ভোরের আলো ফুটতেই শিকদার বাড়ি রূপ নিয়েছে এলাহী কাণ্ডে। রসুইঘর থেকে ভেসে আসা পোলাওয়ের সুগন্ধি চাল, খাঁটি গাওয়া ঘি, আর এলাচ দারুচিনির সুবাসে পুরো বাড়ি থই থই করছে। বাবুর্চিদের রান্নার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। মস্ত মস্ত তামার ডেকে ফুটছে খাসির রেজালা আর হাঁসের মাংসের কালিয়া। ওপাশের ডেকে মশলা মাখিয়ে কষানো হচ্ছে গরুর মাংস। নিজস্ব খামার হতে লিটারে লিটারে দুধ নিয়ে এসে রাখা হচ্ছে পায়েস প্রস্তুত করার জন্য। বাহারি পদের রান্নার জোগাড়ে মুখর পুরো রসুইঘর।
এদিকে চাকর বাকরদের সবার নাভিশ্বাস উঠার উপক্রম। রাতের নিস্তব্ধতা পার করে দিনের আলো ফুটতেই হাক ডাকে মুখর চতুর্দিক। মেজো কর্তা ছোট কর্তার ধমকে ধামকে কাজের গতি সামলে যাচ্ছে তারা ঝড়ের বেগে।
বেলা বাড়ে। আকাশ আজ মেঘমুক্ত, ধবধবে সাদা। সকাল ছাপিয়ে দুপুর হতেই শুরু হয়ে যায় মূল খাওয়ানোর পর্ব। শিকদার বাড়ির সামনে বিশাল সবুজ মাঠজুড়ে টাঙানো হয়েছে নীল সাদা কাপড়ের শামিয়ানা। পুরো গ্রাম আজ ভেঙে পড়েছে মাঠজুড়ে। আশেপাশে দুই তিন গাঁ হতে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবারই জুড়ি মেলেছে আজকের এই নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে। সার বেঁধে পাতা হয়েছে পাটশোলার আসন। বড় বড় কলাপাতা ধুয়ে কেটে সামনে দেওয়া হয়েছে। শয়ে শয়ে মানুষ এসে বসছে, আর চটপটে জোয়ান চাকরেরা কাঁসার বালতি থেকে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি পোলাও, গরু, খাসির চর্বিদার মাংস আর ঘন ডাল পাতে পেড়ে দিচ্ছে।
"দক্ষিণের দিকটায় পোলাও যাবে। পাত খালি হচ্ছে দেখছিস না কেন? কাজ শেখাতে হবে??"
মেজোকর্তার বড় ছেলে ইফতেখার শিকদারের হম্বিতম্বিতে পোলাও ডেক ধরে চাকরেরা ছোটে দক্ষিণের দিকটাতে। খয়েরি পাঞ্জাবি পরে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে তদারকি করতে। অবশ্য বাড়ির সব পুরুষেরাই জায়গা ভাগ করে নিয়েছে লোকেদের খাওয়ার দেখভাল করার জন্য। শামিয়ানা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকের মাথায় ছাতা ধরা।
এমন মহাভোজন পর্বে শুধু উপস্থিত নেই সাহেব বাবু। সারারাত জমিজমার হিসেব নিকেশ পর্ব সেড়ে ঘুমিয়েছে সে ভোরবেলাতে। বেলা দেড়টা বেজে চলেছে এখনও তার ঘুম ভেঙেছে কি না কে জানে।
"মেজোকর্তা, এবার নিশ্চিত তো? ভরসা হলো কলিমুল্লাহ কে?"
"যেভাবে মানুষ আসছে, মনে তো হচ্ছে পাঁচখানা গরু জবাই করলে সই হতো। আমার তো চিন্তা হচ্ছে..ভরসা নড়বড়ে।"
কলিমুল্লাহ হাতে একখানা কাগজ কলম পকেটে ঠেলে নির্ভয় স্বরে বলে,"চিন্তা করবেন না, একদম খাপে খাপ হয়ে যাবে। মানুষ এই ঠেকলো বলে।"
"দেখো, শিকদার বাড়িতে এসে কেউ যেন খালি পেটে না ফেরে। দরকার পড়লে বাবুর্চিদের আবারো রসুইঘর পাঠাও। আবারো হাঁড়ি চড়ুক রান্নার। তবুও কেউ অপ্রসন্ন না হোক।"
"সমস্ত দায়ভার আমার কাঁধে মেজোকর্তা। আমি দেখছি তো। কলিমুল্লাহর আন্দাজ ভুল হবে না।"
"ঠিক আছে।"
খাইরুল শিকদার দু'পাশে সারি সারি বসা মানুষজনের সামনে দিয়ে আস্তেধীরে হেঁটে যায়। তৃপ্তির সাথে খাচ্ছে সবাই৷ চারদিকে শুধু কলাপাতার খসখস আর আয়েশি তৃপ্তির গুঞ্জন। চাকরদের এটা ওটা নির্দেশ দিয়ে সে যায় আরেক প্রান্তে দেখভাল করতে।
.
.
.
শিকদার বাড়ির বিশাল বাগানবাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে গ্রামের মেয়েদের খাওয়ার। চারপাশটা বড় বড় আম কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা। সুগন্ধি লেবু আর মাটির সোঁদা গন্ধের মাঝে সেখানে অসংখ্য নারী আর শিশুরা পাত পেড়ে খাচ্ছে পরম আহ্লাদে।
খাওয়াদাওয়ার এই মহোৎসবের মাঝেই মূল অন্দরমহলের ভারী কাঠের খিলান পেরিয়ে বাগানবাড়িতে পা রাখেন শিকদার বাড়ির বড় গিন্নী অগ্নিবীণা শিকদার। আর তাঁর ঠিক পাশেই শান্ত, ধীর পায়ে হেঁটে আসে মেঘনূর। পিছনে সব বউ ঝিরা।
আজকে মেঘনূর, শিকদার বাড়ির পরিপূর্ণ বধূরূপে নিজেকে ধরা দিয়েছে। পরনে তার অগ্নিবীণা শিকদারের মতোই ভারী তসরের শাড়ি। শাড়ির ওপর জড়িয়ে রেখেছে পাতলা শুভ্র ওড়না। খোঁপা বাঁধা চুল তার শাড়ির আঁচলে সযত্নে ঢাকা। কাজলের কালি দিয়ে সাজানো চোখদুটোতে তার বিস্ময়ের ঢেউ খেলে চলেছে। মিষ্টি মুখের অবয়বটুকুর এক পাশ ঢেকে আছে আঁচলের কার্নিশে। চলার ভঙ্গিতে আজ কোনো চপলতা নেই তার। শিকদার বাড়ির আভিজাত্যের সাথে মানানসই রাজকীয় গাম্ভীর্য আজ প্রতিটি পদরেখায়। তবে, এসমস্ত কিছু বড় গিন্নীর কারণে। তার সংস্পর্শে থাকলে ভয় এসে জেঁকে ধরে মনে। তবে এতোবড় আয়োজন দেখে চপলাবতী ভিতরে ভিতরে বিস্ময়কর সুর তুলেছে। এমন আয়োজন সে বাপের জন্মে কোনদিন দেখেনি।
বাগানবাড়ির মাঝখানে আসতেই অগ্নিবীণা শিকদার গম্ভীর মুখে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে যান। তার পাদচারণ থামতেই থেমে যায় সঙ্গে আসা সবাই। চাকর বাকরেরা বড় গিন্নীর আগমনে আরো ব্যস্ত হয়ে উঠে তাদের কাজে। যাদের কিছু লাগবে না তাদেরও পাত ভারী করে তোলে ঝোলে মাংসে। কেননা, বড় গিন্নীর চোখে পাত খালি ধরা পড়লেই সর্বনাশ। কঠিন শাস্তি দিতে দু'বার ভাববে না।
অগ্নিবীণা জহুরি চোখে সবার খাওয়ার দৃশ্য দেখা শেষে মেঘনূরের দিকে ফিরে চায়। স্নেহশীল কণ্ঠে আদেশ করে বলেন,
"আজ তোমার স্বামীর লোক খাওয়ানো হচ্ছে। নিজ হাতে সবাইকে শেষ পাতে একটু মিষ্টি মুখ করানোটা তোমার দায়িত্ব।"
মেঘনূর স্বল্প বিস্তর মাথা নাড়িয়ে সায় জানায় সঙ্গে সঙ্গে। মনে মনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সে। কেননা কাল শিকদার বাড়িতে পা দেওয়া মুহুর্তে সব আয়োজন দেখে ভেবেছিল তাকে হয়তো কাজ করানোর জন্যই একদিন আগে নিয়ে আসা হয়েছে। আদা,রসুন, কাটাবাছা সমস্ত কিছু নিজ হাতেই করতে হবে৷ যেহেতু তার স্বামীর মানুষ খাওয়াবে কাজগুলো তো তাহলে তাকেই করতে হবে৷ বিষয়টা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিল সে। তবে,কাজ করা নিয়ে ভয় না থাকলেও ভয় ছিল এতো মানুষের রান্নার আয়োজন করা দেখে। একা হাতে সে কি পারবে এতোকিছু সামাল দিতে? দুরদুর বুক নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়েই মহুয়াকে নিয়ে সন্ধ্যার পরে হাজির হয়েছিল সে রসুইঘরে। নিজ হতে শিলা নোড়ায় হাত রাখতেই ফুলমতির তটস্থ চিৎকারে তার থতমত খাওয়ার জোগাড়। ওমা..কাটাবাছা তো দূরে থাক সে কেন রসুইঘরে পা রেখেছে এই নিয়ে তাদের আহাজারির শেষ নেই।
বেচারি মেঘনূর বোকা বোকা চোখে সবার অনুরোধ অনুনয়ে রসুইঘর হতে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তার নাকি হাত নোংরা করে কাজ করা মানা। অথচ, এই হাত দিয়ে সে মামার বাড়ি গোবর ভাঙে, হেঁশেল লেপে, কাঁদা দিয়ে রান্নাঘরের দাওয়া ঠিক করে। আর সেখানে কি না সামান্য দা বটি ধরে হাত নোংরা করা যাবে না। কোথায় ভেবেছিল হাড় খাটুনিই হবে তার স্বামীর প্রতি দায়িত্ব পালন তা না হয়ে সেখানে শুধু মাত্র পাতে পায়েস বাড়ানোটাই নাকি একমাত্র কাজ। এ কোন আজব দেশে এসে পড়লো সে!!
অগ্নিবীণার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই দুই জোয়ান পরিচারক রূপোর মস্ত বড় এক ডেকচি ধরাধরি করে নিয়ে আসে। ডেকচি ভর্তি ঘন ক্ষীর আর কাজুবাদাম ছড়ানো দুধের পায়েশ। দুই চাকর সেই ভারী ডেকচিটা উঁচু করে ধরে মেঘনূরের দুই পাশে দাঁড়াতেই মেঘনূর রুপোর বড় হাতাটা হাতে তুলে নেয়। সামান্য নিচু হয়ে ধীরে ধীরে যত্নসহিত তৃপ্ত পাতের কোণায় ঘন ক্ষীর, পায়েশ বেড়ে দিতে থাকে ।
মায়াময় মুখ দেখে খেতে বসা গাঁয়ের বয়স্কা নারীরা চোখ কপালে তোলে। ফিসফিসিয়ে একে অপরে কানাঘুঁষা করে, "আহা, রূপ বটে। কিন্তু অদৃষ্ট খানা..."
"ঠিক বলেছো,এমন গা ঝাড়া মেয়ের কি না কপালে সুখ সইলো না.. সংসার করতে পারলো না?"
মাগুরাডাঙা থেকেও অনেক মেয়েলোকেরা এসেছে খেতে। মেঘনূর একে একে পরিচিত সব মুখেদের দেখা পেতেই ঠোঁটের কোণে সতেজ হাসি ফোটায়। পায়েসের হাতা ভরে পায়েস তুলে দিয়ে মিনুর মা'কে বলে,"মিনুকে আনোনি কেন চাচি?"
মিনুর মা খাওয়ার মাঝে পরিতৃপ্তির হাসি টেনে বলে,
"আহাঃ ফজলার মা দেখলে তো আমাদের নূরকে। তুমি বললে,বড়লোক ঘরে বিয়ে হয়ে নাকি ওর অহংকার হয়েছে। আমাদের চিনবেই না। দেখলে তো, মিনু কেন আসেনি তার ঠিক খোঁজ নিচ্ছে।"
মিনুর মা পাশে বসা ফজলার মা'র হতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে মেঘনূরের দিকে তাকিয়ে বলে,
"ও মা.. মিনু ওর বাপের সাথে বাইরে বসেছে খেতে।"
মেঘনূর স্বল্প হেসে ফজলার মায়ের কাছে আসে। পায়েস বেড়ে দিতে দিতে বলে,"কয় হাতা লাগবে তোমার বলো চাচি। পরে না দুর্নাম গাও গাঁয়ে গাঁয়ে যে মেঘনূর অহংকারের ঠেলায় তোমায় পায়েস দেইনি।"
ফজলার মা মুখ বাঁকিয়ে কলাপাতা এগিয়ে দেয় সামনে। সরু চোখে তাকিয়ে বলে,"মানুষের একটুখানি আফসোস হয়। এমন হেসে খেলে তোর খাওয়ানো দেখে গা পিত্তি জ্বলে রে নূর। এমন দিনেও দু ফোঁটা চোখের জল নেই তোর চোখে?"
মেঘনূর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, "এক কথা আর কয়বার বলবো? তোমরা সখীরা থাকতে আমার চোখের জল ফেলে কি লাভ বলো দেখি?? আমার হয়ে একটু কেঁদে দিলেও তো পারো৷ বুড়ো সত্যি খুশি হতো। বলতো আহা,ফজলার মা তুমি আমার জন্য কেঁদেছো জন্য কবরের হিসেবখানা কমে এলো। বেশি বেশি কাঁদো..."
"তুই ভালো হবি না নূর.."
"খাও..খাও বেশি কথা বলো না। আজকের দিনে এ বাড়িতে ঝগড়া করতে চাই না। পুকুরে পাড়ে কাপড় ধুতে এসো কোমড় বেঁধে ঝগড়া করবো তখন।"
মেঘনূর সামনে এগোয়। দু মাথা পরেই দেখা পায় চুমবুলি বুড়ির। এ আরেক কুচুটে। সারাদিন এ বাড়ি ও বাড়ি কথা চালান দেয়।
"ময়লা গায়ের রঙ নিয়া যে ভা'তার ধইরা রাখবার পারবিনে এ আমার জানা ছিল। শিকদার বাড়ির বড় গিন্নী কি দেইখা যে তোর মতো অপয়া মাইয়াকে পছন্দ করছিল। বাপ মা মরা মাইয়া নাকি সুলক্ষণা হইব।"
মেঘনূর চুপচাপ পায়েস বেড়ে দিয়ে চাকর দুজনকে একটু সামনে এগোতে বলে। চাকর দুটো সামনে এগোতেই সে চুমবুলি বুড়ির দিকে একটুখানি ঝুঁকে বলে,"মুখ খুললেই তো বলবে,মেঘনূর খারাপ,ঝগড়ুটে,মুখে মুখে তর্ক করে। এখন আমি যদি তোমায় বলি, তোমার মতো সাদা চামড়ার সুন্দরী রমণীর বাপ মা থাকা সত্ত্বেও এমন ভা'তার কপালে জুটেছিল যে কি না বিয়ের পরই লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। এতো সুলক্ষণা হলে ঘর করতে পারলে না কেন? এ কথা বললে তো রাগ করবে। মন খারাপ করবে। তাই বললাম না নাও.."
চুমবুলি বুড়ি ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকে মেঘনূরের দিকে। দ্বিরুক্তি করার ভাষা খুঁজে পায় না। এমন কথা হজম করা কঠিনই বটে। কি মেয়ের চোপা৷ মুখে মুখে এমন উচিত কথা কেউ বলে?
মেঘনূর ধীরলয়ে উঠে সরে যায় তার থেকে। খাদুলি গাঁয়ের এক ঝিয়ের পাতে পায়েস বাড়ার সময় মেয়েলোকটি আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,"আহারে,কি সোনামুখ বউ থুইয়ে ছাওয়াল আমার পরগপার হইলো। ও মা.. জনপণ কি আছে তোর দু একখানা?"
মেঘনূর জবাব দেওয়ার আগেই পাশ থেকে এক বউ কনুই গুঁতো দিয়ে বলে,"কি বলো এসব তুমি ভাবী? বিয়ের দিনে স্বামী মরেছে নতুন বউ এর। জনপন আসবে কোন থিকে?"
"ওও..বুঝি নাই বুঝি নাই।"
মেঘনূর কিছু না বলে উঠে যায়। গাঁয়ের মানুষদের এই এক দোষ। এরা বুঝে কথা বলার চাইতে না বুঝে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। ঠাঁস করে একটা কথা মুখে এলে সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেলবে৷ সে কথা যুক্তিসংগত হোক বা না হোক।
______________________________________
সন্ধ্যার সাজ লগ্ন। দিনের আলো ফুরিয়ে এসে শিকদার বাড়ির চারধারে গোধূলির অন্ধকার নেমেছে। গায়ের সমস্ত মানুষ ততক্ষণে পেটপুরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিয়েছে। এদিকে কলিমুল্লাহর মাপ ঝোঁকও একেবারে খাপে খাপ হয়েছে। কোনো কমতি হয়নি৷ বরং কিছু খাবার অতিরিক্ত বেঁচে গেছে।
পাড়া গায়ের কুকুর বিড়াল সব এঁটো বাঁটা খাবারে মুখ লাগাতে ব্যস্ত। বাড়ির চাকর বাকরেরা নিজেদের ভোজন শেষে মাঠে বসে তামাক টানছে আপনমনে। খানিকক্ষণ বিশ্রাম শেষে সমস্ত কিছু পরিষ্কার করার কাজে আবারো লেগে পড়বে তারা।
.
.
.
অগ্নিবীণা শিকদারের ডাক পেয়ে তাঁর খাস কামরায় এসে উপস্থিত হয়েছে মেঘনূর। অগ্নিবীণা তখন ঘরে ছিলেন না। মেঘনূর একা একা চোখ ধাঁধানো রাজকীয় ঘরটা দুচোখ ভরে দেখে যাচ্ছে। এমন দূর্লভ আসবাবপত্র সে তার সতেরো বছরের জীবনে কখনো দেখেনি। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশাল সেগুন কাঠের কারুকাজ খচিত পালঙ্ক। পালঙ্কের ওপর ধবধবে সাদা চাদর সাথে সিল্কের বালিশ সাজানো। ঘরের এক কোণে শোভা পাচ্ছে বনেদি মেহগনি কাঠের আলমারি।
মেঘনূর ধীর পায়ে হেঁটে এসে আলমারির কাছে দাঁড়ায়। হাত বুলিয়ে দেখতে থাকে কারুকাজ করা নকশার খাঁজগুলো। কি অপরূপ দেখতে। এমন ঝকঝক করছে মনে হচ্ছে সোনা দিয়ে লেপানো। মামির ঘরে একটা রং চটা আলমারি আছে। দারুচিনি রঙের। সেখানে মহুয়াকে কত বলে কয়ে সে একটা শাড়ি তুলে রেখেছে। আলমারিতে তার একখানা শাড়ি ঠাঁই পেয়েছে এই ভেবেই আনন্দে তার মুক্তোঝরে। বাকি পরনের সব কিছু ঘরের মধ্যে পাটের দড়িতে ভাঁজ করে রাখা। দুষ্টু ইঁদুর তার দুষ্টু দাঁত দিয়ে মাঝে মাঝে বেশ জ্বালাতন করে।
দেওয়ালের পাশে পিতলের ঝাড়বাতি হতে হলদে আলো ঝরছে। সেই সাথে সুগন্ধি মোমদানি থেকে হালকা আলোর আভা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে। মেঘনূরের সাহস হয় না বড় বাতি জ্বালানোর৷ পাছে যদি বড় গিন্নী রাগ করে। কি জানি তার হয়তো এমন আবছা আলো পছন্দ। সেজন্যই হয়তো এমন করে রেখেছে। অবশ্য যা আলো আছে ঘর আলোকিত করতে যথেষ্ট।
পিনপতন নীরবতার মাঝে হুট করে দরজার ওপাশ থেকে নতুর হন্তদন্ত গলা ভেসে আসে,
"গিন্নী মা! ছোট সাহেব ঘরে আসছেন।"
আপনা কাজে মত্ত থাকা মেঘনূর এমন ভয়ানক বার্তা শোনা মাত্র স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো শরীর ভয়ে তার হিম হয়ে আসে মুহুর্তেই। বুকের ভেতরে ওলটপালট ধাক্কায় নাজেহাল হয়ে পড়ে সে এক নিমিষে। বড় গিন্নী ঘরে নেই, তিনি আসতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এর মাঝে শিমলার কথা মতো এই বাড়ির ত্রাস, রাগী আর বদমেজাজি ছোট সাহেব নওয়াজ শিকদার তাঁর মায়ের ঘরে আসছেন?
"আল্লাহ, এ কোন বিপদে পড়লাম আমি।"
মেঘনূরের শ্যামলা মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে আসে। ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে, চোখ দুটো ভয়ে চড়কগাছ। একা কক্ষে পুরুষ মানুষের আগমন? কোথায় যাবে এখন সে?
বিস্তর আতঙ্কের মাঝেই পায়ের ছন্দবদ্ধ পদধ্বনি ভেসে আসে কানে। যার প্রতিটি পদক্ষেপ মেঘনূরের বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়ে। উপায়ন্তর না পেয়ে তীব্র আতঙ্কে সে এক ছুটে ঘরের কোণে বেলকনির দিকে চলে যায়। বেলকনির দরজায় ঝুলন্ত সাদা ফিনফিনে জর্জেটের পর্দা তড়িঘড়ি করে টেনে আড়াল করে নেয় নিজেকে।
ঠিক তার পর মুহূর্তেই ঘরে প্রবেশ করে নওয়াজ শিকদার। প্রবেশ মাত্র গম্ভীর, রাশভারী কণ্ঠে বলে উঠে,
"আম্মা, আপনার সাথে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।"
শ্রাবণের মেঘের ন্যায় বজ্রধ্বনি পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘনূরের কানে পৌঁছানো মাত্র সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিললেও মুখে কোনো শব্দ করে না।
ঘর থেকে অগ্নিবীণা শিকদারের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নওয়াজ চারদিকে তীক্ষ্ণ চোখ বুলায়। হঠাৎ তার শাবকীয় নজর গিয়ে ঠেকে বেলকনির সেই সাদা ফিনফিনে পর্দার ওপর। পর্দার ওপাশে একটা আবছা নারী অবয়ব চোখ ভেসে উঠে তার ।
নওয়াজ খানিকটা অবাক হয়। অগ্নিবীণা শিকদারের অনুপস্থিতিতে তাঁর খাস কামরায় বাইরের অন্য কেউ? এটা কীভাবে সম্ভব? কার এত বড় দুঃসাহস এভাবে পর্দার আড়ালে নিজেকে আত্মগোপন করে রেখেছে?
নওয়াজ দু'হাতের মুঠো পিঠের পেছনে শক্ত করে বেঁধে টান টান হয়ে দাঁড়ায়। চোখ দুটো বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ করে সেই ছায়ার অবয়বের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে,
"শিকদার বাড়িতে পা রেখে এতোবড় স্পর্ধা হয় কি করে আত্মগোপন করার?? তাও সেটা অগ্নিবীণা শিকদারের ঘরে পা রেখে? বেঁচে থাকার ইচ্ছে কি ফুরিয়ে এসেছে??"
পর্দার আড়াল থেকে মেঘনূর চোখ বুঁজে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। কি ভয়ংকর লোক। সরাসরি মারার হুমকি দিচ্ছে। শিমলার কথা তো তাহলে পুরোদস্তুর ঠিক। বুকের ভিতর চলমান ঝড় সামলে মেঘনূর চেষ্টা করে উত্তর দেওয়ার। নিজেকে নির্দোষ দাবি করার প্রাণপণ চেষ্টায় সে কিছুটা সময় নেয়। অতঃপর কম্পনরত গলায় জবাব দেয়,
"ব..বড় গিন্নি আমাকে ডেকেছে নিজে তার কামরায়।"
"কী উদ্দেশ্যে?"
"আমার নিজেরও অজানা।"
সংক্ষিপ্ত উত্তর পেয়ে নওয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তপ্ত গলায় বলে উঠে, "একজনের অনুপস্থিতিতে ঘরে এভাবে লুকিয়ে অবস্থান করা যে ভদ্রতাহীন তা হয়তো অজানা আপনার।"
নওয়াজের অপমানজনক এই কথাটা মেঘনূরের গায়ে এসে লাগে সরাসরি। সে কি চোর যে এভাবে অপদস্থ করছে? স্বেচ্ছায় তো আসেনি। কখনো আসতোও না যদি না বড় গিন্নী নিজে আদেশ করতো। ভেতরের ভয়টা তার এক নিমেষে উবে যায়। ভয়ের জায়গায় চট করে এসে জমা হয় তীব্র কপট রাগ।
পর্দার আড়াল থেকেই নির্মেদ স্বরে পাল্টা জবাব ছুঁড়ে দিয়ে বলে, "সৎ সাহস থাকলে ভয় কিসে? যার সৎ সাহস থাকে সে জানে ভদ্রতা আর ভদ্রতাহীন শব্দের মধ্যে কি পার্থক্য। আপনার নিজেরই হয়তো অজানা।"
মুখের উপর তড়তড়ে জবাব পেয়ে নওয়াজের ধারালো চোখ দুটো স্তম্ভিত হয়ে উঠে। এই পুরো পরগনায় তার মুখের ওপর কথা বলার সাহস কোনো পুরুষেরও নেই, আর এই মেয়ে তাকে নীতিশিক্ষা দিচ্ছে? কপালজুড়ে রগগুলো তার দপদপ করে উঠে। থমথমে গলায় বলে,
"শিকদার বাড়ির সাথে কী সম্পর্ক আপনার?"
মেঘনূর দমবার পাত্রী নয়। নওয়াজের রাগান্বিত কন্ঠস্বর তার জেদকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঝাঁঝালো গলায় বলে, "আপনাকে জবাবদিহি করার কী দরকার?"
"জবাবদিহি না করলে এ বাড়িতে একঘন্টা অবস্থান করাটাও কঠিন হয়ে যাবে আপনার জন্য।"
তীর্যক হুমকিতে মেঘনূরের শরীরে ফের ভয় এসে জমে। বুকের মধ্যে লাগাতর ঢিপঢিপ আওয়াজ হচ্ছে। এমন খাটাশ পুরুষকে ভয় না পেয়ে উপায়ও নেই। যে রাগ, খুন খারাবি করতে সময় নিবে না। তড়িঘড়ি করে মুখ ফুটে পরিচয় পর্ব দিতে উদ্যত হয় সে। কিন্তু পর মুহুর্তেই হুট করে আবার ঠোঁট চাপিয়ে ফেলে। একরাশ ভয় নিয়েই বলে উঠে,
"কেন, কে আপনি? কি সে এতো বাধ্যবাধকতা?"
"আমি কে সেটা আপনাকে জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করছি না। শুধু মাথায় রাখবেন,পরিণতি খুব একটা ভালো হতে যাচ্ছে না আপনার।"
পর্দার ওপাশ থেকে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেতে বৃত্ত কাটে মেঘনূর। মনে মনে বলে উঠে," কি দূর্ধ্বষ লোক। আমার বলা কথা আমাকেই ফেরত দিলো?"
অবাধ্য জেদ সে কমায় না। মামির সাথে কোমড় বেঁধে ঝগড়া করা মেয়ে মেঘনূর। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয় লুকিয়ে সমানে সমান টক্কর দিয়ে বলে,"মানুষ হয়ে বাঘের মতো ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমি ভয় পাই না।"
পর্দার ওপার থেকে আসা তীব্র জবাবগুলো নওয়াজের ভেতরের সুপ্ত হিংস্রতাকে আরও উসকে দেয়। ডানহাতের মুঠো শক্ত করে পাকিয়ে সে কক্ষের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। ধমকানো গলার স্বর চড়াও করে মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলে,
"মুখের জোর তো দেখছি দেদার। তবে এই গর্জন পর্দার আড়ালেই মানায় । নওয়াজ শিকদারের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলার ক্ষমতা বড় বড় রথী মহারথীদেরও নেই। আড়ালে লুকিয়ে বাঘিনী হওয়া সহজ, সামনে আসার সাহসটা সবার থাকে না।"
চরম তাচ্ছিল্যভরা অহংকারী বাক্য তীরের মতো গিয়ে বিঁধে মেঘনূরের বুকে। গায়ের রক্ত এক নিমেষে চনমন করে জ্বলে উঠে তার। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে সে এক ঝটকায় মধ্যবর্তী সেই সাদা ফিনফিনে পর্দাটা সরিয়ে ফেলে। ঠিক সেই মুহুর্তে সন্ধ্যাকালীন গৌধূলির শেষ হলদেটে আভা আছড়ে এসে পড়ে তার অবাধ্য, উন্মুখ অবয়বের ওপর।
মেঘনূর এক কদম সামনে এগিয়ে এসে কাজল কালো, অগ্নিঝরা দুচোখ মেলে সরাসরি তাকায় নওয়াজের শিকদারের চোখের দিকে। শ্যামলা কপালে তার রাগের বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঠোঁট দুটো ক্ষোভে কাঁপছে। দূর্গম চোখে এক ফোঁটাও ভয়ের চিহ্ন নেই। আছে কেবল তীব্র অটল বিদ্রোহ।
উত্তপ্ত ক্রান্তিলগনে নওয়াজ শিকদারের গম্ভীর কালো চোখের মণি জোড়া থিতু হয়ে যায় এক তেজি কামিনীর উপর। সেই সাথে মুখোরেখার সেই রাগী কঠোর রেখাগুলো এক লহমায় পাথর হয়ে যায়।
টাইমপিসের কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া পুরো ঘর নিরবতায় ঢেকে যায়। অস্পষ্ট স্বরে কানে ভেসে আসে অন্দরমহলে লাগানো দরজার ক্যাড় ক্যাড়ে শব্দ। কম্পনরত মোমবাতির আলো ছায়ার খেলার মাঝে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে দুটি বিপরীত মেরুর মানুষ। যেখানে নওয়াজের চোখজোড়া শক্ত, ধারালো আর কর্তৃত্বপূর্ণ সেখানে মেঘনূরের চোখজোড়া গভীর, তেজস্বী, আগ্নেয়গিরি। কেউ কারো থেকে চোখ সরায় না। যেন এক চুল নজর সরালেই এই রাজকীয় অহংকারের যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত।
পলকহীন চোখে নওয়াজের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে ক্রুর শীতল হাসির রেখা। চোখে খেলা করে শিকারী চিলদের মতো তীক্ষ্ণতা। সে মেঘনূরের চোখের ওপর নিজের ধারালো দৃষ্টি স্থির রেখেই এক কদম সামনে এগিয়ে আসে। ঘরের মোমবাতির আলোয় তার দীর্ঘ, চওড়া ছায়াটা মেঘনূরের ওপর এসে পড়া মাত্র এক লহমায় তার প্রতাপের অন্ধকারে গ্রাস করে নেয় নারী কায়াটিকে।
"কাল রাতে কাচারি ঘরের আয়নায় একজনকে দেখে মনে হয়েছিল আকাশের চাঁদ হয়তো ভুল করে জমিনে নেমে এসেছে। আজ সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দেখছি। চাঁদের রূপের চেয়ে তার তেজ কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু একটা কথা মাথা রাখা উচিত তার। আকাশের ওই চাঁদ যত বড় তেজের সাথেই অন্ধকার রাতকে শাসন করুক না কেন, দিনশেষে অমাবস্যার এক ফুঁৎকারে তার অস্তিত্ব বিলীন হতে বাধ্য। চাঁদ যতই তেজস্বী হোক সূর্য যখন আকাশে ওঠে তখন চাঁদের কোনো ক্ষমতা থাকে না এক ফোঁটা আলো ছড়ানোর। আর এই পরগনায় এই শিকদার বাড়িতে নওয়াজ শিকদার হলো সেই সূর্য। আমার সাম্রাজ্যে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চোখ রাঙানোর স্পর্ধা দেখালে সেই চোখের তেজ নিভিয়ে দিতে আমার এক মুহূর্তও সময় লাগবে না চন্দ্রমুখী অনন্যা।"