ইয়েরিনের কথা মতো সবাই বাড়ি ফিরে গেলেও ইফরা দুই ঘন্টার মধ্যেই আবার ফিরে এসেছে সিফাত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে আর ইসরাত ইয়েরিনের জন্য খাবার বানাচ্ছে কিছুক্ষণ পর সেও আসবে,,
সবার এত দৌড়াদৌড়ি দেখে ইয়েরিন বেশ বিরক্ত হয়ে ইফরা কে বললো,, -"সবাই এখানে পড়ে থাকলে কোম্পানির কি হবে হ্যাঁ?"
-" আরে তুই চিন্তা করিস না তো তুই সিফাত অফিসের খেয়াল রাখছে,,।।"
দু'দিন পেরিয়ে যায় তিন দিনের দিনই ইয়েরিন জোর করে বেড থেকে নেমে দাঁড়ায় আজ সে হেঁটেই ছাড়বে ওই ইফরা তাকে উঠতে চাইলেই চেপে ধরে রাখে,,তবে আজ আর ইফরা ইয়েরিনের জেদের সাথে পেরে উঠলো না,,।।
ইয়েরিন উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কাঁধে বেশ টান অনুভব করলো মাথা ঘুরে উঠলো তবুও সোজা হয়ে দাঁড়ালো,,ইফরা সাহায্য করতে চাইলে সোজা না করে দিয়ে বললো আমি একাই পারবো,,।।
-"তুই কি নিজেকে সুপারম্যান থুক্কু সুপারওম্যান মনে করছিস,,।।"
-"নাহ্! "
-"তাহলে দেখছিস কষ্ট হচ্ছে তবুও একা হাঁটতে চাইছিস কেনো,,?? "
-"ওই রাইয়ের বাচ্চা সুপারওম্যান নিজেকে আমি না তুই মনে করিস দুদিন ধরে হাসপাতালে আছিস রাত জাগছিস অন্যের খেয়াল রাখতে গিয়ে যে নিজের অবস্থা পেত্নীর মতো করে ফেলেছিস সে খেয়াল আছে??"
-"তা নিয়ে তোর ভাবতে হবে না নিজের ব্যাথার কথা তো একটা বারও বললি না মনেই হচ্ছে না তুই এত ব্যাথা পেয়েছিস মনে হচ্ছে যেন তোর কিছুই হয়নি নিজের প্রতি এতো বেখেয়ালি কেনো তুই???"
-"হ্যাঁ নিজের খেয়াল আর নিজে কীভাবে রাখবো তিন দিন ধরে যা শুরু করেছিস তোরা তিন জনে মিলে ইসরাত রোজ রোজ নতুন নতুন খাবার বানিয়ে আনছে সিফাত একটু পর পর একগাদা ফল দিয়ে যাচ্ছে আর তুই আমাকে জোর করে ধরে সব গেলাচ্ছিস,,।।"
-"শোন রাই তাড়াতাড়ি আমার বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা কর,,।। "
-"বললেই হলো নাকি তুই এখনো পুরোপুরি সুস্থ নস,,।।"
ইফরা আর ইয়েরিনের কথাবার্তা শেষ হতেই ইফরা নিজের হাতে ধীরে ধীরে ইয়েরিনকে খাইয়ে দিতে লাগল। ইয়েরিনও কোনো আপত্তি না করে চুপচাপ খেতে লাগল। কেবিনজুড়ে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
অন্যদিকে নিজের কেবিনে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে রাফিয়ান। মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন।
"একজন মেয়ের জন্য এতগুলো গার্ড পুরো হাসপাতাল পাহারা দিচ্ছে! কে এই মেয়ে? তবে দেখেই তো মনে হলো ওদের ফ্রেন্ড গ্রুপের সবার সঙ্গে বেশ ফ্রেন্ডলি..."
ভাবতে ভাবতেই রাফিয়ানের দৃষ্টি সামনে থাকা আয়নায় গিয়ে থামল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে অজান্তেই নিজের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করল।
— "যাই বলি না কেন... ইয়েরিনের মধ্যে কিছু তো একটা আছেই।"
আয়নার প্রতিচ্ছবি যেন মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— "কিছু না থাকলে কি আর ড. রাফিয়ান আহমেদ এত ঘন ঘন ইয়েরিনের দিকে চোরের মতো তাকায়?"
রাফিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
— "আরে না... ওকে আমার সবার থেকে আলাদা লাগে, ব্যস!"
প্রতিচ্ছবিটা যেন আরও খোঁচা দিল,
— "সবার কাছেই স্পেশাল মানুষটাকে আলাদাই লাগে। কী বলিস? মনে আবার লাড্ডু ফুটতে শুরু করেনি তো?"
রাফিয়ান বিরক্ত হওয়ার ভান করে হেসে ফেলল।
— "ধুর! কী সব ভাবছি আমি! না চিনি, না জানি..."
— "সবাই কি আর আগে থেকেই চেনা-জানা থাকে? চিনে নিতে হয়..."
রাফিয়ান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
— "এই অনুভূতিটার সঙ্গে জীবনে প্রথমবার দেখা হলো।"
প্রতিচ্ছবি আবারও বলল,
— "যাই বল, ওর জন্য তোর মনে কিছু একটা হচ্ছে। না হলে তোর চোখ দুটো বারবার ওর দিকেই কেন চলে যায়?"
রাফিয়ান উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ দরজায় তাড়াহুড়ো করে নক পড়ল।
একজন নার্স হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকে বলল,
— "স্যার, ইমার্জেন্সিতে একজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট এসেছে!"
এক মুহূর্তও দেরি করল না রাফিয়ান। টেবিলের ওপর রাখা স্টেথোস্কোপটা হাতে তুলে নিয়ে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে ইমার্জেন্সির দিকে দৌড়ে গেল। মুহূর্তেই ব্যক্তিগত সব ভাবনা সরিয়ে দায়িত্বশীল ডাক্তার রাফিয়ান আহমেদ আবার নিজের পেশার জগতে ফিরে এল।
রাফিয়ান দ্রুত পায়ে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ঢুকতেই চারপাশের ব্যস্ততা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। নার্সরা ছুটোছুটি করছে, একজন ওয়ার্ডবয় স্ট্রেচার ঠেলে ভেতরে আনছে, আর রোগীর স্বজনদের চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
— "পেশেন্টের ভাইটালস?" রাফিয়ান গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
একজন নার্স সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট এগিয়ে দিল।
— "স্যার, ব্লাড প্রেসার অনেক নিচে নেমে গেছে। পালসও অনিয়মিত।"
রাফিয়ান একবার রোগীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "অক্সিজেন চালু করুন। দুইটা আইভি লাইন ওপেন করুন। আর সঙ্গে সঙ্গে ব্লাড স্যাম্পল ল্যাবে পাঠান।"
সবাই দ্রুত নিজের নিজের কাজে লেগে গেল।
রাফিয়ান নিজেই রোগীকে পরীক্ষা করতে শুরু করল। কয়েক মিনিটের টানা চেষ্টার পর ধীরে ধীরে মনিটরের সংখ্যাগুলো স্বাভাবিকের দিকে ফিরতে লাগল।
একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে বলল,
— "এখন আপাতত স্টেবল। তবে অবজারভেশনে রাখতে হবে।"
রোগীর স্বজনেরা কৃতজ্ঞ চোখে রাফিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি শুধু হালকা মাথা নেড়ে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলেন।
করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবারও অকারণে ইয়েরিনের কথা মনে পড়ে গেল।
নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
— "আচ্ছা... মেয়েটা এখন কী করছে?"
মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকেই ধমক দিল সে।
— "রাফিয়ান, কী হচ্ছে তোর? হাসপাতালটা কি ছোট নাকি? বারবার একই মেয়ের কথাই কেন মনে পড়ছে?"
তবুও মন যেন তার কথা শুনল না।
কোনো কারণ ছাড়াই পা দুটো আবার সেই কেবিনের দিকেই এগোতে লাগল, যেখানে ইয়েরিন ভর্তি আছে।
কেবিনের দরজার সামনে পৌঁছে রাফিয়ান থেমে গেল।
ভেতর থেকে ইফরার হাসির শব্দ ভেসে আসছে। সঙ্গে সিফাতও কী যেন বলে সবাইকে হাসাচ্ছে।
দরজার কাঁচের ফাঁক দিয়ে একবার তাকাতেই রাফিয়ান দেখল, ইয়েরিন আগের চেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক। মুখে ক্লান্তি থাকলেও ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে আছে।
অজান্তেই রাফিয়ানের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত এক কণ্ঠ ভেসে এল—
— "ড. রাফিয়ান... আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?"
হঠাৎ চমকে উঠে রাফিয়ান ঘুরে দাঁড়াল।
সামনেই হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ড. মাহির দাঁড়িয়ে আছেন। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
— "কী ব্যাপার, ড. রাফিয়ান? কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যে?"
রাফিয়ান এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
— "না স্যার... আসলে পেশেন্টকে একবার দেখে যাচ্ছিলাম।"
ড. মাহির মুচকি হেসে বললেন,
— "ভালো। তবে এই পেশেন্টের সিকিউরিটি কিন্তু বেশ কড়া। শুনলাম পুরো ফ্লোরেই গার্ড বসানো হয়েছে।"
— "জ্বি স্যার, আমিও খেয়াল করেছি।"
— "যাই হোক, কেসটা তোমার হাতে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে।"
— "জি, স্যার।"
ড. মাহির চলে যেতেই রাফিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
সে ধীরে ধীরে কেবিনের দরজায় নক করল।
টক... টক...
ভেতর থেকে ইফরার কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "কাম ইন।"
রাফিয়ান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সবাই তার দিকে তাকাল।
ইফরা ভদ্রভাবে উঠে দাঁড়াল।
— "ডাক্তার, আসুন।"
রাফিয়ান সরাসরি ইয়েরিনের দিকে তাকাল। মেয়েটা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। আগের তুলনায় মুখে একটু রং ফিরেছে।
— "এখন কেমন লাগছে?"
ইয়েরিন ছোট্ট করে উত্তর দিল,
— "অনেকটাই ভালো।"
রাফিয়ান এগিয়ে গিয়ে তার পালস চেক করল। তারপর ব্লাড প্রেসারের রিপোর্ট দেখল।
সবকিছু ঠিকঠাক দেখে সে বলল,
— "ভয়ের কিছু নেই। তবে এখনো পুরোপুরি রেস্টে থাকতে হবে। অতিরিক্ত কথা বলা বা স্ট্রেস নেওয়া যাবে না।"
ইয়েরিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ঠিক তখনই সিফাত দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
— "ডাক্তার, আমাদের বন্ধুকে কবে ছাড়বেন?"
রাফিয়ান হালকা হেসে বলল,
— "এত তাড়াহুড়ো কেন? আগে পুরোপুরি সুস্থ হোক। তারপর ডিসচার্জের কথা ভাবা যাবে।"
কথাটা শুনে সবাই হালকা হেসে উঠল।
কিন্তু হাসির মাঝেও রাফিয়ানের চোখ বারবার ইয়েরিনের দিকেই চলে যাচ্ছিল।
আর সেটা ইফরার চোখ এড়াল না।
ইফরা একবার রাফিয়ানের দিকে, আরেকবার ইয়েরিনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
"হুম... কিছু একটা তো আছেই। ডাক্তার সাহেব শুধু পেশেন্ট দেখতেই বারবার আসছেন বলে মনে হচ্ছে না..."
ঠিক তখনই রাফিয়ানের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি অজানা নম্বর।
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল গম্ভীর কণ্ঠ—
— "ড. রাফিয়ান আহমেদ... ইয়েরিনের ব্যাপারে বেশি জানার চেষ্টা করবেন না। নিজের ভালো চাইলে দূরে থাকুন।"
কথাটা বলেই কল কেটে গেল।
রাফিয়ানের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—
"কে এই ইয়েরিন? আর কেন সবাই তাকে ঘিরে এত রহস্য?"
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল রাফিয়ান। কানের ভেতর যেন এখনও ভেসে আসছে সেই গম্ভীর কণ্ঠের কথাগুলো।
"ইয়েরিনের ব্যাপারে বেশি জানার চেষ্টা করবেন না... নিজের ভালো চাইলে দূরে থাকুন।"
রাফিয়ান ধীরে ধীরে ফোনটা পকেটে রেখে একবার কেবিনের ভেতরে তাকাল।
ইয়েরিন, ইফরা, সিফাত আর ফাহিম নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত। তাদের দেখে কোথাও মনে হচ্ছে না, এদের জীবনকে ঘিরে এত বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে।
মনে মনে বলল,
— "যতই ভয় দেখানো হোক, আমি একজন ডাক্তার। আমার রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার দায়িত্ব।"
স্বাভাবিক মুখ করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল সে।
করিডোরে বের হতেই তার চোখে পড়ল কেবিনের সামনেই চারজন সশস্ত্র গার্ড সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশের প্রতিটি মানুষকে তারা তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করছে।
রাফিয়ান ধীরে ধীরে একজন গার্ডের কাছে গিয়ে বলল,
— "একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
লোকটা সম্মান দেখিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
— "জি, ডাক্তার সাহেব।"
— "আপনারা কার আন্ডারে কাজ করছেন?"
গার্ডটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল,
— "স্যরি স্যার। এই বিষয়ে কিছু বলার অনুমতি আমাদের নেই।"
রাফিয়ান আর কিছু বলল না। শুধু হালকা হাসল।
— "ঠিক আছে।"
কিন্তু তার মনে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
ঠিক তখনই হাসপাতালের সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম থেকে এক কর্মচারী দৌড়ে এসে বলল,
— "স্যার!"
— "জি?"
— "একটু আগে সিসিটিভিতে একজন সন্দেহজনক লোককে দেখা গেছে। সে কয়েক মিনিট ধরে ইয়েরিন ম্যামের কেবিনের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। গার্ডদের দেখে পরে দ্রুত নিচে নেমে যায়।"
রাফিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
— "ফুটেজটা আছে?"
— "জি স্যার।"
রাফিয়ান আর দেরি না করে কন্ট্রোল রুমের দিকে রওনা দিল।
মনিটরে ফুটেজ চালু হতেই দেখা গেল— কালো হুডি পরা একজন লোক মুখ নিচু করে করিডোর দিয়ে হাঁটছে। কেবিন নম্বরের সামনে এসে সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকানোর চেষ্টা করল।
এরপরই গার্ডদের একজন তার দিকে এগিয়ে আসতেই লোকটা দ্রুত ঘুরে চলে গেল।
রাফিয়ান ভিডিওটা কয়েকবার দেখল।
হঠাৎ লোকটার ডান হাতে থাকা একটি রুপালি আংটির দিকে তার নজর আটকে গেল।
আংটিটায় অদ্ভুত একটা চিহ্ন খোদাই করা।
রাফিয়ান ভিডিও থামিয়ে জুম করলেও মুখটা স্পষ্ট বোঝা গেল না, কিন্তু সেই চিহ্নটা তার মনে গেঁথে রইল।
সে নিচু স্বরে বলল,
— "তুমি যে-ই হও... ইয়েরিনের কাছে কেন এসেছিলে?"
অন্যদিকে, হাসপাতাল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি কালো গাড়ির ভেতর বসে আছে সেই হুডি পরা লোকটি।
তার হাতে থাকা ফোনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল—
"Target is still alive. Wait for the next order."
মেসেজটা পড়ে লোকটি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দিল।
আর ঠিক তখনই আসন্ন বিপদের কোনো ধারণা ছাড়াই হাসপাতালের কেবিনে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল ইয়েরিন।
পরদিন সকালে রাউন্ড শেষ করে রাফিয়ান সোজা ইয়েরিনের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে তখন ইফরা, সিফাত আর ফাহিম গল্প করছে।
রাফিয়ান দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে বলল,
— "এক্সকিউজ মি... আমি কি ইয়েরিনের সঙ্গে পাঁচ মিনিট একা কথা বলতে পারি? কিছু দরকারি কথা ছিল।"
ইফরা ইয়েরিনের দিকে তাকাল। ইয়েরিন মাথা নেড়ে বলল,
— "তোরা একটু বাইরে যা। আমি কথা বলে ডাকছি।"
ইফরা, সিফাত আর ফাহিম বেরিয়ে যেতেই রাফিয়ান দরজাটা ভেতর থেকে টেনে দিল।
চেয়ার টেনে ইয়েরিনের সামনে বসে বলল,
— "এখন কেমন লাগছে?"
— "অনেক ভালো।"
— "গুড। তাহলে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলি।"
ইয়েরিন ভ্রু তুলে তাকাল।
— "বলুন।"
রাফিয়ান শান্ত গলায় বলল,
— "গতকাল রাতে আপনার কেবিনের সামনে একজন সন্দেহজনক লোক ঘোরাঘুরি করছিল। সিসিটিভিতে তাকে দেখা গেছে।"
ইয়েরিনের মুখে তেমন কোনো পরিবর্তন এল না।
— "তার মুখ দেখা গেছে?"
— "না। কালো হুডি পরা ছিল। মুখটা ঢাকা ছিল।"
— "ও..."
— "আপনার কি কোনো শত্রু আছে?"
ইয়েরিন একটুও ইতস্তত না করে উত্তর দিল,
— "হ্যাঁ, আছে।"
— "ব্যক্তিগত শত্রু?"
— "না। আমার পরিচয়ের কারণে অনেক শত্রু তৈরি হয়েছে। যারা আমার ক্ষতি করতে চায়, তাদের সংখ্যা কম না। তাই আমার লোকেরা সবসময় আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। হাসপাতালে যে গার্ডগুলো দেখছেন, ওরাও আমার লোক।"
রাফিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— "লোকটার হাতে একটা রুপালি আংটি ছিল। আংটিতে অদ্ভুত একটা চিহ্ন খোদাই করা ছিল।"
ইয়েরিন মাথা নেড়ে বলল,
— "হতেই পারে, এসব বিষয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই,, relax! "
— "নিশ্চিত?"
— "একদম। "
রাফিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আপনার ব্যাপারটা যত জানছি, ততই মনে হচ্ছে আপনি সাধারণ কেউ নন।"
ইয়েরিন হালকা হেসে বলল,
— "সাধারণ মানুষ হলে হয়তো জীবনটা অনেক সহজ হতো।"
রাফিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— "আপনি সাবধানে থাকবেন। আমি চাই না হাসপাতালের ভেতরে আপনার কোনো ক্ষতি হোক।"
ইয়েরিন মুচকি হেসে বলল,
— "চিন্তা করবেন না, ডাক্তার। আমার লোকেরা সতর্ক আছে।।"
কথাটা শুনে রাফিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে গেল। চোখ সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
— "আচ্ছা... আমি পরে আবার দেখতে আসব।"
সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইফরা, সিফাত আর ফাহিম ভেতরে ঢুকে পড়ল, আর রাফিয়ান হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবল—
"ইয়েরিন... তুমি আসলে কে?"
রাফিয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে ফিরে এল। কিন্তু আজ কোনো কাজেই মন বসছে না। বারবার ইয়েরিনের বলা কথাগুলোই মাথায় ঘুরছে।
"আমার পরিচয়ের কারণে অনেক শত্রু তৈরি হয়েছে..."
নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল,
— "তুমি কে, ইয়েরিন? তোমার পরিচয়টা কী?"
ঠিক তখনই দরজায় নক পড়ল।
— "May I come in, sir?"
— "Come in."
একজন নার্স ভেতরে ঢুকে বলল,
— "স্যার, ৩০৭ নম্বর কেবিনের পেশেন্টের রিপোর্ট এসেছে।"
রাফিয়ান রিপোর্টটা দেখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে আবার কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।