#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৯১
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
ইনজেকশনের প্রতিক্রিয়ায় সম্পুর্ন ধ্যান জ্ঞান নেই বেপরোয়া যুবকের । কোনো রকমে উঠে বসেছিলো ঠিকি, তবে দূর্বলতায় দাঁড়াতে গিয়ে অসার শরীর খানা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মেঝেতে ।
বেড সাইড টেবিলের উপর সিরামিক ফ্লাওয়ার ভেস্ ছিলো একটা । হাত লেগে সেটাও ঠাস করে মেঝেতে পড়ে ঝরঝর করে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে । রৌদ্র টাল হারিয়ে পড়েছিলো সেই টুকরো গুলোর উপর । ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু ফ্র্যাগমেন্টস গেঁথে গেছে হাতের তালু সহ কপালের এক কোণে । কোমরের কাছেও হেনে বসেছে । টলটলে তাজা রক্ত ও গড়িয়েছে । তবুও একটুও ব্যাথা লাগে নি বেপরোয়া যুবকের ।
কেবলই ঘরে কাউকে না দেখে আঁতকে উঠেছিলো অন্তরাত্মা ।
হামাগুড়ি দিয়ে কোনো রকমে ঘরের মাঝ বরাবর এসে নেতিয়ে পড়েছে । হাঁসফাঁস করে কাতরাচ্ছে সেখানে ।
বাচ্চা দুটোকে নিয়ে তিন তলায় উঠেছিলো মেহের । রোশ শান্ত থাকলেও ইবাদ বড্ড অশান্ত । জ্বালাতন করছিলো । সামলাতে না পেরে নিচে নেমেই রৌদ্রের এমন অবস্থা দেখে আঁতকে উঠেছিলো রমনী । অমনি হাঁক ছেড়েছে ।
এখন এ ঘরে ছুটে আসলো সবাই ।
রৌদ্রকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে হুড়মুড়িয়ে ওর কাছে বসে আদ্র । ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে.....
" রুডি,,, ভাই । কি অবস্থা করেছিস ? পড়ে গেলি কি করে ? ইনজেক্ট করেছি, তবুও ঘুমোস নি তুই ? আমরা তো আছি ভাই, ছিলাম পাশের ঘরে ।
রৌদ্রের নিভু চোখ, ভেজা মুখ । ঠান্ডা শরীর ।
সে ভাইয়ের দিকে তাকালো । কিচ্ছুটি বললো না । চোখ ফিরিয়ে সবাইকে দেখে নিলো থেমে থেমে । দরজার কাছে শুভ্রর পাশে মেঘা দাঁড়িয়ে । রমনীকে দেখেই যেনো প্রাণ ফিরে আসলো তার । ঠোঁট ঠেলে হাসলো একটু । মেঘাকে নিজের কাছে ডাকলো চোখের ইশারায় ।
মেঘা ভেজা চোখ তুলে শুভ্রর দিকে তাকায় । নরম ইশারা পেতেই গুটি গুটি পায়ে রৌদ্রের কাছ ঘেঁষে মেঝেতে বসলো রমনী । দু ঢোক গিলে নিজেকে যথাসম্ভব ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো ।
এদিকে বসা মাত্রই ওর কোলে নিজের ভারী মাথাটা তুলে রাখে রৌদ্র । নিজের রক্তাক্ত ভেজা ভেজা মুখখানা আড়াল করে মেয়েটার কোলে । নিভু চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে বলে......
" তাকিও না আমার দিকে,,, রক্তে ফোবিয়া আছে তো !
ধক্ করে ওঠে মেয়েটার বক্ষস্থল । ওষ্ঠ ভেঙে কেঁদে ওঠে ।
আদ্র হাসে,,, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে তিরষ্কার করে....
" বুঝলি কিছু ? কথাটার অর্থ ঢুকলো মোটা মাথায় ? ও নিজে রক্তাক্ত হয়েও তোর চিন্তা করছে । তোর ফোবিয়া আছে, সেই চিন্তা করছে । আর তুই ? হুহহ,,, শেইম অন ইউ, মেঘ ।
তিক্ত জবানের কথাটায় রৌদ্র বিব্রত হয় । মাথা কাত করে চোখ মেলে চায় । ললাটে বিস্তর ভাঁজ নিয়ে ঠোঁটে আঙুল চেপে থামিয়ে দেয় আদ্র'কে.....
" হুশশশশশ,,, চুপ,,, খবরদার ওকে কেউ কিছু বলবি না । ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে নয়তো । ওর কোনো দোষ নেই । সব দোষ আমার । আমি ওকে কিছু বলিনি । আমার ভুল । আ'ম স্যরি ইভারা ! আমি তোমাকে সব বলতে চেয়েছিলাম,,, কিন্তু তুমি সঠিক সময়টা দিলে না আমায় । চলে এলে কেনো এভাবে ? কতদিন পেরিয়ে গেছে বলতো ? আমাকে ছাড়া এই চারটে বছর কাটাতে পারলে ? এতো হার্টলেস হলে কবে থেকে ?
মেঘা কান্না চেপে রুদ্ধতা গিলে ঠোঁট কাঁপিয়ে প্রত্যুত্তরে আওড়ায়.....
" যবে থেকে আমার স্বামী অন্য কারোর হয়ে গেছে, তবে থেকে । যবে থেকে আমার স্বামীর লুকানো মিথ্যে গুলো আমার চোখে পড়ে গেছে, তবে থেকে । যবে থেকে আমার সন্তান তাকে পাপা ডাকার আগে অন্য কারোর সন্তানের পাপা হয়ে গেছে সে, তবে থেকে । যবে থেকে বুঝে গেছি, আমার রৌদ্র আমাকে ভালোবাসেনি তবে থেকে । সেদিন নিজ চোখে সব দেখেছি আমি । শুনেছি সব । বুঝেছি, আমার রৌদ্র আমার সাথে অভিনয় করেছে শুধু । কেনো রৌদ্র ? ভালোবাসার নাম করে আপনি আমাকে ঠকালেন কেনো এভাবে ?
কথার শেষে ফুঁপিয়ে ওঠে রমনী ।
ওর মনের এমন অযৌক্তিক সন্দেহ দেখে তাৎক্ষণিক চোখ মুখ পাকিয়ে তপ্ত স্বরে ঝেড়ে ওঠে আদ্র.....
" রুডি তোকে ঠকিয়েছে ? সিরিয়াসলি ! তুই আমার ভাইয়ের ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করছিস, মেঘ ? অথচ তোকে হারিয়ে ফেলার পর, পরপর দুবার হার্ট অ্যাটাক করে দীর্ঘ এগারোটা মাস কোমায় পড়েছিলো আমার ভাই ।
এহেন কথায় কান্নার মাঝে ছলকে ওঠে মেঘা । ঝটকা খায় । থরথরিয়ে কাঁপে ললিতাঙ্গ । বিদ্যুতের ন্যায় শিহরণ বয়ে যায় কোমলাঙ্গে । কি শুনলো সে ? না বুঝে সহসা শুধোয় নির্বোধ রমনী....
" হ্যাঁ ? কো....ক...কোমা মানে ?
" কোমা মানে কোমা, বুঝিস আশা করি ।
" ক....কি বলছো এসব ?
" যা শুনছিস তাই । আদৌও খোঁজ রেখেছিলি কোনো কিছুর ? কি কি ঘটে গেছে তুই চলে আসার পর, জানিস ! বেশ অক্ষত আছিস দেখছি । তবে, চারটা বছর লুকিয়ে ছিলি কেনো রে ? আমার ভাই টাকে শেষ করে দিলি কেনো ? কেনো পালিয়েছিলি সেদিন ?
তুই হারিয়ে যাওয়ার পর কি হয়েছে, একটা বারও জানার ইচ্ছে হয় নি ? তোকে না পেয়ে আমার ভাইটার কি অবস্থা হয়েছিলো, সেটাও জানতে ইচ্ছে করেনি ? এক দিনের জন্যও ভালোবাসিস নি ওকে ? চিনিস নি ? তুই তো জানতিস, তোর মুখে একবার ডিভোর্সের কথা শুনেই হার্ট অ্যাটাক করেছিলো রুডি । সেক্ষেত্রে ভেবে দেখতো, তোকে হারিয়ে ফেলার পর ওর ঠিক কি অবস্থা হয়েছিলো ?
আদ্রের এমন অসম্পূর্ণ অস্পষ্ট কথাগুলোর অর্থ বুঝে উঠতে পারে না রমনী ।
ভেতর কাঁপে । কলিজা শুকিয়ে যায় । রৌদ্র কে হুইলচেয়ারে দেখেছে সে, তবুও এলোমেলো মনটা কিছুই বুঝতে পারেনি ।
এখন আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠলো অনুচ্চ তনু । চাতকের ন্যায় বিচলিত হলো অশ্রুসজল নয়ন জোড়া ।
সে ছটফট করে উঠলো । বাষ্পাকুল কণ্ঠে ভেঙে ভেঙে বুলি বেরোলো.....
" কি বলছো ভাইয়া ? হেঁয়ালি করো না প্লিজ । কি হয়েছে আমার রৌদ্রের ! হুইলচেয়ারে কেনো বসে ছিলো ? হার্ট অ্যাটাক, কোমা,, এসব কি বলছো তুমি ?
বলতে বলতে রৌদ্রের দিকে চোখ নামালো । লোকটা ঔষধের চোটে অর্ধ জ্ঞান শূন্য । চোখ বন্ধ । রমনী ঝাকালো ওকে । হেঁচকি তুলে ডাকলো.....
" রো... রৌদ্র ?
ওপাশ হতে প্রত্যুত্তর আসতে ন্যানো সেকেন্ড ও লাগলো না বোধহয়.....
" বলো সুইটহার্ট !
শান্ত ধীরুজ উত্তরে হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা । কেঁপে ওঠে ঘরের চারটি দেয়াল । সে বাহু টেনে রৌদ্রকে ওঠানোর চেষ্টা করে । পারে না, কুলোয় না শক্তি ।
মেঘার কান্না আর ব্যাকুলতায় রৌদ্র নিজেই শিরোভার সামলে উঠে বসলো । ইনজেকশনের এফেক্ট পড়েনি পুরোপুরি । তবে সে ঘোরে আছে । চোখ মেলতে পারছে না প্রভাবে । পত্র যুগল নিভে আসছে আপনা আপনি ।
টেনে টুনে আঁখি মেললো যুবক । মেঘাকে কাঁদতে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলো । রমনীর চোখ মুছিয়ে দিতে দিতেই আর পারলো না বসে থাকতা ।
ভারী মাথাটা এলিয়ে মেঘার কাঁধে রাখলো । বুজে এলো চোখ । ঠিক গলার নিকট মুখ গুজে বললো....
" কাঁদছো কেনো জান,, কষ্ট হয় আমার ।
" ক...কি হয়েছে আপনার ?
" কিছু না,, আ'ম ওকে ! ব্যস,,,ঘুম পাচ্ছে একটু !
আদ্র পেছন থেকে ওর কাঁধে হাত রাখে.....
" ঘুমা তুই !
" উঁহু,, আমি ঘুমিয়ে গেলে ও চলে যাবে । ওকে আটকাতে পারবে না তোমরা !
মেঘা নাক টানে । আদ্রের থেকে ইশারা পেতেই বলে বোঝানোর জন্য.....
" যাবো না । আপনি ঘুমান ।
" প্রমিস ?
" হু !
আশ্বাস পেলো যুবক ।
পেঁচিয়ে নিলো লতানো কটিদেশ । নিবিড়ভাবে মেয়েটাকে জড়িয়ে কাঁধে মাথা গুঁজে শ্বাস ফেললো ।
মস্তিষ্ক ঠান্ডা হলো তার । ঔষধের ক্রিয়ার বিপরীতে গেলো না আর । মেঝেতেই রইলো ওরা ।
বেশ কিছুক্ষণ বাদ মেঘা বুক চিরে শ্বাস ফেলে ! শুধোয় আদ্রকে......
" বললে না তো বাকিটা ? কি হয়েছিলো ওনার ?
" অনেক কিছু হয়ে গেছে ।
তোকে খুঁজে না পেয়ে সেদিন পরপর চারবার প্যানিক অ্যাটাক এসেছিলো রুডির । ষোল ঘন্টায় চার বার প্যানিক অ্যাটাক, একবার হার্ট অ্যাটাক করেছে । দুদিন বাদ জ্ঞান ফেরার পর তোকে না দেখে দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাক এসেছিলো ওর । তারপর আর জ্ঞান ফেরেনি । সেই অ্যাটাকের পর এগারোটা মাস,, গুনে গুনে এগারোটা মাস কোমায় পড়েছিলো আমার ভাই । বুঝতে পারছিস মেঘ ? কোমায় চলে গেছিলো রুডি । শুধু তোর জন্য, তোর বিরহে, তোর হারানোর চিন্তা করে ।
কোমায় যাওয়ার আগ অবধিও তোর চিন্তা করে গেছে ও । চোখ বন্ধ করার আগেও তুই একলা আছিস, তোর ক্ষতি হয়ে যাবে এই চিন্তা করেছে ।
আর কোমা থেকে ফিরে আসার পর ওর প্রথম প্রশ্ন কি ছিলো জানিস,,, আমার জান কোথায় ? তোমরা খুঁজে পাওনি ওকে ?
এই একটা কথাই ছিলো ওর মুখে । তারপর এতো বছরে আমাদের সাথে আর দু বাক্যেও কথা বলেনি কখনো । বলেছে তখনই, যখন তুই ওর ভ্রমে আসতি । ওকে জ্বালাতন করতি ।
তোর স্মৃতি নিস্তার দেয়নি ওকে । সময়ে অসময়ে হ্যালুসিনেশন, প্যানিক অ্যাটাক, সব মিলিয়ে শেষ হয়ে গেছে আমার ভাইটা । কোমা থেকে ফেরার পরও হাঁটে নি চার বছর । পড়ে ছিলো হুইলচেয়ারে । দেখলি তো....
আশ্চর্যের চরম সীমান্তে পৌঁছায় রমনী । ঠান্ডা হয়ে জমে যায় তার সর্বাঙ্গ । শিরশির করে হাত পা । ধোঁয়া ছাড়ে দু কান । বোধগম্য হয় না । কি বলছে আদ্র এসব ? মেঘা বিশ্বাস করলো না । মাথা নাড়ালো দুদিকে । চোখ তুলে তোফায়েল কাবিরের দিকে তাকালো । ডাকলো.....
" বাবা,,, ভাইয়া এসব কি বলছে বাবা ?
ভদ্রলোক বসেন ছেলে বউমার পাশে । মেঘার দিকে তাকিয়ে বলেন স্বভাব সুলভ শান্ত কন্ঠে.....
" ঠিক বলছে !
তুমি চলে আসার পর রৌদ্রের দুবার অ্যাটাক এসেছিলো মেঘা । লাস্ট অ্যাটাকের পর ও কোমায় ছিলো এগারো মাস । হুইলচেয়ারে কেনো ছিলো জিজ্ঞেস করলে না তখন ? ও হুইলচেয়ারে চলাফেরা করে এখন,,, কারন ও হাঁটতে পারে না ! হয়তো পারে, তবে হাঁটে নি । নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি আজ অবধি । কথা বলেনি কখনো । সব তোমার জন্য, তোমাকে হারিয়ে ! কি শুনবে আর ? দেখতে তো পারলে না আমার ছেলেটার সেই যন্ত্রণা গুলো !
দুলে ওঠে মেঘার শরীর । তিরতিরিয়ে কাঁপে চিবুক । ঝরঝরিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে গাল ছাপিয়ে । পাথর হয়ে যায় সে । নড়ে না একটুও ।
নিষ্পলক ভরা দৃষ্টিতে ঘোর । মাথা কাজ করে না রমনীর ।
তোফায়েল কাবির ডাকেন...
" মেঘা !
চমকে ওঠে রমনী ।
তড়াক করে চোখ নামিয়ে রৌদ্রের দিকে তাকায় । লোকটা নিশ্চুপ হয়ে ঘুমিয়ে গেছে এতক্ষণে । তার ভারী উষ্ণ শ্বাস নিজের গ্রীবার নিকট অনুভব করছে সে ।
মেঘার গলা কাঁপে । সে বাম হাত উঠিয়ে রৌদ্রের মাথায় রাখে । অতঃপর খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভরা গালে ।
ডান হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে লোকটাকে । হু হু করে কেঁদে ওঠে বুক চিরে ।
রুবিনা কাবির মুখ ফিরিয়ে নিলেন । চোখ মুছে বললেন কটাক্ষ করে.....
" এখন কাঁদছিস কেনো ? আমার ছেলেটা পাগল ছিলো তোর জন্য, সে কথা মনে ছিলো না ? ওকে ওভাবে ছেড়ে যেতে পারলি কি করে তুই ? কেনো এভাবে কষ্ট দিলি আমার ছেলেটাকে ?
রমনী ঢোক গেলে । ধীর গলায় আহাজারি করে....
" কষ্ট কি শুধু তোমার ছেলে একা পেয়েছে মা ? আমি পাইনি ? ও তোমাদের ছেলে বলে শুধু ওর কষ্টটাই দেখছো ? আর আমি ? আমি এতো দিন কিভাবে কাটিয়েছি তা শুনবে না ? আমি তো বিশ্বাস করেছিলাম ওনাকে ! ছোট বেলা থেকে না পেয়েছি বাবা মাকে, আর না পেয়েছি আমার ভাইকে । কেউ ছিলো না আমার । তোমাদের ছেলে আমার জীবনে এসে আমার সেই শূন্য জীবনটাও তছনছ করে দিলো । কেনো ফেলে গেছিলেন উনি আমাকে ? ভালোবাসার দোহাই দিয়ে ফিরে এসেই বা কেনো আবার জড়ালেন আমায় ?
আমি তো সব ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম ওনার সাথে । ভাইয়ার কথাও শুনিনি ওনার জন্য । কিন্তু উনি, উনি রিসা আপুর সাথে....
বলতে বলতে জবান রুদ্ধ হলো মেয়েটার । মুখ চেপে ধরলো । আদ্র চোখ বুজে হাত মুঠিয়ে নেয় ।
মেঘা এখনো কিছু জানে না । তাই সে আর রাগলো না । বললো...
" রিসার সাথে কি ? বল ?
" জানি না আমি ।
" জানিস না যখন, তখন না জেনে শুনে পালিয়ে গেছিলি কেনো সেদিন ? কোনো কিছু জানার চেষ্টা করিস নি কেনো সেই মুহুর্তে ?
" আর কি জানতাম ভাইয়া ? আমি নিজের চোখ আর কানকে অবিশ্বাস করতাম ? নিজ চোখে রিসা আপু আর রৌদ্রকে একসাথে দেখেছিলাম সেদিন । বাচ্চাও ছিলো । ঐ বাচ্চাটা তোমার ভাইকে পাপা বলে ডাকছিলো । শুধু সেদিন না,,, আরো অনেকবার আমার চোখে পড়েছে । তোমার ভাইয়ের ফোনে ছবিও দেখেছিলাম আমি । লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতেও শুনেছি । কিন্তু উনি কোনো দিন কিচ্ছু বলেননি আমায় । আমি চেয়েছিলাম, রৌদ্র আমাকে নিজে থেকে সব বলুক । কিন্তু উনি বলেন নি ।
তাই নিজেকে বোঝাতাম, হয়তো আমার ভুল । তবুও তোমার ভাইকে অবিশ্বাস করতে চাইনি । সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগের দিন রৌদ্রের ফোনে আসা একটা কল ভুল করে রিসিভ করেছিলাম আমি । সেটা ছিলো ঐ বাচ্চাটার কল । আমার স্বামীকে পাপা বলে ডাকছিলো ও । এটা কতটা যন্ত্রণার জানো তুমি ?
তবুও রৌদ্রকে কিচ্ছু বলিনি । চুপ ছিলাম । বিশ্বাস করো, আমি সুইজারল্যান্ডে গিয়েও সব ভুলে গেছিলাম । কারন তোমার ভাই আমাকে ভালোবাসতো । ওনার চোখে প্রতারণা দেখিনি কখনো । ওনাকে বিশ্বাস করে নিজেকে ভুল বলে এসেছি সবসময় ।
কিন্তু আমার বার্থডের দিন,,, জানো..... সেদিন বিকেলে আমি জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট !
থামলো রমনী । ঠোঁট কামড়ে ধরলো । ফুঁপিয়ে কান্না গিলে নিলো বহু কষ্টে ! দৃষ্টি নত রেখেই আবার বলা শুরু করলো.....
" সেই সময় এক আকাশ জয়ের খুশি ছিলো আমার হাতের মুঠোয় । সবার আগে রৌদ্রকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম । সেদিন সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই গেছিলাম ওনার অফিসে । কিন্তু ওখানে গিয়ে তো আমি নিজেই পুরো সারপ্রাইজড হয়ে গেছি ।
ভাইয়া আমাকে বলেছিলো, রৌদ্র রিসা আপু আর আরাফ ভাইয়াকে ওর থেকে কেড়ে নিয়েছে । আমি ভাইয়ার ওই কথাটার অর্থ বুঝিনি তখন । সেদিন বুঝলাম,, অফিস রুমে রিসা আপুর সাথে রৌদ্র আর একটা বাচ্চাকে দেখলাম যেদিন । জানো মা,,, ঐ বাচ্চাটা তোমার ছেলেকে পাপা বলে ডাকছিলো । আর তোমার ছেলে প্রতিটা ডাকে সাড়া দিচ্ছিলো আদর করে ।
অথচ আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চারা পাপা কি তা জানে না এখনো ! ওরা কোনো দিন কাউকে পাপা বলে ডাকতে পারেনি ! আমার বাচ্চাদের পাপা নেই,,,ওরা চেনে না ওদের পাপাকে । ওদের পাপা অনেক আগেই অন্য কারোর পাপা হয়ে গেছে.....
ফের ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । তার প্রত্যেকটা কথা চাপা আর্তনাদ হয়ে থেমে থেমে মুখে ফুটেছে । রৌদ্রের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে গলা উঁচায় নি রমনী ।
তীব্র যন্ত্রণায় বুক ফেটে গেলেও জোরে কাঁদার শক্তি নেই । চোখ ফেটে পানি গড়াচ্ছে কেবলই ।
বাড়ির সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলেন । চেয়ে দেখলেন মেয়েটাকে । অবশ্য ওকে দোষ দেওয়া যায় না পুরোপুরি । একজন নারী হিসেবে ওর যন্ত্রণা টুকু ঠিক অনুমান করতে পারলেন রুবিনা কাবির । আঁচল টেনে চোখ মুছে নিলেন তিনি । মুখ খুললেন তোফায়েল কাবির.....
" তুমি যদি সেদিন হঠকারি সিদ্ধান্ত না নিতে, তাহলে আজ হয়তো এমন কিছুই হতো না মা । আমার নাতি নাতনিরা ওদের বাবাকে পেতো । আর আমার বাচ্চা পাগল ছেলেটা পেতো ওর সন্তানদের । এভাবে কষ্ট পেতে হতো না কাউকে । তুমি তো জানোই না,, সেদিন যে বাচ্চাটাকে দেখেছো, ওর সাথে রৌদ্রের কোনো সম্পর্ক নেই । রিসা বা ও, ওরা কেউই রৌদ্রের আপন নয় । ঐ বাচ্চাটা আরাফ তালুকদারের ।
চমকে উঠলো মেঘা । ভরা আঁখি যুগল তড়াক করে বৃহৎ হলো । ছ্যাত করে উঠলো ভেতরটা ।
পরক্ষণে কুঁচকে সরু আর প্রশ্নাত্মক হলো দৃষ্টি । মাথা নাড়ালেন ভদ্রলোক ।
শুভ্র বললো এবারে.....
" ঐ বাচ্চাটার নাম মিনি । রিসা আর আরাফ তালুকদারের মেয়ে । তুই এটাও জানিস না,,, তোদের আরাফ মারা গেছে অনেক বছর আগে । রৌদ্র জাস্ট বন্ধু হিসেবে ওর বাচ্চার দায়িত্ব নিয়েছিলো ।
ছোট থেকে ওকে আদর দিয়েছে । ছোট বাচ্চা তো,,, মায়ায় জড়িয়ে গেছে একসময় । মায়ায় পড়ে একটা ভুল করেছে রৌদ্র, সেটা হলো নিজেকে বাবা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলো ঐ বাচ্চাটার কাছে । মিনি তো নিষ্পাপ,, কি আর বুঝতো বল ? রৌদ্রকেই পাপা মেনেছে সবসময় । ডেকেছে ঐ ডাকে । আর এটাই বোধহয় প্রথম ভুল ছিলো । তোদের সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে কাল ছিলো ।
তুই সেদিন ঠিক দেখেছিলি মেঘা । কিন্তু ঠিকটা বুঝিস নি । তোর বোঝাটা ছিলো দ্বিতীয় ভুল । আর দেখ, এই দুটো ভুলে সবকিছু কেমন উল্টে পাল্টে গেলো । দু'জনেই ভুল করলি তোরা । একজন ভয়ে সত্যটা লুকিয়ে রাখলি,, আর একজন সত্যটা না জেনেই নিজেকে লুকিয়ে রাখলি । এতেই অতিক্রম হলো চারটা বছর । কষ্ট কিন্তু দু'জনেই পেয়েছিস । একজনের কষ্ট দেখেছি আমরা, আর তোরটা দেখিনি ।
স্তম্ভিত হয় রমনী ।
চিবুক নত হয়ে আসে আপনা আপনি ।
ঝিমিয়ে আসে শরীর । সদ্য শোনা কথা গুলো মনের মাঝে গুছিয়ে বুঝতে হিমশিম খেয়ে যায় ।
মিনিট কয়েক পিনপতন নিস্তব্ধ রয় গোটা ঘর ।
উঠে দাঁড়ায় আদ্র । পরিস্থিতি বুঝে শ্বাস ফেলে বলে.....
" অনেক হয়েছে । যে যার ঘরে যাও এখন । মেঘকে সময় দাও । জ্ঞান ফিরুক । বাকিটা রুডি নিজেই বোঝাবে ওকে । ওদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি ওদের নিজেদের মিটিয়ে নিতে দেওয়া উচিত ।
মেঘা হতভম্বই বসে রয় । রৌদ্রকে তুলে বিছানার উপর শুইয়ে দেয় আদ্র আর শুভ্র ।
অতঃপর ঘর ছাড়ে ওরা সকলে ।
সকাল থেকে মাকে কাছে পায়নি রোশ্ আর ইবাদ ।
গোটা সময়টা মেহেরের কাছে ছিলো । তবে দুপুরের দিকে ওদের আর ধরে রাখা যায় নি ।
মেঘার মুখেও বুলি ফোটেনি আর । বাচ্চাদের সামলে ঘুম পাড়িয়েছে সেই দুপুরে ।
এখন বিকেল চারটা । টানা সাত ঘন্টা ধরে জ্ঞান শূন্য রৌদ্র । এখনো ঘুমোচ্ছে বেঘোরে । বেডের একপাশে সে । অন্যপাশে রোশ্ আর ইবাদ ।
মেঘা রৌদ্রের মুখোমুখি হয়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে লুটিয়ে । মাথাটা বাম কাত করে নামিয়ে রাখা বিছানার এক ধারে । ঠিক রৌদ্রের মুখোমুখি । কতক্ষন ধরে এভাবে বসে আছে, তার ইয়ত্তা নেই ।
চোখের কার্নিশ হতে নোনা জল গড়াতে গড়াতে সফেদ রঙা বিছানা খানা ভিজে জবজবে হয়ে গেছে ।
বহুক্ষণ ধরে শব্দহীন গোটা ঘর ।
এদিকে মিনিট দুয়েক ধরে খচখচ করে নড়ছে রৌদ্র ।
স্বল্প জ্ঞান ফিরেছে তার ।
তবে চোখ খুলছে না এখনো । মেঘা প্রতিক্ষায় আছে অধীর হয়ে ।
আরো মিনিট পাঁচেক পেরোলো । অতঃপর পিটপিট করে চোখ মেললো বেপরোয়া যুবক ।
ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠে বসলো । ডান পাশে বাচ্চাদের দিকে চোখ ফেরানোর আগেই দৃষ্টি আটকালো মেঝেতে লুটিয়ে বসে থাকা রমনীর পানে । অমনি ছলকে উঠলো দ্বিগুণ । হাঁসফাঁস করে ডাকলো.....
" ইভারা !
মেঘা কিংকর্তব্য বিমূঢ়, নিশ্চুপ ।
এর মধ্যে দৃষ্টিতে পলক পড়েছে কেবল একবার । রৌদ্র ছটফট করে উঠলো । মাথায় চক্কর কাটছে এখনো । সে টেনে তুললো মেঘাকে । বিছানায় বসালো । গোটা মুখ সহ শরীরে নজর বুলিয়ে নিলো ।
হালকা সবুজ রঙের সুতির একটা শাড়ি পড়েছে মেয়েটা । দীঘল কেশরাশি পেঁচিয়ে ঢিলেঢালা হাত খোঁপা বেঁধে কাঁধে ছেড়েছে ।
দিশেহারা হয়ে হাসে রৌদ্র । ভ্রম হচ্ছে না তার । সে একটানে রমনীকে টেনে বুকে মিশিয়ে নিলো । একই ভাবে ছটফট করে ছাড়লো । দখলে নিলো মুখখানি । রুক্ষ ঠোঁট চুবিয়ে মুখ জুড়ে ভেজা ভেজা শত চুমু এঁকে দিলো ক্ষনিকেই । চেতনা হীন রমনীর চোখের ভিজে কোণ দেখে পাগলের ন্যায় ব্যাকুল হয়ে পড়লো.....
" কি হয়েছে সুইটহার্ট ? কেঁদেছো কেনো তুমি ? কেউ কিছু বলেছে তোমায় ? কে কি বলেছে ? আমি সবাইকে বলে দেবো, তোমার কোনো দোষ নেই । তুমি আমার ইভারা । মাই লাইফ, গিফট অফ গড । আ'ম স্যরি জান ।
তুমি জানো,, তুমি যা দেখেছো তা সত্য নয় । সেদিন তুমি রিসা আর মিনিকে আমার সাথে দেখেছিলে,, ওরা আমার কেউ নয় ইভারা । বিশ্বাস করো আমায়,, ওরা আমার কেউ নয় । আমি শুধু তোমার ।
লোকটার ছটফট করে বলা কথার মাঝেই হুট করে মেঘা জড়িয়ে ধরলো তাকে । প্রশস্ত বুকে মাথা গুঁজে পিঠ খামচে ধরলো । সহসা স্থির হলো অস্থির যুবক । হৃৎপিণ্ড থমকালো তার ।
কানে বাজলো রমনীর ফিকড়ে ওঠার শব্দ । ঠোঁট কামড়ে বোকার মতো শুধালো মেয়েটা.....
" রিসা আপু আপনার কেউ নয় ? ঐ বাচ্চাটা আপনার মেয়ে নয় ?
রৌদ্র ঢোক গেলে । ঘুম ঘুম চোখ ডলে স্বাভাবিক করে । মেয়েটাকে জড়িয়ে নিয়ে বলে.....
" উঁহু,, ইয়াশ কে জিজ্ঞেস করে দেখো, ও সব জানে । ওরা কেউ নয় আমার । কেবলই তুমি আমার সব । আমার জান,, আমার সুইটহার্ট.....
রমনীর কান্নার বেগ বাড়ে ! ডুকরে ওঠে....
" না,,, আমি আপনার সুইটহার্ট নই, রৌদ্র । কেউ নই আমি আপনার ! কথা বলবেন না আপনি আমার সাথে । আমি খুব বাজে, খুব খারাপ । কিচ্ছু বুঝি না আমি । খালি ভুল বুঝি । নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে গিয়ে আপনাকে ভুল বুঝেছি আমি ।
চোখ বুজলো বেপরোয়া যুবক । নীরবে ভারী শ্বাস ফেলে বুঝিয়ে বলতে লাগলো গলা নামিয়ে.....
" সেই ভুল শুধরানোর সময়টা দিলে না কেনো আমায় ? তার আগে হারালে কেনো জান ? আমাকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে, ভুলটা শুধরে সঠিকটা বুঝিয়ে দিতাম । এভাবে তোমাকে হারিয়ে মরন যন্ত্রণা পেতে হতো না আমায় !
ইভারা,,, রিসা জাস্ট আমার ফ্রেন্ড,, খুব ভালো বন্ধু । বোনের মতো । যে বাচ্চা টাকে দেখেছো, ও মিনি, রিসার বেবি । রিসা আর আরাফের বেবি । ইউ নো সানি, আরাফ বেঁচে নেই আর । আমি যেদিন জোর করে তোমাকে বিয়ে করলাম, তার পরদিনই আরাফ চলে গেছে । বিয়ের পর আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইনি । আরাফের এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে গেছিলাম সুইজারল্যান্ডে । কিন্তু আমি ফেসে গেছিলাম ওখানে গিয়ে । মত পাল্টে ভেবেছিলাম তোমাকে সময় দেবো । সেই সময় দিতে দিতে মিনি আসলো । রিসার বেবি হলো । মিনির সাথে কি করে জড়িয়ে গেছি, আমি জানি না বুঝতেও পারিনি । আমিই ওকে বলেছিলাম, আমাকে পাপা বলে ডাকতে । ও তো ছোট বাচ্চা,, ওর পাপা ছিলো না । আমি কেবল ওর পাপা হওয়ার চেষ্টা করেছি । কেনো জানি না । আই লাভ কিডস । আমার ভালো লাগে ওকে । জানো, ওর জন্মের পর আমিই ওকে প্রথম কোলে নিয়েছিলাম ।
আরাফ কে কথা দিয়েছিলাম, ওর বাচ্চাকে দেখে রাখবো । তাই করেছি আমি । আমি ওর নিজের বাবা নই সুইটহার্ট । মিনি ইজ নট মাই চাইল্ড ! ওর হার্টে ফুটো ছিলো,,, তাই আমি সাহস করে ওকে কখনো এটাও বলতে পারিনি, যে আমি ওর পাপা নই । ও জানতো না ওর পাপা নেই । জানলে কষ্ট পেতো, আমার সহ্য হতো না । সাড়ে চার বছর মিনির সাথে ছিলাম আমি, খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে । কিন্তু যখন দেশে আসলাম, তোমার কাছে ফিরলাম তখন আমার ভালোবাসাটাই ভয় হয়ে দাঁড়ালো ।
তোমাকে বলতে ভয় পেতাম আমি । ঐ নাগিনের বাচ্চাটাকেও হিংসে করতে তুমি, এটা দেখার পর ভয় গাঢ় হয়েছিল আমার । ভেবেছিলাম তোমাকে নিজের করে মানিয়ে নিয়ে সব বলবো । কিন্তু তাও হলো না । তোমাকে মানাতে মানাতে ইয়াশ আসলো এর মাঝে । তারপর ভাবলাম, একেবারে রিসার সাথে মুখোমুখি করিয়ে সব বলবো তোমায় । তুমি রিসাকে চেনো, নিশ্চয়ই ভুল ধারণা জন্মাবে না আর । সহজেই বুঝে যাবে সব ।
সেদিনই, ছয় এপ্রিল, তোমার বার্থডের দিন দেখা করাতে চেয়েছিলাম তোমাদের । সন্ধ্যায় যখন ওদের দুজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম, তখন পেলাম না তোমায় । তারপর জানলাম তুমি আমায় ভুল বুঝে হারিয়ে গেছো ।
ধরে আসলো তার জবান । থামলো সে । নিজের বুকের কাছে ভেজা ভেজা কিছু অনুভব করলো । কাঁদছে মেঘা । রৌদ্র ওকে আলগা করলো নিজের থেকে ।
মুখোমুখি করে মুখখানা আজলে নিলো । কপালে ঠেকালো কপাল । জবান খুললো আরেকবার....
" ট্রাস্ট মি জানেমান,, রিসার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই । তুমি ভুল বুঝেছো সেদিন । বেপরোয়া রুডভিক কাবির রৌদ্রের পরিবর্তন আর লোমাত ইন্ডাস্ট্রির সিইও হওয়ার পেছনে আমার ছায়া ছিলো রিসা । তোমাকে দেখা আর ভালোবেসে ফেলার কথাটা আমি সবার আগে ওকেই বলেছিলাম । আমি তোমার জন্য চকলেট, ফুল পাঠাতাম ওকে দিয়ে । মনে আছে, রিসা তোমাকে দিতো সেগুলো ? ও আমার সঙ্গে ছিলো সবসময় । ও বলেছিলো তোমার ভাইকে মানিয়ে নেবে । কিন্তু তার আগেই ওদের মধ্যে একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেলো । আলাদা হয়ে গেলো ওরা । তখনো রিসা আমার সাথে ছিলো । তোমাকে ঘিরে ও আমার ক্লোজ হয়ে গেছিলো অনেকটা । আমি কি করে ওর অসময়ে ওকে একলা ছাড়তে পারতাম বলোতো ? ও আরাফ কে হারিয়ে পাগল হয়ে গেছিলো,, কেউ ছিলো না ওর সাথে । আমি থাকার চেষ্টা করেছি । থাকতে গিয়ে কখন মায়ায় জড়িয়ে মিনির পাপার স্থানে নিজেকে বসিয়েছি, আমি নিজেও জানি না তা ।
মিনি কেবলই আমাকে পাপা ডাকে । এর বেশি আর কিচ্ছু নয় । ও খুব কিউট সুইটহার্ট,,, আমি তোমাকে দেখা করাতাম ওর সাথে । এবার অন্তত বিশ্বাস করো,,, আমি তোমাকে ভালোবাসি জান । ঠকাই নি আমি তোমায় । কেনো চলে আসলে ওভাবে ? ইউ নো,, তোমাকে ছাড়া একটুও ভালো ছিলাম না আমি !
মেঘা দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁপিয়ে ওঠে ।
চোখ খিচে স্মৃতিচারণ করে । সেই দিনের কিছু স্মৃতি মনে পড়তেই ধক্ করে ওঠে রমনী । দ্রুত খামচে ধরে রৌদ্রের বাহুর একাংশ । আতঙ্কে তটস্থ হয়ে মিশে যায় যুবকের প্রকান্ড বুকের আবডালে । দুহাতে শক্ত করে জড়ানোর চেষ্টা করে রৌদ্র কে । ঠোঁট কামড়ে কেঁদে ওঠে । কেঁপে কেঁপে গলা তোলে...
" আ..আমি সেদিন চলে আসতে চাইনি রৌদ্র ! আপনাকে ফেলে আসতে চাইনি আমি । স....সেদিন,,,
বলতে গিয়ে থামলো ।
কম্পন উঠলো নমনীয় শরীরে । খিচে নিলো চোখ মুখ । কান গরম হয়ে আসছে । মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে আকস্মিক যন্ত্রণায় । সে দুকান চেপে ধরে ব্যাথা সূচকে গুঙ্গিয়ে উঠলো.....
" আআআআআআ.....
ভড়কে যায় রৌদ্র ।
মুখশ্রীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে । সে মেঘাকে টেনে ধরে । ইতোমধ্যে লাল হয়ে গেছে রমনী ।
" ইভারা, কি হয়েছে সানি ? এমন করছো কেনো ?
ছটফট করতে শুরু করে মেঘা ।
এলোমেলো হয়ে যায় সে । বিচলিত মুখাবয়ব তার । রৌদ্রের দিকে তাকায় । শক্ত করে নখ দাবিয়ে খামচে ধরে যুবকের বাহু । ভয়ার্ত চক্ষু বৃহৎ । মাড়ি খিচে সে কাঁপতে কাঁপতে আওড়ালো বিড়বিড় করে.....
" আ...আমি মা*র্ডার করে ফেলেছি রৌদ্র ! আই হ্যাভ কি*লড সামওয়ান......
#চলবে.......