১৯তম পর্ব —
একই দিনে জন্ম, আলাদা দুটি ঠিকানা
রাতটা আভার কাছে যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না।
ফোনের স্ক্রিনে সামিরার পাঠানো শেষ মেসেজটা এখনো খোলা।
“একই দিনে জন্ম, অথচ আলাদা দুটি ঠিকানা।”
কথাটা বারবার পড়ছে আভা। তার জন্মের দিন আরেকটি শিশুর জন্ম হয়েছিল—এটা কি নিছক কাকতালীয়? নাকি সেই শিশুটির সঙ্গে সত্যিই তার জীবনের কোনো গভীর সম্পর্ক আছে?
আভা আবার সামিরাকে মেসেজ দিল।
আভা: “আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার কোনো ভাই বা বোন আছে?”
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো উত্তর এল না।
অবশেষে আভা ফোনটা পাশে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই সেই দুটি শিশুর কথা মনে পড়ছে।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল।
—আভা, ঘুমাসনি?
বাবার গলা।
—না, বাবা। আসো।
রাশেদ আহমেদ ঘরে ঢুকে মেয়ের পাশে বসলেন। আভা বুঝতে পারল, বাবা কিছু একটা বলতে এসেছেন।
—বাবা, আমার জন্মের দিন কী হয়েছিল?
প্রশ্নটা শুনে রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
আভা ফোনটা বাবার দিকে এগিয়ে দিল।
—সামিরা আন্টি আমাকে এই মেসেজ পাঠিয়েছেন।
বাবা মেসেজটা পড়ে গভীর শ্বাস ফেললেন।
—আমি ভেবেছিলাম, শুক্রবারের আগে উনি তোকে কিছু বলবেন না।
—তাহলে কথাটা সত্যি?
—তোর জন্মের দিন আরেকটি শিশুরও জন্ম হয়েছিল। এটুকু সত্যি।
আভার চোখ বড় হয়ে গেল।
—শিশুটি কে?
—সেটা এখনই বলব না।
—কেন বাবা? আমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তোর জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো তুই এখনো জানিস না। কিন্তু আমি চাই না, তুই অর্ধেক কথা শুনে ভুল কিছু বুঝে বসিস।
—তাহলে পুরোটা বলো।
—শুক্রবার সামিরার সঙ্গে দেখা হলে সবকিছু পরিষ্কার হবে। আমি তোকে কথা দিচ্ছি।
আভা বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তুমি কি আমাকে কিছু থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছ?
বাবা মৃদু স্বরে বললেন,
—না মা। বরং এত বছর ধরে তোকে সবকিছু থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছি।
কথাটা বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকালেন।
—আর একটা কথা, আভা। যা-ই জানিস না কেন, নিজের বাবা-মায়ের ভালোবাসা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলবি না।
আভা কিছু বলল না।
বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার মনে হলো, এই রহস্যের উত্তর হয়তো শুক্রবার পাওয়া যাবে। কিন্তু উত্তর পাওয়ার পর তার জীবনটা কেমন হবে, তা সে জানে না।
পরদিন সকাল।
আভা নাশতার টেবিলে এসে বসতেই মা বললেন,
—আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। তোর বাবা বাজারে যাবে। কিছু জিনিসপত্র আনতে হবে।
—কীসের জিনিস?
—ঢাকার বাসার জন্য কিছু জিনিস। আর কিছু জিনিস এখান থেকেও গুছিয়ে রাখতে হবে।
আভা চুপচাপ খেতে লাগল।
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কী হয়েছে? আবার মন খারাপ?
—মা, আমরা কি সত্যিই খুব তাড়াতাড়ি চলে যাব?
—হ্যাঁ মা। তবে সবকিছু গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে।
—আমাদের এই বাড়িটা কি আর কখনো আগের মতো থাকবে না?
মাহমুদা বেগম মেয়ের হাতের ওপর হাত রাখলেন।
—বাড়ি বদলালেই কি স্মৃতি বদলে যায়? তোর ছোটবেলার কত স্মৃতি এই বাড়িতে আছে। সেগুলো তো তোর সঙ্গেই যাবে।
আভা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তোমরা থাকলে হয়তো সব জায়গাই আমার কাছে বাড়ি।
মাহমুদা বেগম মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
—আমরা তো সব সময় তোর সঙ্গেই আছি।
দুপুরের দিকে আভা ছাদে বসে ছিল। হাতে ফোন। বন্ধুদের গ্রুপে বেশ কয়েকটি মেসেজ এসেছে।
বন্ধুদের আড্ডাখানা
ইসরাত: “সবাই আজ বিকেলে বের হব। কেউ কোনো অজুহাত দিবি না।”
তানু: “আমি রাজি। তবে খাবারের ব্যবস্থা কে করবে?”
নাইমা: “তোর মাথায় শুধু খাবারই থাকে কেন?”
তানু: “খাবার ছাড়া বন্ধুত্ব হয় নাকি?”
তিথি: “আভা আসবে তো?”
আভা: “হ্যাঁ, আসব।”
ইসরাত: “তাহলে ঠিক আছে। আরিয়ান আর ইরফানকেও জানানো হয়েছে।”
আভা মেসেজটা পড়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের ব্যক্তিগত মেসেজ এল।
আরিয়ান: “আজ দেখা হবে?”
আভা: “হ্যাঁ। সবাই আসবে।”
আরিয়ান: “তুমি ঠিক আছ তো?”
আভা কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল।
আভা: “হুম।”
আরিয়ান: “শুধু হুম বললেই তো আর সব ঠিক হয়ে যায় না।”
আভা এবার মৃদু হাসল।
আভা: “তুমি এত প্রশ্ন করো কেন?”
আরিয়ান: “কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলে মন শান্ত হয় না।”
আভা আর উত্তর দিল না।
কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়েই বসে রইল।
বিকেলে গ্রামের পরিচিত মাঠের পাশে সবাই একত্র হলো।
প্রথমে এল ইসরাত আর তানু। দুজনকে দেখেই আভা হেসে ফেলল।
তানু দূর থেকেই বলে উঠল,
—এই যে আমাদের ঢাকার ভবিষ্যৎ বাসিন্দা! কেমন আছিস?
—ভালো। তুই কেমন?
—আমি তো ভালোই। তুই চলে গেলে আমাদের কে বিরক্ত করবে, সেই চিন্তায় আছি।
ইসরাত বলল,
—তোর বিরক্ত করার জন্য তো তানুই যথেষ্ট।
তানু সঙ্গে সঙ্গে ইসরাতের দিকে তাকাল।
—আমাকে নিয়ে বেশি কথা বলবি না। আজ কিন্তু তোকে ছাড়ব না।
তাদের কথায় সবাই হেসে উঠল।
এরপর নাইমা ও তিথি এল। কিছুক্ষণ পর ইরফানও হাজির হলো।
ইরফান এসে বলল,
—কী ব্যাপার? আমাকে ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে নাকি?
ইসরাত বলল,
—হ্যাঁ। আভা ঢাকায় গেলে আমাদের কীভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত।
ইরফান হেসে বলল,
—এতে আবার সিদ্ধান্তের কী আছে? ফোন আছে, ইন্টারনেট আছে।
তানু বলল,
—সবাই তো আর তোর মতো সারাক্ষণ ফোন নিয়ে বসে থাকে না!
ইরফান হাসল।
ঠিক তখনই আরিয়ান এসে দাঁড়াল।
—কী নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছে?
তানু বলল,
—তোমাকে নিয়ে।
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
—আমাকে নিয়ে আবার কী?
ইসরাত হেসে বলল,
—সেটা জানার দরকার নেই।
সবাই মাঠের পাশের গাছটার নিচে গিয়ে বসল।
নাইমা বলল,
—আভা, ঢাকায় গিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হলে আমাদের জানাবি। আর ছুটিতে এলে কিন্তু দেখা করতে হবে।
—অবশ্যই।
তিথি একটু মন খারাপ করে বলল,
—তুই চলে গেলে আমাদের আড্ডাটা আগের মতো হবে না।
আভা তিথির হাত ধরল।
—এত মন খারাপ করিস না। তোদের সঙ্গে যোগাযোগ তো থাকবেই।
ইরফান বলল,
—আমার একটা প্রস্তাব আছে। আমরা সবাই মিলে একটা দিন ঠিক করে অনলাইনে আড্ডা দেব। মাসে অন্তত একবার।
তানু বলল,
—তুই আবার মিটিংয়ের নিয়ম বানাতে শুরু করিস না!
আবারও হাসির রোল উঠল।
কিন্তু আরিয়ান চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখ মাঝে মাঝে আভার দিকে চলে যাচ্ছিল।
একসময় সবাই ছবি তোলার জন্য দাঁড়াল। ইসরাত ফোন বের করে বলল,
—সবাই কাছে আয়। আজকের ছবিটা কিন্তু স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সবাই একসঙ্গে দাঁড়াল।
আভা মাঝখানে দাঁড়াতেই তানু তার এক পাশে এসে দাঁড়াল, অন্য পাশে নাইমা। তিথি আর ইসরাত পেছনে। ইরফান আরিয়ানকে টেনে পাশে দাঁড় করাল।
ছবি তোলা শেষ হলে ইসরাত বলল,
—এই ছবিটা গ্রুপে দেব। কেউ কিন্তু ডিলিট করবি না।
আভা ছবিটা দেখে মৃদু হাসল।
কত সহজে কিছু মুহূর্ত মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে যায়!
সন্ধ্যার আগে সবাই বাড়ি ফিরতে শুরু করল।
আভা একটু পেছনে হাঁটছিল। আরিয়ানও অন্যদের থেকে কিছুটা দূরে ছিল।
একসময় আরিয়ান বলল,
—একটু কথা বলবে?
আভা থেমে তাকাল।
—কী কথা?
—তুমি সত্যিই চলে যাচ্ছ?
—হ্যাঁ। বাবার চাকরির বদলি হয়েছে তো।
—জানি। তবুও ভাবছিলাম, হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে থেকে যাবে।
আভা মৃদু হেসে বলল,
—সবকিছু কি আমাদের ইচ্ছেমতো হয়?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—না। তবে কিছু জিনিস ধরে রাখার চেষ্টা করা যায়।
আভা তার দিকে তাকাল।
—কী ধরে রাখতে চাও?
আরিয়ান উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামল।
—এই বন্ধুত্বটা।
আভা হালকা হাসল।
—বন্ধুত্ব ধরে রাখতে আবার এত কথা বলতে হয়?
—সব বন্ধুত্ব একরকম হয় না।
আভা কিছু বলল না।
আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—ঢাকায় গিয়ে নিজেকে একা ভাববে না। কোনো সমস্যা হলে বলতে পারো।
—তুমি কি সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে?
—সব পারব না। কিন্তু অন্তত শুনতে তো পারব।
আভা এবার সত্যিকারের হাসল।
—দেখা যাবে।
দুজন পাশাপাশি কিছুটা পথ হাঁটল। তারপর আভা নিজের বাড়ির রাস্তার দিকে চলে গেল।
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, কিছু কথা বলা হয় না, তবুও সেগুলো মনের মধ্যে থেকে যায়।
রাতের খাবারের পর আভা নিজের ঘরে বসে ছিল। মা এসে বললেন,
—আভা, তোর বাবা তোকে ডাকছে।
আভা নিচে নেমে বসার ঘরে গেল।
বাবা সোফায় বসে ছিলেন। পাশে একটি পুরোনো ফাইল।
—বস মা।
আভা বাবার পাশে বসল।
রাশেদ আহমেদ ফাইলটা সামনে রেখে বললেন,
—আজ তোকে একটা জিনিস দেখাব। তবে আগে একটা কথা বল।
—কী?
—তুই কি কখনো নিজের জন্মের সময়ের কোনো ছবি দেখেছিস?
—হ্যাঁ। একটা ছবি দেখেছিলাম। তুমি আর মা আমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে।
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—ওই ছবিটা তোর জন্মের পরের দিনের। কিন্তু তার আগের কিছু ছবি আছে, যেগুলো এত দিন আমাদের কাছে রাখা ছিল।
তিনি ফাইল খুললেন।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো কাগজ আর ছবি। একটি ছবিতে হাসপাতালের বিছানায় মাহমুদা বেগম শুয়ে আছেন। পাশে ছোট্ট একটি শিশু।
আভা ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল।
—এটা তো আমি?
—হ্যাঁ।
বাবা আরেকটি ছবি বের করলেন। সেখানে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন রাশেদ আহমেদ, আর তাঁর পাশে সামিরা।
আভা ছবিটা দেখে অবাক হলো।
—সামিরা আন্টি এখানে কেন?
বাবা বললেন,
—কারণ সেই সময় উনি আমাদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন।
আভা আবার ছবির দিকে তাকাল।
—আর এই ছবিটা?
ছবির পেছনে লেখা ছিল একটি তারিখ। তার নিচে দুটি নাম।
আভা — সামিরা।
আভা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—এখানে আমার নামের পাশে সামিরা আন্টির নাম কেন?
রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—কারণ সেদিন শুধু তোর জন্ম হয়নি, আভা। সেদিন সামিরার জীবনেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার সঙ্গে তোর জীবনের সম্পর্ক জড়িয়ে গেছে।
—কী ঘটনা?
বাবা উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সামিরার নাম।
রাশেদ আহমেদ কল রিসিভ করলেন।
—হ্যালো, সামিরা।
ওপাশ থেকে সামিরার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল।
—রাশেদ ভাই, একটা সমস্যা হয়েছে।
—কী হয়েছে?
—যে পুরোনো ফাইলটা এত বছর ধরে আমার কাছে ছিল, সেটা আজ খুঁজে পাচ্ছি না।
রাশেদ আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন।
—কী বলছ? ফাইলটা কোথায় ছিল?
—আমার আলমারিতে। কিন্তু আজ দেখলাম, সেখানে নেই।
—কেউ নিয়েছে?
—আমি জানি না। তবে একটা কথা বলার আছে।
—কী কথা?
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আজ একজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে বলেছে, আভাকে যেন কোনোভাবেই শুক্রবারের আগে কিছু না জানাই।
রাশেদ আহমেদ বিস্মিত হয়ে বললেন,
—কে এসেছিল?
ওপাশ থেকে সামিরা যে নামটি বললেন, তা শুনে রাশেদ আহমেদের মুখের রং বদলে গেল।
আভা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আবারও নতুন কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কল শেষ করে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আভা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, কে এসেছিল?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকালেন।
—এমন একজন, যাকে আমি ভেবেছিলাম অনেক বছর আগে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।
আভা কিছু বলার আগেই বাবা ফাইলটা বন্ধ করে দিলেন।
আর ঠিক তখনই আভার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“শুক্রবার সামিরার সঙ্গে দেখা করতে যেও না। তোমার জানার মতো সব সত্য সে জানে না।”
আভা মেসেজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
এবার কি সত্যিই কেউ তাদের অতীতের রহস্য প্রকাশ করতে চাইছে না?
নাকি সামিরা নিজেই পুরো সত্যিটা জানেন না?
চলবে…