কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর ইয়েরিন ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটি ছোট কাগজ বের করল।
কাগজটাতে শুধু একটি শব্দ লেখা।
সে কাগজটা টেবিলের উপর রাখল।
লোকটা শব্দটা দেখামাত্র স্থির হয়ে গেল।
তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে গেল।
ইফরা কাগজটা দেখার চেষ্টা করল।
-"ওখানে কি লেখা?"
ইয়েরিন উত্তর দিল না।
লোকটাও না।
কারণ দু'জনেই জানত।
ওই একটি শব্দই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু।
কয়েক সেকেন্ড পর লোকটা ফিসফিস করে বলল,
-"অসম্ভব..."
-"আমি অনেক কিছুই অসম্ভব ভেবেছিলাম।"
ইয়েরিন শান্তভাবে বলল।
-"যেমন?"
-"যেমন, আমাকে সরিয়ে দিলে সব শেষ হয়ে যাবে।"
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
-"তুমি বুঝতে পারছো না।"
-"কি বুঝতে পারছি না?"
লোকটার চোখে এবার আতঙ্কের সঙ্গে অন্য কিছু দেখা গেল।
অনুশোচনা নয়।
আতঙ্ক।
-"কিছু দরজা আছে যেগুলো খোলা উচিত না।"
ইয়েরিন হাসল।
-"আর তুই সেই দরজা খুলেছিলি।"
-"আমার কোনো উপায় ছিল না।"
-"সবাই এই কথাটাই বলে।"
ইফরা মুচকি হেসে বলল,
-"আর শেষে দেখা যায় উপায় ছিল, সাহস ছিল না।"
লোকটা চুপ করে গেল।
---
ইয়েরিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
-"চল ইফরা।"
ইফরা অবাক হলো।
-"এত তাড়াতাড়ি?"
-"হ্যাঁ।"
-"কিন্তু—"
-"আমি যা জানতে চেয়েছিলাম, জেনে গেছি।"
লোকটা হতভম্ব।
-"কি জেনেছো?"
ইয়েরিন দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থামল।
তারপর না ঘুরেই বলল,
-"তুই সত্যি জানিস।"
-"......"
-"আর তুই ওকে ভয় পাস।"
প্রথমবারের মতো লোকটা কোনো উত্তর দিল না।
কারণ উত্তরটা সত্যি ছিল।
ইয়েরিন দরজার হাতলে হাত রাখল।
তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত, ঠান্ডা হাসি।
-"জানিস ইফরা..."
-"কি?"
-"আজ রাতে আমি একজন অপরাধীর সঙ্গে দেখা করতে আসিনি।"
-"তাহলে?"
ইয়েরিন ধীরে ধীরে বলল,
-"আমি একজন সাক্ষীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।"
ইফরা হেসে ফেলল।
আর লোকটা বুঝল—
ইয়েরিন তাকে শাস্তি দিতে আসেনি।
সে আরও ভয়ংকর কিছু করতে এসেছে।
সে তাকে বাঁচিয়ে রেখে ভয় নিয়ে বাঁচতে বাধ্য করতে এসেছে।।
আর সেই ভয়টার নাম এখনো রহস্য,,।।
লাইটারটা ছিল এক অচেনা মানুষের— এমন একজন মানুষ, যার নাম কেউ জানে না, ঠিকানা কেউ জানে না। অথচ সেই অচেনা ছায়ামূর্তিটাই যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে ইয়েরিনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য। কত কৌশল, কত পরিকল্পনা— সবকিছু যেন ঘুরে ফিরে ইয়েরিনকে ঘিরেই।
এই কথাটাই ভাবতে ভাবতে ইফরার দিন-রাত এক হয়ে যাচ্ছিল।
আর ইয়েরিন… সে তো এখনো সেই রহস্যময় নামটাই বলেনি— যে নাম শুনে লোকটা মুহূর্তেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সামান্য একটা নাম শুনেই যদি এমন প্রতিক্রিয়া হয়, তাহলে সেই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে কত বড় রহস্য?
ভাবতে ভাবতে ইফরা কল্পনার জগতে চলে গেল।।
২০২৬ সালের সেই রাতটা ছিল ভয়াবহ।
তখন ইফরা আর ইয়েরিন ছিল একদম একা। তাদের কোম্পানি মাত্রই উন্নতির মুখ দেখতে শুরু করেছে। আর সেই উন্নতিই যেন হাজারো শকুন আর শেয়ালের নজর কাড়ে। চারপাশে অদৃশ্য শত্রুর সংখ্যা বাড়ছিল, যদিও তারা তখনও সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
সেদিন তারা বড় একটি কোম্পানির মালিক, মিস্টার সাজেদ খানের সঙ্গে মিটিংয়ে গিয়েছিল। লোকটির বয়স ৪৫ বা ৪৬ হবে । কিন্তু মিটিংয়ের মাঝখানে ইফরার সঙ্গে সাজেদের তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে ইফরা সেখানেই ডিল বাতিল করে দেয়। ইয়েরিনও কোনো দ্বিধা না করে ইফরার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
বাড়ি ফিরে দুজনেরই সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল। কিন্তু তারা অতটা গুরুত্ব দেয়নি। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমানোর প্রায় এক ঘণ্টা পর হঠাৎ ডাইনিং হল থেকে কাঁচ ভাঙার মতো একটা শব্দ কানে আসে ইফরার।
ইয়েরিনের মাথাব্যথা ছিল, তাই সম্ভবত সে শব্দটা শুনতে পায়নি।
ইফরা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে আসে। চারপাশ নিস্তব্ধ। তাদের বাসায় তখন কোনো মেইডও ছিল না— পুরো বাড়িটাতে তারা ছিল সম্পূর্ণ একা।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে সে।
অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে কিছুই দেখতে পায় না। তাই আর লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন মনে করে না। ফিরে আবার উপরে উঠতে যাবে—
ঠিক তখনই!
পেছন থেকে কেউ হঠাৎ তার মুখ চেপে ধরে।
আতঙ্কে জমে যায় ইফরা।
সে প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে লোকটার হাতে জোরে কামড় বসিয়ে দেয় সে।
ব্যথায় লোকটা হাত সরাতেই ইফরা বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে চিৎকার করে ওঠে—
“রীইইইইইইইইন…!!”
ইফরার সেই আর্তচিৎকারে ইয়েরিনের ঘুম ভেঙে যায়।
সে এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে নিচে নেমে আসে। আর নিচে নেমেই দেখে— একজন অচেনা লোক ইফরার সঙ্গে ভয়ংকর কিছু করার চেষ্টা করছে।
এক সেকেন্ডও ভাবেনি ইয়েরিন।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই টেবিলের ওপর রাখা ফ্লাওয়ার ভেসটা তুলে নেয় সে।
পরের মুহূর্তেই সজোরে আঘাত করে লোকটার মাথায়।
লোকটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে।
তারপর…
পুরো বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।লোকটা দূরে ছিটকে পড়তেই পুরো ঘরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
ইফরা সুযোগ বুঝে সরে এসে ইয়েরিনের পাশে দাঁড়ায়।
— “ইয়েরিন…”
তার গলা কাঁপছিল।
ইয়েরিন এক হাত দিয়ে তাকে আড়াল করে সামনে তাকাল।
লোকটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে।
ইয়েরিন ঠান্ডা গলায় বলল—
— “কে পাঠিয়েছে তোকে?”
লোকটা কিছু বলল না।
ঠিক তখনই—
ড্রয়িংরুমের সব লাইট একসাথে জ্বলে উঠল।
দুজনেই চমকে তাকাল।
সোফায় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে মিস্টার সাজেদ খান।
যেন এটা তার নিজের বাড়ি।
তার দুই পাশে আরও কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে।
সাজেদ ধীরে ধীরে হাততালি দিল।
— “ভালো… খুব ভালো।”
ইফরা হতভম্ব।
— “আপনি…!”
সাজেদ হালকা হাসল।
— “মিটিংয়ে তোমাদের আত্মবিশ্বাস দেখে ভালো লেগেছিল। তাই ভাবলাম একটু সামনে থেকে কথা বলা যাক।”
ইয়েরিন সামনে এগিয়ে এল।
— “রাতে মানুষের বাড়িতে ঢুকে?”
সাজেদ উঠে দাঁড়াল।
তার চোখ এবার ইফরার দিকে গেল, তারপর আবার ইয়েরিনের দিকে।
— “আমি একটা জিনিস পছন্দ করি না।”
সে একটু থামল।
— “আমাকে না বলা।”
ইফরা রাগে বলে উঠল—
— “তাই বলে ভয় দেখাবেন?”
সাজেদ এবার শান্ত স্বরে বলল—
— “আজ ভয় দেখাতে আসিনি। একটা শর্ত দিতে এসেছি।”
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল।
ইয়েরিন কিছু বলল না।
সাজেদ বলল—
— “এক রাত। শুধু আমার কথামতো চলবে। তারপর হয়তো তোমাদের ব্যবসা, তোমাদের শান্তি— সব ঠিক থাকবে।”
ইফরার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— “আমরা কাউকে ভয় পাই না।”
সাজেদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে হাত নাড়তেই নিরাপত্তারক্ষীরা এগিয়ে এল।
এরপর মুহূর্তেই শুরু হলো ধস্তাধস্তি।
ইয়েরিন সামনে দাঁড়িয়ে ইফরাকে পেছনে রাখল।
একজন, দুজন— সবাই মিলে ঘিরে ফেলল।
ইফরা সুযোগ পেলেই সামনে যা পাচ্ছে সরিয়ে দিচ্ছে, ঠেলে দিচ্ছে।
ঠিক তখন—
একজন লোক পাশের টেবিল থেকে একটা কেরোসিনের বোতল এনে ইফরার কাপড়ে ছিটিয়ে দিল।
সবাই থেমে গেল।
ইফরা জমে গেল।
সাজেদ ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা লাইটার বের করল।
ক্লিক।
ছোট্ট আগুনের আলো জ্বলে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড সেটা হাতে ঘুরিয়ে বলল—
— “কখনো কখনো মানুষকে বুঝতে শেখাতে হয়।”
ইয়েরিন এক পা সামনে এল।
— “করবেন না।”
সাজেদ লাইটারটা ছুঁড়ে দিতে হাত তুলতেই—
ইয়েরিন সজোরে লাথি মারে।
লাইটারটা পাশের দিকে ছিটকে পড়ে নিভে যায়।
পরিস্থিতি এক মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ঠিক তখনই—
বাইরে গাড়ির শব্দ।
তারপর দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে যায়।
সিফাত।
সে আসলে সেদিন কাজের জন্য জাপান থেকে ফিরেছিল— কাউকে না জানিয়েই।
ভেতরের অবস্থা দেখে এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না।
ফোন বের করে দ্রুত জরুরি নম্বরে কল করল।
তারপর ভেতরে ঢুকে সোজা সামনে দাঁড়াল।
— “আজ ভুল বাড়িতে এসেছেন।”
এরপর শুরু হলো আরেক দফা ধস্তাধস্তি।
সিফাত একে একে নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতিরোধ করে সবার মনোযোগ সরিয়ে দিল।
ইয়েরিনও সুযোগ নিল।
দুজন মিলে শেষ পর্যন্ত সাজেদকে নিয়ন্ত্রণে আনল।
কিছুক্ষণ পর—
সাজেদকে বসার ঘরের একটা চেয়ারেই বেঁধে ফেলা হলো।
তার মুখের আগের আত্মবিশ্বাস আর নেই।
বাইরে দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সাজেদ মাথা তুলে ইয়েরিনের দিকে তাকাল।
ইয়েরিন শান্ত গলায় বলল—
— “আজকে তুমি ভুল করেছ।”
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইফরা প্রথমবারের মতো বুঝল—
এটা শুধু ব্যবসার ঝামেলা না।
এটার শুরু আরও অনেক আগে থেকে।