ফন্ট সাইজ:
থিম:
চোখের আড়ালে ভালোবাসা

পর্ব 15

লেখক: মেহেজাবিন আভা

১৫তম পর্ব
— নতুন পথের শুরু

________

সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে আভার ঘরে এসে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় আটটা ছুঁইছুঁই। অথচ আভা এখনো বিছানায় বসে আছে। গতকাল রাত থেকে বাবার বলা কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছে।

বাবা বলেছিলেন, আজ বিকেলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানাবেন।

কী এমন কথা হতে পারে?

পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত? নাকি অন্য কিছু?

আভা যতই ভাবছে, ততই কৌতূহল বাড়ছে।

এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।

— মা, ঘুম থেকে উঠেছিস?

মাহমুদা বেগমের কণ্ঠ শুনে আভা বলল,

— জি আম্মু, উঠেছি।

— তাহলে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

— আসছি।

আভা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।

ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখল, বাবা নাশতার টেবিলে বসে পত্রিকা পড়ছেন। পাশে মায়ের বানানো নাশতা সাজানো।

আভা বাবার বিপরীত পাশে বসে বলল,

— সুপ্রভাত, আব্বু।

রাশেদ আহমেদ পত্রিকা নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

— সুপ্রভাত, মা। ঘুম কেমন হয়েছে?

— ভালো।

— আজকে কী করবে?

— বিশেষ কিছু না। একটু বই পড়ব, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলব।

বাবা মাথা নেড়ে আবার পত্রিকায় চোখ রাখলেন।

আভা কিছুক্ষণ চুপ করে খেতে লাগল। কিন্তু তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছিল। শেষ পর্যন্ত আর চুপ থাকতে পারল না।

— আব্বু?

— হ্যাঁ, বল।

— কালকে যে কথাটা বলবে বলেছিলে, সেটা কি আজ বলবে?

রাশেদ আহমেদ পত্রিকা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন।

— বলব তো। তবে নাশতা শেষ কর। তারপর আমরা সবাই বসে কথা বলব।

আভা আর কিছু বলল না।

নাশতা শেষে আভা নিজের ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকলেও মনোযোগ দিতে পারছিল না। বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।

এমন সময় ইসরাতের ফোন এল।

— হ্যালো, আভা!

— হ্যাঁ, বল।

— কী করছিস?

— কিছু না। বই নিয়ে বসেছিলাম।

— আবার বই! ফলাফল তো হয়ে গেছে। এখন একটু আমাদের সময় দে।

আভা হেসে বলল,

— আচ্ছা, বল কী হয়েছে?

— আজ বিকেলে সবাই মিলে দেখা করব। তানু বলেছে, তোর কাছ থেকে মিষ্টি খাওয়ার বাকি আছে।

আভা বলল,

— ওর মিষ্টি খাওয়ার কথা এখনো মনে আছে?

— ওর মাথায় শুধু খাবার আর দুষ্টুমি। তুই জানিস না?

— জানি।

ইসরাত একটু থেমে বলল,

— আচ্ছা, একটা কথা বলব?

— বল।

— তুই কি আজকাল একটু অন্যরকম হয়ে গেছিস?

আভা অবাক হলো।

— মানে?

— কিছু না। মনে হচ্ছে তোর মাথায় অনেক কিছু চলছে। স্কুলে আসার পরও মাঝে মাঝে চুপচাপ থাকিস।

আভা জানালার বাইরে তাকাল।

— এমন কিছু না। বাসায় একটু কথা আছে।

— কী কথা?

— এখনো জানি না। আব্বু বিকেলে বলবে।

ইসরাত কৌতূহলী হয়ে উঠল।

— কীসের কথা?

— জানি না বললাম তো!

— আচ্ছা, ঠিক আছে। বিকেলে দেখা হলে বলিস।

কথা শেষ করে আভা ফোন রেখে দিল।

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।

অন্যদিকে আরিয়ানের বাড়িতে সকাল থেকেই একটু ব্যস্ততা।

আরিয়ান নিজের ঘরে বসে ফোনে কিছু দেখছিল। এমন সময় তার ছোট ভাই আরহাম দরজা না ঠুকেই ঘরে ঢুকে পড়ল।

— ভাইয়া!

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।

— কী হয়েছে?

— আম্মুর ফোন এসেছে।

— তো?

— তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে।

আরিয়ান ফোনটা নামিয়ে বলল,

— কখন ফোন করেছে?

— একটু আগেই। তুমি ঘুমাচ্ছিলে, তাই ডাকিনি।

— এখন দে।

আরহাম ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।

আরিয়ান মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।

— আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।

ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী করছিস বাবা?

— কিছু না। বাসায় আছি।

— পড়াশোনা কেমন চলছে?

— ভালো।

— আরহাম ঠিকমতো পড়ছে তো?

আরিয়ান পাশে বসা ভাইয়ের দিকে তাকাল।

— ওর পড়াশোনার খবর ওকেই জিজ্ঞেস করো। আমার কাছে জানতে এসো না।

আরহামের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে ছোট হয়ে গেল।

ওপাশ থেকে মা হেসে বললেন,

— বুঝেছি। তোরা দুজনেই আমাকে ফাঁকি দিস।

আরিয়ানও হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার পর মা বললেন,

— তোর আপু আগামী সপ্তাহে বাড়ি আসবে।

আরিয়ান একটু অবাক হলো।

— সত্যি?

— হ্যাঁ। অনেক দিন তোকে দেখেনি। এবার বেশ কিছুদিন থাকবে।

— ভালোই হবে।

— আর তুই নিজের খেয়াল রাখবি। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবি।

— আচ্ছা, আম্মু।

কথা শেষ হওয়ার আগে মা আবার বললেন,

— আর একটা কথা, তোর বাবার সঙ্গে কথা বলিস। উনি তোকে একটা বিষয় জানাতে চান।

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কী বিষয়?

— সেটা তোর বাবাই বলবে।

ফোন কেটে গেল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরহাম জিজ্ঞেস করল,

— কী বলেছে আম্মু?

— আপু আসবে।

আরহাম খুশি হয়ে বলল,

— সত্যি! তাহলে তো মজা হবে!

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

— হ্যাঁ, এবার তোর দুষ্টুমি করার মানুষ আসছে।

— আমি কি দুষ্টুমি করি?

— না, তুই তো খুব ভালো ছেলে!

আরহাম গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।

— একদম!

আরিয়ান হেসে উঠল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।

আভা নিজের ঘরে বসে ছিল। মা এসে বললেন,

— মা, নিচে আয়। তোর বাবা এসেছে।

আভা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।

নিচে এসে দেখল, বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। পাশে মা। বাবার সামনে একটি ফাইল রাখা।

আভা ধীরে ধীরে সোফায় বসে বলল,

— বলো আব্বু, কী কথা?

রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,

— আভা, তুই তো জানিস, আমি অনেক দিন ধরে অফিসের একটা পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলাম।

— হ্যাঁ।

— সেই ব্যাপারে একটা খবর এসেছে।

আভা মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।

— আমার অফিস থেকে আমাকে ঢাকায় বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে আমার জন্য আরও ভালো একটি পদ আছে। কাজের দায়িত্বও বাড়বে।

আভা প্রথমে কথাটা বুঝতে পারল, কিন্তু পরের কথাটা শোনার জন্য অপেক্ষা করল।

রাশেদ আহমেদ এবার বললেন,

— তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী দুই মাসের মধ্যে ঢাকায় চলে যাব।

কথাটা শুনে আভা একেবারে চুপ হয়ে গেল।

তার মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ করে তার পরিচিত পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়ার কথা বলে ফেলেছে।

— আমরা... ঢাকায় চলে যাব?

মাহমুদা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন।

— হ্যাঁ মা। তোর বাবার কাজের সুবিধার জন্য আমাদের সবাইকে যেতে হবে।

আভা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল।

তার চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠল গ্রামের বাড়ি, স্কুলের মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, বন্ধুদের মুখ।

ইসরাতের বকবকানি।

তানুর দুষ্টুমি।

তিথির মিষ্টি হাসি।

নাইমার শান্ত স্বভাব।

ইরফানের মজার কথা।

আর...

আরিয়ানের মুখটা মনে পড়তেই আভা দ্রুত চিন্তাটা সরিয়ে দিল।

সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— তাহলে আমি কি এই স্কুলে আর পড়তে পারব না?

রাশেদ আহমেদ নরম গলায় বললেন,

— না মা। ঢাকায় গিয়ে তোকে নতুন স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তোর পড়াশোনার জন্য আমরা ভালো একটি স্কুল দেখছি।

আভা কিছু বলল না।

বাবা আবার বললেন,

— তোর ফলাফল খুব ভালো হয়েছে। আমরা চাই, তুই আরও ভালো পরিবেশে পড়াশোনা করিস। ঢাকায় ভালো সুযোগ পাবি।

আভা এবার মুখ তুলে তাকাল।

— কিন্তু আমার বন্ধুরা?

মাহমুদা বেগম মেয়ের হাত ধরলেন।

— বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। দূরে গেলেই তো বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায় না।

— কিন্তু প্রতিদিন তো দেখা হবে না।

কথাটা বলেই আভা চুপ হয়ে গেল।

রাশেদ আহমেদ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— আমি জানি, হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত শুনে তোর খারাপ লাগছে। তোরও তো নিজের একটা জগৎ তৈরি হয়েছে এখানে। কিন্তু আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আর ঢাকায় গেলে তোর জন্য অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

আভা কিছুক্ষণ পর বলল,

— আমি কি একটু সময় নিতে পারি?

— অবশ্যই, মা। আমরা তোকে জোর করছি না। তুই ভাব। তবে আমাদের যাওয়ার সিদ্ধান্তটা প্রায় চূড়ান্ত।

আভা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— আমি একটু ঘরে যাই।

মাহমুদা বেগম বললেন,

— যা মা।

আভা নিজের ঘরে চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়ল।

ঢাকা!

যে শহর থেকে একসময় সে গ্রামে এসেছিল, আবার সেই শহরেই ফিরে যেতে হবে।

কিন্তু এবার সবকিছু আগের মতো থাকবে না।

আগে সে ছিল একা। এখন তার অনেকগুলো বন্ধু আছে। অনেক স্মৃতি আছে।

কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়।

আভা ফোনটা হাতে নিল।

গ্রুপে সবাই কথা বলছে।

ইসরাত: বিকেলে কিন্তু সবাই আসবি।

তানু: আমি কিন্তু খাবারের জন্য প্রস্তুত।

নাইমা: তুই সব সময় প্রস্তুত থাকিস।

ইরফান: আজকে কে কোথায় আসবে সেটা ঠিক করো আগে।

আরিয়ান: মাঠের পাশের পুরোনো জায়গাটায় আসতে পারি।

আভা বার্তাগুলো পড়ল।

কিছুক্ষণ পর লিখল,

আভা: তোমাদের সঙ্গে একটা কথা আছে।

সঙ্গে সঙ্গে ইসরাতের উত্তর এল।

ইসরাত: কী কথা?

তানু: আবার কী করেছিস?

আভা: কিছু করিনি।

নাইমা: তাহলে কী হয়েছে?

আভা লিখতে গিয়েও থেমে গেল।

কীভাবে বলবে?

কীভাবে জানাবে যে খুব শিগগিরই তাদের থেকে দূরে চলে যেতে হবে?

শেষ পর্যন্ত সে শুধু লিখল,

আভা: বিকেলে দেখা হলে বলব।

বিকেলের দিকে গ্রামের পুরোনো মাঠের পাশে সবাই একত্র হলো।

ইসরাত, তানু, তিথি আর নাইমা আগে থেকেই সেখানে ছিল। কিছুক্ষণ পর ইরফান ও আরিয়ানও এসে পৌঁছাল।

ইসরাত আভাকে দেখেই বলল,

— এবার বল, কী হয়েছে?

আভা সবার মুখের দিকে তাকাল।

— একটা কথা বলব। তবে তোরা কেউ মন খারাপ করিস না।

তানু সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— এই ধরনের কথা বললেই তো মন খারাপ হয়!

ইরফান বলল,

— আগে বলতে দাও। তারপর মন খারাপ করা যাবে।

আভা একটু থেমে বলল,

— আব্বুর অফিস থেকে ওনাকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তাই আমরা দুই মাসের মধ্যে ঢাকায় চলে যাব।

কথাটা শুনে সবাই থেমে গেল।

ইসরাত প্রথমে কিছু বলল না। তারপর অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— মানে? তুই চলে যাবি?

আভা মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ।

তিথির মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।

— তাহলে আমাদের কী হবে?

নাইমা শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল,

— ঢাকায় গেলে তো যোগাযোগ থাকবে। কিন্তু প্রতিদিন দেখা হবে না, এটাই কষ্টের।

তানু এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল,

— তুই আমাদের না জানিয়ে চলে যেতে পারবি না কিন্তু!

আভা মৃদু হেসে বলল,

— এখনো তো যাচ্ছি না। দুই মাস সময় আছে।

ইসরাত আভার হাত ধরে বলল,

— দুই মাস অনেক কম সময়!

আভা এবার কিছু বলল না।

ইরফান পরিবেশটা একটু হালকা করার চেষ্টা করে বলল,

— ঢাকায় গেলে আমাদের ভুলে যাস না কিন্তু। আর নতুন বন্ধু পেলে পুরোনো বন্ধুদের ব্লক করে দিবি না।

তানু বলল,

— তোর মাথায় সব সময় এসব কীভাবে আসে?

ইরফান হেসে বলল,

— প্রতিভা!

সবাই একটু হাসল। কিন্তু হাসির আড়ালে একটা চাপা মন খারাপ রয়ে গেল।

এতক্ষণ আরিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

আভা চলে যাবে—কথাটা সে শুনেছে। কিন্তু অন্যদের মতো সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পারেনি।

তার চোখ একবার আভার দিকে গেল।

আভা সবার সঙ্গে কথা বলছে, কিন্তু তার চোখের হাসিটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

আরিয়ান ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— কবে যাচ্ছ?

আভা তার দিকে তাকাল।

— এখনো ঠিক হয়নি। আব্বু বলেছে, দুই মাসের মধ্যে।

— স্কুলের ব্যাপারে?

— ঢাকায় গিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হবে।

আরিয়ান আর কিছু বলল না।

ইরফান পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— তাহলে আমাদের দলটা ভেঙে যাবে নাকি?

নাইমা বলল,

— দল ভাঙবে কেন? সবাই যোগাযোগ রাখব।

ইসরাত বলল,

— হ্যাঁ। আর ছুটিতে আভা এখানে আসবে।

আভা বলল,

— অবশ্যই আসব।

তানু সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— কথা দিলি?

— দিলাম।

তিথি মৃদু হেসে বলল,

— তাহলে আমরা অপেক্ষা করব।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সবাই বাড়ির পথে রওনা দিল।

আভা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। তার পাশে ইসরাত। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ইসরাত বলল,

— তুই সত্যিই চলে যাবি?

আভা মৃদু স্বরে বলল,

— আব্বুর চাকরির ব্যাপার তো। না গিয়ে উপায় কী?

— তবুও খারাপ লাগছে।

— আমারও।

ইসরাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— একটা কথা বলব?

— বল।

— তোর কি কারও জন্য বেশি খারাপ লাগছে?

আভা একটু থমকে গেল।

— মানে?

ইসরাত মুচকি হাসল।

— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।

আভা চোখ সরিয়ে বলল,

— তুই আবার শুরু করেছিস?

ইসরাত হেসে বলল,

— আচ্ছা, আর বলব না।

কিন্তু তার মুখের হাসি দেখে আভা বুঝতে পারল, ইসরাতের মাথায় অন্য কিছু চলছে।

রাত।

আভা নিজের ঘরে বসে ছিল। টেবিলের ওপর খোলা বই, কিন্তু পড়ায় মন নেই।

ফোনের পর্দায় একের পর এক বার্তা আসছে।

গ্রুপে সবাই মিলে নানা কথা বলছে। কেউ ঢাকায় যাওয়ার পর দেখা করার পরিকল্পনা করছে, কেউ আবার আভাকে নিয়ে মজা করছে।

আভা সব পড়ছে, কিন্তু খুব বেশি উত্তর দিচ্ছে না।

হঠাৎ ব্যক্তিগত বার্তা এল।

আরিয়ান: মন খারাপ?

আভা কিছুক্ষণ পর লিখল,

আভা: একটু।

আরিয়ান: ঢাকায় যেতে চাও না?

আভা: জানি না। আব্বুর চাকরির ব্যাপার। যেতে তো হবেই।

আরিয়ান: বুঝলাম।

কিছুক্ষণ কোনো বার্তা এল না।

তারপর আরিয়ান আবার লিখল,

আরিয়ান: এখানে তোমার অনেক স্মৃতি আছে, তাই না?

আভা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

আভা: হ্যাঁ। অনেক।

আরিয়ান: সেগুলো ভুলে যেও না।

আভা উত্তর দিল,

আভা: ভুলব না।

আরিয়ান: আর বন্ধুদেরও না।

আভা লিখল,

আভা: কাউকে ভুলব না।

বার্তাটা পাঠানোর পর আভা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

কিন্তু আরিয়ান তখনো ফোন হাতে বসে ছিল।

সে জানে না, দুই মাস পর কী হবে। আভা চলে গেলে তাদের প্রতিদিনের দেখা, স্কুলের মাঠে হঠাৎ চোখাচোখি, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছু বদলে যাবে।

তবুও সে নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করল না।

কারণ কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো মুখে বলা যায় না।

পরদিন দুপুরে রাশেদ আহমেদ অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল।

তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

— আসসালামু আলাইকুম, রাশেদ ভাই। কেমন আছেন?

রাশেদ আহমেদ একটু অবাক হয়ে বললেন,

— ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

— ভালো আছি। শুনলাম আপনি ঢাকায় চলে আসছেন?

— জি, আগামী মাস দুয়েকের মধ্যে।

ওপাশের মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— তাহলে একটা কথা ছিল। আপনি আসার পর আমাদের একবার দেখা করতে হবে।

রাশেদ আহমেদ বললেন,

— অবশ্যই। কোনো সমস্যা?

— সমস্যা না। বরং অনেক দিনের একটা বিষয় আছে, যেটা আপনার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা দরকার।

রাশেদ আহমেদ কিছুটা চিন্তিত হলেন।

— কী বিষয়?

— ফোনে বলা ঠিক হবে না। আপনি ঢাকায় আসুন, তারপর বলব।

কল কেটে গেল।

রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

লোকটি কে, তা তিনি ভালো করেই চেনেন। বহু বছর আগের পরিচিত। কিন্তু এত দিন পর হঠাৎ যোগাযোগ করার কারণ কী?

আর সেই পুরোনো বিষয়টাই বা কী?

সেদিন সন্ধ্যায় আভা মায়ের সঙ্গে বসার ঘরে বসে ছিল। মাহমুদা বেগম আলমারি থেকে কিছু পুরোনো ছবি বের করছিলেন।

আভা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

— আম্মু, এগুলো কীসের ছবি?

— তোর ছোটবেলার ছবি। গুছিয়ে রাখছিলাম।

আভা ছবিগুলো হাতে নিল। একটার পর একটা দেখতে লাগল।

কোনো ছবিতে সে বাবার কোলে, কোনো ছবিতে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে। একটি ছবিতে ছোট্ট আভাকে একটি বাড়ির বাগানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

আভা ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,

— আম্মু, এটা কোথাকার ছবি?

মাহমুদা বেগম ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

— এটা ঢাকার বাসার পুরোনো ছবি।

— আমাদের আগের বাসা?

— হ্যাঁ।

আভা ছবির পেছনে কিছু লেখা আছে কি না দেখতে উল্টে দিল।

ছবির পেছনে ছোট করে একটি তারিখ লেখা। তার নিচে আরও একটি নাম।

“সামিরা।”

আভা নামটা পড়ে মায়ের দিকে তাকাল।

— আম্মু, সামিরা কে?

মাহমুদা বেগমের হাতের কাজ থেমে গেল।

তিনি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— কোথায় পেলি নামটা?

— ছবির পেছনে লেখা। কে এই সামিরা?

মাহমুদা বেগম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর ছবিটা মেয়ের হাত থেকে নিয়ে বললেন,

— অনেক পুরোনো পরিচিত একজন।

— আমাদের পরিচিত?

— হ্যাঁ। তবে সে অনেক দিন ধরে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না।

আভা আবার প্রশ্ন করল,

— এখন কোথায় থাকে?

মাহমুদা বেগম উত্তর দেওয়ার আগেই রাশেদ আহমেদ ঘরে ঢুকলেন।

মেয়ের হাতে ছবিটা দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।

— এই ছবিটা তুই কোথায় পেলি?

আভা বলল,

— আম্মু বের করেছিল। আব্বু, সামিরা কে?

রাশেদ আহমেদ ও মাহমুদা বেগম একে অপরের দিকে তাকালেন।

কিছু একটা যেন দুজনেই এড়িয়ে যেতে চাইছেন।

রাশেদ আহমেদ ধীরে বললেন,

— অনেক পুরোনো একজন মানুষ, মা। এখন এসব নিয়ে ভাবিস না।

আভা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, বিষয়টা এত সহজ নয়।

সে আর প্রশ্ন করল না।

কিন্তু তার মনে নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি হলো।

সামিরা কে?

আর এত বছর পর তাঁর নাম শুনে বাবা-মা দুজনেই এমন চুপ হয়ে গেলেন কেন?

রাত আরও গভীর হলো।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও রাশেদ আহমেদ নিজের ঘরে বসে ছিলেন। হাতে সেই পুরোনো ছবিটি।

মাহমুদা বেগম পাশে এসে বসে বললেন,

— আজ আভা ছবিটা দেখে ফেলেছে।

রাশেদ আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— হ্যাঁ, বুঝেছি।

— এখন কী হবে?

— ঢাকায় গেলে হয়তো সবকিছু নতুন করে সামনে আসবে।

মাহমুদা বেগম নিচু স্বরে বললেন,

— এত বছর পর আবার সেই বিষয়গুলো সামনে আসুক, আমি চাই না।

রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— সবকিছু তো আর সারাজীবন লুকিয়ে রাখা যায় না।

ঘরের মধ্যে নেমে এল নীরবতা।

অন্যদিকে আভা নিজের ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে সেই ছবিটির কথা বারবার মনে পড়ছে।

ঢাকায় যাওয়া, নতুন স্কুল, নতুন মানুষ—সবকিছুর মাঝখানে এখন আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে।

সামিরা কে?

আর কেন তাঁর নাম শুনে বাবা-মায়ের মুখ বদলে গেল?

আভা জানত না, ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু তার জীবনের নতুন অধ্যায়ই শুরু করবে না, বরং তার পরিবারের বহু বছরের পুরোনো একটি গল্পও আবার সামনে নিয়ে আসবে।

আর সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যার কথা আভা এখনো জানে না।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 15 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন