কেবিনে ঢুকতেই দেখা গেল, ইফরা বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় কাঁদছে। স্যালাইনের নল লাগানো হাতটা বারবার নাড়িয়ে ছটফট করছে।
— "আমার রিন কোথায়? আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাও! আমি এখনই ওকে দেখতে চাই... প্লিজ!"
চোখদুটো কান্নায় লাল হয়ে গেছে। আতঙ্কে তার পুরো শরীর কাঁপছে।
সিফাত দ্রুত গিয়ে তার পাশে বসে নরম গলায় বলল,
— "ইফরা... শান্ত হও। রিন এই হাসপাতালেই আছে। ও নিরাপদে আছে।"
ইফরা কাঁদতে কাঁদতেই সিফাতের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— "সত্যি? ও ঠিক আছে তো?"
সিফাত মাথা নেড়ে আশ্বাস দিল।
— "হ্যাঁ। রাফিয়ান ওকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। না হলে..."
বাকিটুকু আর বলতে পারল না সে।
ইফরা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল।
সিফাত আঙুল তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফিয়ানকে দেখিয়ে দিল। তারপর পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে খুলে বলল।
সব শুনে রাফিয়ান এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
— "তুমি একদম চিন্তা কোরো না। ও এখন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছে। আশা করছি খুব শিগগিরই জ্ঞান ফিরে আসবে।"
রাফিয়ানের আশ্বস্ত করা কথায় ইফরার বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন কিছুটা থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল।
কিছুক্ষণ পর রাফিয়ান বলল,
— "আমার মনে হয়, তোমার একবার ইয়েরিনের সঙ্গে দেখা করা উচিত।"
ইফরার চোখে সঙ্গে সঙ্গে আশার আলো জ্বলে উঠল।
— "প্লিজ... আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন।"
রাফিয়ান একজন নার্সকে ইশারা করতেই তিনি সাবধানে ইফরাকে ধরে ইয়েরিনের কেবিনের দিকে নিয়ে গেলেন।
কেবিনের সামনে পৌঁছে ইফরা ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল। সে আস্তে করে নার্সকে বলল,
— "আপু... আমি একটু একা থাকতে চাই।"
নার্স মৃদু হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেলেন।
ঘরজুড়ে তখন নিস্তব্ধতা।
শুধু মনিটরের নিয়মিত বিপ... বিপ... শব্দটা নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছিল।
ইফরা ধীরে ধীরে ইয়েরিনের বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার কাছে ভীষণ ভারী লাগছিল।
চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মোচড় দিচ্ছে।
বিছানার কাছে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল।
ইয়েরিন নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাতে ক্যানুলা। গুলিবিদ্ধ স্থানে মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ফ্যাকাশে মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, যেন সমস্ত প্রাণশক্তি কোথাও হারিয়ে গেছে।
ইফরার বুকটা হুহু করে উঠল।
কাঁপতে কাঁপতে সে বিছানার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল।
ধীরে ধীরে ইয়েরিনের ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "রিন... চোখ খোল না। আমি এসেছি। আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিস না..."
কোনো উত্তর এল না।
শুধু মনিটরের শব্দ আর ইয়েরিনের ধীর শ্বাসপ্রশ্বাস জানিয়ে দিচ্ছিল সে এখনও লড়াই করে যাচ্ছে।
ইফরা স্থির দৃষ্টিতে ইয়েরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠতে লাগল অতীতের সেই ভয়ংকর দিনগুলোর স্মৃতি...
মনে হচ্ছিল, ইতিহাস যেন আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে।
সে চলে গেল অতীত এ
---*---
"শাল ২০১৬
বেলা দুপুর প্রচন্ড রোদের তাপে ধরণী ক্লান্ত হয়ে
ঝিমাচ্ছে....!! সাথে ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে পথিক গুলো....।। যেখানে কাঠ ফাটা রোদে সবাই ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে সেখানে স্কুলের মাঠ বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি আর প্রাণবন্ত হাসিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।।।। যেন বাচ্চাগুলোর কোনো ক্লান্তি নেই তারা নিজেদের দুনিয়ায় ব্যাস্ত।। হয়তো এখন টিফিন ব্রেক চলছে আর তাই সবাই নিজেদের দুনিয়ায় মত্ত হয়ে উঠেছে...।। মাঠের এক কোণায় গাছের নিচে দুটো মেয়ে বসে আছে ইফরা আর ইয়েরিন বয়স দুজনেরই ৮ বছরের মতো হবে এতসব বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ির মাঝে ওদের দুনিয়া যেনো আলাদা।।। ওরা খেলছে ওদের মতো হাতে একটা পুতুল আর একটা খেলনা পাখি...।। ওরা বসে নিজেদের সেই পাখির সাথে তুলনা করছে কেনো তাদের ডানা নেই?? তাহলে তারা একসাথে উড়ে পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখতে পারতো। ইস কতই না মজা হতো...।। তাদের গল্পের মাঝেই ক্লাসের ঘন্টা বেজে উঠল ইয়েরিন আর ইফরা উঠে ক্লাসের দিকে হাঁটা ধরল।।।
বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
তারা ক্লাসে যাওয়ার পর থেকেই আকাশ ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যেতে শুরু করল। একটি ক্লাস শেষ হতেই আকাশ অনেক অন্ধকার হয়ে গেল। তাই স্কুলের প্রিন্সিপাল দপ্তরি মতিন কে ছুটির ঘণ্টা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ছুটির ঘণ্টা শোনামাত্রই সবাই হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যে যার গন্তব্যে রওনা হলো।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ ইলশেগুঁড়ির মতো ছোট ছোট হীরকের আকারে বৃষ্টির ফোঁটা তাদের শিশুসুলভ মনে আনন্দের ঢেউ তুলে দিল। তারা খুশি মনে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ ইফরা হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলে ইয়েরিন তাকে ধরে ফেলল।
সেই আকস্মিক মুহূর্তে ইফরা ইয়েরিনের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠল—
—“তুই না থাকলে যে আমার কী হতো, বোন!”
—“আমি থাকতে তুই পড়ে যাবি, আর সেটা আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখব? বলদ পেয়েছিস নাকি আমাকে!”
—“আচ্ছা বাবু, বুঝলাম। এখন তাড়াতাড়ি চল, সামনে আরমান ভাইরা ক্রিকেট খেলছে।”
—“হুম, চল।”
দু’জন হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির থেকে মিনিট পাঁচেক দূরে একটি কাঠ বাগানের পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। কাঠ বাগানের মাঝ বরাবর ক্রিকেট খেলার সুবিধার জন্য খেলোয়াড়রা জায়গাটা পরিষ্কার করে নিয়েছে। হঠাৎ ইফরার দাদার ভাইয়ের ছেলে, মানে ইফরার চাচা মামুন, একটি ছক্কা হাঁকাল—বলটি সোজা ইফরাদের দিকেই আসছিল। ঠিক তখনই আরমান সেই বলটি থামিয়ে দিল।
ইয়েরিন একটু চমকে গেলেও সবকিছু দেখছিল, কিন্তু ইফরা চোখ বন্ধ করে ইয়েরিনের হাত শক্ত করে ধরে রইল।
হঠাৎ আরমান ভাই ইফরাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল—
—“এত ভীতু কেন তুই, ইফরা ?”
ইফরা ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখল, বলটি তাদের গায়ে লাগেনি; বরং কেউ একজন লাগতে দেয়নি। কিন্তু আরমানের কথার কোনো জবাব দিল না সে। চুপচাপ দু’জন হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে চলে যেতে লাগল, আর আরমান ফিরে গেল তার খেলায়।
মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর ইফরাদের বাড়ির সামনে এসে গেল তারা। ইয়েরিনদের বাড়ি আর মাত্র দুই মিনিটের পথ। তাই ইয়েরিন বলল—
—“আজকে আমাদের বাড়িতে তোর দাওয়াত।”
—“কেন? হঠাৎ!”
—“আরে, মা আজকে তোর পছন্দের হালুয়া বানিয়েছে, বুটের ডাল দিয়ে। তাই তোকে যেতে বলেছে।”
—“আচ্ছা বাবু, যাবো। তুই সাবধানে যাস।”
—“আচ্ছা, তুইও যা।”
ইয়েরিন তার বাড়ি চলে আসে। ইয়েরিনের মা ইয়াসমিন গৃহিণী বাবা ফাহাদ মিয়া প্রবাসী।। তারা চার বোন ভাই নেই ইয়েরিনের, এতে অবশ্য তাদের কারোরই আফসোস নেই।।। বড় বোন আরশি তার বিয়ে হয়েছে মেঝো বোন মেহরা ক্লাস সিক্সে পড়ে আর ছোট বোন মিরহা বয়স ২ বছর।।। ইয়েরিন খুব বেশি চঞ্চল নয় একটু চুপচাপ আর চাপা স্বভাবের মেয়ে,, তবে সেটা শুধু সবার সামনে মনে মনে বেশ দুষ্টু সে ইফরার সাথে থাকলেই তার অন্য রুপ দেখা যায়।। ইফরা একটু বেশি চঞ্চল স্বভাবের হাসিখুশি আর মিশুক।। ইফরার মা শামসুন্নাহার বেগম সবাই সুমি বলেই চিনে আর বাবা ইফতেখার আলম ওনিও প্রবাসী।। বর্তমানে ইফরা তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।। ইফরাদের বাড়িতে সে তার মা তার দাদা খোরশেদ আলম আর তার দাদি ফুল খাতুন থাকেন।। একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে ইফরা বেশ আদর পায়।। অন্যদিকে ইয়েরিন যদিও তারা চার বোন তবুও তার মা বাবা সবাইকে সমান ভালেবাসে বলে মনে করে ইয়েরিন।। ইয়েরিন আর ইফরার বেশ মিল রয়েছে দুজনেই খুব কোমল হৃদয়ের তাদের মধ্যে বোঝাপড়া বেশ অন্য রকম নিজেদের থেকে বেশি তারা একে অন্যকে চেনে খেয়াল রাখে.....।। তাদের আরও বন্ধু বান্ধব আছে যেমন সাদিয়া, চাঁদনি, শাকিলা, চাম্পা, ঝুমা, সুমাইয়া সব মিলে ইফরা আর ইয়েরিনের ছোট্ট বেলা বেশ আনন্দে কাটে।।। বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের বিন্দু মাত্র ধারণা নেই।। তারা পৃথিবী সাজায় তাদের নিয়মে যেখানে পৃথিবী এক ফুলের বাগানের ন্যায় সুন্দর আর উপভোগ্য।।। তবে আদও কি তাই?? পৃথিবী কি সত্যি এতটা আরামদায়ক?? ইয়েরিন আর ইফরা কি এভাবেই আজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে? নাকি বাস্তবতার ভয়াল থাবা বদলে দেবে তাদের চিন্তা ভাবনা??