#উপন্যাস_নাম
#এক_মিঠে_রোদের_গল্প
#লেখিকা_ঐশী
#পর্ব_৪
ভোরের মিষ্টি রোদের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে রমণীর ফর্সা মুখে আছড়ে পড়ছে। বাইরে পাখির কিচিরমিচির জানান দিচ্ছে, সকাল হয়ে গেছে। বিছানায় ছড়িয়ে থাকা লম্বা কেশরাশি হালকা বাতাসে দুলছে। প্রকৃতির এত আয়োজন কি রমণীর ঘুম ভাঙাতে পারল?
না, তার ঘুম ভাঙানোর দায়িত্ব যে তার মাতা জননীর! হয় বকা, লাঠির বাড়ি, নয়তো পানি দিয়ে। হলোও তাই!
জাহানারা সেই কখন থেকে মেয়েকে ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়ে কি তার এত সহজে ঘুম থেকে উঠবে? তাই শেষমেশ নিজের স্টাইলেই ঘুম ভাঙানোর ব্যবস্থা করলেন।
এক জগ পানি এসে পড়ল নূরারীর মুখের ওপর।
পানি পড়তেই ধড়ফড় করে উঠে বসল নূর। ঘুমজড়ানো চোখে এদিক-ওদিক তাকাল। সে জানে, কে তাকে এভাবে ঘুম থেকে তুলতে পারে!
তাই চিৎকার করে বাবাকে বলল,
—আব্বা! তুমার বউরে জিগাও, প্রতিদিন আমার শান্তির ঘুম নষ্ট না কইরা। হে কী শান্তি পায়?
জাহানারাও কম যান না। একইভাবে বললেন,
—তুমার মাইয়ারে কও, সারাবেইল ঠেপ পারলে আর ঘুমাইলে হইবো না! তার যে সক্কালে কলেজ আছে, সে কথা কি হে ভুইল্লা গেছে? এহনি কও, কলেজে যাওনের লাইগা তৈর হইবার।
নুরুল শিকদার মা-মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসবেন নাকি কাঁদবেন, বুঝতে পারলেন না।
উপায়ান্তর না পেয়ে নূরারীর ঘরের দিকে গেলেন। বিছানায় মেয়েকে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে কাছে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
—যা মা, কলেজে যাওনের লাইগা তৈর হো। মায়ের আর রাগ বাড়াইস না।
নূর তার বাবার কথা কখনো অমান্য করে না। সব কথা শুনে। বাবাকে বেশি ভালোবাসে কিনা! তাই বাবার কথা রাখতে মুখ গোমড়া করে বিছানা থেকে উঠে কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে চলে গেল।
কলেজের ড্রেস পরে বারান্দায় আসতেই জাহানারা মেয়ের মাথায় বেনি করতে থাকলেন। বেনি করা শেষে মেয়েকে আপাদমস্তক দেখলেন।
দুধে-আলতা গায়ের রঙে সাথে শুভ্র রঙের কলেজ ড্রেসটা বেশ মানিয়েছে। কুচকুচে কালো চোখের মণি আর হরিণের মতো টানা টানা চোখ দুটো। ফুলো ফুলো গাল। শিল্পীর আঁকা নিখুঁত তুলির ন্যায় সুন্দর ঠোঁটজোড়া। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত নেমে আসা মসৃণ, রেশমি চুলের নিচের অংশে হালকা লালচে আভা,রোদের আলো পড়লে সেই লাল আভা আরও স্পষ্ট হয়ে চিকচিক করে ওঠে। সব মিলিয়ে নূরারীকে লাবণ্যময়ী, মিষ্টি পুতুলের মতো লাগছে।
মেয়ের এমন রূপ দেখে জাহানারা বদনজর থেকে বাঁচানোর জন্য বলে উঠলেন,
—মাশাআল্লাহ, আল্লাহুম্মা বারিক। কারও যেন নজর না লাগে।
এরপর, নুরুল শিকদার মেয়েকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন। মাঝেমধ্যে নিজ হাতে খাইয়ে দেন নূরারীকে। একমাত্র মেয়ে তার নয়নের মণি। তাই তো মেয়েকে মাথায় তুলে রাখেন। কোনো কাজই করতে দেন না।
কলেজ যাওয়ার আগে মেয়ের হাতে একশো টাকা দিয়ে বললেন,
—মা, তুরে কি আগাইয়া দিয়া আমু?
টাকা পেয়ে নূরারী তো মহাখুশি। আজ তার দলের সঙ্গে অনেক কিছু কিনে খাবে!
তাই হাসিমুখে বলল,
—তুমার যাওন লাগতো না। আমি মায়া, করিম, সামিদ, মিশু তাগর লগে যাইতে পারুম। তুমি তুমার কাজে যাও।
—আইচ্ছা, ঠিক আছে মা। তুই সাবধানে যাইস।
জাহানারা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন,
—কালেজে যাইতাছস, ভালা কইরা পড়বি, বাদে সোজা বাড়িত চইল্লা আবি। আর অন্য কারও গাছের দিকে নজর দিবি না। আমার কানে যাতে কোনো নালিশ না আহে তোর নামে। এত বড় ডেঙ্গি মাইয়া হইয়া গেছস, এহনও তোর নামে বিচার হুনা লাগে! আল্লাহ, তুমি এই মাইয়ারে একটু বুদ্ধি দিও।
নূরারী মায়ের এসব কথা নিত্যদিনই শোনে। তাই এসব কথা গায়ে না মেখে হাতের টাকা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে আনন্দিত মনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
তবে কলেজে যাওয়ার পথে তালুকদার ভিলায় না গিয়ে কি আর পারে? মায়াকে রেখে সে যাবে কী করে?
.
তালুকদার ভিলা—
সামির কফির কাপ হাতে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। ধোঁয়া ওঠা গরম কফিতে চুমুক দিবে, হঠাৎ পাশের বেলকনিতে চোখ যেতে দেখে মায়া চোখ ডলতে ডলতে বেলকনিতে আসছে।
পরনে প্লাজু আর ঢিলেঢালা টি-শার্ট। ঘুমে ফোলা ফোলা চোখ, কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা এলোমেলো চুল। সকালের হালকা রোদের আলো মায়ার উজ্জ্বল হলদে শ্যামবর্ণ মুখে এসে পড়েছে। সামিরের কাছে মায়াকে ভীষণ মায়াবী লাগছে।
সামির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এই মায়াবিনীর দিকে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মুচকি হাসি।
মায়া দুহাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙতে যাবে, ঠিক তখনই পাশের বেলকনিতে চোখ পড়ল। সামিরকে নিজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে দেখে মায়া অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সাথে সাথে হাত নামিয়ে নেয়। সামিরের হাসির কারণ বুঝতে নিজের দিকে তাকাতেই দেখে এলোমেলো চুল আর কুচকানো পোশাক। নিজেকে দেখে মনে হলো, কোনো রাস্তার পাগল।
—তার মানে আমার এই অবস্থা দেখে সামির ভাইয়া হাসছে? কী করব এখন? দৌড়ে রুমে চলে যাব, নাকি...
মায়ার এসব ভাবনার মাঝেই সামিরের ভারী কণ্ঠ কানে এলো,
—কী মহারানী, ঘুম ভাঙল? কলেজ নেই তোর? এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাস যে!
মায়া সামিরের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—হ্যাঁ ভাইয়া, আছে।
—তো এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কলেজের টাইম চলে গেলে পরে কলেজে যাবি।
মায়া তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল,
—না, না! আমি এখুনি রেডি হতে যাচ্ছি।
এই বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
রুমে ঢুকেই মায়া রাগে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
—সামির ভাইয়া এমন ধমক দিয়ে কথা বলে কেন? একটু কি ভালো করে কথা বলতে পারে না! প্রথম দেখায় কোমর ব্যথা দিল, সাথে ধমক ফ্রি। এখন সকাল হতেই আবার ধমক।
তবে একটা বিষয় কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। ছোটবেলায় কয়েকবার দেখেছিল সামিরকে। বিদেশে চলে যাওয়ার পর আর দেখা হয়নি। এত বছর পর প্রথম দেখাতে মায়া সামিরকে চিনতে পারেনি। অথচ সামির তাকে প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলেছে!
—কীভাবে সম্ভব? সামির ভাইয়ার সাথে তো কখনো ভিডিও কলে কথা বলা হয়নি? ভাইয়া আর সামির ভাইয়া তো এক দেশে একসাথে থাকত। ভাইয়া হয়তো আমার পিক দেখিয়েছে। হু, এমনটা তো হতেই পারে। উফ! এসব আজব চিন্তা করে শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করছি। এখন তাড়াতাড়ি রেডি না হলে নিচে গিয়ে আবার মায়ের বকা খেতে হবে।
এদিকে, মায়ার এমন ছুটে পালিয়ে যাওয়ার কাণ্ড দেখে সামিরের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হলো। বেলকনির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কফি খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
তখনই রুম থেকে আনিশার গলা ভেসে এলো।
—কী হয়েছে? সকাল সকাল এমন চিল্লাচ্ছিস কেন? বলতে বলতে রুমে এসে দেখে আনিশা গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—তো কী করব? তুই তো আমাকে ভালোবাসিসই না! মৃন্ময় ভাইয়াকে দেখেছিস? মায়াকে কত্ত ভালবাসে। মায়ার জন্য কত কী এনেছে! এক লাগেজ ভর্তি জিনিস! আর তুই আমার জন্য কী এনেছিস?
লাগেজের কথা শুনে সামিরের ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। আনিশা অবশ্য সেটা খেয়াল করল না।
‘সত্যিই কি এতগুলো জিনিস মৃন্ময় একা এনেছে, নাকি অন্য কেউ?’
সামির শান্ত গলায় বলল,
—এসব কথা বাদ দিয়ে আসল কথায় আয়। কেন এসেছিস, সেটা বল আগে। আর তোর জন্য যা নিয়ে এসেছি, তা নিয়েই খুশি থাক। নাহলে ফেলে দে।
আনিশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—ভার্সিটিতে যাব। টাকা দে।
সামির কোনো কথা না বলে ওয়ালেট থেকে কিছু টাকা আনিশার হাতে দিয়ে দিল।
টাকা পেয়ে আনিশা আর কিছু না বলে চলে গেল।
আনিশা চোখের আড়াল হতেই সামির ফোনটা হাতে নিল। গ্যালারিতে ঢুকে নির্দিষ্ট একটি অ্যালবাম খুলল।
স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠল একটি মেয়ের ছবি।
ছোট্ট মেয়েটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার একের পর এক ছবি। শৈশবের নিষ্পাপ মুখ থেকে কৈশোর পেরিয়ে আজকের সেই মায়াবী মুখ।
ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে সামির মৃদুস্বরে বলল,
—আমার মায়াবিনী।
মায়া ভাবছে, এত বছর পর সামির তাকে কীভাবে চিনল? অথচ উত্তরটা সামিরের ফোনের গ্যালারিতেই লুকিয়ে আছে।
চলবে......
(সবাই কমেন্ট করে জানাবেন কেমন লাগছে।আর বানানে ভুল থাকতে পারে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই 🥰)