ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাহেব বাবুর বিবি

পর্ব 1

লেখক: imran

কন্যার বয়স যেখানে সবে ১৭, পাত্রের বয়স সেখানে ৪০। সাল ১৯৯৫। পাবনা জেলার অষ্টমনীষা ইউনিয়নের মাগুরাডাঙা গায়ে বিশাল সমোরোহে ঘটা করে হয়ে গেলো আজ বিয়ে। যেনতেন বিয়ে নয়,ধরতে গেলে এই গায়ে এমন বিয়ে, গেলো দশ বছরে হয়েছে কি না চোখে পড়া দায়।

"ও নূর যাচ্ছিস তো চলে একটাবার কাঁদবি না? বিদায়ের সময় একটু না কাঁদলে হয়?"

"ও মেয়ের কথা রাখো তো বউ। মিটমিটিয়ে তখন থেকে হেসে চলেছে। মুখ থেকে তো হাসি সরছেই না। কি সুখ পেয়েছে কে জানে!!"

লাল রঙা শাড়ী, ঘোমটা টানা মাথায় সোনার চেলি। ডাগর ডাগর আঁখিতে কাজলের টান। আলতা রাঙা হাতে নতুন বধূ মুখে আঁচল টেনে ঠোঁট লুকিয়ে মিটিমিটি করে হাসে। রুনুঝুনু নুপুর পায়ে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে বসতেই মহুয়ার হাত টেনে ধরে বলে,"বুড়োটাকে দেখে তো আমার হাসি থামছেই না রে মহু। দেখ ব্যাটার ঝিমুনি ধরে গেছে।"

"তোকে সবাই কাঁদতে বলে আর তুই বু্ড়োটাকে নিয়ে পড়ে আছিস?"

"ধুৎ আমার কাঁদা এলে তো কাঁদবো। বুঝি না তোর বাপ মা আর আমার ভাইয়ের কি শোক পেয়েছে। এমন মরা কাঁদা কাঁদছে যেন মেঘনূর চিরবিদায় নিচ্ছে। এরাই তো আমার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলো। ধরে বেঁধে যক্ষ্মারোগীর সাথে দিলো বিয়ে৷ দুদিন পর দেখিস এ বুড়ো ঠিক মরবে।"

মহুয়া চোখ পাকিয়ে মেঘনূরের হাত খামচে ধরে। আশেপাশে তাকিয়ে সাবধানী কন্ঠে বলে,"জিহবা গুটিয়ে নে নূর, কেউ শুনলে তোরে খবর করে দিবে। চারপাশে সব তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন।"

মেঘনূর আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মাথায় দেওয়া লাল দোপাট্টা ভাঁজ করে মুঠো চেপে কোলের মধ্যে রেখে ধীর কন্ঠে বলে,"গাড়ি ছাড়বে কখন রে? ঘোড়ার গাড়িতে জীবনের প্রথম উঠলাম। আমার তো ভারী মজা লাগছে।"

"আমারও। এতোদিন তো শুধু চোখেই দেখতাম। তোর সুবাদে তাও উঠতে পারলাম। আমার নিজেরও যে তড় সইছে না।"

দু' গায়ে থেকে মানুষ ছুটে এসেছে মেঘনূরের বিয়ে, বিদায়ী যাত্রা দেখতে। পাড়াগাঁয়ের বউরা দলবেঁধে বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মুখে আঁচল চেপে বিদায় দেখছে। পাকা রাস্তায় থেমে আছে দুটো ঘোড়ার গাড়ি সঙ্গে চার চাকার শহুরে গাড়ি। শিকদার বাড়ির বড় পুত্রের বিয়ে বলে কথা। বিয়ে করবে না, করবে না করে চল্লিশ বছর পার করে অবশেষে ব্রত ভাঙলো সে ।

"চলো চলো,যাওয়া যাক এবার।"

"হ্যাঁ, হ্যাঁ,নতু রে গাড়ি চালান দে।"

শিকারদার বাড়ির কর্তাদের হাঁক ছুটতেই নতু কাঁধে গামছা ফেলে ঘোড়ার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে্। যুতসমেত নিজ আসনে বসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

"জ্বে সাব। যাওয়া যাক তবে।"

কনের বিদায় হয়। সুলেখার করুণ কান্নার স্বর ভেসে আসে। মুখে আঁচল চেপে আদু বুড়ির গায়ে ঢলে পড়ে অস্ফুটস্বরে আহাজারি করতে করতে বলে,

"আহাঃ আমার যে বুক খালি হয়ে গেলো গো। আমার বাড়ি যে খালি হয়ে গেলো। ও নূর ভালো থাকিস রে মা তুই।"

"চুপ করো বউ,চুপ করো। এতোবড় ঘরে মেয়ে বে দিলে সুখে না থেকে পারে? রাজরাণী হয়ে থাকবে লা।"

ঘোড়ার পায়ের খুরের শব্দে ধূলোমাখা রাস্তা মিশে যায়। গায়ের ছোটবড় সব ছেলে মেয়ে ঘোড়ার গাড়ির পিছু পিছু ছুট লাগায় । রাস্তার দু'ধারে লোক জমায়েত হয়। যে যার কাজ ফেলে অবাক নয়নে দূর্লভ বিয়ের যাত্রা দেখে। পাড়ার বউ ঝি'রা আমোদে প্রমোদে কানাকানি ফিসাফিসি করে।

মেঘনূরের খুব একটা মন্দ লাগে না এ যাত্রা। টগবগিয়ে ছুটে চলা ঘোড়ার গাড়িতে বসতে পেরে বেশ ভালো লাগছে তার। শ্যামলাবরণ মায়াবী চেহারা যেন সদ্য ফোটা কুসুমকলি। মুখে হাসি জুড়লে প্রবাহিত ঝর্ণার তাল কেটে যেতে বাধ্য। জীবন নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে একরাশ আফসোস তার৷ তবে সেগুলোকে নিয়ে খুব একটা ভাবে না সে। সবকিছুকে পায়ের তলায় ঠুকে দস্যি মেয়ে হয়ে মেঘের তালে তালে ভেসে বেড়ায় আপনছন্দে।

দু'পাশে দুটো সিট। সামনের সিটে বসেছে ইকবাল শিকদার। কবুল কালিমায় যিনি কিনা এখন মেঘনূরের স্বামী। যক্ষায় কাশতে কাশতে নেতিয়ে পড়েছে প্রায়। চোখ দুটো বন্ধ করে মুখ দিয়ে ফ্যাস ফ্যাস শব্দ করে ঝিমুচ্ছে সেই বিয়ে কাল থেকে। জরাজীর্ণ দেহে কোনমতে সেঁটে আছে নতুন একখানা পাঞ্জাবি। চোয়াল ভেঙে ঝুলে পড়েছে। বাইরে থেকে যে কেউ দেখে বলবে বারো রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতাল থেকে উঠে এসেছে বিয়ে করতে।

"বুড়োটা যেমন করে ঝিমুচ্ছে পড়ে যাবে তো রে।"

"ধর্ ঠাস্ করে গাড়ি হতে পড়ে গেলো নিচে। সোজা চিৎপটাং। তোর কি হাসি আসবে?"

মেঘনূর রেশমি চুড়ির ঝনঝনানি সুর তুলে ফিক করে হেসে উঠে। মুখে হাতে দিয়ে হাসি দমাতে দমাতে বলে,"আমার তো চোখের সামনে ভাসছে । আর সেটা দেখেই হাসি থামছে না।"

"ইশ্ এতো হাসিস না। তোর জন্য আমিও হাসি চেপে রাখতে পারছি না।"

দু'জনের গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুরতে ইকবালের কপাল কুঁচকে আসে। শরীরের হালচাল এমনিতে ভালো না। কাশতে কাশতে সব নাড়িভুড়ি জট পাকিয়ে এসেছে পেটের ভিতরে। চোখ বন্ধ করে কপাট রাগী স্বর তুলে বলে, "আহঃ চুপ থাকা যায় না। এতো কলকলানি কিসের?"

ভগ্ন কন্ঠে ধমকের সুর শুনতেই নিরব হয়ে উঠে মেঘনূর, মহুয়া। একে অপরের হাত আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে,"ও মা বুড়ো ব্যাটা দেখ ধমকও দেয়।"

"তাল সজাগ আছে বেশ।"

"চুপ থাক নূর। আর কথা বলিস না। অনেক হয়েছে।"

------------------------------------------

মাগুরাডাঙা গ্রামের শেষ সীমানা পেরিয়ে আরও কিছুটা দীর্ঘ পথ। একই ইউনিয়নের বাদলাপুর গ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপশালী 'শিকদার বাড়ি'। মূলত এই বংশের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন এই অঞ্চলের নামকরা জমিদার। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলীন হলেও, তাদের সেই বনেদিয়ানা আর আভিজাত্যের রেশ আজও রয়ে গেছে সমানে। আর তাই, কেবল এই প্রত্যন্ত গ্রামেই নয় পুরো জেলা জুড়েই শিকদার বাড়ির নাম এক ডাকে চেনে সবাই।

দূর হতে সবুজ শ্যামল পথ চিরে প্রথমেই চোখে পড়ে শিকদার বাড়ির বিশাল লোহার গেট, আর তার ঠিক পেছনেই সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী দালানকোঠা। লৌহনির্মিত সেই সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই দু'ধারে সারিবদ্ধ লম্বা সুপারি গাছ যেন নীরব প্রহরীর মতো স্বাগত জানায়। অন্দরমহলে প্রবেশের আগে চোখে পড়ে সাহেবদের জমকালো বৈঠকখানা আর কাচারি ঘরের চিরাচরিত ব্যস্ততা। পোড়া ইটের রঙে দেয়ালের নিখুঁত গাঁথুনি জানান দেয় তাদের ক্ষমতা, দাম্ভিকতা।

অন্দরমহলের ভিতরে পাকা উঠোনে বাড়ির বউ ঝিরা মিলে ডালা সাজিয়ে বসে আছে। অপেক্ষা নতুন বউয়ের। গহনার ঝুনঝুনানি, কাঁচা ফুলের সুবাসে শিকদার গিন্নীরা কলতানে মুখরিত হয়ে উঠে। হেসে হেসে ঢলে পড়ে একে অপরের গায়ে।

"কই গো তোমরা? নতুন বউ এলো তো। বেরিয়ে এসো।"

"এসেছে?"

"বম্মা গো, নতুন বউ এসেছে। তাড়াতাড়ি এসো।"

ঘোড়ার গাড়ি এসে থামে শিকদার মহলের মূল প্রবেশপথের সামনে। রমণীরা মাথায় আঁচল টেনে হাতে ফুলের ডালা, মিষ্টি, পানি, সোনার বালা সাজিয়ে জোর পায়ে চলে আসে মুহুর্তেই।

বড় গিন্নীর আগমনের পথ সুগম করে দেয় পুত্রবধূ গণ।

ঘিয়ে রঙের মোটা পাড়ের শাড়ি সেই সাথে মাথায় ঘোমটা টেনে পান মুখে ধীর পদস্থে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় অগ্নিবীণা। এ বাড়ির কর্তারাণী সে। গা জুড়ে তার সুনাম সুখ্যাতিতে ভরপুর।জমিদারের কন্যা কি না। সৎ ছেলের বধূ বরণে তার চোখ মুখে আনন্দের ঝিলিক বায়।

"নেমে এসো মেঘনূর।"

লতাপাতাখচিত মোটা স্বর্ণের বালা পরনে এক সুন্দরী মধ্যবয়স্কা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পান খাওয়া ঠোঁটে তার পড়ন্ত বিকেলের ন্যায় চকচকে হাসি। গলা বেয়ে নেমে এসেছে লম্বা সীতাহার।

মেঘনূর শুকনো গলায় অনড়চিত্তে সেই পানে চেয়ে থাকে। বুঝে উঠতে পারে না ওতো দামি হাতে তার নগন্য হাত রাখা উচিত কি না। বড়লোকের হাতে গরিবের ছোঁয়া কি মেনে নেওয়া যায়। পাছে যদি কেউ বকে?

"কি হলো এসো।"

ইকবাল মেঘনূরের স্থিরচিত্তে ফের বিরক্ত হয়ে উঠে। এতোক্ষণ পর আবার কাশি শুরু হয়েছে তার। নিচু মাথায় এক হাতে পাঞ্জাবির উপরের বোতাম খুলতে খুলতে কর্কশ গলায় বলে,"যতসব নকশা। অন্দরে কি যাওয়া হবে না নাকি।"

মেঘনূর জড়তা ভেঙে অগ্নিবীণার নরম কোমল হাতে হাত রাখে। শাড়ির কুঁচি ধরে ধীর পায়ে ঘোড়ার গাড়ি হতে নেমে পড়ে সে। সঙ্গে নামে মহুয়া।

" কি সুন্দর বধূ হয়েছে গো।"

"গায়ের রঙটা আর একটু পরিষ্কার হলে একদম মানানসই হতো।"

"গায়ের রঙ চাপা হলে কি বদনখানি তো পূর্ণিমার চাঁদ।"

অগ্নিবীণা পিছন হতে আসা সবার মন্তব্যে ঠোঁট চেপে হাসে। সবকিছু উপেক্ষা করে মেঘ নূরের থুতনিতে হাত রাখে। সন্তপর্ণে মুখ উঁচু করে তুলে নিজের দিকে তাক করে বলে,"আমার সংসারকে মনের আলো দিয়ে আলোকিত করবে আমার বৌমা, গায়ের রঙে কি আসে যায়? ও আমি ধরি না।"

বধূবরণ শুরু হয়। মিষ্টি মুখ করিয়ে মেঘনূরকে অলংকারে সজ্জিত করিয়ে সাদরে সম্ভাষণ জানানো হয় অন্দরমহলে। অবলা মেঘনূর মহুয়ার হাত চেপে ধরে বিশাল বাড়িখানা চোখ বুলিয়ে, মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে। স্কুলের পথে যেতে আসতে কতবার চোখে পড়েছে এই শিকদার বাড়ি। কিন্তু প্রহরীর ভয়ে কখনো সাহস হয়ে উঠেনি ঢুঁ মারার।

" হ্যাঁ রে মহু। এতো বড় বাড়িও হয়? হারিয়ে যাবো না তো?"

"কি জানি বাপু। এ কোন রাজপ্রাসাদে এলাম বুঝতে পারছি না। বাবা এতো বড় ঘরে তোকে বিয়ে দিলো, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।"

মেঘনূর কন্ঠ নামায়। মুখে হাত দিয়ে ফিসফিসিয়ে কানের কাছে গিয়ে বলে,"বড় বাড়ি বুড়ো ব্যামো জামাই। জোয়ান ব্যাটা পেলে এই বিয়ে তোকেই দিতো আমি জানি। আমার ভালো মামির সইবে? এ আমি জিন্দেগীতেও বিশ্বাস করি না। নিজের মেয়ের বেলায় ষোলআনা আর ভাগ্নির বেলায় চার আনা। আমি বুঝি না মনে করেছিস?"

"বা রে নূর, তুই তো বিয়ে হতে না হতেই চালাক হয়ে যাচ্ছিস দেখছি?"

" একটু চালাক হলে ক্ষতি নেই।"

"হয়েছে হয়েছে বাপু, আর দূর্নাম গাইতে হবে না।"

"মা জন্য খুব পোড়ে বুঝি তোর?"

"তো পুড়বে না?"

দু'জনের ফিসফিসানির মাঝে হুট করে চওড়া গলার আতঙ্ক সুর ভেসে আসে৷ মেঘনূর, মহুয়া কথা থামিয়ে সর্তক চোখে দালানবাড়ির বেলকনির দিকে তাকাতেই এক ঘোমটা টানা বউয়ের তটস্থ মুখখানির দেখা পায়।

"বম্মা.. বড় ভাইয়ের গলায় রক্ত উঠেছে। কাশতে কাশতে নেতিয়ে পড়েছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না যে।"

এক মুহূর্তেই থেমে যায় কলতান চারিদিকে। হাসি হাসি রবের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবাক চক্ষুতে সবাই পাথরের ন্যায় জমে যায়।

শিমলার হাঁকে বৃদ্ধা সোনাবান উঁকি মেরে চেয়ে বলে," বড়বউ একি দশা হলো গা? নতুন বউ ঘরে পা রাখতে না রাখতেই অমঙ্গল। হায়.. হায় একি সর্ব্বনাশ হলো।"

"আপনি চুপ করুন মা। আজেবাজে কথা বলবেন না। নলিনী শিগগির ডাক্তার সাহেবকে ফের খবর পাঠাও। বাড়ির পুরুষদের আসতে বলো অন্দরে, বলো মহিলা কাজ বাজ হয়ে গেছে।"

"যাচ্ছি বম্মা।"

নলিনী ছোটে বাড়ির কর্তাদের ডাকতে। বাড়ির বাকি বউ ঝিরা সব উঠোন খালি করে চোখের পলকে সিঁড়ি ভেঙে চলে যায় দোতলাতে। শাড়ির আঁচলে চাবির গোছা, গহনাগাঁটির শব্দে থমকে যাওয়া মুহুর্ত এক সেকেন্ডের মাঝেই ফের মুখরিত হয়ে উঠে। যে যেমন পারে দৌড়ে ছুটে যায় উপরের কক্ষে।

"তুই যাবি না নূর?"

"আমাকে তো কেউ বললো না যেতে।"

"না বললে কি? তোর না স্বামী?"

মেঘনূর সামান্য বিচলিত হয়ে উপরতলা পানে চায়। কিন্তু স্বামীপ্রীতিভাব তার মাঝে বিশেষ একটা দেখা যায় না। সম্পূর্ণ অচেনা একটা লোকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। কবুল বলেছে দায়ে পড়ে। মামা, মামি তাকে অনুরোধ করেছে, পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করেছে বিধায় বিয়ে করেছে। শুধু মামি বললে কখনোই করতো না। কিসের ঠেকা পড়েছে এমন যক্ষা রোগীকে বিয়ে করার? অভাগীর কপাল হলে যা হয়!!

"চল নূর, উপর তলা যাই। না গেলে মেয়েলোকেরা সব খারাপ বলবে।"

"খারাপ না ছাই। এই বুড়ো বয়সে ব্যাটার কি দরকার ছিল বিয়ে করার বল তো দেখি? কাশতে কাশতেই যে লোক কুল পায় না তার কি বিয়ে করা সাজে? ক'খানা হাড় গছিয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে গেছে বিয়ে করতে। এখন ভালো থেকে মন্দ হলে, তোর মা তো আমার কপাল চিবিয়ে খাবে।"

"এখনই এসব ভাবছিস কেন তুই? ডাক্তার আসছে বললো তো।

বাজে বকা বন্ধ করে চল।"

মহুয়া মেঘনূরের হাত ধরে সঙ্গে ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙে দোতলা উঠে যায়। উঠোনে কাজে মত্ত দু তিনজন মেয়ে এক নজর নতুন বউকে দেখে একে অপরের সাথে ফিসফিস করে হেসে উঠে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,

"যাই বলো তাই বলো, নতুন বউ এর চল আছে বেশ।"

"চল না থাকলে হবে? এ বাড়িতে থাকতে হলে এটুকু থাকতেই হবে।"

"যা বলেছো।"

---------------------------------------------------------

"ঐ তো সামনের ঘর হতে আওয়াজ আসছে।"

লম্বা বারান্দায় সারি সারি ঘর। শেষ মাথায় বিশাল বড় আরো একখানা লাগোয়া গোল বারান্দা। মেঘনূর টিপটিপ পায়ে অসুস্থ স্বামীর কক্ষ পেরিয়ে মহুয়াকে টেনে সেই বারান্দায় নিয়ে যায়। এখান হতে পিছনের বাগান বাড়ি স্পষ্ট চোখে পড়ে। শিকদার বাড়ির বাগানবাড়ি চোখে লাগার মতো। চারিদিকে নানান ফল ফলাদি গাছপালাতে ভরপুর। এমন কোনো গাছ নেই , যার ঠাঁই এখানে মেলেনি।

"ও খোদা আমার কদবেল গাছ আছে দেখছি। মহু রে.. চল পেড়ে আনি। ইশ্ এ বছরে কদবেল তো খাওয়াই হলো না। আমার জিবে জল এসে গেছে। নুন কাঁচা মরিচ দিয়ে মাখিয়ে...

মহুয়া মেঘনূরের কথায় কটমট করে তাকায়। দাঁতের উপর দাঁত চেপে বলে,

" মা যে বলে তোর বুদ্ধি শুদ্ধি নেই এই হলো তার প্রমাণ। এমনি কি এতো বকা খাস। দোষ যে শুধু আমার মায়ের তাও নয়, তোরও আছে। স্বামী মরে যাচ্ছে আর তুই কদবেল মাখা নিয়ে পড়ে আছিস?"

মেঘনূর গাছপাকা কদবেলের দিকে তাকিয়ে থেকে কপাল কুঁচকে বলে,

"আমি কি ডাক্তার? বুড়োর ব্যামো আমি কি পারবো সাড়াতে? ও বুড়ো তো আমাকে দেখলেই শুধু ধমক দিচ্ছে। এখন যদি সামনে যাই কাশতে কাশতেও ধমক দিবে।"

"তবুও যাওয়া উচিত।"

"ওত মানুষের মধ্যে দাঁড়ানোর জায়গা পাবো কি?"

মহুয়া হতাশা চোখে মেঘনূরের দিকে তাকায়। মেঘনূর শাড়ির আঁচল দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে নিস্তেজ গলায় বলে,

"ওমন করে তাকাচ্ছিস কেন? যাচ্ছি তো। কদবেল পরেই খাবো। থাক।"

"জীবনে খাসনি কদবেল?"

"গেল বছরে সেই যে সর্দার বাড়ির পুকুর পাড় থেকে চুরি করে খেয়েছিলাম। তারপর তো আর খাওয়া হয়নি।"

"সারাজীবন খেলেও তোর আঁশ মিটবে না।"

"শোন মহু,কাঁচা আম,পাকা তেঁতুল, পাকা কদবেল এগুলোর স্বাদ অমৃত। হাজার খেলেও সহজে আঁশ মেটে না। নিজেরা তো ভালো মন্দ খাস। তোর মা লুকিয়ে চুপিয়ে তোদের ভালো ভালো খাবার খাওয়ায় আর আমাকে দেয় পোড়া এঁটো খাবার । একবার একটু কদবেল চেয়েছিলাম..."

" আমি তোকে ছাড়া কিছু খাই? একটুখানি হলেও রাখি না?"

"হু রাখিস। না রাখলে তোর সাথে আঁড়ি নিতাম।"

" হু জানি। আর আমার মায়ের গুণকীর্তন থামা, দোহাই তোর। মা যে তোর সাথে আমাকে পাঠিয়ে কি ভুল করেছে।"

"আমার জন্য না ঘোড়ার গাড়িতে উঠলি?"

"ঘাট হয়েছে আমার।"

মহুয়া মেঘনূরের হাত চেপে ধরে ও মাথার বারান্দা ছেড়ে এ মাথায় আসে। জোরালো পায়ে কক্ষের সামনে আসতেই দেখে কক্ষে পুরুষলোক মেয়েলোকের সমাগম। এতো এতো মানুষে দাঁড়ানোর জায়গাটুকু নেই।

"ও নতুন বউ.. একি সর্ব্বনেশে কপাল গো তোমার? তোমার স্বামী যে আর নেই।"

মেঘনূরের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে কথাখানা শুনতেই। শরীরজুড়ে বয়ে যায় ঠান্ডা স্রোত। চোখদুটো আপনা আপনি ছানাবড়া হয়ে উঠে। তটস্থ ভঙ্গিতে মহুয়ার হাত চেপে ধরতেই ভিতরে হতে ভারী কান্নার শব্দ তার কানে গিয়ে ঠেকে। তাকে যে বরণ করেছিলো তার ক্রন্দনরত গলা ভেসে আসছে । মেঘনূর গোল গোল চোখ করে মহুয়ার দিকে তাকায়। শুষ্ক ঠোঁট চেপে বলে,"বিয়ের দিনেই বুড়ো মরে গেলো?"

" ও খোদা..কি হলো এটা রে নূর? "

"দেখি দেখি নতুন বউকে আসতে দাও। ও ছোট গিন্নী নতুন বউকে স্বামীর কাছে নিয়ে এসো।"

আর্জিনা ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসে। চোখে তার নোনা পানির ছায়া। মেঘনূরের সামনে এসে দমকানো কান্না থামিয়ে বলে,

"তোমার স্বামী যে আর বেঁচে নেই বৌমা। আজ এই শুভদিনে দুনিয়া ছেড়ে গেলো। আল্লাহর কি ইচ্ছা..এসো দেখবে এসো।"

"আ..আমার মরা দেখে ভয় করে। আমি যাবো না।"

আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বিস্ময় চোখে মেঘনূরের দিকে তাকায়। সদ্য বলা কথাটা কারোই ঠিকমতো বোধগম্য হয় না। মেঝো গিন্নীর বড় পুত্রবধূ কুমকুম এগিয়ে এসে বলে," এমন বলতে হয় না। স্বামী না তোমার? কবুল করেছ যে।"

"ছোট মানুষ। এজন্য হয়তো ভয় পাচ্ছে।"

"যাবে না তুমি? মায়া হচ্ছে না স্বামীর জন্য ?"

মেঘনূর নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে নেই কোনো প্রতিত্তুর। মায়া? এই মানুষটার জন্য কি তার মায়া হচ্ছে? না খুব একটা হচ্ছে না..কি করে হবে? সে তো এই মানুষটাকে ঠিক করে চেনে না,জানে না৷ আসাকালে প্রথম দেখা হলো মাত্র। তাও ধমকে ধামকে একাকার। মনে মনে ভারী রাগ হয়েছিল বুড়ো ব্যাটার উপর। কিন্তু সে রাগ এখন নেই। এতোকষ্ট করে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেলো..

"আল্লাহর বান্দা আল্লাহর কাছে চলে গেছে। উনি তো অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। এমন কাশতে থাকলে কি ভালো থাকতে পারতো? আমার মা ও তো মরার সময় বলেছিল, খোদা গো এতো কষ্ট আর সইতে পারি না। তুমি তার চেয়ে নিয়ে যাও তোমার কাছে। একটু শান্তি দাও। আল্লাহ সেই কথা নিমিষে শুনে নিয়েছিল। রাত পোহানোর মাথাতেই তো মা সব রোগ ছেড়ে বিদায় নিলো নিরবে। কি জানি, উনিও হয়তো আজ তাই বলেছিলেন আল্লাহর কাছে। তাই হয়তো এমন দিনে..."

মেঘনূরের সরল গলায় বলা কথা শুনে কুমকুম মুখে আঁচল চেপে বড় বড় চোখ করে ছোট গিন্নীর দিকে তাকায়। আর্জিনা বিষম খেয়ে ভারী মুখে বলে,"অবুঝ নাদান মেয়ে। ওর কথা বাদ দাও বউ।"

"এ মেয়ের দেখি এখনো জ্ঞান ফোটেনি ছোটমা।"

"ফুটবে কি করে? ফুল হওয়ার আগেই কলি ছিঁড়ে আনলে এমন তো হবেই। কি দরকার ছিল এই ব্যামো নিয়ে বিয়ে করার..এই এতিম মেয়েটার কপাল পোড়ার দায় কি বড় গিন্নি নিবে?"

কুমকুম নাক টেনে করুণ গলায় বলে,

"ও জানি না ছোটমা৷ ভাইজানের মাথায় কি ভূত চেপেছিল আর বম্মাই বা কি বুঝে রাজি হলো কে জানে।"

ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে থাকে। সবাই নতুন বউয়ের দিকে উজবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হায় হুতাশ করতে করতে কান্নার সুর তোলে। কিন্তু নতুন বউয়ের সেদিকে খুব একটা তাল নেই। সে ভাবছে অন্যকিছু। যেহেতু স্বামীই আর নেই, সে আর এ বাড়িতে থেকে কি করবে? মামা ভাই আসলে সেও আবার বাড়ি ফিরে যাবে তাদের সাথে। না নিতে চাইলে জোর করেই যাবে। দরকার হলে কেঁদেকুটে ভাসাবে। তবুও যাবে। আর কদবেল না হয় নাই খেলো। কুসুমদের গাছে তো আছেই। ঠিক পেড়ে নিয়ে লবণ মরিচে মাখিয়ে খাবে।

"ও..অগ্নিবীণা, তোমার শহুরে পুত্রকে কি একটাবার খবর পাঠাবে? সময় হবে কি তার খানদানি রাজ্য ছেড়ে গায়ের পথ মাড়ানোর? হাজার হোক ভাই তো। ভাইয়ের মৃত্যুকালে ভাই আসবে না, তা তো হতে পারে না।"

গুরুজনদের কথায় অগ্নিবীণা নিরুত্তর ভঙ্গিতে পাথর হয়ে বসে থাকে ৷ চোখ হতে টপটপ করে ঝরছে তার অশ্রুজল। সৎ ছেলের এমন আচানক প্রয়াণে তার মতো শক্ত দিলের মানবীর হৃদয় ভেঙে চুরমার। এদিকে নিজ পেটের সন্তানের আগমন নিয়ে সে নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত। বললেই যে ধূলো উড়িয়ে চলে আসবে এমন নয়। শহরের মাঝে বিশাল ব্যবসা বাণিজ্য,লোক সমাগম নিয়ে ডুবে থাকে সবসময়। জমিদারি ছোঁয়া তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নিজস্ব নিয়ম,নিজস্ব কায়দায় চলা এই রাশভারী, গম্ভীর স্বভাবের সাহেবের আদৌও কি সময় হবে শিকদার ভবনে পা রাখার?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন