২২তম পর্ব —
হারিয়ে যাওয়া নথির সাক্ষী
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
বসার ঘরে অদ্ভুত এক নীরবতা বিরাজ করছে। রাশেদ আহমেদ সোফায় বসে আছেন। তাঁর হাতে ফোন, আর ফোনের স্ক্রিনে এখনো ডা. নাসির উদ্দিনের নম্বরটি দেখা যাচ্ছে।
আভা বাবার সামনে দাঁড়িয়ে।
—বাবা, ডাক্তার সাহেব কী বলেছেন?
রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আগামীকাল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।
—কেন?
—তোর জন্মের রাতের কিছু পুরোনো নথি তিনি খুঁজে পেয়েছেন।
—কী আছে সেই নথিতে?
—সেটা এখনো জানি না।
আভা বাবার পাশে বসে পড়ল।
—বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—বল মা।
—আমার জন্মের সময় কি সত্যিই কোনো ভুল হয়েছিল?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকালেন।
—আমি জানি না, আভা। তবে এত বছর ধরে যে ঘটনাটা আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি, সেটার মধ্যে হয়তো অনেক অজানা বিষয় লুকিয়ে আছে।
আভা আর কিছু বলল না।
রাশেদ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই চিন্তা করিস না। কাল সবকিছু জানার চেষ্টা করব।
কিন্তু তাঁর নিজের মনেও তখন ভয় কাজ করছে।
যদি সত্যিই কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভুলের পেছনে কারা জড়িত ছিল?
আর কেনই বা এত বছর ধরে সবাই চুপ ছিল?
### পরদিন সকাল — নতুন একটি ফোনকল
সকালে ঘুম থেকে উঠে আভা দেখল, বাবা ইতিমধ্যে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মা রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছেন।
আভা নিচে নেমে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, তুমি কি আজ ডাক্তার সাহেবের কাছে যাবে?
—হ্যাঁ। তুইও আমার সঙ্গে যাবি।
—মা যাবে না?
রাশেদ আহমেদ একটু থেমে বললেন,
—আজ আগে আমি আর তুই কথা বলে আসি। পরে মাকেও সব জানাব।
আভা মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই বাবার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
তিনি কল রিসিভ করলেন।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
—রাশেদ সাহেব, আমি নাসিরের সহকারী বলছি। আপনাকে একটা কথা জানানো দরকার।
—কী কথা?
—গতকাল স্যার যে নথিগুলোর কথা বলেছিলেন, সেগুলো আজ সকালে আবার পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি সমস্যা হয়েছে।
রাশেদ আহমেদ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
—কী সমস্যা?
—নথির সঙ্গে থাকা একটি পুরোনো খাম পাওয়া যাচ্ছে না।
—খামটা কোথায় ছিল?
—স্যারের ব্যক্তিগত আলমারিতে।
রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—ডাক্তার সাহেব কোথায়?
—স্যার এখন হাসপাতালে। আপনাকে দুপুরে তাঁর চেম্বারে যেতে বলেছেন।
কল শেষ করে তিনি ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
আভা সব শুনেছে।
—বাবা, আবার কিছু হারিয়ে গেল?
রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকালেন।
—হ্যাঁ। মনে হচ্ছে, কেউ চাইছে না আমরা সেই পুরোনো ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানতে পারি।
### ঢাকা — নতুন অতিথির আগমন
অন্যদিকে ঢাকার একটি বাড়িতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা।
বাড়ির কাজের মানুষজন ঘর গোছাচ্ছে। বসার ঘরে নতুন ফুল রাখা হয়েছে।
আদনান সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছিল।
হঠাৎ দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
আদনান উঠে দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
—আপু!
মেয়েটি হেসে বলল,
—কী রে! চিনতে পেরেছিস তাহলে?
আদনান তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—এত দিন পর আসছ, চিনব না কেন?
মেয়েটি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
তার নাম মেহরিন আহমেদ।
আরিয়ান ও আদনানের বড় বোন।
মেহরিন দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিল। এবার কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরেছে।
আদনান তার ব্যাগগুলো ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
—ভাইয়া তোকে দেখে অনেক খুশি হবে।
—আরিয়ান কোথায়?
—ঘুমাচ্ছে মনে হয়।
—এখনো ঘুমায়?
আদনান হেসে বলল,
—তোর ভাই এখন অনেক ব্যস্ত মানুষ।
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কী নিয়ে এত ব্যস্ত?
—সেটা তুই নিজেই জেনে নিস।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে আরিয়ান নিচে নামল।
বোনকে দেখে সে এক মুহূর্ত থমকে গেল।
—আপু!
মেহরিন হাত বাড়িয়ে বলল,
—কী রে, ছোট সাহেব! এত বড় হয়ে গেছিস?
আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরল।
—তুমি আগে বললে না যে আজ আসবে!
—বললে কি এমন চমক দিতে পারতাম?
তিন ভাইবোনের হাসি আর কথায় বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেল।
কিছুক্ষণ পর মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—আচ্ছা, তোর জীবনে নতুন কেউ এসেছে নাকি?
আরিয়ান অবাক হলো।
—মানে?
—মানে, দেশে আসার পর থেকে তোর মুখে একটা মেয়ের কথা শুনতে চাই।
আদনান পাশ থেকে বলে উঠল,
—আছে আপু! আছে!
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
—আদনান, তুই একটু চুপ থাকবি?
মেহরিন হেসে ফেলল।
—বাহ! তাহলে সত্যিই কিছু একটা আছে।
আরিয়ান আর কথা বাড়াল না।
কিন্তু মেহরিনের চোখ এড়াল না ভাইয়ের মুখের পরিবর্তন।
### দুপুর — ডা. নাসিরের চেম্বার
একটি পুরোনো হাসপাতালের ব্যক্তিগত চেম্বার।
দরজার সামনে এসে আভা বাবার সঙ্গে দাঁড়াল।
রাশেদ আহমেদ দরজায় টোকা দিলেন।
ভেতর থেকে অনুমতি পেয়ে দুজন প্রবেশ করলেন।
ডা. নাসির উদ্দিন তাঁদের দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
—আসুন, রাশেদ সাহেব। আর এই বুঝি আভা?
রাশেদ আহমেদ মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। ও সবকিছু জানতে চায়।
ডাক্তার আভার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—বসো মা।
আভা চুপচাপ বসে পড়ল।
ডা. নাসির টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন।
—তোমার জন্মের সময় আমি এই হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলাম। অনেক বছর আগের ঘটনা, তাই সবকিছু মনে রাখা সহজ নয়। কিন্তু কিছু নথি আছে, যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
আভা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
ডাক্তার ফাইল থেকে একটি কাগজ বের করলেন।
—এটা তোমার জন্মের দিনের হাসপাতালের প্রাথমিক রেজিস্টার।
আভা কাগজটির দিকে তাকাল।
সেখানে কয়েকটি নাম, সময় ও তারিখ লেখা।
ডাক্তার বললেন,
—এই রেজিস্টারে একই দিনে জন্ম নেওয়া দুটি শিশুর তথ্য আছে।
আভা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—দুটি শিশুর মধ্যে কি আমি একজন?
—হ্যাঁ।
—অন্য শিশুটি কে?
ডা. নাসির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—সেই শিশুটির পরিচয় নিয়েই সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
রাশেদ আহমেদ সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন।
—নাসির সাহেব, আপনি কি বলতে চাইছেন, হাসপাতালের রেকর্ডে কোনো ভুল হয়েছিল?
ডাক্তার মাথা নাড়লেন।
—শুধু ভুল বললে পুরো বিষয়টা বোঝানো হবে না। সেদিন রাতের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী পরে জানিয়েছিলেন, দুটি শিশুর পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
আভা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে কি আমাকে অন্য কারও সন্তান ভেবে ভুল করা হয়েছিল?
ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
তিনি আরেকটি কাগজ বের করলেন।
—এখানে দেখো, একটি শিশুর তথ্যের পাশে পরে হাতে লেখা কিছু সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু কে সংশোধন করেছিল, তার কোনো স্বাক্ষর নেই।
রাশেদ আহমেদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—এটা কীভাবে সম্ভব?
—সেটাই জানতে চাইছি। তবে মূল ফাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া যাচ্ছে না।
আভা জিজ্ঞেস করল,
—সেই অংশে কী ছিল?
ডা. নাসির বললেন,
—দুটি শিশুকে হাসপাতাল থেকে কারা নিয়ে গিয়েছিল, তার বিস্তারিত তথ্য।
কথাটা শুনে আভা আর কোনো প্রশ্ন করতে পারল না।
ঠিক তখনই ডাক্তার টেবিলের ওপর রাখা একটি ছোট কাগজ এগিয়ে দিলেন।
—এখানে একজন নার্সের নাম আছে। তিনি সেদিন রাতের দায়িত্বে ছিলেন।
রাশেদ আহমেদ কাগজটা হাতে নিলেন।
নামটি পড়েই তাঁর চোখ বড় হয়ে গেল।
ফারজানা ইয়াসমিন।
তিনি ধীরে বললেন,
—ফারজানা!
ডাক্তার মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। যতদূর জানি, তিনি এখন ঢাকাতেই থাকেন। তবে বহু বছর আগে হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
আভা বাবার দিকে তাকাল।
—বাবা, তুমি তাঁকে চেনো?
রাশেদ আহমেদ উত্তর দিলেন না।
শুধু কাগজটা শক্ত করে ধরে রইলেন।
### বিকেল — একটি অজানা পরিচয়
বাড়িতে ফিরে আভা নিজের ঘরে চলে গেল।
তার মাথায় শুধু একটি নাম ঘুরছে।
ফারজানা ইয়াসমিন।
এই নারীই হয়তো জানেন সেদিন কী ঘটেছিল।
আভা ফোন বের করে সামিরাকে কল করল।
—আন্টি, একটা কথা বলব?
—বল মা।
—আজ আমরা ডা. নাসিরের সঙ্গে দেখা করেছি।
সামিরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
—তিনি কী বলেছেন?
—সেদিনের হাসপাতালের রেজিস্টারে দুটি শিশুর তথ্য আছে। আর একজন নার্সের নাম পেয়েছি। ফারজানা ইয়াসমিন।
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।
আভা জিজ্ঞেস করল,
—আন্টি, আপনি কি তাঁকে চেনেন?
সামিরা খুব নিচু স্বরে বললেন,
—ফারজানা আপা?
—হ্যাঁ।
—তুই তাঁর নাম কোথায় পেলি?
—ডাক্তার সাহেবের কাছ থেকে।
সামিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আভা, এই নামটা আমি বহু বছর শুনিনি।
—তিনি কে?
—তিনি তোর জন্মের সময় হাসপাতালে ছিলেন। শুধু তাই নয়, সেদিনের ঘটনার অনেক কিছুই তিনি জানতেন।
আভা দ্রুত বলল,
—তাহলে তাঁর সঙ্গে দেখা করলেই তো সব জানা যাবে!
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—সমস্যা হলো, ফারজানা আপা প্রায় দশ বছর ধরে নিখোঁজ।
আভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—নিখোঁজ!
—হ্যাঁ। একদিন হঠাৎ তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কেউ তাঁর খোঁজ পায়নি।
আভা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
একজনের পর একজন মানুষ তার জীবনের রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু কেউই যেন পুরো সত্যিটা জানে না।
সন্ধ্যা — মেহরিনের সঙ্গে প্রথম কথা
আরিয়ান নিজের ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ দরজা খুলে মেহরিন প্রবেশ করল।
—কী করছিস?
—কিছু না, আপু।
মেহরিন বিছানার পাশে বসে বলল,
—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—বলো।
—তোর ফোনে যে মেয়েটার ছবি দেখলাম, সে কে?
আরিয়ান একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—কোন ছবি?
—যেটা দেখেই তুই ফোনটা লুকিয়ে ফেললি।
আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
—ওর নাম আভা।
—আভা! সুন্দর নাম।
—হুম।
মেহরিন কিছুক্ষণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
—তুই কি ওকে পছন্দ করিস?
আরিয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানি না আপু। তবে ওর মন খারাপ থাকলে আমারও ভালো লাগে না।
মেহরিন মৃদু হাসল।
—সব অনুভূতির নাম সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পাওয়া যায় না। সময় দে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
মেহরিন এবার অন্য প্রসঙ্গে বলল,
—আচ্ছা, তোর ওই আভা কি ঢাকায় আসছে?
—হ্যাঁ। ওদের পরিবারও ঢাকায় চলে আসবে।
—কোথায় থাকবে জানিস?
—এখনো ঠিক জানি না।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—ঢাকায় এলে একদিন ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসিস।
আরিয়ান হেসে বলল,
—আগে আসুক তো!
রাত — সামিরার কাছে নতুন খবর
রাত প্রায় এগারোটা।
সামিরা নিজের ঘরে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে পুরোনো একটি ছবি।
ছবিতে কয়েকজন হাসপাতালের কর্মী দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে ফারজানা ইয়াসমিনও আছেন।
সামিরা ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
তিনি কল রিসিভ করলেন।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন নারী বললেন,
—সামিরা আপা, আমাকে চিনতে পেরেছেন?
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—কে বলছেন?
—আমি ফারজানা।
সামিরার হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
—ফারজানা আপা!
—হ্যাঁ, আমি। অনেক দিন পর যোগাযোগ করলাম।
সামিরা উত্তেজিত হয়ে বললেন,
—আপনি কোথায় ছিলেন এত দিন? সবাই আপনার খোঁজ করছিল!
ফারজানা ধীর কণ্ঠে বললেন,
—সেসব কথা পরে হবে। আগে একটা জরুরি কথা বলি।
—বলুন।
—আপনার কাছে কি এখনো সেই পুরোনো ছবিগুলো আছে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে সেগুলো ভালো করে দেখে রাখবেন। কারণ সেদিনের দুটি শিশুর মধ্যে একজনের পরিচয় নিয়ে যে ভুল হয়েছিল, সেটা আমি ঠিক করেছিলাম।
সামিরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
—আপনি কী বলছেন?
ফারজানা এবার আরও নিচু স্বরে বললেন,
—কিন্তু আমি একা সিদ্ধান্ত নিইনি। আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল।
—কে বাধ্য করেছিল?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ফারজানা বললেন,
—যে মানুষটাকে আপনারা সবাই মৃত বলে জানেন।
সামিরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কী!
—হ্যাঁ, আপা। সেই মানুষটি এখনো বেঁচে আছে।
কথাটা বলেই ফারজানা কল কেটে দিলেন।
সামিরা কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কাঁপা হাতে রাশেদ আহমেদকে কল করলেন।
### শেষ দৃশ্য — ফিরে আসার কারণ
ঢাকার অন্য একটি বাড়িতে মেহরিন নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটি বাক্স খুলছিল।
বাক্সের ভেতরে কিছু ছবি, চিঠি ও কাগজপত্র।
হঠাৎ একটি খাম বেরিয়ে এল।
খামের ওপর লেখা—
রাশেদ আহমেদ।
মেহরিন খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করল।
—হ্যালো, আমি মেহরিন বলছি।
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
—জি, ম্যাডাম।
—আপনি যে ঠিকানাটা দিয়েছিলেন, সেখানে কি সত্যিই সেই মহিলা থাকেন?
—হ্যাঁ। তবে তিনি এখন কারও সঙ্গে দেখা করতে চান না।
—আমাকে একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই হবে।
—কিন্তু ম্যাডাম...
মেহরিন কথাটা শেষ করতে দিল না।
—আমি এত বছর পর দেশে ফিরেছি শুধু একটা কারণেই। এবার আর মাঝপথে থামব না।
কল শেষ করে সে খামটা আবার বাক্সে রাখল।
কিন্তু খামের ভেতর থেকে একটি ছোট্ট ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
ছবিতে দুই তরুণী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
একজন মেহরিন।
অন্যজন—আভা নয়, বরং আভার মা মাহমুদা বেগমের মতো দেখতে একজন নারী।
মেহরিন ছবিটা তুলে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
—তাহলে কি সত্যিই সেই পুরোনো সম্পর্ক আবার ফিরে আসছে?
অন্যদিকে সামিরার ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
ফারজানা ইয়াসমিনের পাঠানো শেষ বার্তা—
"সত্যিটা জানার আগে কাউকে বিশ্বাস করবেন না। বিশেষ করে সেই মানুষটিকে, যাকে আপনি এত বছর ধরে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ ভেবে এসেছেন।"
সামিরা মেসেজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
এবার তাঁর মনে একটাই প্রশ্ন।
তাহলে কি এত বছরের পরিচিত সম্পর্কের আড়ালেও লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য?
চলবে...