ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

২৬তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_২৬

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

পরদিন সকাল । আটটা বাজতে চললো ।

ব্রেকফাস্টে বসেছে বাড়ির সকলে । মেঘা আর শাফাহ্ তৈরি হয় নি এখনো । খেয়ে দেয়ে তৈরি হবে গিয়ে । মেহের আজ টুকটাক কাজ করছে । রুবিনা কাবির আর শাহিনা কাবিরের হাতে হাত মিলিয়ে সবাইকে ব্রেকফাস্ট সার্ভ করেছে । যদিও বাঁধা এসেছে শত । তবুও সে নিজে থেকেই করছে । বাবার বাড়িতেও করতো ।

সবাই বলে মেয়েরা নাকি বাবার ঘরের রাজকন্যা । মেহের ও তাই । একমাত্র রাজকন্যা সে । তবে বিলাসী নয় । মেয়েটা বড্ড ভোলা । সাদামাটা জীবন তার পছন্দ । খুব একটা চাকচিক্যে অভ্যস্ত নয় ও ।

এখন বাবার ঘর ছেড়ে এসেছে শশুর ঘরে । এখানে রাজকন্যা কে বসানো হয়েছে রাজ রাণীর আসনে । ওকে হাতের তালুতে উঠিয়ে রাখে সকলে । শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির ওকে কোনো কিছুতে হাত লাগাতে দেন না । মেহের জিদ ধরে আজ নিজেই সাহায্য করছে ওনাদের । ব্রেকফাস্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শুভ্রর পাশে । শুভ্র চোখে ইশারা করলো খেতে বসার জন্য । বসলো না । অতঃপর শাহিনা কাবির জোর করে বসালেন ।

মুচকি হাসলো শুভ্র । ব্যাপারটা বেশ জমেছে । মেহেরের সাথে বিয়ে হাওয়া টা মন্দ হয় নি মোটেও । এই যে ওরা একে অপরকে আগে থেকেই চেনে , জানে , ওর পরিবার মেহের কে আগে থেকেই জানে , তাইতো মানিয়ে নেওয়া টা সহজ হয়েছে ।

শুভ্র ইদানিং মেহেরের মান অভিমান টুকুও বুঝতে শিখেছে । এই যেমন , এখন অভিমান জমেছে শুভ্রতার হৃদয়ে । বাপের বাড়ি এ অবধি যাওয়া হয় নি । আজ যাওয়ার কথা , শুভ্র নিয়ে যাবে কি না তাও সন্দিহান ।

বউয়ের অভিমানী আদলের পানে তাকিয়ে হাসি চাপে শুভ্র । কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই রৌদ্র নিচে হাজির । সেই রোজকার ন্যায় অবস্থা তার । ঘুম থেকে উঠেই শাওয়ার নিয়ে নিচে নেমেছে । কোনো দিকে না তাকিয়ে চেয়ার টেনে খেতে বসে পড়লো । সকলে চোখ তুলে তাকালো এক পলক করে । রৌদ্রের মাথা নিচু । রুবিনা কাবির ছেলের খাবার বেড়ে দিলেন । অগত্যা খেতে আড়ম্ভ করলো রৌদ্র ।

ভাইয়ের থেকে চোখ নামিয়ে খেতে খেতে শুভ্র ডেকে বললো....

" মেহের , আজ তৈরি থাকবি ! দুপুরে অফিস থেকে ফিরে ও বাড়িতে নিয়ে যাবো ।

সহসা চিকচিক করে ওঠে মেয়েটা । তবে বাদবাকি কারোরই পছন্দ হলো না শুভ্রর কথাটা । তাৎক্ষণিক ভার গলা ভেসে আসলো তৌসিফ কাবিরের থেকে.....

" এটা কি ধরনের বিহেভিয়ার শুভ্র ? মেহের তোমার স্ত্রী ! ওর সাথে এখনো তুই তুকারি করছো কেনো তুমি ? ম্যানার্স কোথায় তোমার ?

শুভ্র থতমত খেলো সহসা ।

আব্বুর দিকে তাকাতেই রাগী ভাব নজরে আসলো । ভুল জায়গায় বেফাস বলে ফেলেছে । শাহিনা কাবির স্বামীর কথায় কথা জুড়লেন.....

" ঠিকি তো , তুই মেহেরের সাথে এখনো তুই তুকারি করে কথা বলিস ? সে কি এখনো তোর বন্ধুর বোন আছে ? স্ত্রী হয় ও তোর । সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারিস না ? কিসের তুই তুকারি ওর সাথে ?

শুভ্র বিপাকে পড়ে । পিটপিট করে মেহেরের দিকে তাকায় । নিজেকে সামলে আমতা আমতা করে পরিস্থিতি সামাল দিতে.....

" আ... না মানে , অভ্যাস ছিলো তো ।

" অভ্যাস পরিবর্তন করো । মেহের এখন তোমার স্ত্রী ।

তোফায়েল কাবিরের কথায় শুভ্র ভুল শুধরে বলে ধীরুজ স্বরে....

" সরি....

রৌদ্র সবটা মন দিয়ে শুনলো । গেড়ে নিলো মনে । তুমি করে বলাটাই যদি স্ত্রীর সম্মান হয় । তাহলে আজ থেকে রুডভিক কাবির রৌদ্রও তার স্ত্রীর সাথে তুমি সম্বোধনেই কথা বলবে । যদিও বা তুই বলাটা তারও অভ্যাস । সম্মান দেওয়ার জন্য অভ্যাসের পরিবর্তন করবে না হয় । খেতে খেতে আড়চোখে মেঘার দিকে তাকালো সে । কাল দেখেছে মেঘার অভিমান । একটা ফোন পাসওয়ার্ড কে ঘিরে মেঘার সন্দেহ দেখেছে । সেই যে কাল রৌদ্রের থেকে ছুটে পালালো মেয়েটা , আর ধরা দেয় নি আপন মনে ।

কথা তো দূর , মুখোমুখিও হয় নি ও বাড়িতেই । রৌদ্র একেবারে রাত বারোটার পর ফিরেছে । অতঃপর দেখেছে রমনীর ঘুমন্ত মুখাবয়ব ।

মেঘা খাচ্ছে চিবুক নামিয়ে । রৌদ্র ওর থেকে চোখ নামিয়ে প্লেটের দিকে তাকালো । একখানা অমলেট প্লেটে । কেবল একটুই খেয়েছে । আশপাশ না ভেবে হাত বাড়িয়ে অর্ধেক ডিম টুকু চট করে নিজের পাতে তুলে নিলো সে ।

সাথ সাথ তিরিক্ষি চোখে চাইলো মেঘা । বাকিরাও তাকায় । রুবিনা কাবির কিচেনে গেছেন । রৌদ্র ডিম খায় না । সেদ্ধ তো একেবারেই না । সেদিন ওকে মেঘার পাত থেকে অমলেট নিয়ে খেতে দেখেছিলেন । তাই আজ গেছেন ছেলের জন্য আলাদা করে অমলেট করতে ।

শাহিনা কাবির বললেন.....

" মেঘার পাত থেকে ডিম নিচ্ছিস কেনো রৌদ্র ? তোর মা আরেকটা অমলেট করতে গেছে । নিয়ে আসুক , ওটা খাবি । মেঘার টা ফিরিয়ে দে ওর পাতে ।

রৌদ্র পরোয়া করলো না কথাটুকু । স্যান্ডউইচের ভাজে পুরো অমলেট পুরে মুখের ভেতর ঠেলে দিলো । চিবিয়ে বললো অস্পষ্ট স্বরে....

" ওর পাতের খাবার একটু বেশিই টেস্টি , মনি....

টেস্ট লাইক অ্যামব্রোশিয়া ।

বোঝা গেলো না বাক্য দুটো । রুবিনা কাবির আরেকটা অমলেট নিয়ে এসে রৌদ্র বাঁধা দেওয়ার আগেই ছেলের পাতে তুলে দিলেন তিনি । রৌদ্র কিছু বললো না তবুও । গোটা অমলেট নিজের পাত থেকে তুলে মেঘার প্লেটে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বললো.....

" এটা তুমি খাও.....

ভুতের মুখে রাম নাম । থুড়ি , রৌদ্রের মুখে তুমি সম্বোধন । কর্ণপাত হওয়া মাত্রই ভড়কে চাইলেন বাকিরা । ছেলের পরোয়া নেই । তোফায়েল কাবির ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে রইলেন মুখে খাবার নিয়ে । পরক্ষনে গলা খাঁকারি দিলেন । মেঘা অবাক হলেও মানিয়ে নিলো নিজেকে । তোফায়েল কাবিরের ইঙ্গিত বুঝে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো ।

আদ্র হাসলো মিটিমিটি । শাফাহ্'র মুখ চুলকাচ্ছে । এতো সবার সামনে বলতেও পারছে না । শেষে না বলে থাকতে পারলো না আর ।

" আচ্ছা রৌদ্র ভাইয়া , আমাদের ফ্যামিলি ফটো দেখেছো ?

রৌদ্র তাকিয়ে প্রশ্ন করে....

" কোনটা ?

সহসা হাত ইশারায় দেখিয়ে বললো শাফাহ্....

" ঐ‌যে ওটা । দেখো দেখো....কেমন হয়েছে ?

রৌদ্র তাকায় । ছবিটাতে যেটা নজর কাড়ার‌ কথা , সেটাই নজর কাড়লো সর্বপ্রথম । ওরা ফ্রেম বন্দি হয়ে আছে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝে । ওষ্ঠপূটে হাসির দেখা মেলে রৌদ্রের । মুহুর্তেই চেপে ফেলে তা ।

চোখ নামিয়ে খাওয়ায় মনযোগ দেয় । ধীরে বলে..

" হুম , সুন্দর এসেছে ।

শাফাহ্ চাপা স্বরে প্রশ্ন করে রৌদ্রের দিকে খানিক ঝুঁকে এসে....

" ভাইয়া , একটা কথা বলি ? তুমি তখন মেঘার দিকে কি দেখছিলে ওভাবে ?

রৌদ্র ও একই ভাবে ফিসফিসিয়ে বললো....

" কখন ?

" ঐ যে , ছবিটা তোলার সময় ?

" নিজেকে দেখছিলাম ।

" কি করে ?

" ওর চোখে !

" আচ্ছা ? মেঘা কি দেখছিলো ?

" আমাকে ।

" ও কেনো তোমার মতো করে নিজেকে দেখলো না তোমার চোখে ?

" ও আমাকে দেখুক , নিজেকে না দেখলেও চলবে ।

" কিন্তু....

" উঁহু , কোনো কিন্তু নয় । তোর সাথে আমার কথা আছে...

ভার্সিটি থেকে ফিরে আমার কাছে আসবি । মনে থাকবে..?

" কেনো ?

" তোকে কিছু কাজ দেবো ! যদি করে দিতে পারিস , তাহলে অনেক চকলেট পাবি আমার থেকে । আনলিমিটেড চকলেট দেবো ।

" সত্যিই ?

" হুম । এখন চুপ...

দুই ভাই বোন ফিসফিস করা থামালো । মেঘা আড়চোখে অবলোকন করলো দুজনকে । শাফাহ্ চুপটি মেরে যায় ।

খাওয়া দাওয়া সেরে ভার্সিটিতে বেরিয়েছে ওরা । আদ্রের ক্লাস প্রথমে । দশটা হতে এগারোটা পর্যন্ত । এগারোটার পর প্রথম ক্লাস শেষে বাইরে বেরিয়েছে মেঘা,শাফাহ্ আর শিশির । এরপরের ক্লাস নেই । আছে আরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর । ক্যাম্পাস হতে বেরিয়েছে ওরা । শাফাহ্'র খিদে পেয়েছে ।‌ খাবে এখন । সেদিন আদ্র বললো, ভার্সিটির বাইরে নতুন একটা ফুড কর্নার ওপেন হয়েছে । সেখান থেকেই মোমো নিয়ে গেছিলো । বেশ ভালো খেতে । খুঁজে নিয়ে সেই ফুড কর্নারেই ঢুকলো তিনজনে । শিশির ইতস্তত । নামি দামি ক্যাফেটেরিয়া । সব খাবারের দাম ও নিশ্চয়ই বাইরের তুলনায় একটু হলেও বেশি এখানে । আর ও বাইরের খাবার পছন্দ করে না খুব একটা । হাতে টাকাও নেই বাড়তি করে খরচের জন্য ।

শাফাহ্,মেঘা জোরপূর্বক নিয়ে এসেছে ওকে । শিশির বাঁধা দিয়েও কাজ হয় নি । এখন ইতস্তত লাগছে । ওয়েটার এসে মেনুকার্ড ধরিয়ে দিতেই টুকটাক অর্ডার করলো মেঘা । তিনজনের জন্য কোল্ড কফি । শাফাহ্ পেস্ট্রি খাবে ।

মেঘার মোমো পছন্দ । এখানকার মোমো বেশ‌ ভালো লেগেছে । তাই নিজের আর শিশিরের জন্য মোমো অর্ডার করলো সে । ওয়েটার চলে যেতেই শিশির ভেজা গলায় দোনামোনা করে বলে জড়তায়....

" মেঘা , আমি কিছু খাবো না । তোরা খা...

আমি জাস্ট একটা কফি নেবো । তাহলেই চলবে...!

প্লিজ জোর করিস না । আমি বাইরের খাবার খাই না তেমন ।

" চুপ করবি । একবার খেয়ে দেখ , ভালো লাগবে । আমার পক্ষ থেকে আজ তোদের দুজনের ট্রিট ।

" কিন্তু..

" কোনো কিন্তু নয় । চুপ থাক ।

আর বল , তোর ভাইয়ের এখন কি অবস্থা ?

শিশির একটু চুপ থাকলো । পরক্ষনে বললো একটু হেসে....

" আগের তুলনায় অনেক বেটার । লাস্ট সপ্তাহ থেকে বাড়িতেই আছে । বলেছিলাম না , ও মাঝে মাঝে আমাদের চিনতে পারে না । ভুলে যায় । আমাদের স্মৃতি মুছে যায় মাথা থেকে । কিন্তু ইদানিং ও ভালো আছে জানিস । আমাকে রোজ আপু বলে ডাকে ।

ইকরা আপু তো অফিসে যায় , আর আমি ভার্সিটিতে আসি । বাড়ি গেলে দেখি অভিমান জমিয়ে রাখে আমাদের দুজনের উপর ।

আমাদের আবার সেই অভিমান ভাঙ্গাতে হয় । সব মিলিয়ে এখন আগের থেকে খুব ভালো আছে । আল্লাহ করুক , আরেকটু সুস্থ হোক । তাহলে আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই আমাদের ।

মেঘা মুচকি হাসলো । রয়ে সয়ে বললো....

" একদিন তোদের বাড়িতে যাবো তোর ভাইকে দেখতে ! আমাদের কথা বলবি ওকে ।

ওদের কথা বলার মাঝেই ওয়েটার অর্ডার সার্ভ করে গেছে । খেতে খেতে আরো টুকটাক গল্প করলো ওরা । হাতে সময় নেই । ক্লাস শুরু হবে মিনিট দশেকের মাথায় ।

খাওয়া শেষ করে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে মেঘা শুধায়....

" আমাদের বিল ?

ম্যানেজার মেঘা কে ভালো করে পরখ করলেন প্রথমে । এসে থেকেই নজর রেখেছিলেন । চেনা মাত্রই ভরা গালে হেসে বিনয় দেখিয়ে বললেন....

" আপনাদের বিল পেমেন্ট করা আছে ম্যাম ।

কপাল কুঁচকে ফেললো মেঘা । বুঝলো না ।

" সরি , আমরা পে করি নি এখনো ।

" প্রিপেইড করা আছে । আপনি আগামীতে যত খুশি তত খেতে পারবেন আমাদের ফুড কোর্টে । আপনার আগামী সব খরচার মূল্য আগে থেকেই পেমেন্ট করা ।

মেঘা চোখ সরু করলো । গলা নামিয়ে বললো ....

" মানে ? আপনারা হয়তো আমাদের অন্য কারোর সাথে গুলিয়ে ফেলছেন ।

" নো ম্যাম , আপনাকে চিনতে পেরেছি আমরা । আপনি তো লাকি কাস্টমার আমাদের কর্নারের ‌। যার , আগামী মাস, বছর সব খাবারের বিল অলরেডি পে করা হয়েছে আমাদের ।

মেঘা আহম্মক বনলো । শাফাহ্ ফটাফট প্রশ্ন করলো....

" আরে বাহ্ । প্রিন্সেস ট্রিট ? আচ্ছা , ঝেড়ে কাশুন তো একটু । মেঘা কে চেনেন আপনারা ? মজা করছেন ? খেতে না খেতেই কে আমাদের খাবারের বিল পে করে দিলো ?

" তা তো জানি না । তবে ম্যাডাম কে জানি ।

" আমাকে জানেন মানে ? কি করে জানেন ? আর আগাম বিল পেমেন্ট করেছে কে ?

" তাকে তো চিনি না । তবে তিনি আপনাকে চিনিয়ে দিয়েছেন ভালো করে । শুধু আপনাকে জানি । আপনি তো ইভারা ম্যাম...? এম আই রাইট ?

মেঘা ধক্ করে ওঠে । কেমন নড়েচড়ে পরিবর্তন আনে চেহারায় । হাত দিয়ে খামচে ধরে নিজের পার্স । তড়িতে চোখ ঝাপটে ঘন ঘন পলক ফেলতে থাকে ।

শাফাহ্ কপাল গুটিয়ে বলে.....

" হ্যাঁ , ও ইভারা ।

তার মানে বলছেন আমাদের আর পে করতে হবে না ? কিন্তু পে করলো টা কে ? আদ্র ভাইয়া ? হবে হয়তো । মেঘ , আদ্র ভাইয়ার কথা বলছেন হয়তো ইনি । চল , বক বক করে লাভ নেই । দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের । ক্লাস শুরু হয়ে যাবে ।

মেঘা স্তম্ভিত । চোখের অস্বাভাবিকতা কিয়ৎ কাল বাদ স্বাভাবিক হয় । কথা না বাড়িয়ে ওর হাত টেনে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরোলো শাফাহ্ । মেঘার দূর্বোধ্য , হতবাক ভঙ্গিমা দেখে বললো বোঝানোর মতো করে....

" মেঘা , এতো কি ভাবছিস ? আরে , আদ্র ভাইয়া এসব করেছে হয়তো । নয়তো ওনার কিসের ঠেকা আমাদের ফ্রিতে খাওয়ানো ? চল , আদ্র ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে নেবো না ।

মেঘা নড়েচড়ে ওঠে এবার । থেমে বলে...

" হু । চল....

★

সন্ধ্যা রাত ।

সারাদিনের ব্যস্ত সময় পেরিয়ে অফিস ছুটিতে ঘরে ফেরার পালা । শহরের ব্যস্ত রাস্তায় আজ যানজট প্রচুর । রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে ছিমছাম একটা মেয়ে । সদ্য অফিস থেকে বেরোলো । চেহারায় কিছুটা অবসন্নতা প্রকাশিত ।

অবসন্নতা বেড়েছে আরো । কপালে তিক্ত ভাঁজ । আজ রিকশা চালকদের ডিমান্ড বেড়েছে । অফিস থেকে বাড়ি ফেরা রোজকার ভাড়া কুড়ি টাকা । সেখানে আজ প্রত্যেকে তিন-চার গুণ বেশি ভাড়া চেয়ে বসছে । এইতো কিছুটা পথ । এটুনি পথ এতো টাকা দিয়ে যাওয়া যায় নাকি ? একেই রোজরোজ যাওয়া আসাতে খরচা হয় অনেক ।

মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসার । বেশি খরচা যে করতে নেই । এই এক মাস পর মাইনে পেলে তবেই না সারাটা মাস সংসার চলবে ।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও ন্যায্য ভাড়ায় কোনো রিকশা পাওয়া গেলো না । সামর্থ্য নেই অতিরিক্ত টাকা ভাড়া দেওয়ার । ব্যাগে হিসেব মতো কিছু টাকাই আছে । সেসব দিয়ে যাওয়ার সময় ভাইয়ের ঔষধ কিনতে হবে ।

আর পারা গেলো না । কতক্ষন আর দাঁড়িয়ে থাকবে এভাবে ! রমনী ত্রম্ভ পায়ে হাঁটা ধরলো । সামনে ফার্মেসি থেকে মেডিসিন নিয়ে হেঁটেই যাবে আজ । জিদ ধরলো নিজেই নিজের সাথে । কয়েক পা এগোনো মাত্রই পাশাপাশি কাছ ঘেঁষে এসে থামলো একটা বাইক । সহসা ডাক পড়লো কানে....

" ইকরা !!

ইকরা চকিতে থামে । পাশ ফিরতেই চোখে পড়ে চিরচেনা সেই সুপুরুষ । মাথায় হেলমেট । মুখটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছিলো না । তন্মধ্যে হেলমেট খুললো লোকটা । সহসা সেঁটে রাখা ক'গাছি চুল এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়লো কপালে । চোয়াল ঠেলে মুচকি হাসলো #আবিদ । ইকরা তাকিয়ে থাকার মাঝে প্রশ্ন করলো....

" হেঁটে যাচ্ছেন কোথায় ?

চোখ নামায় ইকরা । ধীরে বলে....

" ফার্মেসি থেকে মেডিসিন কিনতে হবে । ফার্মেসির দিকেই যাচ্ছি ।

" সে কি ? এখানে আশেপাশে তো ফার্মেসি নেই । আছে অনেকটা দূরে । হেঁটে যাচ্ছেন যে ?

" রিকশা চালকদের ডিমান্ড বেড়েছে আজ । তাদের চাহিদা পূরণ করতে গেলে আমার পরিবারে টানাপোড়েন পড়বে । পরিবার টাই বেছে নিলাম । এইতো এটুকু পথ ‌, সামনেই ফার্মেসি , হেঁটে যেতে পারবো ।

আবিদ শান্ত চোখে তাকায় । স্থির করে দৃষ্টি । মেয়েটা কে যত দেখে , ততই অবাক হয় সে । মুগ্ধতা বাড়ে । মেয়েটার বয়স কোথায় বেশি । হবে বাইশ কি তেইশ । এতেই পুরো পরিবারের ভার তার একার কাঁধে । অসুস্থ ভাইয়ের চিকিৎসার খরচ , মা বোন সহ পরিবার সামলানো , সব একাই করে মেয়েটা । সারাদিনের অফিসের ধকলের পর এখন কিনা কটা টাকা বাঁচাতে হেঁটে বাড়ি ফিরবে‌ ! সিদ্ধান্ত দেখে মনে হয় কত বিজ্ঞ এই মেয়ে । কিন্তু মোটেও তা না ।

সৌন্দর্যে বেশ স্নিগ্ধ আর আদুরে মেয়েটা । শ্যামলা গড়ন । তবুও দেখতে ভারী চোখে লাগে । ঐ যে কথায় আছে , সুন্দর কে সুন্দরের মতো করেই দেখতে হয় । সুন্দর করে দেখার জন্য প্রয়োজন সুন্দর দৃষ্টি । আর সেই সুন্দর দৃষ্টি এই আবিদ নামক লোকটার আছে । তাইতো এতো সুন্দর লাগে ইকরা নামক এই মেয়ে টাকে । মনে হয় সবসময় চোখের সামনে বসিয়ে রাখতে । ইচ্ছে করে আশ মিটিয়ে চোখ ভরে দেখতে ।

ভরা গালে তাকিয়ে শব্দহীনা হাসে আবিদ । বলে নরম গলায়....

" হেঁটে যেতে হবে না । বাইকে উঠুন , পৌঁছে দিচ্ছি ।

" আরে না ,‌ প্রয়োজন নেই । আমি চলে যেতে পারবো । আপনি যান । অফিস শেষ তো , আপনাকেও বাড়ি ফিরতে হবে ।

" ইকরা , আপনি না বলেছিলেন আমরা কেবলই বন্ধু । বন্ধুত্বের খাতিরে আপনাকে একটু সাহায্য করতে পারি না ? নাই বা হলেন অন্য কিছু । বন্ধুই সই...

ইকরা চোখ নুইয়ে ফেলে জড়তায় । এই লোকটা ওর কলিগ । কাজের পাশাপাশি আগে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা বেশ গাঢ় হলেও এখন পিছিয়েছে একটু । আবিদের দেওয়া একটা আকাঙ্ক্ষিত নিবেদনের সম্মুখে পড়া মাত্রই গুটিয়ে এসেছে ইকরা । সামনে দাঁড়ালে ইতস্তত হয় ইদানিং ।

মেয়েটার অচলতা দেখে আবার বললো আবিদ....

" ইকরা , উঠে আসুন ।

আর‌ দ্বিমত করলো না । জোর পূর্বক হেসে বাইকের পেছনে ফাঁক রেখে উঠে বসলো মেয়েটা ।

ফার্মেসির সামনে নেমে কতগুলো ঔষধ কিনে নিলো । দাম এসেছে একটু বেশি । ব্যাগ ঘেঁটে টাকা মেলাতে গিয়ে দেখলো কম পড়ে যায় । বিপত্তিতে পতিত হলো মেয়েটা । শাফিনের ঔষধ লাগে রোজ । মাইনে হাতে আসতে এখনো দিন পাঁচেক বাকি । ভেবেছিলো আগামী পাঁচ দিনের ঔষধ কিনে নেবে আপাতত । কিন্তু ব্যাগে টাকা নেই । যা আছে কম পড়ে যায় ।

দোনামোনা করলো ইকরা । পেছনে বাইকের সাথে হেলান দিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে #আবিদ । ইকরা ঘাড় ঘুরিয়ে চোরা চোখে তাকালো । ফের ঝট করে চোখ ফিরিয়ে ফার্মেসির লোকটাকে বললো ধীর কন্ঠে.....

" আপনি আমাকে তিন দিনের ঔষধ দিন ।

" থাক , পাঁচ দিনেরই দিন । কত টাকা কম পড়ছে ?

আবিদের ভরাট কন্ঠে ইকরা পাশে তাকায় । লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে । পিটপিট করে কুণ্ঠাবোধে চাইলো মেয়েটা । আবিদ চোখে চোখ রেখে ভ্রু তুলে বলে....

" কত কম পড়েছে ?

" তিনশ পঞ্চাশ ।

শোনা মাত্রই ওয়ালেট থেকে বের করে দিলো আবিদ । ঔষধ নিয়ে বাইকের সামনে আসা মাত্রই ইকরা ডেকে উঠলো....

" আবিদ ?

" হু ?

" থ্যাংক ইউ । আসলে টাকা বাড়িতে আছে । আমি আপনাকে কাল দিয়ে দেবো । শিফাতের ঔষধ কেনার ছিলো । থ্যাংক ইউ হেল্প করার জন্য..

" এতোবার ধন্যবাদ দিতে হবে না, ইকরা । প্রয়োজনে প্রিয়জনই পাশে থাকে । আপাতত রাখুন এই উপকার টুকু । যখন আমার প্রয়োজন পড়বে , তখন প্রিয়জন হিসেবে আপনাকে যেনো এভাবেই পাশে পেতে পারি । আমি যে প্রয়োজনে পাশে পেতে চাই আপনাকে ।

ইকরা হাত মুঠিয়ে চিবুক গলায় মিশিয়ে নেয় ‌। বাইকে ওঠে লোকটা । মেয়েটা কে এখন বাড়িতে পৌঁছে না দেওয়া পর্যন্ত ছাড়বে না আর ।

" উঠুন , বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি ।

★

অক্টোবর মাসের শেষ হতে চলেছে ।

মেঘ গুড় গুড় করে রোজ । এই যেনো বৃষ্টি নামবে যখন তখন । রাতে ঝুম বৃষ্টি নেমেছিলো । সেই বৃষ্টি চলছে আজ সকাল অবধি । শেষ রাতে কমলেও , সকাল হতেই আবার মেঘ ছাপিয়ে মুষুল ধারে বৃষ্টি নেমেছে । বাজে সকাল সাতটা । ঘুম থেকে গা মুড়িয়ে উঠে বারান্দায় এগোলো মেঘা । দমকা মিঠে হাওয়া গায়ে লাগতেই ফুরফুরে হয়ে উঠলো পুরোটা সকাল । হাই তুলে এক চিলতে হাসলো মেঘা । বৃষ্টি নেমেছে কতদিন বাদ । ভেজা হয় না বর্ষনের জলে । নিভু চোখ উজাড় করে বারান্দা হতেই হাত বাড়িয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কণা ছুয়ে দিলো একবিংশী ।

ঠান্ডা বারিধারা হাতের তালুতে ঝড়ঝড়িয়ে পড়তেই শিউড়ে উঠলো কোমলাঙ্গ । কেঁপে উঠলো রমনী ।

শিরশিরে পবনের সাথে সাথে বাদলের ঝটকা মাতিয়ে তুললো ছোট্ট হৃদয় । হাসি প্রগাঢ় হলো ওষ্ঠ যুগলে । দুহাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখলো বৃষ্টিকে ।

কালো মেঘের অন্ধকারে নিমজ্জিত আশপাশ । পুরো শহর তলিয়েছে বাদলের ছন্দময় গীতিতে ।

মেঘা এক মুহুর্ত ভাবলো , এই বৃষ্টিতে ভার্সিটিতে যাওয়া হবে আজ ? না হলে এক্ষুনি ছাদে উঠবে সে । আকাঙ্ক্ষা পুষে না রেখে , ভিজে সিক্ত করবে নিজেকে ।

শাফাহ্ ঠোঁট উল্টিয়ে ঘুমোচ্ছে এখনো । মেঘা ওকে ডাকলো না । তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে দরজার দিকে এগোলো । একটা অবাধ্যতা দেখিয়েছে কাল । দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়েছিল গত রাতে ।

ঐ লোক কেনো ওকে দরজা খুলে ঘুমোতে বলেছিলো ? ইয়ত্তা থাকলেও আর আশকারা দিতে চায় না মেঘা । বুঝতে চায় না ঐ অবাধ্য লোকটাকে ।

সে নরম হয়ে পড়ছে । আগে থেকেই যেটুকু কোমল ছিলো , শক্ত খোলসের আবরনে ঢেকে রেখেছিল সেই কোমলতা । কিন্তু , ইদানিং শক্ত খোলস ধরে রাখা যাচ্ছে না আর । মেঘা দূর্বল হয়ে পড়ছে । প্রকাশ্যে আসছে ওর দূর্বলতা । এটা যে হওয়ার নয় ।

দূরত্ব বাড়াতে হবে ঐ অবাধ্য লোকটার থেকে । মেঘা এবার হতে এড়িয়ে চলবে ওনাকে । দেখেও না দেখার ভান ধরবে । কথা বলা তো অনেক দূর । প্রথমে যেমন ছিলো , অচেনার ভান ধরে , তেমনই করবে আবার ।

ছিটকিনি খুলে নিচে নামলো মেঘা । ফ্রেশ হওয়া হয় নি এখনো । পড়নে ঢিলেঢালা ফ্রক আর স্কার্ট । মেঘা স্কার্ট রাউন্ড করে ঘুরিয়ে হেলে দুলে নিচে নামলো । বাড়ি ফাঁকা । শুভ্র কাল মেহের কে নিয়ে ও বাড়িতে গেছে । কর্তারা বোধহয় ঘরে এখনো । ফুরফুরে মেজাজে ড্রয়িং রুম হতেই গলা বাড়ালো মেঘা....

" মনি , আদ্র ভাইয়া ওঠে নি এখনো ?

কিচেন হতে জবাব দিলেন শাহিনা কাবির ।

" না , বৃষ্টি হচ্ছে তো । ঘুমোচ্ছে তাই । ডাকিস না...

" ভার্সিটি যাবে না ?

" এই বৃষ্টিতে যাবে কি ? যেতে হবে না আজ । গেলে পরে দেখা যাবে । এখন ডাকিস না ওকে....

মেঘা সায় পেলো । গদগদ হয়ে এক ছুটে উপরে উঠলো আবার । আদ্রের ঘরের দরজায় কান পাতলো একবার । ওঠে নি মনেহয় । বৃষ্টিমুখর ঠান্ডা ওয়েদারে জমজমাট ঘুম দিচ্ছে । মেঘার বৃষ্টিতে ভেজার সখ জেগেছে । আদ্র উঠলে পরে ভিজতে দেবে না । একেই জ্বর নামছে কদিন পর পর । এখন বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর বাঁধবে না , তার কি গ্যারান্টি ? কিন্তু মেঘার বড্ড ইচ্ছে করছে ভিজতে । এখন এই খুঁতখুঁতে মনকে শান্ত করার জন্য ইচ্ছে টাকে প্রাধান্য না দিলেই নয় ।

মেঘা প্রথমে শাফাহ্ কে ডাকলো....

" টুকটুকি , এই টুকটুকি ? দেখ কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে । ওঠ না , ছাদে যাবো । দুজনায় একটু ভিজবো বৃষ্টিতে । শুনছিস আমায় ? ওঠ প্লিজ...

এই কুম্ভকর্নের বোন । ওঠঠঠঠ....

ঐ মেয়ের তো সাড়া নেই । না চড়চড় । গায়ে চাদর টেনে আরো আয়েশে তলিয়ে গেলো ও ।

মেঘা হাল ছাড়লো । ছটফটিয়ে ঘর থেকে বেরোলো । পা টিপে টিপে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোতেই মুখোমুখি আহিয়ান । মেঘা থামলো সহসা । ধরা পড়ে অধর ভিজিয়ে পিটপিট করে বললো....

" গুড মর্নিং,জিজু ।

" গুড মর্নিং,মেঘা । ওদিকে কোথায় যাচ্ছো ?

মেঘা থতমত খায় । ধীরে বলে....

" ছাদে যাচ্ছি ।

" বৃষ্টি হচ্ছে তো ।

" তাইতো যাচ্ছি । কাউকে বলো না প্লিজ । আদ্র ভাইয়ার কানে গেলে রক্ষে থাকবে না । গুনে গুনে পাঁচ মিনিট ভিজবো শুধু , পাক্কা । তার পরেই নিচে নেমে আসবো ।

আহিয়ান ফিক করে হাসে । মোলায়েম কন্ঠে বলে....

" আচ্ছা, বলবো না কাউকে । যাও । তবে বেশিক্ষণ ভিজবে না । জ্বর আসবে নয়তো । একেই অসুস্থতা লেগে আছে । ঠান্ডা পানি , এতো সকালে ভেজা ঠিক হবে না ।

মেঘার মুখো মন্ডল দীপ্ত হয়ে ওঠে । পুলকিত স্বরে বলে....

" থ্যাংক ইউ জিজু ! বেশি ভিজবো না । শুধু পাঁচ মিনিট । তুমি কিন্তু কাউকে বলবে না । আমি আসছি....

আহিয়ান কে পাশ কাটিয়ে ধড়ফড়িয়ে ছাদে উঠলো মেঘা । আহিয়ান ঠোঁট কামড়ে নিলো । মেঘা চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই ঘর হতে বেরোলো রৌদ্র । চোখ ফোলা , রক্তিম বর্ন ধারন করেছে দৃষ্টি যুগল ।

সারা রাত্রি চোখের পাপড়ি এক হয় নি , সেটা আর কে জানে আপন মন ব্যতীত । ঐ ইডিয়ট টা তো ওকে জ্বালাতে পারলেই বাঁচে । মন মস্তিষ্ক সবখানে গেড়ে বসে মজা লুটছে । ধুঁকে ধুঁকে পুড়িয়ে ক্ষত বিক্ষত করছে বেপরোয়া ছেলের অবাধ্য হৃদয়কে ।

রৌদ্র ঘর হতে বেরিয়ে ঘাড় ডলে নাক টানলো । কপাল গুটিয়ে ফেললো আহিয়ান । রৌদ্রের ভাবগতিক দেখে চোখ তীক্ষ্ণ করলো । পরক্ষনে মুখশ্রী শিথিল করে বললো....

" আরে রৌদ্র , উঠে পড়েছো ? গুড মর্নিং ।

এতো সকাল সকাল উঠলে যে ? তোমার ও কি বৃষ্টিতে ভেজার ক্রেভিং হচ্ছে নাকি ? মেঘা তো সবাইকে লুকিয়ে ছাদে উঠলো । আমাকে বললো কাউকে যেনো না বলি । যাও যাও, তুমিও যাও ছাদে । কাউকে বলবো না আমি ।

রৌদ্র ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে । আহিয়ান হাসি ঠেলে আবার বলে....

" আমার অফিস আছে , ছুটি নেই ভাই । এই বৃষ্টিতে ভিজে অফিসে বেরোতে হবে আমায় । নতুবা এই রোমান্টিক ওয়েদারে হয়তো বউ বাচ্চা , নয়তো বৃষ্টিকে বেছে নিতাম । আসি আমি.....

যা শোনানোর ছিলো , তা শোনানো শেষ । পিছু ফিরে ওষ্ঠ চেপে ধরলো আহিয়ান । বড় বড় ধাপে নিচের সিঁড়ির দিকে এগোলো ।

রৌদ্র কিয়ৎ কাল থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে । মেঘার প্রসঙ্গটা মাথায় ঠিকঠাক ধরা দিতেই চোয়াল শক্ত করলো । কাল‌ রাতে প্রতিজ্ঞা করেছে , ঐ ইডিয়ট টাকে দেখা মাত্রই চার নম্বর থাপ্পর টা গালে বসাবে ওর । সারারাত স্বস্তি মেলে নি এক দন্ডের জন্যেও ।

একেই অস্থির সে , তার উপর ঐ মেয়ের চেহারা এক পলকের জন্য দুচোখের সামনে পায় নি রাত বিরেতে । রোজ রোজ সাক্ষাৎ করে ঘুমানো অভ্যাস হয়ে গেছে এই কদিনে । গত পাঁচ বছরের বিরহের অবসান ঘটিয়ে একটুই তো কাছে পেয়েছে । তাও কাছে পেয়েও কেবলই এক পলক করে দেখার আবদার জুড়েছিলো । তাও রাখলো না ঐ ইডিয়ট । অস্থিরতা সংবরণ করবে কিভাবে ?

রৌদ্রের খিটখিটে মেজাজ চড়ে ওঠে । কেবলই সকালের অপেক্ষায় ছিলো সে । হাত মুঠো করে গজগজ করে ছাদের দিকে পা বাড়ায় ।

একবিংশী এ নাগাদ বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে । পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে খোলা আকাশের তলে নিজেকে বিলিয়ে দিতে উন্মাদ রমনী ।

চারদিকে কেবলই ঝিরঝিরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ । মুখোরিত আশপাশ ঝমঝম শব্দে । বৃষ্টির কোমলতা ঠেকিয়ে দূর আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে একটু আধটু । তবে তা কেবলই মাঝে মাঝে ।

মেঘা পুরো ভিজে একাকার । কতদিন পর নিজেকে এমন মুক্ত মনে হচ্ছে । ইচ্ছে করছে উড়ে যেতে । দুহাত মেলে বৃষ্টি কে আলিঙ্গন করছে রমনী । ঠোঁটের কোণ হতে সরছে না উচ্ছ্বাসিত হাসির রেখা । ছাদে পানি জমেছে রাতভর বৃষ্টি হওয়ার দরুন । এখন বেড়েছে আরো বেশি । মেঘা ছলাৎ ছলাৎ করে পুরো ছাদে চক্কর কাটে । লাফিয়ে চলে । গুনগুন করে তাল মিলিয়ে গলা চিরে গায় আর নাচে বৃষ্টির ছন্দে....

" Re beh ki chali , main toh beh ki chali

Re kehti chali main to kehti chali,,

Re meghaaa......

Nanna re Nanna re Nanna re.... Na Na re....

Nanna re Nanna re Nanna re.... Na Na re....

রমনী ব্যাস্ত গানের সাথে তাল মেলাতে । বৃষ্টির দমকা শব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে তার কন্ঠসুর ।

শরীরের সাথে লেপ্টে বসে গেছে পড়নের কাপর । হাঁটু ছড়ানো কেশ গুলো ভিজে লেপ্টে জুড়ে গেছে একটার সাথে আরেকটা । কপাল চোখে মুখে আছড়ে আছড়ে পড়ছে দীঘল জবজবে কেশগুচ্ছ । মেঘা একাই মাতিয়ে রেখেছে নিজেকে ।

ছাদের দরজায় যে একজন থমকেছে , তা রমনীর চোখে ধরা দেয় নি । সেই প্রথম দিনের মতো আজও মেঘার নাচের তালে মূর্ত বনলো তার বেপরোয়া স্বামী । খেই হারিয়ে সমস্ত রাগ ভুলে পলক হীনা তাকিয়ে রইল কাকভেজা রমনীর উন্মাতাল ছন্দের পানে ‌।

মুখ ফাঁক কিছুটা । চোখ জোড়ার সাথে সাথে বিমূর্ত পুরো শরীর । স্থবির সে । বৃষ্টির চেরা চেরা ফোঁটা ঝাঁপসা করে দিচ্ছে নৃত্যরত রমনীকে । রৌদ্র শুল্ক ঢোক গেলে । সেদিন এভাবেই দেখেছিলো মেঘাকে । তবে শুকনো গোধূলি লগ্নে । আজ আবার দেখলো । তবে আজ ভেজা প্রভাত লগ্নে ।

হাত পুড়িয়েছিলো সেদিন । আর আজ দহন বাড়লো হৃদয়ের । শ্বাস প্রশ্বাস হলো জোরালো ।

ভেজা রমনীকে এ অবস্থায় দেখে পাথরের ন্যায় জমে গেলেও পাথরের ভেতর চলতে লাগলো উত্তাল ঝড় । ঢোক গিললো রৌদ্র ।

চোখ নামিয়ে খিচে রেখে শ্বাস টানলো দরজা চেপে ধরে । ঠোঁট ভিজিয়ে সামান্য বিরতি নিয়ে সামনে তাকালো আবার ‌ । শ্বাস হয়ে এসেছে জোরালো ।

মেঘার দিকে পূনরায় তাকানোর মাঝেই হঠাৎই আকাশ কাঁপিয়ে বিদ্যুতের ঝলকানি দিয়ে উঠলো দূরে কোথাও । বজ্রপাতের তীর্যক আলো ছ্যাত করে পড়লো ধরনীর বুকে । মেঘা মুহুর্তেই থামে । বজ্রপাতের বিকট শব্দ হওয়ার আগেই ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে দুহাতে চেপে ধরে কান । খিচে নেয় দু'চোখ । পাক্কা তিন সেকেন্ড বাদ বাজ পড়ার‌ শব্দ হলো বিকট ।

ততক্ষণে মেঘা কে কেউ টেনে নিয়েছে নিজের বাহুডোরে । বিকট শব্দের ভয়ে তটস্থ হয়ে তাৎক্ষণিক ঘাপটি মেরে কারোর বুকের মাঝে সেপ্টে লুকিয়ে পড়লো মেঘা । মস্তিষ্ক তখনো শূন্য । শব্দ হওয়ার সাথে সাথে কেঁপে উঠে খামচে ধরলো কারোর বুকের কাছের টি শার্টের অংশ । কারোর প্রসস্থ বুকের মাঝে লুকিয়ে ফেললো আপন সত্ত্বাকে । সেই জন দুহাতে আগলে, জাপটে নিয়েছে ওকে ।

মুহুর্ত কয়েক পেরোলো । সম্বিত ফিরলো একবিংশীর । পিটপিট করে চোখ খুললো । উঠলো নড়েচড়ে । নিজেকে কারোর বক্ষের অন্তরালে আবদ্ধ দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো । দ্রুত মাথা তুললো । নড়চড় করে খানিক আলগা হওয়া মাত্রই ভেসে উঠলো রৌদ্রের নিরেট তামাটে ভেজা মুখো ভঙ্গিমা ।

মেঘা পুনরায় ছলকে ওঠে । দ্রুত বেগে পেছাতে চায় । তবে পারে না । এর আগেই কানে বাজে রৌদ্রের তপ্ত ধমক....

" ইডিয়ট , মরতে এসেছিস এই বৃষ্টিতে ? নাকি আমাকে মারতে এসেছিস ? লাইটনিং হচ্ছে । আর তুই ধেই ধেই নাচছিস এখানে ? যদি কিছু হয়ে যায় তোর ?

🟥 প্রায় ৪৫০০ শব্দ । আর দিলাম না আজ । বাকি টুকু পরবর্তী পর্বে থাকবে ‌। আর সেদিনের স্পয়লার টুকুও । রেসপন্স পূর্ণ করবেন জলদি । 🟥

#চলবে…………

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন