৮ মাস পর…
ক্লাস থ্রির ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। ইফরা হলের ঠিক মাঝখানের সিটে বসে নিশ্চিন্তে নিজের মতো লিখছে। হঠাৎ সুমন স্যার কোনো কাজে ক্লাসরুম থেকে বের হতেই চাঁদনী, শাকিলা, সাদিয়া, চম্পা, সুমাইয়া আর ঝুমা দৌড়ে এসে ইফরার খাতা দেখে লিখতে শুরু করে। তাদের এই আচরণ দেখে ইফরা একটু ভয় পেয়ে যায়। আর এই দৃশ্য দেখে সামনে বসা ইয়েরিন হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়ে পড়ার অবস্থা।
ঠিক তখনই সুমন স্যার ক্লাসে ঢুকে পড়েন। ইফরার অবস্থা দেখে তিনি হেসে ফেলেন এবং বাকিদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। ইফরা আবার নিশ্চিন্তে লিখতে থাকে, কিন্তু ঝুমারা সবাই রাগভরা চোখে ইফরা আর ইয়েরিনের দিকে তাকায়।
পরীক্ষা শেষে সবাই যখন বের হয়, ইয়েরিন আর ইফরা খাতা গুছিয়ে বের হতে গিয়ে ফেরদৌসি ম্যাডামের সাথে দেখা হয়। তিনি তাদের ইংরেজি শিক্ষক এবং ইফরার দূর সম্পর্কের ফুফু—যদিও ইফরা তা ভালো করে জানে না। ফেরদৌসি ম্যাডাম কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনই ফাতেমা ম্যাম হেসে বলেন,
— “ইফরা , ইয়েরিন, তোমাদের পরীক্ষা কেমন হলো?”
দুজন একসাথে বলে ওঠে,
— “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হয়েছে ম্যাম।”
চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ফাতেমা ম্যাম বলেন,
— “আচ্ছা, দেখে-শুনে বাড়ি যেও।”
— “আচ্ছা ম্যাম, আসসালামু আলাইকুম।”
দুজন গল্প করতে করতে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ মাঝপথে আরমান ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। তিনি কোলিকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কলি হলো আরমান ভাই এর মামাতো বোন ও ইফরার দাদার বোনের ছেলের মেয়ে,,, আর আরমান ওর দাদার বোনের মেয়ের ছেলে,, সেই হিসেবে ইফরা ও ওর মামাতো বোন ৷ ইফরাদের দেখে থামে আরমান । ইফরার সাথে কিছু না বলে ইয়েরিনকে জিজ্ঞেস করেন,
— “কিরে, তোদের পরীক্ষা কেমন হলো?”
— “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো ভাইয়া ।”
ইফরা কিছু না বলে ইয়েরিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে আসে। আসলে পারিবারিক কিছু ঝামেলার কারণে তাদের সাথে ইফরার কথা বলা হয় না। আরমান কিছু বলতে চাইলেও ইফরা তাকে খুব ভয় পায়।
হাঁটতে হাঁটতে তারা বাড়িতে পৌঁছে যায়। ইয়েরিন নিজের বাড়িতে চলে যায়, আর ইফরা নিজের বাড়িতে ঢুকে দেখে—তার দাদা-দাদি চুপচাপ বসে আছেন। আর তার মা সুমি ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছেন।
ইফরা দুই-তিনবার ডাকতেই হঠাৎ তার মা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে ইফরার হাত ধরে বলেন,
— “চল, আজই তোকে নিয়ে আমি আমার বাবার বাড়ি চলে যাব। আমি আর এখানে থাকব না। যেখানে বাড়ির বউ হিসেবে আমাকে সম্মানই করে না, সেখানে কেন থাকব?”
ঠিক তখনই ইফরার দাদি ফুল খাতুন গম্ভীর মুখে ইফরার হাত টেনে নিয়ে তাকে কোলে তুলে বলেন,
— “আমার নাতনি, আমার ছেলের আদরের মেয়ে ওকে আমরা কোথাও যেতে দেব না। তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো।”
সুমি উত্তরে বলেন,
— “এত আদরের মেয়ে হলে জন্মের পর আপনার ছেলে তাকে কোলে নিতে অস্বীকার করেছিল কেন? পরে আপনাদের জোরাজুরিতে নিতে বাধ্য হয়েছিল!”
— “তখন আমার ছেলে লজ্জা পেত, তাই কোলে নিতে চাইত না। তারপর দুই মাস পর থেকেই তো কোলে নিয়ে ঘুরত।”
— “তখন একটু মায়া হয়েছিল বলেই নিয়েছিল!”
অনেক তর্ক-বিতর্কের পরও কোনো সমাধান না পেয়ে সুমি হঠাৎ ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। ঠিক তখনই ইফরার মামা ফরিদ এসে পৌঁছান। আসলে ইফরার দাদি আগেই তাকে ফোন করে ডেকেছিলেন।
এসে এমন অবস্থা দেখে ফরিদ হতভম্ব হয়ে যায়। এক পর্যায়ে সুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে অনেক কষ্টে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু ফুল খাতুন ইফরাকে যেতে দেন না।
১ জানুয়ারি…
ইফরাদের রেজাল্ট দেওয়া হবে এবং নতুন ক্লাস। ক্লাস ফোরের বই বিতরণ করা হবে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ প্রিন্সিপাল স্যার কথা বলা শুরু করলেন—
— “আমাদের স্কুলের কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য আমরা অনেক সুনাম অর্জন করতে পারছি। দোয়া রইল, তোমরা আরও সফল হও।”
তারপর তিনি সবার হাতে রেজাল্ট শিট দিয়ে একটি কাগজ হাতে নিয়ে বললেন—
— “তোমরা তোমাদের রেজাল্ট শিট পেয়েছো। এখন তোমাদের নতুন জীবনের শুরু। আর কে কততম হয়েছো, সেটাই এখন বলবো।”
চারপাশ হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
প্রিন্সিপাল স্যার আবার বললেন—
— “প্রথম হয়েছে… জয় আহমেদ!”
জয় খুশিতে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে স্যারের কাছে চলে গেল।
— “দ্বিতীয় হয়েছে… মিলন মিয়া!”
মিলনও একইভাবে দৌড়ে স্যারের কাছে গেল।
— “এবং তৃতীয় হয়েছে… ইফরা মনি! সবাই হাততালি দাও!”
— “আর চতুর্থ হয়েছে আমাদের
ইয়েরিন মনি!”
ইফরা আর ইয়েরিন খুশিতে লাফিয়ে উঠে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। তারপর দুজন হাত ধরে স্যারের কাছে গেল। অনুষ্ঠান শেষে তারা খুশিতে নাচতে নাচতে, লাফাতে লাফাতে বাইরে বের হলো।
সামনে ইফরা আর ইয়েরিন, আর তাদের পেছনে আনন্দ করতে করতে আসছে সাদিয়া, ঝুমা, চম্পা, শাকিলা, চাঁদনী, সুমাইয়া, গাজী, আলামিন, সাগর, মোহাম্মদ, সাথী সবাই।
যেতে যেতে তারা সেই কাঠবাগানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ইফরা তার মামুন চাচ্চুকে বলল—
— “চাচ্চু! আমি আর ইয়েরিন থার্ড আর ফোর্থ হয়েছি! ইয়েহহ!”
— “অনেক ভালো, চাচ্চু! আরও ভালো করে পড়তে হবে।”
তাদের আনন্দ দেখে আরমানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। কেউ না দেখলেও সাকিব সেটা লক্ষ্য করল। আরমান কিছু না বলে চুপচাপ ক্রিকেট গ্রাউন্ডের দিকে চলে গেল।
এভাবেই কেটে গেল তাদের ক্লাস ফোরের দিনগুলো।
আনন্দভরা দিনগুলো বেশিদিন থাকে না অনেক হাসি-খুশির মাঝেও কখনো আকাশ মেঘে ঢেকে যায়, আবার সূর্যের সোনালি আলোয় পৃথিবী ঝলমল করে ওঠে।
ক্লাস ফোরের জীবনটাও তারা ঠিক এভাবেই পার করে দিল।
ভবিষ্যতের অপেক্ষায় সবাই থাকলেও, তারা তাদের বর্তমান দিনগুলোই উপভোগ করত—সহজভাবে, আনন্দে।
এর মধ্যেই ইফরার মায়ের রাগ ও কমে যায়,, সে ও এসে পরে বাপের বাড়ি থেকে..
দেখতে দেখতে ক্লাস ৪ এর বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেলো।। হাসি মজা দুষ্টুমি আর দৌড়াদৌড়ির মাঝে এবার ইফরা আর ইয়েরিন এর পড়া তেমন ভালো হয়নি, কালই পরীক্ষা,, ইফরা আর ইয়েরিন ইফরাদের বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে বসে এসবই বলছিলো যে এবার তারা একদম ফেইল হয়ে যাবে,,।। ইয়েরিন এমনিতেই গণিতে খুব কাঁচা, গণিত দেখলেই তার মাথা ঘুরে কিন্তু ইফরা গণিতে অনেক ভালো তবে ইফরা আর ইয়েরিন দুজনেরই প্রিয় সাবজেক্ট ইংরেজি এই পরীক্ষা নিয়ে তাদের চিন্তা নেই একদম,,।। তাদের কথার মাঝেই ইফরার মা তাদের ডেকে উঠে,, দুজনে উঠে ইফরাদের বাড়ি আসে, তারপর ইফরার মায়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে ইয়েরিন বাড়ি চলে আসে।।। এখন একটু পড়তে হবে,,।। দেখতে দেখতে পরীক্ষা শুরু হলো দুজনের পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হলো,,।। আজকে শেষ পরীক্ষা তারপর স্কুল থেকে লম্বা ছুটি পাওয়া যাবে এই নিয়ে ইফরা আর ইয়েরিনের আনন্দের শেষ নেই,,।। পরীক্ষা শেষে হেড মাস্টার কালাম স্যার এসে বলে গেলো স্কুল এক মাস বন্ধ এর মাঝে পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়া হবে তারপর ক্লাস ৫ এ ক্লাস শুরু হবে,,।। এতদিন বন্ধ পেয়ে ইয়েরিন, ইফরা, সাদিয়া, চাঁদনি চাম্পা, ঝুমা, সুমাইয়া সবাই খুশিতে আত্মহারা তারা একসাথে স্কুলের মাঠে বেরিয়ে এলো।। ভাবলো কিছুক্ষণ খেলা করে তারপর বাড়ি যাবে,, যেই ভাবা সেই কাজ সবাই মিলে গাছ ছোঁয়া, কুমির কুমির, জুতো চোর এমন আরও কিছু খেলায় মেতে উঠলো।। পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ ৮ দিন ইফরা ইয়েরিন আর সব বান্ধবী রা পশ্চিম দিকের ক্ষেতে গোল্লা ছোট খেলছে,, খেলা শেষে ক্লান্ত হয়ে সবাই বাড়ি ফিরে গেলো কথা হলো আবার কাল সবাই এখানেই খেলতে আসবে,,।। সবাই চলে গেলে ইফরা আর ইয়েরিন ও নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো,, আকাশের তেজি সূর্য টা পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে আকাশ কমলা রঙে ছেয়ে গেছে,, হালকা বাতাস বইছে,, দারুণ মনোরম পরিবেশ,,,
দুজন এসে ইয়েরিনদের বাড়ির ছাদে বসলো। ইফরা বললো,
-" আমি তো কাল সাটুরিয়া নানুর বাড়ি যাবো! তুই কোথাও ঘুরতে যাবি না??"
-" আমি খালার বাড়ি যাবো কিন্তু পরে,, আগে বল তুই কবে আসবি??"
-" জানি না তবে বন্ধ শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে আসবো...।।"
-" এমন বললে হবে না শিওর বল কবে আসবি?
-" আচ্ছা, মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে বলবো..।"
এরপর দুজনে ঠিক করলো আত্মীয় বাড়ি ঘোরাঘুরি শেষ করে তারা স্কুল খোলার ৭ দিন আগে বাড়ি ফিরবে এরপর ইফরা নিজের বাড়ি যাওয়ার জন্য এগোলো ইয়েরিন গেলো তাকে একটু এগিয়ে দিতে।।। ইয়েরিনের মা ইয়াসমিন ইফরা কে থাকতে বললো কিন্তু ইফরা বললো,
-" পরে আসবো আম্মু এখন যাই।"
বলেই ইফরা চলে গেলো,।।। এরপর ইফরা চলে গেলো তার নানুর বাড়ি আর ইয়েরিন গেলো তার খালার বাড়ি,,।। সেখানেও ইয়েরিনের দিন বেশ আনন্দে কাটে তার খালা তাকে বেশ আদর করে খালু রোজ সকালে বাজারে নিয়ে ইয়েরিনের ইচ্ছে মতো চিপস কিনে দেয়,,,।। ইয়েরিনের খালার দুই মেয়ে এক ছেলে,
।।।বড় মেয়ে আঁখি তার সাথে ইয়েরিনের বেশ ভাব ইচ্ছে হলেই তার থেকে গল্প শোনে ইয়েরিন তাকে আঁখি আপু বলে ডাকে মেঝো মেয়ে নয়ন তার সাথে ইয়েরিনের বেশ ভালো সম্পর্ক ইয়েরিন খালার বাড়ি গেলে সারাক্ষণ নয়ন আপুর সাথেই চিপকে থাকে একসাথে পুকুরে গোসল করে গল্প করে,,।। আর ছোট ছেলে আকাশ ইয়েরিনের থেকে দুই বছরের বড় হবে,, তার সাথে মাঝে মাঝেই ইয়েরিনের ঝগড়া মারামারি হয়,,,।। যাই হোক এভাবেই স্কুলের ছুটি শেষ করে ইয়েরিন বাড়ি ফিরে এলো,,।।। এসেই মাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
-"মা ইফরা এসেছিলো নাকি?? আমাকে খুঁজেছে??"
ইয়াসমিন বেগম জানালেন ইফরা আসে নি,,,,,।।। ইয়েরিনের একটু মন খারাপ হলো সে বললো
-" মা আমি এক্ষুনি আসছি ইফরা দের বাড়ি থেকে,,"
বলেই ইয়েরিন দৌড় লাগালো পেছন থেকে তার মা বলতে লাগলো,,
-"একটু আগে বাড়ি আসলি হাত মুখ ধুয়ে তারপর যা,,,।।"
কে শোনে কার কথা এক দৌড়ে ইয়েরিন সোজা এসে থামলো ইফরার বাড়ির সামনে এসে দেখলো ইফরার দাদি ফুল খাতুন বসে সুপারি কাটছেন ইয়েরিন এসে জিজ্ঞেস করলো
-"দাদি ইফরা আসে নি??? "
ফুল খাতুন বললেন
-"আসেনি হয়তো আজ আসবে না ওরা আর দুই এক দিন থাকতে পারে....।। "
এবার ইয়েরিনের বেশ মন খারাপ হলো, সে ছোট করে বললো
-" ওহ্ "
এরপর বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো।। রাস্তার কাছে আসতেই দেখলো ইফরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছে ইয়েরিন খুব খুশি হলো,,।।। দৌড়ে গিয়ে ইফরা কে জড়িয়ে ধরলো এদিকে হঠাৎ কেউ জড়িয়ে ধরায় ইফরা বেশ অবাক হলো তবে পেছনে ঘুরে ইয়েরিন কে দেখে সেও খুশি হলো,,,,।।। এরপর দুজনে সেখানে দাঁড়িয়েই গল্প শুরু করলো এতদিন কে কি করলো না করলো এসব...।। এদিকে বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ইফরার মা তাদের ডেকে বলছে
-"ঘরে এসে কথা বল দুজন এমন ভাব করছিস যেন কত জন্ম তোদের দেখা হয় না...।।"
কে শোনে কার কথা??? ওরা ওখানেই দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলো তারপর ইয়েরিন বললো
-" সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে এখন বাড়ি যাই নয়তো মা মারবে। "