১৪তম পর্ব —
এক মুঠো স্বপ্ন, একরাশ আনন্দ
_________
সকাল থেকেই আভার মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে। আজ তাদের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন। অথচ অন্য দিনের মতো আজ ঘুম থেকে উঠেই বইখাতা নিয়ে বসেনি সে। বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
গত কয়েক দিনের পড়াশোনা, পরীক্ষার হলের সেই মুহূর্তগুলো, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মনে করার চেষ্টা—সবকিছু একসঙ্গে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মাহমুদা বেগম মেয়ের ঘরে এসে দেখলেন, আভা এখনো তৈরি হয়নি।
— কী রে মা, এখনো বসে আছিস? স্কুলে যাবি না?
আভা মায়ের দিকে তাকাল।
— যাব তো আম্মু। একটু পরেই তৈরি হচ্ছি।
— মন খারাপ নাকি?
— না তো।
— তাহলে মুখটা এমন শুকনো করে রেখেছিস কেন? ফলাফল যা-ই হোক, তাতে এত চিন্তার কী আছে? তুই নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিস, এটাই তো বড় কথা।
আভা মৃদু হেসে বলল,
— জানি আম্মু। তবুও একটু ভয় লাগছে।
মাহমুদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।
আভা মাথা নেড়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।
অন্যদিকে স্কুলের মাঠে সকাল থেকেই বেশ হৈচৈ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ আবার ফলাফল নিয়ে নানা রকম হিসাব কষছে। কারও মুখে হাসি, কারও মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।
ইসরাত, তানু, তিথি আর নাইমা স্কুলের গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
ইসরাত বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।
— আভা এখনো আসছে না কেন? ওকে ছাড়া তো ফলাফল দেখতেই ভালো লাগবে না!
তানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— তোর কি ফলাফল দেখার চেয়ে আভাকে দেখার আগ্রহ বেশি?
— অবশ্যই! ও না এলে আমার রেজাল্টও ভালো হবে না।
নাইমা হেসে বলল,
— তুই চুপ কর। সকাল থেকে একবারও চুপ থাকিসনি।
তিথি মৃদু হেসে বলল,
— আভা নিশ্চয়ই আসছে। একটু অপেক্ষা কর।
ঠিক তখনই দূর থেকে আভাকে আসতে দেখা গেল। সাদা পোশাকের সঙ্গে পরিপাটি ওড়না, মুখে সেই চেনা মাস্ক। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে সে।
ইসরাত দূর থেকেই হাত নেড়ে ডাকল,
— এই যে আমাদের মিস চুপচাপ! এত দেরি কেন?
আভা কাছে এসে বলল,
— আরে, দেরি কোথায়? এখনো তো সময় আছে।
তানু চোখ ছোট করে তাকাল।
— বুঝেছি, ফলাফলের ভয়ে বাসা থেকে বের হতে দেরি করেছিস।
— একদম না।
— তাহলে তোর মুখ এত গম্ভীর কেন?
আভা কিছু বলার আগেই নাইমা বলে উঠল,
— তোরা একটু থামবি? ফলাফল বের হওয়ার আগেই মেয়েটাকে পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছিস!
সবাই হেসে উঠল।
আভাও চোখের কোণে হাসি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর মাঠের অন্য পাশ থেকে আরিয়ান আর ইরফানকে আসতে দেখা গেল। দুজনেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছিল।
ইরফান প্রথমে বন্ধুদের দেখতে পেয়ে বলল,
— ওই যে, আমাদের পুরো দল এক জায়গায়!
আরিয়ানও তাকাল। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য আভার ওপর গিয়ে থামল।
কয়েক দিন আগেও মেয়েটিকে স্কুলে দেখা যায়নি। সেই দিনগুলোর অস্বস্তি এখনো পুরোপুরি কাটেনি তার। আভাকে আবার বন্ধুদের মাঝে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনের ভেতর জমে থাকা অজানা স্বস্তিটা যেন একটু বেড়ে গেল।
ইরফান কাছে এসে বলল,
— কী খবর? সবাই প্রস্তুত তো?
তানু মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আমরা প্রস্তুত, কিন্তু আমাদের ফলাফল প্রস্তুত কি না সেটা জানি না।
ইরফান হেসে ফেলল।
— ফলাফল তো আর পালিয়ে যাবে না!
ইসরাত বলল,
— তোমার এত আত্মবিশ্বাস কেন? তুমি কি আগে থেকেই নিজের রেজাল্ট দেখে এসেছ?
— না। তবে পরীক্ষা ভালো দিয়েছি।
আরিয়ান এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে আভার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছিল?
আভা স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
— ভালোই।
— শুধু ভালোই?
— আর কী বলব?
ইরফান পাশ থেকে বলে উঠল,
— আরিয়ান ভাই, এত প্রশ্ন না করে নিজের রেজাল্টের চিন্তা করো। অন্যের রেজাল্ট নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোর নিজেরটা নিয়ে চিন্তা কর।
তানু হেসে বলল,
— ইরফান, আজ তুই একটু বেশি কথা বলছিস!
ইরফানও হেসে উত্তর দিল,
— ফলাফল বের হওয়ার আগে একটু কথা বলে নিই। পরে কারও মুখে কথা থাকবে কি না কে জানে!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল। শিক্ষকরা মাঠের সামনে এসে দাঁড়ালেন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের শ্রেণিকক্ষের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে বলা হলো।
আভাদের শ্রেণিশিক্ষক হাতে কয়েকটি কাগজ নিয়ে সামনে এলেন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি।
— তোমরা সবাই নিশ্চয়ই ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছ। তবে ফলাফল দেখার আগে একটা কথা বলব। সারা বছর তোমরা যে পরিশ্রম করেছ, তার ফল আজ পাবে। কারও ফলাফল খুব ভালো হবে, কারও হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে একটু কম হবে। কিন্তু মনে রাখবে, একটি পরীক্ষার ফলাফলই জীবনের শেষ কথা নয়। ভুল হলে সেটা থেকে শিখবে, আর ভালো করলে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।
সবাই মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল।
শিক্ষক এবার ফলাফলের কাগজটি হাতে তুলে বললেন,
— এখন তোমাদের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
মুহূর্তেই পুরো মাঠের পরিবেশ বদলে গেল। সবার মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
প্রথমে কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাম ডাকা হলো। কেউ ভালো ফলাফলে খুশিতে বন্ধুদের জড়িয়ে ধরল, কেউ আবার নিজের নম্বর শুনে একটু মন খারাপ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আভার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়তে লাগল।
ইসরাত তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,
— ভয় পাচ্ছিস?
আভা মাথা নেড়ে বলল,
— একটু।
— আরে, তুই এত ভালো পড়িস। তোর আবার ভয় কিসের?
নাইমা বলল,
— নম্বর ভালো হোক বা খারাপ, আমরা তো একসঙ্গেই থাকব।
তিথিও মৃদু স্বরে বলল,
— হ্যাঁ, একদম।
আভা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
এরপর শ্রেণিশিক্ষক কয়েকজনের নাম ঘোষণা করলেন। হঠাৎ তাঁর কণ্ঠে শোনা গেল,
— আভা আহমেদ!
নিজের নাম শুনে আভা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
ইসরাত উত্তেজনায় তার হাত চেপে ধরল।
— যা! তাড়াতাড়ি যা!
আভা ধীর পায়ে শিক্ষকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
শিক্ষক ফলাফলের কাগজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— অভিনন্দন, আভা। খুব ভালো ফলাফল করেছ। পুরো শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছ।
কথাটা শুনে আভা যেন কয়েক মুহূর্ত বুঝতেই পারল না শিক্ষক কী বললেন।
— জি, স্যার?
শিক্ষক আবার বললেন,
— তুমি প্রথম হয়েছ। তোমার ফলাফল সত্যিই প্রশংসনীয়। এভাবেই মনোযোগ ধরে রেখো।
আভার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দুহাত দিয়ে ফলাফলের কাগজটি গ্রহণ করল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
শিক্ষক স্নেহের সঙ্গে বললেন,
— তোমার বাবা-মাকে আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাবে।
আভা মাথা নেড়ে বন্ধুদের কাছে ফিরে এল।
ইসরাত আর তানু যেন আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।
— কী হয়েছে? কী হয়েছে? — ইসরাত এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করল।
আভা কাগজটা সামনে ধরতেই ইসরাত প্রায় চিৎকার করে উঠল,
— তুই প্রথম হয়েছিস!
তানু আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল,
— আমি জানতাম! আমি আগেই জানতাম!
নাইমা হাসিমুখে আভাকে বলল,
— অভিনন্দন, আভা। তুই সত্যিই এটা প্রাপ্য।
তিথি এগিয়ে এসে আভার হাত ধরল।
— অনেক ভালো লাগছে আমার।
আভা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— তোরা এমন করছিস কেন? এটা তো শুধু একটা ফলাফল।
ইসরাত সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— শুধু একটা ফলাফল! এই মেয়ে, তুই প্রথম হয়েছিস আর বলছিস শুধু একটা ফলাফল!
তানু বলল,
— আজকে কিন্তু তোকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে।
আভা হেসে উত্তর দিল,
— আচ্ছা, খাওয়াব।
— শুধু বললে হবে না। আমরা কিন্তু মনে রাখব।
এদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানও সব শুনেছে।
আভার প্রথম হওয়ার খবর শুনে তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে কাছে এসে বলল,
— অভিনন্দন।
আভা তার দিকে তাকাল।
— ধন্যবাদ।
— জানতাম তুমি ভালো করবে।
আভা একটু অবাক হয়ে বলল,
— কীভাবে জানলে?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— তোমাকে দেখে বোঝা যায় তুমি পড়াশোনায় কতটা মনোযোগী।
ইরফান পাশ থেকে বলল,
— বাহ! আরিয়ান ভাই তো দেখছি আগে থেকেই সব জানেন!
আরিয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল,
— তুই একটু চুপ থাকবি?
ইরফান হেসে ফেলল।
এরপর ইরফানের নাম ঘোষণা করা হলো। সেও খুব ভালো ফলাফল করেছে। নিজের নাম শুনে সে খুশিতে বন্ধুদের দিকে তাকাল।
— দেখেছিস? আমার আত্মবিশ্বাস একদম ভুল ছিল না!
আরিয়ান বলল,
— হ্যাঁ, তোর ভাগ্য ভালো ছিল।
— ভাগ্য না, পরিশ্রম!
ইসরাত বলল,
— ঠিক আছে, এবার বেশি কথা না বলে আমাদের অভিনন্দন জানাও।
ইরফান হাত তুলে বলল,
— সবাইকে অভিনন্দন। আর যারা একটু কম পেয়েছ, তাদেরও বলছি—মন খারাপ করার কিছু নেই।
এরপর আরিয়ানের ফলাফল ঘোষণা করা হলো। সেও ভালো ফলাফল করেছে। যদিও আভার মতো প্রথম হয়নি, তবুও তার ফলাফল নিয়ে শিক্ষক সন্তুষ্ট ছিলেন।
শিক্ষক বললেন,
— আরিয়ান, তোমার ফলাফল ভালো হয়েছে। তবে তুমি চাইলে আরও ভালো করতে পারতে। আগামী বছর আরও মনোযোগী হবে।
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
— জি, স্যার।
ইরফান তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
— পরের বছর কিন্তু প্রথম হতে হবে।
আরিয়ান হেসে বলল,
— আগে তুই নিজের জায়গাটা ধরে রাখ।
তাদের কথার মাঝেই ইসরাত নিজের ফলাফল হাতে নিয়ে এগিয়ে এল। তার ফলাফলও বেশ ভালো হয়েছে। তিথি আর নাইমাও নিজেদের প্রত্যাশামতো ফলাফল পেয়ে খুশি। তানুর ফলাফল একটু কম হলেও সে খুব একটা মন খারাপ করল না।
তানু কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বলল,
— যাক, অন্তত পাশ করেছি। এখন বাড়ি গিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারব।
নাইমা হেসে বলল,
— সারা বছর পড়াশোনা না করে এখন আবার ঘুমানোর কথা মনে পড়ছে?
— আরে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে দেখিস!
ইসরাত বলল,
— এই কথাটা গত বছরও বলেছিলি।
সবাই হেসে উঠল।
ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষক সবাইকে কিছুক্ষণ শ্রেণিকক্ষে থাকতে বললেন। এরপর নতুন শ্রেণিতে ওঠার বিষয়ে কয়েকটি কথা জানানো হলো।
আভা জানালার পাশের বেঞ্চে বসে ফলাফলের কাগজটি বারবার দেখছিল। নিজের নামের পাশে প্রথম লেখা দেখে তার মনটা আনন্দে ভরে উঠছিল।
কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। এই শ্রেণিকক্ষ, এই বেঞ্চ, এই বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো—সবকিছুই যেন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে।
ইসরাত পাশে বসে বলল,
— কী ভাবছিস?
— কিছু না।
— আবার সেই কিছু না! তোর এই একটা উত্তর আমার একদম ভালো লাগে না।
আভা মৃদু হেসে বলল,
— ভাবছিলাম, পরের বছর আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব তো?
নাইমা পেছন থেকে বলল,
— থাকব না কেন? আমরা তো একই স্কুলে পড়ব।
তিথি বলল,
— নতুন শ্রেণিতে উঠলেও বন্ধুত্ব তো বদলাবে না।
তানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— তবে নতুন শ্রেণিতে নতুন দুষ্টুমি শুরু হবে!
ইসরাত বলল,
— তোর দুষ্টুমি কখনো শেষ হবে না, তাই না?
— কখনোই না!
আভা তাদের কথায় হেসে ফেলল।
সেদিন স্কুল ছুটির পর সবাই একসঙ্গে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে এসে ইসরাত বলল,
— আজকে কিন্তু সবাই মিলে কোথাও বসব। এমন একটা আনন্দের দিন এভাবে শেষ হতে পারে না।
নাইমা বলল,
— কোথায় যাবি?
— মাঠের পাশের দোকানে। কিছু খাওয়া হবে।
তানু বলল,
— আমার আপত্তি নেই। তবে আভা আজকে মিষ্টি খাওয়াবে।
আভা হেসে বলল,
— আচ্ছা বাবা, খাওয়াব।
ইরফান বলল,
— তাহলে আমরাও যাচ্ছি।
ইসরাত চোখ বড় করে বলল,
— তোমাদের আবার কে ডাকল?
— আমাদের নিজেদের পা আছে। আমরা নিজেরাই চলে যেতে পারি।
তানু হেসে বলল,
— বাহ! কথাটা কিন্তু ভালো বলেছিস।
আরিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ হাঁটছিল। সে শুধু একবার আভার দিকে তাকাল। আভা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে আজ অনেক দিন পর স্বাভাবিক আনন্দের ঝিলিক।
আরিয়ান মনে মনে ভাবল, মেয়েটা যেন সব সময় এমনই হাসিখুশি থাকে।
বাড়িতে পৌঁছাতেই মাহমুদা বেগম দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
— কী রে মা, ফলাফল কী হলো?
আভা ব্যাগটা নামিয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল।
— আম্মু...
— হ্যাঁ, বল।
আভা কিছু না বলে ফলাফলের কাগজটা মায়ের হাতে তুলে দিল।
মাহমুদা বেগম কাগজের দিকে তাকালেন। প্রথমে নম্বরগুলো দেখলেন, তারপর নামের পাশে লেখা অবস্থানটি চোখে পড়তেই তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— আলহামদুলিল্লাহ! আমার মেয়ে প্রথম হয়েছে!
তিনি আনন্দে আভাকে জড়িয়ে ধরলেন।
— মা, তুই আমাকে আজ অনেক খুশি করেছিস।
আভা মায়ের বুকে মাথা রেখে মৃদু স্বরে বলল,
— তোমরা খুশি হয়েছ, এটাই আমার ভালো লাগছে।
মাহমুদা বেগম মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— তোর বাবা শুনলে যে কত খুশি হবে!
ঠিক তখনই বাইরে থেকে রাশেদ আহমেদের কণ্ঠ শোনা গেল,
— কী হয়েছে? এত আনন্দ কিসের?
মাহমুদা বেগম হাসিমুখে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
— তোমার মেয়ের কৃতিত্বের খবর শুনবে না?
রাশেদ আহমেদ ঘরে ঢুকে বললেন,
— কী হয়েছে আমার মেয়ের?
মাহমুদা বেগম ফলাফলের কাগজটা তাঁর হাতে দিলেন।
কাগজের দিকে তাকিয়ে রাশেদ আহমেদের মুখেও আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল।
— মাশাআল্লাহ! আমার মেয়ে প্রথম হয়েছে!
তিনি আভার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এদিকে আয় মা।
আভা বাবার কাছে এগিয়ে গেল। রাশেদ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— তুই জানিস, তোর এই ফলাফল দেখে আমার কত ভালো লাগছে?
আভা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— আমি চেষ্টা করেছি, আব্বু।
— আমি জানি। আর তোর চেষ্টা যে বৃথা যায়নি, সেটাই আজ প্রমাণ হলো।
মাহমুদা বেগম বললেন,
— আজ কিন্তু ওর পছন্দের খাবার রান্না হবে।
রাশেদ আহমেদ হেসে বললেন,
— শুধু খাবার? আমার মেয়ের জন্য আজকে একটা উপহারও লাগবে।
আভা তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
— না আব্বু, উপহার লাগবে না।
— কেন লাগবে না?
— তোমরা খুশি হয়েছ, এটাই যথেষ্ট।
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— সব সময় এমন কথা বলিস কেন? বাবা-মায়েরও তো ইচ্ছে করে মেয়েকে কিছু দিতে।
আভা আর কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল।
বিকেলের দিকে আভা নিজের ঘরে বসে ছিল। ফলাফলের কাগজটি টেবিলের ওপর রাখা। পাশে কয়েকটি পুরোনো খাতা। সে খাতাগুলো গুছিয়ে রাখছিল।
এমন সময় ফোনে বার্তা আসার শব্দ হলো।
আভা ফোন হাতে নিয়ে দেখল, “বন্ধুদের আড্ডাখানা” গ্রুপে নতুন বার্তা এসেছে।
ইসরাত: আজকের দিনটা আমার অনেক ভালো কেটেছে!
তানু: কারণ আভা মিষ্টি খাওয়াবে!
নাইমা: তুই কি শুধু খাওয়ার কথাই ভাবিস?
তানু: অবশ্যই। আনন্দের সঙ্গে খাবার না থাকলে আনন্দ পূর্ণ হয় নাকি?
তিথি: আজ সবাইকে একসঙ্গে দেখে ভালো লাগছিল।
ইরফান: আমাদের দলের ফলাফলও ভালো হয়েছে। এটা উদ্যাপন করা দরকার।
আরিয়ান: সবাই ভালো করেছ। আগামী বছরও যেন এমন ভালো হয়।
ইসরাত: আরিয়ান ভাই, আপনি এত গম্ভীর কেন? আজকে একটু হাসুন!
ইরফান: ওকে হাসতে বলিস না। ও হাসলে আমরা চিনতে পারব না।
তানু: হাহাহা!
আভা বার্তাগুলো পড়ে মৃদু হাসল। তারপর লিখল,
আভা: সবাই ভালো করেছ। অভিনন্দন।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের ব্যক্তিগত বার্তা এল।
আরিয়ান: বাসায় পৌঁছেছ?
আভা কয়েক মুহূর্ত ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উত্তর দিল,
আভা: হ্যাঁ।
আরিয়ান: ফলাফল নিয়ে বাসায় সবাই খুশি?
আভা: হ্যাঁ, অনেক।
আরিয়ান: ভালো। তোমার খুশি দেখে আমারও ভালো লাগছে।
বার্তাটা পড়ে আভা একটু থমকে গেল। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পর শুধু লিখল,
আভা: ধন্যবাদ।
এরপর আর কোনো বার্তা এল না।
আভা ফোনটা পাশে রেখে আবার খাতাগুলো গুছাতে শুরু করল। কিন্তু আরিয়ানের কথাটা তার মনে থেকে গেল।
সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসল। টেবিলে আভার পছন্দের কয়েকটি খাবার রাখা হয়েছে। মাহমুদা বেগম মেয়ের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বললেন,
— আজকে একটু বেশি খেতে হবে। সকাল থেকে তো চিন্তায় ঠিকমতো খাওনি।
আভা মৃদু হেসে বলল,
— আম্মু, আমি ঠিকমতোই খেয়েছি।
রাশেদ আহমেদ হেসে বললেন,
— তোমার আম্মুর কাছে তুই যতই খাস, সব সময়ই কম মনে হবে।
মাহমুদা বেগম বললেন,
— মেয়েকে নিয়ে আমার চিন্তা একটু বেশিই।
খাওয়া শেষের দিকে রাশেদ আহমেদ পানির গ্লাসটা নামিয়ে বললেন,
— আভা, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
আভা বাবার দিকে তাকাল।
— কী আব্বু?
— তোমার ফলাফল তো খুব ভালো হয়েছে। আমরা দুজনেই অনেক খুশি। তাই তোমার পড়াশোনার ব্যাপারে একটা নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আভা একটু অবাক হলো।
— কী সিদ্ধান্ত?
মাহমুদা বেগমও স্বামীর দিকে তাকালেন। মনে হলো তিনিও কথাটা শোনার অপেক্ষায় আছেন।
রাশেদ আহমেদ মৃদু হেসে বললেন,
— এখনই সব বলছি না। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তুমি জানতে পারবে।
আভা কৌতূহলী হয়ে বলল,
— আব্বু, আমাকে এখনই বলো না?
— না মা। একটু অপেক্ষা কর। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সিদ্ধান্তটা তোমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নেওয়া হয়েছে।
আভার মনে নানা প্রশ্ন জাগল।
নতুন সিদ্ধান্তটা কী হতে পারে? তার পড়াশোনা নিয়ে কি কোনো পরিকল্পনা করছেন বাবা? নাকি অন্য কিছু?
সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু মাথা নেড়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
রাত বাড়তে লাগল। জানালার বাইরে নীরব আকাশে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে। আভা পড়ার টেবিলে বসে ফলাফলের কাগজটা আবার হাতে নিল।
আজকের দিনটা তার জন্য সত্যিই বিশেষ। এত দিনের পরিশ্রমের ফল পেয়েছে সে। মা-বাবার মুখে আনন্দ দেখেছে। বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করেছে।
তবুও বাবার বলা কথাটা তার মনে ঘুরছে।
হঠাৎ ফোনে আবার বার্তার শব্দ হলো।
এবার আরিয়ানের বার্তা।
আরিয়ান: ঘুমিয়ে পড়েছ?
আভা উত্তর দিল,
আভা: না।
আরিয়ান: আজকের দিনটা মনে থাকবে, তাই না?
আভা: হ্যাঁ। অনেক দিন মনে থাকবে।
আরিয়ান: আগামী বছরও এমন ভালো ফলাফল করতে হবে।
আভা: চেষ্টা করব।
আরিয়ান: শুধু চেষ্টা না, নিজের ওপর বিশ্বাসও রাখতে হবে।
আভা বার্তাটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল,
আভা: তুমি নিজেও ভালো করে পড়বে।
আরিয়ান: অবশ্যই। তবে একটা কথা বলি?
আভা: বলো।
আরিয়ান: তুমি আবার আগের মতো স্কুলে নিয়মিত আসছ, এটা দেখে ভালো লাগছে।
আভার আঙুল ফোনের পর্দায় স্থির হয়ে গেল।
সে জানে, কিছুদিন স্কুলে না আসার কারণে সবাই চিন্তিত হয়েছিল। কিন্তু আরিয়ানের এই কথার মধ্যে যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
আভা কিছুক্ষণ পর উত্তর দিল,
আভা: এখন সব ঠিক আছে।
আরিয়ান: ভালো থেকো।
আভা: তুমিও।
কথোপকথন সেখানেই শেষ হলো।
আভা ফোনটা রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাতের নীরবতা। দূরের বাড়িগুলোর আলো একে একে নিভে যাচ্ছে।
অন্যদিকে আরিয়ানও নিজের ঘরে বসে ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিল। আভার সঙ্গে খুব বেশি কথা হয়নি, তবুও তার মনটা আজ অদ্ভুতভাবে ভালো।
সে ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার বাইরে তাকাল।
আগামী বছর নতুন শ্রেণি, নতুন বই, নতুন ব্যস্ততা। হয়তো অনেক কিছুই বদলে যাবে। কিন্তু কিছু মানুষকে কি এত সহজে ভুলে থাকা যায়?
আরিয়ান নিজের অজান্তেই মৃদু হাসল।
পরদিন সকাল।
রাশেদ আহমেদ নাশতার টেবিলে বসে একটি ফোনকল শেষ করলেন। তারপর মাহমুদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সব ব্যবস্থা মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে।
মাহমুদা বেগম একটু নিচু স্বরে বললেন,
— আভাকে কখন বলবে?
— আজ বিকেলে বলব। ওর মতামতটাও জানা দরকার।
— ও যদি রাজি না হয়?
রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— তাহলে আমরা আবার ভেবে দেখব। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে চাই না।
ঠিক তখনই আভা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
— আব্বু, কী নিয়ে কথা বলছ তোমরা?
দুজনেই একটু থেমে গেলেন।
মাহমুদা বেগম হেসে বললেন,
— তোর কথাই বলছিলাম।
আভা অবাক হয়ে বলল,
— আমার কথা?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— হ্যাঁ মা। আজ বিকেলে একটু সময় রাখিস। তোকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব।
আভা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তবে তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
সে জানত না, তার জীবনের সামনে এমন একটি সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে, যা শুধু তার পড়াশোনার পথই নয়, তার পরিচিত পরিবেশকেও বদলে দিতে পারে।
আর এই পরিবর্তনের খবর এখনো জানে না তার বন্ধুরা।
জানে না আরিয়ানও।
চলবে...