ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৭২তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৭১_৭২

#সুরভী_আক্তার

বাজে বিকেল চারটে । অফিস থেকে ফিরেই মেহেরের পিছে তদারকি করতে লেগে পড়েছে শুভ্র । মেয়েটার অসুস্থতায় বেশ কতকগুলো ঔষধ দেওয়া হয়েছে । সময় মেপে খেতে হয় সেসব । চারটের সময় ছিলো একটা । শুভ্র সেই সাড়ে তিনটের সময় হাজির হয়েছে বাড়িতে । এই মেয়েকে বিশ্বাস নেই । মনে করে ঔষধ খাবে না । ভুলে গেলে বাহানা দেখাবে হাজার । শুভ্র নিজে ওর সব দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে । বাড়ির কারোর উপর সঁপে দেয় নি স্ত্রীকে ‌।

হাজার ব্যস্ততা থাকলেও ঠিক সময় করে বাড়ি ফিরে আসে । নিচে সিঁড়ি পাশের একটা ঘরে শিফট করেছে ওরা । মেহের কে ঔষধ খাইয়ে পাশাপাশি ফোন হাতে নিয়ে বসলো শুভ্র । খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে রমনী । শুভ্র কাছে জিরিয়ে বসতেই সে মুখ খুললো.....

" আমাকে বাড়িতে রেখে এসো । আমি কটা দিন ও বাড়িতে থাকবো । এর পর বেশি অসুবিধা হলে তো যেতে পারবো না । এখন রেখে এসো ।

চকিতে তাকালো শুভ্র । ধীরুজ স্বরে বললো....

" এখন না । বেবি হোক, তারপর ।

" বেবি এখন হবে নাকি ? হতে হতে এখনো আট মাস । ততদিন যাবো না ও বাড়িতে ? এখন সুস্থ আছি আমি । তুমি আমাকে এক্ষুনি রেখে এসো । আমি আর থাকবো না এখানে ।

রমনীর খিটখিটে স্বর । মাতৃত্বকালীন এই সময়ে নাকি হাজার পরিবর্তন আসে । মুড সুইং হয় ক্ষণে ক্ষণে । মেজাজ বিগড়ে যায় সহজেই । মেহেরের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে হয়তো । বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে সরল মেয়েটার মাঝে । নমনীয় মেয়েটা ক্ষণে ক্ষণে রেগে যায় আজকাল । বকে ফেলে ভুলভাল । তার উপর গত কদিনের টেনশন আর চাপে রমনী আরো বেশি রগরগে হয়ে থাকে সর্বক্ষণ । সায়ানের খোঁজ খবর জোগাড় করতে পারে নি বিধায় শুভ্রর উপরও চেঁতে ছিলো । এমন আচরণই করছে বেশ কদিন ধরে । বারবার ও বাড়িতে যাওয়ার কথা পাড়ছে ।

শুভ্র ওর কথাগুলো গায়ে মাখলো না বেশি ।

" মেহের,,, বোকামো করছিস ‌। ডক্টর তোকে রেস্টে থাকতে বলেছেন । ও বাড়িতে গেলে দেখাশোনা কে করবে তোর ? তোর মাঝে এখন অন্য আরেকজন বেড়ে উঠছে । ভুলে যাস কেনো এটা ‌? তারও তো খেয়াল রাখতে হবে । তার সাথে সাথে এই বেখেয়ালি মেয়েটাকে কার ভরসায় ছাড়বো আমি ?

" আমার আম্মু আছে !

" আন্টি নিজেই সায়ানের চিন্তায় নাজেহাল ।

" তাহলে ভাইয়াকে খুঁজে বের করছো না কেনো ?

" তোর কি মনে হয়, হাত গুটিয়ে বসে আছি আমি ? খোঁজ না পেলে আমি কি করবো ? খোঁজ বের করার মতো ও কোনো পথ রাখেনি ।

মেহের ঝিমিয়ে এলো । ছলছল করে উঠলো আঁখি যুগল । ভয়ে ভয়ে বললো ঢুকি চিপে.....

" আমার ভাইয়া ঠিক আছে তো ?

রোজ রোজ এক প্রশ্ন করতে একটুও খামতি রাখে না এই মেয়ে । শুভ্র বারবার এক উত্তর করে । আশ্বাস দেয় । এবারও দিলো । স্ত্রীর হাত দুখানা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বললো উল্টো পিঠে চুমু এঁকে.....

" মেহের,, ও একদম ঠিক আছে । কতবার বলবো আমি ? বুঝতে চাস না কেনো বলতো ? এমনি এমনি কি তোকে গাধা বলি ? আমাকে দেখ,, আমি টেনশন করছি ? এতো সহজে শান্ত আছি কি করে আমি ? কারন, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর । সায়ান ঠিক আছে । ও বাচ্চা নয়, যে নিজের ক্ষতি করে বসবে । ওর এ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উইথড্র করা হচ্ছে । এ কদিনে বেশ কবার টাকা উঠিয়েছে ও । ওর যদি কিছু একটা হয়েই যেতো , তাহলে কে করতো এসব ? সায়ান কে পাগল ভাবিস তুই ? যে ও নিজের ক্ষতি করবে ! অবশ্য ও পাগলই । পাগলটা একবার ফিরে আসুক, প্রেম বের করবো ওর আমি । যে ওকে বোঝেনি, তার জন্য কেনো ও সবাইকে নাস্তানাবুদ করবে ?

শুভ্র কথা শেষ করতেই দরজার কাছ থেকে রিনরিনে রমনী কন্ঠ ভেসে আসলো.....

" ভাইয়া, আসবো ?

ধড়ফড়িয়ে তাকালো শুভ্র । আকস্মিক শাফাহ্'র কন্ঠের টোন কানে বাজলো বোধহয় । এমন মনে হলো , যেনো তার বোন ডাকলো । কতদিন শোনা হয় না সেই ডাক । দেখা হয় না নির্ভেজাল বোকা বোকা মুখখানা । ডাক কানে পড়তেই শুভ্রর চিত্ত ধক্ করে উঠেছে মুহুর্তেই । তবে ধারনা ভুল । মেঘা দাঁড়িয়ে আছে দরজার নিকট । হাতে ট্রে । শুভ্র চোখ বন্ধ করলো এক মুহুর্তের জন্য । পরক্ষণে ঢোক গিলে সম্মতি দিলো....

" আয় ।

মেঘা ভেতরে ঢোকে । ট্রেতে ফল কেটে রাখা । রুবিনা কাবির পাঠালেন ওকে দিয়ে । বেড সাইড টেবিলের উপর ট্রে খানা রাখতে রাখতে বলল সে.....

" মেহের আপুর জন্য মা ফল কেটে পাঠালো । খেয়ে নাও আপু ।

মেহের নাক টেনে ভেজা চোখের কার্নিশ মুছে নেয় ।

শুভ্র ট্রে তুলে বিছানার একপাশে রাখলো । দ্বিতীয় বার আর তাকালো না মেঘার দিকে । মেঘা দুজনকে দেখে নেয় কুঞ্চিত দৃষ্টিতে । কথা খুজে বলে আমতা আমতা করে.....

" আপু,, খেয়ে নাও ।

" ও খেয়ে নেবে । তুই যা ।

শুভ্রর কেমন কঠিন বাক্য । মেঘা মলিন করলো মুখখানা । বললো শুকনো কন্ঠে.....

" আমার উপরেও রেগে আছো ভাইয়া ?

" তোর উপর রেগে থাকার কোনো কারণ নেই । রেগে নেই আমি ‌। যা....

" ভাইয়া !

" শুনছি । আর কিছু বলবি,, বল ?

মেঘা একটু এগোলো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে অপরাধী সুরে বলল ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে.....

" ভাইয়ার হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি । প্লিজ ক্ষমা করে দাও ।

" একজন ভুল করবে,, একজন ভুলে সঙ্গ দেবে, একজন সেই ভুলের জন্য বুক চেরা কষ্ট পাবে, আর আরেকজন এসে কিনা ক্ষমা চাইবে ? আর আমি , ক্ষমা করবো আমি ? আমি কে ক্ষমা করার ? ভুল কি আমার সাথে হয়েছে ?

মেঘা দৃষ্টি নত করে । শুভ্র বলে রাশভারী গলায়.....

" তোর উপর আমার কোনো রাগ নেই মেঘা । ক্ষমা করার ও কেউ নই আমি । তবে হ্যাঁ,,, আমার সায়ানের যদি ভুল করেও কোনো ক্ষতি হয় , তাহলে তোর ভাই আর ভাইয়ের বউ, কাউকেই ক্ষমা করবো না কোনো দিন । সায়ানের তো দোষ ছিলো না এতে । বিনা দোষে ওকে কেনো শাস্তি পেতে হলো ? ভালোবাসাটা কি অপরাধ ছিলো ? ঐ মেয়েটা কেনো বুঝলো না ওকে ? ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার জন্য জোর করলো, আর ও রাজি হয়ে গেলো ? সুখে থাকার বর্ননাও দিলো । কেনো ? খুব সুখে আছে ও ? দু্ঃখে থাকলে হয়তো আজ ওকে ফেরানোর চেষ্টা করতাম ‌। সায়ান কে নিরুদ্দেশ হতে দিতাম না ।

মেঘা জড়োসড়ো হয়ে আসে । চিবুক মিশিয়ে নেয় গ্রীবায় । শুভ্র হাঁফ ছেড়ে বলে গলা চড়িয়ে.....

" বাদ দে এসব । মেহেরের রেস্টের প্রয়োজন । ওর সামনে এসব কথা তুলতে চাইছি না আমি । আর কিছু বলবি তুই ?

একবিংশী বিনয়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো । আর থামলো না । জোর কদমে বেরিয়ে আসলো রুম থেকে ।

,,,,,

“The Dolder Grand” ,, জুরিখের অন্যতম বিলাসবহুল পাঁচ তারকা রিসোর্ট । খানিক আগে এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করার পর সোজা এই হোটেলে উঠেছে ইয়াশ আর শাফাহ্ । দীর্ঘ এগারো ঘন্টার জার্নি । প্রি বুকিং ছিলো আগে থেকেই ।

আসার পথে প্রায় গোটা সময়টা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে শাফাহ্ । সেই যে প্লেনে ওঠার পর পর চোখ বুজেছে । মাঝে একবার জেগেছিলো । ঘুমিয়েছে আবার । আর টের পায় নি । এ যাত্রায় তার চোখ খুলেছে একেবারে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন শহরে, ল্যান্ড করার পর । ঘুমানোর আগে হাজার বার প্রশ্ন করেছে, কোথায় যাওয়া হচ্ছে এই নিয়ে । তবে ইয়াশ উত্তর করে নি । শাফাহ্ও আর ঘাটে নি । তবে মনে খুঁতখুঁতুনি ছিলো বড্ড । মন বলছিলো, যেনো সে দেশে ফিরতে পারবে । ফিরতে পারবে আপন দের ভিরে । ইয়াশ হয়তো ওকে সারপ্রাইজ দিচ্ছে । মেয়েটা পুরো সারপ্রাইজড হতে চেয়েছিলো ।

তবে হতে পারলো না । যখন দেখলো সে ভিন্ন দেশে এসেছে ‌। এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করার পর থেকে মুখে কুলুপ এঁটেছে পুরো । আর শুধোয় নি অবস্থান সম্পর্কে । এপাশ ওপাশ নজর বুলিয়ে বিভিন্ন সাইনবোর্ড দেখে বুঝেছে , তার বর্তমান অবস্থান সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ।

মেয়েটা খানিক অবাক হয়েছে এতে । সুইজারল্যান্ডে তো রৌদ্র ভাইয়া থাকতো । তবে কোথায় থাকতো , তা জানা ছিলো না ।

জুরিখে তখন প্রায় সন্ধ্যা গড়াচ্ছে । ছয়টা পেরিয়েছে বোধহয় । রিসোর্টে এসেই ফ্রেশ হয়েছে ইয়াশ ‌। একজন স্টাফ এসে ওয়েল কাম ড্রিঙ্কস সহ, অর্ডার করা কিছু খাবার দিয়ে গেছেন । শাফাহ্ ওয়াশ রুমে । মিনিট বিশেকের লম্বা শাওয়ার নিয়ে বেরোলো । চিবুক কাঁপছে ঠান্ডায় ।

ইয়াশ দাঁড়িয়ে আছে রুমের বিশাল খোলা ব্যালকনিতে । আল্পস পর্বতমালার বিশুদ্ধ হীম শীতল বাতাস ছুঁইয়ে দিচ্ছে তার দাপুটে চওড়া শরীর খানাকে । সূর্যি ডুবতেই জুরিখ শহরের বুকে জ্বলে উঠেছে লাখো কোটি নিয়ন আলো ।

তপ্ত যুবকের গলায় তখনো ভেজা টাওয়েল ঝোলানো । ফোনে ইম্পর্ট্যান্ট কিছু করছে মনযোগ দিয়ে । ক্ষণে ক্ষণে কানে ঠেকিয়ে কথা বলছে কারোর সাথে । চোখে মুখে গাম্ভীর্য ভাব,, অস্বাভাবিকতা কিছুটা ‌। যেনো চিন্তায় অস্থির ।

রমনী ব্যালকনিতে উঁকি দিলেও পাত্তা দেয় নি ওকে । খিদে পেটে খাবার দেখে লোভ সামলাতে পারেনি এক মুহুর্ত । চুলে টাওয়েল পেঁচিয়ে খেতে বসেছে সবার আগে ।

ইয়াশ ঘরে আসতে আসতে ওর খাওয়া শেষ । যা ছিলো, সব গিলেছে ‌। পেট টইটুম্বুর । জোর পূর্বক সবটা খেয়েছে । জেদ চেপে ইয়াশের জন্য রাখে নি কিচ্ছুটি ।

কঠিন যুবক ঘরে আসলো আরো মিনিট পাঁচেক পর । শাফাহ্ তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে । ঝুঁকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে পরখ করছে । প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পর নিজের এই ফকফকে চেহারা খানা ঠিকমতো দেখলো আয়নায় । ও বাড়িতে আয়না নেই । কেনো নেই জানা নেই । শাফাহ্ কখনো শুধোয় নি । ইচ্ছেও জাগে নি ।

আজ এতো দিন পর নিজেকে দেখে কেমন অসহায় লাগলো তার । চেহারায় কেমন বিষন্ন ছাপ,, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে,, চোখের নিচাংশ দেবে গেছে, গোলাপী ওষ্ঠ জোড়া ফিকে দেখাচ্ছে । চুল গুলোও জট পাকিয়ে গুটলি বেঁধেছে । উত্তাল রমনী বোধহয় আগের মতো স্নিগ্ধ নেই । আজ নিজেকে কেমন অচেনা লাগছে তার । সেই চিরচেনা সুশ্রী মুখাবয়বে বদল এসেছে কত ।

নিজেকে এভাবে দেখে তো অভ্যস্ত নয় সে । পোশাক আশাকের ও ঠিক নেই । কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছেলেদের টিশার্ট আর ট্রাউজার পড়ে থাকে সবসময় ‌। পাগল পাগল লাগে নিজেকে ।

শাফাহ্ নিজের এমন হালাত দেখে ওষ্ঠ উল্টায় ।

দর্পনের প্রতিবিম্বে পেছনে ইয়াশ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাড় ঘোরায় । মিনমিনিয়ে শুধোয়.....

" আমাকে পাগলের মতো দেখাচ্ছে, তাই না ?

ইয়াশের তীক্ষ্ণ আঁখি । কপালে ভাঁজ বিস্তর । এই সবে বুলি ফুটলো রমনীর জবানে । যুবক তড়িতে উত্তরে বলে গম্ভীর গলায়.....

" পাগলের মতো দেখাবে কেনো ?

" শুকিয়ে গেছি , চেহারার যত্ন নেই বহুদিন, ড্রেসআপের ঠিক নেই, চুল গুলোও মরে যাচ্ছে দিনকে দিন, সব মিলিয়ে পাগলের মতোই তো হলাম ! ইশশ্, সবাই আমাকে দেখে কি ভাবে ? এজন্যই যেখানেই যাই, সবাই কেমন আশ্চর্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । পুরো ভুতের মতো দেখায় আমাকে । তাই না ?

ইয়াশের হাসি পেলো ওর কথায় । আধো অন্ধকার নেমেছে রমনীর স্থির মুখাবয়বে । তা দেখে ভালো লাগা কাজ করলো কঠিন হৃদয়ে । সে হাসি চেপে বললো....

" ভুত নয় , পেত্নির মতো দেখায় ।

" এভাবে বলছেন কেনো ? নিজের বউকে কেউ পেত্নি বলে ?

ইয়াশ ঘাড় উঁচায় । জানতে চায় আঁখি লতা কুঁচকে......

" কে বউ ?

" আমি !

" কার বউ ?

" আপনার !

" ওও , বউ তুমি আমার ?

" হেঁয়ালি করবেন না !

" আচ্ছা করলাম না ! তো আমার বউ ,, বলুন শুনি । পেত্নি না বলে কি বলবো আপনাকে ?

শাফাহ্ বোধহয় একটুখানি লজ্জা পেলো । লাজে দৃষ্টি নোয়ালো ‌। আপনি সম্বোধনের পাশাপাশি 'আমার বউ' ডাকটা বেশ ভালো লাগলো তার কাছে । ফুরফুরে হয়ে বিজ্ঞের ন্যায় বললো লাজুক হেসে....

" বউকে পরী বলতে হয় । প্রশংসা করতে হয় । একটু বাড়িয়ে বাড়িয়ে বউয়ের প্রশংসা করতে হয় । বুঝলেন ? সংসার জীবনে যদি আমি কখনো রাগ করি আপনার উপর, তাহলে আমার প্রশংসা করবেন । দেখবেন গলে যাবো । আমার প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে !

চোখ সরু করে ইয়াশ । প্রশ্নাত্মক স্বরে বলে স্বাভাবিক কন্ঠে.....

" সংসার জীবন ? আশা আছে সংসার করার ?

" ওমা, থাকবে না ? বিয়ে হয়েছে ! সংসার হবে না ? দেখবেন,, দু চারটে বাচ্চাও হবে আমাদের !

অকস্মাৎ বাচ্চার কথায় খুকখুক করে কেশে উঠলো ইয়াশ ‌ । শাফাহ্ ও সম্বিতে ফিরলো কাশির শব্দে । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত পিঠ ফিরিয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়ালো । ইয়াশ গলা ঝেড়ে বলে.....

" বাই দ্যা ওয়ে,, সব খাবার খেয়েছো ? আমি কি খাবো ?

শাফাহ্ সামলে নেয় নিজেকে । গলা ভার করে বলে.....

" আমি কি জানি । খিদে পেয়েছিলো, তাই খেয়ে নিয়েছি । আপনার চিন্তা করতে বয়েই গেছে আমার ।

রমনী ভেজা চুল মুছতে লেগে পড়লো । বেশ ভালোই শীত এদিকটায় । রুমে হিটার আছে বিধায় খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না । এতক্ষণ আধো ভেজা শরীরে ব্যালকনিতে থাকায় ইয়াশের শরীর হীম হয়ে গেছে পুরো । কাঁপছে তিরতিরিয়ে । লালচে তার ফর্সা মুখাবয়ব ।

সে ভালোমতো নিজের ভেজা চুল মুছে নিয়ে গায়ে একটা কালো হুডি জড়ালো । পরিপাটি হলো,,, বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বোধহয় ‌ । চোরা চোখে অবলোকন করলো শাফাহ্ । ইয়াশ দরজার দিকে পা বাড়াতেই নিজেকে দমীয়ে রাখতে পারলো না আর । ডেকে শুধালো.....

" এইযে,, কোথায় যাচ্ছেন আপনি ?

" বাইরে !

" বাইরে মানে ? আমাকে রেখে ? আমি একা থাকবো এখানে ?

" আমি কি জানি । তোমার চিন্তা করতে বয়েই গেছে আমার ।

রমনী মুখ বিকৃত করে ফেলে । লোকটা ওকে নকল করলো ? তপ্ত যুবক বেরিয়ে যায় উদ্যমী কদমে । শাফাহ্ মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটে বিপরীতে । আর যাই হোক,, বাইরে থেকে ডোর লক করে গেছে । ভয় নেই । প্রজ্বলিত আলো আছে এখানে । ঝকঝক করছে পুরো ঘর । শাফাহ্ বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ দম ফেলে ।

ইয়াশ ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা । ততক্ষণ ধরে রমনী বসে ছিলো একলা একা ‌। পায়চারি করেছে পুরো ঘর সহ খোলা বারান্দায় । কনকনে হিমেল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় বসে ছিলো । তারা বোধহয় পাঁচ তলার রুমে । উপর থেকে দেখতে গেলে রাতের শহরের দৃশ্যটা বেশ আকর্ষণীয় । ঝিকঝিকে আলো ।‌ পুরো চোখ ধাঁধানো সুন্দর শহর । শান্ত মনোরম পরিবেশ । ভেজাল নেই খুব একটা ।

শাফাহ্ আজ পরিপাটি করেছে নিজেকে । চুল আঁচড়ে বিনুনি গেঁথেছে । এলোমেলো নেই আজ । ঠান্ডা লাগছিলো বিধায় ইয়াশের একটা ঢিলেঢালা সোয়েট শার্ট জড়িয়েছে গায়ে ।

ওয়েল কাম ড্রিঙ্কস আর খাবারের সাথে বেশ কতকগুলো চিপস আর চকলেট দিয়ে যাওয়া হয়েছিলো হোটেল থেকে । শাফাহ্'র চিপস পছন্দ নয় খুব একটা । তবে চকলেট মারাত্মক পছন্দ । চিপসের প্যাকেটের নিচে থাকায় লক্ষ্য করেনি সেগুলো । যখন লক্ষ্য করলো, হুমড়ি খেয়ে পড়লো তখন । খাওয়া হয় না কতদিন ।

এতক্ষণ বসে বসে এসব খেয়েছে । ইয়াশ আসলো । ডিনার নিয়ে এসেছে সাথে । আসা মাত্রই ঘরের অবস্থা দেখে কপালে উঠলো চোখ । ঝকঝকে মেঝে জুড়ে এখানে ওখানে চকলেট,চিপস, এসবের প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । একপাশের সিঙ্গেল সোফাটায় পায়ে পা তুলে বসে আয়েশ করে ডার্ক চকলেট চিবুচ্ছে ঐ মেয়ে । এটাই লাস্ট । দরজার শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করলো না কোনো । নড়েচড়ে বসল আরো বেশি । ইয়াশ এসেই চোখ পাকিয়ে ঝাড়ি মারে......

" স্টুপিড,, ঘরের এ কি অবস্থা করেছো ?

শাফাহ্ গিলে নেয় । এপাশ ওপাশ ছোট চোখে তাকিয়ে অবস্থা দেখে বলে গা ছাড়া ভঙ্গিতে.....

" ডোন্ট ওয়ারি, ঝাড়ু দিয়ে দিন, পরিষ্কার হয়ে যাবে !

ক্লান্ত রাগে ফেটে পড়লো ইয়াশ......

" হোয়াট ? আমি ঝাড়ু দেবো ?

" তো কি ,,, আমি ঝাড়ু দেবো ? আমি পারবো না ওসব !

" পারবে না তো নোংরা করেছো কেনো ? ডাস্টবিন দেখোনি চোখে ? জংলি তুমি ?

ভেংচি কাটে শাফাহ্ । খেয়ে দেয়ে গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় ।দম ফেলে হাই তুলে বলে......

" ঘুমাবো আমি । আপনার অপেক্ষায় ছিলাম । ঝাড়ু দিতে পারলে দিন, নয়তো রুম সার্ভিস ডেকে ক্লিন করে নিন ।

ইয়াশ ফোঁস করে শ্বাস ফেললো কেবলই । এনার্জি নেই কিছু বলার মতো । বড্ড ক্লান্ত লাগছে । নিজেকে ধাতস্থ করে শুকনো প্যাকেট গুলো উঠিয়ে ডাস্টবিনে ফেললো সে । গায়ের হুডি খুলতে খুলতে রমনীর দিকে তাকালো । ততক্ষণে মেয়েটা শোয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে ।

" খাবে না ?

" উঁহু । পেট ভরা ।

ইয়াশের খাওয়া হয় নি । বেরোনোর পর কোথায় গেছিলো কে জানে । মলিন মুখখানা । ঝুলে এসেছে চোয়াল । একলা খেতে বসলো সে । তবে রুচি কুলালো না । দু চামচ মুখে তুলে তিক্ত স্বাদে বিকৃত করলো মুখখানা ।

রেস্ট প্রয়োজন । বড্ড ধকল যাচ্ছে মন মস্তিষ্কে । সে শুকনো নিষ্ক্রিয় চোখে বেডের দিকে তাকায় । শোবার জায়গা নেই আর । সোফাতেও শোয়ার মতো অবস্থা নেই । বড় হলে কাজ চালানো যেতো এতেই ।

শাফাহ্ শুয়েছে । ইয়াশ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফেরালো । ছোট্ট সোফাটায় ভালোমতো বসে মাথা নামিয়ে শরীর এলিয়ে দিলো । অবিসন্নতায় বুজলো দু'চোখ । শ্বাস পড়লো ভারাক্রান্ত বুক চিরে । শাফাহ্ মাথা তুলে পিটপিট করে চায় ‌। কালকের থাপ্পরের কথা ভোলেনি মোটেও ‌। রাগ হচ্ছে এখনো ‌। তবে লোকটার চেহারা দেখে কেমন মায়াও লাগছে । মনে মনে ফন্দি আঁটে রমনী । ডাকে রসিয়ে রসিয়ে....

" ওখানে ওভাবে পড়ে আছেন কেনো ? খাটে আসুন ।

ইয়াশ কপালে বিস্তর ভাঁজ ফেললো । বিরক্ত হলো মেয়েটার কথায় । চোখ বন্ধ রেখেই ঝেড়ে বললো.....

" টকেটিভ লেডি,,, চুপচাপ ঘুমাও । মাথা খেও না ।

উঠে বসে শাফাহ্.....

" মাথা খাচ্ছি না তো । আচ্ছা বলুন ,, আমরা এখানে কেনো এসেছি ?

" তোমাকে বেঁচে দেবো এই অচেনা শহরে ।

" উঁহু ,, হানিমুন করতে এসেছি । আপনি আসলেই বড্ড লাজুক । অলস ও বটে ।

মাথা তুলে দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকলো ইয়াশ । শাফাহ্ দাঁত কেলিয়ে হাসে....

" খাটে আসুন । ভয় পাবেন না । কিচ্ছু করবো না আমি আপনাকে ।

" শাট আপ স্টুপিড । কি করবে তুমি আমায় ?

" আপনি যা ভাবছেন , তাই । এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো ? আসুন বিছানায় । ওখানে অসুবিধা হচ্ছে । পুরো রাত কাটাতে পারবেন না ।

" সেটা আমি বুঝে নেবো । তুমি ঘুমাও চুপচাপ ।

" আপনি ভীতু লোক ।

আমি ভেবেছিলাম আপনি সাহসী । জোর করে বিয়ে করেছেন , কত কি ভেবেছিলাম আপনার বিষয়ে । কিন্তু আপনি মোটেও অমন নন ।

" হোয়াট ননসেন্স,,, ইভটিজিং করছো তুমি আমায় ? জোর করে বিয়ে করেছি, কথাটা মাথায় রেখো । বেশি কথা বললে মেরে সোজা করবো একদম । ঘুমাও বেয়াদব ।

চিবিয়ে বজ্র ধমক দিলো ইয়াশ । শাফাহ্ হাসি চাপে জোর পূর্বক ‌।

" শুধু মারতেই পারবেন । আর কিছু করার মুরোদ নেই । আচ্ছা ওখানেই থাকুন । আমি ঘুমাই । গুড নাইট ।

ইয়াশের দিকে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে মারলো ধূর্ত মেয়েটা । তপ্ত যুবক হা বনে যায় ওর এমন আকস্মিক অস্বাভাবিক কান্ডে । শাফাহ্ পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে । ফিক করে হাসে চাদর মুড়ি দিয়ে ।

#পর্ব_৭২

রাত্রি প্রায় বারোটা পেরোলো । এতক্ষণে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে ঐ বকবকে মেয়েটা । নড়চড় সাড়াশব্দ নেই বিন্দুমাত্র । ইয়াশ ঘুমোতে পারেনি এখনো । বসে বসে চোখ নিভিয়ে ফেলছে ‌। ঝিমুচ্ছে ঘুমের টালে । শান্তি হচ্ছে না বসে থেকে । এভাবে কি আরাম পাওয়া যায় নাকি ?

আর পারা যাচ্ছে না । বসে থাকা দায় ‌। মানছে না শরীর ।

সে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো । রুম ক্লজেট থেকে দ্বিতীয় আরেকটা চাদর বের করে বিছানার দিকে এগোলো । শাফাহ্ একপাশে আছে । সে দূরত্ব রেখে অন্যপাশে নিজের জায়গা করে নিতেই পারে । আর যাই হোক, ওরা স্বামী স্ত্রী । এতো দ্বিধা মানতে নেই । অনায়াসে সীমা ছাড়াতে পারে সে । আর এখানে তো সীমার মধ্যেই ।

দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে মাঝে একটা কোলবালিশ রেখে আরেক পাশে শরীর এলিয়ে সমস্ত ভার ছেড়ে দিলো যুবক । পেরেশানিতে বড্ড ক্লান্ত সে ‌। নরম তুলতুলে বিছানায় দাপুটে শরীর খানা যেনো তলিয়ে গেলো তার । এতক্ষণে আয়েশ পেলো । মনে হলো ভাসছে হাওয়ায় । দূর্বল চোখ দুটি নিভে এলো খুব সহজেই । উবু হয়ে শুয়ে মাথার বালিশ খানা দুহাতে আকড়ে ধরে প্রশান্তিতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো সে ।

চোখ লেগে ঘুম সবে ধরা দিয়েছে মিনিট দশেকের মাথায় । বেঘোরে তলানোর আগেই আকস্মিক ধাক্কায় খাট থেকে ছিটকে মেঝেতে আছড়ে পড়লো যুবক ‌। হুট করেই অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে গেলো বোধহয় । মেঝেতে পড়া মাত্রই আহ্ সূচকে মৃদু কুকিয়ে উঠলো সে । অকস্মাৎ চোখের ভারী পাপড়ি মেলে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো । তখন তার অবস্থান ঠান্ডা মার্বেলের মেঝেতে ‌। ডান হাত দিয়ে চেপে ধরেছে কপাল । হাত সরাতেই ঝাঁপসা চোখের সামনে ছোপ ছোপ লাল তরল পরিলক্ষিত হলো । খাট থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে বেড সাইড টেবিলের কোণে কপাল ঠোকা খেয়েছে । টানটান নরম চামরা চিরে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে নিমিষেই । ইয়াশ ঘুম ঘুম চোখে তা দেখা মাত্রই দ্বিতীয় বার আহ্ সূচক মৃদু শব্দ করে উঠলো । চিনচিনে ব্যাথায় খিচে নিলো দাঁত ।

শাফাহ্ ভড়কায় । চাদরের নিচে মাথা তার । পিটপিট করে দেখছে অন্ধকার । ঢোক গিললো শুল্ক । ভয়ে ভয়ে চাদর সরিয়ে মাথা বের করে একটু খানি উঁকি দিলো । মেঝেতে বসে লোকটা । হাতের তালুতে রক্তের ছাপ দেখা মাত্রই হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো চঞ্চলা রমনী । ছ্যাত করে উঠেছে তার কোমল বক্ষস্থল । মেয়েটা সব ফেলে তেড়ে এলো......

" এ কি ,, আপনার কপাল কাটলো কি করে ?

বিচলিত হয়ে পড়লো রমনী । ইয়াশ বুঝতে পারে না । ঘুমের টালে কি করে বিছানা থেকে হেলে পড়লো , মাথায় আসলো না । ভার হয়ে আছে মস্তিষ্ক । ব্যাথায় কিঞ্চিত বদলে যাওয়া মুখাবয়বের ভঙ্গিমা পরিবর্তন করে স্বাভাবিক করলো সে ।

" আ...আমি ঠিক আছি !

" না,,, ঠিক নেই আপনি । রক্ত বেরোচ্ছে তো । আ'ম সরি । আমি বুঝতে পারিনি । দেখি উঠে বসুন । আমি বরফ লাগিয়ে দিচ্ছি ।

ইয়াশ কে তুলে খাটে বসালো সে । রুমে মিনি ফ্রিজ আছে একটা । কোল্ড ড্রিঙ্কস, ঠান্ডা পানি, সব আছে । ছটফটিয়ে আইস কিউব বের করে রমনী । আলগোছে টিস্যু পেপারে মুড়িয়ে যুবকের কপালের কাটা অংশে চেপে ধরে তড়িঘড়ি হাতে ।

ক্ষতস্থান চিনচিন করে উঠতেই দাঁতে দাঁত চেপে চোখ খিচে নিলো ইয়াশ । শাফাহ্ ব্যাথিত নয়নে তাকায় । ভীষণ আহত দৃষ্টি তার । সময় নিয়ে আইস সরালো । বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরোচ্ছে তবুও । মেয়েটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে । কি করবে খুঁজে পায় না ।

নিজের করা ভুলের জন্য অনুশোচনায় ঠোঁট ফোলায় । কাঁদো কাঁদো হয়ে যায় সে....

" আ'ম সরি । প্লিজ ক্ষমা করে দিন । ব্যাথা করছে খুব । লেগেছে তাই না ? দেখুন রক্ত বেরোচ্ছে এখনো ।

" আমি ঠিক আছি । কিচ্ছু হবে না । সেরে যাবে ।

" রক্ত বেরোচ্ছে তো । আপনি রিসোর্টের কাউকে ফোন করুন প্লিজ । অয়েনমেন্ট লাগবে, নয়তো রক্ত বেরোনো বন্ধ হবে না ।

মেয়েটার চোখ ছাপিয়ে পানি গড়িয়েছে । ইয়াশ আশ্চর্য হয়ে ওকে পরখ করলো । এটুকুতে কাঁদার কি আছে ? তাও আবার অপরের ব্যথায় !

যুবক মৃদু হাসে । টিস্যু পেপারে ক্ষতস্থান চেপে ধরে আলগোছে বলে.....

" এইইই টুকটুকি, প্যানিক করছো কেনো এভাবে ? ঠিক হয়ে যাবে । রক্ত বেরোনো বন্ধ হয়ে যাবে এক্ষুনি । ডোন্ট প্যানিক ।

" আ'ম সরি.....

" তুমি সরি বলছো কেনো ? ঘুমাও গিয়ে । আ'ম ফাইন ।

মেয়েটা নাক টানে । সবটা চেপে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে.....

" ফাইন নন মোটেও । কেটে গেছে তো ।

" ঠিক হয়ে যাবে ।

রমনী ওর কোনো বারন শোনে না । ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে বসায় লোকটাকে । নরম রুমালে তার কপাল ঠিকমতো মুছিয়ে ওয়ান টাইম টেপ লাগিয়ে দেয় । ইয়াশ নিভু চোখে তাকিয়ে বলে সবটা অবলোকন করে....

" এবার ঘুমাও ।

" আপনি ?

" আমি আছি এখানেই !

" সরি ।

" বারবার সরি বলছো কেনো ?

মেয়েটা কিচ্ছুটি বললো না সে বিষয়ে । বরং চোখ নামিয়ে জড়িয়ে আসা গলায় বুলি আওড়ালো......

" আপনি এখানেই ঘুমোতে পারেন । অসুবিধা নেই আমার ।

" আই নো,, এখানেই ঘুমোবো । ওকে ? তুমি ঘুমাও । কাল একটা জায়গায় নিয়ে যাবো !

" কোথায় ?

" গেলেই দেখতে পাবে । দেখে নিও । বুঝে নিও অনেক কিছু । আমার পূর্নতা, শূন্যতা সব সেখানে ।

★★

পরদিন রাত । জুরিখের থেকে ঘন্টা পাঁচেক এগিয়ে ঢাকা শহর । খাওয়া দাওয়া করে সবে নিজ নিজ ঘরে উঠেছেন কাবির পরিবারের এক একটা সদস্য ।

রৌদ্র বাড়িতে নেই দুপুর থেকে ‌। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ কবার ফোন করলো মেঘা । বন্ধ দেখায় ।

শেষমেষ শূন্যে তাকিয়ে হাঁফ ছাড়ে একবিংশী । ফোন বন্ধ কেনো কে জানে ? লোকটা বড্ড বেখেয়ালে হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন । সারাদিন বাইরে কি করে তাও খবর নেই । ব্যালকনির রেলিং ঘেঁষে উপর পানে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা । ভাবছে আজগুবি ‌। ভালো লাগছে না । শাফাহ্ থাকলে তবুও সময় কাটতো । সিরাত চলে যাওয়ার পর শাফাহ্ও চলে গেলো । পুরো একলা হয়ে গেলো মেয়েটা । শিশির আছে , তবে এখন কাছে নেই । বিষন্ন সময়ে সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই । ঘরে ওরা । আদ্র আছে । সেখানে যাওয়াটা বেমানান । ভালো দেখায় না একটুও । পরপর বুক শ্বাস টানছে সে ।

উদাসীন একবিংশীর ধ্যান কাটলো রুবিনা কাবিরের ডাকে....

" মেঘা, রৌদ্র কে ফোন করেছিলি ? এখনো আসছে না কেনো ?

চকিতে তাকালো মেঘা । মুখাবয়ব শুকনো । এগোলেন রুবিনা কাবির....

" কি হয়েছে ? এমন মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো এভাবে ? রৌদ্র কোথায় ? এতক্ষণে তো চলে আসে ।

মেঘা ঘুরেই আকস্মিক তাকে জড়িয়ে ধরে আদুরে হয়ে । টাল হারিয়ে এক কদম পেছান ভদ্রমহিলা । শুধোন....

" কি হয়েছে মেঘা ?

" তোমার ছেলে আবার চলে যাবে মা !

" কোথায় যাবে ?

" যেখানে ছিলো সেখানে !

ভ্রু গুটালেন রুবিনা কাবির....

" কি বলছিস ? ও হঠাৎ চলে যাবে কেনো ?

" জানি না । বলেছেন চলে যাবে । সারার বিয়ের আগেই চলে যাবে । ১৫ তারিখে ফ্লাইট ।

মেয়েটার কন্ঠ ধরে এসেছে । সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে । রুবিনা কাবির ওর চোখ মুখ দেখে আঁতকে উঠলেন । দ্রুত চিবুক উঁচিয়ে ধরে বললেন.....

" কাঁদছিস কেনো ? ও চলে যাবে আমাদের বলেনি তো !

" আমাকে বলেছে ।

" ওখানে ওর কি কাজ ? কেনো যাবে ?

" আমি জানি না ।

ফুঁপিয়ে উঠলো রমনী । তাৎক্ষণিক পুরুষালি ভরাট কন্ঠ ভেসে আসে......

" মম, আমার বউকে কাঁদাচ্ছো তুমি ? কাঁদছে কেনো ও ?

দরজা মারিয়ে তেড়ে গেলো যুবক । দ্বিধা হীন স্ত্রী কে টেনে নিজের দিকে ফেরালো । ভেজা মুখশ্রী দেখে বৃহৎ হলো খাদযুক্ত দৃষ্টি জোড়া । দ্রুত হাতের আজলে রমনীর নির্ভেজাল মুখখানা আগলে নেয় সে.....

" ইভারা, কি হয়েছে জান ? কাঁদছো কেনো ?

" তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ ? আবার কোথায় যাচ্ছিস শুনলাম ?

মেঘা কিছু বলার আগেই প্রশ্ন করলেন রুবিনা কাবির । রৌদ্র তাকায়.....

" আগে বলো , ও কাঁদছে কেনো ?

" তোর জন্যই কাঁদছে । কোথায় যাচ্ছিস ওকে ফেলে ?

রৌদ্র চোখ কুঁচকে ফেলে.....

" ইডিয়ট,, এজন্য কাঁদছো ? আরে আমি কি একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি ? জাস্ট হাফ মানথে'র জন্য । খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো !

" কেনো যাচ্ছিস আবার ?

" কাজ আছে মম । এবার গিয়ে সব মিটিয়ে আসবো । এবারেই দীর্ঘ সময়ের জন্য যাচ্ছি । পরের বার থেকে যদি দরকার পরে, তাহলে মাসে একবার যাবো শুধু !

মেঘা গর্জে উঠলো এবারে......

" কেনো যাবেন ওখানে ? কি কাজ আপনার ?

মা , তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করো ? কে আছে ওখানে ওনার ? কার টানে আমায় ফেলে ওখানে ফিরছেন উনি ?

" ইভারা,, কিসব বলছো ? আমি তো ফিরবো আবার ।

" ফিরতে হবে না আপনাকে । গিয়ে ওখানেই থাকুন । মাসে একবার যেতে হবে না । যদি মনে হয়, দরকার পরে, তাহলে মাসে একবার এখানে ফিরবেন , তাতেই হবে ।

রৌদ্র ঠোঁট প্রসারিত করলো । চোখের ইশারায় রুবিনা কাবির কে কিছু একটা ইঙ্গিত দিলো । হাঁফ ছেড়ে প্রস্থান করলেন ভদ্রমহিলা ।

মেঘা পিছিয়ে গেছে । নাক টানছে বারবার । শিশু সুলভে উল্টানো ওষ্ঠ জোড়া । রৌদ্র এগিয়ে গিয়ে ওকে আলগোছে টেনে বুকে মেশালো ।

" হেয়য়য় মাই লাভ,,,, আমি খুব শীঘ্রই চলে আসবো তো । তোমার কাছে #আসবো_ফিরে_আবারো । যেখানেই যাই না কেনো । তোমাকে ছাড়া থাকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে । শুধু বিশটা দিন । গুনে রাখো এপ্রিলের পাঁচ তারিখ,, ছয় তারিখ হওয়ার এক সেকেন্ড আগে হলেও তোমার কাছে ফিরে আসবো আমি । মিলিয়ে নিও ।

" তবুও যাবেন, তাই না ? শুনবেন না আমার বারন ? মানবেন না কোনো পিছুটান ? যেতেই হবে ?

" হ্যাঁ সানি । প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো । ওখানে কাজ আছে আমার । ইম্পর্ট্যান্ট না হলে তোমায় ছেড়ে যেতাম না কিছুতেই । ওখানে অনেক দায়িত্ব আছে আমার । আমি ছাড়া কেউ নেই সেখানে । আমাকে যে যেতেই হবে ।

আর বাঁধা দিও না প্লিজ । এভাবে কাঁদলে তো আমি যাওয়ার আগেই ভেঙে যাবো । কষ্ট হবে তো ভীষণ । বোঝো না কেনো ?

একবিংশী হার মেনে নিলো.....

" ঠিক বিশ দিন , মনে থাকে যেনো !

" মন মস্তিষ্ক সবখানে থাকবে । বিশ দিনের মধ্যেই আমি আমার জান পাখির কাছে ফিরে আসবো । পাক্কা ! কথা দিলাম ‌।

" ওখানে গিয়ে যা যা করবেন, সব ভিডিও কলে দেখাবেন আমায় ।

" আচ্ছা জানন !

" আপনার অফিসে কমবয়সী মেয়েরাও আছে ?

" উমমম, আছে বোধহয় ।

" বোধহয় বলছেন কেনো ? জানেন না ?

" জানি, দেখিনি সেভাবে ।

সহজ স্বীকারোক্তিতে মেঘা ঝট করে মাথা তুললো......

" দেখতেও হবে না । ওদের থেকে দশ হাত দূরে থাকবেন, কথা দিন । কথা বলবেন না কোনো মেয়ের সাথে ।

" হুমমম , এমনিতেও বলি না ।

" শুধু আমার হয়ে থাকবেন !

" আমি তো তোমারই । সবাই জানে আমি তোমার । আমি বিবাহিত ।

" তবুও, কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেবেন না ।

" দেইনা কখনো ।

রমনী ফের মাথা নামিয়ে সুঠাম বুকে জায়গা করে নিলো । পিঠ আঁকড়ে হেঁচকি তুলে বললো.....

" আমি মিস করবো আপনাকে ।

" সে তো আমিও করবো । তোমার থেকে হাজার গুণ বেশি করবো । বিশটা দিন দেখতে দেখতেই কেটে যাবে । তারপর আমি আবারো তোমার কাছে ফিরে আসবো ।

এজন্য এতো কাঁদে কেউ ? পাঁচ বছর কাটিয়েছো না আমাকে ছাড়া ? এখন তো শুধু বিশ দিন ।

" তখন কি আপনাকে ভালোবাসতাম নাকি ? এখন বাসি ।

" তাহলে ভেবে দেখো,, আমি তোমাকে ভালোবেসে পাঁচ বছর কিভাবে কাটিয়েছি । কোথায় দিন আর কোথায় বছর !

" দিনের হিসেব করছেন ? এদিকে সেকেন্ড গুনে হলেও ভয় হয় আমার ।

" কিসের ভয় সুইটহার্ট ?

" আপনাকে হারানোর ভয় । আমার মনে হয় আপনি অন্য কারোর হয়ে যাবেন । ওখানে গেলে ভুলে যাবেন আমায় !

" তোমাকে ভোলা সম্ভব ?

" জানি না আমি । আমি জানি, আপনি শুধু আমার । বিশ দিনের মাথায় ফিরে না আসলে জানে মেরে ফেলবো একদম ।

" আচ্ছা, বিশ দিনের মাথায় ফিরে না আসলে জান কুরবান করবো তোমার হাতে । চলবে ?

মেঘা হেসে ফেললো এ বেলায় । রৌদ্র ওকে একটু আলগা করে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় । এক গুচ্ছ কুন্তল টেনে স্বভাব সুলভ নাকের ডগায় চেপে লম্বা শ্বাস টানে । বলে হাস্কি টোনে.....

" ভীষণ মিস করবো সুইটহার্ট ।

,,,,,,,

চারটের দিকে রিসোর্ট থেকে শাফাহ্ কে নিয়ে বেরিয়েছে ইয়াশ । রওনা দিয়েছে কোথাও একটা । মেয়েটাকে সে কিছুই বলে না । হুটহাট কান্ড ঘটিয়ে বসে । কোথায় যাচ্ছে,, গন্তব্য কোথায় বলে নি এখনো । কালকের পর থেকেই চুপসে গেছে শাফাহ্ । ইয়াশ কে জ্বালাচ্ছে না খুব একটা ।

এদিকে আধা ঘন্টা যাবৎ মিনির পেছনে ছোটাছুটি করছে রিসা । তবুও ওকে খাওয়াতে পারছে না ঠিকমতো । বিরক্ত সে ‌। এই পুঁচকে বাচ্চা ওকে জ্বালিয়ে মারে । নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে এই হাফ ব্যাটারি । দু'দিন ধরে রৌদ্রের সাথে কথা বলতে পারে নি ঠিকমতো । আজ বায়না ধরেছে ভিডিও কলে কথা বলার । সে তার পাপার সাথে কথা বলবে । কথা না বলা অবধি খাবার মুখে তুলবে না ।

‌অভিমান করেছে । গাল ফুলিয়ে অভিযোগ করবে । রিসা আজকাল রৌদ্র কে কল করতে ইতস্তত বোধ করে । যদি ভুল করে মেঘার হাতে ফোন পৌঁছায় , বা চোখে পড়ে, তাহলে কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে । তাই সে কল করে না রৌদ্র কে । রৌদ্র নিজে থেকেই দু বেলা খোঁজ নেয় । দুদিন ধরে ফোন করছে না সেও । রিসাও আগ বাড়িয়ে কল করে নি । দমিয়ে রেখেছে মেয়েকে ।

আজ আর পারছে না । এই মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে বাধ্য হয়ে দুবার কল করেছে । রৌদ্র রিসিভ করে নি । রিসাও আর ঘাটেনি । ওপাশ ভুলে মেয়েকে মানানোর চেষ্টা করছে সে । হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়েও সামলানো যাচ্ছে না মেয়েকে । পুরো লিভিং রুম জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে মিনি । রিসাও ধাওয়া ধরে তাল মেলাচ্ছে মেয়ের কদমে কদমে । হাতে খাবারের বাটি । আশরাফ তালুকদার একপাশে বসে নাতনি আর বউমার এমন ধাওয়া ধাওয়ি দেখে হাসছেন মিটিমিটি । সাবধান করছেন ক্ষণে ক্ষণে ।

কলিং বেল বাজলো এমতসময় । রিসা ধ্যান জ্ঞান দিলো না খুব একটা । মেয়েতেই মত্ত সে । একজন হাউজ সিটার গিয়ে দরজা খুলে দিলেন ।

অমনি হন্তদন্ত কদমে ভেতরে ঢুকে আসলো ছটফটে এক তাগড়া যুবক । পিছু পিছু এক ছিমছাম অনুচ্চ রমনী । ভয়ে গোটানো তার ললিতাঙ্গ । পেছনে গেইটের গার্ড'রা ধাওয়া ধরেছে । গেটের সামনে হম্বিতম্বি করে গার্ডদের ছাপিয়ে ভেতরে ঢুকেছে যুবক । কড়া পাহারা ছিলো বাড়ির বাইরে । ঝামেলা হয়েছে সেথায় ।

অনুচ্চ রমনী যুবকের পায়ে পা মিলিয়ে তেড়ে এসে আঁকড়ে ধরলো যুবকের বাহু । তারা দুটোয় এসে থামে লিভিং রুমের মাঝ বরাবর । পেছনে ছুটে আসলেন হাউজ সিটার ভদ্রমহিলা । ভিন্ন ভাষায় হকচকিয়ে প্রশ্ন করলেন গমগমে স্বরে......

" হেইইই , কারা আপনারা ? এভাবে হুটহাট বাড়িতে ঢুকে পড়লেন কেনো ?

তার উদ্বিগ্ন বাক্যে বসা অবস্থায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন আশরাফ তালুকদার । চেনা মুখাবয়ব দেখে চোখে মুখে বিভৎস পরিবর্তন আসলো তার । দাঁড়িয়ে গেলেন স্তম্ভের ন্যায় ।

পেছন থেকে মেইড ভদ্রমহিলার তেজি স্বর.. গলা বাড়িয়ে সিকিউরিটি ডাকলেন তিনি । গার্ড রাও উপস্থিত । বিপদ সংকেতে পুরো বাড়ির সাইরেন বেজে উঠলো ।

তবুও তপ্ত যুবকের পরোয়া নেই কোনো দিকে । স্তব্ধ দৃষ্টিতে সে চেয়ে আছে সিঁড়ির পানে । মা মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । অচেনা মানুষ দেখে ছোটাছুটি বন্ধ করে জড়োসড়ো হয়ে মায়ের ওরনা চেপে ধরে দাঁড়িয়েছে মিনি । রিসা নিস্তব্ধ । চোখাচোখি চলছে সামনের যুবকের সাথে । অবাক নিগুড় লোচনে চেয়ে আছে রমনী । চোখে একরাশ অবিশ্বাস , সেথায় ছেদ ঘটে পলক পড়লো দীর্ঘক্ষণ বাদ । ছলকে নামিয়ে নিলো আঁখি যুগল । পরক্ষনে স্পর্ধায় চোখ তুললো আবার । ঢোক গিললো ।

ধরা জবানে অস্ফুটে ঠোঁট নাড়ালো.....

" ইয়াশ !

ইয়াশের দৃষ্টিতে পলক পড়ে দীর্ঘক্ষণ বাদ । যুবকের চোখ জোড়া নির্বিঘ্নে ভরে আসে । শুকিয়ে আসে কন্ঠনালি । লাগাতার ঢোক গেলে সে ।

একজন গার্ড এগিয়ে এসে স্পর্ধা দেখালেন এবারে । বিপদ সন্দেহে অচেনা যুবকের গায়ে হাত দিলেন তিনি । তপ্ত যুবকের পেশিবহুল বাহুতে সজোরে একটা আঘাত বসালেন কিছু না ভেবেই । আঘাতের চোটে দুলে উঠলো ইয়াশের শরীর ।

এহেন আক্রমণে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাফাহ্ আতঙ্কে কেঁপে ওঠে । সব অচেনা এখানকার । কোথায় আসলো ওরা, কেনো আসলো এখানে ? কারা এনারা ? বাইরে গন্ডগোল পাকিয়েছে ইয়াশ । গার্ডরা আটকাতে পারেন নি ওকে । তপ্ত যুবক সবাইকে অগ্রাহ্য করে হিড়হিড়িয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছে ।

শাফাহ্ ভয়ে কুঁকড়ে দুহাতে ইয়াশের বাহু জাপটে ধরলো । হেলদোল নেই এই লোকের । সিকিউরিটি দ্বিতীয় বার আঘাতের জন্য উদ্যত হতেই সামন থেকে কম্পিত রিনরিনে কন্ঠের বাঁধা আসে.....

" হেয়য়য়,, স্টপ । লেট হিম গো ।

তাৎক্ষণিক মৃদু হাসে ইয়াশ । সিকিউরিটি সাফাই গাইতে চান.....

" বাট ম্যাম....

" আউট ।

এক নির্দেশেই মাথা নত করে বেরিয়ে গেলেন সকলে । ইয়াশের দৃষ্টি এখনো স্থির । শাফাহ্ ভয়ে জড়িয়ে আছে । সে না তাকিয়েই রমনীকে নিজের বাহু থেকে সরাতে চায় । ছাড়ে না শাফাহ্ । মাথা নাড়ায় ।

ইয়াশ জোর পূর্বক সরায় ওকে । বলে গলা নামিয়ে......

" ডোন্ট ওয়ারি, আমি আছি । কিচ্ছু হবে না ।

শাফাহ্ সরে আসতেই সে নিশ্চল কদম বাড়ালো । কম্পিত ধাপ তার । যত কদম এগোয় , তত বার কেঁপে ওঠে রিসা । একহাতে মিনি কে আগলে ধরে । বাচ্চাটা পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । হয়তো চেনার চেষ্টা করছে ।

ইয়াশ রিসার মুখোমুখি দাঁড়ালো । দৃষ্টি সরেনি তখনো । আকস্মিক হাঁটু ভেঙ্গে ধপ করে বসলো মুখোমুখি । ছিটকে এক কদম সরে যায় রিসা । ইয়াশ কিছু বললো না । হাত বাড়িয়ে মিনি কে ধরার চেষ্টা করলো । বাচ্চাটা লুকিয়েছে । ইয়াশ ওকে টেনে আনে সামনে । একহাতে বাহু ধরে রেখে অন্যহাতে পুরো মুখ জুড়ে ছুঁইয়ে দেয় । কেমন চেনা ছাপ চেহারায় । খুব আপন সে ।

ইয়াশ ভরা চোখ নিয়েই হেসে ফেললো । ওর হাসিতে মিনিও হেসে উঠলো । হয়তো বুঝলো, বিপদ নেই এই লোকের কাছে ।

ইয়াশ বাচ্চা টাকে জড়িয়ে নেয় বুকে.....

" কেমন আছো মাম্মা ?

ঝট করে উত্তর দেয় মিনি....

" আ'ম ফাইন ।

ইয়াশ ওকে ছাড়লো । ধড়ফড় করে উঠলো ।

" রিসা,,, এটা আমার, আমার আরাফের বাচ্চা ? এটা, এটা তোর আর আরাফের বাচ্চা ? আমার আরাফের ! কি সফট ও ! কি কিউট ! সো প্রিটি ! মাম্মা,,, ডু ইউ নো মি ? আ'ম ইয়াশ আঙ্কেল । কল মি আঙ্কেল ।

" আঙ্কেল ?

" ইয়াহ্ ,,, ইয়াশ আঙ্কেল । কল মি আঙ্কেল , ওকে ?

" ওক্কে আঙ্কেল ।

শব্দ করে হাসলো ইয়াশ । মিনিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো । বাচ্চাটার গালে মুখে আদর করে চুমু আকলো ।

রিসাকে পাশ কাটিয়ে আশরাফ তালুকদারের কাছে এগোলো ।

" আঙ্কেল,,, দেখুন না , ও কত্ত সুন্দর । বেবি ডল পুরো । চোখ দুটো একদম আরাফের মতো , তাই না ? দেখুন, ফেস পুরো রিসার মতো ।

আশরাফ তালুকদার এখনো মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন । ইয়াশ বলে হাপুসহুপুস করে.....

" কি হলো আঙ্কেল,,, কি দেখছেন তখন থেকে ? আমি ইয়াশ । ভুলে গেছেন আমায় ? চিনতে পারছেন না ? অসুবিধা হচ্ছে ? আমাকে সবাই ভুলে গেলেন আঙ্কেল ?

ভদ্রলোক তাকিয়ে থেকে জবানে কথা ফোটান.....

" ভুলবো কেনো তোমায় ? ছেলেদের কি ভোলা যায় ?

" ছেলে ? হ্যাঁ,,, আচ্ছা আঙ্কেল, ছেলে কোথায় আপনার ? ডাকুন তো ওকে । ওর সাথে কথা আছে আমার ।

রিসা,, আরাফ কোথায় ? ওকে ডাক । আমার কথা বল ! বল আমি এসেছি । সব ভুলে এসেছি । ওকে একটাবার শুধু আমার সামনে আসতে বল । আমি দেখবো ওকে । কোথায় ও ?

রিসা পাথরের ন্যায় জমে গেছে । অনুভুতি হীন জড়বস্তু । কিংকর্তব্য বিমূঢ় স্তব্ধ পুরো । ইয়াশ মিনি কে কোল থেকে নামায় । রিসার সামনে যায় । চোখ মুছে বলে.....

" শুনছিস না আমি কি বলছি ?

রিসা বোধহয় জানতো ইয়াশ আসবে । রৌদ্রের কাছে আভাস পেয়েছে । তৈরি রেখেছিলো নিজেকে । তবে এখন সামনাসামনি হতেই গুঁড়িয়ে গেছে পুরো । কঠোর রমনী নিজেকে ধাতস্থ করলো । বুলি ফুটালো অস্ফুটে.....

" পাগলামো করছিস কেনো, ইয়াশ ? ভাল্লাগছে আমাকে কষ্ট দিতে ?

ঝিমিয়ে এলো তপ্ত যুবক, ধরা জবানে সেও অস্ফুটে আর্তনাদ করলো......

" আমাকে এভাবে কষ্ট দিতে তোদের খুব ভালো লেগেছে, তাই না ? কেনো রিসা,,, কেনো করলি এমন ? কি বড় ক্ষতি করেছি আমি তোদের ? খুব ক্ষতি করেছি ? আমাকে পর করলি কেনো এভাবে ? শেষ বারের মতো ওকে দেখতে দিলি না তোরা আমায় । আরে আমি কি এতোটাই নিষ্ঠুর নাকি ! চিনিস নি আমায় ? ও কে আমার জীবনে, জানিস না তুই ? তাহলে কেনো এমনটা করলি ?

শেষ বাক্যে চিৎকার করে ওঠে সে । কম্পিত গলার স্বর । কান্নার তোপ স্পষ্ট । মিনি ভয় পায় আকস্মিক দাপটে । রিসা শক্ত থেকে বলে.....

" আমার মেয়ে ভয় পাচ্ছে ইয়াশ !

ইয়াশ তাকালো ঝট করে । ততক্ষণে আশরাফ তালুকদার মিনি কে সামলে নিয়েছেন । সে আবার বললো.....

" আমাকে আরাফের কাছে নিয়ে চল । আমি যাবো ।

" লাভ কি ? মরে গেছে ও ।

একটুও বাধলো না বলতে গিয়ে । কষ্ট পেয়ে পেয়ে পাথরে পরিণত হয়েছে এই মেয়ে । ইয়াশ জেদ করলো.....

" নিয়ে চল আমায় । নিষ্ঠুর হোস না প্লিজ । এমন তো ছিলি না । ভুলে গেলি আমাকে ? এতো বড় অপরাধ করে ফেলেছিলাম বুঝি ?

ফের তাকায় রিসা । দৃষ্টি ছলছল । নোনা জল চেপে রেখেছে আঁখি কোটরে । ইয়াশ কিছু একটা বুঝলো হয়তো । দুহাতে চোখ মুখ মুছে নিলো । পিছু হটে বিমূঢ় একাকী রমনীকে টেনে আবারো আগের অবস্থানে দাঁড়ালো । কাঁধ জড়িয়ে নিলো শাফাহ্'র । শাফাহ্ বুঝে পায় না কিছু । ঘাড় উঁচিয়ে দেখে যায় কেবলই । ইয়াশ হেসে বলে.....

" ভয় পাচ্ছিস রিসা ? আমাকে এতোটা খারাপ ভাবিস ? এই চিনেছিস ? ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই । এই দেখ, কাকে নিয়ে এসেছি । মিট মাই ওয়াইফ । আমার স্ত্রী ও । ওকে জীবনে ঠাই দিয়ে ফেলেছি । তোকে কেড়ে নিতে আসিনি আমি ।

রিসা নড়েচড়ে উঠলো......

" ইয়াশ,, আমি সেভাবে কিছু ভাবিনি । তুই...

" মানুষের বিষয়ে একবার খারাপ ধারনা জন্মালে সেটা সহজে মোছে না । নিয়ে চল আমায় । আমি শুধু একবার ওর কবরে যেতে চাই ।

কাতর আবদার । রিসা চোখ সরিয়ে শাফাহ্ কে দেখে নিলো । অবিলম্বে ভিজলো কপোল ।

ভেতর জুড়ে তোলপাড় । অস্থির সে । বহুবছর পেরিয়েছে । কত কষ্টে গুমড়ে মরেছে মেয়েটা । ইয়াশ কে দেখা মাত্রই জেঁকে উঠলো সব দগ্ধ ব্যাথা । মস্তিষ্ক চড়াও হয়ে উঠলো । কাঁটার ন্যায় কিছু যন্ত্রণা হানলো সর্বাঙ্গে । নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসে তার । সে শ্বাস টানে । ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে । সরে আসে ইয়াশের সামনে থেকে ।

দৃষ্টি নামায় ইয়াশ । টুপ করে যুবকের আঁখি কার্নিশ ঘেঁষে পানি ঝরে । শাফাহ্ চেয়ে রয় অবাক লোচনে ।

রিসা নিজেকে ধাতস্থ করে মিনির কাছে গেলো । আশরাফ তালুকদার কে ইঙ্গিতে কিছু বোঝালো । মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো ভেজা গলায়.......

" মাম্মা,,, আমি বাইরে যাই একটু ? চলে আসবো খুব তাড়াতাড়ি । মাহির আংকেল আসছে, ঘুরতে নিয়ে যাবে তোমায় । ওকে ?

মিনি বলতে নিলো ঠোঁট উল্টে.....

" আমি পাপা......

" মিনি,, মাম্মার কথা শুনতে হয় । মাহির আংকেল এসে ঘুরতে নিয়ে যাবে তোমায় । ততক্ষণ দাদুর কাছে থাকো । প্লিজ সোনা । মাম্মা এক্ষুনি যাবে, আর এক্ষুনি চলে আসবে । গুড গার্ল হয়ে থাকবে ওকে ? মাহির আংকেল না আসা অবধি দাদু কে জ্বালাবে না । গুড গার্ল হয়ে থাকলে পাপার সাথে কথা বলতে দেবো ।

শেষের বাক্যটা ধীরে উচ্চারণ করলো । চিকচিক করে উঠলো মিনি । নিষ্পাপ শিশুটা সব মেনে নিলো মুহুর্তেই ।

মিনি কে মানিয়ে ইয়াশের সামনে আসে রিসা । দুজনকে দেখে ভারী গলায় বলে !

" চল ! দেখিয়ে নিয়ে আসি একটা ইট পাথরের সমাধিকে । তাকে ছোঁয়ার সাধ্য নেই । অনুভব করতে পারবি শুধু । তবে কথা দে, চোখের পানি ফেলবি না । নয়তো আজাব হবে ওর কবরে । আমি চাই না ও কষ্ট পাক ।

শেষের দিকে নিভে আসে তার স্বর ।

,,,,,

ডুবছে সূর্যি । পশ্চিমাকাশ লালচে । কিচিরমিচির শব্দে ডাক পাড়ছে পাখিরা । উড়ে ফিরছে নীড়ে । অর্ধ ডুবন্ত সূর্যের লাল আভায় ধরনী আলোকিত তখনো । ঝিমিয়ে আসা আলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে গগনে ।

আশপাশে অগনিত সমাধী ।

শুয়ে আছে কতশত প্রাণহীন নিথর দেহ ‌। পচে গলে মিশে গেছে মাটির সাথে । প্রত্যেকটা কবরের শিয়রে খানিক উঁচু টিলার ন্যায় শান বাঁধানো রয়েছে । প্রত্যেক জনের নির্ভুল পরিচয় লেখা সেখানে । সব অচেনা , অপরিচিত ।

তবে এতো সবের মাঝে একজন মৃতের পরিচয় বড্ড চেনা । ডান পাশের দ্বিতীয় সারির মাঝ বরাবর একটি কবর । সবুজ ঘাসে আবৃত । শিয়রের কাছের বাঁধানো শানে ইংরেজিতে লেখা স্পষ্ট....

Name :– Araf Talukdar

Death :– 10 September 2019

Nationality :– Bangladeshi

ব্যাস, এটুকুই । সেই কবরের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই হাঁটু গুঁড়িয়ে আসলো ইয়াশের । ধপ করে ভেঙে পড়লো তার কঠিন শরীর খানা । সে শব্দহীন সোজাসুজি লুটিয়ে পড়লো কবরের ডান পাশে ।

শাফাহ্ আঁতকে ওঠে । এতক্ষণের সব মেনে আসলেও এখন অদ্ভুত লাগে তার । এতোসব কবরের ভিড়ে ছমছম করে গা । শিউরে ওঠে লোমকূপ ।

সে ছ্যাত করে ইয়াশের দিকে এগোতে চায় । কদম বাড়ানোর আগেই টেনে ধরে রিসা । ঠান্ডা মৃদু স্বরে আওড়ায়....

" যেও না । ওকে একটু একা ছাড়ো । এসো, বসি আমরা ।

সে শাফাহ্ কে টেনে পাশাপাশি নিয়ে একপাশে বসলো । তাজ্জব বনে রমনী । এতক্ষণে যা বুঝলো, এই মেয়ের স্বামীর কবর এটা । অথচ ইনি এতো স্থবির আছেন কি করে ? হিসেব মেলাতে বড্ড হিমশিম খায় বোকা মেয়েটা । নিশ্চুপ রয় ।

ক্ষয়ে ক্ষয়ে সময় অতিবাহিত হয় । আরাফের কবরটার উপর শরীর ছড়িয়ে প্রায় মিনিট বিশেক ধরে পড়ে আছে ইয়াশ । কিচ্ছুটি বলছে না । সবুজ ঘাস গজানো কবরটাকে আকড়ে আছে নীরবে । ওরা এখানে আসতে আসতেই সময় পেরিয়েছে অনেকটা । এখন তো ঘনীয়ে আসছে সন্ধ্যা । ঘনীভূত হচ্ছে চারপাশ ।

দুই রমনী একপাশে বসে নিঃশব্দে অবলোকন করছে ওকে । শাফাহ্ বিষ্ময়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে চেয়ে আছে শুধু । তাজ্জব হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে ‌।

ওর পাশেই হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে রিসা । শাফাহ্ এতক্ষণে লক্ষ্য করলো,, এই মেয়েটার চোখ ভেজা, টইটুম্বুর হচ্ছে বারংবার ‌। তবে পানি গড়ানোর আগেই ঠিক কৌশলে মুছে নিচ্ছে ।

নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে এবার ডাকলো রিসা....

" ইয়াশ !

ডাক ভেসে আসতেই এ বেলায় শব্দ করে হেসে উঠলো যুবক ‌। হাসির মাঝে চোখের কার্নিশ বেয়ে টুপ করে নোনা জল গড়ালো । মিশলো তা কবরের মাটিতে । ঘাসের ফাঁকের তৃষ্ণার্ত ধুলো কনা শুষে নিলো তা ।

ইয়াশ কবর টাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরার চেষ্টা করে আরো বেশি । হাত বোলায় পুরোটায় । এতক্ষণ তাই করে এসেছে । যেনো ঘুমন্ত কারোর শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আদর করে । চেনা গন্ধ পাচ্ছে এই মাটিতে ।

ঢোক গেলে নিস্তেজ যুবক । ধক্ করে শ্বাস টেনে ডাকে । বড্ড ক্ষিণ তার কন্ঠস্বর ,,, ধরে আসছে জড়তায় । সেভাবেই বুলি ফুটায় ঠোঁট কাঁপিয়ে....

" হেয়য়য় চ্যাম্প,,, আই মিস ইউ ইয়ার । কোথায় চলে গেছিস আমায় ছেড়ে ? চল টেবিল টেনিস খেলবো ‌। কতদিন খেলি না বলতো । তুই ছাড়া কিচ্ছু চলে না আমার জীবনে । পুরো নিঃস্ব আমি । চল ওঠ । আমি এসেছি তোকে ডাকতে । তোকে নিতে । তোকে দেখতে এসেছি । কতদিন দেখিনা তোকে । খুব ইচ্ছে করছে দেখতে । তোকে জড়িয়ে ধরতে । অভিমান করে আছিস আমার উপর ? এই দেখ, তোর অভিমান ভাঙাতে এসেছি আমি । তোর ইয়াশ এসেছে । সব ভুলে গেছি আমি । তুই ও ভুলে যা প্লিজ । আমি তোর কাছে এসেছি , আরাফ । প্লিজ ওঠ । ক্ষমা কর আমায় ‌‌।

#চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন