এদিকে ইফরা নিজের রুমে শুয়েও এপাশ-ওপাশ করছে। ইয়েরিনের রুমে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় নিজের রুমটা আজ কেমন যেন অচেনা লাগছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না। সারাদিন অফিসে প্রচুর কাজ করায় শরীরও বেশ ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ঘুম নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে মনে মনে বলল,
— "ছাদে গিয়ে একটু হেঁটে আসি। হয়তো ভালো লাগবে।"
ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এল সে। ছাদের দরজাটা খোলা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল।
— "এই তারা ফুপ্পি না! আবারও দরজা আটকে রাখতে ভুলে গেছে।"
বিড়বিড় করতে করতে অন্ধকারে নিজের প্রিয় জায়গা, ছাদের দক্ষিণ পাশের রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎই শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিল সে।
ঠিক তখনই শক্ত দুটো হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। ইফরা ভয় পেয়ে চিৎকার করতে যাবে, এমন সময় অপরিচিত সেই মানুষটি তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরে বলল,
— "আরে, চিৎকার কোরো না! আমি..."
ইফরা তার হাত সরিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
— "আমি মানে? কোন লুল্লু প্রাণী?"
অন্ধকারেই হালকা হেসে উত্তর এল,
— "আরে, আমি মেহরাব।"
ইফরা অবাক হয়ে বলল,
— "আপনি! এত রাতে ছাদে কেন? আর আমাকে ছাড়ুন। সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছেন কেন?"
মেহরাব ধীর স্বরে বলল,
— "ঘুম আসছিল না, তাই ছাদে এসেছি।"
ইফরা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "আপনার জন্যই তো প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম।"
মেহরাব ভ্রু তুলে বলল,
— "এহ্! আমি না ধরলে তো সত্যিই পড়তে। এমনিতেই তোমাকে ধরতে গিয়ে মনে হচ্ছিল আমার হাতটাই ভেঙে যাবে। কী ওজন রে বাবা!"
ইফরা চোখ বড় বড় করে বলল,
— "কীইই? আমার ওজন? মাত্র তিপ্পান্ন কেজি আমি! হুহ!৷
কিছুক্ষণ পর আবার বলল,,
-" এত জিম করে বডি বানিয়ে কি লাভ হয়েছে আপনার সামান্য ইফরাকে ধরতে পারেন না। "
বলেই খিল খিল জরে হেসে দিল।
মেহরাব মুখ ফিরিয়ে চাপা হাসল।
এরপর দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দক্ষিণ দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস দুজনের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু বাতাসের মৃদু শব্দ আর দূরে কোথাও রাতজাগা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে মেহরাব বলল,
— "তুমি খুব সুন্দর গান গাও।"
ইফরা খানিকটা অবাক হলো। তারপরই দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে বলল,
— "I know, Mr. Lullu."
মেহরাব কপাল কুঁচকে বলল,
— "এই! তুমি আমাকে কী বললে?"
— "লুল্লু প্রাণী।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "নামটা সুইট না?"
মেহরাব অসহায় মুখে বলল,
— "এসব পাও কোথা থেকে?"
ইফরা ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— "সিক্রেট। বলা যাবে না।"
মেহরাব আর কিছু বলল না। সে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত। এই মেয়েটার সঙ্গে সে যতই রুক্ষ আচরণ করতে চায়, ততই যেন তা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অকারণেই ইফরার উপস্থিতি তার মনকে নরম করে দেয়।
নিজের অস্বস্তি লুকাতে গম্ভীর গলায় বলল,
— "অনেক রাত হয়েছে। নিচে গিয়ে ঘুমাও।"
ইফরা সঙ্গে সঙ্গে ভেংচি কেটে বলল,
— "আপনার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে আমারও বয়েই গেছে। হুহ!"
কথাটা বলেই সে দ্রুত সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।
মেহরাব কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল। এরপর গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সেও ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল।
সকাল ঠিক ৮টা।
আজ মাথাব্যথার জন্য অফিসে যায়নি ইফরা। পর্দা টানা ঘরে এখনো আধো অন্ধকার। নরম কম্বলটা জড়িয়ে আরাম করে ঘুমোচ্ছিল সে।
ঠিক ৮টা ১৩ মিনিটে তার ফোনটা হালকা ভাইব্রেট করতে শুরু করল। বিরক্তিতে চোখও পুরো না খুলেই ফোনটা কানে ধরল।
ওপাশের লোকটা কী বলছে, তা শোনা গেল না। শুধু ইফরার কথাগুলোই শোনা গেল।
— "আমার ডিজাইন করা এখনো সত্তরেরও বেশি ড্রেস আছে, যেগুলো কেউ চোখেও দেখেনি।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "আপনি চাইলে আমি বিশটা দিতে পারি... তবে কোন বিশটা দেব, সেটা পুরোপুরি আমার ইচ্ছা।"
ওপাশ থেকে সম্ভবত সম্মতি জানানো হলো।
ইফরা ছোট্ট করে বলল,
— "ওকে।"
এরপরই কোনো কথা না বাড়িয়ে কল কেটে দিল।
ফোনটা পাশে ছুড়ে দিয়ে বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করল,
— "এইসব আবুল্লা মার্কা মানুষের জন্য আমার ঘুমটাই নষ্ট হয়!"
বলে আবার চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ বারান্দার দিক থেকে ভেসে এলো এক পুরুষ কণ্ঠের গান।
সুরটা খুব জোরে নয়, হালকা বাতাসে ভেসে আসছে।
"Dekha hai jabse tumhe...
haan tumko hi dekhte hain...
sochte hain, kyun tumko
itna zyada sochte hain...
aise na le dil mere ishq ke faasle..."
ইফরা হঠাৎই ধড়ফড় করে উঠে বসল।
— "এই বাড়িতে ছেলে মানুষ গান গাইছে?"
তার মনে সঙ্গে সঙ্গেই পার্টির সেই রাতটার কথা ভেসে উঠল। এই তো, ঠিক এই গানটাই তো সে সেদিন গেয়েছিল!
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে দ্রুত বারান্দার দিকে হাঁটল।
কিন্তু বারান্দায় পৌঁছানোর আগেই গানটা থেমে গেল।
চারদিকে তাকিয়ে দেখল, নিজের বারান্দা একেবারে ফাঁকা।
ঠিক তখনই তার ডান পাশের বারান্দা, অর্থাৎ মেহরাবের রুমের বারান্দার পর্দাটা হালকা নড়ে উঠল। পর্দার আড়াল দিয়ে বোঝাই গেল, মেহরাব এইমাত্র ভেতরে ঢুকেছে।
ইফরা কয়েক সেকেন্ড সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর আর কিছু না ভেবে রুমে ফিরে গেল।
ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। এরপর করিডোরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে বলল,
— "তারা ফুপিইইই! এক কাপ কফি দিয়ে যাও তো!"
নিচ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,
— "আসছি মা!"
ইফরা আবার রুমে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুলগুলো ভালো করে আঁচড়ে একপাশে বেণি করল।
চুলে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই মুখ বাঁকাল।
— "উফ! আমার চুলগুলো এমন কার্লি কেন? ওয়েভি হলেই তো কত সুন্দর লাগত!"
কিছুক্ষণ পর তারা ফুপ্পি ধোঁয়া ওঠা এক মগ কফি দিয়ে চলে গেলেন।
কফির মগ হাতে নিয়ে ইফরা আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
দক্ষিণমুখী বারান্দা হওয়ায় এখান থেকে দূরে বিস্তীর্ণ সমুদ্রটা দেখা যায়। আজ কেন যেন সমুদ্রটাকে একটু বেশি দূরে মনে হচ্ছে। তবে সেই দূরত্ব পেরিয়েই ঠান্ডা, লবণাক্ত বাতাস এসে আলতো করে ছুঁয়ে দিল ইফরার মুখ।
আজ তার পরনে সাদা রঙের একটি সাদামাটা টপ আর ম্যাচিং প্লাজো। সকালের নরম আলোয় তাকে অদ্ভুত শান্ত আর স্নিগ্ধ লাগছে।
ঠিক তখনই মেহরাবও নিজের বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সে।
সাদা পোশাকে ইফরাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অকারণেই বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে চাইল না। চুপচাপ আবার নিজের রুমের ভেতরে চলে গেল।
আর ইফরা?
সে তখনও কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সমুদ্র, আকাশ আর সকালের প্রকৃতি দেখছে। তাই মেহরাবের আসা-যাওয়া তার চোখেই পড়ল না।
ইয়েরিন অফিসে বসে একের পর এক ফাইল মনোযোগ দিয়ে চেক করছিল। আজ নতুন পারফিউমের কিছু স্যাম্পল আসার কথা, তাই সে ফোন বের করে সিফাতকে কল দিল।
— "মি. সিফাত আরফিন, আপনি আজকাল খুবই অন্যমনস্ক হয়ে উঠেছেন। চাইলে আপনার এই রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।"
ওপাশ থেকে হালকা হেসে সিফাত বলল,
— "আরে ইয়েরিন, রাগ করো কেন? স্যাম্পল এসে গেছে। আমি এখনই সাইন করছি। লিফটে উঠলেই চলে আসছি, একদম বেশি সময় লাগবে না।"
— "ওকে।"
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ইয়েরিন কল কেটে দিল।
ঠিক তখনই ফোনে মেসেজের নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। ইফরা।
Ifra: "আজকে নতুন একটা ডিল হয়েছে। ইমেইল করে দিয়েছি, দেখে নিস। ২০টা ড্রেসের অর্ডার। শালারা হেভি!"
মেসেজটা পড়ে ইয়েরিনের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ইমেইল খুলে অর্ডারের ডিটেইলস একবার দেখে নিল। সবকিছু ঠিকঠাক আছে নিশ্চিত হয়ে রিপ্লাই দিল,
"Nice. Good job."
এরপর আবার কাজে মন দিল সে। একে একে সব ফাইল ক্লিয়ার করল, কয়েকটা জরুরি ডকুমেন্টে সাইন করল, আর নতুন অর্ডারের আপডেটও সিস্টেমে এন্ট্রি করে দিল। কিছুক্ষণ পর সিফাত পারফিউমের স্যাম্পলগুলো নিয়ে তার কেবিনে ঢুকল। দু'জনে মিলে প্রতিটা স্যাম্পল খুলে ঘ্রাণ পরীক্ষা করল, নোট নিল এবং কোনগুলো ফাইনাল শর্টলিস্টে যাবে সেটা ঠিক করল।
সব কাজ গুছিয়ে নেওয়ার পর হঠাৎ সিফাতের মনে পড়ল, আজ সারাদিন ফাহিমকে অফিসে দেখা যায়নি। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে কল দিল।
— "কিরে, অফিসে আসিসনি কেন?"
ফাহিমের কণ্ঠটা বেশ দুর্বল শোনাল।
— "শরীরটা ভালো না। ইয়েরিনকে মেসেজ দিয়ে বলেছি। নো টেনশন।"
সিফাতের কণ্ঠে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
— "ওহ... কী হয়েছে?"
ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "অনেক জ্বর এসেছে। মাথাটাও প্রচণ্ড ব্যথা করছে। তাই আজ আর বের হতে পারিনি।"
— "ডাক্তার দেখিয়েছিস?"
— "এখনও না। একটু পর যদি জ্বর না কমে, তাহলে যাব।"
সিফাত গম্ভীর স্বরে বলল,
— "অবহেলা করিস না। দরকার হলে আমাকে বল, আমি এসে নিয়ে যাব। আগে সুস্থ হও, অফিসের চিন্তা করতে হবে না।"
ফাহিম হালকা হেসে বলল,
— "আচ্ছা, ধন্যবাদ। কিছু লাগলে তোকে জানাব।"
কল কেটে যাওয়ার পর সিফাত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ইয়েরিনের দিকে ফিরে বলল,
— "ফাহিমের অনেক জ্বর। আজ আসতে পারবে না মনে হয়।"
ইয়েরিন ফাইল থেকে চোখ না তুলে শান্ত গলায় বলল,
— "ওকে বিশ্রাম নিতে বলো। অফিসের কাজ আমরা সামলে নেব। আগে ওর সুস্থ হওয়াটাই জরুরি।"
ফাহিমের সাথে কথা বলে সিফাত কলটা কেটে দিল। অফিস শেষ হতেই সিফাত আর ইয়েরিন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজ সারাদিনের কাজের চাপে ইয়েরিনের মাথা বেশ ব্যথা করছিল, তাই সে গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বসল। সামনে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছিল, আর সিফাত পাশে বসে ফোন স্ক্রল করছিল।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজের নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। নম্বরটা সেভ করা ছিল "আমার রাত্রী" নামে। স্ক্রিনে নামটা দেখেই সিফাত একটু অবাক হলো। জীবনে এই প্রথম ইসরাত নিজে থেকে তাকে মেসেজ দিয়েছে। কৌতূহল নিয়ে দ্রুত ইনবক্সে ঢুকতেই দেখল—
— "ইয়েরিন কোথায়? ওর ফোনে কল দিচ্ছি, ধরছে না।"
সিফাত সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিল,
— "ওর মাথা ব্যথা করছে। তাই পেছনের সিটে বসে চোখ বন্ধ করে আছে।"
কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
— "ওহ, ঠিক আছে।"
মেসেজটা দেখে সিফাত একটু হাসল। তারপর মজা করেই আবার লিখল,
— "জীবনে প্রথম মেসেজ দিলে, একটু তো জিজ্ঞেস করতে পারতে আমি কেমন আছি।"
সেন্ড হতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রিপ্লাই এলো—
— "🙂"
সিফাত ইমোজিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা হেসে মনে মনে বলল,
— "এই মেয়েটা আর কিছু বলবে না।"
ফোনটা লক করে সেও চোখ দুটো কিছুক্ষণ বন্ধ করে রইল।