#উপন্যাস_নাম
#এক_মিঠে_রোদের_গল্প
#লেখিকা_ঐশী
#পর্ব_২
তালুকদার ভিলা
______০______
তালুকদার ভিলার সামনে এসে গাড়িটা থামালো মৃন্ময়, দারোয়ান গেট খুলে দিতেই মূল গেট দিয়ে ল্যাম্বরগিনি গাড়িটা একদম পার্কিং লটে দিকে নিয়ে যায়।
.
বাড়ির ভিতরে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ, কারও কথাবার্তা হাসির আওয়াজ।
মধুমিতা: আপা ওরা তো এখনো আসছে না। সে কখন বললো তারা গ্রামের রাস্তায় আছে, এখনো আসছে না কেন? কতবার করে বললাম তর বাবা বা অন্য কাউকে পাঠাই? তোদের নিয়ে আসতে! না করে দিলো, বলে দরকার নেই কারো, কষ্ট করে আসার কোনো মানে হয় না! আমরা একাই আসতে পারবো, আমরা ছোট্ট বাচ্চা না যে পথ ভুলে হারিয়ে যাব! এতো দিন পর আসছে তাকে আনতে গেলে নাকি কষ্ট হবে।
শিরীন: আহ্ মেজো এতো চিন্তা করিছিস কেনো? একটু পরে এসে পরবে তারা, তখন না হয় একটু বকে দিবি কেমন।
জেসমিন: তখন কি আর বকা দিতে পারবে আপা, কেঁদেই তো কুলপাবে না। সকাল থেকে তো দুই আপা মিলে কান্না করছে, আবার ছেলেদের জন্য পছন্দের রান্না করছে।
আফিয়া: কি করবো ভাবি বলো, মনতো আর মানছে না কখন ছেলেটাকে দেখবো চোখ দুটি খাঁ-খাঁ করছে দেখার জন্য।
জেসমিন: জানি তো, আমরাও তো অপেক্ষায় আছি! তারা এখনি মনে হয় এসে পরবে।
মধুমিতা: আমার পায়েস রান্না শেষ, তোমার চিংড়ির মালাইকারি রান্না কি শেষ হলো আফিয়া, বড় আপা তোমার মাংস রান্না কতদূর।
আফিয়া: এইতো শেষ এখন নামিয়ে নিবো।
শিরীন: আমার রান্নাও শেষ এখন সব টেবিলে গুছালে কাজ শেষ।
চার জাঁ আর ননদ মিলে-মিশে টেবিলে সব রান্না করা খাবার সজাছে, সারা টেবিল ভর্তি নানা রকম রান্না, পুরো বাড়ি গন্ধে "ম-ম" করছে! মনে হচ্ছে এখনি খাবারের উপর হামলে পরবে সবাই। বাড়ির কর্তারা এক সাথে বসে চা খাচ্ছে আর খুস গল্পে মেতে আছে, ছোট্টরা সবাই টেবিলে সাজানো দেখচ্ছে আর খাবারের ঘ্রাগ নিচ্ছে।
তখনি বাইরে গাড়ির শব্দ পায়,
আফিয়া: তারা মনে হয় এসে গেছে ভাবি।
সবাই শব্দ পেয়ে বাইরে দিকে যেতে অগ্রসর হয়। এতো বছর পর তালুকদার ভিলায় যেন প্রান ফিরে এলো,
তারা বাইরে গিয়ে দেখে গাড়ির ডোর খুলে মৃন্ময় আর সামির বেরিয়ে আসছে।
তারা কাছে আসতেই মধুমিতা মৃন্ময়কে জরিয়ে দরে কন্না করে দেয়।
সামির তার মা কে জরিয়ে দরে তিনিও কান্না করছেন।
সবার মাঝে যেন কান্নার রোল পরে যায়, এটা দূঃখের নয় খুশির কান্না।
মৃন্ময়ের মা অভিমানি গলাই বলল,
—তর এতো দিন পর মনে পরলো মায়ের কথা, কতোবার বলার পরো আসলি না।
সয়ফুল: এখনে কি বকাঝকা দিবে নাকি! আগে ভিতরে নিয়ে যাও এতোটা রাস্তা র্জানি করে এসেছে।
সামির: হে মামা ঠিক বলেছো! আর খিদে পেটে চোঁ-চোঁ করছে,নআম্মু তারাতাড়ি চলো তুমার ছেলে খিদের জ্বালায় কিছুখনের মধ্যে শুকিয়ে যাবে।
সবাই সামিরের কথা শুনে হেসে দেয় এবং সবাই একসাথে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।
প্রথমে দাদা,দাদী কে সালাম করে মৃন্ময় আর সামির, তারপর বড়দের সবাইকে সালাম করে কুশল বিনিময় করে। তারপর ছোট্ট ভাই বোনদের সাথে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে। পুরোটা সময় মৃন্ময় গম্ভীর মুখে কথা বলছিলো।
এটা দেখে আফিকুল তাদের উদ্দেশ্য করে বলল,
—যাও বাবা! আগে তোমরা ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নাও, তার পর গল্প করা যাবে।
মৃন্ময় আর সামির আচ্ছা বলে! ফ্রেশ হতে চলে যায়। তাদের জন্য আলাদা করে ঘড় গুছিয়ে রাখা হয়েছে, বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে গাড়ি থেকে লাগেজ এনে তাদের রুমে রেখে যায়, মৃন্ময় একটা লম্বা শাওয়ার নেওয়ার জন্য বাথরুমে চলে যায়।
সামিরও গোসল করার জন্য লাগেজ থেকে কাপড় বের করতে নেয় তখনি রুমে ঢুকে আনিশা।
আনিশা রুমে ঢুকে সামিরকে বলে,
—কিরে ভইয়া তর লাগেজে কি আছে! দেখা আমার জন্য কি গিফট এনেছিস।
সামির মুখ বাকিয়ে বলল,
—এএহ্! আসছে, তোর জন্য কোন দুঃখ গিফট আনবো! আর আনলেও কি আমি রুমে নিয়ে আসবো নাকি, বাড়ির সবার জন্য গিফট আনা হয়েছে যা দেখ গিয়ে।
গিফট মানেই খুশি,
এই খুশিতে আনিশা সামিরকে জরিয়ে ধরে বলে, —লাভ ইউ ভাইয়া।
—যে শুনেছিস গিফট এনেছি ওমনি ভালাবাসা বেড়ে গেলো।
—তোমায় আমি ভালোবাসি না বলছো,(কাঁদো কাঁদো করে বললো আনিশা)
—হয়ছে, আর ডাং করতে হবে না! যা এখন আমি ফ্রেশ হবো।
আনিশা চলে গেলে সামিরও ফ্রেশ হতে চলে যায়।
অন্যদিকে..
নূরারী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বট গাছটার এদিকে যেতে থাকে, আজকে ওই হারামি গুলোকে ছারবে না। তাকে একা ফেলে আশা মজা বুঝাবে!
—ওই হারামিদের জন্য আইজকা আমার এই হাল, ওই খবিস নাক উচুঁ বেটার কথা শুনতে হইলো!
নিজ মনে বিড়বিড় করতে করতে বট গাছটার নিচে এসে যায় নূরারী।
আর দেখতে পায়, সবকয়টা হারামির দল চট বিছিয়ে লবণে গুড়োলঙ্কা মিশিয়ে লবণের রং পালটে বসে আছে। নূরারী অপেক্ষায় ছিল!
—হু, থাকবে না কেন? তার কাছে তো মূল্যবান জিনিসটা আছে, যেটা সে মরে-বাঁচতে বাঁচতে নিয়ে এীরসেছে।
নূরারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়া বিরক্ত গলায় বলল,
—কিরে নূর, এত দেরি করলি কেনরে? আমরা হেই কহন থেইক্কা বইয়া রইছি, আমার আবার বাড়ি যাইতে হইব আইজকা আমার ভাইয়া আইব, আয় তাড়াতাড়ি পেয়ারা দে।
পাশ থেকে সামিদ বলল,
—কিতা হইছেলো নূর? আই, বাইনা পেয়ার দে খাই মন মানতাছে না।
মিশুও বলে উঠলো,
—কিরে পেয়ারা গুলা কই রাখছস? দে না খাই,
পেছন থেকে হাত এনে বাঁশের কঞ্চি বের করলো নূর, রাস্তা থাইক্কা লইয়া আইছে, এদের পিটাবে বলে।
নূরারী রাগে ফুঁসে ওঠে বলল,
—আয় তোগরে জন্মের পেয়ারা খাওয়াইতাছি, আমারে কুত্তার মুখে ফালাইয়া থইয়া তোরা ভাগছস, এহন আবার পেয়ারা চাইতাছস!
নূর বলতে বলতে,
মায়া, করিম, মিশু আর সামিদকে পিটাতে লাগলো।
সবাই একসাথে চিৎকার করতে লাগলো,
ওমাগো! মা! ছাইড়া দে বইন, আর জীবনে তরে একা রাইখা যাইতাম না, এহনও বিয়া করি নাই মরে গেলে....আহ্ নূর, ব্যথা লাগতাছে আর মারিস না!
ক্লান্ত হয়ে নূর দপ করে বসে পড়লো চটের উপর, এবার একটু শান্তি লাগতাছে সব রাগ ইচ্ছামত ঝাড়তে পেরে, সবাই শরীর ডলতে ডলতে নূরারীর পাশে বসলো।
আর কিছু না বলে নূর সবাইকে একটা করে পিয়ারা দিয়ে বাকি চারটা নিজে রেখে দিলো।
এটা ওদের শাস্তি আজকে নূর বেশি পেয়ারা খাবে, ইচ্ছা তো করছিলো সবগুলি একাই খেয়ে ফেলবে।
নূরারীর কাছে বেশি পেয়ারা দেখে মায়া বলল,
—তুই না আমার সতিন—থুক্কু,সই! আমারে আরেকটা দে।
নূর দিলো না আপনমনে তার পেয়ারা খেতে থাকলো।
মায়া এবার একটু চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—নূর তুই ওই কুত্তাগুলার থেইকা বাইচ্চা আইলি কেমনে?
নূর ক্রুদ্ধ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
—মানে কি তোরা চাইছিলি আমি মইরা যাই?বাইচ্চা না আই?
সবাই একসাথে মাথা ঝাঁকিয়ে না,না,না বলতে লাগলো
মায়া মিনতি সুরে আবার বললো,
—বল না, কী করে আসলি?
নূরারী সবার দিকে তাকিয়ে সব ঘটনা বলে শেষ করতেই সবাই হো হা হো করে হাসতে লাগল।
—তোরা আবার হাসতাছোস ক্যান?
করিম হাসতে হাসতে বলল,
—নূর না,না...নুনু হা হা হা!
বলতে বলতেই করিমের সথে সবাই আবার হেসে দিল। তাদের গা জ্বালানো হাসি দেখে নূরারী রাগে ফুঁসছে। সবাই নূরের রাগী মুখ দেখে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ পারছে না।
তাই মায়া পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বলে উঠলো,
—দুপুর মেলা হইছে আমি জায়গা,আমার ভাইয়া আইবো। নূর,মিশু তোরা বিকালে আমার বাড়িতে আইবি ভাইয়ের লগে দেহা করায় দেম। আর এমনিতেও তো অনেক দিন ধইরা যাস না।
পাশ থেকে সামিদ,করিম বলল,
—আমাদের নিবি না?
মায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—তরা যাবি হালা! তরা যতবার গেছস, ততবার জামেলা বাধাস এইবার আর না, ঘুরতে বের হইলে তখন দেখিস। আর জানোস আমার ভাই বিদেশ থেইকা কিযে সুন্দর হইছে! আমি মোবাইলে দেহি তো। আর তরা হুন, আমাগোর বাড়িতে গিয়া কিন্তু কেউ অশুদ্ধ ভাষায় কথা কইবি না। মনে থাহে যেন! জানোস তো, আমাগোর বাড়ির কেউ অশুদ্ধ কথা কয় না, শুনতে পারে না, সবাই যে শহর থেকে পড়েলেখা কইরা আইছে।
মিশু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তাইলে তুই কেমনে আমাগোর লগে কস?
মিশুর মাথায় গাট্টা মেরে মায়া বললো,
—আমারে কোন দিন দেখছস বাড়ির কারও লগে অশুদ্ধ ভাষায় কথা কইতে? তগোর লগে থাকলে শুধু এমন কইরা কথা কই। না হলে শুদ্ধ কথা কইতে হয়। আমাগোর বাড়ির কেউ অশুদ্ধ কথা পছন্দ করে না।
নূরারী চুপচাপ সব শুনছিল, এতো খন পর মুখ খুলে ভেংচি দিয়ে বলল,
—ইশ রে! কী আমার শুদ্ধ ভাষার পরিবার থেইকা শুদ্ধ পরী নাইমা আইলো রে! আমরা শুদ্ধ কথা কইতে পারি, আর তগো বাড়ি গেলে যে শুদ্ধ কথা কইতে হইবো, ওইডাও জানি বারবার এক কথা মনে করাইতে হইবো না।
আর কী জানি কইলি? তর ভাই সুন্দর হইয়া আইছে? তাতে আমাগো কী? তরে নিয়ে গেল না কেন? তুইও সুন্দর হইয়া আইতি!
— আরে নূর,চেতস কেন? এহন কথা কওয়ার সময় নাই, দেরি হইলে মা বকবো আমি যাই। আর নূর তুই আইবি কিন্তু,
—হো! আমার এমনেও যাইতে হইবো আম্মা খেতা(কাঁথা) দুইটা সেলাই রাখছে দিতে হইবে বড় আম্মারে।
আর কেউ কথা না বাড়িয়ে সবাই যার যার বাড়ির দিকে চলে গেল।
.
এদিকে মায়া ভয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
—যাক! ভাইয়ারা মনে হয় আসেনি!
মায়া নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল, শরীরে কী ময়লা! মা দেখলে তার খবর আছে। আগে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে হবে। এই ভেবে চুপিচুপি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে যাবে, তখনই পিছন থেকে মধুমিতা মায়ার কান মুচড়ে ধরল।
মায়া ব্যথায় চোখ টলমল করে বলল,
—আউচ! আম্মু, ব্যথা লাগছে তো! ছেড়ে দাও। আর কখনো এমন করব না। সব সময় বাসায় থাকব।
পাশ থেকে মায়ার বড় আম্মু বলল,
—ছেড়ে দে না, মেয়েটা ব্যথা পাচ্ছে। মায়া, তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। তোর ভাইয়ারা সেই কখন এসে গেছে, আর তুই এত দেরি করলি? কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
মধুমিতা মায়ার কান ছেড়ে দিয়ে রাগি গলায় বলল,
—এই মেয়েকে কে না মারলে শিক্ষা হবে না! সারাদিন উড়নচণ্ডীর মতো ঘুরে বেড়ায়।
মায়া মায়ের কথায় কান না দিয়ে বলল,
—কী! ভাইয়া এসে গেছে?
চলবে....
( সবাই সাপোর্ট করবেন প্লিজ 🥰)