ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের বাজিমাত

৩৯তম পর্ব

লেখক: রোজ ও রুশা

#প্রেমের_বাজিমাত

#লেখনিতে_রোজ_ও_রুশা

#পাঠ_৩৯

❌কপি করা নিষেধ ❌

>>>>>>>>

কোর্ট চত্বরের সামনে সকালটা আজ অস্বাভাবিক রকম ভারী।

কোর্টের অফিসিয়াল পোশাক-পরা। কাজল খানকে দেখলেই বোঝা যায়, সে শুধুই একজন এডভোকেট নয়,এই আদালতের ভেতরে তার উপস্থিতি মানেই এক ধরনের নীরব শক্তি। হাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, চোখে আত্মবিশ্বাস আর ঠোঁটে ঠান্ডা স্থিরতা। পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সালাম দিচ্ছে—কেউ সম্মান থেকে, কেউ ভয় থেকে।

তার বারাদ্দকৃত ক্যাবিনে বসে, সে সহকর্মী তন্নির দিকে ফোন দিতে যাবে, ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় জাওয়াদ খান। পুরো পরিবেশ যেন এক মুহূর্তে থেমে যায়।

জাওয়াদ খান—লন্ডনের এক সময়কার শীর্ষ ব্যবসায়ী, যার নাম একসময় বড় বড় কোম্পানির দরজায় দরজায় ঘুরত। এখনো তার নামের প্রভাব অনেক জায়গায় টিকে আছে। কিন্তু সেই একই মানুষ আজ দাঁড়িয়ে আছে আদালতের বারান্দায়, চোখে এক অদ্ভুত জেদ নিয়ে। সে শান্ত গলায় বলে ওঠে—

“একটা কেস ফাইল করবো, এডভোকেট ম্যাডাম।

কাজল খান এক মুহূর্তও দেরি করে না। তার চোখে বিরক্তি স্পষ্ট।

“ অকারণে পথ - আটকানো কোনো ম্যানার্সের মধ্যে পড়ে না, মি. জাওয়াদ খান।

জাওয়াদ খান হালকা হাসে, যেন কথাটা তার কানে ঢোকার আগেই হারিয়ে গেছে।

“ মিসেস খান… আপনি হয়তো ভুলে গেছেন!

জাওয়াদ খান একটু কাছে এগিয়ে আসে--

“ আমি আপনার স্বামী। এসব ম্যানার্স আমার সাথে যায় না।

এই কথায় কাজল খান যেন এক মুহূর্তে আগুন হয়ে ওঠে।

“ একদম গলা উঁচিয়ে কথা বলবেন না। আমি আপনার এই পরিচয় মানি না। সামনে থেকে সরুন।

জাওয়াদ খান একটুও সরে না। বরং আরও শান্ত, আরও জেদি ভঙ্গিতে বলে—

“ বললেই হলো? আমি এত সহজে সরে যাই না। বউয়ের কথায় কষ্ট পেয়ে চলে যাওয়ার মানুষ আমি না। বরং… আচলটা দিন, আমি ধরেই হাঁটি আপনার পাশাপাশি!

- কাজল খান রাগে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শামসুলের দিকে।

এক মুহূর্তে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। দরজার আড়ালে শামসুল কে দেখে তার কণ্ঠ হঠাৎ কঠিন হয়ে ওঠে—

“এই! কে কোথায় আছো? এই লোককে কেবিন থেকে বের করো!

ডাক শুনে দৌড়ে আসে তন্নি। তন্নির মাথায় যেন একসাথে বাজ পড়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে যায় জাওয়াদ খানের সামনে। একদিকে নির্দেশ, অন্যদিকে ভয়। কারণ তার সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে শুধু প্রভাবশালীই না—সে নাভান স্যারের একমাত্র বাবা।

তন্নির গলা শুকিয়ে আসে। মনে মনে সে বিড়বিড় করে

“আল্লাহ… স্যার গত রাতে বলছিলেন বাবা-মাকে একসাথে দেখলে আমি যাতে নেটওয়ার্ক এর বাইয়ে যাই … এখন তো কানেক্ট হয়ে গেছে! আমি এখন কী করি? চাকরি থাকবে তো আমার? একদিকে মায়ের আদেশ আরেক দিকে ছেলের আদেশ দুই টাই তো আগুন এখন আমি কি করি।

- তার চোখ কাঁপছে, কিন্তু মুখে পেশাদারিত্ব আনার চেষ্টা করছে। জাওয়াদ খান তখনও স্থির। তার চোখ কাজল খানের দিকে। একধরনের ঠান্ডা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলে উঠে--

“ আমি কেস ফাইল করবো শামসুলের বিরুদ্ধে--

” জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে বলে। কাজল খান তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়--

“ না। এই কেস আমি নেব না।

তার কণ্ঠ কঠিন--

" আপনি বিখ্যাত আইনজীবী, কেন নেবেন না ? সবার বিচার সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করেন, বাট নিজের লাইফের সঙ্গে হওয়া অপরাধের বিচার করবেন না, এডভোকেট এম এল এ কাজল খান?

- জাওয়াদ খান প্রশ্ন করে। কাজল খান নিরলস জবাব দেয়--

“ কারণ আমি বলেছি। আর অযথা সময় নষ্ট করার

প্রশ্ন উঠে না। জীবনে অনেক কিছুর বিচার আমরা করতে পারি না। আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না আমাদের।

" তুমি কেস ফাইল করবে, আর স্বাক্ষী ও দিবে তুমি।

" কখনো না।

" কেনো?

তাহলে তো শামসুলের সাথে আপনার নামেও কেস ফাইল করতে হয় মিঃখান।

" কাজল রেখা !

রুমটা ভারী নীরব ছিল না । বরং অদ্ভুত এক লড়াই চলছিলো। কাজল খানের চোখে আগুন। আর সেই আগুনের ভেতরে জমে থাকা বহু বছরের অভিমান। কণ্ঠটা কাঁপলেও শব্দগুলো ছিল ধারালো—

“একদম এই নামে ডাকবেন না। কী মনে করেছেন আপনি? ছেলেকে সাথে নিয়ে আমার কাছে হাত জোর করলেই সব মাফ হয়ে যাবে?

সে এক ধাপ এগিয়ে গেল, চোখ সরাল না।

“ আমি ক্ষমা করবো না। কারণ যখন আপনাকে আমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিলো, তখন আমি আপনাকে পাইনি। আমি ক্ষমা করবো না, কারণ যেদিন আমি নিরিহর মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, সেদিন আপনি আমাকে একা ফেলে চলে গেছেন। অবিশ্বাস করেছেন। আমাদের অস্বীকার করেছেন।

তার কণ্ঠ আরও শক্ত হলো, যেন ভেতরের সব ভেঙে পড়া জমাট বাঁধা ক্ষোভ এখন শব্দ হয়ে বেরোচ্ছে—

“ পারবেন? আমার দুই যুগের একাকিত্ব, আমার অভাব, আমার কষ্ট—সব পূরণ করতে পারবেন? পারবেন না।

এক মুহূর্ত থেমে কাজল খান ঠান্ডা গলায় শেষ করল-

“ So leave. This is your last warning. আমার সামনে আর আসবেন না। এই বয়সে ইভটিজিং-এর কেস ফাইল করে জেলে ঢুকাবো। Got it?

জাওয়াদ খান এর চারিদিক যেনো স্তব্দ হয়ে গেছে।

ঠিক সেই নীরবতা ভেঙে পেছন থেকে এক ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠ ভেসে এল—

“ বাহ… সুন্দরী, খুব ভালো কথা বলেছো।

কাজল খান চমকে পেছনে ঘুরল।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শামসুল। মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে বিদ্রুপ। তার উপস্থিতি যেন পুরো ক্যাবিনের বাতাস বদলে দিল। ঠিক তখনই জাওয়াদ খান বিরক্ত নিয়ে বলে--

“ তুই আবার আমার বউয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিস?

তার মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেছে। চোখে রাগ, অপমান, আর পুরোনো ক্ষতের বিষ।

শামসুল একটু মাথা কাত করে হাসল।

“ দুই যুগ তো একসাথে ছিলাম আমরা।

এই কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালল।

জাওয়াদ খান এক পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাত চেপে বলল—

“ মুখ সামলে কথা বল শামসুল। একসাথে থেকেছিস মানে কী?

শামসুল কাঁধ ঝাঁকালো। একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে—

“ মানে তো অনেক কিছুই রে সৎ ভাই। তুই বুঝিস না।

“তুই আমাকে সৎ ভাই বলিস কোন সাহসে?

জানোয়ার! তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!”

শামসুল এবার একটু হাসল, সেই হাসিতে কোনো ভয় নেই।

“ আরে ভাই, আজকাল তোকে দেখলে আমার নিজের জিহান ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। আমার রিয়েল সৎ ভাই। তাই অভাব পূরণ করার জন্য একটু ডাকি আর কী!

এই কথায় জাওয়াদ খানের চোখ লাল হয়ে গেল।

সে প্রায় চিৎকার করে উঠল—

“ তোর জন্য আমি আমার বন্ধুকে ভুল বুঝেছি! আমার বউকে ভুল বুঝেছি! তোর জবান আমি বন্ধ করে দেবো!

শামসুল হাত তুলে শান্ত ভঙ্গিতে বলল—

“ কুল ভাই, কুল। মন্ত্রীদের থ্রেট দিতে নেই। বিপরীতে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে।

এই কথাটা যেন জাওয়াদ খানের সহ্যের শেষ সীমা ভেঙে দিল।

“ তোর এই মন্ত্রীত্বের উপর থু!

শামসুল এবার হেসে ফেলল-

“ আরেহ ভাই, এই মন্ত্রীত্ব জীবনে একবারই পাবি না। আর থু দিস!

পাবে না মানে কি? শামসুল এর ধারনা আছে জাওয়াদ খানের হাত কতো লম্বা। বউ এর সামনে যেনো অপমান বোধ করলো জাওয়াদ খান। একই ভাবে শামসুলের মতো বলে উঠে —

“ কি? চ্যালেঞ্জ নিচ্ছিস নাকি?

“ চ্যালেঞ্জ না,

শামসুল চোখ সরু করে বলল।

" ওপেন চ্যালেঞ্জ।

' ক্যাবিনটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল–

জাওয়াদ খান দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। তারপর ধীরে বলল—

“ওকে ডান!

এই এক শব্দে যেন যুদ্ধের ঘোষণা হয়ে গেল।

শামসুল পেন্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলবে তার আগেই জাওয়াদ খান বলে উঠে —

“প্রেমের বাজিমাত আমি জাওয়াদ খান অনেক আগেই করেছি … আর রাজনৈতিক বাজিমাতও আমি করবো খুব দ্রুত।

শামসুল তাচ্ছিল্যের হাসি দিল—

“এই বুড়ো বয়সে?

জাওয়াদ খান শান্ত গলায় উত্তর দিল—

“ আমার লাঠি আছে… ভর দেওয়ার মতো।

এই কথায় হালকা নীরব হাসির ছায়া দেখা গেল কিছুক্ষণের জন্য।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্য দেখছিলেন কাজল খান। তিনি চেয়ার থেকে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে পরিষ্কার বিরক্তি।

তিনি ধীর গলায় বললেন—

“ দুজন যা ইচ্ছে করেন। কিন্তু আমাকে জড়িয়ে কিছু যেন না হয়। এটা পরিষ্কার বলে দিলাম।

সম্পর্ক, প্রতিশোধ, অভিমান আর ক্ষমার মাঝে দাঁড়িয়ে তিনজন মানুষ—প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে অনড়।

*****

বাবা তুমি এ কেমন চেলেঞ্জ নিলে?

অধীরের কথায় জাওয়াদ খান বলে উঠে–

" আরে বউ এর সামনে ক্ষমতার বড়াই করছে বেটা সয়তান। বউ ভাববে না আমি সত্যি বুড়ো হয়ে গেছি?

জাওয়াদ খানের কথায় অধীর ভাবুক স্বরে বলে --

" একদম ঠিক। কিন্তু বাবা, ভাই শুনলে কি করবে ভাবছো?

" তুই সামাল দিবি।

" তুই সামাল দিবি মানে কি! নাভানের কথার বাইরে কিছু করলে ধমক খেয়ে সারাদিন পেট ভরতে হয়। আর এখন বাবা তাকে বলতেছে তুই সামাল দিবি। এমনি নাভান এই নির্বাচন পছন্দ করে না। সে নির্বাচন ছাড়াই বিজয়ী হয়। হেরার সাথে ভার্সিটিতে এমনি কতো ঝামেলা হয়েছে। অধীর কাদো কাদো গলায় বলে ---

' মানে!! আমার মতো নিরিহ প্রাণীকে তুমি সিংহের গুহায় ঠেলে দিচ্ছো বাবা। এ কেমন বিচার তোমার!

জাওয়াদ খান অধীরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠে–

" আরে এই বয়সে ছেলের কাছে ধমক খেলে ব্যাপার টা কেমন দেখাবে না। তুই খেলে অন্য রকম!

" তাই বলে আমি!?

" হ্যাঁ তুই। একেবারে যেহেতু এসে পরেছি তখন আর সমস্যা কি তোর মায়ের আশে পাশে থাকার জন্য সব করবো

জাওয়াদ খান গাড়ী অন্য দিক ঘুরতে দেখে বলে উঠে --

" কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস গাড়ি।

" এই লুক চেঞ্জ সেলুনে।

" সেলুনে কেনো?

" তোমার চুল কিছু পেকে গেছে সেগুলো কলব করে দিতে হবে।

" মানে কি বলতে চাচ্ছিস তুই, আমি বুড় হয়ে গেছি? মেয়ের সামনে আমার ইজ্জত এর বারো টা বাজস না বাপ ।

" তোমার মেয়ে বলেছে। আর তোমায় কে বলেছে তুমি বুড়ো? জানো কলেজে তোমায় নিয়ে গেলে সবাই আমাদের বন্ধু বা ভাই বলবে সিউর।

" ছেলের কথায় জাওয়াদ খান নড়ে -চড়ে বসে। আজ রুশা রোজ অধীর, জাওয়াদ খান কে জা তা বুঝিয়েছে। তার দরুন এখন সেলুনে। যাতে নতুন লুকে দেখে এডভোকেট এম এল এ কাজল খান প্রেমে পরে। ছেলে মেয়েদের জোরাজুরিতে জাওয়াদ খান নিজেকে পরিবর্তন করতে লাগে।

জাওয়াদ খানের সাথে বেশ ভাব এখন অধীরের -

************

দুদিন ধরে সৃজনের প্রচণ্ড জ্বর। ভার্সিটিতে যাচ্ছে না। ফোনও ঠিকমতো ধরছে না কারো, রোজের ছাড়া! রোজ প্রথম দিন ভেবেছিল— হয়তো ক্লান্ত।

দ্বিতীয় দিন এসে বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা শুরু হলো।

সকাল থেকে কতবার ফোন করেছে সে নিজেও জানে না। কখনো ফোন বন্ধ, কখনো কাজের মেয়ে ধরে বলেছে—

“ ভাইয়া ঘুমাচ্ছে আপু।

এই “ঘুমাচ্ছে” কথাটাই যেন রোজের বুকের ভেতর আরও বেশি কাঁপন ধরাচ্ছিল।

মানুষটা অসুস্থ… অথচ সে একবার দেখতে পর্যন্ত পারছে না। হেরা তখনো ঘুমিয়ে। রোজ চুপচাপ একটা ফাইল হাতে নিল। সৃজনের সামনে পরীক্ষা। জ্বরের জন্য যেন পিছিয়ে না যায়, তাই সারারাত জেগে তার অ্যাসাইনমেন্টগুলো নিজে করে এনেছে। ফাইলটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ধীরে বলল—

“একবার শুধু দেখে আসবো…

তারপর বেরিয়ে গেল। রুশা আর হেরাকে ঘুমের মধ্যে রেখে। বলে গিয়েছে অবশ্য , যাতে চিন্তা না করে। ভার্সিটিতে দেখা হবে। সকাল সাতটা। সৃজনদের বাড়িটা আজ অদ্ভুত শান্ত। কলিংবেল চাপতেই কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিল।

“ভাইয়া রুমে আছে আপু।

" রোজ কে কাজের মেয়েটা ভালো করে চিনে। কারন এই মেয়েটাও নাভান দের বাড়ির মেয়ে দুইজন বোন। সব টাই জানে তারা। মেয়েটিকে হাসি মুখে বিদায় দিয়ে রোজ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

এদিকে সৃজন জানত না— গতরাতে নুড়ি এসেছে।

নুড়ি মূলত সৃজনের জন্যই এসেছে। আগেরবার এসে তাকে ঠিকমতো দেখতে পায়নি। ছোটবেলা থেকেই সবার মুখে শুনে এসেছে “সৃজনই হবে নুড়ির বর।

এই কথাটাকে সত্যি ভেবেই বড় হয়েছে মেয়েটা।

তার কাছে সৃজন শুধু ভাইয়া নয়… তার সমস্ত ভালোবাসা। এদিকে সৃজন গভীর ঘুমে। জ্বরের কারণে শরীর ভেঙে গেছে। খালি গায়ে উবু হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের যুবকটাকে দেখলে যে কারও চোখ আটকে যাবে। নাভানের মতো অতটা ফর্সা না হলেও, সৃজনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। লম্বা গড়ন, শক্ত শরীর, শান্ত মুখ… অসুস্থ অবস্থাতেও ছেলেটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নুড়ি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার বুক কেঁপে উঠল। এই মানুষটাকেই তো সে এত বছর ধরে ভালোবেসেছে। খালি গায়ে যে কেউ দেখলে মনে কামনা বাসনা জাগবে। এই মুহুর্তে সৃজন কে দেখলে। বডি আর মায়াবি মুখ দেখেই মেয়েরা ফিদা হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ে নুড়ি

তার ফর্সা নরম হাতটা আলতো করে রাখল সৃজনের গায়ে।

“এত জ্বর নিয়েও নিজের খেয়াল রাখে না…”

ফিসফিস করে বলল নুড়ি।

সে একটু ঝুঁকে ছিল। ঠিক তখনই,দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রোজ।

আর মুহূর্তেই পৃথিবীটা থেমে গেল তার। দুজন কে এতো কাছাকাছি দেখে। মনে হচ্ছে তারা অন্য কাজে বিভোর। পিছন থেকে দেখলে এটাই মনে হবে যে কারোর । কিন্তু সৃজন তো ঘুমে। রোজের হাতে থাকা ফাইল, অ্যাসাইনমেন্ট, কাগজ— সব ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

শব্দে নুড়ি চমকে সরে দাঁড়াল। হটাৎ শব্দে

সৃজন দু- চোখ খুলে তারাহুরো করে উঠে বসলো –

প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি সৃজন । তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোজকে দেখে তার বুক ধক করে উঠল। রোজের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সেই চোখে কষ্ট…… ভাঙা বিশ্বাস। সৃজন কাপা গলায় বলে--

“ ফুল জান আমার!

হটাৎ নুড়িকে এতো কাছে দেখে।

নুড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলল—

“তুই? তুই এখানে কী করছিস?

নুড়ি তোতলাতে লাগল—

“ আ' আ ' আসলে ভাইয়া আমি!

কিন্তু রোজ আর কিছু শোনেনি।

সে ঘুরে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

“ ফুল জান আমার ! দাঁড়াও! কি হয়েছে জান!

বুঝতে পারে কিছুটা। আর নুড়ি কেমন তা সে ভালো করে জানে। সৃজন বিছানা থেকে নেমে ছুটে যেতে গিয়েও থেমে গেল। হঠাৎই রাগে ফেটে পড়ল সে।

“ তুই আমার রুমে কেন এসেছিস?

নুড়ি কেঁপে উঠল। সৃজন চিৎকার করে উঠল—

“ আমি তোকে কতবার বলেছি আমার আশেপাশে থাকবি না! আমি একজন যুবক ছেলে। অনুমতি ছাড়া আমার রুমে কেন ঢুকেছিস?

“ ভাইয়া আমি শুধু!

“ চুপ!

তার চোখ লাল হয়ে গেছে।

“আজ তোর জন্য আমার ভালোবাসার মানুষ আমাকে ভুল বুঝে চলে গেল।

- নুড়ি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

ভালোবাসার মানুষ?

তার মাথার ভেতর যেন শব্দটা ধাক্কা মারল।

সে কাঁপা গলায় বলল—

“ কি বলছো ভাইয়া? তুমি… কাউকে ভালোবাসো?

“ হ্যাঁ ভালোবাসি!

সৃজন গর্জে উঠল।

“ আমি আমার ফুল কে ভালোবাসি!

নুড়ির পৃথিবীটা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে অসহায়ের মতো বলল—

“ কিন্তু… ফুপিমা তো বলেছে… আমার আর তোমার বিয়ে হবে… তুমি আমার বর হবে ছোট থেকে তো এটাই জানি আমি!

“ওটা ' মা বলেছে। এই সৃজন না!

সৃজন দাতে দাঁত চেপে বলল।

“ আমি কখনো বলেছি, আমি তোকে বিয়ে করবো?

“ কিন্তু সবাই জানে…!

নুড়ির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

“ আমি তো তোমাকেই ভালোবেসেছি ভাইয়া… অন্য কাউকে কখনো ভাবিনি…।

সৃজন চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।

তারপর খুব কঠিন গলায় বলল—

“আমি তোকে কখনো বোন ছাড়া অন্য চোখে দেখিনি। আর দেখবোও না।

নুড়ি কেঁপে উঠল।

“ ভাইয়া প্লিজ কি বলছো এসব … তুমি বুঝতে না আমি তোমাকে ভালোবাসি?

“ আমি বুঝতাম।

সৃজনের কণ্ঠ এবার নিচু।

“ তাই তো তোকে এড়িয়ে চলতাম। তুই যখন বাসায় আসতি, আমি তোর সামনে যেতাম না। ইগনোর করতাম। কারণ আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি।

“ আমি কিছু জানি না…”তুমি আমার ভালোবাসা!

নুড়ি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।

“ আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি…”

“ কিন্তু আমি তোকে ভালোবাসি না! আর না কখনো ভালোবাসবো।

- এই কথাটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধল মেয়েটার বুকে।

ওদিকে রোজ দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে।

চোখের পানি কিছুতেই থামছে না।

হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“ প্লিজ জান! প্লিজ ভুল বুঝো না!

সৃজন। হাঁপাচ্ছে সে। রোজ কাঁপা গলায় বলল—

“ ছাড়ুন…”

“ না ছাড়বো না!

সৃজন প্রায় পাগলের মতো বলল।

“ আমি কিছু জানতাম না! বিশ্বাস করো! ও আমার মামাতো বোন। ও কখন আমার রুমে এসেছিলো আমি জানি না। আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম জান।

রোজ কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“ আমি নিজের চোখে দেখেছি…”

“ তুমি ভুল দেখেছো!

“ ভুল?

রোজ তিক্ত হেসে উঠল।

“ কনসার্টের দিনও কি ভুল ছিল? যেদিন একটা মেয়ে তোমার ফোন ধরে বলেছিল সে তোমার হবু বউ? তোমার আর তার পিক পাঠিয়েছিলো। সে তোমার রুমে ওড়না ছাড়া কিভাবে পিক তুলে?

সৃজন থমকে গেল।

রোজ কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“ আমি বিশ্বাস করিনি তখন। কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু আজ… আজ নিজের চোখে দেখলাম…”

“ জান!

“ না সৃজন "

সে মাথা নেড়ে পিছিয়ে গেল।

“তোমাদের দুজনকে ওই অবস্থায় দেখে আমার লজ্জা লাগছে…” আমি তোমাদের মাঝে থাকবো না। আর নাটক করার দরকার নেই। আমি সব দেখেছি নিজ চোখে।

সৃজন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে--

“ প্লিজ ফুল জান… তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না…

দূরে দাঁড়িয়ে সৃজনের মা সব দেখছিলেন।

প্রথমবার।

প্রথমবার তিনি দেখলেন তার ছেলে একটা মেয়ের জন্য এভাবে ভেঙে পড়েছে। তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। তাহলে… তিনি এতদিন ভুল ছিলেন?

নুড়িকে আশ্বাস দিয়েছেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

আর সেই ভুল আশাতেই মেয়েটা নিজের পুরো জীবন বেঁধে ফেলেছে সৃজনের সাথে। নিজেকেই এখন অপরাধী লাগছে তার। ওদিকে নুড়ি দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার চোখের সামনে সৃজন অন্য একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

যে ছেলেটাকে সে স্বামী ভেবেছে…

সে অন্য কারও জন্য পাগল। এর চেয়ে বড় ভাঙন আর কী হতে পারে? নুড়ি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—

“ ফুপিমা… সৃজন ভাই আমাকে ভালোবাসে না…”

সৃজনের মা মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিন্তু তার নিজের চোখও ভিজে গেছে।

কারণ আজ চারটা মানুষ একসাথে কষ্ট পাচ্ছে।

রোজ সৃজন কে ছেড়ে চলে যায়। এদিকে রোজ জেতেই সৃজন উঠে দাঁড়ায়। নুড়ি আর মায়ের কাছে গিয়ে সৃজন রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল—

“ তুই কেন আমার ফোন ধরেছিলি সেদিন? কেন উল্টাপাল্টা কথা বলেছিলি আমার ফুল কে ?

নুড়ি ভয় পেয়ে যায় সৃজন এর ধমকে,,,,সে তো ভেবেছিলো সৃজন কে বিরক্ত করে তাই যা মনে ছিলো সব বানিয়ে বানিয়ে বলেছে। আর রোজ সেটা ভেবে সেদিন মন খারাপ করেছে। সৃজনের আড়ালে তার রুমে ওড়না ছাড়া পিক ও তুলে পাঠিয়েছে। সৃজন অসহায় চোখে তাকায় মায়ের দিকে।

" মা কেনো করলো এমন তোমার ভাই এর মেয়ে? তোমায় তো বলেছিলাম আমি, নুড়িকে বোন ছাড়া আমি কিছু ভাবি না। আজ ওর জন্য আমার ফুল আমায় ভুল ভেবেছে। আমার ফুল কান্না করেছে। মা, আমি আমার ফুল কে এতো টা কষ্ট পেতে দেখি নি এর আগে কখনো। মেয়েটার যে এই সৃজন ছাড়া কেউ নেই।

কথা বলে চোখের পানি আড়াল করতে চলে আসে। একটা পেন্ট পরা আর খালি গায়। এমন অবস্থায় নুড়ির সামনে থাকতেও লজ্জা করছে।

সৃজন ধীরে ধীরে নিজের রুমের দরজা খুললো।

সারা শরীর জ্বরে পুড়ছে তার। চোখ দুটো লাল, মাথা ভারী হয়ে আছে। রোজের কান্নারত মুখ টাই তার ভিতর সব ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।

কিন্তু রুমে ঢুকেই সে থমকে গেল।

মেঝের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কিছু গোলাপ ফুল। সাদা আর হালকা লাল গোলাপ মিশিয়ে ছোট্ট একটা বুকে বানানো ছিল। কিন্তু এখন সব এলোমেলো। পাশে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা কয়েকটা অ্যাসাইনমেন্ট ফাইল। কিছু পেজ মেঝেতে পড়ে আছে।

সৃজন কপাল কুঁচকে ধীরে ধীরে এগিয়ে সব কিছু নিচ থেকে উঠায়।

কাল রাতে নাভানের কাছ থেকে সব নোট, বই আর তথ্য নিয়ে পুরো রাত জেগে সৃজনের অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করেছে সে। কারণ সৃজন জ্বরে অসুস্থ ছিল। সকাল হতেই ছুটে এসেছে তাকে দেখতে। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো।

একটা ছেলে, তার রুম, খালি গা, একটা মেয়ে খুব কাছে…তাদের যেমন ভাবে দেখেছে। যে কেউ ভুল বুঝতে পারে। রোজও ভুল বুঝেছিল।

আর সেই মুহূর্তে মেয়েটার চোখের কষ্টটা… এখন মনে পড়তেই সৃজনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

সে ধীরে ধীরে ফুলগুলো তুলে হাতে নিল।

ফুলগুলোর কিছু পাপড়ি ভেঙে গেছে।

ঠিক যেমন ভেঙে গেছে রোজের মন।

সৃজন চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।

তার এখন নিজের উপরই রাগ হচ্ছে বেশি।

রোজ তার অসুস্থতার খবর শুনে সারারাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট করেছে… ফুল নিয়ে এসেছে… আর সে মেয়েটাকে একটা ব্যাখ্যাও দিতে পারলো না।

সৃজন হঠাৎ দেয়ালে ঘুষি মারলো।

তার শরীর কাঁপছে জ্বরে, তবুও সে ওয়াশরুমে ঢুকে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলো। মাথা ঝিমঝিম করছে, কিন্তু তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—

রোজ কাঁদছে। গোসল শেষে শার্ট পরে সৃজন সোজা ভার্সিটির দিকে চলে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকতেই তার চোখ চারপাশে রোজকে খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ হেরা আর রুশাকে দেখতে পেল।

হেরা অবাক হয়ে বললো,

“ ভাইয়া আপনার এই অবস্থা কেন? আপনি নাকি অসুস্থ্য।

সৃজন সোজা প্রশ্ন করলো--

“রোজ কোথায়?

রুশা বললো--

“ সকালে বের হয়েছে। একটা কাজ আছে বলেছে। তারপর ভার্সিটিতে আসবে বলছিল।”

“এখনো আসে নি ?

“ না…

সৃজনের বুক ধক করে উঠলো।

হেরা এবার সন্দেহের চোখে তাকালো।

“ কি হয়েছে ভাইয়া?

সৃজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে সব খুলে বললো।

কীভাবে রোজ এসেছিল তাকে দেখতে।

কীভাবে ফুল আর অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এসেছিল।

আর কীভাবে ভুল বুঝে কষ্ট পেয়ে চলে গেছে।

সবটা শোনার পর যেন মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটাই থেমে গেল।

রুশার মুখ হাঁ হয়ে আছে। চোখদুটো অবিশ্বাসে বড় বড়। পাশে বসে থাকা হেরা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। যেন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে আসছে।

কখন যে নাভান এসে ঠিক হেরার পিছনে দাঁড়িয়েছে, সেটা কেউ টেরই পায়নি। সেও নিঃশব্দে সবটা শুনেছে। পুরো জায়গাটা তখন শুধু চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ। কারো মুখে একটা শব্দও নেই।

ঠিক তখনই হেরার ফোনে টুং করে একটা মেসেজ আসে।

শব্দটা এতটাই আচমকা ছিল যে সবাই চমকে ওঠে।

হেরা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলতে যাবে, ঠিক তখনই কেউ তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নেয়।

পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে নাভান ও অধীর।

নাভানের চোখদুটো অদ্ভুত রকম শান্ত, অথচ সেই শান্তির আড়ালে ভয়ংকর ঝড় লুকিয়ে আছে।

হেরা ফোনটা নিতে যাবে, তার আগেই নাভান নিচু গলায় বলে উঠে—

“রোজ তার বাসায় গেছে...”

সৃজন অসহায় চোখে তাকায় নাভানের দিকে। চোখদুটো লাল হয়ে আছে। যেন এই একটা বাক্যই তাকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

হেরা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কেড়ে নেয়। কাঁপতে থাকা হাতে মেসেজটা ওপেন করতেই সবাই নিঃশব্দ হয়ে যায়।

মেসেজটা ছিল—

“দোস্ত সরি রে... কিছু মনে করিস না।

তোদের না বলে বাবা মার কাছে চলে আসছি। খুব ইচ্ছে করছে তাদের সাথে একটু সময় কাটাই। অনেক দিন হলো মন খুলে কথা বলি না।

কবরের ওই খাদেমটাও বললো, আম্মু আব্বুর কবরের উপর অনেক আগাছা জমে গেছে... কেউ পরিষ্কার করে না। বল তো দোস্ত, আমার আম্মু আব্বুর কষ্ট হয় না?

তাই ভাবলাম একটু পরিষ্কার করে দেই... তাদের সাথে একটু কথা বলি। অনেক দিন হয় বুক ভরে কাঁদি না।

প্লিজ তোরা মন খারাপ করিস না। আমি আসবো... একটু নিজেকে সময় দেই। তোরা ছাড়া এখন আমার আর কেউ নেই...।

লিখাগুলো পড়ার সাথে সাথে হেরার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। একটা মানুষ কতটা একা হলে “তোরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই” লিখতে পারে?

রুশা নিজের মুখ চেপে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু চোখের পানি ঠিকই গড়িয়ে পড়ে। হেরা মুখ চেপে কান্না করে দেয়। অধীর ধীরে ধীরে রুশাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তার নিজের গলাটাও ভারী হয়ে আছে। রোজ কে তো বোন এর মতো দেখে, যতই দুষ্টুমি করুক ভাবি বলুক তাও তো বোন মানে।

সৃজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কোনো শব্দ নেই।

কোনো নড়াচড়া নেই। শুধু তার মাথার ভেতর বারবার একটা কথাই ঘুরছে—

“রোজ চলে গেছে...”

যে মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের ভালোবাসা ছাড়া বড় হয়েছে...

যে মেয়েটা প্রতিটা রাতে লুকিয়ে কাঁদতো...

যে মেয়েটা নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিত না...

সেই মেয়েটা আজ তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কাছ থেকেও ছলনা পেল। না! সে ছলনা করে নি পরিস্থিতি টা একটু ভিন্ন ছিলো। " যা ঘটে নি তাই রটে ছে " ব্যাপার টা এমন। ভালোবাসার মানুষটার থেকে এমন কিছু আশা করে নি রোজ।

এটাই কি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় না?

যাকে নিজের পৃথিবী ভাবো, সেই মানুষটাই যখন তোমার সাথে ছলনা করবে ..

সৃজন নিজের চুল মুঠো করে ধরে। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে নিজ হাতে রোজকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে। সে কেনো আগে নুড়ির কথা বলে নি। সব টা বলে দিলে তো এমন হতো না।

হঠাৎ নাভান ধমক দিয়ে উঠে—

“ নাটক করছো মিসাইল গার্ল?

হেরা চমকে তাকায়।

নাভান দাঁতে দাঁত চেপে আবার বলে—

" একটা মেয়ে চোখের সামনে বের হয়ে গেল, আর তোমরা কেউ জানলে না? এখন কেঁদে লাভ কি? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। রোজের বাসার ঠিকানা দাও।

হেরা রাগী চোখে তাকায় তার দিকে।

কিন্তু কিছু বলে না। তার চুপ থাকা দেখে নাভান এবার ভয়ংকর গলায় ধমক দেয়—

“ আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও! রোজ এর বাড়ির ঠিকানা দাও।

সবাই কেঁপে ওঠে। হেরা তো ভয়েই কাঁপতে থাকে।

আমতা আমতা করে বলে—

“ আ... আসলে... রোজের বাসার ঠিকানা আমরা জানি না...”

মুহূর্তেই নাভান তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়।

“বাহ! কি বন্ধুত্ব! এত মাস একসাথে থাকছো, অথচ বান্ধবী কোথায় থাকে জানো না? এটাই তোমাদের বন্ধুত্ব?

তার কথায় হেরা মাথা নিচু করে ফেলে।

কারণ সত্যিই তারা কখনো বুঝতেই পারেনি রোজ কতটা একা। নাভান এবার সৃজনের দিকে তাকায়।

“ আর তুই? তুইও জানিস না?

সৃজন ফ্যাকাসে মুখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।

নাভান হাততালি দিয়ে হেসে উঠে, কিন্তু সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই।

“ কি প্রেম রে বাবা! ভালোবাসার মানুষ কোথায় থাকে সেটাও জানিস না! গর্দভের দল একেকটা!

কথাগুলো বললেও ভিতরে ভিতরে সেও অস্থির হয়ে আছে। কারণ সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে—

এই মুহূর্তে রোজ কতটা ভেঙে গেছে। কারন সে নিজেও এই সন্দেহর স্বাক্ষী তার বাবা মায়ের ক্ষেত্রে। হঠাৎ তার চোখ পড়ে হেরার দিকে।

মেয়েটা চুপচাপ কাঁদছে। চোখদুটো টকটকে লাল। নাক টেনে বারবার কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।

নাভানের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে।

কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে জানে না।

তাই বরাবরের মতো রাগ দিয়েই ঢাকার চেষ্টা করে।

বিরক্ত গলায় বলে—

“ উফ! কান্নাকাটি বন্ধ করবে? মাথা ধরিয়ে দিচ্ছো!

বলেই পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে হেরার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

“ নাও। মুখ মুছো।

হেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড।

তারপর চুপচাপ রুমালটা নিয়ে চোখ মুছে।

রুমালটা শক্ত করে ধরে রাখতেই নাভান কপাল কুঁচকে বলে—

“এইটা কি স্মৃতি হিসেবে রেখে দিবা নাকি?

বলেই হুট করে রুমালটা টেনে নেয়।

তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে বের হয়ে যায়।

হেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার দিকে।

চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন