#এক_মিঠে_রোদের_গল্প
#লেখিকা_ঐশী
#পর্ব_৩
—কী! ভাইয়া এসে গেছে?
পরে ফ্রেশ হবো, আগে ভাইয়ার সাথে দেখা করে আসি!
আর কারও কথা না শুনে উপরের দিকে দৌড় দিল মায়া।
পেছন থেকে মধুমিতা চিৎকার করে বলল,
—আস্তে যা! পরে হাত-পা ভাঙবি নাকি?
এদিকে সামির তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে নিচে যাচ্ছিল। খিদের জ্বালায় পেটে যেন ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। করিডোর পার হয়ে সিঁড়ির দিকে যাবে, তখনি সামনে কে যেন ধাক্কা খেয়ে ফ্লোরে পরে গেল!
—ও মাগো! আমার কোমর শেষ!
মাএ মায়ের কাছে কান মুলা খেয়ে এসেছি,এখন আবার কোন হাতি আমার কমড় ভেঙ্গে দিলো।
সামির স্থির দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
মায়া কোমর ধরে উঠে কিছু বলতে যাবে।
তার আগেই সামির ধমকে উঠল,
—পাখির মতো উড়ে উড়ে কোথায় যাচ্ছিলি?
ধীরে-সুস্থে হেঁটে যেতে পারিস না? হাত-পা ভাঙার শখ জেগেছে নাকি?
মায়া বোকার মতো সামিরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কে এই লোক? আর তাকে এভাবে ধমকাচ্ছেই বা কেন? মায়া কিছুই বুঝতে পারছে না।
মায়ার হাবভাব দেখে সামির আবার বলে উঠল,
—এমন হাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?
সামনে থেকে সর। খিদে পেয়েছে, নিচে যাব।
এই বলে মায়াকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় সামির।
মায়া সামিরের যাওয়ার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার ভাইয়ার কথা মনে পড়তেই আবার দৌড় দিল সে দিকে।
মৃন্ময় রুমের দরজা হালকা চাপানো ছিল, তাই মায়া সোজা রুমের ভেতরে ঢুকে পরে।
মৃন্ময় তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল সেট করছিল। হঠাৎ আয়নায় মায়াকে দেখতে পেয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়াতেই মায়া ছুটে গিয়ে মৃন্ময়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কত বছর পর নিজের ভাইয়াকে দেখছে, আবেগী মায়ার চোখে জল এসে পরে।
মৃন্ময় মায়াকে সামলে নিয়ে বলল,
—আরে পাগলি! কান্না করছিস কেন? আমি তো চলে এসেছি। আসার পর থেকেই সবাই কান্না করে করে আমার মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। তুই আর প্যাচপ্যাচ করিস না। কান্না করলে তোকে দেখতে একদম পেত্নীর মতো লাগে।
অভিমানী মায়া সঙ্গে সঙ্গে গাল ফুলিয়ে বলল,
—হু! আমি তো পেত্নী, তোমার কপালে একটা পেত্নী বউ জুটবে, দেখো!
—আচ্ছা, পরে দেখা যাবে। তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আর শরীরে এত ময়লা কেন? যা, আগে ফ্রেশ হয়ে নে। আর তোর জন্য গিফট এনেছি তোর রুমে রাখা আছে, গিয়ে দেখে নিস পছন্দ হয় কি না।
গিফটের কথা শুনতেই মায়া খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
—তুমি আমার বেস্ট ভাইয়া! লাভ ইউ ভাইয়া!
মৃন্ময় মায়ার মাথায় চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
—Love you too, my little sister.
তারপরা মায়া খুশি মনে রুম থেকে চলে যায়। মায়া বেরিয়ে গেলে, মৃন্ময়ও নিচে চলে যায়।
নিচে গিয়ে দেখে, সবাই তার অপেক্ষায় বসে আছে। আজ বাড়ির কর্তারা সবাই একসঙ্গে খাবার খাবে।
যৌথ পরিবার তাদের,
বিশাল বড় তালুকদার ভিলায় পরিবারের সবাই মিলেমিশে থাকে। বাড়িটা যেমন বিশাল, বিশাল বড় তাদের ডাইনিং টেবিল। এত বড় পরিবারে ভাইয়েরা কিংবা বাড়ির বউরা কখনো ঝগড়া-বিবাদে জরায় না, বরং একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকাই এই পরিবারের সবচেয়ে বড় নিয়ম।আজও সেই নিয়মের ব্যতিক্র হয় না।
তাদের এই মিলের জন্য গ্রামের লোকজন তাদের অনেক সম্মান করে এবং সবার মুখে মুখে তালুকদার বাড়ির প্রশংসা শুনা যায়।
সুলতান তালুকদার নাতি কে দেখে তার পাশে বসতে বলে,
মৃন্ময় চুপচাপ গিয়ে দাদার পাশে বসে পরে, খাওয়ার মাঝে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মৃন্ময় গম্ভীর মুখে হু,হ্যাঁ! ছাড়া আর কোন শব্দ বের করল না। সামির অবশ্য সবার সাথে গল্প করছে আর জমিয়ে খাবার খাচ্ছে, সবার খাওয়া শেষ না হতেই মৃন্ময় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উঠে চলে যায় নিজের বরাদ্দ রুমের দিকে।
তার এই গাম্ভীর্য স্বভাব যেন জন্ম থেকে নিয়ে এসেছে।
এত বছর পর বাড়িতে এসেছে সবার সাথে কথা বলবে তা না করে নিজের মত থাকে।
এই দেখে মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! ছেলে তার দিন দিন উগ্র, বেখেয়ালিপনা! হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে এই ছেলেকে ঠিক করবেন তিনি।
.
বিকেলের দিকে নূরারী আর মিশু আসে তালুকদার ভিলায়। কলিংবেল বাজাতেই মায়া এসে দরজা খুলে নূরারী আর মিশুকে ভেতরে নিয়ে যায়।
—কিরে, এখন আবার কে আসলো!
বলতে বলতে শিরীন এদিকে এসে দেখে নূরারী আর মিশু এসেছে। নূরারীকে দেখে শিরীন খুশি হয়ে যায়।
নূরারী খুব মিশুক মেয়ে। তালুকদার বাড়িতে তার আসা-যাওয়া হয়ে থাকে। মায়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা বেশ গভীর, আর সেই সুবাদে তালুকদার বাড়ির প্রতিটি মানুষই নূরারীকে খুব ভালো করে চেনে।
শিরীনকে দেখে নূরারীও হাসি দেয়। আর পেছনে তাকাতেই দেখে, সুলতানা তালুকদার বসে আছেন। নূরারী সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে সালাম দেয়।
—আসসালামু আলাইকুম, দাদাজান। কেমন আছো?
সুলতান তালুকদার মুচকি হেসে সালাম এর উওর দিয়ে তাকে পাশে বসতে বলেন। নূরারী কে ভদ্র লোক সেই পছন্দ করেন তার সাথে জমিয়ে গল্প করতে পারে যে। আর কেউ তো তার সাথে গল্প করতে চায় না।
কিন্তু মায়া নূরারীকে বসার সুযোগই দিল না। মৃন্ময় তার জন্য কী কী এনেছে, সেসব না দেখানো পর্যন্ত যেন মায়ার মন কিছুতেই শান্ত হবে না।
মায়া নূরারীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
—পরে দাদার সাথে গল্প করবি, আগে আমার সাথে আয়।
—আরে ছেমড়ি, এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিস কেন? পড়ে যাব তো!
মায়া নূরারীর কথা শুনলে তো!
মায়া একদম রুমে এনে হাত ছাড়লো।
দুজন এখন বিছানায় বসে আছে। মায়া একটা বড় লাগেজ খুলতেই দেখল, পুরো লাগেজ ভর্তি জিনিস, সব মায়ার জন্যই। নূরারী এত জিনিস দেখে তো পুরো টাসকি খেয়ে বসে আছে।
এর মধ্যেই মায়ার রুমে এলো,
রিমঝিম, সেঁজুতি, শায়নী আর আনিশা।
শায়নী রুমে ঢুকেই প্রথমে নূরারীর গুলুমুলু গাল দুটো টেনে দিল। রিমঝিম আর সেঁজুতিও গাল টেনে দিল। সবাই গাল টানাটানি করায় নূরারীর ফর্সা গাল দুটো একদম লাল হয়ে গেল।
নূরারী গালে হাত দিয়ে বলল,
—ভাবি, আপু! তোমরা আমার গালের কী অবস্থা করেছো! সব সময় আমার গাল নিয়ে টানাটানি করো শুধু ভালো লাগে না।
শায়নী মিষ্টি হেসে বলল,
—তোর নাদুস-নুদুস গাল দুটো দেখলে টেনে দিতে ইচ্ছে করে, কী করব বল?
শায়নীর ভাবি রিমঝিম বলল,
—সত্যি, তোমার গাল না টানলে ভালোই লাগে না। আর কতদিন ধরে আসো না! তোমার গাল দুটো অনেক মিস করেছি।
নূরারী তাদের কথায় ঠোঁট উল্টে বসে রইল।
মায়ার এক লাগেজ ভর্তি জিনিসপত্র দেখে আনিশা আক্ষেপের সুরে বলে,
—মৃন্ময় ভাইয়া তোর জন্য এক লাগেজ ভর্তি জিনিস নিয়ে এসেছে! আর আমার ভাইটাকে দেখ, আমার জন্য হাফ লাগেজের জিনিসও আনেনি!
আনিশার কথায় শায়নী, সেঁজুতি আর রিমঝিমও তাকালো লাগেজটার দিকে । লাগেজ দেখে তারাও অবাক হয়ে গেল। এত বড় একটা লাগেজ ভর্তি জিনিসপত্র! বাড়িতে সবার চেয়ে বেশি গিফট মনেহয় মায়ার জন্যই এনেছে। আনবে নাইবা কেন? আদরের ছোট্ট বোন বলে কথা। সবাই জানে, মৃন্ময় মায়াকে কতটা ভালোবাসে। সুইজারল্যান্ডে থাকাকালীন মৃন্ময় সবার সঙ্গে নিয়মিত কথা না বললেও মায়ার সাথে প্রতিদিন কথা বলত। আর মৃন্ময় একদিন কল না দিলে মায়া রাগ করে বসে থাকত।
সবার এভাবে অবাক হওয়া দেখে মায়া সরল গলায় বলল,
—আমি তো নিজেও ভাবিনি, আমার জন্য ভাইয়া এত কিছু নিয়ে আসবে।
সেজুঁতি মায়ার পাশে বসতে বসতে বলল,
—আরে বাঁধদে, আগে দেখা তো ভাইয়া কি কি! এনেছে তোর জন্য।
তারপর সবাই মিলে মায়ার জিনিসপত্র দেখতে দেখতে অনেক গল্পগুজব আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠে।
কিছুক্ষণ পর নূরারী বিচলিত হয়ে বলল,
—আমি চলে যাব। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আরও দেরি করলে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। আর মিশুও তো নিচে অপেক্ষা করছে। আমি যাই।
কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বাইরে চলে যেতে লাগলো নূরারী।
.
এদিকে নিচে বসে মিশুর প্রায় কাঁদো-কাঁদো অবস্থা। সেই কখন নূর উপরে গিয়েছে, অথচ এখনো নিচে নামার নাম নেই। তার ওপর সুলতান তালুকদার তাকে পাশে বসিয়ে একের পর এক গল্প করেই যাচ্ছে। মিশু উঠে উপরে যাবে, সেই সুযোগটাও দিচ্ছে না। অসহায় মিশু মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে শুধু হু-হা!করে যাচ্ছে আর বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
ঠিক তখনই ওপর থেকে নূরকে নিচে আসতে দেখে, মিশুর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
(মিশু মনে মনে বলে)
—যাক! এই বুইড়ার বকবক থাইক্কা বাচুম!
নূরারী মিশুর সামনে এসে বলল,
—মিশু, ওঠ তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে। দেরি করলে রাত হবে যেতে যেতে।
পাশ থেকে সুলতান তালুকদার কিঞ্চিৎ অভিমান নিয়ে বললেন,
—নূরদাদু, তুই আজকে আমার সাথে গল্প করলি না।
—আরেকদিন এসে গল্প করব দাদাজান। আজকে আসি।
এই বলে মিশু আর নূর চলে যেতে থাকে সদর দরজার দিকে।
মৃন্ময় নিচে আসছিল কফি খেতে। কিন্তু সদর দরজা দিয়ে দুটো মেয়েকে বেরিয়ে যেতে দেখে, সেদিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে আউরালো,
—মাশাআল্লাহ! এত সুন্দর লম্বা চুল! কে সে?
সোফায় দাদাকে বসে থাকতে দেখে মৃন্ময় তার স্বভাবসুলভ গম্ভীরতা বজায় রেখে কিছুটা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—দাদা, ওই লম্বা চুলের মেয়েটা কে ছিল?
সুলতান তালুকদার মনে হয় কিছুটা অবাক হলেন। যে ছেলে বাড়িতে আসার পর থেকে চুপচাপ। কারও সাথে তেমন কথাই বলেনি। অথচ এখন কিনা একটা লম্বা চুলের মেয়েকে দেখে জানতে চাইছে, মেয়েটা কে!
সুলতান তালুকদার রসিকতার সুরে বললেন,
—আমার না-হওয়া বউ!
—হোয়াট?
—বলছি কী, কেশপরীর প্রেমে পড়লে নাকি দাদুভাই?
কথাটা বলেই হাসতে লাগলেন তিনি।
মৃন্ময় কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ ফেলে কিছু না বলে চলে যায়।
মেয়েটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাটাই যেন তার ভুল হয়েছে। সত্যিই তো, মেয়েটা যে হোক সে জেনে কী করবে?
চলবে......
( সবাই লাইক কমেন্ট করে যাবেন 🥰 )
পর্ব 3
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান