#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_২৫ [ প্রথমাংশ ]
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
রাত টুকু কেটেছে । ফুটেছে সকালের আলো ।
সেই যাত্রাপালা থেকে ফিরে ঘুমোতে ঘুমোতে ভোর চারটা পেরিয়েছে । সারাটা রাস্তা দুজনায় ঝগড়া করে এসেছে । রৌদ্র মেঘা কে ছাড়ে নি আর । ওভাবেই পুরো রাস্তা পাঁজাকোলা করে তুলে এনে চেয়ারম্যান বাড়ির দরজার সামনে নামিয়ে দিয়েছে । শাহিন আলম বাড়ি ফেরার আগেই ফিরে এসেছে ওরা । কারোর চোখে পড়ে নি । রমনীর ইচ্ছে রাখতে সবার চোখ চুরিয়ে যাত্রা দেখতে বেরোলো বেপরোয়া যুবক ।
তবে যাত্রা আর দেখা হলো কই ! হলো আরেক নাটক । বাড়িতে কেউ জানাজানি হওয়ার আগেই ওরা যে যার ঘরে ঠাই জুড়েছিলো ।
এখন বাজে সকাল নয়টা । দিগন্ত চিরে সূর্যালোকের সোনালী রশ্মি নেমে এসে মিশেছে মাটির বুকে । আজ বোধহয় শহরে ফেরার দিন । রৌদ্র না আসলে আরো কটা দিন থাকা হতো । কিন্তু বেপরোয়া ছেলে যেহেতু এসেছে , তাই তোফায়েল কাবির শুভ্র কে কড়া আদেশ দিয়েছেন আজকেই সবাইকে শহরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।
শুভ্র দুপুরে এসে নিয়ে যাবে ওদের ।
ব্রেকফাস্ট করে লাইটার আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো রৌদ্র । শাওয়ার নিয়েছে সকালে উঠেই । সাবার পরীক্ষা ছিলো না আজ । বসার ঘরে বসে ছিলো ওরা সকলে । রৌদ্র ওদের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির পথে এগিয়েছে । সিগারেট খাওয়ার জন্য এখন ছাদে উঠছে সে , তা কারোরই অজানা নয় ।
মেঘা বাঁকা দৃষ্টিতে সূক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলো । হাতে কেবলই লাইটার আর সিগারেটের প্যাকেট । আর কিছু নেই । রৌদ্র সিঁড়ি বেয়ে ওঠা মাত্রই ছটফট করে উঠে দাঁড়ালো মেঘা । জোর পূর্বক হেসে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল আস্তে ধীরে.....
" আমি আসছি একটু ।
বলেই পা বাড়ালো সন্তর্পণে । নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে ঢুকলো না রমনী । সবার চোখ চুরিয়ে ঢুকলো রৌদ্রের ঘরে । এ ঘরটাতেই ছিলো সেই বেপরোয়া লোক । মেঘা ঘরে ঢোকে চোরের ন্যায় । হাঁসফাঁস করে ভয়ে । দরজা চাপিয়ে দেয় কম্পিত হাতে । এপাশ ওপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে পুরো ঘরে নজর বোলায় । খোঁজে কাঙ্ক্ষিত কিছু । ঘন ঘন ঢোক গিলে জিভে অধর ভিজিয়ে লম্বা শ্বাস টানে ।
এলোমেলো পায়ে বিছানার দিকে এগোয় । বালিশ বিছানা এলোমেলো করে খোঁজ করে কিছু একটার । তবে পায় না হোদিশ । বারবার ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকায় রমনী । যদি লোকটা ভুলেও চলে আসে , তাহলে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাবে । তবে , মনে হয় আসবে না এ সময় । ছাদে গিয়ে একের পর এক সিগারেট খাবে । আসবে তার পর ।
বেড সাইড টেবিলের উপর ও নেই প্রত্যাশিত বস্তুটা । ড্রয়ার গুলোও খুলে দেখলো । পেলো না । ওপাশ ফিরতেই টেবিল ল্যাম্পের পাশে নজরে পড়লো কিছু । অমনি ছটফটিয়ে তড়তড়ে পায়ে এগোলো রমনী । ঘুরে গিয়ে রৌদ্রের ফোনটা হাতে নিলো । লম্বা শ্বাস ফেললো । বসলো বিছানার উপর । স্ক্রিন ওপেন করতেই দেখলো ফোন লক ।
পাসওয়ার্ড দেওয়া । কপাল গুটিয়ে আসলো রমনীর । পড়লো গাঢ় ভাঁজ । কি পাসওয়ার্ড হতে পারে ফোনের ? আন্দাজে নিজের মন মতো পাসওয়ার্ড দিয়ে ট্রাই করলো আনলক করার ! কিন্তু হলো না । বিফল হলো রমনী ।
মোটে চারবার চেষ্টা করলো , পারলো না খুলতে । একজনের ফোনের পাসওয়ার্ড আরেকজন জানবেই বা কি করে ? আর একবার ট্রাই করতে পারবে । যদি না খোলে , তাহলে এক মিনিটের জন্য লক হয়ে যাবে ফোন । এক মিনিট পর পুনরায় চেষ্টা করতে হবে ।
মেঘা হাঁফ টানলো । হাত কাঁপছে ঠক ঠক করে । শুকিয়ে আসছে গলা । শেষ বার ট্রাই করলো সে , এবারো বিফল । ব্যার্থতায় গা ছাড়লো । নড়েচড়ে বসল তবুও । এক মিনিট বাদ পুনরায় ট্রাই করবে আবার । যে করেই হোক আজ এই ফোন আনলক করেই ছাড়বে সে ।
দেখবে কি আছে এই ফোনে । কে বারবার ফোন করে রৌদ্র কে ? কে আছে ওনার ? সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে কম করে হলেও চার বার ফোন করেছিলো কেউ । রৌদ্র কেটে দিয়েছে বরাবর । পাঁচ বারের বেলায় সবার আড়ালে গিয়ে কথা বলেছে রিসিভ করে ।
কিন্তু কার সাথে ? মেঘার জানা মতে বাড়ির কারোর ফোন ধরে না রৌদ্র । তাহলে কে , বন্ধুরা ? কিন্তু এতো কিসের দরকার বন্ধুদের সাথে ? সেদিন ভুল বশত লক্ষ্য করেছিলো মেঘা , ফোন আসার সাথে সাথে স্ক্রিনে একটা বাচ্চার ছবি ভেসে উঠেছিলো । এক ঝলকের জন্য হলেও ঠিক দেখেছে সে । ভুল দেখেনি মোটেও । কে সেই বাচ্চা ?
ফোন রিসিভ করলে রৌদ্র বেশ শান্ত হয়ে কথা বলে ! কার সাথে এতোটা কোমল হয়ে কথা বলে সে ?
এসব ভাবতে ভাবতেই এক মিনিট পেরোলো । এবার আনলক করতে না পারলে পাঁচ মিনিটের জন্য অফ হয়ে যাবে ফোন । কি করবে মেঘা ?
হাতের কম্পন বাড়ে । ঘাম ছোটে কপালের ধারে ।
তবুও চেষ্টা করলো সে । ভেবেচিন্তে দুটো সংখ্যা টাইপ করা মাত্রই পেছন থেকে ভেসে আসলো ধারালো তবে মৃদু কোমল পুরুষালি কন্ঠ.....
" সানি ,, হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হেয়ার , ইন মাই রুম ?
মেঘা এক ঝটকায় চমকায় । ঝটকা মেরে দাঁড়াতে গেলে দূর্বল হাত ফসকে ঠাস করে রৌদ্রের ফোনটা পড়ে যায় মেঝেতে । আরো বেশি ভড়কায় মেয়েটা । রৌদ্রের কন্ঠ শোনা মাত্রই কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে তার । বৃহৎ নয়নে তাকালো সে রৌদ্রের দিকে । আত্মারাম ধক্ করে খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম । সহসা ভয়ে জোরালো হয় মৃদুভাষী কন্যার হৃৎস্পন্দন । পিটপিট করে তাকায় সে । রৌদ্র চেয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে । মেঝের দিকে তাকালো এক ঝলক । নিজের ফোনটাকে পড়ে থাকতে দেখে ফের চোখ সূক্ষ্ম করে তাকালো মেঘার দিকে ।
রৌদ্রের তীর্যক দৃষ্টি নিজের উপর নিক্ষেপ হওয়া মাত্রই দ্রুত চোখ নামায় মেঘা । মেঝেতে পড়ে থাকা ফোনটা তোলে ঝট করে । ভাগ্যিস কিছু হয় নি ফোনের । ঠোঁট ভিজিয়ে হাঁফ ছাড়ল সে ।
রৌদ্র এগিয়ে এসেছে । ঠোঁটের ভাঁজে চপল হাসি তার । এখানটায় হঠাৎ মেঘার উপস্থিতির কারন বুঝেও বুঝলো না । সে তো এসেছিলো নিজের ফোন নিতে ।
রৌদ্র কাছাকাছি এগোতেই মেঘা শিউরে ওঠে । চিবুক নামিয়ে সিটিয়ে দাঁড়ায় ফোনটাকে চেপে ধরে । পায়ের আঙ্গুল খুটতে থাকে শান বাঁধানো মেঝেতে ।
রৌদ্র মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করে গলা ভার করে....
" কি করছিলি এখানে ? আমার ফোন তোর হাতে কেনো ?
মেঘা রৌদ্রের ফোন বিছানায় ছুড়ে মারে । ঝটপট করে বলে....
" কি...কিছু করছিলাম না ।
" আচ্ছা , তাহলে আমার ফোন তোমার হাতে কেনো ছিলো সুইটহার্ট ?
" এমনি !
" এমনি এমনি তুমি এ ঘরে এসেছো ? আমার অনুপস্থিতিতে এ ঘরে কি প্রয়োজন ? তাও আবার আমার ফোনে ! হাতে নিয়েছো কেনো আমার ফোন ?
মেঘা দৃষ্টি তুলে চোখে চোখ রাখলো দ্বিধাহীন । শক্ত করলো নিজেকে ।
" নিতে পারি না ?
" পারো তো , হাজার বার নিতে পারো । প্রয়োজন টা জানতে পারি ?
" আছে আমার প্রয়োজন ।
" তাহলে মিটিয়ে নাও ।
মেঘা আশকারা পেয়ে ফের ফোনটা হাতে তুলে নিলো পূণরায় । অধিকার দেখিয়ে জানতে চাইলো চড়া গলায়.....
" পাসওয়ার্ড কি আপনার ফোনের ?
" দাও খুলে দিচ্ছি !
" আমাকে বলুন । আমি খুলবো !
রৌদ্র শিথিল হয় । কোমল করে চাহনি । ফিকে হাসিতে মাধুর্যময় রাশ টানে । মেঘার চোখে চোখ রেখে কন্ঠ নামিয়ে উত্তর করে বাধ্যের ন্যায়.....
" 9 September 2019 .....
মেঘা শোনা মাত্রই ফোনে টাইপ করতে উদ্যত হয়ে পড়লো । চারটে সংখ্যা টাইপ করা মাত্রই হাত থমকালো রমনীর ।
তারিখ , মাস , এবং বছরটা বড্ড চেনা ঠেকলো ।
এই তারিখ টা তো.....
আর ভাবলো না রমনী ।
মস্তিষ্ক সজাগ হওয়া মাত্রই ছ্যাঁত করে উঠলো । ফোন খানা দুহাতে চেপে ধরে বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক তাকালো রৌদ্রের দিকে । লোকটা এক দৃষ্টে চেয়ে আছে । মেঘা মূর্ত বনে যায় অবিশ্বাসে । মুখ ফাঁক হয়ে আসে রমনীর । এই তারিখটা , এই মাসটা , এই বছরটা যে বড্ড চেনা তার । চেনা বলেই তো পাসওয়ার্ড টাইপ করার সময় মেঘার আচমকাই মনে পড়লো, দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে এই তারিখ টাতেই এই বেপরোয়া অবাধ্য লোকটা নেশার ঘোরে জোর করে বিয়ে করেছিলো ওকে ।
হ্যাঁ তো , ঠিক এই তারিখ টাতেই । মেঘার দিব্যি মনে আছে । সালটা ছিলো তখন ২০১৯ । আর এখন , সেই সালটা পরিবর্তন হয়ে পাঁচ বছর পেরিয়েছে । বদলেছে পাঁচটা ক্যালেন্ডার ।
মেঘার ঠিক মনে আছে , হয়তো খারাপ স্মৃতি স্বরুপে । কিন্তু এই লোকটা ? এনার মনে থাকলো কি করে ? কেনো মনে রাখলেন উনি এই তারিখটা ? তাও আবার নিজের ফোনের পাসওয়ার্ড হিসেবে সেট করে রেখেছেন এটা ? কেনো ? এটা কি কেবলই কাকতালীয় ভাবে ?
প্রশ্ন জাগতেই উল্টো উত্তর খুঁজে নিলো রমনীর ব্যাকুল উন্মাতাল হৃদয় । সেদিন তো ইভা আপুর সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এনার । মেঘা হাজার বার শুনে এসেছে এই ক বছরে । রৌদ্র নিজেই বিয়ে করতে চেয়েছিলো ইভা কে । কিন্তু ইভা পালিয়েছিলো তার প্রেমিকের সাথে ।
ইভা'র জায়গায় জুটেছে ইভারা । তাও নেশার ঘোরে । নেশা না করলে হয়তো এমন কিছুই হতো না ।
তার মানে তিনি ইভা আপু আর তার ভেঙে যাওয়া বিয়ের দিন টাকে স্মরনে রাখার জন্য ফোনের পাসওয়ার্ডে বসিয়েছেন এটা ? নাকি ভুলক্রমে হওয়া ওদের বিয়ে টাকে স্মরনে রাখার জন্য ?
মেঘার চোখ অজানা ধারনায় ছলছল করে ওঠে । রৌদ্র কে চেনে না সে । শুধু জানে রৌদ্র বেপরোয়া । আর এই বেপরোয়া লোকটাকে ঘৃণা করে ও । ওর এই সর্বহারা জীবনের জন্য দায়ী এই বেপরোয়া লোক । এই বেপরোয়া লোকটা সেদিন একটু পরোয়া করলে মেঘার জীবন এমন হতো না আজ ।
মেঘা নিজেকে ধাতস্থ করলো । মন না মানলেও মনকে মানালো । ইভার দিক থেকে ভেবে দেখলো সে ।
ফোন আনলক করার ইচ্ছে জাগলো না আর । লোকটা এখনো তাকিয়ে আছে কেমন করে । মেঘা বুঝতে দিলো না কিছু । ফোনটাও আনলক করলো না । উল্টে সেভাবেই ওটাকে ছুড়ে মারলো বিছানার উপর । ফোঁস করে রৌদ্র কে টপকাতে গেলে সহসা হাত টেনে ধরলো রৌদ্র.....
" কি হলো , প্রয়োজন নেই ?
মেঘা ঝাড়া মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় । শক্তি খাটিয়ে আকস্মিক রৌদ্রের বুকে ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে দেয় পিছনে । ভেজা গলা তুঙ্গে তুলে বলে.....
" রাইনো মুখো , আই হেইট ইউ । কোনো দিন ছোঁবেন না আমায় । কোনো দিন না ।
" এইই ইভারা , কি হলো হঠাৎ ?
" ডোন্ট কল মি ইভারা.... ডাকবেন না আমায় এই নামে ?
কেনো বলেন আমায় ইভারা ? এই নামে ডাকেন কেনো ? ইভা আপুর নামের সাথে মিলিয়ে ? হ্যাঁ ? ভুলতে পারেন নি ইভা আপুকে ? ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তো ?
৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ , সেই জন্যই ফোনে এই পাসওয়ার্ড সেট করেছেন ?
" এই ইডিয়ট , কিসব বলছিস তখন থেকে ?
রৌদ্র আবার হাত টেনে ধরতেই মেঘা ঝাঁজিয়ে ওঠে.....
" চুপ , বলেছি না ছোঁবেন না আমায় !
" ইভারা , গলা বড় করবি না আমার উপর ! আর ইভা ? হু ইজ ইভা ? আই ডোন্ট নো হার ! বাট,আই নো ইউ ? ইউ আর মাই ইভারা ! মাই সানি । এই রৌদ্রের রৌদ্রময়ী তুই ।
" নই । কিচ্ছু নই আমি আপনার ।
যাকে মনে রেখে ফোনের পাসওয়ার্ড দিয়েছেন । তার সাথে তোরজোর করুন গিয়ে । আমাকে রেহাই দিন । ঐ ইভা আপু.....
বাকি কথা টুকু শেষ করার আগেই রৌদ্র ওকে হিচড়ে টেনে ধরলো । রমনীর উদ্যত দুহাত পেছনে কোমরের সাথে মুচড়ে ধরলো । ছটফট করলো মেঘা । রৌদ্র পরোয়া করলো না । মেয়েটাকে বুকের সাথে চেপে ধরে রাগে ঝেড়ে উঠলো রক্তিম চোখে তাকিয়ে....
" ওও শাট্ আপ । বারবার ঐ বাস্টার্ড টার নাম মুখে নিবি না ।
" কেনো , গায়ে লাগে ? বিয়ে করতে গিয়ে হারিয়েছেন । আফসোস হয় তাই ? আফসোস মেটাতে ঐ মেয়েকে মনে রেখে ফোন পাসওয়ার্ড....
আবারো শেষ করতে পারলো না কথা । চোখের কোনে ভেজা ভেজা কিছু ঠেকলো । ঘোলাটে অনুভুত হলো আঁখি যুগল । নিমিষেই ঝাপসা চোখ পরিষ্কার করে বাম চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা উষ্ণ নোনা তরল গড়ালো টুপ করে । রুদ্ধ হলো জবান । মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে অজানা কারনে ।
রৌদ্র একবিংশীর চোখে পানি দেখে শিথিল হয় । তবে বিচলিত অন্তঃস্থল । অগোছালো ছটফটে মেয়েটাকে আলগোছে আগলে নিয়ে কপালে কপাল ঠেকায় পরম আবেশে । ধীরে বলে শান্তনা সুরে.....
" 9 September 2019....দ্যাট ওয়াজ আওয়ার ওয়েডিং ডেট , নাথিং ইলস্....
#চলবে……………
#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_২৫ [ শেষাংশ ]
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
সময় তখন দুপুর দেড়টা । অফিস রুম থেকে বেরোলো আদ্র । ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে দোতলার করিডোর পেরিয়ে দম্ভভরে পা চালিয়ে এগোচ্ছে সিঁড়ির দিকে । ক্লাস শেষ । বাড়ি ফিরছে এখন । পড়নে টানটান সাদা শার্ট ইন করা । পুরো ফিটফাট প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র । পুরো বললে ভুল হবে । একটু এলোমেলো আছে । পড়নের ব্লেজার খুলে ধরে রেখেছে হাতে । দু চারটে চুল কপালে বাড়ি খাচ্ছে । সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নিচে নামলো সে । করিডোরের পথে পার্কিং লটের দিকে এগোতে গেলে চিকন মেয়েলি কন্ঠের ডাক পড়লো পিছন থেকে....
" স্যার...
আদ্র প্রথমত সাঁড়া দিলো না । দ্বিতীয় বার কানে বাজলো সে সম্বোধনের সাথে নিজের নাম ।
" আদ্র স্যার ?
সহসা থামলো আদ্র । ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরতেই সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলো । অতি সহজিয়া রমনী । এই তো সেই । চেনা , তবে ক্ষণিকে ক্ষণিকে বড্ড অচেনা হয়ে দাঁড়ায় ।
আদ্র তাকে দেখে দাম্ভিকতা বজায় রেখেই কপালে ভাঁজ ফেললো তিন স্তর । শিশির পিটপিট করে এগোয় । সামনাসামনি দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে চিবুক উঁচিয়ে বলে....
" সরি , পিছু ডাকার জন্য । এ্যাকচুয়েলি , মেঘা আর শাফাহ্ কে ফোনে পাচ্ছি না । কদিন ধরে আসেও নি ভার্সিটিতে । ওদের সাথে কন্টাক্ট হচ্ছে না । তাই ডাকলাম আপনাকে । জানার ছিলো , কবে থেকে আসবে ওরা ?
আদ্রের রাশভারী জবাব.....
" কাল থেকে আসবে । আর,ওরা বাড়িতে নেই !
" কোথায় গেছে ?
শিশিরের বিচলিত প্রশ্ন । আদ্র চোখ সরু করে । বিরক্ত লাগলেও উত্তর করে.....
" গ্রামে ঘুরতে গেছে । সেখানে নেটওয়ার্ক প্রবলেম,তাই কন্টাক্ট হচ্ছে না হয়তো । তবে কাল থেকে আসবে ওরা ! অর এনি কোয়েচশন ?
গুরুগম্ভীর লোকটার মুখশ্রীতে প্রকাশিত বিরক্তি টুকু শিশির বুঝলো বোধহয় । লোকটা গুরুভার , দাম্ভিক । অহংকারী বললে ভুল হবে না । শাফাহ্ আর মেঘা সবসময় বলে আদ্র অনেক ভালো । খুব কোমল, নমনীয় । কেবল ক্লাসেই সে এমন গম্ভীর । বাড়তি সময় খুব মোলায়েম ।
তবে লোকটার ব্যাবহারে মোটেও তা প্রকাশ পায় না, মনেই হয় না তিনি কোমল ।
টিচার হিসেবে হলেও শিশির তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে নি কভুও । আজ প্রথম এভাবে ডেকে কথা বললো । আর সেদিনটা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত ।
গলা নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল শিশির....
" নো , স্যার ।
মাথা নামিয়ে ব্যাগ চেপে ধরে পাশ কাটাতে গেলে আদ্র ডাকে আচমকা...
" এইই শোনো...
চকিতে ঘাড় ঘোরায় স্নিগ্ধ কোমল রমনী । উত্তরে বলে...
" জি ।
" নামটা যেনো কি তোমার ?
" সেদিন বলেছিলাম ।
" মনে নেই ।
" শিশির ।
" হু... নাইস নেম । আসতে পারো....
আর থামলো না মেয়েটা । আদ্র পার্কিং লটের দিকে পা বাড়ায় । আর সে পা বাড়ায় উল্টো পথে । মেঘা আর শাফাহ্'র খোঁজ নেওয়ার ছিলো কেবলই । ওদের সাথে কন্টাক্ট হয় নি কদিন হলো ।
কয়েক পা এগোতেই মুখোমুখি হয় ফারিন ।
ফারিনের সাথে আরো দুজন । ওরই ফ্রেন্ড । বড়লোকের মেয়ে ওরা সবে । শিশির কে আদ্রের সাথে কথা বলতে দেখেছে ফারিন । অমনি বিচুটি পাতা ডলা পড়েছে গায়ে । ক্লাস, আর পড়াশোনা , এই ব্যাতীত ভার্সিটির অন্য কোথাও আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের সাথে কথা বলার সাহস নেই কারোর । কথা বলতে গেলেও আদ্র ইগনোর করে চলে । সে কেবলই এ ভার্সিটির লেকচারার । সময় করে আসা , ক্লাস নেওয়া , আর ছুটির পর চলে যাওয়া ব্যাতীত বাড়তি কিছুই তার ব্যাক্তিত্বের সীমায় পড়ে না ।
আজ হিতে বিপরীত । ফারিন শত চেষ্টা করেও কোনো দিন সুযোগ নিতে পারে নি ।
কথা বলতে পারে নি আদ্রের সাথে । চেষ্টা করলেও রাগান্বিত দৃষ্টির সম্মুখে টিকতে পারে নি । আজ বেশ স্বাভাবিক হয়েই আদ্রের সাথে শিশির কে কথা বলতে দেখলো । রাগে গজগজিয়ে শিশিরের পথ রুখে মুখ বাঁকিয়ে খিটখিটে স্বরে জিজ্ঞেস করলো সোজাসাপ্টা.....
" কি কথা বলছিলে স্যারের সাথে ?
শিশির ভ্রু যুগল জড়ো করে । পাল্টা শুধোয়.....
" তোমাকে কেনো বলবো ?
" জানতে চেয়েছি , তাই বলবে ।
" মেঘা আর শাফাহ্'র খোঁজ নিচ্ছিলাম ।
" খোঁজ নিচ্ছিলে , নাকি সেই বাহানায় স্যারের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করার চেষ্টা করছিলে ?
কুৎসিত বাক্যে মুখ কুঁচকে ছোট করলো শিশির । চাহনি তীক্ষ্ণ করে বললো....
" হোয়াট আর ইউ টকিং ননসেন্স ?
ফারিন হাসলো ব্যাঙ্গাত্বক । বাকি দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে ঠোঁট বাঁকিয়ে তিরষ্কার করে বললো....
" শুনেছিস তোরা , ডিপার্টমেন্টের টপার গার্ল – উপস্ সরি , লোয়ার ক্লাস গার্ল কিনা ক্লাসের বাইরে দ্যা মোস্ট হ্যান্ডসাম আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের সাথে কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়েছে ? মানা যায় এটা ?
শিশির বিব্রত হয় । এই মেয়ে বরাবর অসহ্যকর । এই অসহ্য অনুভূতি টা শাফাহ্'র থেকে ভালোই আয়ত্ত করেছে সে । সহ্য হয় না এই বিগড়ে যাওয়া মেয়েটাকে । আর এই মেয়ে শিশির কে সহ্য করতে পারে না । কারন মেঘা আর শাফাহ্'র সাথে গভীর বন্ধুত্ব আছে শিশিরের । যা ওর সাথে নেই । এই সাধারণ , ছোটলোক মেয়েটাকে কি দেখে বন্ধু পাতিয়েছে ওরা কে জানে ? বরাবর মেঘা আর শাফাহ্'র সামনে শিশির কে কটাক্ষ করে কথা বলে ফারিন । যতবার বলে ততবারই নিজেই লাঞ্চিত হয়ে ফিরে আসে । শাফাহ্ তো আছেই , মুখের উপর ঝকঝক্ করে ঠাস ঠাস কথা শোনানোর জন্য ।
এখন বিরক্তি সমেত স্বাভাবিক ভাবেই বললো শিশির....
" যার সাহস থাকে , কেবল সেই দুঃসাহস দেখানোর মতো সৎ সাহস পায় । মানা বা না মানা সেটা প্রতক্ষ্যদর্শীদের ব্যাপার । বাই দ্যা ওয়ে , ভুলে যেও না আদ্র স্যার কেবলই আমাদের প্রফেসর । তোমার ও , আর আমার ও । আর তার পাশাপাশি তিনি মেঘা আর শাফাহ্'র ভাইয়া । আমি কেবলই ওদের ভাইয়ার কাছে ওদের খোঁজ নিয়েছি । বুঝেছো আশা করি ।
এটুকুনি বলেই শিশির পাশ কাটাতে গেলো ওদের । ফারিন কটাক্ষ করে বললো তৎক্ষণাৎ......
" ক্লাস , ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড , বা চেহারার সৌন্দর্য , কোনোটাই নেই তোমার কাছে । তোমার দ্বারে বাড়তি কিছু ভাবিও না আমি ।
শিশির থামলো সহসা । পিছু ফিরলো এক ঝাঁক বিরক্তি সমেত । সে নরম , তবে ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন । কারোর বিদঘুটে তাচ্ছিল্য করে বলা কথা শুনে গায়ে লাগানোর মতো মেয়ে নয় সে । সেই কথার বিপরীতে পাল্টা প্রতিরোধ তার জানা আছে । সাধারণ সে । তবে ভুক্তভোগী নয় । ফারিনের তিরষ্কার মোটেও গায়ে মাখলো না , ঝেড়ে উঠলো.....
" শাট আপ ,,, খবরদার আমার ক্লাস তুলে কথা বলবে না ।
আর না ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে । সহ্য করবো না বলে রাখলাম । নিজের অকাতে থাকো ফারিন । আমি কিন্তু ছেড়ে কথা বলার মেয়ে নই । সবসময় উল্টো পাল্টা মন্তব্য সহ্য করি তোমার ।
আর এমনিতেও , তোমার ক্লাস আর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আমার থেকে ভালো হলে শাফাহ্ আর মেঘা আমার কাছে না এসে তোমার কাছেই যেতো । এখান থেকেই বুঝে নাও , তুমি কোন ক্লাস থেকে বিলংস করো ।
ফারিনের মুখখানা চুপসে আসে অগত্যা । শিশির আর দাঁড়ায় নি । কথা গুলো শুনিয়েই গটগটিয়ে হাঁটা ধরেছে নিজের পথে ।
★
গ্রাম থেকে শহরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমেছে । শুভ্র গেছিলো দুপুরের পর । ফিরেছে ওদের সবাইকে এক সাথে নিয়ে । সে গিয়ে রৌদ্রের নাগাল পায় নি । তার আগেই বেরিয়ে এসেছে রৌদ্র । এই ছেলের মতিগতি বোঝা বড্ড দায় । কি করে , কে জানে ।
অবশ্য শুভ্র এখন খানিকটা অবগত সিক্রেট মিশন নিয়ে । সেও আজকাল যোগ দিয়েছে সিরাত আর আদ্রের সাথে । সেদিন বাড়ি ফিরেই রৌদ্রের কান্ড সিরাতের কানে তুলেছে দু ভাই । ওরা তিন ভাই বোন এখন একদল । মেহের কেও টানা হবে । শাফাহ্ টা বোকা ,, না হলে ওকেও টানা যেতো । কিন্তু ঐ মেয়ে বুদ্ধু , তার উপর মুখ পাতলা ।
বোকার মতো কখন সবটা মেঘার কাছে উগড়ে দেবে , তা সে নিজেও জানবে না । ওর কথা বাদ ।
সিরাত , আদ্র, শুভ্র আর মেহের , এরা চারটে মিলে মিশনে নেমেছে । বেপরোয়া রৌদ্র আর জেদি মেঘা কে এক করার মিশন । মেঘা কে ছাড়া যাবে না । আর রৌদ্র কে ওকে ছাড়তে দেওয়া যাবে না । রৌদ্র রগচটা, সে কখনো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবে না কারোর সামনে । নিজের ইগো, দাম্ভিকতা বজায় রেখেই ঔদ্ধত্যা চালাবে সে । এখনো চালাচ্ছে । সেই বিদেশ থেকে ফেরার পর হতেই মেঘার উপর অপ্রকাশিত ভাবে খাটাচ্ছে নিজের অধিকার ।
এ কদিনে রৌদ্রের ভাবগতিক বোঝা হয়ে গেছে ওদের । বউয়ের প্রতি টান জেগেছে বেপরোয়া ছেলের । এই টান কতদূর গড়াতে পারে তাই দেখার পালা ।
রাতের ডিনার শেষে বাড়ির দুই কর্তা ড্রইং রুমে বসে আছেন । গিন্নিরা ব্যাস্ত কিচেন গোছাতে । মেঘা আর শাফাহ্ রুমে উঠেছে খেয়ে দেয়ে । কাল ভার্সিটি আছে । পড়াশোনা গুছিয়ে নিচ্ছে টুকটাক ।
সদর দরজায় বেল বাজলো এমত সময় । ঘড়ির কাঁটা নয়টার দোরে । এই সময় কে আসতে পারে ? রুবিনা কাবির দরজা খোলার জন্য এগোতে গেলে তোফায়েল কাবির বাঁধা দিলেন । নিজে গিয়ে খুলে দিলেন দরজাটা ।
গেটের দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে সদরের সামনে । সাথে আরেকজন । তোফায়েল কাবির কে দেখা মাত্রই দারোয়ান
স্বভাবত হেসে পাশের লোকটাকে ইশারা করলেন । ইনি এসেছেন পার্সেল নিয়ে । খুঁজছেন আদ্র কে । তোফায়েল কাবির লোকটার পাশে বিশাল আকারের একটা ফ্রেম মতো কিছু লক্ষ্য করলেন । প্যাকেজিং করা ভালো মতো ।
ভেতরে কি আছে জানা নেই । লোকটা সাবধানী হয়ে ধরে রেখেছেন সেটাকে ।
আদ্র আবার কি আনিয়েছে কে জানে ।
ছেলে কে ডাকা মাত্রই ছেলে ঘর হতে নিচে নামলো তড়তড়িয়ে । সদরের বাইরের লোকটাকে দেখে মুখ ফাঁক করলো । দ্রুত বললো স্বাভাবিক কন্ঠে.....
" বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ? ভেতরে নিয়ে আসুন !
দারোয়ানের সহায়তা নিয়ে তাই করলো লোকটা । বড় পার্সেল করা বস্তু টাকে ভেতরে নিয়ে আসা হলো ।তোফায়েল কাবির শুধালেন.....
" কি আছে এতে ?
" ঐ , আমাদের ফ্যামিলি পিকচার । ভাইয়ার বিয়েতে তুললাম না ? সেটা ফ্রেমে বাঁধিয়েছি ।
সদর বরাবর ডাইনিংয়ের সামনের দেয়ালটা আগে থেকেই ফাঁকা করিয়ে রেখেছে আদ্র । সেখানকার সব ফটো ফ্রেম সরিয়েছে । মূল সদর বরাবর ঠিক সামনে টাঙানো হবে তাদের ফ্যামিলি ফটো টা । যাতে দৃষ্টি কাড়ক হয় আরো বেশি । প্যাকেজ খোলা হচ্ছে । খুব সাবধানে মুড়িয়ে এনেছেন ফ্রেম টা । বেশ বড়সড় ।
শাফাহ্ আর মেঘা কে ডাকা মাত্রই ওরা নামলো ছটফটিয়ে । মেঘা টেবিলের দিকে এগোয় । চেয়ার টেনে বসে , গ্লাসে পানি ঢালে খাওয়ার জন্য । শাফাহ্ চিকচিক করে শুধায়....
" এটা আমাদের সেই ফ্যামিলি পিকচার , ফ্রেমে বাঁধিয়েছো ভাইয়া ?
আদ্র এক পলক তাকায় । বুকে হাত গুটিয়ে টান টান দাঁড়িয়ে ফ্রেমটার আনবক্সিং দেখছে সে । চোখ ফিরিয়ে আবারো সেদিকে নজর রেখে উত্তর করলো...
" হুম ।
" বেশ ভালো করেছো । আমাদের একটাও ফ্যামিলি ফটো নেই । থাকলেও ফোন গ্যালারিতে বন্দি হয়ে আছে । ফ্রেমে বাঁধানো নেই একটাও । এটা বেশ বড়সড় করে বাঁধিয়ে ভালোই করেছো ।
" আমি ভালোই করি সবসময় ।
ফ্রেম টার প্যাকেজিং পুরোপুরি খোলা মাত্রই আদ্র মৃদু হাসলো । হাত নামালো বুক থেকে । একটা হাস্যোজ্জ্বল পরিবার । মাধুর্যময় হাসি সকলের ঠোঁটে । নব দম্পতিকে ঘিরে রয়েছে তাদের পরিবার । ছবিটাতেই চাকচিক্যতা স্পষ্ট ।
শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির মুচকি হাসলেন তাদের সংসারের চিত্র দেখে । তোফায়েল কাবির, তৌসিফ কাবির একপাশে বসে । শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে দেখলো । প্রথমেই দেখলো নিজেকে । ওর পাশে সায়ান । নিজের ফটো ভালো এসেছে , ফিক করে হাসলো সে । তুড়ি বাজিয়ে হাসি চওড়া করে বললো.....
" ওয়াহ্ , খুব সুন্দর হয়েছে ছবিটা । মেঘা , দেখে যা....
এ পর্যায়ে মেঘার ছবিটার দিকে তাকানো মাত্রই মুখ গোল করে ফেললো শাফাহ্ । সবার দৃষ্টি, মেইন ফোকাস সামন বরাবর হলেও মেঘার ফোকাস তার বাম পাশে । ঘাড় উঁচিয়ে চোখ তুলে বাম পাশে চেয়ে আছে মেঘা । বাম পাশের জন রৌদ্র । রৌদ্রেরও দৃষ্টি নেই সামনে । সেও একই ভাবে চোখ নামিয়েছে তার ডান পাশের অনুচ্চ রমনীর পানে । যেনো চোখাচোখি হচ্ছে দুজনার ।
শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে তাকায় । মেঘা উঠে আসার আগে বোকা মেয়েটা আচমকা বলে ওঠে ছবিটার দিকে তাকিয়ে....
" একি মেঘা , তুই ওভাবে ভাইয়ার দিকে কি দেখছিস ?
মেঘা থতমত খেলো । বুঝলো না । কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ সূক্ষ্ম করলো । পরক্ষনে শাফাহ্ আবার বলে একই স্বরে.....
" ইয়া আল্লাহ , ভাইয়া এটা কি ছবি বাঁধিয়েছো তুমি ? মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়া তো গন্ডগোল পাকিয়েছে । ওরা তো নিজেদের দেখতেই ব্যাস্ত ।
শোনা মাত্রই ধক্ করে ওঠে মেঘা । দ্রুত কদমে এগিয়ে আসে । সচকিতে দৃষ্টিপাত করে ফ্রেম টার দিকে । ছ্যাত করে ওঠে নিজেদের দিকে তাকানো মাত্রই । ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে । বাকিরা সামন পানে । চোখ ছোট হয়ে আসে মেঘার । রৌদ্রের স্পর্শ নিজের কোমরে পাওয়া মাত্রই বিরক্ত হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়েছিল সে সময়, আর ঠিক তখনই ক্যামেরায় ক্লিক করা হয়েছে ।
মেঘা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয় এক মুহুর্ত । ফের সম্বিত ফেরে শাফাহ্'র কথায়...
" মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়া তো ফোকাসে নেই ভাইয়া ।
আদ্র চাপা স্বরে ধমকালো কাউকে না শুনিয়ে....
" চুপ বুদ্ধু , যার ফোকাস যেখানে , সে সেখানেই তাকিয়ে আছে । তোকে অতো বুঝতে হবে না । যদি আর একটা কথা বলেছিস , তো গাট্টা খাবি বলে রাখলাম ।
শাফাহ্ সহসা চুপসে যায় । মেঘার তাজ্জব মুখো ভঙ্গিমা দেখে ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করে আদ্র । শুভ্র আর সিরাতের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচায় ।
তোফায়েল কাবির কিছু না বুঝে উঠে এসেছেন দেখার জন্য । ছবিটা দেখা মাত্রই পেছনে হাত গুটিয়ে নিলেন তিনি । গুরুগম্ভীর করলেন নিজেকে । গলা ঝাড়লেন ।
" বাঁধানোর মতো আর ছবি পাও নি ? এটাই পেয়েছো ?
" এটাই ভালো এসেছিলো আব্বু ।
ছবি টাঙানোর জন্য লোকটাকে তাড়া দিলো বিলম্ব না করে....
" আপনি এটা টাঙিয়ে দিন ।
তাই করলো লোকটা । দ্রুত টাঙিয়ে দিয়ে তিনি তার পারিশ্রমিক নিয়ে চলে গেলেন ।
মেঘা মাথা নামিয়েছিলো লজ্জায় । পিটপিট করে চোখ তুলে আড়চোখে তোফায়েল কাবির কে দেখে আর থাকতে পারলো না । গা বাঁচিয়ে সবার নজর থেকে বাঁচতে উপরে উঠলো দ্রুত পায়ে ।
শাফাহ্ আদ্রের কাছাকাছি দাঁড়ায় । ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুকে এক হাত গুটিয়ে নেয় । অন্য হাত চোয়ালে ঠেকিয়ে ভাবুক ভঙ্গিতে দাঁড়ায় । বলে.....
" ভাইয়া , কি হলো এটা ?
" আই কন্টাক্ট । তোর মোটা মাথায় ওসব ঢুকবে না ।
" উঁহু , ঢুকেছে । কি ঢুকেছে জানো ?
চেয়ে দেখো ছবিটার দিকে । কি দেখছো ? বুঝলে না ? ওয়েট আমি বোঝাচ্ছি । দেখো ছবিটার দিকে.....ভাইয়া আর মেহের আপু কাপল । আম্মু আব্বু , মামনি আর বাবাই ওরাও কাপল । সিরাত আপু আর আহিয়ান ভাইয়া , ওরাও জোড়া জোড়া । মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়ার ও জোড়া আছে । আমার পাশে সায়ান ভাইয়া , ছবিতে হলেও আমাদের জোড়া লাগছে । মানে ,, কাপল মনে হচ্ছে আরকি । কিন্তু দেখো , পুরো ছবিটার মধ্যে তুমি একলাই বেচারা । সিঙ্গেল ম্যান । কেউ নেই তোমার পাশে । তোমাকে এক কোণে রেখেছে সবাই । ইশশ্ ভাইয়া , সো স্যাড । কোনো পার্টনার নেই তোমার । ইশশ্ ইশশ্ , এজন্যই মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছো ? বুঝি আমি । তোমার কষ্ট টা বুঝি । কিন্তু আফসোস , বাড়ির কেউ বোঝে না । আর কতদিন সিঙ্গেল থাকবে এভাবে ?
আদ্র কটমট করে তাকিয়ে আছে । শাফাহ্ পাত্তা দিলো না । একটু থেমে ঢোক গিলে আবার বললো....
" আহারে বেচারা আদ্র ভাইয়া , সিঙ্গেল থাকতে থাকতে শুকিয়ে যাচ্ছো । টেনশন করো না , আমি মামনি আর বাবাই কে বলবো তোমাকে একটা বউ গিফট করতে । কেমন ? আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না । রিটার্ন হিসেবে কয়েকটা চকলেট দিও,তাতেই হবে । যদি বলো , তাহলে এক্ষুনি মামুনি বাবাই কে......
মেয়েটা আর কথা শেষ করতে পারলো না । আদ্র রেগে মেগে ব্লাস্ট হওয়ার আগেই ঢোক গিলে এক কদম পেছালো । বাকি টুকু শেষ করার জন্য মুখ খোলার আগেই সবার সামনে ওর দিকে তেড়ে গেলো আদ্র.....
" টুকটুকির বাচ্চাাাাা......
" আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাা....আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বললাম ।
মামনি , তোমার ছেলে আমাকে মেরে ফেললো । বাঁচাওওও.......
🟥 কারেন্ট নেই । তাই দেরি হয়ে গেলো আরো বেশি । অর্ধেক অংশ,তাই ছোট এই পর্বটা । সবাই রেসপন্স করবেন । স্পয়লারে যেটা ছিল , সেটা ২৬ পর্বে থাকবে । এটুকু নিয়ে খুশি থাকুন আজ । 🟥
#চলবে…………