২০তম পর্ব —
অতীতের ছায়ায় অচেনা এক মুখ
রাত তখন প্রায় বারোটা।
ঘরের চারপাশ নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে মাঝেমধ্যে বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠছে। অথচ আভার মনের ভেতর যেন এক অদ্ভুত ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ফোনের স্ক্রিনে অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা এখনো জ্বলজ্বল করছে।
"শুক্রবার সামিরার সঙ্গে দেখা করতে যেও না। তোমার জানার মতো সব সত্য সে জানে না।"
আভা বারবার মেসেজটা পড়ছে।
কে এই মানুষটা? সামিরাকে সে কীভাবে চেনে? আর তার জন্মের দিনের সঙ্গে এমন কী ঘটনা জড়িয়ে আছে, যা এত বছর পরেও কেউ প্রকাশ করতে চাইছে না?
আভা নম্বরটিতে কল করার সিদ্ধান্ত নিল।
একবার রিং হলো।
দুবার।
তিনবার।
কেউ ফোন ধরল না।
আভা আবার কল দিল। এবার ফোন বন্ধ।
বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল সে।
ঠিক তখনই আরেকটি মেসেজ এল।
প্রেরক—সামিরা।
সামিরা: "আভা, কাল তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। সম্ভব হলে একটু সময় বের করো।"
আভা কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
আভা: "আন্টি, আজ একজন অচেনা নম্বর থেকে আমাকে মেসেজ করেছে। সে বলেছে, শুক্রবার আপনার সঙ্গে দেখা না করতে।"
মেসেজ পাঠানোর কয়েক মিনিট পর সামিরার উত্তর এল।
সামিরা: "তুমি কি নম্বরটা আমাকে দিতে পারবে?"
আভা নম্বরটা পাঠিয়ে দিল।
কিন্তু সামিরার পরের মেসেজটি পড়ে আভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সামিরা: "এই নম্বরটা তো অনেক বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা!"
আভা দ্রুত লিখল,
আভা: "আপনি কি তাকে চেনেন?"
এবার আর কোনো উত্তর এল না।
### পরদিন সকাল
ঢাকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বাড়িতে বেশ ব্যস্ততা।
বসার ঘরে কয়েকটি বড় ব্যাগ রাখা। মা কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিচ্ছেন। বাবা ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।
আভা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে মাকে জিজ্ঞেস করল,
—মা, এত কিছু গুছাচ্ছ কেন? এখনই কি সব নিয়ে যাবে?
—সব না। কিছু জিনিস আগে পাঠিয়ে দেব। বাকি জিনিসগুলো যাওয়ার দিন নিয়ে যাব।
—আমাদের কি শুক্রবারের আগেই যেতে হবে?
মাহমুদা বেগম কাপড় ভাঁজ করতে করতে বললেন,
—না মা। তোর বাবা বলেছে, কয়েকটা জরুরি কাজ শেষ করে তারপর যাব।
আভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—মা, তোমার কি এই বাড়িটা ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে না?
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—খারাপ তো লাগছেই। কত বছরের সংসার! কত স্মৃতি! কিন্তু জীবনে কখনো কখনো নতুন জায়গায় নতুন করে শুরু করতে হয়।
আভা মায়ের পাশে বসে পড়ল।
—মা, ঢাকায় গিয়ে তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?
মাহমুদা বেগম হেসে মেয়ের গাল টিপে দিলেন।
—পাগলি একটা! তোকে ছাড়া আমার দিন কাটে?
আভা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
কিন্তু তার মনে তখনো অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
### অন্যদিকে, ঢাকা
শহরের একটি অভিজাত আবাসিক এলাকার দোতলা বাড়ি।
বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী ফোনে কথা বলছে। তার পরনে হালকা নীল রঙের কামিজ। মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে এক ধরনের দৃঢ়তা।
ফোনের ওপাশ থেকে একজন বলল,
—আপু, তুমি কি সত্যিই দেশে ফিরেছ?
তরুণী হালকা হেসে বলল,
—হ্যাঁ। তবে এখনো কাউকে জানাতে চাই না।
—কিন্তু ভাইয়া তো জানে না!
—জানবে। সময় হলে সবাই জানবে।
—তুমি কি আবার সেই পুরোনো ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ শুরু করেছ?
তরুণী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
—কিছু সত্যি যতই পুরোনো হোক, একদিন না একদিন সামনে আসেই।
—তাহলে কি এবার সবকিছু বদলে যাবে?
তরুণী দূরের আকাশের দিকে তাকাল।
—হয়তো। তবে এবার আমি আর কাউকে সত্যিটা লুকাতে দেব না।
কথা শেষ করে ফোনটা রেখে দিল সে।
তারপর আলমারির ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে হাসপাতালের একটি কক্ষ। সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ।
ছবির এক পাশে ছোট্ট দুটি শিশুর বিছানা।
তরুণী ছবিটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—এত বছর পর কি আবার দেখা হবে?
### গ্রামের বাড়ি
দুপুরের খাবারের পর আভা নিজের ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ ইসরাতের ফোন এল।
—হ্যালো ম্যাডাম! কী খবর?
—এই তো। তোর কী খবর?
—আমাদের খবর তো বাদ দে। ঢাকায় গিয়ে আমাদের ভুলে যাবি না তো?
আভা হেসে বলল,
—তোদের ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ আমি না।
—দেখা যাবে। ঢাকায় গিয়ে নতুন বন্ধু পেলে তখন আমাদের চিনবি না।
—আবার শুরু করলি!
ওপাশ থেকে ইসরাত হেসে উঠল।
—আচ্ছা শোন, আজ সন্ধ্যায় সবাই মিলে ভিডিও কলে কথা বলব। তুই ফ্রি থাকিস।
—ঠিক আছে।
ফোন রাখার কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের মেসেজ এল।
আরিয়ান: "কী করছ?"
আভা: "কিছু না।"
আরিয়ান: "আজকাল তোমার কিছু না কথাটার মধ্যেও অনেক কিছু লুকানো থাকে।"
আভা: "সব কথা কি সবাইকে বলা যায়?"
আরিয়ান: "না। তবে কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে না বললেও মনের অবস্থা বোঝা যায়।"
আভা মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আরিয়ান আবার লিখল,
"তুমি কি আমার ওপর কোনো কারণে রাগ করে আছ?"
আভা: "না তো।"
আরিয়ান: "তাহলে আগের মতো কথা বলছ না কেন?"
আভা এবার উত্তর দিল,
"সবকিছু আগের মতো থাকবে না, আরিয়ান।"
মেসেজটা পাঠানোর পর আভা ফোনটা নামিয়ে রাখল।
ওপাশে আরিয়ান অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শুধু একটি কথাই লিখল,
"মানুষ বদলালেও কিছু অনুভূতি বদলায় না, আভা।"
### বিকেল — সামিরার ফোন
আভা বারান্দায় বসে ছিল। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
সামিরা কল করছেন।
আভা সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল।
—আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।
—ওয়ালাইকুম আসসালাম, মা। কেমন আছ?
—ভালো। আপনি কেমন আছেন?
—ভালো থাকার চেষ্টা করছি।
সামিরার কণ্ঠে কেমন যেন অস্থিরতা।
আভা জিজ্ঞেস করল,
—আন্টি, আপনি কি অচেনা নম্বরটা চিনেছেন?
—হ্যাঁ।
—কে সে?
সামিরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন,
—তার নাম শুনলে হয়তো তুই অবাক হবি।
—নামটা বলুন।
—এখনই না, মা।
আভা বিরক্ত হয়ে বলল,
—সবাই আমাকে একই কথা বলছেন। কেউ কিছু বলছেন না। আমি কি এতটাই ছোট যে নিজের জীবন সম্পর্কে জানার অধিকারও আমার নেই?
ওপাশে সামিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোর অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু কিছু সত্যি জানার আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়।
—আমি প্রস্তুত, আন্টি।
—তাহলে একটা কথা বল। তোর বাবা কি তোকে পুরোনো ছবিগুলো দেখিয়েছে?
—হ্যাঁ। হাসপাতালের কয়েকটা ছবি দেখিয়েছেন।
—সেখানে কি আমার ছবি ছিল?
—ছিল।
সামিরা এবার একটু থেমে বললেন,
—তাহলে বুঝতেই পারছিস, তোর জন্মের সময় আমি সেখানে ছিলাম।
—কিন্তু কেন?
সামিরা উত্তর না দিয়ে বললেন,
—শুক্রবার দেখা হলে সব বলব। তবে তার আগে একটা অনুরোধ, তোর বাবাকে বলিস না যে আমি তোকে ফোন করেছিলাম।
আভা অবাক হলো।
—কেন?
—কারণ তোর বাবা এখনো জানে না, আমি কিছু সত্যি জেনে গেছি।
কথাটা বলেই সামিরা কল কেটে দিলেন।
আভা ফোন হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল।
একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যেন দশটা নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে সে।
### সন্ধ্যা — বন্ধুদের আড্ডাখানা
সন্ধ্যায় সবাই ভিডিও কলে যুক্ত হলো।
ইসরাত, তানু, তিথি, নাইমা, ইরফান ও আরিয়ান।
তানু শুরুতেই বলে উঠল,
—এই যে ঢাকার রানী! আমাদের মনে আছে তো?
আভা হেসে বলল,
—তুই না থাকলে তো আরও শান্তিতে থাকতাম!
—এই! আমার মতো ভালো বন্ধু পেয়ে তুই ভাগ্যবতী।
নাইমা বলল,
—তোমাদের দুজনের ঝগড়া কি কোনো দিন শেষ হবে না?
ইরফান হেসে বলল,
—আমার মনে হয়, তানু একা থাকলে নিজেই নিজের সঙ্গে ঝগড়া করবে।
সবাই হেসে উঠল।
তিথি বলল,
—আচ্ছা, আভা ঢাকায় গিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হলে আমাদের কিন্তু সব জানাতে হবে।
—অবশ্যই।
ইসরাত বলল,
—আর নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবি।
তানু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—বিশেষ করে কোনো ছেলে বন্ধু হলে!
আভা চোখ বড় করে বলল,
—তানু!
আরিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার বলল,
—ওকে একটু শান্তিতে থাকতে দে।
তানু দুষ্টুমি করে বলল,
—ওহ! আভার হয়ে কথা বলার মানুষও আছে দেখছি!
ইরফান হাসতে হাসতে বলল,
—আজকের আড্ডা বেশ জমবে মনে হচ্ছে।
আভা লজ্জা পেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে দিল।
কিছুক্ষণ পর সবাই নিজেদের পড়াশোনা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলল।
কল শেষ হওয়ার আগে নাইমা বলল,
—একটা কথা মনে রাখিস, দূরত্ব বন্ধুত্ব নষ্ট করে না। যদি মানুষগুলো সত্যি হয়।
আভা মৃদু হেসে বলল,
—তোদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বও তেমনই থাকবে।
কল শেষ হলো।
কিন্তু আরিয়ানের ব্যক্তিগত মেসেজ এল কয়েক মিনিট পর।
আরিয়ান: "আজ তোমাকে একটু হাসিখুশি লাগছিল। ভালো লাগল।"
আভা: "সব সময় কি মন খারাপ করে থাকতে হবে?"
আরিয়ান: "না। তোমার হাসিটা থাকুক, এটাই চাই।"
আভা মেসেজটা পড়ে আর উত্তর দিল না।
কিছু কিছু কথা উত্তর ছাড়াই মনের মধ্যে জায়গা করে নেয়।
### রাত — পুরোনো ফাইলের রহস্য
রাত প্রায় দশটা।
রাশেদ আহমেদ নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু পুরোনো নথি দেখছিলেন।
হঠাৎ ফোনে একটি কল এল।
সামিরা।
—হ্যালো, সামিরা। কিছু জানতে পেরেছ?
—রাশেদ ভাই, আমি আজ একটা পুরোনো ডায়েরি পেয়েছি।
—কোথায়?
—আমার মায়ের আলমারিতে। এত দিন খেয়াল করিনি।
—ডায়েরিতে কী আছে?
—সেদিনের ঘটনার কিছু বিবরণ। আর একটা নাম।
রাশেদ আহমেদ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
—কোন নাম?
সামিরা নিচু স্বরে নামটি বললেন।
নামটা শুনে রাশেদ আহমেদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
—অসম্ভব! সে তো...
—হ্যাঁ, ভাই। আমিও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি।
—ডায়েরিটা তোমার কাছে নিরাপদে আছে তো?
—আছে। কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।
—আবার কী?
—ডায়েরির শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা ছেঁড়া।
রাশেদ আহমেদ কপালে হাত রাখলেন।
—এত বছর পর আবার কেন এসব সামনে আসছে?
সামিরা বললেন,
—কারণ হয়তো এবার সত্যিটা প্রকাশ হওয়ার সময় এসেছে।
ঠিক তখনই রাশেদ আহমেদের ঘরের দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
তিনি পেছনে তাকালেন।
আভা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।
—বাবা, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?
রাশেদ আহমেদ দ্রুত ফোনটা কেটে দিলেন।
—তুই এখনো ঘুমাসনি?
—না। তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
—কী কথা?
আভা বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।
—বাবা, আমার জন্মের দিন কি সত্যিই এমন কিছু হয়েছিল, যার কারণে আজও সবাই ভয় পাচ্ছে?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—ভয় পাচ্ছে কি না জানি না। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারছি, এত বছর ধরে যে সত্যিটা চাপা ছিল, সেটা আর বেশিদিন চাপা থাকবে না।
আভা বাবার হাত ধরল।
—আমি কি কোনো ভুলের ফল, বাবা?
প্রশ্নটা শুনে রাশেদ আহমেদের চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্যি, মা। পৃথিবীর কেউ যদি তোকে নিয়ে হাজারটা প্রশ্নও তোলে, তবুও তোর প্রতি আমার ভালোবাসা একটুও কমবে না।
আভা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
রাশেদ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
কিন্তু তাঁর নিজের মনেও তখন একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।
সত্যিটা জানার পর আভা কি তাঁকে আগের মতোই বিশ্বাস করতে পারবে?
### একই রাত — অচেনা এক ঠিকানা
ঢাকার সেই পুরোনো বাড়িতে আবারও আলো জ্বলছে।
নীল পোশাক পরা তরুণীটি টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে খোলা ডায়েরি।
ডায়েরির একটি পাতায় দুটি নাম লেখা।
আভা — \[অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় নাম\]
তরুণীটি নামটির ওপর আঙুল রাখল।
তারপর নিজের ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করল।
—হ্যালো।
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
—কী খবর? সব ঠিক আছে?
—না। সবকিছু আর আগের মতো নেই।
—তুমি কি মেয়েটার খোঁজ পেয়েছ?
—হ্যাঁ।
—সে কি কিছু জানে?
—এখনো পুরোটা জানে না। তবে খুব শিগগিরই জেনে যাবে।
পুরুষটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
তরুণী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—এবার আর পালিয়ে লাভ নেই। এত বছর ধরে যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, তার মুখোমুখি হতেই হবে।
কল শেষ করে সে ডায়েরিটা বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—আভা, তুই জানিস না, তোর জন্য কতগুলো জীবন অপেক্ষা করে আছে।
### পরদিনের অপেক্ষা
রাত গভীর হলো।
আভা বিছানায় শুয়ে ফোনের গ্যালারি খুলল। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবিটা সামনে এল।
ছবিটা দেখে তার মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
কিন্তু পরক্ষণেই অচেনা নম্বরটির কথা মনে পড়ল।
সে আবার নম্বরটিতে মেসেজ দিল।
আভা: "আপনি কে? আমার কাছ থেকে কী লুকাচ্ছেন?"
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
"আমি তোমার অতীতের এমন একজন মানুষ, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তোমাকে কখনো জানানো হয়নি।"
আভা দ্রুত লিখল,
"আপনি কি আমার আত্মীয়?"
উত্তর এল না।
বরং কয়েক মিনিট পর আরেকটি ছবি এল।
ছবিটা দেখে আভার হাত কেঁপে উঠল।
এটি হাসপাতালের সেই পুরোনো ছবির মতোই একটি ছবি।
ছবিতে দুটি নবজাতক শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।
ছবির নিচে লেখা—
একই দিন, একই হাসপাতাল, দুটি জন্ম।
আর ছবির একেবারে নিচে হাতে লেখা একটি বাক্য—
"একজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এক ঠিকানায়, অন্যজনকে অন্য ঠিকানায়। কিন্তু কেন, সেই উত্তর আজও অজানা।"
আভা ছবিটা বড় করে দেখল।
তারপর হঠাৎ খেয়াল করল, ছবির পেছনে একটি তারিখের পাশে ছোট্ট করে লেখা রয়েছে—
১৭ জুন।
আভা ফিসফিস করে বলল,
—তাহলে কি সত্যিই সেদিন...
কথাটা শেষ করার আগেই ফোনের স্ক্রিনে নতুন মেসেজ ভেসে উঠল।
"শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা কোরো না, আভা। তার আগেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে।"
আভা এবার আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ সে বুঝতে পারছে, কেউ একজন তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সেই মানুষটি বন্ধু, নাকি শত্রু—তা এখনো অজানা।
চলবে...