল—
— “রাতে জোর করে ঢুকেছিল।”
পুলিশ আরও কিছু জিজ্ঞেস করল।
কিন্তু একবারও কেউ সাজেদের নাম বলল না।
ইফরার বুক জোরে ধুকপুক করছিল।
তার মনে হচ্ছিল— যেন সবাই কিছু লুকাচ্ছে।
সবশেষে পুলিশ আহত লোকগুলোকে নিয়ে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।
ইফরা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার চোখ সরাসরি ইয়েরিনের দিকে।
— “এবার বলবি?”
ইয়েরিন চুপ।
ইফরা বলল—
— “পুলিশকে ওর কথা বললি না কেন?”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
দূরে স্টোর রুমের ভেতর থেকে খুব আস্তে একটা শব্দ এলো।
আর তখনই ইফরার মনে হলো—
হয়তো তারা ভুল করেছে।
তবে ইয়েরিন তাকে আস্বস্ত করলো,,,।।
ইয়েরিন বললো তুই ঘরে যা আমরা আসছি,, ইফরা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো না না আমিও যাবো আমার ভয় হচ্ছে,,
-- ঠিক আছে চল এদিক টা পরে দেখছি,,,।।
এরপর ইয়েরিন ইফরা আর সিফাত ঢুকলো সেই স্টোর রুমে যেখানে সাজেদ কে রেখেছে তারা,,।।
ইয়েরিন ইশারা করতেই সিফাত সাজেদ এর মুখের বাঁধন খুলে দিলো,, সাথে সাথে সাজেদ হা হা করে হেসে উঠলো,, হাসির তোড়ে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলো,,ইফরা ভয়ে কিছুটা গুটিয়ে গেলো,,, তবে ইয়েরিন নিশ্চল রইলো,,।।
হাসি থামিয়ে সাজেদ বলে উঠলো
-" কি মনে হয় কতক্ষণ আমাকে এখানে এভাবে আটকে রাখতে পারবে তোমরা,,??"
তারা কিছুক্ষণ চুপ থাকলো,,ইয়েরিন কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো সাজেদ এর এত আত্মবিশ্বাসী হাসি,,।।
এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো সাজেদ এর দিকে তারপর পর কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই ঠাস ঠাস করে থাপ্পড় মারতে লাগলো সাজেদ এর গালে,,পর পর পাঁচ টা থাপ্পড় দিয়ে সে থামলো,, ইতিমধ্যে সাজেদ এর মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে এসেছে গাল থেকে ফেঁটে রক্ত ঝড়ছে,,,এইটুকু মেয়ের হাতে এমন দাবাং মার্কা পাঁচ টা থাপ্পড় খেয়ে সাজেদ বাকহারা হয়ে গেলো,,নিজেকে সামলে চেঁচিয়ে উঠতে নিলে ইয়েরিন আবার তাকে থাপ্পড় মেরে বলে উঠলো,,
-" তোর সাহস কি করে হলো ইফরা কে নোংরা নজরে দেখার লোক ভাড়া করে ওকে স্পর্শ করার,,,"""
গুনে গুনে ১৬ টা থাপ্পড় খেলো সাজেদ,,তার মাথা ঘুরছে, গাল বেয়ে রক্ত ঝরছে,, ঠোঁট কেটে প্রায় দুভাগ হয়ে গেছে,,,
কিছুক্ষণ নীরব সময় কাঁটার পর সাজেদ গর্জে উঠে বললো,,
-"ছাড়বো না তোকে একবার এখান থেকে ছাড়া পাই আগে তোকে খুন করবো,,তুই আমার হাঁটুর বয়সী হয়ে আমার সাথে পাঙ্গা নিস, মরবি তুই,,।"
তার কথা শুনে ইয়েরিন শব্দ করে হেসে উঠলো সাথে হাসলো সিফাত ও ইফরাই শুধু চুপ করে আছে,,
সিফাত বলে উঠলো,,,,
-"শালা বুড়ো হচ্ছিস তাও জ্ঞান হলো না? যেখানো তোর ভাড়া করা এতগুলো লোক থেকেও ইয়েরিনের একটা চুলও ছিঁড়তে পারলো না সেখানে তুই কি করবি?? তুই না জেনে ভুল মানুষের সাথে পাঙ্গা নিলি রে্,, তোর জন্য মায়া হচ্ছে,,।। ""
ইয়েরিন সিফাতের কাছে থেকে মোবাইল নিয়ে একটা ভিডিও অন করলো তারপর সেটা সাজেদ এর মুখের সামনে ধরলো,,,ভিডিও টা দেখে সাজেদের হাসি মিলিয়ে গেলো,, চোখে মুখে ভীর করলো ভয়,,,৷
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে তার ঘুমন্ত স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে কে তাদের আশেপাশে কালো পোশাক ধারী কয়েকটা লোক হাতে ধারালো অস্ত্র,,,।।
সাজেদ জড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো,,
-এই, এই, এরা কারা, হ্যাঁ! আমার বাড়িতে কি করছে ওরা??,,আমার বউ বাচ্চার কিছু হলে কিন্তু ভালো হবে না বলছি,,।। ""
ইয়েরিন কিটকিট করে হেসে উঠলো তারপর মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ করে বললো,,
-"আহারে বুড়োর বউ এর প্রতি কি ভালুপাসা,, তা এতই যখন ভালোবাসা তাহলে বউ কে এত রাতে একা রেখে বাঘের খাঁচায় এসে বাঘ কে খোঁচাচ্ছিস কেন,,।।।""শোন তোকে এখন মারবো না তবে তুই আর একটু বাড়াবাড়ি করলে ওদিকে তোর বউ বাচ্চা শেষ,,, তুই জানিস ও না আমি আসলে কে কি কি করতে পারি,,।।তুই কি ভাবলি এত সহজে আমায় শেষ করে দিবি?? এই জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীর মাঝে বাস করি আমি আর তুই সামান্য মানুষ আমায় মারবি??
যাই হোক তোকে কয়েক টা ডোজ দিয়েই ছেড়ে দিবো. ।। "
তারপর দুঃখী মুখ বামিয়ে বললো,,
-" কিন্তু তোর বউ বাচ্চার কি হবে বলতে পারছি না রে,,"।"
সাজেদ বললো,,
-" কি চাও তুমি বলো আমি সব দেবো প্লিজ ওদের কিচ্ছু করো না মাফ করে দাও,,,।""
-"" দেখো সিফাত দেখ ইরা এর বউয়ের জন্য কি ভালোবাসা বেচারা লয়াাাাাাল,,।""
যাই হোক শোন কাল কোম্পানি তে গিয়ে আগে সবার সামনে ইফরার কাছে মাফ চাইবি তারপর হাতে পায়ে ধরে আমাদের ডিল করতে রাজি করাবি,, তারপর যেনো আর তোর মুখ কখনো আমার সামনে না দেখি বুঝলি???""
-"হ্যাঁ হ্যাঁ বু বুঝে গ গেছি আ আমি,, আমি সব করবো, তুমি ওদের কিছু করবে না তো?"
-"আরে নাহ্ ইয়েরিন এক কথার মেয়ে। তুই আমার কথা মতো কাজ করলে ওরাও বেঁচে থাকবে বুঝলি??""
এরপর ইয়েরিন সিফাতের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করলো,, সিফাত মাথা নেড়ে বোঝালো সে বুঝেছে কি করতে হবে,,,।।
এরপর ইয়েরিন ইফরা কে নিয়ে রুমে চলে গেলো,,,।।।
কল্পনার জগৎ থেকে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আসতেই ইফরার চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল দু'ফোঁটা অশ্রু। অতীতের প্রতিটি স্মৃতি যেন আবারও তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য না-বলা অনুভূতি তাকে ভারাক্রান্ত করে তুলল। সে একবার চোখ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন সেই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে অতীতের সব কষ্ট, আফসোস আর হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোও বেরিয়ে যেতে চাইছে।
সব চিন্তা ঝেড়ে ইফরা আবার বাস্তবে ফিরে এল। ঠিক তখনই ইয়ারিন দ্রুত এসে ওর হাত ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— "চল, তাড়াতাড়ি! রাত কল দিয়েছিল। ওর হাত কেটে গেছে।"
কথাটা শুনেই ইফরার মুখের রঙ বদলে গেল। দুজনেই একবার রহস্যময় লোকটির দিকে তাকিয়ে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।