এদিকে বাসায় ইসরাত নতুন একটা রেসিপি শিখেছিল। মনে হলো আজ ম্যাঙ্গো ডেজার্ট বানিয়ে সবাইকে খাওয়াবে। যত্ন করে বানিয়ে ফ্রিজে রেখে হাত মুছতেই দরজা খুলে ইয়েরিন ধীর পায়ে প্যালেসে ঢুকল।
ইসরাত কিছু বলার আগেই ইয়েরিন ক্লান্ত গলায় বলে উঠল,
— "কল দিয়েছিস, ধরিনি কারণ ফোন সাইলেন্ট ছিল। আমার মাথা ব্যথা করছে, তাই বকবক করিস না। আমি ওপরে গেলাম।"
কথা শেষ করেই এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।
ইসরাত কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ইয়েরিনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিফাত ফিক করে হেসে ফেলল।
সিফাতের হাসি শুনে ইসরাতের ভ্রু কুঁচকে গেল।
"আমাকে নিয়ে হাসাহাসি? আচ্ছা, দেখাচ্ছি মজা!"
রাগে গিয়ে ধপ করে সোফায় বসে টিভি চালিয়ে দিল। আজ সে কারও সাথেই কথা বলবে না।
অন্যদিকে সিফাত পেট চেপে হাসতেই থাকল। ইসরাতের ফুলে থাকা মুখটা দেখে হাসিটা আর ধরে রাখতে পারছিল না।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ধপ করে ইসরাতের পাশেই সোফায় বসে বলল,
— "শোনো ইসরাত, রাগ করো না বুঝলে? ইয়েরিনের আজ অনেক কাজের চাপ ছিল। তাই ওইসব বলেছে।"
— "........"
কোনো উত্তর নেই।
সিফাত বুঝে গেল, ইয়েরিনের কথায় নয়— নিজের হাসির কারণেই ইসরাত রেগে আছে। তাই বিষয়টা পাল্টে নরম গলায় বলল,
— "আমাকে এক কাপ চা করে দেবে?"
— "........"
— "অনেক রাগ উঠেছে?"
— "........"
সিফাত ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
— "ভাবছিলাম, তোমার নতুন গাড়ি হয়েছে... তোমাকে আমি ড্রাইভিং শেখাব।"
কথাটা শুনেই ইসরাত অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "সত্যি? শিখাবেন?"
সিফাত মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
ইসরাতের মুখে সঙ্গে সঙ্গেই হাসি ফুটে উঠল।
— "আপনি বসুন, এক্ষুনি চা নিয়ে আসছি।"
বলেই সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা রাগে একটাও কথা বলছিল না, এখন তার মুখে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। সিফাত মাথা নেড়ে নিজের মনেই হেসে ফেলল।
— "এই মেয়েটার রাগ ভাঙানো আসলে খুব একটা কঠিন না।"
কয়েক মিনিট পর ট্রেতে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর সঙ্গে কিছু বিস্কুট নিয়ে ফিরে এল ইসরাত। টেবিলের ওপর ট্রে রেখে এক কাপ সিফাতের দিকে বাড়িয়ে দিল।
— "এই নিন।"
সিফাত কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিতেই বলল,
— "বাহ... চা তো দারুণ হয়েছে।"
প্রশংসা শুনে ইসরাত একটু লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকাল।
— "ভালো লাগলে আরও বানিয়ে দেব।"
— "না, এটা শেষ করি আগে।"
দুজনেই শান্তভাবে চা খেতে লাগল। টিভি চললেও কারও মন সেদিকে নেই।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইসরাত আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
— "কবে থেকে ড্রাইভিং শেখাবেন?"
সিফাত কাপটা টেবিলে রেখে বলল,
— "আগে তোমার মাথায় একটা জিনিস ঢুকাও। ড্রাইভিং শুধু গাড়ি চালানো না, ধৈর্য আর দায়িত্বও লাগে।"
ইসরাত মনোযোগ দিয়ে মাথা নাড়ল।
— "আমি মন দিয়ে শিখব।"
— "তাহলে কাল অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারলে গ্যারেজে শুরু করব। প্রথম দিন শুধু বেসিকস।"
ইসরাতের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
— "ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করব।"
ওদের কথোপকথন চলতেই উপরের তলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে এলো। বুঝতে বাকি রইল না, ইয়েরিন ওষুধ খেয়ে বিশ্রাম নিতে গেছে। সিফাত একবার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল,
"আজ ওর ওপর সত্যিই অনেক চাপ গেছে। কাল যেন একটু ভালো থাকে..."
আর এদিকে ইসরাত নিজের নতুন গাড়ি আর আগামীকাল থেকে ড্রাইভিং শেখার কথা ভেবেই মৃদু মৃদু হাসছিল। তার কিছুক্ষণ আগের অভিমান যেন এক কাপ চা আর সিফাতের কয়েকটা কথাতেই গলে পানি হয়ে গেছে।
পরের দিন সকাল ঠিক ৭টা। এখনও ইয়েরিনের ঘুম ভাঙেনি। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে তার ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় উঠে বসেই বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ফাহিমের মায়ের কান্নাভেজা কণ্ঠ।
— "ইয়েরিন মা, আমার ছেলের জ্বর তো আরও বেড়েই চলেছে। চোখ-মুখ সব লাল হয়ে উঠছে মা..."
ইয়েরিন শান্ত গলায় বলল,
— "আন্টি, প্লিজ প্যানিক করবেন না। আপনি শান্ত হন, না হলে আপনিও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি এখনই গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি দেরি না করে ফাহিমকে নিয়ে সিটি হাসপাতালে চলে যান।"
— "আচ্ছা মা..."
ফোন কেটে দিয়েই ইয়েরিন তাদের গ্রুপে একটা মেসেজ দিল। গ্রুপটার নাম "Disco Bar"— সম্ভবত ইফরাই দুষ্টুমি করে এমন নাম রেখেছিল।
সবার আগে মেসেজটা দেখল সিফাত। সে তখনই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ইফরা এখনও গভীর ঘুমে।
ইয়েরিনও ফ্রেশ হতে বাথরুমে গেল। গোসল সেরে বের হয়ে আবার ফোন চেক করে দেখল, ইফরা এখনও ওঠেনি। মনে মনে ভাবল, "সিফাত জেগেছে হয়তো..."
ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়েই ইফরার রুমে ঢুকে তাকে টেনে তুলল। ফাহিমের কথা শুনতেই ইফরারও ঘুম উড়ে গেল। সে তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে লাগল।
মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই ইয়েরিন নিচে নেমে দেখল সিফাত পুরোপুরি প্রস্তুত। ইফরা তখনও নামেনি। উপরে আর না গিয়ে ইয়েরিন তাকে ফোন করল।
— "আর দুই মিনিট!"
— "আমরা গাড়িতে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি কর। আন্টি হয়তো ফাহিমকে নিয়ে ইতোমধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে গেছেন।"
ফোন রাখতেই সিফাত বলল,
— "আমি রাফিয়ান ভাইকে জানিয়ে দিয়েছি। কোনো সমস্যা হবে না।"
কথাটা শুনে ইয়েরিন একবার হঠাৎ সিফাতের দিকে তাকাল। মনে হলো কিছু বলতে চায়, কিন্তু সিফাত তখন ফোনে চোখ রেখে কিছু দেখছিল। তাই আর কিছু না বলে শুধু বলল,
— "চলো, ইফরা আসছে। গাড়ি বের করো। আর ড্রাইভার নেওয়ার দরকার নেই।"
ইফরা নেমে আসতেই তিনজন দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিল। ইসরাতও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ইয়েরিন বলেছিল,
— "তুই পরে গিয়ে দেখে আসিস।"
সিটি হাসপাতালে পৌঁছে কেবিনে ঢুকতেই তারা দেখল, রাফিয়ান একটু আগেই ফাহিমকে চেক-আপের জন্য নিয়ে গেছে। কেবিনে শুধু ফাহিমের মা, রুবি বেগম, উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন।
সবার আগে ইফরা ভেতরে ঢুকল। তাকে দেখেই রুবি বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ইফরা এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর দুজন নার্স ফাহিমকে কেবিনে ফিরিয়ে নিয়ে এল।
উচ্চ জ্বরের ঘোরে ছেলেটার শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল। বেডে শুইয়ে দেওয়ার পরই সে কাঁপতে শুরু করল।
দৃশ্যটা দেখে সিফাতের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
"এই সেই ফাহিম? সবসময় হাসিখুশি, উড়নচণ্ডী ছেলেটার আজ কী অবস্থা..." মনে মনে ভাবল সে।
এদিকে মেহরাব ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমেই পুরো ঘটনা শুনে সিফাতকে ফোন করেছিল। লোকেশন জেনে সেও হাসপাতালে রওনা দিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর রাফিয়ান কেবিনে ঢুকল।
ভেতরে ঢুকেই সবার আগে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ইয়েরিনের মুখে। কয়েক সেকেন্ড যেন স্থির হয়ে রইল সেই চোখজোড়া। তারপর নিজেকে সামলে সিফাতের দিকে ফিরে বলল,
— "এই ওষুধগুলো এখনই লাগবে। এক মিনিটও দেরি করা যাবে না। না হলে জ্বর কমবে না। সব চেক-আপ শেষ করেছি। রিপোর্ট আসতে আরও তিন-চার ঘণ্টা লাগবে।"
সিফাত মাথা নেড়ে প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়েই দ্রুত বেরিয়ে গেল।
ফাহিমের পাশে বসে রুবি বেগম ছেলের হাত-পা মালিশ করতে করতে কাঁদছিলেন।
ইফরা ওয়াশরুম থেকে একটা রুমাল ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে এনে ফাহিমের কপালে রাখল। কিন্তু মাত্র বিশ সেকেন্ডের মধ্যেই রুমালটা গরম হয়ে গেল। সে আবার ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে একইভাবে কপালে রাখতে লাগল।
কেবিন থেকে বের হওয়ার আগে রাফিয়ান আরেকবার ইয়েরিনের দিকে তাকাল। আজ অদ্ভুতভাবে কোনো কথা বলল না।
ইয়েরিনও একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। এরপর ফোন বের করে কাউকে কল করে নিচু স্বরে কথা বলতে শুরু করল।প্রায় পনেরো মিনিট পর সিফাত ওষুধ নিয়ে কেবিনে ফিরে এলো। রাফিয়ান তখনও পাশের কেবিনে ছিলেন। খবর পেতেই তিনি এসে নার্সদের হাতে ওষুধগুলো তুলে দিলেন।
নার্স দ্রুত ইনজেকশন প্রস্তুত করতে লাগল। ফাহিম তখনও জ্বরের ঘোরে অচেতন, মাঝে মাঝেই কাঁপছে। ক্যানুলা দিয়ে ওষুধ দেওয়া শুরু হতেই সে কষ্টে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
ইফরা ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরে বলল,
— "আর একটু সহ্য করো, সব ঠিক হয়ে যাবে..."
রুবি বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আবারও চোখ মুছলেন।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল মেহরাব।
— "কেমন আছে ও?"
সিফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "জ্বর অনেক বেশি। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।"
মেহরাব এগিয়ে গিয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল। সবসময় হাসিখুশি ছেলেটাকে এভাবে দেখে তারও মনটা খারাপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল পুরো কেবিনে।
রাফিয়ান ফাইলটা বন্ধ করে বললেন,
— "জ্বর আপাতত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে ভাইরাল, ব্যাকটেরিয়াল নাকি অন্য কোনো ইনফেকশন। এর মধ্যে কেউ ওর পাশে থাকবেন। শরীরের তাপমাত্রা নিয়মিত চেক করতে হবে।"
সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
রাফিয়ান চলে যাওয়ার পর ইয়েরিন রুবি বেগমের পাশে গিয়ে বসল।
— "আন্টি, আপনি সকাল থেকে কিছু খেয়েছেন?"
রুবি বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন,
— "এমন অবস্থায় কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না মা..."
ইয়েরিন একটু কঠিন গলায় বলল,
— "আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ফাহিমকে দেখবে কে? আপনি বসুন, আমি ক্যান্টিন থেকে কিছু নিয়ে আসছি।"
— "না মা, দরকার নেই..."
— "দরকার আছে। আপনি না খেলে আমরাও কেউ খাব না।"
ইয়েরিনের কথায় ইফরা আর সিফাতও সায় দিল।
শেষ পর্যন্ত রুবি বেগম আর না করতে পারলেন না।
ইয়েরিন সিফাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "চলো, ক্যান্টিন থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসি।"
সিফাত মাথা নেড়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে গেল। কেবিনে তখন ইফরা, মেহরাব আর রুবি বেগম ফাহিমের পাশে রইল।
বাইরে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সিফাত হঠাৎ বলল,
— "ইয়েরিন..."
— "হুম?"
— "তোমার কি মনে হয়... ফাহিম ঠিক হয়ে যাবে তো?"
ইয়েরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
— "হবে। ওকে কিছু হবে না। আমরা সবাই আছি ওর পাশে।"
ইয়েরিনের কথাটা শুনে সিফাত কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাসপাতালের লম্বা করিডোরের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে হাঁটতে লাগল।