যে রাতে বাসর হওয়ার কথা ছিল, সে রাতে হলো স্বামীর দাফন। নতুন বউয়ের গায়ের গহনা এখনো ঝকঝকই করছে, লাল পাড়ের শাড়ি তার গায়ে জড়ানোই আছে অথচ যার রঙে লাল হলো সে, সে চলে গেলো পরপারে। বিয়ের দিনেই নববধূ হলো বিধবা।
ইকবাল শিকদারের দাফন কার্য কাজ শেষ হয়েছে একটু আগে। মেঘনূরের মামা ভাই সহ গ্রামের অর্ধেক মানুষ এসেছে শিকদার বাড়িতে জানাজায় অংশ নিতে। আসেনি শুধু শহুরে সেই সাহেব। ব্যবসায়িক কাজে সে যে দেশ ছেড়েছে কদিনের জন্য তা অজানা ছিল অগ্নিবীণা সহ গোটা পরিবারের মানুষদের। যার কারণে তাকে ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে বাকি কার্য।
ফাল্গুনের রাত হয়ে উঠেছে জনমানবে ভরপুর। বাগান বাাড়ির সারি সারি লন্ঠনের হলুদ আলোতে নারী পুরুষের গমগমে আওয়াজ ভাসিয়ে তুলছে গোটা শিকদার বাড়িকে। তবে, অন্দরমহলে প্রবেশের অনুমতি নেই কারো। যা সব আহাজারি সবকিছু উঠোন বাড়িতে,কাছারি ঘরেতে। শিকদার বাড়ির বউ ঝিরা খুব দরকার ছাড়া পরপুরুষের সম্মুখীন হয় না।
কঠোর নিয়মে বাঁধা তাদের জীবন যাত্রা। বাড়ির সমস্ত পুরুষেরা তাদের দেখভাল করে নিজস্ব নিয়মে। তবে, গোটা বাড়ির শাসনের তদারকি আবার অগ্নিবীণা শিকদারের হাতে।
"তুমি থাকতে চাও না এ বাড়িতে?"
অগ্নিবীণার ঠান্ডা গলার প্রশ্নে মেঘনূর মাথা নুইয়ে শাড়ি চেপে থাকে। মনে ভয় জমে সরাসরি 'না' বলতে। স্বামী মরার শোকে এক ফোটা জল চোখ হতে না গড়লেও মামা ভাইয়ের কাছে ঠিকই কেঁদেকুটে ভাসিয়েছে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা সহজে রাজি না হলে কান্নার বেগ বাড়িয়ে কেঁদেছে সে। আর তার কান্নার শব্দে আশেপাশে সবাই মনে করেছে স্বামীর শোক পেয়েছে অবশেষে।
"থাকবে না?"
"আ..মি বা..ড়ি যাবো।"
"এটাই তো তোমার বাড়ি। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই তো মেয়েদের আসল বাড়ি হয়। তুমি জানো না?"
মেঘনূর মাথা তুলে চায়। অবুঝ মনে তার প্রশ্নেরা এসে দোল খায়। স্বামীই তো নেই আর। তাহলে আর স্বামীর বাড়ি দিয়ে কি করবে সে? কার সংসার করবে? এটা কি তারা জানে না?
আশেপাশে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকা সব বউঝিদের দেখে মনের মাঝে ভয়েরা এসে ফের দল পাকায়। এরা যদি জোর করে ধরে বেঁধে রাখে? বুড়ো তো মরে গেছে। এখন সে একা। যদি আলতা বুবুর মতো তাকে মেরে ফেলে বালিশ চাপা দিয়ে? তখন?
"আ..আমি থাকবো না। আমি বাড়ি যাবো।"
মেঘনূর কথা শেষ না করতেই গলার স্বর বাড়িয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ভাসায়। অগ্নিবীণা সহ আশেপাশে সবাই হকচকিয়ে উঠে এক লহমায়। মুখে আঁচল চেপে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। মেঝো গিন্নী নাজদা দু কদম এগিয়ে এসে শক্ত গলায় বলেন,
"কান্না থামাও মেয়ে। স্বামীর জন্য তো দুফোঁটা গড়ালো না পানি,এখন বাড়ি যাওয়ার জন্য এভাবে কাঁদছ? এতো পাথর চাপা মন কেন তোমার? খারাপ লাগছে না একটুও?"
কুমকুম বম্মার দিকে এক নজর তাকিয়ে শাশুড়ীর উদ্দেশ্য মিনমিনে কন্ঠে বলে,
"কাঁচা ধানে খই ফুটিয়ে কি বা হবে মা? এ মেয়ের তো বুঝশক্তিই নেই। দিলে মোহাব্বত না থাকলে কাঁদবে কিভাবে?"
"কেন? দিলে মোহাব্বতই কি সবকিছু। নিজের কপালের দিক চেয়েও তো কষ্ট পাওয়া যায়। নতুন বউ স্বামী শোকে না কেঁদে বাড়ি যাওয়ার জন্য কাঁদছে। এমনটা দেখেছো কখনো?"
কুমকুম শাশুড়ি মায়ের ঝাঁঝালো কণ্ঠে নিরুত্তর হয়ে যায়। মুখে আঁচল চেপে দু কদম পিছিয়ে ছোটমার হাতে চিমটি কাটে চুপিসারে। ছোট গিন্নী আর্জিনা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
"বাপ মা মরা মেয়ের কপাল এমনিতে পোড়াই হয় মেজ ভাবি। তা না হলে বিয়ের দিন কারো স্বামী মরে বলো? এ মেয়ের পোড়া কপালে নতুন করে আর কি পুড়বে। ও এখানে থেকেই বা আর কি করবে.."
"অলক্ষুণে কারবার সব। জাত পাত বংশ না দেখে এমন.."
পুরো কথা শেষ করার আগেই নাজদার মুখ বন্ধ হয়ে যায় অগ্নিবীণার এক হাতের ইশারায়। রাগান্বিত মেজাজখানি দমে যায় সুরমা লেপে থাকা চোখজোড়া দেখেই।
অগ্নিবীণা মেজ'জায়ের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলেন,"জাত, পাত, বংশ , পদবি, ধনী, গরিব এসব আমার সামনে উচ্চারণ করবে না। আল্লাহ তোমাকে যে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছে, নন্দীপাড়ার পাগলা ফকিরকেও একই মাটি দিয়ে তৈরি করেছে। খোদার হাতের পুতুল হয়ে অহংকার করবে না খবরদার। মনে রাখবে, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।"
নাজদা বড় গিন্নীর কথার ধারে চুপ হয়ে যায়। অগ্নিবীণা সেদিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে কুমকুমের দিকে তাকিয়ে বলেন,
"বাড়ির পুরুষেরা কি বললো?"
"নলিনী খবর দিলো, নতুন বউয়ের ভাইয়ের অনুরোধে নাকি বাবা,কাকা, উকিল ভাই তারা অনুমতি দিয়েছে। বলেছে থাকবে না যেহেতু পাঠিয়ে দিতে।"
"ভরণপোষণের কথা কিছু বলেছে?"
"না, সে নিয়ে কিছু বলেনি৷ আপনি যেটা বলবেন সেটাই হয়তো.."
অগ্নিবীণা খানিক সময় নিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে। অতঃপর ধীর গলায় বলেন,
"অলোকাকে ডাকো বউ। তার অনুমতির প্রয়োজন। সেই তো ইকবালের সবচেয়ে আপন। বোন হয়ে অধিকার ফলাবে তো সেই।"
"কিন্তু, মা তো আপনি বম্মা।"
"সৎ মায়ের মূল্য খোঁজা বারণ।"
কুমকুম আর কথা বাড়ায় না। শিমলাকে নিয়ে দুজনে মিলে যায় ইকবাল শিকদারের একমাত্র বোন অলোকাকে ডাকতে। গিয়াসউদ্দিন শিকদারের প্রথম পক্ষের ছেলে মেয়ে ইকবাল, অলোকা। ২০ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন পাশের গ্রামের মেয়ে রাজিয়াকে। বিয়ের একবছর পর ঘর আলো করে আসে তাদের পুত্র সন্তান ইকবাল। এর ঠিক দশ বছরের মাথায় ফের পুত্র সন্তানের আশায় ধরণীতে আসে অলোকা। ইকবালের যখন এগারো শেষে বারো ছুঁই ছুঁই তখন গ্রামে গন্ডগোলের কারণে নিজেদের দল ভারী করতে গিয়াসউদ্দিন পনেরো বছর বয়সী জমিদার কন্যা অগ্নিবীণাকে বিয়ে করেন। তবে সতীনের ঘর রাজিয়াকে খুব বেশিদিন করতে হয়নি। অসুখের বেড়াজালে পরে দুনিয়া ছাড়েন দু বছরের মাথায়। ওদিকে সংসার ধর্ম করতে করতে অগ্নিবীণার কোল আলো করে আসে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। মুস্তাফা নওয়াজ শিকদার।
"ডাকছেন মা?"
"ডাকছি।"
অলোকার চক্ষুজোড়া লাল। ভিতর পুড়ে ছারখার। বাপ মা শেষে আপন বলতে ভাইটাকেও হারালো সে। আর কিছুই রইলো না তার এই দুনিয়ায়। মাথায় আঁচল টেনে মলিন মুখো হয়ে বলে,"কি জন্য?"
"মেঘনূর এ বাড়ি থাকতে চাইছে না। ও চলে যেতে চায়। তোমার কি মত?"
অলোকা এক পলক মেঘনূরের দিকে তাকায়। ভেজাকন্ঠে বলে,"স্বামী মরলে চল্লিশ দিন ঘরের চৌকাঠ পেরোতে হয় না। চল্লিশ দিন পরে গেলে হয় না?"
মেঘনূর অলোকার প্রশ্নাত্মক চাহনি উপেক্ষা করে মাথা নিচু করে। আনমনে আঙুলের কড়ে চল্লিশ দিন গুনতে শুরু করে। সতেরো অব্দি টানা গুণে আঙুলের কড় খুঁজে পায় না আর সে। বৃদ্ধা আঙ্গুলিতে তর্জনী ঠেকিয়ে মনে মনে বলে," না হয় না,আমি থাকবো না এ বাড়ি। আমাকে ছেড়ে দিন। পাকঘর থেকে একটা রসুন কোয়া আঁচলের গিঁটে চেপে সোজা দৌড়ে দিবো বাড়ি। এ পথে আর ফিরে তাকাবো না।"
"চল্লিশ দিনে কি আসে যায় অলোকা? ও তো সংসারে ঝুলিই খোলেনি। অন্তর খুঁটলে স্বামীর নামটা অব্দি পাওয়া যাবে না। বেঁধে রেখে কি আর লাভ?"
ছোটমার কথায় অলোকা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
"তাহলে আর কি? চলে যাক।"
"তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?"
"ভাই বেঁচে নেই। আপত্তি আসবে কেন।"
সদুত্তর পাওয়া মাত্র অগ্নিবীণা অলোকা, নাজদা, আর্জিনাকে কক্ষে উপস্থিত থাকতে বলে বাকি সবাইকে বলে কক্ষ হতে বের হয়ে যেতে। দুই পুত্রবধূ সহ ছেলে মেয়েরা সকলে তার নির্দেশ মতো একে একে চলে যায় কক্ষ ছেড়ে।
"শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তোমাদের বিয়ে হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সংসার বোঝার আগেই স্বামীকে হারিয়ে ফেললে। অনাচার, অলক্ষুণে কারবার,কুসংস্কার এসব কিছুই নয়। আমি এগুলো মানি না, বিশ্বাস করি না।
আমার পুত্রবধূ কিংবা শিকদার বাড়ির বউ হিসেবে তোমার প্রতি আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। তা যেভাবে হোক পালন করতেই হবে। তোমার ভরনপোষণের সমস্ত খরচা কিছু আমরা দিবো। বাড়ির পুরুষেরা তোমার মামা ভাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন হয়তো এতোক্ষণে। নতুন জীবনে অভীষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত তা চলতে থাকবে এবং ততদিন পর্যন্ত এ বাড়িতে যে কোন প্রয়োজনে তোমার ডাক পড়লে তুমি সাড়া দিবে। প্রয়োজন হলে তোমাকে রাত্রিযাপনও করতে হবে। এ আমার নির্দেশ রইল।"
অগ্নিবীণা কথা শেষ করে নিজ গলা হতে মোটা স্বর্ণের একখানা চেইন খুলে নেয়। মেঘনূরের গায়ে জড়ানোর আগে উপস্থিত বউদের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেন, "তোমাদের কোনো কিছুতে আপত্তি আছে কি? থাকলে বলো। আমি যদি ভুল কিছু বলে থাকি সংশোধন করে দাও। মেজোবউ, অলোকা.."
"আমাদের কোনো আপত্তি নেই। যেটা ভালো হয় আপনি করুন।"
অগ্নিবীণা সন্তুষ্ট চিত্তে মৃদু ঠোঁট প্রসারিত করে। স্বর্ণের চেইনখানা মেঘনূরের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেন,"কোনো এককালে ক্ষণিকের জন্য, তুমি যে আমার পুত্রবধূ হয়েছিলে এই তার প্রমাণ রইল। অনুরোধ থাকবে, এই গয়না অক্ষত রাখার জন্য। ভালো থেকো তুমি।"
_____________
কালো রাত ছাড়িয়ে সূর্যের দেখা মেলে ভোরের আকাশে। সময়ের হিসেবে পেরোয় একটা দিন। সূর্যের আলো ফুটতেই কিচিরমিচির করে উড়া আসা একদল পাখি এসে বসে নিম্ন মধ্যবিত্ত এক বাড়ির শাল গাছের ডালে।
সকাল সকাল রান্নাঘরের দাওয়া মাটি দিয়ে লেপতে লেপতে সুলেখার তীর্যক স্বর ভেসে আসে। স্বভাবে সে খুব কড়া হলেও কাজ তার টিপটাপ ফিটফাট। বাড়িঘর আয়নার মতো চকচকে রাখে সবসময়। সামান্য ময়লা সহ্য করতে পারে না। এক উঠোন দিনে হাজারবার ঝাঁট দেওয়া হয় তার।
"কপাল আমার, কপাল। সুখ সয় না তাতে। ঘাড় হতে কোনদিন ঝামেলাও আমার নামবে না, এ আমি বুঝেছি। আমার রক্ত শুষে না খাওয়া অব্দি শান্তিও হবে না। হতচ্ছাড়া মেয়ে! এতো কষ্ট করে খরচাপাতি করে বিয়ে দিলাম। একটা দিনও স্বামী ধরে রাখতে পারলি না?"
মেঘনূর সদ্য ভাঙা কাঁচা ঘুম ঠেলে বিছানা ছেড়ে উঠে। ভোর হতে যে মাইক বাজছে তাতে আর তার ঘুম হবে না। পরনের সুতি শাড়িখানা ঠিকঠাক করে কলপাড়ে যায় সে । চোখ মুখ কুঁচকে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতে দিতে বলে,"তোমার কপালের দোষ আমায় কেন দিচ্ছ মামি ? বুড়োটাকে কি আমি গলা টিপে মেরেছি নাকি? ও বুড়োকে কাল দেখেই আমি বুঝেছিলাম মরবে। কিন্তু আমার মুখের কথা যে এতো তাড়াতাড়ি ফলবে সেটা কি জানতাম নাকি।"
"কি সর্ব্বনেশে মেয়ে রে তুই নূর? বিয়ের দিনই স্বামীর মৃত্যু কামনা করেছিলি? তোর কি একটুও মনে আটকায়নি। এমন অলক্ষুণে কথা মুখ দিয়ে বের হলো?"
"মনে আসলে মুখে বলতে কি দোষ? উঠোন ঝাঁট দিতে হবে নাকি বলো। ওসব বিয়ে বিয়ে খেলা শেষ।"
সুলেখা হাতের কাজ থামায়। রাগান্বিত স্বরে বলে," তোরে এ বাড়িতে ভাত দিবে কে? শ্বশুরবাড়ি পার হ যা। দয়া করে মামার ঘাড় থেকে এবার নাম। বাপ মা খেয়ে দুই ভাইবোন তো সেই যে ঘাড়ে উঠে বসেছিস। তোদের জন্য কি আমার সব বিসর্জন দিতে হবে?"
"মারো কাটো যাই করো ও বাড়ি আমি যাবো না। একশো একটা বউ ঝি দিয়ে ভরপুর ও বাড়ি। ইয়া বড় বাড়ি। একমাথায় ঢুকলে আরেক মাথা খুঁজে পাওয়া যায় না। কার মনে কি আছে কে জানে। দুদিন সংসার না করতেই হিংসার জোরে কে যে আমার মুখে বালিশ চাপা দিবে সেটা কি আমি জানতে পারবো? আলতা বুবুর মতো মরার শখ নেই আমার বাবা। তার চেয়ে মামার ঘাড়ে বসেই থাকবো। খাই তো দুটো ভাত। এমন করো কেন? কাজ কি কিছুই করি না?"
"তোর মতো দস্যি মেয়েকে বালিশ চাপা দেওয়ার সাহস কারো আছে? এসব হচ্ছে তোর নাটক। মামার সংসার ধ্বংস করবি এই চাস তুই। আমি জানি না ভেবেছিস? উহ, আবার কাজের খোঁটা দেয়? মহারাণী কাজ করে একেবারে উদ্ধার করে আমাকে।"
"তোমার মেয়ের চেয়ে ভালোই আছি। সে তো বেলা দশটা অব্দি পরে পরে ঘুমায়।"
সুলেখা খিটমিটে মেজাজে দাওয়া ছেড়ে উঠোন লেপতে শুরু করে। নিয়ম করে কতক্ষণ, শ্বশুর বাড়ির গুষ্টি নিয়ে বকাবকি শেষে তিক্ত গলায় বলে,"পায়ে পায়ে ঝগড়া করতে খুব পারো তাই না? যাও কাপড়গুলো ধুয়ে এনে আমায় উদ্ধার করো।"
মেঘনূর গামছা দিয়ে চোখ মুখ মুছে উঠোনে নেড়ে দেয়। মামির সাথে তার দা কুমড়ার মতো সম্পর্ক। কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেনা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝগড়া করে ঠিকই কিন্তু সুলেখার যেকোনো কাজের আদেশ মানতে সে বাধ্য থাকে।
বাড়ি ছেড়ে কিছুটা দূরে শান বাঁধানো পুকুরঘাট। সকালের দিকে অনেক বধূগণই ভীড় জমায় সেখানে। কেউ কেউ কাপড় ধুতে আসে তো কেউ কেউ নাওয়া সাড়তে। মেঘনূর তার এক সখীকে পেয়ে গাল গপ্পে মশগুল হয়ে কাপড় ধুতে থাকে। সকালের মিষ্টি রোদ তার মুখের উপর লুকোচুরি খেলছে। শ্যামলা বর্ণ গায়ের রঙ জ্বলজ্বল করছে সেই আলোতে।
"কাল বিয়ে হলো, স্বামীও মরলো। আজ এসেছিস কাপড় ধুতে?বলি তোর কি মন টন বলে কিছু আছে? একফোঁটা জলও নেই চোখে বাপরে বাপ।"
মেঘনূর পিছু ফিরে চায়। শেখ বাড়ির সেজো বউ আসমার কথা শুনে মুখ লটকে বলে,"এই কাপড়গুলো তুমি তাহলে ধুয়ে দাও। আমি বসে বসে কাঁদি।"
আসমা তব্দা খেয়ে যায়। পাশে কাপড় ধুতে থাকা ফজলার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
"মেয়ের কথা শুনলে চাচি? কি ধাঁচ বাবা। এমন মেয়ে বাপের জন্মে দেখিনি।"
"ওর মাথায় ব্যামো আছো। নয়তো এমন দেখেছো কোনদিন? বিয়ের দিন স্বামী মরলো কোনো হেলদোল নেই। কাল বিদায় নিলো আজ আবার এসে হাজির। দাঁত কেলিয়ে কাপড় ধুইতে এসেছে।"
"যাঃ বলেছো।"
"বলি ও মেঘনূর তোর কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না?"
মেঘনূর সাবান ফেনা হাতের উপর নিয়ে ফু দিয়ে দিয়ে বেলুন বানায়। আশেপাশে সবার কটু বাণী তার কানে গেলেও সেসবে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। নিজ কাজে মত্ত থেকে বলে,"আমার কাঁদা আসে না কি করি বলো। তোমরা একটু আমার হয়ে কেঁদে দাও। বুড়োর কবরে গিয়ে বলে আসবো, ও বুড়ো তোমার সখীরা তোমার জন্য কাঁদছে একটু সওয়াব পাঠিয়ে দাও তাদের জন্য।"
ফজলার মা'সহ আশেপাশে সবাই একবাক্যে চুপ হয়ে যায় মেঘনূরের কথা শুনে। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো ভাষা খুঁজে পায় না তারা। পাশ হতে কেউ একজন
ফিসফিসিয়ে বলে,"চুপ থাকো। ওর সাথে কথা বলার কি দরকার বাপু? ও মেয়ের সাথে নিশ্চিত জ্বেনের বসবাস।"
-------------------------------------------------
"নূর বুবু তোমায় শাদাব ভাই ডেকেছে।"
"আমাকে?"
"হ্যাঁ। এখনই যেতে বলেছে। তাড়াতাড়ি যাও।"
মেঘনূর বালতি ভর্তি কাপড় নিয়ে হাঁটা নামায়। পথিমধ্যে দৌড়ে আসা কুঞ্জের দেওয়া খবরে তার আত্মা শুকিয়ে উঠে। চোখজোড়া হয়ে উঠে ভীত। শাদাব ভাই তাকে ডেকেছে মানে? সে যে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এসেছে এটা উনি জানলো কিভাবে? দেখেছে নাকি?
"আমি পুকুরপাড় থেকে এলাম মাত্র। পরে গেলে হবে না?"
"তোমাকে এক্ষুণি যেতে বলেছে মানে এক্ষুণি। বালতি তুমি আমায় দাও। যাওয়া পথে তোমার বাড়ি রেখো আসবো।"
কুঞ্জ মেঘনূরের থেকে বালতি নিয়ে চলে যায়। যাওয়া পথে আবারো তাড়া দেয় তাকে। মেঘনূর পড়ে বিপাকে। ভেজা হাত পরনের শাড়ির সাথে মুছে অতঃপর পা বাড়ায় পুকুরঘাট ছাড়িয়ে দু বাড়ি পরের বাড়িটায়।
একতলা পাকা দালান বাড়ি ছেড়ে কিছুটা দূরে নতুন টিনের চালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বড় কক্ষ। সারি সারি লাইট ফ্যান লাগানো তাতে। কাঠের বেঞ্চি হবে তাও আট নয় খানা। তবে অর্ধেক বেঞ্চই ফাঁকা পড়ে থাকে। তিন গাঁ মিলে গুটি কুড়ি ছাত্র ছাত্রী হবে কি না বোঝা দায়। পড়ালেখার বাহার খুব একটা নেই বললেই চলে। এ ক'জন যে পড়ে তাইতো ঢের।
সামনে সাইনবোর্ডে লেখা বিদ্যান্বেষণ কোচিং সেন্টার।
মেঘনূর ধীর পায়ে উঠোন পেরিয়ে কোচিং সেন্টার এর দিকে যেতে থাকে। পিছনে ডাক পড়ে দালানবাড়ি হতে এক পৌঢ়া রমণীর। কুঁচকানো চামড়া ভাঁজ হয়ে নেতিয়ে পড়েছে তার। হাতে একখানা লাঠি নিয়ে হাঁক ছেড়ে ডেকে বলে,"ও নূর শোন তো দেহি।"
মেঘনূর পদ যাত্রা থামিয়ে আবার সেদিকে বাঁক নেয়। লোহার গ্রিলে আবৃত বারান্দার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে,"কি হয়েছে?"
"সংসার হলো?"
"দেখতেই তো পাচ্ছো।"
"বিয়ার দিনই স্বামী খাইলি?"
মেঘনূর বিরক্ত হয়ে উঠে। রাগ এসে শরীরে ভর করে। সবার মুখে মুখে এক কথা। কাল হতে শুনতে শুনতে কান পঁচে গেলো তবুও থামার নাম নেই। বুড়ো জুয়ান বাচ্চা থেকে শুরু করে যে যেমন পারছে তাকে এই কথার বাণে জর্জরিত করে যাচ্ছে। আর কত??
"হু খেলাম। কি বলবে বলো।"
"তুই এমন মাইয়া? স্বামী খাইয়াও আফসোস নাই?"
"বুড়ির ঘরের বুড়ি, স্বামী কি খাওয়ার জিনিস যে খাবো? ঝগড়া করতে এসো না বলে দিলাম। মেজাজ কিন্তু গরম আছে।"
লম্বা বারান্দার এক পাশে রান্নাঘর হতে জবেদা বেগম হাসতে হাসতে বের হন। হাতে তার রান্না করার খুন্তি। তরকারির ঝোল লেপটে আছে তাতে। শাড়ির আঁচলে গলার ঘাম মুছতে মুছতে বলেন,
"এমন খেপেছিস কেন রে মেয়ে?"
"তোমার শাশুড়ীর মরার সময় হয়েছে। তাও কুটনামি ছাড়ে না কেন বড়মা? আমি স্বামী খেয়েছি এই চিন্তায় বুড়ির ঘুম হচ্ছে না।"
"শান্ত হ শান্ত হ। ওতো রাগতে হবে না। দোষ তোর মামা মামির। তোর এখানে কোনো হাত নেই।"
"কয়জন বুঝছে সে কথা বলো? আমি কেন কাঁদছি না,কেন স্বামী শোকে পাগল হচ্ছি না এই নিয়ে গ্রামের মানুষের ঘুম হারাম হচ্ছে? আমার সাথে এদের এতো কি সাধ? নিতে পারবে আমার কপালখানি?"
"রাগ করিস না মা৷ মানুষের মুখ আছে বলবেই। যা এখন তোর শাদাব ভাই এর কাছে শিগগির যা। সে তো তোকে ডেকেছে।"
"যাচ্ছিলামই তো এই বুড়ি পিছু ডেকে.."
"হতচ্ছাড়ি মাইয়া।"
"মা আপনি থামুন। বাচ্চা মেয়ের সাথে লাগতে যান কেন? যান ঘরে গিয়ে তসবি পাঠ করুন তাও কাজে লাগবে।"
"বুড়ির মরার চিন্তা নেই।"
"তুই থাম। মামির সাথে ঝগড়া করে করে গলা বড় হয়ে গিয়েছে তোর।"
মেঘনূর মুখ বাঁকিয়ে গিজগিজ করতে করতে ফের হাঁটা ধরে। জবেদা বেগম খুন্তি হাতে খানিকটা এগিয়ে এসে গ্রিল ধরে মুখ বাড়িয়ে বলে,
"শোন মেয়ে, যাওয়া পথে দুটো কদবেল নিয়ে যাস। বারান্দায় রাখবো। তোর জন্য আজ সকালে মাদুলিকে দিয়ে তুলে রেখেছিলো শাদাব।"
কদবেলের কথা শুনতেই বিরস মুখে হাসি ফোটে মেঘনূরের। কথা থেমে যায় তার। পিছু ঘুরে না তাকালেও ঠোঁটের কোণে হাসি প্রসারিত হয়ে উঠে। শাড়ির কুঁচি সামলে সে দ্রুত হেঁটে এসে দাঁড়ায় তার ভাবনা অনুযায়ী যমের ঘরে।
শাদাব খন্দকার। মাগুরাডাঙ্গা সরকারি কলেজের গণিতের শিক্ষক। বয়স ২৯ ছুঁই ছুঁই। শহর থেকে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা করছে নিজ গ্রামে। শহুরের যান্ত্রিক জীবন তার মনকে ধরে রাখতে পারিনি। ভালো চাকরি ছেড়ে, বিলাসী জীবন ছেড়ে আপন ভিটায় থিতু হয়েছে সে। গ্রামের মতো পরিবেশে যেখানে পড়াশোনার তেমন কোনো রেওয়াজই নেই সেখানে নিজ উদ্যেগে শহরের ভাঁজ ধরে কোচিং সেন্টার খুলেছে দূর্গম সাহস নিয়ে। একক প্রচেষ্টায় বেশ উন্নতিও করেছে বলা চলে। এই প্রত্যন্ত গ্রামে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের পড়ানো মুখের কথা না। নিজ গ্রামসহ আশেপাশে কয়েক গ্রাম মিলে ছাত্র ছাত্রী জোগাড় করেছে সে বহুকষ্টে। যদিও সময়ের বিবর্তনে দু একটা করে হারিয়ে যায় তবুও হাল ছাড়ে না।
চোখে চিকন ফ্রেমের চশমার সঙ্গে চেহারা সুরুত মানানসই বেশ। শান্ত, ধীর প্রকৃতির ছেলে। গ্রামের মধ্যে সে আর ও পাড়ার নিতুন বসুর ছেলে এ দু'জনই নামকরা মাস্টার।
দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের পড়া চলছে এখন। বোর্ডে অংক বুঝিয়ে দেওয়া শেষে করতে দিয়েছে সবাইকে। বর্তমানে চেয়ারে বসে বইয়ের পৃষ্ঠায় মুখ ডুবিয়ে রেখেছে শুভ্র বর্ণের পুরুষটি।
টিপটাপ পায়ে শাড়ি পরনে মেঘনূরের আগমন ঘটতেই সে চোখ তুলে চায়। এক নজর দেখা শেষে চোখ নামিয়ে নিয়ে বই বন্ধ করতে করতে বলে,"বারান্দায় গিয়ে দাঁড়া।"
মেঘনূর চুপচাপ কথা না বাড়িয়ে ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বুকের মধ্যে তার ঢিপঢিপ আওয়াজ শুরু হয়েছে। এই যমকে দেখলে তার কেন যে এতো ভয় লাগে বুঝতে পারে না। অথচ সারা দুনিয়া চষে বেড়ায় সে।
শাদাব পরনে সাদা চেক শার্ট হালকা টেনে বারান্দায় আসে। মেঘনূরের সম্মুখে না দাঁড়িয়ে পাশে দাঁড়ায় সে। দু'হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে অদূরে দৃষ্টি রাখে। থমথমে গলায় বলে,"বিয়ের কারবার শেষ হয়েছে তোর?"
"হু।"
"খুব শখ ছিলো বিয়ে করার?"
"না।"
"করলি কেন?"
মেঘনূর শাড়ির আঁচলে নখ খুঁটতে খুঁটতে ধীর কন্ঠে বলে,"সবাই বলেছিলো করতে।"
"সবাই যা বলবে তোর তাই শুনতে হবে?"
"না শুনে উপায় নেই।"
শাদাবের কপাল ভাঁজ হয়ে আসে। গলার স্বর উঁচু হয়ে এলেও
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সে। ভারী গলায় বলে,"পড়াশোনা কি আর করবি? নাকি আবার বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নিবি?"
শাদাব ভাইয়ার ত্যাড়া কথায় মেঘনূর চাপা শ্বাস ফেলে নিরবে। এই যমের কাজই হচ্ছে তাকে কথা শোনানো। একটা কিছু পেলেই সেটা নিয়ে কথা শোনানো শুরু করবে। বিয়ের জন্য আবার প্রস্তুতি নিবি মানে? সে কি চেয়েছিল এই বিয়ে করতে?
"পড়বো।"
"বিয়ের জন্য দশদিন আগেই কলেজ বাদ দিয়েছিলি। এদিকের পথও ভুলে গিয়েছিলি। বোর্ড পরীক্ষায় তোর মতো হাবাগোবা ছাত্রী পাশ করবে আদৌও? নাকি এসএসসি পাশ করে নিজেকে বিদ্যাসাগর মনে করছিস? আর না পড়লেও চলবে?"
মেঘনূর মুখ তুলে চায় ধীরে ধীরে। শুকনো ঢোক গিলে বলে,"এখন থেকে কলেজে যাবো।"
"কাল থেকে সকাল সাতটায় তোকে যেন এখানে দেখি আর দশটার সময় কলেজে। এর হেরফের হলে তোর আর তোর ভাইয়ের খবর করে দিবো আমি। মনে করিস না, এসএসসি আর এইচএসসি এক। প্রথম বর্ষে উঠেছিস মাত্র জন্য টের পাচ্ছিস না। যখন পরীক্ষার হলে গিয়ে বসবি তখন বুঝবি। মাথায় ঢুকছে কি কথা?"
"হু।"
"মৃদুলকে বিকেলে পাঠিয়ে দিবি আমার কাছে।"
"হু।"
শাদাব আঁড়চোখে মেঘ নূরের দিকে তাকায়। এক পলক তাকানো শেষে দৃষ্টি সরিয়ে বলে,"স্বামীর জন্য মন খারাপ?"
"না।"
"না?"
"হু। বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়েছিল। যক্ষারোগী। আপনি বিয়েতে এলেন না কেন শাদাব ভাই?"
"আমি গিয়ে কি করবো?"
"কেন? দাওয়াত খেতেন।"
শাদাব ঠোঁট চেপে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, "তুই খেয়েছিলি তোর বিয়ের দাওয়াত?"
"খাবো না কেন? পেট ভরে খেয়েছিলাম।"
"শিকদার বাড়ি পছন্দ হয়েছে?"
শাদাবের নমনীয় কন্ঠে সাহস পায় মেঘনূর। হাসিমুখে সঙ্গে সঙ্গে বলে," জমিদার বাড়ির ভিতরটা পছন্দ না হলেও বাগানবাড়িটা পছন্দ হয়েছে অনেক। কদবেল গাছ আছে অনেক। পাকা পাকা কদবেল সব।"
"থাকলি না কেন তাহলে?"
"ভয় করে। আলতা বুবুর মতো যদি মেরে ফেলে? কাদবেল খাওয়ার শখ মিটে যাবে তখন।"
শাদাব অন্তরালে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নেয়। মুখোভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে বলে,"ঠিক আছে যা এখন। কাল সময়মতো চলে আসবি।"
"আচ্ছা। "
"শোন।"
মেঘনূর দাঁড়িয়ে পড়ে। শাদাব অন্যদিক মুখ করে তাকিয়ে বলে,"আম্মা কিছু বলেছে তোকে ?"
"হু, আসাপথে বললো কদবেল রেখেছে আমার জন্য।"
"আচ্ছা যা।"
মেঘনূর চলে যায়। শাদাব তার যাওয়া পথে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে কিয়ৎক্ষণ। বুকের মধ্যে তার তোলপাড় হচ্ছে কিন্তু মুখে নেই তার কোনো প্রতিচ্ছবি। কেন হচ্ছে কি কারণে হচ্ছে এটা সে জানে না। শুধু জানে মেঘনূর তার সামনে এলে সে দ্বিগবিদিক হারিয়ে অতলে গহ্বরে তলিয়ে যায়। এই ডানা ঝাপটানো পাখিটার কাজলে মাখা চোখজোড়া দেখলে তার হৃদয় থমকে যায়। ভীষণ মায়া হয়।