ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের বাজিমাত

৩৮তম পর্ব

লেখক: রোজ ও রুশা

#প্রেমের_বাজিমাত

#লেখনিতে_রোজ_ও_রুশা

#পাঠ_৩৮

>>>>>>

❌কপি করা নিষেধ ❌

রাত অনেক গভীর।

জাওয়াদ খান এর বাড়িটায় প্রতিটা আলো নিভে গেছে প্রায়। শুধু করিডোরের হলুদ ডিমলাইটটা জ্বলছে, সেটাও আধো অন্ধকারে কেমন বিষণ্ন লাগছে।

রোজ আর রুশা বিছানার দুই পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু হেরার চোখে ঘুম নেই।

বারবার কাজল খানের মুখটা ভেসে উঠছে।

আজ কতদিন পর মানুষটা হেসেছিলেন।

তার মাথায় হাত রেখে খাইয়েছেন, গল্প করেছেন, আদর করেছেন।

কিন্তু জাওয়াদ খানের কথা উঠতেই মুখ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

“ ওই মানুষটার কথা আমার সামনে আনবি না পরি মা!!

এই একটা কথার আড়ালেই কত কষ্ট লুকানো…

আজ হেরা সেটা বুঝেছে।

বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে সে। তারপর হঠাৎ করেই নাভানের নামের উপর চাপ পড়ে যায় আঙুল। কল চলে যায়। আর কল যেতেই হেরার বুক ধকধক শুরু হয়ে যায়।

“ আমি কি সত্যিই ওনাকে ফোন দিলাম?

যে ছেলেটাকে দেখলেই তার রাগ হয়…

যার কথা শুনলেই মাথা গরম হয়ে যায়…

সেই ছেলেকেই রাত একটা বাজে ফোন দিয়েছে সে।

জানলে রোজ আর রুশা হাসতে হাসতে মরে যাবে।

অন্যদিকে— কালো গাড়িটা নিরিবিলি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করেছিল নাভান। ফোনের রিংটোন বাজতেই বিরক্ত হয়ে ফোন হাতে নেয়। কিন্তু স্ক্রিনে নামটা জ্বলতেই তার চোখ বদলে যায়। একটা ধীর, ভয়ংকর সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ে ঠোঁটে।

“ my oxygen calling …”

নাভান কয়েক সেকেন্ড শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কল রিসিভ করে নিচু গলায় বলে—

“ বাহ… আজ সুর্য কি পশ্চিমে উঠছে না কি ?

হেরা ভ্রু কুঁচকে ফেলে।

“ মানে?

“তুমি নিজে থেকে কল করেছো। পৃথিবী শেষ হওয়ার আগে এমন দৃশ্য দেখবো ভাবিনি কখনো ।

“ ড্রামা কম করেন।

নাভান চোখ বন্ধ করে হেসে ফেলে।

সেই হাসির শব্দটা কানে যেতেই হেরার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত লাগে।

“ … একটা কথা ছিল।

“শুধু একটা?

“ জি।

নাভান বুঝতে পেয়েছে যে মেয়ে তাকে দেখলেই নাক ছিটকায় সে করবে ফোন নিশ্চয়ই কোনো দরকারে কল করেছে, তাই কথা না বাড়িয়ে বলে—

“ আচ্ছা আচ্ছা বলো।

হেরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলে—

“ বাবা আর সুন্দরী মা কে এক করা যায় না কোনো ভাবে?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর নাভানের গলা বদলে যায়। গভীর হয়।

“ তারা আলাদা কি হয়েছে নাকি?

“ মানে?

" মানে বুঝবে না, তারা আলাদা হয় নি লং ডিস্টেন্স ছিলো অভিমানের জন্য। তুমি এসব বুঝবে না!

" কি বলছেন বুঝিয়ে বলুন ( হেরা)

“ ওকে তাহলে নিচে আসো। আমি নিচেই আছি।

হেরা থমকে যায়।

“ কি?

“ নিচে আসো। প্ল্যান করতে হবে।

হেরার কন্ঠ শুনে নাভানের মন বদলে যায়। এক পলক দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে মন। কিন্তু এই মেয়ে যেহেতু নিজ থেকে ধরা দিয়েছে এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে হবে নাকি? নাভানের করা প্রশ্নে হেরা সাথে সাথে উত্তর করে—

“ এখন?

“ হ্যাঁ এখন।

“ আপনি পাগল?

' Only For You."

“ অসভ্য কথা বলবেন না।

' নিয়ে আসো quickly

“ আমি আসবো না।”

“ তাহলে আমি উপরে চলে আসবো।

হেরা লাফ দিয়ে উঠে বসে।

“ খবরদার!

নাভান নিচু গলায় হেসে ওঠে।

" আরে প্রেম করার জন্য তো আর ডাকছি না, একটা plan বানাচ্ছি। আমার সাথে না থাকতে চাইলে okay, but আমি কাউকে পরে কিছু share করবো না।

হেরা পরে গেলো বিপাকে। একবার নাভান এর কথা না শুনার ফলে, সাথে সাথে কাজ না করার ফলে বাবার হাতে খেয়েছিলো এক থাপ্পড়। তার উপর কিছু জানতে পারে নি। কিন্তু এখন তো জানে এই অসভ্য গিটার ওয়ালা অনেক কিছু জানতো আগে থেকে। তার উপর তার কাজিন হয়। একটা রিক্স নিয়ে বের হবে হেরা। কাওকে না জানিয়ে। ছোট করে বলে উঠে—

“ তাহলে পাঁচ মিনিট।

কল কেটে যায়। হেরা কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের কপালে চাপড় মারে—

“ আমি কেন ফোন দিলাম! যদি কেউ দেখে ফেলে?

যে ছেলেটাকে সে সারাদিন সহ্য করতে পারে না বলে বেড়ায়…রাতের বেলা তার সাথে লুকিয়ে দেখা করতে যাচ্ছে!

নিজেকেই নিজের কাছে হাস্যকর লাগছিল তবুহৃদপিণ্ডটা কেমন দ্রুত চলছিল।

হেরা ধীরে বিছানা থেকে নামে।রোজের দিকে তাকায়।

রুশা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সে নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হয়। করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নিজের নিশ্বাসের শব্দও বড় লাগছিল।

নিচে এসে দেখে—

কালো গাড়িটা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে।

হেডলাইট বন্ধ। গাড়ির ভেতরে শুধু নরম নীল আলো জ্বলছে। জানালা নামতেই নাভানকে দেখা যায়। আর হেরা থেমে যায়। আজ মানুষটাকে অন্যরকম লাগছে।

কালো শার্টের হাতা গোটানো। চোখের নিচে ক্লান্তি।

তবু সেই চোখে ভয়ংকর টান। নাভান তাকিয়ে থাকে।

এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন চারপাশে আর কিছু নেই। হেরার গলা শুকিয়ে আসে। কারণ আজ সে একদম সাধারণ পোশাকে। প্লাজু সাদা ঢিলেঢালা গেঞ্জি, চুল এলোমেলো। তবু নাভানের দৃষ্টিটা এমন ছিল…

যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কিছু দেখছে।

নাভান ধীরে বলে—

' You don’t understand… this is not right, going out like this at night.

হেরা বিরক্ত হয়ে বলে—

“ আপনিই তো ডেকেছেন!

“ I made a mistake!

“ তাহলে যাচ্ছি।

হেরা ঘুরতেই নাভান হাত ধরে ফেলে। গরম শক্ত আঙুল। হেরা কেঁপে ওঠে।

“ ছাড়ুন!

“ আগে গাড়িতে উঠো।

“ আমি এসেছি বাবা-মায়ের ব্যাপারে কথা বলতে।

“ আমিও।

“ তাহলে এভাবে হাত ধরছেন কেন? অসভ্য লোক!

নাভান এক পা এগিয়ে আসে। এত কাছে যে তার শরীরের গন্ধ পুরোপুরি ঘিরে ধরে হেরাকে। গভীর পুরুষালী ঘ্রাণ। ধোঁয়া আর ঠান্ডা রাতের মিশ্রণ।

হেরার বুক ধক করে ওঠে। নাভান নিচু হয়ে ফিসফিস করে—

“ কারণ তোমাকে সামনে দেখলে ভদ্র থাকা কঠিন হয়ে যায়।

হেরা চোখ বড় বড় করে তাকায়।

“আপনি অসহ্য! অসভ্য, অভদ্র!!

নাভান হেসে বলে উঠে

“ তবু এই অসহ্য,অসভ্য,অভ্রদ্র লোক কেই তো কল করেছো!

হেরা থেমে যায়। সত্যিই তো। সে নিজেই কল দিয়েছে।

এই কথাটা মনে হতেই গাল গরম হয়ে ওঠে। নাভান সেটা বুঝে ফেলে। ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে—

“লজ্জা পাচ্ছো?

“একদম না!”

“ মিথ্যা।

“অসভ্য গিটার ওয়ালা আমি কিন্তু চলে যাবো।

“ ঠিক আছে যাও।

“ সত্যি?

“ হুম।

নাভান হাত ছেড়ে দেয়। কিন্তু হেরা যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনের মাঝখানে অদ্ভুত নীরবতা।

তারপর নাভান গাড়ির দরজা খুলে ধীরে বলে—

“এসো, মিসাইল গার্ল।”

হেরা বিরক্ত মুখে উঠে বসে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বুঝতে পারছিল— নাভানের সাথে থাকলেই তার ভেতরটা কেমন অদ্ভুত হয়ে যায়। যেন রাগ… ভয়… বিরক্তি… আর অচেনা কোনো টান একসাথে মিশে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—

সে চাইলেও এই টান থেকে দূরে যেতে পারছে না।

রাত অনেক গভীর। শহরের আলো পেছনে পড়ে গেছে অনেক আগেই। কালো রাস্তাটা কেবল গাড়ির হেডলাইটে কেটে যাচ্ছে। চারপাশ নির্জন… দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, আর ভেতরে গাড়ির কেবিন জুড়ে ভারী নীরবতা।

স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে নাভান।

চোখে ঘুম নেই চারদিনের।

দাড়ি গজিয়েছে, চোখ লাল… কিন্তু পাশে বসে থাকা হেরার দিকে তাকালেই বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছু হয় তার।

হেরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

… খোলা চুল… শরীরে বেবি পাউডার বা লোশোন সাথে মিশে থাকা তার নিজস্ব ঘ্রাণ পুরো গাড়িটা দখল করে রেখেছে। নাভান কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল গভীর ভাবে। বাবা মায়ের ব্যাপারে কথা বলতে বলতে নির্জন এক জায়গায় এসেছে নাভান হেরাকে নিয়ে। প্রিয় মানুষ কে সামনে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করা দায় হয়ে যাচ্ছে নাভানের। বিরক্ত নিয়ে বলে—

“ তুমি কি ইচ্ছে করে আমাকে পাগল করছো মিসাইল গার্ল ?” নাভানের গলা কর্কশ

হেরা ভ্রু কুঁচকালো।

“ আমি কি করেছি? আপনি যে পাগল এটা কি সবাই জানে?

“ নাভান হালকা হেসে তাকালো তার দিকে।

“আমি চারদিন ঘুমাইনি। মাথা কাজ করছে না। আর তুমি পাশে বসে আছো… এভাবে… আমি কীভাবে ঠিক থাকবো বলো?

হেরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও গাল লাল হয়ে উঠলো। কি ইঙ্গিত করছে নাভান, পরোক্ষনে বিরক্তিতে ছেয়ে গেলো মন মস্তিষ্ক।

" আমায় বাসায় দিয়ে আসুন,

গাড়ি আরও দূরে চলে গেল। শহরের শব্দ হারিয়ে গেল পুরোপুরি। একসময় নাভান রাস্তার পাশে নিরিবিলি জায়গায় গাড়ি থামালো। চারপাশ অন্ধকার।

উপরে আধখানা চাঁদ। হেরা একটু অস্বস্তিতে তাকালো।

“এখানে থামলেন কেন?

নাভানের চোখের নিচে কালি। চোয়াল শক্ত।

স্টিয়ারিং ধরা হাত কাঁপছে সামান্য। হেরা নাভানের কাপা হাত দেখে বলে উঠে—

“ আপনার শরীর খারাপ?

“ না।

“মিথ্যা,তাহলে গাত কাপছেন কেনো?

নাভান এবার ধীরে হেসে ওঠে।

“ চার দিন ঘুমাইনি।

হেরা চমকে তাকায়।

“ কি?

“ তোমার বাবার পেরা, তোমার মায়ের রাগ, আর তোমাকে সামলাতে গিয়ে সময় পাইনি।”

“ এভাবে কেউ না ঘুমিয়ে থাকে?

“ থাকি তো।

গাড়িটা ধীরে একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে থামিয়েছে নাভান। চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।

নাভান সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে -- হেরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই বলে উঠে নাভান—

“ এক মিনিট…

“ কি হয়েছে?

“ ঘুম পাচ্ছে খুব।

“তাহলে বাসায় যান।

“ পারবো না।”

“ কেন?

নাভান ধীরে পিছনের সিটে চলে যায়।

হেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।

পরের মুহূর্তেই—

হুট করে তার হাত টেনে নেয় নাভান।

হেরা ভারসাম্য হারিয়ে পিছনের সিটে পড়ে যায়।

আর তার আগেই— নাভান মাথা রেখে দেয় হেরার কোলে। পুরো শরীর অবশ হয়ে যায় হেরার।

“আ আ … আপনি কি করছেন!

নাভান চোখ বন্ধ করেই ফিসফিস করে—

“ চুপ… মাথা ধরেছে।

“ উঠুন—”

“ একটু থাকো।

গভীর ভারী কণ্ঠ।

হেরার নিশ্বাস আটকে আসে।

পুরো গাড়ির ভেতর নাভানের পারফিউম আর গরম নিশ্বাস মিশে আছে। বাইরে অন্ধকার। ভেতরে উত্তাপ।

হেরা বুঝতে পারছে—

তার উচিত নাভানকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু পারছে না।

একদমই পারছে না।

নাভান একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে কোমড়ের কাপড়ের অংশ । যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে।

“হেরা…

“ হুম?”

“ তোমার মা-বাবাকে মিলিয়ে দিবো আমি।”

“ কিভাবে?

“জোর করে।”

হেরা নিচে তাকায়।

“ ভালোবাসা কি জোর করে হয়?”

নাভান চোখ না খুলেই হেসে ওঠে।

“ সবচেয়ে ভয়ংকর ভালোবাসাগুলো জোর করেই হয়।”

হেরার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।

তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে। কারণ এই অন্ধকার রাত… এই নিরিবিলি গাড়ি…

এই মানুষটার কণ্ঠ— নাভান আর কছু বললো না কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইলো হেরার দিকে। সেই দৃষ্টি অদ্ভুত… ক্লান্ত, গভীর, অধিকার মেশানো।

হঠাৎ নাভান হেরার পেটে মুখ গুজে হেরার হাত টেনে নিল। হেরা রিতিমত কাপছে।

“ কি করছেন অসভ্য গিটার ওয়ালা।

হেরা ভয় পেয়ে গেল কিছুটা। বুক ধকধক করছে।

“ আপনি এমন করছেন কেন?

নাভান এবার চোখ বন্ধ করে ফেলে তারপর ধীরে ধীরে বললো—

“ কারণ আমি আর পারছি না!

তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল। এমন ক্লান্তি, যা শুধু শরীরের না… ভেতরেরও।

“ বাবা সারাজীবন মাকে ভালোবেসেও ঠিকভাবে কাছে টানতে পারেনি। বিশ্বাস ছিল না যার জন্য দূরত্ব ছিল। আমি তাদের মতো হতে চাই না।”

হেরা চুপ।

নাভান নিচু স্বরে আবার বললো—

“আর মা… উনি সবসময় বলতেন, মানুষ যখন নিজের মানুষকে কাছে পেয়েও দূরে রাখে, তখন সেটাই হয় সবচেয়ে বড় ভুল। এক সময় এই সময় পাওয়া যায় না একদিন সব ফাঁকা হয়ে যায়। কিছুক্ষণ নীরবতা।

হেরা অবাক, নাভানের কথার মানে যে বুঝতে পারছে কিছুটা। কিন্তু কিছু একটা বাধা দিচ্ছে তাকে।

বিরক্ত নিয়ে বলে—

“এই… উঠুন।”

“না।”

“ অসভ্য লোক হচ্ছে কি জোর করে অধীকার খাটাচ্ছেন?

“একটু থাকতে দাও।

তার গলায় এমন এক জেদ ছিল, যেটা শিশুর মতো। ভয়ংকর একটা মানুষ… অথচ এই মুহূর্তে কেবল শান্তি চাইছে।

হেরা বিরক্ত হয়ে বললো—

“আপনি অসভ্য "

নাভান চোখ বন্ধ রেখেই হালকা হাসলো।

“জানি।”

তারপর ধীরে ধীরে মুখটা হেরার পেটের কাছে গভীর ভাবে গুঁজে দিল। হেরা কেঁপে উঠলো। উষ্ণ নিঃশ্বাস কাপড় ভেদ করে লাগতেই শরীরের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে গেল তার। বুক কেঁপে উঠছে। হাত শক্ত হয়ে আছে। নাভান গভীর শ্বাস নিল।

মনে হচ্ছে সত্যিই যেন সে অক্সিজেন পাচ্ছে এখন। চারদিনের অস্থিরতা… রাগ… চাপ… সব যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ রেখেই বললো নাভান।

***তোমার শরীরের ঘ্রাণটা নেশার মতো***

হেরার গলা শুকিয়ে গেলেও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছিল। বুকের ভিতরটা কেমন কাঁপছিল, তবুও মুখে কঠিন ভাব এনে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। আর নাভান? সে-ও চুপ। ঠোঁটের কোণে হালকা একরকম জেদি হাসি, যেনো কিছু বলতে চেয়েও বলছে না। গাড়ির ভিতর নিস্তব্ধতা জমে উঠেছিল ধোঁয়ার মতো। বাইরে রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল, দুজনের কথার মাঝেই একসময় ঘুম এসে চুপচাপ গ্রাস করে নেয় নাভান কে! হেরা নাভানের ঘুমন্ত মুখ দেখে ভাবে। কি নিষ্পাপ দেখতে ছেলেটা। কি সুন্দর করে শান্ত ছেকের মতো ঘুমাচ্ছে। মনে হচ্ছে কতো রাত ঘুমায় না। হেরা নিজের প্রতি বিরক্ত কেনো সে নাভানের ডাকে চলে এসেছে। আর কেনই বা নাভান কে উপেক্ষা করতে পারছে না। কেন নাভানের কথায় তার মন মস্তিষ্ক তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এটাই কি সেই অহংকারী ছেলে, যার জন্য মেয়েদের জীবন, নষ্ট হয়ে যায়? কিন্তু নাভান কে যতো দেখছে তার ভুল কেনো ভাঙতে চাচ্ছে না। মনের অজান্তেই হেরার হাত চলে যায় নাভানের সিলকি চুলের ভাজে। ভাবতে থাকে নাভান কে নিয়ে। আর ভাবতে ভাবতে মাথায় হাত রেখে ঘুমিয়ে যায় হেরা নিজে ও!

ফজরের আজানের ধ্বনি চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশের পূর্বদিকে হালকা কমলা আভা। শিশির ভেজা বাতাসে এক ধরনের পবিত্রতা মিশে আছে।

নাভানের চোখ ধীরে ধীরে খুললো। কয়েক সেকেন্ড সে বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় আছে। তারপর পাশ ফিরতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল। হেরা।

সিটে মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। এলোমেলো চুল মুখের উপর এসে পড়েছে। চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁটজোড়া গাড়ো গোলাপি । ভোরের আলো মুখে এসে এমনভাবে পড়েছে যেনো কেউ খুব যত্ন করে ছবির মতো সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। নাভান কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।

তার বুকের ভিতর অদ্ভুত শান্তি নামলো। কতদিনের ইচ্ছে ছিল—ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে এমন একটা মুখ দেখবে। যে মুখ দেখে মনে হবে পৃথিবীতে সব অশান্তির পরও শান্তি বলে কিছু আছে। তার চোখ নরম হয়ে এলো। খুব আস্তে করে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামলো সে। কাছেই ছোট্ট একটা মসজিদ চোখে পড়তেই হাঁটতে হাঁটতে সেখানে চলে গেল।

নামাজে সিজদায় মাথা রাখতেই বুকটা কেঁপে উঠলো তার।

“আল্লাহ... আমি তো কিছুই চাইনি জীবনে। শুধু এই মেয়েটাকে ভালো রাখতে চাই...”

কতটা সময় কেটে গেল সে বুঝতেই পারেনি।

নামাজ শেষে ফিরে এসে গাড়ির দরজা খুলতেই আবার থেমে গেল। হেরা এখনো একইভাবে ঘুমিয়ে আছে।

নাভানের ঠোঁটে হাসি ফুটলো।

“এই মেয়ে মানুষ নাকি ঘুমের কারখানা...”

খুব সাবধানে সে হেরাকে কোলে তুলে নিল। যেনো একটু জোরে ধরলে ভেঙে যাবে। তারপর সামনে বসে এক হাতে তাকে আগলে ধরে গাড়ি স্টার্ট দিল।

রাস্তায় তখনো তেমন গাড়ি নামেনি। সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশ ভরিয়ে তুলছে।

হেরা ঘুমের মাঝেই একটু নড়লো। সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ভ্রু কুঁচকে উঠলো তার। কিন্তু চোখ খোলার আগেই নাকে এলো সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ। কেমন গভীর, নেশা ধরানো একটা ঘ্রাণ। ঘুম জড়ানো অবস্থাতেই হেরা অজান্তে নাভানের বুকের দিকে আরও একটু সরে এলো। নাক ঘষে ঘ্রাণটা আরও গভীর করে নিতে চাইল। আর ঠিক তখনই— নাভানের পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস আটকে এলো।

“ইয়া আল্লাহ... এই মেয়ে কি আমাকে মেরে ফেলবে নাকি?”

হেরা ঘুমের মাঝেই আরও জড়িয়ে ধরলো তাকে।

নাভানের হাত স্টিয়ারিংয়ে কাঁপতে লাগলো। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল যেনো বিদ্যুৎ ছুঁয়ে গেছে।

সে দ্রুত হেরাকে একটু দূরে সরিয়ে দিল।

“ স্টপ!

হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে হেরা ভয় পেয়ে চোখ মেলে চিৎকার করে উঠলো।

“আআআ—!

“চুপ!”

নাভান ধমক দিল।

হেরা কয়েক সেকেন্ড বোঝার চেষ্টা করলো কি হয়েছে। তারপর সামনে নাভানকে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। কাল রাতের সব মনে পড়তেই মুখ হাঁ হয়ে গেল তার। সে চারপাশে তাকালো। ভোরের আলো। ফাঁকা রাস্তা। গাড়ির ভিতর তারা দুজন। তারপর ধীরে ধীরে রাগ চেপে উঠলো। দাঁত চেপে বললো —

“এই অসভ্য গিটার ওয়ালা! আপনি আমায় এমন করে ধাক্কা দিলেন কেনো?

নাভান ভ্রু তুলে তাকালো।

“ কারণ আর একটু হলে দম বন্ধ হয়ে মারা যেতাম, মিসাইল গার্ল।

“ বাজে কথা বলবেন না!

“ বাজে কথা? তুমি এমনভাবে চেপে ধরেছিলে যেনো আমি তোমার বালিশ! আরেকটু হলেই চুমু খেয়ে নিতে!

হেরা লজ্জায় লাল হয়ে গেলেও মুখ শক্ত রাখলো। চেচিয়ে বলে উঠে—

এই না - ছি আমি কিছু করি নি!

“ ওহ তাই? তাহলে আমার শার্ট কে কুঁচকে দিল? ভূত?”

“ আপনি আমায় রাতে বাসায় দিয়ে আসেন নি কেনো?”

“ কারণ কেউ একজন ঘুমিয়ে নাক ডেকে পৃথিবী কাঁপাচ্ছিল।

“কি?! আমি নাক ডাকি?

“ একদম। মাঝখানে তো মনে হচ্ছিল গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে।

হেরা রাগে ফুঁসতে লাগলো।

" মিথ্যাবাদী!

নাভান হেসে ফেললো। হেরা কটমট করে বলে উঠে—

- নিজের বেলা ষোল আনা পরের বেলা এক আনাও না, কাল রাতে কে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল?

নাভাম ডেম কেয়ার ভাব নিয়ে বললো -

“ তা... তা আলাদা ব্যাপার!

“কেন আলাদা?”

“ কারণ আমি ছেলে তাই!

“ও আচ্ছা। তাহলে ছেলেদের সব অপরাধ মাফ?

' তোমার জন্য আমার সব অপরাধ মাফ!

“আপনি সীমা ছাড়াচ্ছেন কিন্তু!

নাভান দুষ্টু হেসে একটু ঝুঁকে এলো।

“তো কালকের শোধ তুলছিলে নাকি?

“ মানে?!”

“আমি তো তোমাকে এত ডিপ হাগ করি নি, তুমি করেছো আমায়।

হেরা এবার পুরোপুরি লাল হয়ে গেল।

“এই অসভ্য কথা বলা বন্ধ করুন!

নাভান নাটকীয় ভাবে মাথা নেড়ে বললো—

“হুম বুঝেছি। তুমি লেনদেন পছন্দ করো?

“মানে?”

“মানে আজ থেকে আমি যা করবো তুমিও তাই করবে। হিসাব ক্লিয়ার।”

“কি?!”

“আমি যদি হাত ধরি তুমিও ধরবে।”

“অসম্ভব!”

“আমি যদি জড়িয়ে ধরি?”

“চুপ!”

“আমি যদি—”

“গাড়ি থামান!”

নাভান হো হো করে হেসে উঠলো।

রাগে গজগজ করতে করতে হেরা দরজা খুলে নেমে গেল। নাভান জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটা হনহন করে হাঁটছে। তার হাসি আরও বেড়ে গেল।

“রাগলে মেয়েটাকে আরও সুন্দর লাগে...”

হেরা পা টিপে টিপে বাসায় ঢুকছিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—

“আম্মাজান, কোথায় গিয়েছিলে?”

হেরা লাফিয়ে উঠলো প্রায়।

জাওয়াদ খান সোফায় বসে চা খাচ্ছেন।

এত সকালে বাবাকে দেখে হেরার গলা শুকিয়ে গেল।

“আ-আসলে বাবা... হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভালো লাগছিল না তো...”

জাওয়াদ খান মেয়ের এলোমেলো চুল, লাল মুখ আর অস্থির চোখ ভালো করে লক্ষ্য করলেন।

তার অভিজ্ঞ চোখ অনেক কিছুই আন্দাজ করলো।

কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু শান্ত গলায় বললেন,

“সকালে হাঁটা ভালো অভ্যাস।”

তারপর ধীরে ধীরে নিজের রুমে চলে গেলেন।

হেরা বুক চেপে ধরে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেললো।

“ইয়া আল্লাহ! আজ তো ফেসে গিয়েছিলাম ।

নিজেকে বকতে বকতে রুমে ঢুকলো সে।

আর ঢুকেই থমকে গেল। রুশা আর রোজ দুইদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে যেনো যুদ্ধ করে এসেছে।

রুশার এক হাত খাট থেকে ঝুলে আছে। চুলগুলো এমন এলোমেলো যেনো শেওড়া গাছের পেত্নী রাতভর বাতাসে উড়েছে।

হেরা বিরক্ত হয়ে বললো,

“এই দুইটা মানুষ না বিপদ!

চলবে,,,?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন