ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাহেব বাবুর বিবি

পর্ব 6

লেখক: imran

"আমাকে তলব করছিলে?"

"জ্বি, আপনার সাথে কিছু কথা বলা প্রয়োজন ছিল।"

"ভিতরে এসো। বসে কথা বলি।"

নওয়াজ এক নজর মায়ের কক্ষের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। রাশভারী কন্ঠে বলে,"সময় নেই এখন আমার ভিতরে বসে কথা বলার। বের হতে হবে আমাকে।"

"এতো তাড়া কিসের?"

"কাজ থাকলে তাড়া থাকাটা স্বাভাবিক।"

ছেলের ক্ষুব্ধ অবয়ব দেখে অগ্নিবীণা আর কথা বাড়ায় না৷ দরজামুখে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে,

"আমি জানি তুমি আমাকে কি বলতে চাও। সেই কথা আমি নিজে থেকেই তুলতে চাই। মাগুরাডাঙ্গা আর সোনাগাতীর চরের কৃষকেরা এসেছিল আমার কাছে। এ বছর খরা আর অকাল বন্যায় ওদের ফসল প্রায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। বিঘাপ্রতি ফসলের যে পত্তনের টাকা দেওয়ার কথা, তা এবার ওরা দিতে পারছে না। আমি ভাবছি এবার ওদের কিছুটা মওকুফ করে দেওয়া হোক। বাদলাপুরের হিসেবটাও একটু নমনীয় করা দরকার।"

নওয়াজ হাত ঘড়িতে তাকিয়ে সময় দেখে তীর্যক হাসে। কর্কশ গলা উঁচিয়ে মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে,

"এটা অসম্ভব। এক ছটাকও আমি ছাড় দেব না। বাদলাপুর, মাগুরাডাঙ্গা আর সোনাগাতী এই তিন গ্রামের প্রতিটা চাষীর থেকে কাঁটায় কাঁটায় হিসেব বুঝে নেওয়া হবে।"

অগ্নিবীণার ভ্রু কুঁচকে আসে। শক্ত গলায় বলে,

"ওরা না খেয়ে মরছে, নওয়াজ। জোর খাটালে ওরা গ্রাম ছেড়ে পালাবে।"

"পালাবে না। বরং আপনিই বেশি ভাবছেন।"

"আমার ভুল ধরছো তুমি??"

নওয়াজ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলে,

"আম্মা, আপনার সাথে আমি তর্কে জড়াতে চাই না। আমার সে সময়ও নেই। গত বছর আপনার আদেশে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। তাতে কি খুব পরিবর্তন হয়েছে? হয়নি কিন্তু। এদের অসুবিধা আজন্ম ভরা। আর ছোটলোকদের আমি খুব ভালো করে চিনি। এরা হলো জাত শয়তান। গরিব নাম ভাঙিয়ে খাওয়া এদের পুরনো স্বভাব। এদেরকে মাথায় তুললে এরা পিঠে চড়ে বসবে। পিঠে দু-ঘা না পড়লে কারো টাকা বের হয় না। আর আমি দয়া দেখাতে শহর ছেড়ে গ্রামে আসিনি। আমি শিকদার বাড়ির মহাজন, কোনো এতিমখানা খুলিনি।"

অগ্নিবীণা চোয়াল শক্ত করে নওয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে তপ্ত গলায় বলেন,"তুমি ভুলে যাচ্ছো নওয়াজ, এই তিন গ্রামের কৃষকদের রক্ত জল করা ঘামেই কিন্তু এই গ্রামের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। ওদের একদম পিষে ফেললে লাঙলটা ধরবে কে? বাদলাপুরের জমিগুলো এবার এমনিতেই পড়ে থাকবে যদি ওদের বীজ কেনার টাকা না থাকে। টাকা আদায় করো ঠিক আছে, কিন্তু ওদের বেঁচে থাকার পথটা বন্ধ করো না।"

"ওদের বেঁচে থাকা না থাকায় আমার কিচ্ছু আসে যায় না। অর্থনীতির চাকা কেমন করে চালু রাখতে হয় সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। বীজ কেনার টাকা না থাকলে জমি বন্ধক রেখে টাকা নেবে আমার কাছ থেকে। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ শোধ করবে। সোনাগাড়ার ঘাটে কাল যদি দশ নৌকা ধান এসে না পৌঁছায়, তবে ওদের ভিটেমাটি আমি নিলামে তুলব।"

"তোমার দুঃসাহসিক কারবার শহরে গিয়ে করো। এই গ্রামে নয়। আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার স্পর্ধা দেখাতে এসো না।"

মায়ের ক্রোধান্বিত স্বরে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় নওয়াজ। তবে রাগ বা হঠকারিতার মাধ্যমে নয় বরং এক জাত ব্যবসায়ীর ঠান্ডা, যুক্তিপূর্ণ ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় নিজেকে মুড়িয়ে নেয় সে।

শান্ত পাথুরে গলায় বলে,

"আম্মা, ব্যবসা আর মহাজনী করতে হলে দয়া মায়া আর আবেগকে অন্দরের মহলে তালা মেরে রেখে আসতে হয়। ব্যবসায় কোনো বাকি চলে না, কোনো দয়া চলে না। হিসেব চলে সমান সমান, কাঁটায় কাঁটায়। সেখানে গ্রাম কি আর শহর কি।স্পর্ধা, দুঃসাহস দুটোই আমার আছে। আপনি নিজেও জানেন এ বছর পত্তনের টাকা আদায় আমার নির্দেশে হবে। এরপরেও এসব বলে আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না।"

অগ্নিবীণা ছেলের কথা শেষ হতে না হতেই গলার জোর আরও এক পর্দা চড়ান। কপালের মাঝখানে তীব্র ক্ষোভের ভাঁজ নিয়ে বলেন,"কম কি আছে তোমার নওয়াজ? দেশ বিদেশে বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছো। এই বিশাল সাম্রাজ্য থেকে সামান্য কিছু অংশ ছাড় দিতে কী এমন অসুবিধা তোমার?"

নওয়াজ সামান্য হেসে ধারালো গলায় বলে,

"অসুবিধা আছে । নওয়াজ শিকদার তার রাজত্বের এক ছটাক জমিও যেমন কাউকে দান করে না, ঠিক তেমনই নিজের প্রাপ্য এক আনা অংশও কাউকে ছাড় দেয় না। আজ যদি আমি মাগুরাডাঙ্গার চাষীদের ওপর দয়া দেখিয়ে চার আনা কর মওকুফ করি, তাহলে কাল সোনাগাতীর মাঝিরা এসে বলবে, সাহেব নদীতে মাছ মেলেনি, ঘাটের টাকা মাফ করুন। পরশু বাদলাপুরের জোতদারেরা এসে হাত পাতবে।

দয়া হচ্ছে এক ধরণের ছোঁয়াচে রোগ । একবার যদি এই পরগনার মানুষ বোঝে যে শিকদার বাড়ির ছোট সাহেবের মন গলেছে, তবে পরদিনই আমার এই পুরো রাজত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। শাসন করতে হলে পিঠে চাবুকটা সচল রাখতে হয়।"

অগ্নিবীণা ছেলের যুক্তিতে পাল্টা গলায় প্রতিহত করে বলেন,

"শাসন আর শোষণ এক জিনিস নয়। যে লাঙল মাটির বুক চিরে ফসল ফলায়, সেই লাঙল চালানো হাতগুলোকে যদি তুমি ঋণের জালে বেঁধে কেটে ফেলো তবে আগামী বছর এই শিকদার বাড়ির উর্বর জমিগুলো কেবল শ্মশান হয়ে পড়ে থাকবে। তখন তোমার এই অহংকার আর হিসেব খাটবে কার ওপর? ওরা বাঁচলে তবেই তোমার মহাজনী বাঁচবে।"

"ওরা এমনি মরবে না। এদের চামড়া অনেক শক্ত। ছোটলোকদের স্বভাবই হলো সুযোগ পেলেই মহাজনের টাকা মেরে দেওয়া। এরা অভাবের দোহাই দিয়ে ঘি পোলাও খায়, আর কর দেওয়ার সময় সাধু সেজে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। আমার শাসনকালে এসব চলবে না।"

মা ছেলের যুক্তি পাল্টা যুক্তির নির্মম লড়াই দরজার ওপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘনূরের বুকে তপ্ত তীরের মতো বিঁধতে থাকে। নওয়াজ শিকদারের প্রতিটি হিসেবি আর অহংকারী ব্যাখ্যা সীসার মতো গলে গলে তার কানে ঢুকছে। কাজল রঙা চোখদুটোতে ক্রোধের আগুনে জ্বলজ্বল করছে। বড় বড় মাথাদের উপস্থিতিতে পারছে না উগড়ে দিতে।

গাঁয়ের মেয়ে মেঘনূর। চাষবাস, কাদা মাটি আর রোদে পুড়ে খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে থেকে মানুষ হওয়া তার। ভালো করেই জানে সে, খরার দিনে যখন জমি ফেটে চৌচির হয়, তখন চাষীর বুক কেমন করে ফাটে। নওয়াজ শিকদার যাকে সুযোগ বুঝে টাকা মেরে দেওয়া বলছে, মেঘনূর চোখের সামনে দেখেছে সেটা আসলে কতটা তীব্র, হাড়ভাঙা খাটুনির পর এক মুঠো ভাতের জন্য অসহায় আত্মসমর্পণ। চোখের সামনে ভেসে উঠে,

নিজের ভাই কেমন করে বাপের রেখে যাওয়া এক টুকরো জমিতে আবাদ করে। কড়া রোদে পিঠ পুড়ে তামাটে হয়ে এলেও কোনো টু শব্দ মুখ দিয়ে বের হয় না। দিন রাত এক করে, পায়ে কাদা মেখে লাঙল টানে।

মনে পড়ে ও বাড়ির বুড়ো সরোজ চাচার কথা। যে কি না অভাবের তাড়নায় শেষ সম্বল ধানের গোলাটা মাতব্বরের পায়ে সঁপে দিয়ে বারান্দায় বসে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠে ময়না বুবুর সেই ভাঙা ঘর। যেখানে চালের অভাবে, তেলের অভাবে তার গলার হাড় বের হয়ে আসার উপক্রম। সেখানে মাথার ওপর মহাজনের ঋণের খাঁড়া তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে।

এই মানুষেরা এত কষ্ট করে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায় তার কোনো মূল্যই নেই এদের কাছে? এত কষ্টের পরও এই রাজপ্রাসাদের রাজপুত্রদের চোখে তারা কেবল ছোটলোক আর জাত শয়তান??

মেঘনূরের দুই হাতের মুঠো শক্ত হয়ে নখগুলো চামড়া ভেদ করে যায় অনায়াসে। নওয়াজ শিকদারের মুখে গরিব চাষীদের প্রতি এমন তীব্র ঘৃণা, এমন হেয় প্রতিপন্নে পুরো শরীর রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকে তার। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই একদৃষ্টিতে দরজা মুখে চেয়ে থাকে সে। বুকের ভেতরে তীব্র ঘৃণা দলা পাকিয়ে উঠতে শুরু করে ক্রমান্বয়ে।

"মানুষ এত নিষ্ঠুর, এত পাষাণ কীভাবে হতে পারে? রুহ কাঁপে না? ভয় হয় না? অহংকার আভিজাত্যর তাড়না যদি মানুষকে এইভাবে অন্ধ করে তাহলে আমি মেঘনূর সেই মানুষকে নিজের দুশমন মনে করি। আর দুশমনের বিরুদ্ধে আমার বিদ্রোহ ততদিনের, যতদিন না তার অহমিকা চূড়া আমি চূর্ণ করে মাটিতে মেশাই।"

------------------------------------------------

বাদলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের দোতলার বড় সভাকক্ষ। রাত তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার হলেও ভিতরের হলদেটে টিউবলাইটের আলোয় পুরো ঘরের পরিবেশটা থমথমে।

ঢাকা থেকে আসার পর থেকেই নওয়াজ ছক কষেছিল মুকুন্দ পাড়া এলাকাটা নিয়ে। গ্রামের প্রবেশপথ এটি। যাতায়াত সুবিধাও বেশ ভালো। আর এখানেই সে টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি গড়ে তুলবে একেবারে আধুনিক শহুরে কায়দায়। প্রায় তিরিশ বিঘা উর্বর জমি জুড়ে গড়ে উঠবে সেই বিশাল সাম্রাজ্য। যার চিমনি দিয়ে বেরোনো ধোঁয়া জানান দেবে শিকদার বাড়ির একচ্ছত্র আধিপত্য।

"আপনাদের নিজস্ব মতামত থাকলে সেটা পরিষ্কার করুন।"

"মতামত...না তেমন কিছু নেই।"

"বুঝে বলবেন।"

ঘরের মাঝখানে বিশাল কাঠের টেবিল। তার একপাশে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে আছে নওয়াজ শিকদার। পরনের তার কালো রঙের পাঞ্জাবি। হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। মুখে সেই চেনা আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য। তার ঠিক পাশে বসে আছেন তার মেজ চাচা খাইরুল শিকদার সাথে তাদের নিজস্ব কিছু লোকেরা।

টেবিলের অপর মাথায় বসে আছেন বাদলাপুর ইউনিয়নের সরকারি কর্মকর্তা,চেয়ারম্যান সাহেব ও ভূমি অফিসের কর্মচারীরা। প্রত্যেকের কপালে হালকা চিন্তার ভাঁজ থাকলেও কন্ঠস্বর বেশ ঝরঝরে। নওয়াজ শিকদারের ঠান্ডা মাথায় তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতা নিয়ে ফ্যাক্টরি স্থাপনের আইনি নিয়ম নীতি আর জমির দলিলপত্র নিয়ে বলা কথা তারা চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।

চলমান কথোপকথনের মাঝে হুট করে সভাকক্ষের ভারী দরজা সজোরে ঠেলে ঘরে ঢুকেন সরকার বাড়ির প্রধান দেলোয়ার সরকার সেই সাথে তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। দেলোয়ার সরকারের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। কাঁচা পাকা দাড়ি, পরনে পাঞ্জাবি, চোখে এক আদিম হিংস্র দাপট। সরকার বাড়ি এই তল্লাটে শিকদারদের একমাত্র আদি শত্রু।

দেলোয়ার সরকার ঘরে ঢুকেই টেবিলে চাপড় দিয়ে গর্জে উঠে বলেন,

"এই ফ্যাক্টরি বাদলাপুরের মাটিতে হবে না। হবে না মানে হবে না। যদি মাটিতে একটা কোপ পড়ে তাহলে তার লাশ সরকার বাড়ির হাতে পড়বে।"

নওয়াজ চলমান কাজের মধ্যে বাঁধাপ্রাপ্ত হলেও তেমন একটা কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় না। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে

পকেট থেকে বেনসন সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে ধরায়।

এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলে,

"গ্রামে এত বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, শয়ে শয়ে মানুষের পেট চলবে। ভালো কিছু তো আপনাদের মতো চাষাড়াদের গায়ে ধরে না তাই না? অবশ্য ফকিরের জাতদের এই এক কমন সমস্যা।"

মেজোকর্তা খাইরুল শিকদার ভাতিজার কথা শুনে ব্যঙ্গত্মক হেসে সমর্থন জানায়। তাচ্ছিল্যের সহিত বলে,"কথা খারাপ বলোনি নওয়াজ। সব আবর্জনা।"

অপমান মূলক কথা দেলোয়ার সরকারের গায়ে এসে লাগে। ক্রোধে বশীভূত হয়ে তীব্র ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,

"কাকে চাষাড়া বলিস? ঢাকা থেকে দু পাতা ইংরেজি শিখে এসে আমাগো ওপর জমিদারি দেখাস? তোর রাজত্ব গুঁড়াইতে আমার একদন্ডও লাগবো না নওয়াজ। মুখ সামলাইয়া কথা বল।"

কথার পিঠে কথা বেড়ে এক নিমিষে ঘর জুড়ে কোন্দল লেগে যায়। শুরু হয় শিকদারের লোকেদের সাথে সরকার বাড়ির লোকেদের তুমুল তর্ক বির্তক। ঠিক সেই সময়ে দেলোয়ার সরকারের পেছন থেকে এগিয়ে আসে চেরাগ আলী, পরাণ শেখ নামের দুই চাষী। স্বভাবে তারা অত্যন্ত ধূর্ত আর গিরগিটির মতো রঙ বদলানো মানুষ। একসময় শিকদার বাড়ির নুন খেয়ে তাদের ছায়ায় বড় হয়েছে। আর এখন লোভে পড়ে রং বদলে সরকার বাড়ির পা চাটছে।

পরাণ শেখ নওয়াজের টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে। দাপুটে গলায় আঙুল উঁচিয়ে বলে,

"ছোট সাহেব, দিনকাল বদলাইছে। মনে কইরেন না আপনার ডরে আমরা কোনাব্যাঙ হইয়া জলের মধ্যে ডুব দিয়া থাকমু। ওই চরের জমিতে আমারও দুই কাঠা আছে। আমি টিপসই দিমু না। দেখি আপনার ফ্যাক্টরি কেমনে হয়। আর আপনের কত ক্ষমতা।"

নওয়াজ চেয়েছিল এই ঝামেলায় নিজেকে না জড়াতে৷ কেননা নিরসনের জন্য তার চাচা আর নিজের লোকেরাই যথেষ্ট ছিল। এই একটুখানি পরেই নিয়ন্ত্রণে এসে যেত৷ কিন্তু এর মাঝে পরাণ শেখের আঙুলে উঁচিয়ে এত বড় দাপুটে কথাবার্তা তার মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেয়। তাও আবার নিজের বাড়ির একসময়ের পুকুর চুরির দায়ে খেদানো চরের চাকর। নওয়াজের সুর্দশন মুখটা রাগে এক মুহূর্তের মধ্যে কয়লার মতো কালো হয়ে আসে। চোখের মণি দুটো জ্বলে উঠে লেলিহান দাবালনে।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চিতাবাঘের মতো আসন ছেড়ে এক ঝটকায় পরাণ শেখের গলা চেপে ধরে এই কঠোরচিত্তের মানব। তার লোহার মতো শক্ত আঙুলগুলো পরাণের শ্বাসনালীতে বসে যায় মুহুর্তেই। হাতের পেশিগুলো ফুলে ফেঁপে উঠে পাঞ্জাবি ভেদ করে।

এদিকে পরাণের দাপুটে চেহারা এক সেকেন্ডে ফ্যাকাশে হয়ে চোখ দুটো উল্টে যাওয়ার উপক্রম।

নওয়াজ এক টানে টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে তাকে। ঠোঁটের কোণ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা এক ঝটকায় ডানহাতে নেয়। কোনো দয়া বা দ্বিধা ছাড়াই সেই জ্বলন্ত সিগারেটটা সজোরে চেপে ধরে পরাণ শেখের হাতের তালুর চামড়ায়।

তীব্র যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠে পরাণ শেখ। নওয়াজ তার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে হিংস্র গলায় বলে,

"সোজা কবরে পাঠিয়ে দেবো তোকে। আমার নুন খেয়ে, আমার দয়ায় বড় হয়ে, আজ আমারই চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাস, শুয়োরের বাচ্চা। ভাগাড়ে পড়া মাল ডাঙায় এসে বাহাদুরি করার স্বাদ আজন্মের মতো ঘুচিয়ে দিবো।"

সরকারি ভবনের ভিতরে এমন কাণ্ড দেখে ভূমি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান তবিদুল সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। দুই পক্ষকেই শান্ত থাকার জন্য অনবরত অনুরোধ করে যান তারা। এদিকে নওয়াজের মারমুখী ভঙ্গি দেখে পারেন না খাইরুল শিকদারের পায়ে ধরে তাকে স্থির হওয়ার জন্য বলতে।

"নওয়াজ, ছেড়ে দাও। এসব চামচিকা মেরে হাত দূর্গন্ধ করার চাইতে কাজের কাজ করা ভালো।"

নওয়াজ এক ঝটকায় পরাণকে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে খায়রুল শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে,

"কাকা, কাগজগুলো বের করুন। এই মুহুর্তে সাইন হবে। যদি কেউ বাঁধা দিতে আসে, তাহলে সোজা তার গলাটা শরীর থেকে নামিয়ে দেবেন। একটা কথাও হবে না।"

দেলোয়ার সরকারের সেঝো ভাই রায়হান সরকার নওয়াজের হুংকারে দগ্ধ হয়ে গর্জে উঠে বলে,"মাদার** ভয় পাই না তোকে। তোর বাপেরও সাহস নাই এই দলিলে একটা টোকা দেওয়ার। সাইন হবে না, কী করবি কর।"

নওয়াজ শিকদার নিজেকে দমিয়ে রাখার জন্য কিছু সেকেন্ড সময় নেয়। এদিকে জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার পরণতি যে খুব একটা ভালো হবে না তা আন্দাজ করা মাত্র খাইরুল শিকদার, চেয়ারম্যান সাহেব তাকে বুঝানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠে। কিন্তু কাজের কাজ হয় না। হাতের ইশারায় তাদের আগেই থামিয়ে দেয় নওয়াজ। মুখ খোলার অবকাশ অব্দি দেয় না। শাবকীয় দৃষ্টিতে হাতের ঘড়ি ঠিক করতে করতে এক লহমায় টেবিলের ওপর থাকা কাঁচের ভারী ফুলদানিটা তুলে এক আছাড়ে ভেঙে ফেলে সে। অতঃপর ভাঙা কাঁচের ধারালো টুকরো চোখের পলকে ঝড়োগতিতে গিয়ে বসিয়ে দেয় রায়হানের গলার ঠিক এক ইঞ্চি নিচে।

পাতলা চামড়ার ফাঁক গলে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত ছিটকে এসে পড়ে নওয়াজের পাঞ্জাবির হাতায় আর টেবিলের কাগজের ওপর। পুরো সভাকক্ষে এক মুহুর্তে নেমে আসে অস্থিতিশীল, ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। দেলোয়ার সরকার নিজ জায়গায় অটুট থাকলেও সাঙ্গ পাঙ্গরা তার ভয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়।

নওয়াজ রক্তাক্ত কাঁচের টুকরা রায়হানের গলায় চেপে ধরে ঠান্ডা গলায় বলে, "মানুষ খুন করতে নওয়াজের বাপের সাহস লাগে না। নওয়াজ শিকদার একাই যথেষ্ট।"

"আমার ভাই এর কিছু হইলে এইহানে রক্তবন্যা বইয়া যাবে নওয়াজ। ছাড় ওরে, আমি সই দিতাছি।"

পুরো ঘর শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ খেলা করে যায়। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। নওয়াজের এই রুদ্রমূর্তি আর পৈশাচিক সাহস আজ নতুন নয়। এর আগে বহু ঝামেলায় হাত লাল করেছে সে। রায়হানের মতো কতজনের টুটি চেপে ধরে রক্তখেলা করেছে তা অগণিত।

ভূমি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান সাহেব সই করা শেষ হতেই

খাইরুল শিকদার রক্তমাখা কাগজটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে কলমটা দেলোয়ার সরকারের সামনে এগিয়ে দেয়। বিদ্রুপের সুরে বলে,"দু পয়সার সাহস নিয়ে শিকদার বাড়ির দিকে চোখ দিস না দেলোয়ার। তোর চোখ আর চোখের জায়গায় থাকবে না। আজ তোর ভাই এর জ*বাই করার কথা থাকলেও এই শুভকাজে আর হাত নোংরা করলাম না। সাবধানে থাকিস। ফ্যাক্টরি হবেই।"

-----------------------------

রাত দশটা। সারাদিনের এলাহী আয়োজনের ধকল শেষে শিকদার বাড়ির বিশাল আঙিনা এখন ক্লান্ত অবসাদ। ডেকচি, বালতি আর শামিয়ানা গোছাতে ব্যস্ত চাকর বাকরদের ক্লান্ত ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে দূর হতে। চারপাশের আম কাঁঠালের বাগান থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক।

এমনই এক শান্ত লগ্নে, বাড়ির অন্দরের বাগানবাড়িতে হাঁটছে একঝাঁক তরুণী। অগ্নিবীণার বড় ননাস নূরজাহান শিকদারের মেয়ে স্নেহলতা, কুমকুম, শিমলা পরম উৎসাহে মেঘনূর আর মহুয়াকে ঘুরে ঘুরে শিকদার বাড়ির আনাচ কানাচ, প্রতিপত্তির নিদর্শন দেখাচ্ছে। আজ বাড়ির বড় অনুষ্ঠান থাকায় সব কিছুতেই একটু বিলম্ব হচ্ছে। যার কারণে সুযোগ বুঝে একটুখানি অবাধে বিচরণ করার চেষ্টা তাদের।

"একটা দিন থাকো না নূর। পুরো বাড়ি জুতসই ঘুরিয়ে দেখাবো৷ এমন তাড়াহুড়ো করে কি দেখা হয়?"

"আমিও তো সেই কথাই বলে যাচ্ছি ভাবি। এ দুই মেয়ে শুনছেই না। কাল ভোরে চলে যাওয়ার জন্য বম্মার থেকে অনুমতি নিয়েই ছেড়েছে।

মেঘনূর মহুয়া একসঙ্গে স্নেহলতা,কুমকুমদের পিছু পিছু ধীরপায়ে হাঁটতে থাকে। চলা পথে মেঘনূর মহুয়ার হাতে চিমটি কেটে ফিসফিস করে হেসে বলে,"পুরো বাড়ি ঘুরে দেখা সেই আসাদিনেই হয়ে গেছে। এরা কি না আজ বলছে এ কথা?"

"ওরা তো আর জানে না তোর দস্যিপানা৷ জানলে নিশ্চয়ই বলতো না৷ এই শোন নূর, খবরদার ওদের কথায় গলবি না। হাজার অনুরোধ করলেও শুনবি না। কাল ভোরে বাড়ি যেতে হবে মানে যেতেই হবে। কলেজ কোনমতেই মিস করা যাবে না।"

"কেন কাল কলেজ মিস গেলে কি হবে?"

মহুয়া তীক্ষ্ণ চোখে মেঘনূরের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বকে,"কি হবে মানে? কাল কলেজে শাদাব ভাই উচ্চতর গণিত ক্লাস পরীক্ষা নেবে।"

পরীক্ষার কথা শুনেই মেঘনূরের গলা শুকিয়ে আসে। বাংলা, ইংরেজি পরীক্ষা হলে তাও একটা কথা ছিল্। উচ্চতর গণিত কোন দুঃখে হতে গেল। এ কি বিপদ আবার!! তাও আবার যমের রাজা শাদাব খন্দকারের সাবজেক্ট। সাধারণ গণিত টেনেটুনে একটু তাও করা হয়েছে। উচ্চতর গণিত তো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। কি ঘোড়ার ডিম পরীক্ষা দিবে সে।

"শো..শোন মহু৷ আমি কাল পরীক্ষা দিতে পারবো না। কলেজেও যেতে পারবো না। আমার ভীষণ পেট ব্যথা। দু'দিন ভালোমন্দ খেয়ে পেট আন্দোলন করা শুরু করেছে কবে মরিচ পোড়া পান্তা খাবো।"

মহুয়া আঁড়চোখে মেঘনূরের দিকে তাকায়। সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,"আবার নাটক শুরু করলি তুই? কোথায় তোর পেট ব্যথা? একটু আগেই তো নুন মেখে কাঁচা তেঁতুল খেলি আয়েশ করে।"

"আমি ভেবেছি তেঁতুল খেলে পেটে ব্যথা সাড়ে সেজন্য খেয়েছি। কিন্তু এখন তো দেখছি ঘটনা উল্টো হলো। তেঁতুল খেয়ে পেটের মধ্যে চিনচিন ব্যথা আরো বেশি করছে। দেখিস কাল আমাকে নির্ঘাত সদরে ভর্তি করতে হবে।"

"বাজে বকা বন্ধ কর। কলেজে যাবি না,পরীক্ষা দিবি না ভালো কথা। তাও এসব অলক্ষুণে কথা মুখে আনিস না।"

মেঘনূর সামনের দিকে নজর রেখে নিচু গলায় বলে, "শাদাব ভাই যদি জানতে চায়,আমি এলাম না কেন তুই তখন বলবি , মেঘনূরের পেটে সমস্যা। বাড়িতে অচেতন হয়ে শুয়ে নুন পানি গোলা খাচ্ছে।"

"মিথ্যে বলবো শাদাব ভাইকে?"

মেঘনূর ঠোঁট বাঁকায়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে, "মিথ্যে বলবো শাদাব ভাইকে? কেন তোমার শাদাব ভাই কি পীর আউলিয়া যে মিথ্যে বলা যাবে না? একটুখানি ভালোর জন্য মিথ্যে বলাই যায়।"

"এখানে ভালোটা কি?"

"ভালোটা কি মানে? এই যে, পরীক্ষাটা না দিলে ঘোড়ার ডিম নাম্বার নিয়ে ঝাড়ি খেতে হবে না শাদাব ভাইয়ের। এটা ভালো না?"

"তুই আসলেই ঝগড়ুটে নূর।"

"হু, তোর মায়ের মতো।"

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ স্নেহলতা থমকে দাঁড়ায়। তুমুল ফিসফিসানি শুনে পিছু ঘুরে তাকিয়ে বলে, "তখন থেকে দু'জনে চুপিসারে কি বকবক করছো হ্যাঁ?"

মহুয়া সর্তক দৃষ্টি তাকিয়ে একগাল জোরপূর্বক হাসি টেনে বলে,

"না,না কিছু না। এমনি কথা বলছি।"

স্নেহলতা পাল্টা প্রতিত্তুর দেওয়ার আগে হুট করে ঠোঁট চাপিয়ে ফেলে। চোখজোড়া চলে যায় তার সরাসরি মূল দালানের দোতলার কোণের খাস কামরার দিকে। সেখানে বাথরুমের বড় বেলজিয়াম কাঁচের জানালাটার ভেতর থেকে হ্যালোজেন লাইটের হলদেটে আলো তীব্রভাবে ফুটে বেরোচ্ছে। স্নেহলতা কনুই দিয়ে শিমলাকে গুঁতো দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

"ওই দেখ শিমলা,নওয়াজ ভাইজান এতক্ষণে গোসলে ঢুকেছে।"

শিমলার সাথে সাথে একযোগে কুমকুম, মেঘনূর, মহুয়া একনজর তাকায় সেই আলোর দিকে। কুমকুম সহজ কন্ঠে বলে,"নওয়াজ ভাইজান প্রায়ই এমন সময় গোসল করে। আজ ফেরার পথে পাঞ্জাবির সাথে রক্ত দেখলাম। নিশ্চয়ই.."

কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শিমলা কুমকুমের হাত চেপে ধরে। চোখের ইশারায় মেঘনূর মহুয়ার দিকে তাকিয়ে চুপ করতে বলে তাকে। কুমকুম ইশারা পাওয়া মাত্র নিজেকে সঙ্গে সঙ্গে সংযত করে নেয়। আমতা আমতা স্বরে বলে," ভাইজানের কাজের শেষ নেই। চলো তো ওদিকটায় যাই।"

সন্ধ্যার গুমোট কক্ষে নওয়াজ শিকদারের মুখে গরিবদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা আর অমানবিকতার কথাগুলো হুট করেই মনে পড়ে যায় মেঘনূরের৷ সহজ সরল মুখটা এক নিমেষে শক্ত হয়ে উঠে তার। দোতলা হতে ভেসে আসা আলো হতে তার দৃষ্টি সরে না। সেই নির্দয়, অহংকারী শাসকের ওপর রাগের পাহাড় জমতে শুরু করে নিরবে।

কয়েক কদম এগোতেই বাগানবাড়ির অন্ধকার পথ কেটে পাশ দিয়ে হেঁটে যায় শিকদার বাড়ির বিশ্বস্ত কর্মচারী প্রবীণ গোলবার। এক হাতে লন্ঠন, অন্য হাতে দুটো ধারালো তীর ধনুক। কুমকুম তাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

"গোলবার চাচা, এই মাঝরাতে হাতে তীর ধনুক নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?"

গোলবার পা থামায়। নিচু স্বরে বলে, "আজ বাদলাপুর কাচারিতে একটু গণ্ডগোলের আভাস পেয়েছিলাম, মা। ছোট সাহেবের সুরক্ষায় কোনো খামতি রাখা তো শিকদার বাড়ির নিয়ম নয়। তাই একটু পাহারা দিচ্ছি।"

"কেন? কি হয়েছে?"

"একটু আর কি ঝামেলা।"

শিকদার বাড়ির নিত্যদিনের এমন কার্যকলাপে অভ্যস্ত

কুমকুমেরা। তাই আর এ নিয়ে কেউ দ্বিরুক্তি করে না। কথা শেষ করে আবার সামনের দিকে পা বাড়ায় সবাই। কিন্তু মেঘনূরের পা নড়ে না। সে এক মুহূর্ত সময় নেয়। চোখের মণি দুটো অন্ধকারে বিড়ালের মতো চকচক করে উঠে। সে দল থেকে একটু পিছিয়ে এসে চারপাশটা দেখে নিয়ে অমোঘ স্বরে ডাক ছাড়ে, "গোলবার চাচা..."

গোলবার কিছুটা পথ এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। লন্ঠনটা উঁচিয়ে ধরতেই মেঘনূর ধীর পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। গোলবারের চোখের দিকে তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, "ধনুকটা আমায় একটু দিন তো চাচা। ছোটবেলায় ভাইয়ের সাথে জমিতে পাখি শিকার করতাম। আজ বড্ড ইচ্ছে করছে একটু নিশানা পরীক্ষা করতে।"

গোলবার ইতস্তত বোধ করে। শিকদার বাড়ির বউ তীর ধনুক হাতে নিবে বিষয়টা তার বোধগম্য হয় না। কেউ জানতে পারলে..

"বউমা.."

"ভয় পাবেন না চাচা। কেউ জানবে না।"

মেঘনূরের চোখের সম্মোহনী দৃষ্টি সেই সাথে তীব্র জেদে গোলবার আর না করতে পারে না। সন্তপর্ণে একটা তীর ধনুক তার হাতে সঁপে দেয় সে।

মেঘনূর সরল হাসে। ধনুকটা হাতে নিয়ে এক পা পেছনে দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ায় সে। রাতের মিলমিলে হাওয়া তার শাড়ির পাতলা আঁচল দুলিয়ে দিয়ে যায়। তীরটা ধনুকে জুড়িয়ে সুতীব্র মনোযোগে নিজের পুরো দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দোতলার সেই আলোকিত বাথরুমের কাঁচের জানালাটার ঠিক মাঝখান বরাবর। হাতের আঙুলগুলো ধনুকের ছিলাটাকে টেনে একদম কানের কাছ পর্যন্ত নিয়ে আসে। অতঃপর নিশ্বাস স্তব্ধ।

অন্ধকার রাতকে চিরে তীব্র গতিতে ছুটে যায় সেই ধারালো তীর।

এক নিমেষে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় নওয়াজ শিকদারের বাথরুমের সেই দামী বেলজিয়াম কাঁচ। তীব্র শব্দে কাঁচের বড় বড় টুকরো চারদিকে মুহুর্তেই ছিটকে পড়ে। তীরের ফলাটা গিয়ে সজোরে আটকে যায় জানালার কাঠের ফ্রেমে। কিন্তু কাঁচ ভাঙার সেই তীব্র অভিঘাতে ধারালো বড় দুটো কাঁচের টুকরো ছিটকে গিয়ে সোজা বিঁধে যায় ঠিক তার নিচে থাকা নওয়াজ শিকদারের উন্মুক্ত পিঠে।

ঝরণার নিচে উদাম, বলিষ্ঠ শরীর নিয়ে গোসল করছিল সে। পিঠে হঠাৎ তীব্র আঘাতের মতো কিছু একটা বিঁধতেই সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। কাটা জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে তাজা লাল রক্ত ঝরণার জলের সাথে মিশে মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

নওয়াজ পিঠে ভেজা হাত রাখা মাত্র আঙুলগুলো রক্তে ভিজে উঠে। বুঝতে পারে কিছু একটা গোলযোগ ঘটেছে তার দেহে। কিন্তু তাতেও সুদৃঢ় কপালে কোনো যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠে না তার। উল্টো দুই ভুরুর মাঝখানে তৈরি হয় গভীর, কুঁচকানো কৌতূহল।

নওয়াজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘুরে তাকায় জানালার দিকে। যেখানটায় গেঁথে আছে ধনুকের ফলা। কিয়ৎসেকেন্ড মস্তিষ্কে কড়া হিসেব করে এক ঝটকায় গা টা তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে নেয় সে। অতঃপর সোজা বের হয়ে চলে যায় পিছন বেলকনিতে।

উপর থেকে সোজা নিচের অন্ধকার বাগানবাড়ির দিকে তীব্র বাজপাখির মতো চোখ মেলতেই দেখতে পায় লন্ঠনের আলো ছায়ার আলোড়নে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চন্দ্রমুখী অনন্যাকে।

উপর থেকে নওয়াজ স্পষ্ট দেখতে পায় মেঘনূরের দুই চোখে রুদ্রমূর্তির অবকাশ। এক বিদ্রোহী রাণীর অহংকার। কঠিন পুরুষটি ফলার তীব্র আঘাতে গর্জে উঠে না,রাগ দেখায় না। পিঠের রক্ত আর ক্ষতকে উপেক্ষা করে শান্ত চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নিচের সেই অবাধ্য মেয়ের দিকে। যার হাতে তখনও শোভা পাচ্ছে রূপোলি ধনুক।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গোলবারের তখন ভ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন