#প্রেমের_বাজিমাত
#লেখনিতে_রোজ_ও_রুশা
#পাঠ_৫
❌ কপি করা নিষেধ ❌
>>>>>>
"মদ খেলে হয় চোখ লাল, কিস খেলে হয় ঠোঁট লাল, কট খেলে পিঠ লাল, প্রেম করলে মন লাল—এখন বল তুই কি খাইলি? সৃজন ঠোঁট লাল করেছে, তুই কি করলি? বলে ফেল ফটাফট, এমন ডং না করে!"
নাভান-এর কথায় গেয়ে উঠে অধীর।
""সকালে ইজ্জত খাওয়া মেয়েকে দেখি, বিকেলে ও তাকে দেখি, হলো রে হলো, একি রাতে ও শোনো মেয়ে জেনে নিও তোমাকে দেখি, মান-সম্মান খাইছে রে আমার মানসম্মান খাইছে, ৭২ লাখ দেখে আমাকে কলঙ্কিত করেছে!"
এক মনে গান গেয়ে যাচ্ছে, দুই দিন ধরে একই গান গাইছে অধীর।
নাভান আর সৃজন বুঝতে বাকি নেই অধীরের সাথে কী হয়েছে। গত দুই দিন ধরে অধীরকে চুপচাপ থাকতে দেখে নাভান কথাটা বলে।
দুই দিন ক্যাম্পাস অফ থাকায় বাসায় সময় কাটাচ্ছে অধীর। সে বাইরে বের হচ্ছে না তার মানসম্মানের ভয়ে, যদি ওই মেয়ে সবাইকে বলে দেয় অধীরের কথা, তখন সে মুখ কিভাবে দেখাবে? আচ্ছা মেয়েটা কি তাকে খচ্চর লোক বলবে? এসব ভেবে বেচারার অবস্থা কাহিল।
এমন অনেক কাহিনি আছে যা আমরা বন্ধুদের সাথে বলে থাকি। ব্যাপারটা কার কাছে কেমন জানি না, কিন্তু আমার মতে ছেলে-মেয়ে ক্লোজ বন্ধু থাকলে এর থেকেও গভীর কথা বলে ফেলি আমরা! (একান্তই আমার মতামত)
নাভান ডেম কেয়ার ভাব নিয়ে বলে—
"কাল থেকে ওই দুই মেয়েকে খুঁজে বের করবি। আর বিবাহিত না হলে চান্স নিবি। নিজেদের মানসম্মান তো বাঁচবে এতে, তা না হলে ভবিষ্যৎ বউকে কী বলবি? আমার ঠোঁট ধর্ষণ হইছে আর আমার সম্মান দেখে নিয়েছে!"
অধীর লাফ দিয়ে উঠে বলে—
"না না না! ওই মেয়ে সামনে আসলে লজ্জায় মরে যাব। শালি ইজ্জত খাওয়া মহিলা, আমার ইজ্জত খাইয়া দিছে!"
কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলতেই সৃজন বলে উঠে—
"সালা, তুই কোন সুখে দুই দিন ধরে গান গাইতেছিস তাহলে? আবার মেয়ে মানুষের মতো নেকা ভাব ধরছিস!"
"ভাই, অতি শোকে বাপ্পারাজের মতো পাথর হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেমনে জানি দিলদারের মতো কমেডিয়ান হয়ে গেলাম!"
অধীরের কথা শুনে সৃজন না চাইতেও হেসে ফেলে।
এদিকে দুই বান্ধবী ওই কাণ্ডকারখানার কথা শুনে হেরা ঠান্ডায় আইস ব্যাগ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। ১০ মিনিট পাশে ছিল না আর দুইটা এমন কাজ করছে যা সমাজে গ্রহণযোগ্য না। হেরার চিন্তিত মুখ দেখে রুশা বলে—
"আমার কী হবে রে হেরা পাখি? সিনারি দেখার অপরাধে কি আমার জেল টেল হবে?"
"শালি! তোর না সিনারি দেখার শখ? এবার মিটেছে শখ?"
"আরে ওইরকম দেখি নাই তো!"
রুশার কথায় হেরা কটমট করে বলে।
"ও আরও দেখার ইচ্ছে ছিল মনে হয়?"
রোজ রুশার পেছনে বলে উঠে।
"একটু দেখে ১ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিল, আর পুরোটা দেখলে ১ দিন থাকত! শালি, তোর জন্য আমার এমন সর্বনাশ হয়ে গেল? তখন না চিল্লালে যেতাম না আর ওই কানা লোকটার সাথে ধাক্কা খেতাম না। বেটা উঠে তো দৌড়! একটা থাপ্পড়ও মারার চান্স দেয় নাই!"
কথাটা খুব আফসোসের সাথে বলে রোজ। রোজও বোঝে এটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। আমাদের বাস্তব জীবনে এমন অনেক কিছুই হয় রাস্তা-ঘাটে, যা একটা মেয়ের জন্য খুব খারাপ কিছু। অনেক সময় আমাদের হাতে কিছু করার থাকে না। ঢাকা শহরে বাসে আর ট্রেনে এমন কাহিনি অহরহ দেখা যায়—মেয়েদের গায়ের ওপর পুরুষরা পড়ে যায়, কখনো ইচ্ছাকৃত, কখনো ভিড়ের কারণে। আসলে মেয়েরা কোথায় সেভ? বাসায়? বাইরে? কোথাও না—আমার মতে। তাই মেয়েদের বলছি, নিজেদের কঠিনভাবে গড়ে তোলো যাতে কোনো ছোট বিষয় তোমাকে ভেঙে দিতে না পারে। সাবধানতার সাথে চলাফেরা করবে।
(ছোট্ট মেসেজ মেয়েদের জন্য ছিল এটা)
শীতের সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকা সাধারণত ঘন কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস এবং শিশিরে ভেজা সবুজ ক্যাম্পাস নিয়ে এক শান্ত ও মনোরম পরিবেশ তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতিতে নোট-বই নিয়ে ব্যস্ত থাকে, টিএসসি থেকে শুরু করে করিডোরগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, আর প্রকৃতিতে এক ভিন্ন স্নিগ্ধতা বিরাজ করে যা শীতের সকালকে বিশেষ করে তোলে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় ক্যাম্পাস, যা এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেমিস্টার ফাইনালের চাপ থাকায় ভোরের ঠান্ডা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা হাতে বই-নোট নিয়ে ক্লাস ও লাইব্রেরির দিকে ছুটে চলে। হেরা, রোজ ও রুশা তিনজন ক্যাম্পাসে ঢুকতেই নিলয়ের ফোন আসে।
"হেরা ফুল, কেমন আছো?"
মেয়েটাও মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে—
"জি আলহামদুলিল্লাহ!"
নিলয়ের এমন মধুর ডাকে হেরা হাসে।
"আজ আমার আসতে একটু লেট হবে।"
(নিলয়)
"কেন?" (হেরা)
"আমার একটু কাজ আছে।"
"ও আচ্ছা।"
চুপ রইলো নিলয় ও হেরা।
....
"হেরা, তুমি আমাকে মিস করবে না?"
উত্তরে কিছুই বললো না। সে মিস করবে? মেকি হাসি দিয়ে বলে—
"ফ্রেন্ডকে তো মিস করাই যায়!"
"পুট পুট পুট" শব্দে কলটা কেটে যায়। ফ্রেন্ড—এই শব্দটা নিলয়ের কাছে এখন অসহ্য লাগে। আচ্ছা মেয়েটা এমন কেন? সে কত কিছু বোঝাতে চায়, কিন্তু ওই মেয়ে বোঝতে চায় না। সে কি দেখতে খারাপ? মেয়েরা পাগল তার জন্য, আর এই মেয়ে ভালো করে তাকায়ও না। কল কেটে ছোট করে একটা মেসেজ দেয়—
"নেটওয়ার্ক সমস্যা"
হেরা মুচকি হেসে ফোন ব্যাগে রাখে।
ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে হেরা, রোজ ও রুশা। অনেকেই আছে আড্ডায়।
__
বাইক থামিয়ে হেরাদের ক্লাসরুমে যায় নাভান। অধীর, ঝিনুক, সৃজন তার পিছু পিছু আসে। রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে, মনে হচ্ছে এখনই সব ধ্বংস করে দেবে।
সব জায়গায় খুঁজে অবশেষে একটা মেয়ের দেখানো মেয়েটাকে পিছন থেকে হাতে টেনে নিজের দিকে ঘুরায় নাভান। এই ঘুরানোটাই বোধহয় তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকে নাভান। তারপর চোখ বন্ধ করে আবার খোলে। সবাই নাভানের চোখ দেখে আতকে উঠে। ভয়ংকর সুন্দর পুরুষটাকে সত্যিই ভয়ংকর রাগী লাগছে, যা তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
হেরার হাতে আজ কাচের চুড়ি আছে। সেও নাভানকে দেখে রাগে ফেটে পড়ে। হাতের চুড়ি ভেঙে যা তার হাতে ঢুকছে তা যেন রাগের কারণে টেরই পাচ্ছে না।
হেরা রাগে কটমট করে বলে—
"শেহতাজ খান নাভান স্বয়ং সামনে দাঁড়িয়ে, তা আজ আবার আপনি কোন কুরুচিপূর্ণ কথা বলতে এসেছেন? শুনুন আগেই বলে রাখি, এই মেহরিমা ইসলাম হেরার সময় নেই আপনার কথা শোনার!"
নাভানকে এমন কটাক্ষ করে কথা বলাতে পাশের সবাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়ের সাহস আছে বলতে হবে—যার দিকে তাকিয়ে কথা বললে বুক কাঁপে, সেই মেয়ে নির্লিপ্তভাবে কথা বলছে।
নাভান চোখ গরম করে তাকায় হেরার দিকে বলে—
"অভিনয় তো ভালো পারিস! চেহারা সুন্দর, তোর সিনেমায় যোগ দিস না কেন? তুই মেইন ক্যারেক্টারে চান্স পাবি, আমি সিউর!"
নাভান আরও শক্ত করে হেরার হাত চেপে ধরে। হেরা এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
"আমার হাত আপনার সম্পত্তি না যে এমনভাবে ধরবেন, শেহতাজ খান নাভান!!"
"তোর মতো মেয়েকে এই শেহতাজ খান নাভান ছুঁয়ে দেখা তো দূর, তাকায়ও না। আর সম্পত্তি? হু! তুই তো আমার টাইপ না। নাভানের সম্পত্তি হওয়া এত সহজ না। আমি তোদের মতো মেয়েকে ছুঁয়েও দেখি না।"
"তাহলে এখন কে ধরেছে আমায়?"
"আমি হাত ধরেছি। আর তুই যে কাল আমায় জড়িয়ে ধরেছিলি?"
হেরা এবার চুপ।
"নাভান, প্লিজ ছেড়ে দে, মেয়েটার হাতে লাগছে, রক্ত পড়ছে!"
হেরার হাতের দিকে তাকিয়ে ঝিনুক বলে উঠে।
"পরুক! তার শরীরের সব রক্ত ঝরলেও আমার সম্মান ফিরবে না। এতো টাকার লোভ? কতো টাকা চাস তুই? ওই নিলয় কতো টাকা দিয়েছে তোকে, যে আমার সম্মান নষ্ট করলি?"
হেরা কটমট করে বলে—
"ধুলা যতই উড়ুক আসমানের গায়ে, ধুলো মাখাতে পারে না। তেমনি আপনি যতই বদনাম করেন না কেন, আমার গায়ে লাগাতে পারবেন না, শেহতাজ খান নাভান!"
"এতো যখন সম্মানবোধ, তো কই ছিলো সেদিন যেদিন সবার সামনে আমায় জড়িয়ে ধরেছিলি?"
হেরা কঠোরভাবে বলে—
"সেটা আমি ইচ্ছে করে করি নি। যদি জানতাম সেই ব্যক্তি আপনি, তাহলে একটা পাগলকেও ধরতাম, আপনাকে না, শেহতাজ খান নাভান!"
আচ্ছা হেরা কি তাকে ইনডিরেক্টলি পাগলের থেকেও নিচু বানিয়ে দিল? না, হ্যাঁ—তাকে ধরত না কিন্তু পাগলকে ধরত। না, এটা যেন মানতে পারলো না নাভান। সে আরও চেপে ধরে হেরার হাত।
এদিকে তিতিরের যেন অপমানটা নিজের গায়ে লেগেছে। তার হিরো নাভানকে এই মেয়ে অপমান করছে! সে পিছন থেকে চুলের মুঠো ধরতে যাবে, তার আগেই শক্ত একটা হাত সেটা আটকে দেয়।
চোয়াল শক্ত, হাতের নীল রগ ফুলে উঠেছে, সিল্কি চুল কপালে ছড়িয়ে আছে। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। রাগে তার পুরো ক্যাম্পাসের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
(কে এই ব্যক্তি, যে হেরার জন্য এমন উন্মাদ হচ্ছে? আচ্ছা অধীর, সৃজন—তাদের কী রিয়েকশন হবে যখন দেখবে রোজ ও রুশা হেরার ফ্রেন্ড?)
চলবে....