ফিনিশিং প্লেস এ এসে মেহরাব দেখলো ইয়েরিন গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মেহরাব গাড়ি থামিয়ে নেমে এলো সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের সামনে,,
ইয়েরিন তাকে দেখেই তাচ্ছিল্য করে হাসলো তারপর চুলে হাত বুলিয়ে বললো,,,
-"কি মিস্টার মেহরাব রাফসান কি ভেবেছিলেন আপনি জিতে গেছেন? "
তারপর মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বললো,,
-"আহারে বেচারা জেতার আনন্দে ব্যস্ত থাকার সময় মুখ টা প্যাচার মতো করে রাখতে হচ্ছে,,
,,,,বাদ দিন শর্ত অনুযায়ী এখন থেকে আপনি আর আমার প্যালেসে থাকছেন না সো নিজের থাকার ব্যবস্থা করে নিন আর না পারলে ফাহিম আপনাকে সাহায্য করে দিবে ওকে? বাই!"
ইয়েরিন আর দাঁড়ালো না স্টিলেটো হিলে শব্দ তুলে গাড়িতে উঠে বসলো তারপর হাওয়ার গতিতে দূরে মিলিয়ে গেল।
পুরোটা সময় মেহরাব একটাও কথা বললো না
ইয়েরিন চলে যাওয়ার পরই সে বললো,
-"তোমার প্যালেসে থাকা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই, আমার মাথা ব্যথা মিস ইফরা কে নিয়ে।
যাই হোক আমি যেখানেই থাকি আমার নজর কিন্তু প্যালেসেই থাকবে।
রেসটা তুমি জিতেছো কিন্তু আসল খেলা এখনো শুরুই হয় নি।""
তবে তার বলা প্রতিটা কথা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল কেউ শুনলো না তা।
সেও গাড়ি নিয়ে দ্রুত জায়গা ত্যাগ করলো,,।।
পরেরদিন সকালে ইয়েরিন নিজের রুমে রেডি হচ্ছিল তখনই তার রুমে ইফরা আর ইসরাত একসাথে ঢুকলো।
দুজনেরই শান্ত চেহারা ইফরা বললো,,
-"রিন শোন তোর সাথে আমার কথা আছে.।, "
পাশ থেকে ইসরাত বললো,,
-" না আমি আগে বলবো।"
-"চুপ শালি আমি আগে বলবো,"
-"তুই চুপ রাইয়ের বাচ্চা,, "
-"এই ঢেপসী মুখী এই তুই আমার বাচ্চা পেলি কই? "
-"বিলের ধারে পেয়েছি তাতে তোর কি সর আগে আমায় বলতে দে,, "
-"বলেছি না আগে আমি বলবো বেহুদা চেঁচাবি না।"
ইয়েরিন বিরক্ত হয়ে বলল,,
-"এই থামবি তোরা কি শুরু করলি সকাল সকাল?"
-"মেহরাব নাকি এখন থেকে আমাদের প্যালেসে থাকবে না?"
-"হ্যাঁ তো?"
-"এই রাত বাদ দে ওই লুল্লু পেঁচার কথা রিন তুই আমার কথা শোন mm industry এর মালিক আছে না? ওইযে আমাদের অনেক পুরনো বিজনেস পার্টনার মিস্টার করিম ওনি আজ মারা গেছেন,,।"
-"জানি, আমি সেখানেই যাচ্ছি তুই গেলে ফার্স্ট রেডি হয়ে আয়।"
ইফরা সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।
-"রিন!"
-"হ্যাঁ বল,"
-"মেহরাব এমন হঠাৎ চলে গেল কেন?"
-"নতুন বাসা কিনেছে মেইড ও রেখেছে এভাবে বেশিদিন অন্যের বাড়িতে থাকা ঠিক না তাই চলে গেছে। "
-"ওহ্ কিন্তু আমাদের সাথে তো দেখাও করে গেলো না!"
-"পরে দেখা করে নিস এখন আমাকে যেতে হবে বাই।"
ইয়েরিনের পরনে হাঁটু ছুঁইছুঁই কালো লং কোট।
ভেতরে সাদা শার্টের ওপর পরা কালো ওয়েস্টকোট,
গলায় ধূসর-কালো চেক টাই আর কালো ফরমাল ট্রাউজার।
ইফরা একটা সাদা শার্ট আর ফরমাল প্যান্ট পরে দ্রুত নিচে নেমে এলো।
তারপর মেরুন রঙের গাড়িটা নিয়ে দুজন দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
মিস্টার করিমের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বেলা ১০ টা বেজে গেল।
গাড়িটা থামলো এক বিশাল গেটের সামনে।
গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে ইফরা বেরিয়ে এলো, তারপর গাড়ি পার্ক করে ইয়েরিনও এলো।
দুজন একসাথে ভেতরে গেলো পুরো বাড়িতে প্রায় অনেক মানুষ বড় বড় বিজনেস ম্যান।
ইয়েরিনকে দেখেই তাদের মাঝে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হলো।
কিছু বিজনেস ম্যান এগিয়ে এসে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চাইলো,,
তবে ইয়েরিন বিরক্ত মুখে তাদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গেল।
সোফায় একটা মেয়ে কাঁদছে হয়তো মিস্টার করিমের মেয়ে।
ইয়েরিন এগিয়ে গিয়ে একটা সোফায় পা তুলে বসলো।
কিছু লোক বাঁকা চোখে তার দিকে তাকালো তবে কিছু বলার সাহস পেল না কম বেশি সবাই জানে ইয়েরিনের রাগ সম্পর্কে।
ইতোমধ্যে মিস্টার করিমের জানাযা হয়ে গেছে তাই ইফরা তার হাতে ধরা সাদা গোলাপের তোরা টা একপাশে রেখে দিলো।
একটু পর একটা ছেলে এলো উচ্চতা ৫'১১ মতো হবে চোখগুলো হালকা লাল চুল গুলো কপালে লেপ্টে আছে সারা শরীর ঘামে ভেজা।
ছেলেটা ভেতরে ঢুকেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
সম্ভবত তাড়াহুড়ো করে এসেছে। শ্বাসটা কিছুটা ভারী। কিন্তু ঘরের এত মানুষের ভিড়েও তার দৃষ্টি আটকে গেল এক জায়গায়।
ইয়েরিন।
কালো লং কোটের নিচে সাদা শার্ট, গলায় ধূসর-কালো চেক টাই। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে সোফায় বসে আছে সে। মুখে কোনো আবেগ নেই, চোখেমুখে শোকের ছাপও নেই—শুধু অদ্ভুত এক স্থিরতা।
ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটাকেই সে আগে দেখেছিল বাবার সঙ্গে সেই মিটিংয়ে।
সেদিনও ইয়েরিনকে নিয়ে মিটিং রুমে বেশ কিছু কথা হয়েছিল। তবে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়নি। পরে কৌতূহল থেকে ইন্টারনেটে তার সম্পর্কে খুঁজেছিল সে।
ছবিতে দেখা মেয়েটা আর সামনে বসে থাকা মেয়েটার মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নেই।
তবু সামনে থেকে দেখলে কেন যেন আরও বেশি আলাদা লাগছে।
ইয়েরিন হঠাৎ চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই ছেলেটা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
একটা অস্বস্তিকর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।
ইফরা বিষয়টা খেয়াল করল।
সে ইয়েরিনের পাশে এসে নিচু গলায় বলল,
— "রিন, ওই ছেলেটাই মনে হয় মিস্টার করিমের ছেলে।"
ইয়েরিন ছেলেটার দিকে আরেকবার তাকাল।
— "হুম।"
এর বেশি কোনো আগ্রহ দেখাল না সে।
এদিকে ছেলেটা ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলো।
কাছাকাছি আসতেই ইফরা উঠে দাঁড়াল।
ছেলেটা কিছুটা সামলে নিয়ে বলল,
— "আপনারা... ইয়েরিন ম্যাডাম আর ইফরা ম্যাডাম?"
ইফরা মাথা নেড়ে বলল,
— "হ্যাঁ। আপনি?"
ছেলেটা উত্তর দেওয়ার আগেই ইয়েরিন শান্ত গলায় বলল,
— "করিম সাহেবের ছেলে?"
ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল,
— "জি, আমি মেহেদী হাসান।"
ইয়েরিন উঠে দাঁড়াল।
— "আপনার বাবার জন্য দুঃখিত।"
কথাটা খুব ছোট ছিল।
কিন্তু ইয়েরিনের গলার স্বরটায় কোনো কৃত্রিম সমবেদনা ছিল না। ছিল শুধু সংযত একটা আন্তরিকতা।
ছেলেটা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
— "ধন্যবাদ।"
পাশে বসে থাকা মেয়েটা এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল।
ইয়েরিনের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটা আগের চেয়ে একটু বদলে গেল।
তার চোখে কষ্টের পাশাপাশি খুব হালকা একটা বিরক্তি ফুটে উঠল।
বাবার মৃত্যুর পর এত মানুষ এসেছিল।
কিন্তু তার ভাইয়ের চোখ যেন সবার মাঝখান থেকে শুধু একজনকেই খুঁজে নিয়েছে।
ইয়েরিনকে।
মেয়েটা ঠোঁট চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
ইফরা সেটা খেয়াল করলেও কিছু বলল না।
আর ইয়েরিন?
সে যেন কিছুই দেখেনি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "ইফরা, আমাদের যেতে হবে।"
ইফরা মাথা নেড়ে ব্যাগটা হাতে নিল।
ইয়েরিন একবার করিম সাহেবের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—" নিজের খেয়াল রেখো।"
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু ইয়েরিন চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আর মেহেদী?
সে এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে।
যতক্ষণ না কালো কোট পরা মেয়েটা চোখের আড়ালে চলে গেল।