#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৭০
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
আগামী ১৬ই মার্চ সারার বিয়ে । হাতে মোটে সাত থেকে আট দিন আছে । দুপুরের দিকে শিকদার বাড়ি থেকে রেহানা শিকদার আর তার স্বামী এসেছিলেন দাওয়াত দেওয়ার জন্য । হাতে সময় কম । বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়েছে হুট করেই ।
তবে শোনা গেলো বিয়ের কথা চলছিলো অনেক আগে থেকেই । প্রথম থেকেই সারার দ্বিমত ছিলো বিয়েতে । কি যে হলো মাঝপথে,, মেয়েটা হুট করেই রাজি হয়ে গেলো । ছেলে ভালো । জবও ভালো ,, বর্তমান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে রয়েছে ।
বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হচ্ছে । ছয় মাস আগে সম্বন্ধ এসেছিলো ছেলের বাড়ি থেকে । তখন থেকেই সারার দ্বিমতের জন্য ঝুলে ছিলেন তারা । তবে হাল ছাড়েন নি । আর এখন এসে গেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ , যখন সারা হঠাৎ করেই রাজি হয়ে গেলে এই বিয়েতে ।
তারিখটাও ঠিক করা হলো তাৎক্ষণিক । ছেলে পক্ষ থেকে সময় নিতে চাননি তারা । ঘরোয়া ভাবে বউকে ঘরে তুলতে চেয়েছিলেন । কিন্তু সারার মা বাবা রাজি হননি । ছোট মেয়ের বিয়ে । বড় মেয়ে তো কান্ড ঘটিয়েছে । এই মেয়ের বেলায় তারা সব দিক বিবেচনা করে তোড়জোড় চালিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন ।
সপ্তাহের মাথাতেই বিয়ে । কাবির ম্যানসন থেকে দাওয়াত দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বিকেল গড়িয়েছে ।
তাদের পিছু পিছু মেঘাও রৌদ্রকে নিয়ে বেরিয়েছে শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে । মেঘার কাছে সবটা ঘেঁটে যাচ্ছে । সারার হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না সে । মেয়েটা চাপে পড়ে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিলো না তো ?
ওরা শিকদার বাড়িতে পৌঁছায় । কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দেয় ইভা । ভেবেছিলো আব্বু আম্মু এসেছে । কিন্তু না, রৌদ্র আর মেঘাকে দেখে চোখে মুখে আঁধার নামলো ওর । নিশ্চয়ই রেহানা শিকদার'রা কাবির ম্যানশন থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও ইনভাইট করতে গেছেন । মেঘা আর রৌদ্র আগেই পৌঁছেছে এ বাড়িতে ।
ইভাকে দেখে জোর পূর্বক হাসলো মেঘা । মেকি খাতির করলো....
" ভালো আছো আপু ?
" আছি ভালো ! তা তুই হঠাৎ ? কি দরকার ?
ইভার খিটখিটে স্বর । রৌদ্র মাড়ি খিচে ধমকালো....
" এই নাগিন, আমাদের কি দরকার আছে-নেই, সেটা তোকে কেনো বলবো ? সর সামনে থেকে ।
মেঘা কে টেনে বাড়ির ভেতর ঢুকলো সে । মেঘা শুধোয়....
" আপু, সারা কোথায় ?
" রুমে !
মেঘা উপরে ছুটতে চাইলো । দমলো আকস্মিক । রৌদ্র সোফায় পা তুলে বসেছে ততক্ষণে । একপাশে জাবির বসে আছে । খেলছে আপন মনে ।
ইভাও দরজা আটকে সোফার দিকেই এগোচ্ছে । এরা তিনটে একসাথে থাকবে এখন ?
একবিংশী সবটা লক্ষ্য করে গাল ফুলিয়ে ডাকলো....
" আপনি ওখানে বসলেন কেনো ? আসুন আমরা সাথে !
" উমমম সুইটহার্ট,, তুমি যাও । কথা শেষ করো , আমি এখানেই আছি ।
" না , আমার সাথেই আসবেন আপনি । আসুন বলছি....
ইভা মুখ বাঁকায় । গা জ্বলে যায় এমন মাখো মাখো আদিখ্যেতায় । কিড়মিড় করে ওঠে সে....
" তুই বড্ড গায়ে পড়া হয়েছিস মেঘা ! এমন ভাব করছিস, যেনো তোর স্বামীকে আমরা খেয়ে ফেলবো । দুনিয়াতে কি তোর একলারই স্বামী আছে নাকি ?
রৌদ্রের সহ্য হলো মোটেও ।
" ইউ নাগিনের ঘরের নাগিন,,, তোর কত্ত বড় সাহস, তুই আমাকে খাওয়ার চিন্তা ভাবনা করিস ? ছ্যাহহহহ্ ! গাল ফাটিয়ে দেবো একদম । টাকলা বর কোথায় তোর ? তাকে খেতে পারিস না ? তোরও তো আছে এক সরকারি চাকরি ওয়ালা । লাভ কি ? আমার মতো তো আর নয় ।
আমার মতো একটা চিজজ থাকলে তো আর এখানে পড়ে থাকতি না । বাই দ্যা ওয়ে,, সুইটহার্ট প্রেম প্রেম পাচ্ছে তোমার ? কাছে ডাকছো যে ?
রৌদ্রের বাড়াবাড়িতে মেঘা নাক ফুলিয়ে কটমট করে তাকায় । ঠোঁট ভেঙে হাসে রৌদ্র । উঠে দাঁড়িয়ে একবিংশীর পিছু নেয় । মুখোমুখি হয়ে চোখ ঘুরিয়ে ইভার দিকে তাকায় । পরক্ষণে আবারো মেঘার দিকে ফিরে নাক সিটকে বলে.....
" MP,, পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি কোথা থেকে ? ইশশ্, কি পুড়ছে বলতো ?
" চুপ করবেন আপনি ? চলুন আমার সাথে !
রৌদ্র ঠোঁট কামড়ে হাসে । নিচ থেকে দাঁত কিড়মিড়িয়ে হিসহিসিয়ে ওঠে ইভা....
" নাটক যত্তসব । বুঝি না আমি ?
" এই নাগিন,,, নাটক বুঝতে হবে না তোকে । দেখবি কিছু ? ওয়েট ক্লাইম্যাক্স দেখাই । দেখ, জ্বল আর লূচির মতো ফোল....
কথা টুকুনি বলেই একদন্ড বিলম্ব করলো না । আগাম বার্তাহীন হুট করেই ঝুঁকে এসে একবিংশীর কোমল ওষ্ঠ জোড়া আঁকড়ে ধরলো বেপরোয়া যুবক । শক্ত চুমু বসালো দীর্ঘ সময়ের । মেঘা আঁতকে ওঠে আকস্মিক কান্ডে । ডাগর চোখ জোড়া বিষ্ময় আর লজ্জায় বৃহৎ হয়ে আসে তার । দ্রুত রৌদ্র কে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে । ততক্ষণে অনেক দেরি । রৌদ্র আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ওকে । দাপুটে হাতে জড়িয়ে নিয়েছে নম্রকটি । কসরত করেও বিফল হয় রমনী । সুপ্ত অনুভূতিতে কুন্ঠিত হয়ে বুজে নেয় আঁখি যুগল । খামচে ধরে লোকটার পিঠের অংশ ।
এদিকে ইভা পুরো তাজ্জব বনে যায় । হা বনে হতবাক হয়ে চায় চোখ গোল গোল করে । নিমেষহীন নয়ন সিঁড়ির নিকট দাঁড়ানো দুটো উন্মত্ত নর নারীর পানে ।
এপাশে সময় নিয়ে আশ মিটিয়ে সরে আসে রৌদ্র । বৃদ্ধা আঙ্গুলে নিজের ওষ্ঠ জোড়া স্লাইড করে ফিচেল হাসে । মেঘা তখনো আহম্মক । মূর্ত বনে দাঁড়িয়ে আছে । রৌদ্র ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচাতেই সম্বিতে ফিরলো একবিংশী । তড়াক করে ইভার দিকে দৃষ্টি ফেরালো ।
মারাত্মক লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো নাজুক মেয়েটা । রৌদ্রের দিকে কিড়মিড় করে রাগ ঝাড়লো বাহুতে একটা ছোট্ট আঘাত বসিয়ে । উচ্চারণ করলো কন্ঠ চিপে....
" অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া, ইরিটেটিং, রাইনো মুখো,,, আই হেইট ইউ ।
কথা টুকুনি বলেই উদ্যত এলোমেলো কদমে ছুটলো উপরের দিকে । রৌদ্র শব্দ করে হাসে । বিপরীতে চেঁচিয়ে বলে....
" বাট আই লাভ ইউ সভ্য মেয়ে । এন্ড থ্যাংকস ফর ইট । দিস টেস্টস ইনসেইন, সুইটহার্ট...
ইভার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো অতঃপর । ইভা হাত মুঠিয়ে ফুঁসে ওঠে । ঝট করে টেনে কোলে তোলে জাবির কে । হিসহিসিয়ে উঠে অহমিকায় কদম বাড়ায় রুমের দিকে ।
সারার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মেঘা । এপাশ ওপাশ লক্ষ্য করে দেখলো, সারা ঘরে নেই । খোলা বারান্দায় বসে রকিং চেয়ারে দোল খাচ্ছে বিষন্ন মেয়েটা । মেঘা সেদিকে এগোয় । বারান্দার পর্দা সরিয়ে আহত চোখে পরখ করে উদাসীন মেয়েটাকে । ডাকে মিহি কন্ঠে....
" সারা ?
ছটফটিয়ে ওঠে সারা । ঘাড় ঘুরিয়ে মেঘাকে দেখে হেসে ওঠে । তেড়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ।
" মেঘা, তুই, কখন আসলি ?
" এক্ষুনি !
" হঠাৎ ? আগে বলিস নি তো !
" তুইও তো আগে বলিস নি , যে বিয়ে করছিস !
সারার মুখখানি চুপসে এলো । মেঘাকে ছেড়ে ফিকে হাসি টানলো ঠোঁটে । বললো দম ফেলে.....
" বিয়ে তো হুট করে ঠিক হয়ে গেলো । আগে বলার সময়ই পাইনি । ভেবেছিলাম আম্মু আব্বু বলে আসার পর তোকে ফোন করবো রাতে । কিন্তু তুই তো তার আগেই আমার কাছে চলে আসলি । জানাস নি কেনো আগে ? একা এসেছিস ? নাকি রৌদ্র ভাইয়া নিয়ে এসেছে ? অবশ্য রৌদ্র ভাইয়া তোকে একা ছাড়লে তবেই না একা আসবি । কোথায় ভাইয়া ?
" আগে বল তুই ঠিক আছিস তো ? বিয়ে করছিস সারা ? হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত ?
" ওমা, বিয়ে করবো না ? হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেইনি তো, খুব ভেবেচিন্তেই নিয়েছি । একদিন না একদিন তো বিয়ে করতেই হতো । আজ হোক বা কাল , হয়েই যাক । হলে পরে যদি মুক্ত হই কিছু স্মৃতির বেড়াজাল থেকে । তাহলে মন্দ কিসে ?
মেঘার আহত নয়ন জোড়া প্রকম্পিত হয় । সে সারার বাহু আঁকড়ে ধরে টেনে এনে চেয়ারে বসায় । নিজে হাঁটু গেড়ে মুখোমুখি হয়ে মেঝেতে বসে.....
" সারা,, তুই এমন কেনো হ্যাঁ ? আমি জানি তোর ভেতর কি চলছে, যথেষ্ট বুঝতে পারছি । তাহলে তুই সব কষ্ট চেপে এতোটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছিস কেনো নিজেকে ? গুমড়ে মরছিস ভেতর ভেতর ?
" মরছি না আর । মানুষ বারবার মরে না । আমি সব ভুলতে চাই মেঘা । সেই চেষ্টাতেই আছি ।
" তাই বলে যাকে তাকে বিয়ে করবি ?
" যাকে তাকে তো করছি না । আব্বু আম্মু খোঁজ নিয়েছে, শুনেছি ছেলে যথেষ্ট ভালো । দেখতেও নাকি সুন্দর ।
" দেখিস নি ?
" উহু ,, শুনেছি ।
" শুধু শুনেছিস ? দেখিস নি তাকে, কথা বলিস নি, ফেস করিস নি সামনাসামনি,, তাহলে বুঝলি কি করে ? ভালো বলছিস কি করে তাকে ?
" তোর ভাইয়াকেও তো দেখেছিলাম, কথা বলেছিলাম, বছরের পর বছর ফেস করেছিলাম সামনাসামনি, তবুও তাকে বুঝলাম না যে ? বোঝাতেও পারলাম না । সেও বুঝলো না নিজে থেকে । এটা বোধহয় আমার ব্যর্থতা , পোড়া কপাল , তাই না ? দেখি এ কপালে কি আছে । আমি নসিবে বিশ্বাস রাখি মেঘা । যা হবার তা হয়েছে । আর ভবিষ্যতে হবেও । তুই এতো টেনশন করছিস কেনো বলতো ? আরে চিল কর , আমার বিয়ে সামনে । তোর একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে । ওওও সরি, শাফাহ্ও তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো । ভুলেই গেছিলাম । বাই দ্যা ওয়ে,,, তুই কিন্তু চারদিন আগে আসবি আমার কাছে । তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই । কে থাকবে আমার সাথে ?
মেঘা মূর্তির মতো চেয়ে রয় । এই মেয়ে বড্ড ধৈর্যশীল । হাসছে দেখো ! আলতো স্বরে বলল একবিংশী.....
" সারা,,, আমার মনে হয় তোর ফিওন্সের তোর সাথে একটাবার কথা বলা উচিত । সে কেমন বোঝা উচিত । আঙ্কেল আন্টি তো ভালোই প্রশংসা করলো, শুনলাম । কিন্তু তোর বোঝা উচিত সবার আগে । তুই জীবন শুরু করবি তার সাথে । একটা অপরিচিত মানুষের সাথে হুট করেই মানিয়ে নিবি কি করে তুই ? ভেবে দেখ ।
" আমি সহজেই সবকিছু মানিয়ে নিতে পারি, তুই খুব ভালো করেই জানিস । সো, আমাকে নিয়ে অযথা টেনশন করিস না তো মেঘা । আমি একদম ঠিক আছি । নতুন স্বপ্ন বুনছি মনে মনে । আমার সংসার টা বোধহয় খুব সুন্দর হবে , দেখে নিস । যেযনই হোক না কেনো,, আমি সুন্দর করে সাজিয়ে নেবো । একদম আমার মনমতো । চেনা মানুষের অচেনা রুপের থেকে ভালো, একটা অচেনা মানুষকে ধীরে ধীরে চিনে নেওয়া । তিনি আপাতত অচেনাই থাক । তাকে আমি ধীরে ধীরে চিনতে চাই । বুঝতে চাই । ভালো হলে তো আলহামদুলিল্লাহ । আর কিছু চাওয়ার থাকবে না ।
বলেই বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । মেঘা নিষ্ক্রিয় নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে দেখলো শুধু । হার মেনে বললো কিয়ৎ কাল বাদ......
" আচ্ছা কথা বলতে হবে না । কিন্তু ওনাকে একটাবার দেখবি তো ! ফটো নেই ? তোকে দেখায় নি কেউ ?
" ফটো নেই আমার কাছে । আম্মুর কাছে আছে বোধহয় । তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন গত কাল । কন্ঠ শুনেছি শুধু । দেখিনি চোখ তুলে । কালকেই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়েছে ।
" শুনলাম অনেক আগে থেকেই তারা সম্বন্ধ নিয়ে ঘুরছিলেন ?
" হুঁ ,,, তখন রাজি ছিলাম না ।
মেঘা মৃদু হাসলো । সারার দুহাত জড়িয়ে নিয়ে বললো আবেগাপ্লুত হয়ে.....
" দেখবি,,, তুই খুব সুখি হবি । যা কল্পনাও করিস নি কখনো , তাই পাবি ! তুই খুব ভালো সারা । তোকে ভালো না বেসে থাকা যায় কি করে ? দেখবি, সে তোকে খুব বেশি ভালোবাসবে । তোর ভাবনার থেকেও বেশি ।
সারা কেবলই তাল মিলিয়ে হাসলো মৃদুমন্দ ।
,,,,
শাফাহ্'র ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল এগারোটা বেজেছে । পিটপিট করে চোখ খুললো মেয়েটা । শরীর নাড়াতে পারছে না যন্ত্রণায় । যেনো কোমল তন্বীর প্রতিটি খাঁজে ব্যাথা ধরেছে । শক্ত মার্বেলের কনকনে মেঝেতে পড়ে ছিলো সারারাত । বেহুঁশ ছিলো ঘুমের ঘোরে । তীব্র মাথা যন্ত্রণা থেকে কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি । সারাটা রাত কেটেছে বেঘোরে ।
এখন ঘুম হালকা হতেই উঠে বসলো মেয়েটা । ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো মৃদু স্বরে । পেট চেপে ধরলো সাথে সাথে । খেয়েছে আগের দিন বিকেলে । তাও যত্তসব বাজে খাবার । সেসবে রুচি আসে না । রাঁধতেও পারে না । প্রত্যেক বেলার খাবার অর্ডার দেওয়া হয় বাইরে থেকে । সেসব আজেবাজে খেয়ে পেট ভরে নাকি ? সেই এক খাবার ! ভাতের দেখা মেলেনি আসার পর থেকে ।
বড্ড খিদে পেয়েছে । চুইচুই করছে পেট । শাফাহ্ ঘুমের ঘোরে নিজের অবস্থান দেখে নেয় । গোটা রাত এই দরজার সামনে মেঝেতেই পড়ে ছিলো । নড়েনি একটুও । দরজা ভেতর থেকে বন্ধ এখনো । তারমানে ইয়াশ ও আর খোঁজ নিতে আসেনি । ভাবতেই তিরষ্কার করে হাসলো মেয়েটা ।
উঠে দাঁড়িয়ে দূর্বল কদম বাড়িয়ে ঢুকলো ওয়াশ রুমে । একেবারে ফ্রেশ হয়ে ঘর ছাড়ে সে । চোখ মুখ ফুলে একাকার । ফোলা ফোলা নিভু চোখে পাশের ঘরের দিকে তাকালো শাফাহ্ । ডোর লক । লোকটা এতক্ষণে বেরিয়ে গেছে নিশ্চয়ই ।
দ্বিতীয় বার তাচ্ছিল্য করে হাসলো রমনী । হাই তুলতে তুলতে কিচেনের দিকে এগোলো । ফ্রেশ খাবার নেই হয়তো । চুলা জ্বালাতে পারে , আগের রাতের কিছু খাবার বেঁচে গেলে সেসব গরম করে খাওয়া যাবে ।
ফ্রিজ ঘেঁটে দেখলো, শুকনো ব্রেড আর জেলি ব্যাতীত কিছুই নেই । মেয়েটা মলিন মুখে দুটো নিয়ে বেরিয়ে এসে ডাইনিংয়ের একপাশে বসলো পায়ে পা তুলে ।
ব্রেডে জেলি মাখিয়ে মুখে তোলার আগেই দৃষ্টি পড়লো টেবিলের মাঝ বরাবর । দুটো ক্যাসারোল পাশাপাশি ।
শাফাহ্ চিকচিক করে ওঠে । হয়তো বেঁচে যাওয়া খাবার আছে । আর যাই হোক,, পেট তো ভরবে এতে ।
তড়িঘড়ি করে ঢাকনা সরানো মাত্রই তাজ্জব বনে যায় মেয়েটা । গরম সবজি একটাতে । অন্যটা খোলা মাত্রই আরো বেশি আশ্চর্য হলো । ঘিয়ে ভাজা পরোটা গরম গরম । উষ্ণ ধোঁয়া ছড়াচ্ছে । সাথে লোভ লাগানো সুঘ্রাণ ।
নিজের পছন্দ মতো খাবার দেখে পেটের খিদে চুইচুই করে তড়তড়িয়ে বাড়লো মেয়েটার । ঢোক গিললো সে । আগপিছ না ভেবেই হামলে পড়লো খাওয়ার জন্য । পরোটা হাতে তুলতেই থমকে গেলো কিছু একটা ভেবে । চুপসে ছোট হয়ে এলো মুখখানি । প্রশ্ন জাগলো,,, কে বানালো এই পরোটা আর সবজি ? ঐ বদমাইশ লোকটা ?
শাফাহ্ কালকের কথা ভেবে ওষ্ঠ উল্টায় । সে ভোলেনি কিছু । লোকটা ধমকেছিলো । মারতেও চেয়েছে বিনা দোষে । মনে পড়তেই হাতের পরোটা খানা আগের ন্যায় ক্যাসারলে ছুড়ে ফেললো সে । নাক টানলো । সে খাবে না কিছুতেই । ঢাকনা আটকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো টেনে হিঁচড়ে । লোভ লাগলেও ঠিক সামলে নিলো ।
এদিকে পেটের খিদে বাঁধা সয় না । খিদের চোটে শুকনো পাউরুটিতে জ্যাম মাখিয়ে মুখে তোলে মেয়েটা । খেতে খেতে আহত লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে রয় ক্যাসারল দুটোর দিকে ।
ইয়াশ বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় বিকেল চারটে ।
দরজার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই পা থমকালো তার । কুঞ্চিত হয়ে এলো দৃষ্টি । ডোরের ঠিক পাশেই এক গুচ্ছ হলুদ গোলাপ । বেশ বড়সড় একটা বুকে ।
চোখ সরু করে ইয়াশ । পরক্ষণে চোয়াল দাবিয়ে পা দিয়ে সজোরে এক লাথি মেরে বুকেটা ছুড়ে ফেলে বাইরের দিকে । গন্ডি ছাড়িয়ে গার্ডেনের দিকটায় আছড়ে পড়ে ফুলগুলো । ইয়াশ বেশি ভাবে না । হয়তো ফুল গুলো সম্পর্কে কিছু একটা ঠাহর করলো । দরজা খুলে ঢুকলো ভেতরে ।
তাকালো আশপাশ । ঘরের দিকে প্রথমে । দরজা ফাঁক করে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিলো । শাফাহ্ নেই রুমে । নিশ্চয়ই লাউঞ্জে আছে ।
ফ্রেশ হওয়া প্রয়োজন আগে । ইয়াশ শার্টের বোতাম গুলো খুলতে খুলতে পাশের ঘরের দিকে কদম বাড়ালো । আচমকা চোখ পড়লো ডাইনিংয়ের উপর ।
ঝকঝকে স্ফটিক টেবিলের ঠিক মাঝ বরাবর সকালে রেখে যাওয়া ক্যাসারল দুটো ঠিক একই অবস্থানে আছে এখনো । ভ্রু কুঁচকে এলো তপ্ত যুবকের । ততক্ষণে ঠোঁটের কোণে ভিড় জমিয়েছে ক্ষিণ তৃপ্ত হাসি । গটগটিয়ে এগিয়ে গেলো দেখার জন্য । একটা ক্যাসারল তুলতেই ভারী অনুভূত হলো । ললাটের সুক্ষ্ম ভাঁজ গাড় হলো এতে ।
চটপট ঢাকনা খুলে দেখা মাত্রই সংকুচিত হলো নিরেট মুখাবয়ব । সবজি ঠিক যেভাবে রেখে গেছিলো, ঠিক সেভাবেই আছে এখনো ।
আরেকটাতে পরোটা । সেটাও খুলে দেখলো ইয়াশ । এটার অবস্থাও অভিন্ন । মোটে আটটা পরোটা বানিয়েছিলো নিজ হাতে । ভোর ভোর ওঠার পর কি একটা ভেবে যে এসব করেছে কে জানে ? মেয়েটা খায়নি সারারাত । সকালে দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও ফিরে এসেছে ইয়াশ । ডিস্টার্ব করেনি । রাখেনি ভেতরকার খবর । নিজেও কিচ্ছু খায়নি রাতে । কিচেনে কফি বানাতে গিয়ে আচমকা এসব করার চিন্তা এলো মাথায় । মনে হলো বাড়ির মতো করে কিছু একটা বানানো উচিত । মেয়েটা এসেছে থেকে নাক সিটকে বাইরের খাবার গিলছে কোনো রকমে । বিন্দুমাত্র অভিযোগ করে না সে ।
ইয়াশও গুরুত্ব দিচ্ছে না ওর দিকটা । আজ দেওয়ার ইচ্ছে হলো । সে রাঁধতে পারে মোটামুটি । তবে শাফাহ্ কে নিয়ে আসার পর থেকে এসব ভুলেছে । হসপিটালেও ছুটতে হচ্ছে । ফিরে এসে আর এনার্জি পায় না কিছু করার মতো । আগে একলা ছিলো । চলতো কোনো রকমে । তবে এখন জুটেছে আরেক অকর্মণ্য । কিচ্ছুটি পারে না ।
নিজের চিন্তার আগে ওর চিন্তা করে বাইরে থেকে দু বেলা খাবার অর্ডার করে ইয়াশ । আজ ইচ্ছে হলো না বাইরে থেকে অর্ডার করার ।
সেই সাত সকালে হসপিটালে যাওয়ার আগে গরম গরম পরোটা আর সবজি বানিয়ে রেখে তবেই গেছে । আটটার মধ্যে একটা খেয়েছে সে । রেখে গেছিলো বাকি সাতটা । যেগুলো আস্ত আছে এ অবধি । তার মানে ঐ মেয়ে খায়নি এখনো । দেখেনি নাকি ?
ইয়াশের মুখ জুড়ে বিস্তর তফাৎ পরিলক্ষিত হলো । বিরক্তি ফুটলো স্পষ্ট । ফ্রেশ হওয়া বাদ দিয়ে দম্ভ ভরে পা চালালো লাউঞ্জের দিকে ।
পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে শাফাহ্ । গুনগুন করছে আপন খেয়ালে । ইয়াশ পেছনে দাঁড়িয়েই তপ্ত ঝাড়ি মারলো.......
" এইইই মেয়ে ,,, এখানে কি করছো তুমি ?
শাফাহ্ চমকে ওঠে । তড়াক করে ঘাড় ঘোরায় । সেকেন্ড কয়েকের মাথায় সামলে নেয় ভড়কানো ভঙ্গিমা । মুখ ফিরিয়ে বলে স্বাভাবিক কন্ঠে.....
" নৌকা চালাচ্ছি !
" হোয়াট ?
বুঝতে পারলো না ইয়াশ । শাফাহ্'র দৃষ্টি বরাবর পুলের নীলচে পানির দিকে তাকানো মাত্রই ঝুলে এলো চোয়াল । পুরো পুল জুড়ে বেশ কয়েকটা কাগজের সাদা নৌকা ছোট ছোট । মেয়েটা একলা বসে বসে এসব বানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে জলে । ইয়াশ ওর বাচ্চামো দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । চিবিয়ে বললো......
" খাওনি কেনো ?
" খেয়েছি তো !
" কি খেয়েছো ?
" জ্যাম পাউরুটি ।
" পরোটা আর সবজি ছিলো, দেখোনি ?
" দেখেছি ।
ভনীতা হীন জবাবে রাগ বাড়লো যুবকের । ঝেড়ে উঠলো....
" তাহলে সেসব খাওনি কেনো স্টুপিড ? জ্যাম পাউরুটি খেয়ে আছো এখনো অবধি ?
শাফাহ্ নির্বিকার । ভাবান্তর হীন । জবাব করলো না । মুখ ভোঁতা করে রেখেছে । উঠে দাঁড়িয়ে গা ঝেড়ে ইয়াশ কে পাশ কাটিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াতে গেলে টেনে ধরলো ইয়াশ । প্রত্যেক বারের ন্যায় কাঁধের কাছের টিশার্টের গিট্টু টা মুঠোবন্দী করে টেনে ধরলো ।
বাঁধা পেয়ে নরম মুখাবয়ব কুঁচকে জড়ো করলো শাফাহ্ । চোখ তুলে লম্বাটে দানবীয় লোকটার দিকে তাকালো । তাৎক্ষণিক হিসহিসিয়ে উঠলো তপ্ত যুবক.....
" টকেটিভ লেডি,,, কথা বলো ! জবাব দিচ্ছো না যে ? আছো কেনো চুপ করে ? খাওনি কেনো ? সকাল সকাল ঘুম ছুটিয়ে হাত পুড়িয়ে রান্না করলাম কার জন্য আমি ?
ইয়াশের শেষ কথাটায় শাফাহ্ ছ্যাঁত করে উঠলো । দ্রুত বেগে নজর দিলো যুবকের হাতের পানে । বিচলিত হয়ে দুহাত টেনে নিলো । উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে বলতে লাগলো ভড়কানো গলায়.....
" হাত পুড়িয়ে ফেলেছেন ? কোথায় পুড়েছে ? দেখি....
ইয়াশ আঁখি লতা নাকের ডগা বরাবর কুঁচকে ফেলে । মেয়েটার এমন ছটফটে উদ্বিগ্নতা দেখে বিস্মিত হলো সে । শাফাহ্ ওর অক্ষত দুহাত দেখে শুধোয় চোখে চোখ রেখে.....
" কোথায় পুড়েছে ?
এ বেলায় তপ্ত যুবক নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে নরম কন্ঠে জবাব দেয়....
" পোড়েনি ,, কথার কথা বললাম । তুমি খাওনি কেনো ?
" এমনি । খেতে ইচ্ছে করে নি । ভালো লাগেনি ।
মেয়েটা দৃষ্টি নত করেছে আবার । ইয়াশ বুকে আড়াআড়ি ভাবে গুটিয়ে নিলো দুহাত । ফের গলা চড়িয়ে বললো.....
" সেদিন না ব্রেকফাস্টে পরোটা খেতে চাইলে ? তাহলে আজ খেতে ইচ্ছে করে নি কেনো ?
" আমার জন্য বানিয়েছেন ?
" উঁহু, আমার জন্য । রেখেছিলাম তোমার জন্য ।
" নিজের জন্য বানিয়েছেন তো নিজে গিয়ে খেয়ে নিন । আমার জন্য কেউ রাখতে বলে নি আপনাকে । ভাবছেন কেনো আমার কথা ?
শাফাহ্ ভেজা কন্ঠ চিরে অভীমান উগড়ে দিয়ে যুবক কে পাশ কাটিয়ে প্রস্থান করলো । ও চলে যেতেই ভারী শ্বাস ফেললো ইয়াশ । মেয়েটার যাওয়ার পথ লক্ষ্য করে বামে দৃষ্টি নামাতেই ছলকে উঠলো । পুলের পাশের বেতের সোফাটায় একটা ফাইল রাখা । ইয়াশ নিজের খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা চিনতে পেরে ধড়ফড়িয়ে ওঠে । ছলাৎ করে পুলের দিকে তাকায় । পেপারে বানানো কতগুলো নৌকা ভাসছে । মোটে দশ বারোটা তো হবেই । তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে কিছু একটা আন্দাজে আসতেই ধক্ করে উঠলো তপ্ত যুবক । তার সুদূরপ্রসারী এলোমেলো চিত্ত ভেবে নিলো অনেক কিছু ।
দ্রুত পুলে ঝাপ দিয়ে একে একে সব গুলো কাগজের নৌকা জড়ো করে উঠে আসলো । ভিজে একাকার প্রত্যেক টা কাগজ । ধারে বসে অবান্তর চিন্তায় থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে ইয়াশ । কম্পিত হাতে আলগোছে একটা ভেজা কাগজের ভাঁজ খোলে । কাগজের কোন লেখাই বোঝা যাচ্ছে না । পানিতে ভিজে ঘেঁটে গেছে কালো কালি । নরম হয়ে ভেঙে আসছে ।
ইয়াশ ধীরে ধীরে সন্তর্পণে প্রত্যেক টা কাগজ খোলে । একই অবস্থা সবগুলোর । পুরো ঘেঁটে ঘ । লেখাগুলো ছিড়িবিড়ি হয়ে গেছে ।
এসব দেখে উদ্ভট ধারনায় চোখ খিচে মাথা চেপে ধরলো যুবক । এই ফাইলে ওর সব ইম্পর্ট্যান্ট কাগজপত্র আছে । ডক্টর হওয়ার সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে সবকিছুই । আর ঐ বোকা মেয়েটা নিশ্চয়ই কাগজ খুঁজতে গিয়ে এই ফাইল খুঁজে পেয়েছে । ভেতরকার কাগজপত্র দিয়েই এই বাচ্চামো গুলো করেছে নিশ্চয়ই !
ভাবতে গিয়ে ক্ষোভে মাথাটা বিগড়ে গেলো ইয়াশের । চোয়াল খিচে নিলো শক্ত করে । বিভৎস রাগে ফেটে পড়লো । ঠিকড়ে বেরোলো শিরা উপশিরা । দমলো না আর ।
সারাটা দিন জ্যাম পাউরুটি খেয়ে কাটিয়েছে শাফাহ্ । এখন আর পারলো না । খিদের কাছে সব মান অভিমান ঢলে পড়লো । সব বিষাদ ঠেলে লাউঞ্জ থেকে এসেই খেতে বসেছে আয়েশ করে । চেয়ারে পায়ে পা তুলে পরোটা ছিড়ে তৃপ্তি করে খাচ্ছে বেশ ।
এমন সময় হেঁচকা টান পড়লো কনুইতে । মেয়েটাকে এক টানে চেয়ার থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে কোনো কিছু বিবেচনা না করেই সপাটে একটা থাপ্পর বসালো ইয়াশ । আকস্মিক আছড়ে পড়া আঘাতের টাল সামলাতে না পেরে মেয়েটা ছিটকে পড়লো মেঝেতে । দূর্বল মাথাটা ঝিমঝিমিয়ে চক্কর দিয়ে উঠলো । ঝিঁঝিঁ ধরলো কান সহ সর্বাঙ্গে ।
ভারী আঘাতের চোটে নিমিষেই আঁখি দ্বয়ের টলটলে পানি উজাড় হয়ে বাঁধ ভাঙলো । মুখের খাবার আর নামলো না গলা দিয়ে । মেয়েটা চকিতে তাকালো ইয়াশের দিকে । মাত্রাতিরিক্ত রাগে গিজগিজ করছে লোকটা । পুলে নামার দরুন শরীর ভিজে একাকার,, টপাটপ পানি ঝড়ে পড়ছে মার্বেলের মেঝেতে । বিলম্ব না করে নমনীয় মেয়েটাকে টেনে দাঁড় করালো উন্মাদ যুবক । কনুই ঠেসে হিড়হিড়িয়ে টেনে এনে গর্জে উঠলো বজ্রকণ্ঠে....
" স্টুপিড গার্ল,,,, পাগল তুমি ? মাথা খারাপ ? বোঝো না কিছু ? নাটক করো স্টুপিড ? বাচ্চা তুমি ? নৌকা চালাবে ? কোন সাহসে আমার ইম্পর্ট্যান্ট ফাইলে হাত দিয়েছো ? বলো.....
বোকা রমনী চমকায় । চোখ ঝাপসা । ঝরঝরিয়ে পানি ঝরে । বোঝে না কিছু । ফুঁপিয়ে ওঠে ! লোকটার এমন অগ্নিমূর্তি দেখে ঢোক গিলে বলে থেমে থেমে....
" ক....কি করেছি আ....আমি ?
" কি করেছো জানো না ? নির্বোধ হওয়ার ভান করো ? বাচ্চা সাজো,, খুব ইনোসেন্ট তুমি ? বাচ্চাদের মতো নৌকা বানিয়ে খেলেছো কি দিয়ে বলো ? কাগজ কোথায় পেয়েছো ? আমার ফাইল ধরার পারমিশন কে দিয়েছে তোমায় ?
মেয়েটা হেঁচকি তুললো । বড্ড কসরত করতে হলো শ্বাস নেওয়ার জন্য । হাঁসফাঁস করে শ্বাস টেনে ধেয়ে আসা কান্না গিলে বুলি ফুটালো....
" আ..আমি আপনার ফাইলে হাত দেইনি । দেখেছি শুধু.....
" চুপপপ,,, মেরে সোজা করবো একদম ।
আমার পুরো ক্যারিয়ার আছে ঐ ফাইলে, বুঝলে ? কটা কাগজ বের করেছো ওখান থেকে ? বাপ মা পড়াশোনা করায় নি ? বুদ্ধি নেই কেনো মাথায় ? নষ্ট করার আগে দেখোনি কেনো কাগজগুলো ? কোন স্পর্ধায় আমার জিনিসে হাত দিয়েছো তুমি ? কি কি বের করেছো ফাইল থেকে ?
চিবিয়ে কথাগুলো ঝেড়ে মেয়েটাকে ঝাড়া মেরে দূরে সরিয়ে দিলো ইয়াশ । নমনীয় মেয়েটা চিবুক নামিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে এবার । কপোল খানার তীব্র জ্বলনে কান্নার বেগ বাড়ে । চেঁচিয়ে ওঠে.....
" আমি নষ্ট করিনি কোনো কাগজ !
ড্রয়ারে স্ক্র্যাপ পেপার ছিলো । সেসব দিয়ে নৌকা বানিয়েছি আমি । ছুঁই নি আপনার ফাইল । বের করিনি কোনো কাগজ । দেখাই নি কোনো স্পর্ধা ।
এটুকুনি বলেই মেয়েটা শব্দ করে ফুঁপিয়ে এক ছুট লাগালো ঘরের দিকে । ইয়াশ থমকে যায় । ক্রোধিত টকটকে মুখাবয়বে কিঞ্চিত বদল আসে । রমনীর কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে সে । ঠোঁট ভিজিয়ে দু কদম পিছিয়ে তড়তড়ে তেজি কদমে ফের লাউঞ্জে যায় । ফাইলটা হাতে তুলে খুলে দেখে । কড়কড়ে সব কাগজপত্র খুঁটিয়ে অবলোকন করে উল্টে পাল্টে । সব ঠিক আছে । কমতি নেই কোনো পেপারে । সব কাগজপত্র একসাথে বাঁধা আছে এখনো ।
ইয়াশ বিমূঢ় হয়ে গেলো । তার রাগান্বিত সত্তা নিভে এলো দপ করে । মেয়েটার কথা গুলো কানে বাজলো ঝনঝনিয়ে । সবটা বোধগম্য হওয়া মাত্রই ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কপালের দুপাশ ঠেসে ধরলো সে । নিজের উপর চরম ক্ষুব্ধতায় দাঁত মুখ চেপে ধরলো । এভাবে বাড়াবাড়ি করার আগে ফাইল টা খুলে দেখলেই হতো । তা করেনি সে ।
ক্রোধের বশে ভুলেই গেছিলো, ফাইলটা গত কাল সে নিজে এখানে রেখেছে কিছু কাগজ খুঁজতে গিয়ে । ঘরে নিয়ে যাওয়ার কথা মনেই ছিলো না ।
মেয়েটা ঠিক বলেছে । আগপিছ না ভেবেই বেকার বেকার নিষ্পাপ রমনীর উপর রাগ ঝাড়লো যুবক । অকারণে আঘাত করলো চড়িয়ে ।
ইয়াশ নিজের উপর ফুঁসে ওঠে । চ সূচকে বিরক্তি প্রকাশ করে নিজের উপর । বিড়বিড় করে.....
" শিটটট্ । বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি এবারে ।
থামলো না আর ।
শাফাহ্ ঘরে এসেছে থেকে বালিশে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । হেঁচকি উঠে গেছে অতিরিক্ত কান্নার দরুন । ইয়াশ ওর কাছে আসলো আরো মিনিট বিশেক পর । পুরো ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে ফিটফাট হয়ে এসেছে । ঘরে ঢুকেই দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । বাজে পাঁচটা । ঠোঁট ভিজিয়ে পরক্ষণে বিছানার দিকে দৃষ্টিপাত করলো সে । বোকা মেয়েটা উবু হয়ে শুয়ে ফোপাচ্ছে । গলা খাঁকারি দিলো ইয়াশ । উপস্থিতি বুঝতেই রমনী কান্না আটকায় মুখ চেপে ধরে । ফোঁপানির শব্দ বিলিন হতেই নিস্তব্ধ হয় পুরো ঘর । ইয়াশ আলগোছে এগিয়ে শিয়রের কাছে বসে । ডাকে আধো স্বরে......
" ওঠো ।
শাফাহ্ মাথা তুললো না । পাশ ফিরে তাকালোও না । বরং গুটিয়ে গেলো আরো বেশি । ইয়াশ ওর কাঁধের কাছের গিট্টু টা মুঠোবন্দী করে টেনে ধরে আবার বলে.....
" উঠতে বলছি তো,, ওঠো !
এবারে ছটফট করলো শাফাহ্ । উঠে বসে ঝাড়া মেরে লোকটার হাত ছাড়িয়ে নিলো । চোখ মুখ লাল টকটকে । ভিজে জবজবে । এলোমেলো খুচরো চুল গুলো লেপ্টে আছে ভেজা মুখে । উল্টানো তার ওষ্ঠ জোড়া । ফর্সা কপোল দুখানি টমেটোর মতো টকটকে দেখাচ্ছে । ইয়াশের দৃষ্টি জোড়া পলক ফেলতে ভুললো আকস্মিক । রমনীর এমন ক্রন্দনরত ভেজা ভেজা আবেদনময়ী রুপে স্তম্ভিত হলো তপ্ত যুবক ।
ওদিকে মেয়েটা নাক টেনে দুহাতের আজলে মুখ মুছলো । বললো ঝাইঝাই করে......
" আবার কি করেছি আমি ? একবার মেরে শান্তি হয় নি ? মন ভরেনি ? মারবেন আবার ?
সম্বিত ফিরলো যুবকের । দ্রুত পলক ঝাপটে চোখ নামালো । উঠে দাঁড়ালো । ঠোঁট চুবিয়ে বললো......
" ফ...ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে এসো । বেরোবো এক্ষুনি ।
" পারবো না । যাবো না আমি কোথাও ।
" আচ্ছা ফ্রেশ হতে হবে না । সময় নেই ,,, এভাবেই চলো ।
বলেই চেপে ধরলো শাফাহ্'র হাত । বড্ড তাড়া তার । হাতে টান পড়তেই চেঁচিয়ে ওঠে রমনী.....
" বলেছি তো যাবো না । ছাড়ুন আমায় ।
" তোমার অমতের ধার ধারি আমি ? জোর করতে বাধ্য করো না । চলো,,, দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
" যাবো না আমি । মেরে বালি চাপা দেওয়ার ধান্দা করছেন ? ছাড়ুন আমায় ! কোথায় নিয়ে যাবেন ?
" হানিমুনে নিয়ে যাবো তোমায় পাখি । চলো হানি,,, হানিমুনে যাই ।
ঠোঁট কামড়ে ভনীতা হীন বলে বসলো যুবক । মুখ থেকে প্রথম এমন বাক্য খসলো তার । তার এহেন অভাবনীয় কথায় শাফাহ্'র ভেজা চোখ জোড়া উঠলো কপালে । চক্ষু হলো চড়কগাছ । ভ্যাট ভ্যাট করে হা বনে হতবাকের ন্যায় চাইলো সে । ঘন ঘন পলক পড়লো চোখে । ললিতাঙ্গ স্থির হয়ে গেলো পুরো । ইয়াশ ওর এমন ভয়ার্ত অবস্থা দেখে ওষ্ঠপূটে দাঁত বসায় । ভয় বাড়িয়ে রমনীর দিকে ঝুঁকে পড়ে,, হাস্কি টোনে ফিসফিসিয়ে বলে আবার.....
" যাবে হানিমুন ? বিয়ে করেছো, হানিমুন করবে না ? কি পরিমান অলস হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই ফেলে রাখি আমরা ! উঁহু, ভেরি ব্যাড । অনেক হয়েছে । আর অলসতা নয় । সইছে না আর । সবকিছু সেরে আসি গিয়ে । চলো হানি......
#চলবে.........