২৪তম পর্ব —
নতুন শহরে পুরোনো রহস্যের ছায়া
সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করছে।
আভার ঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে গোছানো-অগোছানো কিছু ব্যাগ। এক পাশে বইয়ের স্তূপ, অন্য পাশে কাপড়চোপড়। টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ফুলদানিটাও আজ যেন অন্য রকম লাগছে।
আজ তাদের ঢাকায় যাওয়ার দিন।
চট্টগ্রামের এই বাড়িটাতে কাটানো এতগুলো বছরের স্মৃতি ছেড়ে যেতে আভার খুব একটা ভালো লাগছে না। পরিচিত রাস্তা, বিকেলের বারান্দা, নিজের ঘরের জানালা—সবকিছু ছেড়ে নতুন একটা শহরে যেতে হচ্ছে।
আভা শেষবারের মতো জানালার বাইরে তাকাল।
পেছন থেকে মাহমুদা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এল।
— কী রে মা, এখনো তৈরি হসনি?
আভা ফিরে তাকাল।
— হচ্ছি মা।
— তাড়াতাড়ি কর। তোর বাবা নিচে সবকিছু গাড়িতে তুলে ফেলেছে।
আভা ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,
— মা, আমাদের কি সত্যিই এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে?
মাহমুদা মেয়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন।
— কেন? ঢাকায় যেতে তোর ভালো লাগছে না?
— তা না। কিন্তু এই বাড়িটা ছেড়ে যেতে কেমন যেন লাগছে।
মাহমুদা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
— মানুষ জায়গা বদলায়, মা। কিন্তু নিজের মানুষগুলো পাশে থাকলে নতুন জায়গাটাও একসময় আপন হয়ে যায়।
আভা মৃদু হাসল।
কিন্তু মাহমুদার মনে তখন অন্য চিন্তা।
ঢাকা শুধু তাদের নতুন ঠিকানা নয়। এই শহরের বুকেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলো থেকে পালিয়ে থাকার চেষ্টা তিনি বছরের পর বছর করেছেন।
আর এবার সেই স্মৃতিগুলোর মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।
---
সকাল সাড়ে দশটা।
গাড়ি চট্টগ্রামের পরিচিত রাস্তা পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
পেছনের সিটে বসে আভা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। কানে হেডফোন থাকলেও কোনো গান চলছে না।
রাশেদ আহমেদ গাড়ি চালাতে চালাতে আয়নায় মেয়ের দিকে তাকালেন।
— কী হয়েছে মা? এত চুপচাপ কেন?
— কিছু না বাবা।
— ঢাকায় গিয়ে কিন্তু নতুন বন্ধু বানাতে হবে। সারাক্ষণ নিজের মধ্যে থাকলে চলবে না।
আভা হালকা হেসে বলল,
— চেষ্টা করব।
মাহমুদা পাশ থেকে বললেন,
— ওকে একটু সময় দাও। নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে সময় লাগবে।
রাশেদ আর কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর তাঁর ফোনে একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর।
“ঢাকায় পৌঁছানোর পর পুরোনো ঠিকানায় একবার যাবেন। ১৭ জুনের সত্যিটা এখনো সেখানে অপেক্ষা করছে।”
রাশেদের হাত শক্ত হয়ে গেল।
তিনি দ্রুত ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু তাঁর চোখের সেই পরিবর্তন মাহমুদার নজর এড়াল না।
— কী হয়েছে?
— কিছু না।
— আবার কে মেসেজ দিল?
রাশেদ এবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
— মাহমুদা, ঢাকায় গিয়ে একটা কথা মনে রাখবে। আভাকে কোনোভাবেই একা কোথাও যেতে দেবে না।
মাহমুদা অবাক হলেন।
— হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন?
— বললাম, মনে রেখো।
মাহমুদা আর প্রশ্ন করলেন না।
তবে তাঁর বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় জমতে শুরু করল।
---
অন্যদিকে, ঢাকার একটি বাড়ি।
মেহরিন আহমেদ নিজের ঘরে বসে পুরোনো ছবিটা দেখছিলেন।
সামনে রাখা ডায়েরির পাতাগুলো কয়েকবার উল্টেপাল্টে দেখলেন তিনি।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
— আপু, আসব?
— আয়।
আরিয়ান ঘরে ঢুকল।
— কী করছ?
— কিছু না। পুরোনো কিছু জিনিস দেখছিলাম।
আরিয়ান টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে তাকাল।
— এটা কার ছবি?
মেহরিন দ্রুত ছবিটা উল্টে রাখলেন।
— পুরোনো পরিচিত কয়েকজনের।
— তোমার কাছে এখনো এত পুরোনো ছবি আছে!
— কিছু ছবি ফেলে দেওয়া যায় না, আরিয়ান।
আরিয়ান চেয়ার টেনে বসল।
— আচ্ছা আপু, তোমাকে একটা কথা বলব?
— বল।
— আজ বিকেলে আমার একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা আছে। চাইলে তোমাকেও নিয়ে যেতে পারি।
মেহরিন মৃদু হেসে বললেন,
— বন্ধুটি কি সেই আভা?
আরিয়ান একটু থমকে গেল।
— হ্যাঁ। ওর পরিবারও আজ ঢাকায় আসছে।
মেহরিনের মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
— আজই?
— হ্যাঁ। কেন?
— না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
আরিয়ান কিছুক্ষণ বোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
— আপু, তুমি কি আভাকে আগে থেকে চেনো?
মেহরিন এবার চোখ নামিয়ে বললেন,
— না। তবে নামটা শুনে মনে হচ্ছে, মেয়েটার সঙ্গে আমার একদিন দেখা হওয়া দরকার।
আরিয়ান হেসে উঠল।
— তাহলে আজই পরিচয় করিয়ে দেব।
মেহরিন কোনো উত্তর দিলেন না।
মনে মনে শুধু একটি কথাই বললেন,
'যে মেয়েটাকে দেখার অপেক্ষায় এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম, সে কি জানে তার জীবনের সঙ্গে আমার কতটা সম্পর্ক জড়িয়ে আছে?'
---
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
অবশেষে গাড়ি ঢাকার নির্দিষ্ট এলাকায় এসে থামল।
নতুন বাড়িটা তিনতলা। সামনের দিকে ছোট্ট বাগান, গেটের পাশে কয়েকটি গাছ। চারপাশে বেশ শান্ত পরিবেশ।
আভা গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে তাকাল।
— বাবা, এটাই আমাদের নতুন বাড়ি?
রাশেদ হেসে বললেন,
— হ্যাঁ মা। কেমন লাগছে?
— সুন্দর।
মাহমুদা ব্যাগ হাতে এগিয়ে এলেন।
— আগে ভেতরে চল। তারপর সব দেখিস।
আভা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
দোতলার একটি ঘর তার জন্য ঠিক করা হয়েছে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল বড় জানালাটার দিকে।
জানালার বাইরে বেশ কিছু গাছ দেখা যাচ্ছে। দূরে কয়েকটি বাড়ি।
আভা ব্যাগটা বিছানায় রেখে জানালার পাশে দাঁড়াল।
নতুন শহর।
নতুন ঘর।
নতুন পরিবেশ।
কিন্তু তার জীবনের পুরোনো প্রশ্নগুলো এখনো একই জায়গায় রয়ে গেছে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
আরিয়ান কল করেছে।
আভা ফোন রিসিভ করল।
— হ্যালো।
— ঢাকায় পৌঁছেছ?
— হ্যাঁ, একটু আগেই।
— বাড়ি কেমন লাগল?
— ভালোই। তবে এখনো সবকিছু গুছানো হয়নি।
— বিশ্রাম নাও। অনেকটা পথ এসেছ।
— হুম।
— আচ্ছা, আজ বিকেলে সময় হবে?
— কেন?
— আপুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব বলেছিলাম না?
আভা একটু হেসে বলল,
— তোমার আপু কি এতটাই আগ্রহী আমাকে দেখার জন্য?
আরিয়ান মজা করে বলল,
— মনে হচ্ছে তোর চেয়েও বেশি!
আভা হেসে ফেলল।
— আচ্ছা, দেখা যাবে।
— তাহলে বিকেলে জানাব।
কল কেটে গেল।
আভা ফোনটা বিছানায় রেখে দিল।
অথচ সে জানে না, এই পরিচয়টা তার জীবনের কত বড় একটা অধ্যায়ের দরজা খুলে দিতে যাচ্ছে।
---
বিকেল পাঁচটা।
আভা গোসল করে হালকা নীল রঙের একটি সালোয়ার-কামিজ পরেছে। চুলগুলো খোলা। নতুন বাড়িতে আসার ক্লান্তি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
মাহমুদা ঘরে এসে বললেন,
— মা, তোর বাবা নিচে ডাকছে।
— কেন?
— কয়েকটা জিনিস কিনতে যাবে। তুই যাবি?
আভা মাথা নাড়ল।
— না মা। আজ আর বের হতে ইচ্ছা করছে না।
মাহমুদা মেয়ের পাশে বসে বললেন,
— ঠিক আছে। তবে বেশি রাত জাগিস না।
তিনি চলে যেতেই আভার ফোনে মেসেজ এল।
আরিয়ান: তৈরি আছ?
আভা: কোথাও যাওয়ার কথা তো বলিনি!
আরিয়ান: তোমাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছি না। আমরা আসছি।
আভা: আমরা মানে?
আরিয়ান: আমি আর আপু।
আভা মেসেজটা পড়ে অবাক হলো।
আভা: এখনই?
আরিয়ান: হ্যাঁ। আপু আর অপেক্ষা করতে রাজি না।
আভা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচে গিয়ে মাকে বিষয়টা জানাল।
---
কিছুক্ষণ পর বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল।
রাশেদ দরজা খুলতে গেলেন।
দরজা খুলেই তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। পাশে একজন তরুণী।
— আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।
রাশেদ কিছুক্ষণ আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলেন।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। এসো বাবা, ভেতরে এসো।
আরিয়ান পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে ইশারা করল।
— আঙ্কেল, আমার বড় বোন। মেহরিন আহমেদ।
মেহরিন সামনে এগিয়ে এলেন।
— আসসালামু আলাইকুম।
রাশেদ উত্তর দিলেন।
কিন্তু মেহরিনের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে যে বিস্ময় ফুটে উঠল, সেটা তিনি দ্রুত আড়াল করার চেষ্টা করলেন।
মেহরিনও তাঁকে দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— কেমন আছেন, রাশেদ ভাই?
রাশেদ একটু থমকে গেলেন।
— ভালো। তুমি কবে এলে?
আরিয়ান অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকাল।
— তোমরা কি আগে থেকেই পরিচিত?
মেহরিন মৃদু হাসলেন।
— অনেক বছর আগের পরিচয়।
রাশেদ দ্রুত বললেন,
— তোমরা বসো। আমি মাহমুদাকে ডাকছি।
তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
মেহরিন সোফায় বসে চারপাশে তাকালেন।
কিছুক্ষণ পর আভা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল।
আরিয়ান তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।
— এই যে, আমাদের নতুন ঢাকাবাসী!
আভা হালকা হেসে বলল,
— এত জোরে বলার কী আছে?
আরিয়ান তার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপু, এই হলো আভা।
মেহরিন উঠে দাঁড়ালেন।
আভার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
এই মেয়েটির মুখে তিনি যেন বহু পুরোনো একটি পরিচিত মুখের ছায়া খুঁজে পেলেন।
মেহরিন ধীরে বললেন,
— তুমি আভা?
— জি।
— তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগল।
আভা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আপনাকেও।
মেহরিন মেয়েটির মাথায় হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেলেন।
কেন জানি তাঁর বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছিল।
এই মেয়েটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী, সেটা আভা জানে না।
হয়তো জানার পর এই হাসিটা আর আগের মতো থাকবে না।
---
চারজন বসে গল্প করছিল।
মাহমুদা চা-নাশতা নিয়ে এলেন।
মেহরিনের সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতেই দুজনেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।
মাহমুদা প্রথমে কথা বললেন।
— কেমন আছো, মেহরিন?
— ভালো আছি, ভাবি। আপনি কেমন আছেন?
— আলহামদুলিল্লাহ।
আভা মায়ের দিকে তাকাল।
— মা, তোমরাও কি আগে থেকে চেনো?
মাহমুদা একটু হেসে বললেন,
— হ্যাঁ মা। অনেক বছর আগের পরিচয়।
আভা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিন্তু আরিয়ানের কৌতূহল বাড়তে লাগল।
— আপু, তুমি আগে বলোনি যে আঙ্কেল-আন্টিকে চেনো!
মেহরিন চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বললেন,
— সব পরিচয়ের গল্প কি আর সবসময় বলা যায়?
কথাটা শুনে রাশেদের হাতের কাপটা থেমে গেল।
আভা এবার মেহরিনের দিকে তাকাল।
— আপু, আপনি কি আগে চট্টগ্রামে থাকতেন?
মেহরিন মৃদু হেসে বললেন,
— না। তবে তোমার জন্মের সময় আমি চট্টগ্রামে ছিলাম।
আভার চোখ বড় হয়ে গেল।
— আমার জন্মের সময়?
মাহমুদা তাড়াতাড়ি বললেন,
— আচ্ছা, তোমরা গল্প করো। আমি একটু রান্নাঘর থেকে আসছি।
মেহরিন এবার আভার দিকে তাকালেন।
— হ্যাঁ। তোমার জন্মের সময়ের কিছু স্মৃতি আমার মনে আছে।
আভা আগ্রহ নিয়ে বলল,
— সত্যি? কী স্মৃতি?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— সেদিন হাসপাতালটায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল।
আভা অবাক হয়ে বলল,
— আপনি সেদিন হাসপাতালে ছিলেন?
মেহরিন উত্তর দেওয়ার আগেই রাশেদ বলে উঠলেন,
— মেহরিন, তোমার নিশ্চয়ই অনেক কাজ আছে। আরিয়ান, তোমরা এবার ওঠো।
ঘরের পরিবেশটা হঠাৎ বদলে গেল।
আরিয়ান অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
— আঙ্কেল, আমরা তো একটু আগেই এলাম!
— আজ আরেকদিন এসো বাবা।
মেহরিন বুঝতে পারলেন, রাশেদ আর কোনো কথা বলতে দিতে চাইছেন না।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
আভার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আবার দেখা হবে, আভা।
আভা মৃদু হেসে বলল,
— অবশ্যই আপু।
কিন্তু মেহরিন দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেলেন।
পেছনে ফিরে একবার আভার দিকে তাকালেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
— একটা কথা মনে রেখো, মা। সব সত্যি জানার পরও কখনো কখনো কিছু মানুষকে নতুন করে চিনতে হয়।
আভা কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।
---
রাত সাড়ে দশটা।
আরিয়ান নিজের ঘরে বসে ফোন দেখছিল।
আভার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু বিকেলের ঘটনাগুলো মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
বিশেষ করে মেহরিন আর আভার পরিবারের পুরোনো পরিচয়ের বিষয়টা।
সে বোনের ঘরে গেল।
— আপু, ঘুমাওনি?
মেহরিন ডায়েরি বন্ধ করে তাকালেন।
— না। কিছু বলবি?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— আঙ্কেল-আন্টিকে তুমি আগে থেকে চেনো, তাই না?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— হ্যাঁ।
— কীভাবে?
— অনেক পুরোনো একটা ঘটনার কারণে।
— কী ঘটনা?
মেহরিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আরিয়ান, সব প্রশ্নের উত্তর সবসময় সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোমরা সবাই একই কথা বলো কেন?
মেহরিন হেসে ফেললেন।
— কে কে বলে?
— আভা, ওর বাবা-মা, এখন তুমিও!
মেহরিনের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
— আভার বাবা-মা কি ওকে কিছু বলেছে?
— জানি না। তবে মেয়েটাকে দেখে মনে হয়, ওর মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।
মেহরিন ধীরে বললেন,
— ওর প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিন ও নিজেই খুঁজে পাবে।
আরিয়ান আর কিছু না বলে চলে গেল।
মেহরিন আবার ডায়েরিটা খুললেন।
শেষ পাতার নিচে নতুন করে একটি লাইন লিখলেন।
“আজ অবশেষে আভাকে দেখলাম। মেয়েটা জানেই না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা আমার কাছেই লুকানো।”
---
একই রাত, অন্য একটি ঘর।
রাশেদ আহমেদ ঘরের দরজা বন্ধ করে ফোন হাতে নিলেন।
সামিরাকে কল করলেন।
— হ্যালো, সামিরা?
— বলো।
— আজ মেহরিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সামিরা বললেন,
— আভাকে দেখেছে?
— হ্যাঁ।
— কিছু বলেছে?
— ১৭ জুনের কথা তুলেছিল। আভার সামনে।
সামিরার গলা কেঁপে উঠল।
— রাশেদ, আমি আর পারছি না। কত বছর এভাবে লুকিয়ে রাখব?
রাশেদ জানালার বাইরে তাকালেন।
— এখন সত্যিটা প্রকাশ করলে শুধু আভা নয়, আরও অনেক মানুষ ভেঙে পড়বে।
— আর যদি দেরি করতে করতে সবকিছু আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়?
রাশেদ কোনো উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই তাঁর ফোনে আরেকটি কল এল।
সেই অপরিচিত নম্বর।
তিনি সামিরাকে বললেন,
— পরে কথা বলছি।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
— কেমন আছেন, রাশেদ সাহেব?
রাশেদ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
— আপনি আবার ফোন করেছেন কেন?
— কারণ আপনারা এখনো বুঝতে পারছেন না, সময় শেষ হয়ে আসছে।
— কী চান আপনি?
লোকটি হালকা হেসে বলল,
— আমি কিছু চাই না। শুধু চাই, আভা যেন নিজের পরিচয়টা নিজেই জানতে পারে।
রাশেদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— আপনি আভার কাছ থেকে দূরে থাকবেন।
— সেটা কি আপনার সিদ্ধান্তে হবে?
— আমি পুলিশে জানাব!
ওপাশ থেকে শান্ত গলায় উত্তর এল,
— তার আগে নিজের কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন। ১৭ জুন রাতে হাসপাতালে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর মধ্যে আসলে কাকে আপনি নিজের কাছে রেখেছিলেন?
রাশেদ নির্বাক হয়ে গেলেন।
লোকটি আবার বলল,
— আর কাকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলেন?
কলটা কেটে গেল।
রাশেদ ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই রাতের স্মৃতি।
হাসপাতালের করিডোর।
একটি বন্ধ দরজা।
দুটি শিশুর কান্না।
আর এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার মূল্য এখনো সবাইকে দিতে হচ্ছে।
---
রাত বারোটা।
আভা বিছানায় শুয়ে ফোন দেখছিল।
আরিয়ানের মেসেজ এল।
আরিয়ান: আজকের দিনটা কেমন কাটল?
আভা: ভালোই। তবে একটা ব্যাপার বুঝলাম না।
আরিয়ান: কী?
আভা: তোমার আপু আর আমার বাবা-মা আগে থেকেই পরিচিত। অথচ কেউ কিছু পরিষ্কার করে বলল না।
আরিয়ান: আমিও বুঝতে পারছি না। আপুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু বলেনি।
আভা: অদ্ভুত না?
আরিয়ান: খুব।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ এল।
আরিয়ান: একটা কথা বলব?
আভা: বলো।
আরিয়ান: নতুন শহরে এসে যদি কখনো নিজেকে একা মনে হয়, আমাকে জানাবে।
আভা কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
আভা: তুমি কি সবার জন্য এত চিন্তা করো?
আরিয়ান: না।
আভা: তাহলে?
আরিয়ান: কিছু মানুষ থাকে, যাদের ভালো থাকার খবরটা না জানলে নিজের দিনটাও ঠিকমতো কাটে না।
আভা মেসেজটা পড়ে চুপ করে গেল।
তারপর খুব ছোট্ট করে লিখল,
আভা: ঘুমাও এবার। অনেক রাত হয়েছে।
আরিয়ান: শুভরাত্রি, আভা।
আভা ফোনটা পাশে রেখে দিল।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই জমে আছে অজস্র প্রশ্ন।
---
অন্যদিকে, মেহরিনের ঘর।
তিনি আলমারি খুলে ভেতর থেকে একটি ছোট্ট বাক্স বের করলেন।
বাক্সের ভেতরে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র, একটি ছবি এবং শিশুর হাতে পরানোর ছোট্ট একটি ব্রেসলেট রাখা।
ব্রেসলেটটার গায়ে খোদাই করা—
১৭ জুন।
মেহরিন সেটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করলেন।
— হ্যালো, ফারজানা?
ওপাশ থেকে দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এল।
— মেহরিন আপা?
— তুমি কোথায় আছ?
— নিরাপদ জায়গায় আছি। কিন্তু বেশিদিন এভাবে থাকা সম্ভব নয়।
মেহরিন চোখ বন্ধ করলেন।
— তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।
— বলুন।
— আভা কি সত্যিই সবকিছু থেকে অন্ধকারে আছে?
ফারজানা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— আভা শুধু নিজের জন্মের সত্যিটাই জানে না, আপা। সে এটাও জানে না, তার জন্মের রাতেই আরেকটি শিশুর ভাগ্য বদলে দেওয়া হয়েছিল।
মেহরিনের হাত থেকে ব্রেসলেটটা টেবিলে পড়ে গেল।
— আর সেই শিশুটি?
ফারজানা নিচু গলায় বললেন,
— সেই শিশুটির পরিচয় জানার পর হয়তো আভা আর কাউকে আগের মতো দেখতে পারবে না।
মেহরিনের চোখে পানি জমল।
— ফারজানা, আর কতদিন?
— খুব বেশি নয়, আপা। এবার সত্যিটা প্রকাশ করতেই হবে।
কল কেটে গেল।
মেহরিন ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাইরে তখন রাত আরও গভীর।
একই শহরে পাশাপাশি দুটি বাড়িতে ঘুমিয়ে আছে দুই তরুণ-তরুণী—আভা আর আরিয়ান।
তারা কেউই জানে না, তাদের পরিবারের অতীতের সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক জড়িয়ে আছে, যা সামনে এলে শুধু তাদের পরিচিত পৃথিবীটাই বদলে যাবে না, বদলে যেতে পারে তাদের একে অপরকে দেখার দৃষ্টিও।
কারণ কিছু সত্যি মানুষকে শুধু অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় না, কখনো কখনো সেই সত্যিই সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে অপরিচিত করে তোলে।
চলবে...