প্রায় তিন ঘণ্টা পর ফাহিমের রিপোর্ট এসে পৌঁছাল। রিপোর্টটা সংগ্রহ করতে রাফিয়ান নিচতলায় গিয়েছিল। কিন্তু বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও সে আর ফিরে আসছিল না। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে ইফরা শেষমেশ ইয়েরিনকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— "যা তো, দেখে আয়। এতক্ষণ লাগছে কেন?"
ইয়েরিন বিরক্ত মুখে উঠে লিফটের দিকে গেল। গিয়ে দেখল লিফট তখন ১৩ তলায়, আর সে রয়েছে মাত্র ৩ তলায়। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার ধৈর্য তার ছিল না। ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে সে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে রিসেপশনিস্টের কাছ থেকে রাফিয়ানের কেবিন নম্বর জেনে সেই দিকেই হাঁটা দিল। কিন্তু কেবিনের কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ একটা মুখোশ পরা লোক দৌড়ে এসে জোরে ধাক্কা মেরে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
— "উফ!"
তাল সামলাতে না পেরে ইয়েরিন ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। লোকটা একবারও পিছন ফিরে তাকাল না, মুহূর্তেই চোখের আড়াল হয়ে গেল।
ইয়েরিন বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। হাত-পা ঝেড়ে মনে মনে লোকটাকে একচোট বকা দিয়ে আবার রাফিয়ানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
কেবিনের সামনে গিয়ে দু-তিনবার নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো,
— "Come in."
ইয়েরিন কোনো কথা না বলে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ঢুকেই দেখল রাফিয়ান ভীষণ মনোযোগ দিয়ে ফাহিমের রিপোর্টগুলো দেখছে।
ইয়েরিন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে বলে উঠল,
— "ফাহিমের রিপোর্টে কী এসেছে?"
রাফিয়ান চোখ না তুলেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
— "টাইফয়েড।"
কথাটা বলেই হঠাৎ কণ্ঠস্বরটা চিনতে পেরে সে দ্রুত মাথা তুলে তাকাল। ইয়েরিনকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
— "আরে! আপনি যে! তা, আজ তো আমার ভাগ্যই খুলে গেল। আপনার সঙ্গে এখানে দেখা হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি!"
ইয়েরিন ভ্রু কুঁচকে শান্ত গলায় বলল,
— "কেন? আমি কি এখানে এসে কোনো ভুল করে ফেলেছি?"
রাফিয়ান তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে হেসে বলল,
— "আরে না না! কী যে বলেন! বলুন তো, কী খাবেন? চা নাকি কফি?"
ইয়েরিন বিরক্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমি এখানে পেটপূজা করতে আসিনি। উপরে চলুন। ফাহিমের জ্বর আবার বেড়ে যাচ্ছে।"
প্রতিবেদনগুলো টেবিলের ওপর রেখে রাফিয়ান উঠে দাঁড়াল।
— "চলুন, উপরে যাই।"
ইয়েরিনও আর সময় নষ্ট করল না। দু'জন একসঙ্গে কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বের হতেই হঠাৎ করিডোরজুড়ে তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ কানে এলো।
প্রথমে দু'জনই থমকে গেল।
দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠ—
— "হাসপাতালের গাফিলতি চলবে না!" — "দোষীদের বিচার চাই!" — "আমাদের মানুষগুলোকে ফিরিয়ে দাও!"
একজন নার্স দৌড়ে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে আতঙ্কিত গলায় বলল,
— "নিচে যাবেন না! বাইরে প্রচুর মানুষ জড়ো হয়েছে। একটা ভাইরাল ইনফেকশনের কারণে বারো জন রোগী মারা যাওয়ার পর রোগীদের স্বজনরা বিক্ষোভ শুরু করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে!"
কথা শেষ করেই সে আবার অন্যদিকে দৌড়ে গেল।
ইয়েরিন আর রাফিয়ান একবার পরস্পরের দিকে তাকাল।
রাফিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
— "আমাদের তাড়াতাড়ি তিন তলায় উঠতে হবে। ফাহিমের রিপোর্টটা ডাক্তারকে দেখানোও জরুরি।"
ইয়েরিন মাথা নাড়ল।
কিন্তু কেবিন থেকে বের হয়েই তারা বুঝতে পারল, ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
রাফিয়ানের কেবিনের ঠিক বিপরীত পাশেই ছিল সিঁড়ি আর লিফট। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই করিডোরজুড়ে মানুষের ঢল নেমে এসেছে। আতঙ্কে কেউ এদিকে ছুটছে, কেউ ওদিকে। রোগীর স্বজন, হাসপাতালের স্টাফ, নিরাপত্তারক্ষী—সব মিলিয়ে পুরো ফ্লোর যেন বিশৃঙ্খলায় ডুবে গেছে।
একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে জোরে একটা ধাক্কা আসতেই ইয়েরিন সামনের দিকে হোঁচট খেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাফিয়ান দ্রুত তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
ইয়েরিন অবাক হয়ে তাকাল।
— "এইদিকে... সাবধানে!"
কথাটা বলেই রাফিয়ান আর হাত ছাড়ল না।
চারপাশের ধাক্কাধাক্কি ক্রমেই বাড়ছিল। সামনে এগোনোই কঠিন হয়ে পড়েছে। দু-একবার এমন ধাক্কা এল যে ইয়েরিনের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
রাফিয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
পরের মুহূর্তেই ইয়েরিন নিজেকে রাফিয়ানের বুকের খুব কাছে আবিষ্কার করল।
রাফিয়ান এক হাত দিয়ে ইয়েরিনকে জড়িয়ে রেখেছে, অন্য হাত দিয়ে সামনে থাকা মানুষগুলোকে সরিয়ে পথ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
— "একটু... সরুন প্লিজ!"
— "পাশ দিয়ে যেতে দিন!"
মানুষের ভিড়ে কেউ কারও কথা শুনছে না।
একটা ধাক্কা আবারও এলো।
এবার রাফিয়ান প্রায় পুরো শরীর দিয়েই ইয়েরিনকে আড়াল করে ফেলল, যেন কোনোভাবেই তার গায়ে আঘাত না লাগে।
ইয়েরিনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
'এভাবে জড়িয়ে ধরার কী দরকার ছিল?'
মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করল সে।
মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পাশ দিয়ে একজন লোক প্রায় দৌড়ে এসে ধাক্কা মেরে চলে গেল। যদি রাফিয়ান তাকে শক্ত করে না ধরে রাখত, তাহলে হয়তো সে আবার মেঝেতে পড়ে যেত।
কথাগুলো আর বলা হলো না।
রাফিয়ানের বুকের সঙ্গে এতটা কাছাকাছি থাকার অভ্যাস তার নেই।
অদ্ভুতভাবে সে অনুভব করল, রাফিয়ানের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত চলছে। নাকি এই ভিড় আর দৌড়ঝাঁপের কারণেই এমন হচ্ছে?
নিজেরও কেন যেন নিঃশ্বাস ভারী লাগছে।
অকারণেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
এই অনুভূতিটা তার একদমই চেনা নয়।
বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল...
রেগে যাওয়ার কথা ছিল...
কিন্তু তার বদলে এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর অজানা অনুভূতি ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরল।
সে চোখ তুলে একবার রাফিয়ানের মুখের দিকে তাকাল।
ছেলেটার পুরো মনোযোগ তখন শুধু একটাই বিষয়ে—কীভাবে ইয়েরিনকে নিরাপদে ভিড়ের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায়।
তার কপালে চিকচিক করছে ঘাম।
চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
চারপাশে কী হচ্ছে, কে কী ভাবছে—সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
এই মুহূর্তে যেন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা শুধু ইয়েরিন।
আর সেই বিষয়টাই না চাইলেও ইয়েরিনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, ব্যাখ্যাতীত অনুভূতির জন্ম দিল।
প্রায় পাঁচ মিনিটের ধাক্কাধাক্কির পর অবশেষে তারা সিঁড়ির সামনে পৌঁছে গেল।
ভিড়টা একটু কমতেই রাফিয়ান ধীরে ধীরে ইয়েরিনকে ছেড়ে দিল।
দু'জনের মাঝখানে আবার আগের মতোই দূরত্ব তৈরি হলো।
কিন্তু ইয়েরিনের মনে হচ্ছিল, কয়েক সেকেন্ড আগের সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা যেন এখনো তার বুকের কোথাও রয়ে গেছে। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না—এটা শুধু ভয়ের প্রভাব, নাকি অন্য কোনো অনুভূতির শুরু।
অনেক কষ্টে সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় পৌঁছাল রাফিয়ান আর ইয়েরিন।
দুজনেরই শ্বাস কিছুটা ভারী হয়ে গেছে। নিচতলার বিশৃঙ্খলার শব্দ এখনও ক্ষীণভাবে ভেসে আসছে, তবে তিন তলাটা তুলনামূলক শান্ত।
রাফিয়ান একবার ইয়েরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আপনি ঠিক আছেন?"
ইয়েরিন সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
— "হুম।"
আর কোনো কথা না বলে সে দ্রুত কেবিনের দিকে হাঁটা দিল।
আর কোনো কথা না বলে সে দ্রুত কেবিনের দিকে হাঁটা দিল।
কেবিনের দরজা খুলতেই ইফরা, সিফাত আর ফাহিমের মা একসঙ্গে তাদের দিকে তাকাল।
ফাহিমের মায়ের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা,
— "বাবা... রিপোর্টে কী এসেছে?"
রাফিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রিপোর্টগুলো বিছানার পাশের টেবিলে রাখল।
— "আন্টি, আপাতত ভয়ের কিছু নেই। ফাহিমের টাইফয়েড হয়েছে।"
কথাটা শুনে ফাহিমের মা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন।
— "আলহামদুলিল্লাহ... আমি তো আরও খারাপ কিছু ভেবেছিলাম।"
ইফরা এগিয়ে এসে রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "শুধু টাইফয়েড?"
রাফিয়ান মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ। তবে জ্বরটা অনেক বেশি হওয়ায় ও খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী ওর শরীরে পানিশূন্যতাও শুরু হয়েছে। তাই স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক আর নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকলেই ভালোভাবে রিকভার করবে, ইনশাআল্লাহ।"
সিফাত এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
সে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "কোনো রিস্ক আছে?"
রাফিয়ান রিপোর্টের একটি পাতায় আঙুল রেখে বলল,
— "এই মুহূর্তে বড় কোনো জটিলতার লক্ষণ নেই। তবে টাইফয়েডকে অবহেলা করা যাবে না। সময়মতো ওষুধ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম আর তরল খাবার খুব জরুরি। জ্বরটা দুই-তিন দিন ওঠানামা করতে পারে।"
ইয়েরিন এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিল।
সে ধীরে ধীরে ফাহিমের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
ফাহিম এখনও অচেতন ঘুমে আচ্ছন্ন। কপালে ভেজা কাপড় রাখা। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
ইয়েরিন হাত বাড়িয়ে আলতো করে ফাহিমের কপালে হাত রাখল।
আগের তুলনায় জ্বর কিছুটা কমেছে, কিন্তু শরীর এখনও গরম।
ফাহিম ঘুমের মধ্যেই কপাল কুঁচকে অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বিড়বিড় করল।
ইয়েরিন নিচু হয়ে শুনতে চেষ্টা করল।
খুব আস্তে ভেসে এলো—
— "...পানি..."
ইয়েরিন সঙ্গে সঙ্গে তাকালো রাফিয়ান এর দিকে।
রাফিয়ান এসে ফাহিমের অবস্থা দেখে বলল,
— "ও পুরোপুরি জেগে উঠলে অল্প অল্প করে পানি দেবেন। এখন স্যালাইন চলছে, চিন্তার কিছু নেই।"
ইফরা চেয়ার টেনে ফাহিমের মায়ের পাশে বসল।
— "আন্টি, আপনি একটু বসুন। এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।"
ফাহিমের মা ক্লান্ত মুখে বসে পড়লেন।
তার চোখে এখনও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
সিফাত জানালার পাশে গিয়ে বাইরে তাকাল।
হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এখনও পুলিশ আর বিক্ষোভকারীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে।
সে নিচু গলায় বলল,
— "নিচের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি।"
রাফিয়ান মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
— "হ্যাঁ। আপাতত কেউ নিচে না যাওয়াই ভালো।"
কেবিনে আবার নীরবতা নেমে এলো।
শুধু মনিটরের নিয়মিত বিপ... বিপ... শব্দ আর স্যালাইনের ফোঁটা পড়ার ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
সবাই যেন মনে মনে একটাই দোয়া করছিল—
ফাহিম যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।