ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

৯১তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯০ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

দোতলায় আদ্রের রুমে নিয়ে গিয়ে রৌদ্রকে স্থির করার যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে । কিন্তু সেই বেপরোয়া ছেলেকে ধরে রাখা বড্ড দায় । নিস্তেজ শরীরটাতে খানিক জোর পেয়েছে কি পাই নি, অমনি ঔদ্ধত্য হয়েছে আবার ।

ওকে শক্তি খাটিয়ে বিছানায় চেপে ধরার কসরত করছে শুভ্র আর তোফায়েল কাবির । ভদ্রলোক ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টাও করছেন । কিন্তু শুনছে না তাদের বেপরোয়া ছেলে । আদ্রর হাতে সিরিঞ্জ । প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা খুব বেশি বেড়ে রৌদ্রকে ধরে রাখা দায় হয়ে পড়ে । তাৎক্ষণিক মেডিসিন দিলেও সেটা কার্যকর হতে হতে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময় । সেই দিক বিবেচনা করে ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা একটা ইনজেকশন টা দেওয়া হয়েছে রৌদ্র কে । সময়ে অসময়ে কাজে লাগে এটা । যা শরীরের তীব্র কম্পন রুখে ধীরে ধীরে শান্ত করে ঘুমে অচেতন করে দেয় বেপরোয়া যুবককে । এতো বছরে আদ্র রৌদ্রকে পুরোপুরি সামলানো শিখে নিয়েছে ।

বরাবর ভাইকে দমন করার জন্য নিজে ইনজেকশন পুশ করে সে । তবে আজ রৌদ্র ছটফট করছে ভীষণ । এমন চলতে থাকলে তার হৃদযন্ত্রের রক্তনালী ব্লকেজ হতে পারে । অর্থাৎ আবারো হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা খুব বেশি তার । সামলানোর জন্য দ্রুত ইনজেক্ট করতে হবে ।

এই ইনজেকশনের তীব্র প্যানিক অ্যাটাক ও শরীরের কম্পন থামিয়ে রোগীকে ঘুম পাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে ঠিকি , তবে এটিরই ভুল ব্যবহারে মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকি হতে পারে । খুব সাবধানে ইনজেক্ট করতে হয় বরাবর । যা আজ সম্ভব হচ্ছে না ।

কেউ সামলাতে পারছে না বেপরোয়া যুবককে ।

শেষমেষ মেঘাকে সাথে নিয়ে সিঁড়ি চড়ে দোতলায় আদ্রের বরাদ্দ ঘরটায় ঢুকলেন রুবিনা কাবির । বিছানার উপর ছেলের অমন ছটফটে অবস্থা একঝলক দেখে নিলেন । অতঃপর মেয়েটাকে টেনে নিয়েই গেলেন বেডের পাশে । কান্না গিলে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন ধরা গলায়......

" রৌদ্র,,, এই দেখ বাবা, মেঘা এসে গেছে । ও কোত্থাও যাবে না তোকে ছেড়ে । আমরা যেতে দেবো না । তোর জন্য আমরা ঠিক আটকে রাখবো ওকে । এবার তুই একটু শান্ত হ বাবা । নয়তো অসুস্থ হয়ে যাবি আবার । ইনজেকশন টা দিতে দে,,, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে । আর কষ্ট হবে না ।

শুয়ে থেকে মেঘাকে দেখা মাত্রই হাসি খেলে গেলো বেপরোয়া যুবকের ওষ্ঠপূটে । নিমিষেই ছটফটানি কমিয়ে স্থির হয়ে গেলো সে । টইটুম্বুর চোখদুটি হালকা হলো পানি ঝড়ে । সে নিস্তেজ হতেই ওকে ছাড়লো শুভ্র । পিছিয়ে গেলো । হা করে শ্বাস টেনে হাত উঁচায় রৌদ্র । হতবুদ্ধ রমনীকে কাছে ডাকে ফিসফিস করে......

" ইভারা,,, কাছে এসো প্লিজ ।

আদ্র ভেজা চোখে চায় । হাতে টান মারে মেঘার । করুন চোখে চেয়ে বুলি আওড়ায়....

" মেঘ,,, ওর কাছে যাবি একটু ? আমি জাস্ট ইনজেকশন টা দেবো । প্লিজ মেঘ,,, আমার ভাইটা শেষ হয়ে যাবে নয়তো । প্লিজ...

মেঘার থেকে উত্তর না নিয়ে আদ্র নিজে ওকে টেনে রৌদ্রের শিয়রে বসিয়ে দিলো ।

হাসলো রৌদ্র । প্রশন্য হলো ভীষণ । ঝট করে ভার মাথাটা তুলে সেটাকে এলিয়ে দিলো রমনীর কোলে । পেঁচিয়ে নিলো তনুমধ্য । উদরের কাছে মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস টানলো চোখ বুজে । শব্দহীন হাসলো প্রশান্তিতে । বিড়বিড় করলো শান্ত হয়ে....

" আই লাভ ইউ সুইটহার্ট.....আই রিয়েলি লাভ ইউ !

যাতনায় ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে নেন বাড়ির সকলে । যে ছেলে একটু আগেও উন্মাদের ন্যায় আচরন করছিলো, থামানো যাচ্ছিলো না যাকে, সে এখন এই মেয়ের সংস্পর্শে এসে দমে গেলো নিমিষেই । এ কেমন অবাধ্যতা তার ?

আদ্র দম ছাড়ে । খুব সাবধানে ইনজেকশন পুশ করে রৌদ্রের ডান হাতের শিরায় ।

মেঘ তব্দা বনে দেখে । ঝিমিয়ে আসে রৌদ্র । অসার হয়ে আলগা হয় তার হাতের বাঁধন । সে বুঝতে পারছে, সে এখন জ্ঞান খোয়াবে । ঘুমে তলিয়ে যাবে । ঘুমোলে যদি মেঘা পালিয়ে যায়, তাহলে কি হবে ? এই ভাবনা আসতেই জ্ঞান শূন্য হওয়ার আগে তড়াক করে দৃষ্টি মেললো যুবক । ধড়ফড় করে এপাশ ওপাশ তাকালো । বালিশের কাছে শিশিরের একটা ওরনা দেখতে পেলো । নিভু নিভু চোখে চেয়ে হাত বাড়িয়ে সেটাকে টেনে নিলো দখলে ।

আলগোছে ওরনার এক মাথা পেঁচালো নিজের হাতের সাথে । অপর মাথা মেঘার বাম হাতের কব্জিতে বাঁধলো । অতঃপর আধো আধো চোখ তুলে তাকালো মেঘার দিকে । ঝাপসা হয়ে বুজে আসছে ভেজা পাপড়ি । সে মৃদু হেসে বিড়বিড় করলো ঘোরের বশে.....

" কোত্থাও যেও না, কেমন ? খুলে দিও না এই বাঁধন । আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না । কষ্ট হয় আমার । ভীষণ কষ্ট হয়, সুইটহার্ট ।

সম্পুর্ন অচেতন হওয়ার আগে পরক্ষণে তোফায়েল কাবির কে উদ্দেশ্য করে বললো আধো ভাঙ্গা গলায়....

" ড্যাড,,, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে ড্যাড । আমি ঘুমিয়ে গেলে তোমরা ওকে দেখে রাখবে প্লিজ । কোত্থাও যেতে দেবে না আর । আটকে রাখবে । আমি ঘুম থেকে উঠে ওকে চাই । ওকে আর হারাতে দিও না ড্যাড । আমার জন্য আটকে রেখো ।

বিড়বিড় করতে করতে এক পর্যায়ে আর কন্ঠ উঠলো না । নিভে এসে ঘুমের অতলে হারালো যুবক । শান্ত হলো সে । নিস্তব্ধ হলো আশপাশ ।

মেঘা পাথরের ন্যায় বসে আছে অনুভূতি হীন । গোটা ঘরে সবার উপস্থিতি থাকলেও কারোর মুখে রা নেই ।

পিনপতন নীরবতা । যাতে ছেদ ঘটলো বাচ্চার ডাকে......

" মাম্মা.....!

ছ্যাত করে ওঠে মেঘা । সচকিতে তাকায় ।

দরজার চৌকাঠ মাড়িয়ে ভেতরে পা রেখেছে #উৎস নামক যুবকটি । মেঘার বাচ্চা দুটো তার কাছেই । রোশ ডেকেই ওষ্ঠ উল্টে ছোট ছোট চোখে দেখছে নিজের মাকে । #ইবাদ ও তাকিয়ে আছে অবাক লোচনে । বাচ্চা দুটো এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না ।

মেঘা শুষ্ক ঢোক গেলে । বাড়ির সবাই দরজার দিকে তাকিয়েছে একই সাথে । উৎসের সাথে এই বাচ্চা দুটোকে দেখে দৃষ্টি কুঁচকে আসলো সবার । সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এরা কারা ? এই ছেলেটাই বা কে ? সেই সাথে আরো অনেক প্রশ্ন রয়েছে ।

আদ্র ভেজা ঢোক গেলে । মেঘার কোল থেকে রৌদ্রকে সরিয়ে বেডে শুইয়ে দেয় ভালোভাবে । মেঘার হাত থেকে ওরনার বাঁধন টাও খুলে দেয় । চোয়াল শক্ত যুবকের । সে শক্ত করেই মেঘার হাতের কব্জি চেপে ধরল । বললো ধারালো কন্ঠে....

" চল আমার সাথে.....

পাশেরটা রৌদ্রের ঘর ।

সে ঘরে ভিড় জমলো । মাঝামাঝি নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে রমনী । আদ্র ওর মুখোমুখি । আশেপাশে ওকে ঘিরে সবাই । রোশ, ইবাদ, উৎস, ওরাও আছে ।

এখনো সবকিছু ঘোলাটে সবার কাছে । আদ্র ভারিক্কি গলায় প্রশ্ন করে ভনীতা হীন.....

" এতো দিন কোথায় ছিলি তুই ?

মেঘা ঢোক গিললো । উত্তর করলো সাবলীল.....

" এখানেই । তবে আর থাকবো না ।

" থাকবি না মানে, কোথায় যাবি ?

" যেখানে আবার আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না, সেখানে !

" মেঘ !

চেঁচিয়ে ওঠে আদ্র । খানিক কেঁপে পেছাতে গিয়েও দমে যায় রমনী । তোফায়েল কাবির বলেন ঠান্ডা গলায়....

" আদ্র,,, শান্ত হয়ে কথা বলো । বাচ্চারা আছে এখানে !

মুখ গোল করে শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে যুবক । বাচ্চাদের প্রসঙ্গ উঠতেই তড়াক করে দরজার পাশে তাকায় । চোয়াল খিচে শুধোয়.....

" ওরা কারা, মেঘ ?

মেঘা মাথা তুললো । নিজের ছেলে মেয়ের দিকে তাকালো এক ঝলক । একটুও গলা জড়ালো না প্রত্যুত্তরে......

" আমার ছেলে মেয়ে ওরা !

আদ্র ছলকে যায় । পরের প্রশ্নে গলা কাঁপে.....

" আর এই ছেলেটা,,, সে কে ?

" এক্সকিউজ মি,, আমি....

উৎস মুখ খুলে কিছু বলার আগেই ধমকে উঠলো আদ্র.....

" শাট আপ,,, আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি । চুপ করে থাকুন । মেঘ,, বল , কে ও ?

" ও উৎস ! আমরা একসাথে কাজ করি ।

রুবিনা কাবির তেড়ে যান । কনুইয়ে হেঁচকা টানে রমনীকে ফেরান নিজের দিকে ! ভয়ে ভয়ে শুধোন.....

" এই বাচ্চা,,,, বাচ্চা গুলো কার ?

" আমার ! ওরা আমার সন্তান ! আমি ওদের মা ।

" বাবা কে ওদের ?

মেঘার চোখ বেয়ে নির্বিঘ্নে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । ব্যাথা পিছে ঠেলে উত্তর করে দ্বিধাহীন....

" ওদের কোনো বাবা নেই ! শুধু মা আছে,,আমি ওদের মা । আর কেউ নেই.....

ললাট কুঞ্চিত হয় সকলের । বুঝতে বাকি রয় না কিছু । ফুঁপিয়ে ওঠেন ভদ্রমহিলা । থেমে থেমে জিজ্ঞাসা করেন সন্দেহ কাটাতে......

" ওরা আমার রৌদ্রের বাচ্চা, মেঘা ? আমার ছেলের ? আমাদের নাতি নাতনি ওরা ? আমার রৌদ্রের জমজ বাচ্চা হয়েছে ? আমারা ছেলেটা দুই সন্তানের বাবা হয়েছে !

ফুঁপিয়ে হেসে উঠলেন তিনি । ছুটে গেলেন বাচ্চা দুটোর কাছে । একসাথে দুটোকে টেনে মিশিয়ে নিলেন বুকের সাথে । কেঁদে উঠলেন শব্দ করে । আহাজারি করলেন......

" এ‌ দুটো আমার নাতি নাতনি । আমার ছেলের অংশ । আমাদের রক্ত । নিজেদের রক্ত কে চিনতে নাকি কেউ ভুল করে না, দেখেছেন আমারাও ভুল করিনি । আমার রৌদ্র ঠিক চিনেছিলো নিজের মেয়েকে । ও কাল রোশকে দেখে ঠিক আন্দাজ করেছিলো, যে এটা ওর মেয়ে । রোশ্ যখন কাঁদছিল, আমরা কেউ সামলাতে পারছিলাম না ওকে । কিন্তু রৌদ্র, ওর কোলে যাওয়া মাত্রই চুপ করে গেছে বাচ্চাটা । রৌদ্র বলেছিলো কাল, যে মেঘার মতো এর নাকের ডগাতেও তিল আছে । ও বলেছিলো এই বাচ্চাটা মেঘার মতো । আমরা কেউ গুরুত্ব দেইনি ওর কথায় । এখন দেখেছেন তো,, আমার রৌদ্র ভুল নয় । এটা আমার রৌদ্রের মেয়ে । আমার ছেলের জমজ বাচ্চা হয়েছে । ছেলে, মেয়ে দুটো সন্তানের বাবা হয়েছে আমার পাগল ছেলেটা । অথচ ও এখনো জানতেই পারলো না এসব । ওর সন্তানের মুখে বাবা ডাক শুনলো না এখনো ।

কথা বলার মাঝে ডুকরে উঠলেন তিনি । মেঘা চোখ বুজে নেয় । তাচ্ছিল্য হেসে বলে.....

" ভুল বললে মা,,,, তোমার ছেলে তার সন্তানের মুখে অনেক আগেই বাবা ডাক শুনে ফেলেছে । এ দুটো তার সন্তান নয় । এরা শুধু আমার সন্তান ।

আদ্র মাড়ি খিচে ধমকে ওঠে.....

" আচ্ছা,, ওরা শুধু তোর সন্তান !

চোখ তুলে তাকালো মেঘা....

" হ্যাঁ । ওরা শুধু আমার সন্তান । আর কেউ নেই ওদের । রোশ্, ইবাদ, মাম্মার কাছে এসো ।

মায়ের ডাক পেতেই রুবিনা কাবিরের বুক থেকে এক ছুটে মায়ের কাছে গেলো বাচ্চা দুটো । মেঘা হাঁটু মুড়ে বসতেই দুটোতে ঝাঁপিয়ে পড়লো বুকে ।

মেঘা জড়িয়ে নেয় ওদের । কান্না গিলে বিড়বিড় করে.....

" ওরা শুধু আমার সন্তান । শুধু আমার ।

উৎস সবকিছু দেখেছে এতক্ষণ অবধি । কোনো কিছুই বুঝতে বাকি নেই ওর । এখানকার কাউকে চিনতেও বাকি নেই । সে মুচকি হাসলো । বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল....

" মেঘা,,, আমি ডরমেটরিতে যাচ্ছি । আই থিংক, আমার এখানে থাকাটা উচিত হবে না । তবে যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে স্বরন করতে ভুলো না । আসছি আমি.....

" দাঁড়াও,,, একসাথে যাবো ।

বাচ্চাদের ধরে উঠে দাঁড়ালো রমনী ।

চোয়াল খিচে নিলো আদ্র । খুবলে টেনে ধরলো ওর কনুই । হিসহিসিয়ে উঠলো.....

" কোথায় যাবি তুই ? বাড়াবাড়ি করবি না একদম । অনেক হয়েছে তোর এই লুকোচুরি । আমার ভাইটাকে শেষ করে দিয়েছিস তুই ! তোর জন্য আজ ওর এই অবস্থা ! নাটক পেয়েছিস ? বছরের পর বছর কোথায় ছিলি তুই ? দেশে আসলি কি করে ? মনে পড়ে নি আমার ভাইয়ের কথা ? সন্তান জন্ম দিয়েছিস ওর ! কোন স্পর্ধায় দূরে ছিলি এতো বছর ! কেনো শেষ করে দিলি রৌদ্রকে....

রোশ আর ইবাদ কুঁকড়ে গেছে । ভয় পাচ্ছে বাচ্চা দুটো । এদের পরিবারের মাঝে না ঢুকে উৎস নিঃশব্দে ঘর ছাড়লো । রোশ আর ইবাদ'কে নিজের কাছে টেনে নিলো মেহের । শুভ্রর ইশারা পেতেই বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ঘর ছাড়লো সেও । মেঘা গলে না আজ । কঠোরতা ধরে রেখেই ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে.....

" আমি শেষ করেছি তোমার ভাইকে ? নাকি সে আমায় শেষ করেছে ? ভাইয়ের হয়ে সাফাই গাচ্ছো ভাইয়া ? কেনো থাকতাম আমি তোমার ভাইয়ের কাছে ? আমার তো কোনো প্রয়োজন ছিলো না । তার জীবনে তিনি জাস্ট অতিরিক্ত হিসেবে রেখেছিলেন আমায় । অতিরিক্ত টুকু না হলেও চলতো । সংসার ছিলো তার,, স্ত্রী সন্তান.....

মেয়েটার পুরো কথা শেষ হলো না । তার আগেই আদ্রের শক্ত হাতের একটা চড় ঠাস করে আছড়ে পড়লো বাম গালে । চমকে উঠলেন সকলে ।

আকস্মিক আঘাতের টাল সামলাতে না পেরে ডান দিকে ছিটকে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেলো মেয়েটা । মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই ওকে ধরে ফেলল শুভ্র ।

মেঘা হতভম্ব হয় । টলমলে চোখে ছলকে তাকায় আদ্রের দিকে । প্রহারের টাল সামলে অবিশ্বাসে অস্ফুটে জবানে বুলি খসলো তার....

" ভাইয়া.....

" চুপ ! খবরদার ভাইয়া বলে ডাকবি না আমায় । স্বার্থপর কোথাকার । চুপচাপ আমার প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিবি । আমার ভাইকে ছেড়ে কোথায় চলে গেছিলি, বল ? এতো বছর কোথায় ছিলি তুই ? সুইজারল্যান্ড থেকে এখানে আসলি কি করে ? হ্যাঁ,, বল ! রোশ্, ইবাদ, ওরা আমার ভাইয়ের সন্তান ? আমার ভাইয়ের বাচ্চাদের ওর থেকে এতো বছর দূরে রাখার স্পর্ধা পেলি কোথায় ? তুই জানিস, তুই চলে আসার পর কি কি হয়েছে ? কোথায় না খুঁজেছি আমরা তোকে ! আরে চার বছর পেরিয়ে গেছে,, এখনো সুইজারল্যান্ডের মাটিতে তোর খোঁজ চলমান । তোকে হারিয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে আমার ভাই,,,পাগল হয়ে গেছে ওর তোর জন্য !

আদ্রের কন্ঠ ধরা ‌। কেঁপে উচ্চারিত হচ্ছে বাক্য গুলো । মেঘা ফিকড়ে ওঠে ।

" কেনো ? আমার জন্য কেনো পাগল হবেন উনি ? কে আমি ওনার ? ওনার তো স্ত্রী-সন্তান আছে,,, কোথায় তারা ? দেখছি না তো ! নাকি তোমরা এখনো তোমাদের বাড়ির বেপরোয়া ছেলের লুকানো সংসার সম্পর্কে জানতে পারোনি ! বলেনি তোমার ভাই তোমাকে ?

রমনীর এহেন কথায় ক্রোধ ঠিকড়ে ওঠে আদ্রের মুখাবয়বে । ফের চড়াও হয় মস্তিষ্ক । রক্ত বর্ন ধারন করে আঁখি যুগল । গর্জে ওঠে সে । গলা চড়িয়ে তীব্র চিৎকার জুড়ে ফের হাত উদ্যত করে আঘাতের জন্য ।

তবে এ বেলায় শক্ত চড় গালে পড়ার আগেই ওকে পেছনে ঠেলে আড়াল করে সামনে দাঁড়ালো শুভ্র ।

গাল চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘা ।

শুভ্র রাগি গলায় ধমকায় আদ্র কে.....

" ব্যস আদ্র,,, অনেক হয়েছে । শান্ত ভাবেও কথা বলা যায় । রাগারাগী করছিস কেনো এভাবে ? মেঘার দিকটাও বুঝতে হবে ।

" আর কি বুঝবো ভাইয়া ? ও বুঝেছে, বোঝার চেষ্টা করেছে আমার ভাইকে ? রুডিকে পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে ও ! চার বছর, কম সময় নয় । অনেক সময়, অনেক মাস, অনেক দিন । ভ্রান্ত চোখে কি দেখেছি কি দেখেনি, অমনি হারিয়ে গেলো ও ? জানার চেষ্টা করলো না সত্যটা ?

শুভ্রর পেছন থেকে বলে ওঠে রমনী.....

" কি জানবো আমি ? কি জানার বাকি ছিলো ?

নিজের চোখে দেখেছি আমি সব ! হাজার বার সন্দেহ করেছি তোমার ভাইকে, তবুও মুখ খুলিনি কখনো । শুধু নিজেকে মানাতাম, বোঝাতাম, যে আমার রৌদ্র আমাকে ভালোবাসে । তিনি আমাকে ঠকাতে পারেন না কিছুতেই । কিন্তু না,, আমি ভুল ছিলাম । ভুল ছিলো আমার ধারনা । ভুল ছিলো আমার বিশ্বাস ।

রাগ ধরে রাখতে না পেরে হিসহিসিয়ে ওঠে আদ্র । ঘাড় চেপে ধরে সরে দাঁড়ায় । এদিক ঝট করে পিছু ফেরে শুভ্র । ঠান্ডা হয়ে বলে......

" ভুল ছিলি তুই ? আসলেই ? রৌদ্রের অবস্থা দেখলি তো,,, একটুও খারাপ লাগছে না ? প্রশ্ন জাগছে না মনে, কি হয়েছে ওর ? জানবি না সত্যটা ?

মেঘা দুহাতে মুখ চেপে ফিকড়ে ওঠে ।

ধপ করে বসে যায় মেঝেতে । এবারে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রমনী । সবার চোখে জল । তোফায়েল কাবির বুঝতে পারেন ওর পরিস্থিতিও । একটু এগিয়ে যান । হাঁফ ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলেন.....

" তুমি ভুল ছিলে না মেঘা । ভুল ছিলো তোমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি । সেদিন যদি নিজের চোখের দেখাটাকে বিশ্বাস না করতে, তাহলে আজ এতো গুলো বছর এভাবে কাটতো না । সেদিন তুমি রৌদ্রকে প্রশ্ন করতে পারতে, মুখোমুখি হয়ে কৈফিয়ত চাইতে পারতে ওর কাছে । কিন্তু তুমি তেমন কিছুই করোনি । উল্টো নিজেকে সরিয়ে নিয়েছো খুব সন্তর্পণে । আর আমার ছেলেটাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে ছেড়েছো । জানো, তুমি চলে যাওয়ার পর রৌদ্রের কি হয়েছে ? কিভাবে বেঁচে ছিলো ও এতো গুলো বছর ? দেখলে তো ওর ছটফটানি !

মেঘা চোখ তুলে তাকায় । কথা বলতে পারে না ।

হেঁচকি উঠে গেছে,, কান্নারা জড়িয়ে যাচ্ছে গলায় । দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকাচ্ছে কন্ঠনালিতে । একাধারে পানি ঝড়ছে চোখ হতে । বুক ফেটে যায়,,, সে কেবলই প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে রয় ‌।

শুভ্র মেঝেতে বসলো ওর পাশে । টেনে নিজের দিকে ঘোরালো মেঘাকে । ভেজা দৃষ্টি যুবকের ‌। মেঘা হতভম্ব হয় সবার চোখে পানি দেখে । রুদ্ধতায় শুধোতে পারে না কিছু । শুভ্র মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে । তার আগেই মেহেরের হতচকিত কন্ঠ ভেসে আসলো দরজার কাছ থেকে....

" মা, বাবা,,, রৌদ্র ভাইয়া ঘুমোয় নি । উঠে পড়েছে আবার ! তাড়াতাড়ি এ ঘরে এসো...

#চলবে........

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯০ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

দোতলায় আদ্রের রুমে নিয়ে গিয়ে রৌদ্রকে স্থির করার যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে । কিন্তু সেই বেপরোয়া ছেলেকে ধরে রাখা বড্ড দায় । নিস্তেজ শরীরটাতে খানিক জোর পেয়েছে কি পাই নি, অমনি ঔদ্ধত্য হয়েছে আবার ।

ওকে শক্তি খাটিয়ে বিছানায় চেপে ধরার কসরত করছে শুভ্র আর তোফায়েল কাবির । ভদ্রলোক ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টাও করছেন । কিন্তু শুনছে না তাদের বেপরোয়া ছেলে । আদ্রর হাতে সিরিঞ্জ । প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা খুব বেশি বেড়ে রৌদ্রকে ধরে রাখা দায় হয়ে পড়ে । তাৎক্ষণিক মেডিসিন দিলেও সেটা কার্যকর হতে হতে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময় । সেই দিক বিবেচনা করে ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা একটা ইনজেকশন টা দেওয়া হয়েছে রৌদ্র কে । সময়ে অসময়ে কাজে লাগে এটা । যা শরীরের তীব্র কম্পন রুখে ধীরে ধীরে শান্ত করে ঘুমে অচেতন করে দেয় বেপরোয়া যুবককে । এতো বছরে আদ্র রৌদ্রকে পুরোপুরি সামলানো শিখে নিয়েছে ।

বরাবর ভাইকে দমন করার জন্য নিজে ইনজেকশন পুশ করে সে । তবে আজ রৌদ্র ছটফট করছে ভীষণ । এমন চলতে থাকলে তার হৃদযন্ত্রের রক্তনালী ব্লকেজ হতে পারে । অর্থাৎ আবারো হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা খুব বেশি তার । সামলানোর জন্য দ্রুত ইনজেক্ট করতে হবে ।

এই ইনজেকশনের তীব্র প্যানিক অ্যাটাক ও শরীরের কম্পন থামিয়ে রোগীকে ঘুম পাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে ঠিকি , তবে এটিরই ভুল ব্যবহারে মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকি হতে পারে । খুব সাবধানে ইনজেক্ট করতে হয় বরাবর । যা আজ সম্ভব হচ্ছে না ।

কেউ সামলাতে পারছে না বেপরোয়া যুবককে ।

শেষমেষ মেঘাকে সাথে নিয়ে সিঁড়ি চড়ে দোতলায় আদ্রের বরাদ্দ ঘরটায় ঢুকলেন রুবিনা কাবির । বিছানার উপর ছেলের অমন ছটফটে অবস্থা একঝলক দেখে নিলেন । অতঃপর মেয়েটাকে টেনে নিয়েই গেলেন বেডের পাশে । কান্না গিলে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন ধরা গলায়......

" রৌদ্র,,, এই দেখ বাবা, মেঘা এসে গেছে । ও কোত্থাও যাবে না তোকে ছেড়ে । আমরা যেতে দেবো না । তোর জন্য আমরা ঠিক আটকে রাখবো ওকে । এবার তুই একটু শান্ত হ বাবা । নয়তো অসুস্থ হয়ে যাবি আবার । ইনজেকশন টা দিতে দে,,, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে । আর কষ্ট হবে না ।

শুয়ে থেকে মেঘাকে দেখা মাত্রই হাসি খেলে গেলো বেপরোয়া যুবকের ওষ্ঠপূটে । নিমিষেই ছটফটানি কমিয়ে স্থির হয়ে গেলো সে । টইটুম্বুর চোখদুটি হালকা হলো পানি ঝড়ে । সে নিস্তেজ হতেই ওকে ছাড়লো শুভ্র । পিছিয়ে গেলো । হা করে শ্বাস টেনে হাত উঁচায় রৌদ্র । হতবুদ্ধ রমনীকে কাছে ডাকে ফিসফিস করে......

" ইভারা,,, কাছে এসো প্লিজ ।

আদ্র ভেজা চোখে চায় । হাতে টান মারে মেঘার । করুন চোখে চেয়ে বুলি আওড়ায়....

" মেঘ,,, ওর কাছে যাবি একটু ? আমি জাস্ট ইনজেকশন টা দেবো । প্লিজ মেঘ,,, আমার ভাইটা শেষ হয়ে যাবে নয়তো । প্লিজ...

মেঘার থেকে উত্তর না নিয়ে আদ্র নিজে ওকে টেনে রৌদ্রের শিয়রে বসিয়ে দিলো ।

হাসলো রৌদ্র । প্রশন্য হলো ভীষণ । ঝট করে ভার মাথাটা তুলে সেটাকে এলিয়ে দিলো রমনীর কোলে । পেঁচিয়ে নিলো তনুমধ্য । উদরের কাছে মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস টানলো চোখ বুজে । শব্দহীন হাসলো প্রশান্তিতে । বিড়বিড় করলো শান্ত হয়ে....

" আই লাভ ইউ সুইটহার্ট.....আই রিয়েলি লাভ ইউ !

যাতনায় ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে নেন বাড়ির সকলে । যে ছেলে একটু আগেও উন্মাদের ন্যায় আচরন করছিলো, থামানো যাচ্ছিলো না যাকে, সে এখন এই মেয়ের সংস্পর্শে এসে দমে গেলো নিমিষেই । এ কেমন অবাধ্যতা তার ?

আদ্র দম ছাড়ে । খুব সাবধানে ইনজেকশন পুশ করে রৌদ্রের ডান হাতের শিরায় ।

মেঘ তব্দা বনে দেখে । ঝিমিয়ে আসে রৌদ্র । অসার হয়ে আলগা হয় তার হাতের বাঁধন । সে বুঝতে পারছে, সে এখন জ্ঞান খোয়াবে । ঘুমে তলিয়ে যাবে । ঘুমোলে যদি মেঘা পালিয়ে যায়, তাহলে কি হবে ? এই ভাবনা আসতেই জ্ঞান শূন্য হওয়ার আগে তড়াক করে দৃষ্টি মেললো যুবক । ধড়ফড় করে এপাশ ওপাশ তাকালো । বালিশের কাছে শিশিরের একটা ওরনা দেখতে পেলো । নিভু নিভু চোখে চেয়ে হাত বাড়িয়ে সেটাকে টেনে নিলো দখলে ।

আলগোছে ওরনার এক মাথা পেঁচালো নিজের হাতের সাথে । অপর মাথা মেঘার বাম হাতের কব্জিতে বাঁধলো । অতঃপর আধো আধো চোখ তুলে তাকালো মেঘার দিকে । ঝাপসা হয়ে বুজে আসছে ভেজা পাপড়ি । সে মৃদু হেসে বিড়বিড় করলো ঘোরের বশে.....

" কোত্থাও যেও না, কেমন ? খুলে দিও না এই বাঁধন । আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না । কষ্ট হয় আমার । ভীষণ কষ্ট হয়, সুইটহার্ট ।

সম্পুর্ন অচেতন হওয়ার আগে পরক্ষণে তোফায়েল কাবির কে উদ্দেশ্য করে বললো আধো ভাঙ্গা গলায়....

" ড্যাড,,, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে ড্যাড । আমি ঘুমিয়ে গেলে তোমরা ওকে দেখে রাখবে প্লিজ । কোত্থাও যেতে দেবে না আর । আটকে রাখবে । আমি ঘুম থেকে উঠে ওকে চাই । ওকে আর হারাতে দিও না ড্যাড । আমার জন্য আটকে রেখো ।

বিড়বিড় করতে করতে এক পর্যায়ে আর কন্ঠ উঠলো না । নিভে এসে ঘুমের অতলে হারালো যুবক । শান্ত হলো সে । নিস্তব্ধ হলো আশপাশ ।

মেঘা পাথরের ন্যায় বসে আছে অনুভূতি হীন । গোটা ঘরে সবার উপস্থিতি থাকলেও কারোর মুখে রা নেই ।

পিনপতন নীরবতা । যাতে ছেদ ঘটলো বাচ্চার ডাকে......

" মাম্মা.....!

ছ্যাত করে ওঠে মেঘা । সচকিতে তাকায় ।

দরজার চৌকাঠ মাড়িয়ে ভেতরে পা রেখেছে #উৎস নামক যুবকটি । মেঘার বাচ্চা দুটো তার কাছেই । রোশ ডেকেই ওষ্ঠ উল্টে ছোট ছোট চোখে দেখছে নিজের মাকে । #ইবাদ ও তাকিয়ে আছে অবাক লোচনে । বাচ্চা দুটো এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না ।

মেঘা শুষ্ক ঢোক গেলে । বাড়ির সবাই দরজার দিকে তাকিয়েছে একই সাথে । উৎসের সাথে এই বাচ্চা দুটোকে দেখে দৃষ্টি কুঁচকে আসলো সবার । সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এরা কারা ? এই ছেলেটাই বা কে ? সেই সাথে আরো অনেক প্রশ্ন রয়েছে ।

আদ্র ভেজা ঢোক গেলে । মেঘার কোল থেকে রৌদ্রকে সরিয়ে বেডে শুইয়ে দেয় ভালোভাবে । মেঘার হাত থেকে ওরনার বাঁধন টাও খুলে দেয় । চোয়াল শক্ত যুবকের । সে শক্ত করেই মেঘার হাতের কব্জি চেপে ধরল । বললো ধারালো কন্ঠে....

" চল আমার সাথে.....

পাশেরটা রৌদ্রের ঘর ।

সে ঘরে ভিড় জমলো । মাঝামাঝি নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে রমনী । আদ্র ওর মুখোমুখি । আশেপাশে ওকে ঘিরে সবাই । রোশ, ইবাদ, উৎস, ওরাও আছে ।

এখনো সবকিছু ঘোলাটে সবার কাছে । আদ্র ভারিক্কি গলায় প্রশ্ন করে ভনীতা হীন.....

" এতো দিন কোথায় ছিলি তুই ?

মেঘা ঢোক গিললো । উত্তর করলো সাবলীল.....

" এখানেই । তবে আর থাকবো না ।

" থাকবি না মানে, কোথায় যাবি ?

" যেখানে আবার আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না, সেখানে !

" মেঘ !

চেঁচিয়ে ওঠে আদ্র । খানিক কেঁপে পেছাতে গিয়েও দমে যায় রমনী । তোফায়েল কাবির বলেন ঠান্ডা গলায়....

" আদ্র,,, শান্ত হয়ে কথা বলো । বাচ্চারা আছে এখানে !

মুখ গোল করে শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে যুবক । বাচ্চাদের প্রসঙ্গ উঠতেই তড়াক করে দরজার পাশে তাকায় । চোয়াল খিচে শুধোয়.....

" ওরা কারা, মেঘ ?

মেঘা মাথা তুললো । নিজের ছেলে মেয়ের দিকে তাকালো এক ঝলক । একটুও গলা জড়ালো না প্রত্যুত্তরে......

" আমার ছেলে মেয়ে ওরা !

আদ্র ছলকে যায় । পরের প্রশ্নে গলা কাঁপে.....

" আর এই ছেলেটা,,, সে কে ?

" এক্সকিউজ মি,, আমি....

উৎস মুখ খুলে কিছু বলার আগেই ধমকে উঠলো আদ্র.....

" শাট আপ,,, আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি । চুপ করে থাকুন । মেঘ,, বল , কে ও ?

" ও উৎস ! আমরা একসাথে কাজ করি ।

রুবিনা কাবির তেড়ে যান । কনুইয়ে হেঁচকা টানে রমনীকে ফেরান নিজের দিকে ! ভয়ে ভয়ে শুধোন.....

" এই বাচ্চা,,,, বাচ্চা গুলো কার ?

" আমার ! ওরা আমার সন্তান ! আমি ওদের মা ।

" বাবা কে ওদের ?

মেঘার চোখ বেয়ে নির্বিঘ্নে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । ব্যাথা পিছে ঠেলে উত্তর করে দ্বিধাহীন....

" ওদের কোনো বাবা নেই ! শুধু মা আছে,,আমি ওদের মা । আর কেউ নেই.....

ললাট কুঞ্চিত হয় সকলের । বুঝতে বাকি রয় না কিছু । ফুঁপিয়ে ওঠেন ভদ্রমহিলা । থেমে থেমে জিজ্ঞাসা করেন সন্দেহ কাটাতে......

" ওরা আমার রৌদ্রের বাচ্চা, মেঘা ? আমার ছেলের ? আমাদের নাতি নাতনি ওরা ? আমার রৌদ্রের জমজ বাচ্চা হয়েছে ? আমারা ছেলেটা দুই সন্তানের বাবা হয়েছে !

ফুঁপিয়ে হেসে উঠলেন তিনি । ছুটে গেলেন বাচ্চা দুটোর কাছে । একসাথে দুটোকে টেনে মিশিয়ে নিলেন বুকের সাথে । কেঁদে উঠলেন শব্দ করে । আহাজারি করলেন......

" এ‌ দুটো আমার নাতি নাতনি । আমার ছেলের অংশ । আমাদের রক্ত । নিজেদের রক্ত কে চিনতে নাকি কেউ ভুল করে না, দেখেছেন আমারাও ভুল করিনি । আমার রৌদ্র ঠিক চিনেছিলো নিজের মেয়েকে । ও কাল রোশকে দেখে ঠিক আন্দাজ করেছিলো, যে এটা ওর মেয়ে । রোশ্ যখন কাঁদছিল, আমরা কেউ সামলাতে পারছিলাম না ওকে । কিন্তু রৌদ্র, ওর কোলে যাওয়া মাত্রই চুপ করে গেছে বাচ্চাটা । রৌদ্র বলেছিলো কাল, যে মেঘার মতো এর নাকের ডগাতেও তিল আছে । ও বলেছিলো এই বাচ্চাটা মেঘার মতো । আমরা কেউ গুরুত্ব দেইনি ওর কথায় । এখন দেখেছেন তো,, আমার রৌদ্র ভুল নয় । এটা আমার রৌদ্রের মেয়ে । আমার ছেলের জমজ বাচ্চা হয়েছে । ছেলে, মেয়ে দুটো সন্তানের বাবা হয়েছে আমার পাগল ছেলেটা । অথচ ও এখনো জানতেই পারলো না এসব । ওর সন্তানের মুখে বাবা ডাক শুনলো না এখনো ।

কথা বলার মাঝে ডুকরে উঠলেন তিনি । মেঘা চোখ বুজে নেয় । তাচ্ছিল্য হেসে বলে.....

" ভুল বললে মা,,,, তোমার ছেলে তার সন্তানের মুখে অনেক আগেই বাবা ডাক শুনে ফেলেছে । এ দুটো তার সন্তান নয় । এরা শুধু আমার সন্তান ।

আদ্র মাড়ি খিচে ধমকে ওঠে.....

" আচ্ছা,, ওরা শুধু তোর সন্তান !

চোখ তুলে তাকালো মেঘা....

" হ্যাঁ । ওরা শুধু আমার সন্তান । আর কেউ নেই ওদের । রোশ্, ইবাদ, মাম্মার কাছে এসো ।

মায়ের ডাক পেতেই রুবিনা কাবিরের বুক থেকে এক ছুটে মায়ের কাছে গেলো বাচ্চা দুটো । মেঘা হাঁটু মুড়ে বসতেই দুটোতে ঝাঁপিয়ে পড়লো বুকে ।

মেঘা জড়িয়ে নেয় ওদের । কান্না গিলে বিড়বিড় করে.....

" ওরা শুধু আমার সন্তান । শুধু আমার ।

উৎস সবকিছু দেখেছে এতক্ষণ অবধি । কোনো কিছুই বুঝতে বাকি নেই ওর । এখানকার কাউকে চিনতেও বাকি নেই । সে মুচকি হাসলো । বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল....

" মেঘা,,, আমি ডরমেটরিতে যাচ্ছি । আই থিংক, আমার এখানে থাকাটা উচিত হবে না । তবে যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে স্বরন করতে ভুলো না । আসছি আমি.....

" দাঁড়াও,,, একসাথে যাবো ।

বাচ্চাদের ধরে উঠে দাঁড়ালো রমনী ।

চোয়াল খিচে নিলো আদ্র । খুবলে টেনে ধরলো ওর কনুই । হিসহিসিয়ে উঠলো.....

" কোথায় যাবি তুই ? বাড়াবাড়ি করবি না একদম । অনেক হয়েছে তোর এই লুকোচুরি । আমার ভাইটাকে শেষ করে দিয়েছিস তুই ! তোর জন্য আজ ওর এই অবস্থা ! নাটক পেয়েছিস ? বছরের পর বছর কোথায় ছিলি তুই ? দেশে আসলি কি করে ? মনে পড়ে নি আমার ভাইয়ের কথা ? সন্তান জন্ম দিয়েছিস ওর ! কোন স্পর্ধায় দূরে ছিলি এতো বছর ! কেনো শেষ করে দিলি রৌদ্রকে....

রোশ আর ইবাদ কুঁকড়ে গেছে । ভয় পাচ্ছে বাচ্চা দুটো । এদের পরিবারের মাঝে না ঢুকে উৎস নিঃশব্দে ঘর ছাড়লো । রোশ আর ইবাদ'কে নিজের কাছে টেনে নিলো মেহের । শুভ্রর ইশারা পেতেই বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ঘর ছাড়লো সেও । মেঘা গলে না আজ । কঠোরতা ধরে রেখেই ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে.....

" আমি শেষ করেছি তোমার ভাইকে ? নাকি সে আমায় শেষ করেছে ? ভাইয়ের হয়ে সাফাই গাচ্ছো ভাইয়া ? কেনো থাকতাম আমি তোমার ভাইয়ের কাছে ? আমার তো কোনো প্রয়োজন ছিলো না । তার জীবনে তিনি জাস্ট অতিরিক্ত হিসেবে রেখেছিলেন আমায় । অতিরিক্ত টুকু না হলেও চলতো । সংসার ছিলো তার,, স্ত্রী সন্তান.....

মেয়েটার পুরো কথা শেষ হলো না । তার আগেই আদ্রের শক্ত হাতের একটা চড় ঠাস করে আছড়ে পড়লো বাম গালে । চমকে উঠলেন সকলে ।

আকস্মিক আঘাতের টাল সামলাতে না পেরে ডান দিকে ছিটকে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেলো মেয়েটা । মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই ওকে ধরে ফেলল শুভ্র ।

মেঘা হতভম্ব হয় । টলমলে চোখে ছলকে তাকায় আদ্রের দিকে । প্রহারের টাল সামলে অবিশ্বাসে অস্ফুটে জবানে বুলি খসলো তার....

" ভাইয়া.....

" চুপ ! খবরদার ভাইয়া বলে ডাকবি না আমায় । স্বার্থপর কোথাকার । চুপচাপ আমার প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিবি । আমার ভাইকে ছেড়ে কোথায় চলে গেছিলি, বল ? এতো বছর কোথায় ছিলি তুই ? সুইজারল্যান্ড থেকে এখানে আসলি কি করে ? হ্যাঁ,, বল ! রোশ্, ইবাদ, ওরা আমার ভাইয়ের সন্তান ? আমার ভাইয়ের বাচ্চাদের ওর থেকে এতো বছর দূরে রাখার স্পর্ধা পেলি কোথায় ? তুই জানিস, তুই চলে আসার পর কি কি হয়েছে ? কোথায় না খুঁজেছি আমরা তোকে ! আরে চার বছর পেরিয়ে গেছে,, এখনো সুইজারল্যান্ডের মাটিতে তোর খোঁজ চলমান । তোকে হারিয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে আমার ভাই,,,পাগল হয়ে গেছে ওর তোর জন্য !

আদ্রের কন্ঠ ধরা ‌। কেঁপে উচ্চারিত হচ্ছে বাক্য গুলো । মেঘা ফিকড়ে ওঠে ।

" কেনো ? আমার জন্য কেনো পাগল হবেন উনি ? কে আমি ওনার ? ওনার তো স্ত্রী-সন্তান আছে,,, কোথায় তারা ? দেখছি না তো ! নাকি তোমরা এখনো তোমাদের বাড়ির বেপরোয়া ছেলের লুকানো সংসার সম্পর্কে জানতে পারোনি ! বলেনি তোমার ভাই তোমাকে ?

রমনীর এহেন কথায় ক্রোধ ঠিকড়ে ওঠে আদ্রের মুখাবয়বে । ফের চড়াও হয় মস্তিষ্ক । রক্ত বর্ন ধারন করে আঁখি যুগল । গর্জে ওঠে সে । গলা চড়িয়ে তীব্র চিৎকার জুড়ে ফের হাত উদ্যত করে আঘাতের জন্য ।

তবে এ বেলায় শক্ত চড় গালে পড়ার আগেই ওকে পেছনে ঠেলে আড়াল করে সামনে দাঁড়ালো শুভ্র ।

গাল চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘা ।

শুভ্র রাগি গলায় ধমকায় আদ্র কে.....

" ব্যস আদ্র,,, অনেক হয়েছে । শান্ত ভাবেও কথা বলা যায় । রাগারাগী করছিস কেনো এভাবে ? মেঘার দিকটাও বুঝতে হবে ।

" আর কি বুঝবো ভাইয়া ? ও বুঝেছে, বোঝার চেষ্টা করেছে আমার ভাইকে ? রুডিকে পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে ও ! চার বছর, কম সময় নয় । অনেক সময়, অনেক মাস, অনেক দিন । ভ্রান্ত চোখে কি দেখেছি কি দেখেনি, অমনি হারিয়ে গেলো ও ? জানার চেষ্টা করলো না সত্যটা ?

শুভ্রর পেছন থেকে বলে ওঠে রমনী.....

" কি জানবো আমি ? কি জানার বাকি ছিলো ?

নিজের চোখে দেখেছি আমি সব ! হাজার বার সন্দেহ করেছি তোমার ভাইকে, তবুও মুখ খুলিনি কখনো । শুধু নিজেকে মানাতাম, বোঝাতাম, যে আমার রৌদ্র আমাকে ভালোবাসে । তিনি আমাকে ঠকাতে পারেন না কিছুতেই । কিন্তু না,, আমি ভুল ছিলাম । ভুল ছিলো আমার ধারনা । ভুল ছিলো আমার বিশ্বাস ।

রাগ ধরে রাখতে না পেরে হিসহিসিয়ে ওঠে আদ্র । ঘাড় চেপে ধরে সরে দাঁড়ায় । এদিক ঝট করে পিছু ফেরে শুভ্র । ঠান্ডা হয়ে বলে......

" ভুল ছিলি তুই ? আসলেই ? রৌদ্রের অবস্থা দেখলি তো,,, একটুও খারাপ লাগছে না ? প্রশ্ন জাগছে না মনে, কি হয়েছে ওর ? জানবি না সত্যটা ?

মেঘা দুহাতে মুখ চেপে ফিকড়ে ওঠে ।

ধপ করে বসে যায় মেঝেতে । এবারে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রমনী । সবার চোখে জল । তোফায়েল কাবির বুঝতে পারেন ওর পরিস্থিতিও । একটু এগিয়ে যান । হাঁফ ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলেন.....

" তুমি ভুল ছিলে না মেঘা । ভুল ছিলো তোমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি । সেদিন যদি নিজের চোখের দেখাটাকে বিশ্বাস না করতে, তাহলে আজ এতো গুলো বছর এভাবে কাটতো না । সেদিন তুমি রৌদ্রকে প্রশ্ন করতে পারতে, মুখোমুখি হয়ে কৈফিয়ত চাইতে পারতে ওর কাছে । কিন্তু তুমি তেমন কিছুই করোনি । উল্টো নিজেকে সরিয়ে নিয়েছো খুব সন্তর্পণে । আর আমার ছেলেটাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে ছেড়েছো । জানো, তুমি চলে যাওয়ার পর রৌদ্রের কি হয়েছে ? কিভাবে বেঁচে ছিলো ও এতো গুলো বছর ? দেখলে তো ওর ছটফটানি !

মেঘা চোখ তুলে তাকায় । কথা বলতে পারে না ।

হেঁচকি উঠে গেছে,, কান্নারা জড়িয়ে যাচ্ছে গলায় । দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকাচ্ছে কন্ঠনালিতে । একাধারে পানি ঝড়ছে চোখ হতে । বুক ফেটে যায়,,, সে কেবলই প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে রয় ‌।

শুভ্র মেঝেতে বসলো ওর পাশে । টেনে নিজের দিকে ঘোরালো মেঘাকে । ভেজা দৃষ্টি যুবকের ‌। মেঘা হতভম্ব হয় সবার চোখে পানি দেখে । রুদ্ধতায় শুধোতে পারে না কিছু । শুভ্র মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে । তার আগেই মেহেরের হতচকিত কন্ঠ ভেসে আসলো দরজার কাছ থেকে....

" মা, বাবা,,, রৌদ্র ভাইয়া ঘুমোয় নি । উঠে পড়েছে আবার ! তাড়াতাড়ি এ ঘরে এসো...

#চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন