ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৬৩তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৩(ক)

#jannatul_firdaus_mithila

“ ডু ইউ ওয়ান্ট আ গুড মর্নিং কিস দেড়ব্যাটারী?”

লজ্জার রক্তিম আভায় মুহুর্তেই লাজুক মায়াবিনীর গালদুটি কেমন রাঙা হয়ে উঠল। ত্রস্ত আঁখিজোড়া নত করতে না করতেই, আচমকা বেপরোয়া হাওয়ার বেগে তার কোমল তুলতুলে অধরযুগলের ওপর ঝুঁকে পড়ল রূঢ় মানব। প্রগাঢ় অধিকারবোধে বিনাবাক্যে আঁকড়ে ধরল রমণীর কম্পিত ওষ্ঠপুট! নিজ রুক্ষ অধরযুগলের এক অনভ্যস্ত স্পর্শের আকস্মিকতায় অপ্রস্তুত করে দিলো ভীত রমণীর সমস্ত সত্তাকে। বেহায়া লোকের এরূপ অবাধ্য পরশে কর্পূরের ন্যায় পুড়ছে মাহি। ক্ষুদ্র বদনের অদৃশ্য ঝংকারে বারংবার ডানা ঝাঁপটাচ্ছে পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রজাপতিগুলো। আবেশের বদলে ভীত-সন্ত্রস্ততায় কুঁচকে গিয়েছে তার হরিণী চোখদুটো। রমণী স্থির! প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গিয়েছে তার ঘর্মাক্ত হাতপা। ওদিকে বেপরোয়া যুবক নিজ উন্মত্ততায় লিপ্ত। একহাতে যানের কন্ট্রোলার টেনে রাখা তার, অন্যহাত অবাধ্যের ন্যায় বিচরণ চালাচ্ছে রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমরে। ক্ষনে ক্ষনে দুলে উঠছে মাহি। তা রূঢ় মানবের রুক্ষ অধরযুগলের সিক্ত আবেশে, না-কি বান্দার বেহায়া হাতের পরশে, তা কে জানে!

সময়ের উর্ধ্বগতিতে হাসফাস বেড়ে গেল মাহি'র। গভীর চুম্বনের দৃঢ়তায় নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় বেচারির, তক্ষুনি দু'হাতে ঠেলতে লাগলো বলিষ্ঠের রুক্ষ বক্ষভাঁজ। অন্যদিকে, নিজ প্রসন্ন কাজে হুটহাট বাধবিঘ্নে বড্ড বিরক্ত হলো মুগ্ধ। ত্বরিত গোছালো কপাল! ওষ্ঠপুটের কার্যক্রম অব্যহত রেখে পর্দা সরালো চোখের। দৃষ্টিতে একরাশ তীক্ষ্ণতা লেপ্টে পরপরই ঘন-ভ্রুযুগলের ইশারায় মানবীকে জিজ্ঞেস করল,

“ কি সমস্যা?”

বোকা মানবী উত্তর দিতে অপারগ। নিশ্বাস জুড়িয়ে আসার কষ্টে নিজ সিক্ত অধরযুগল রূঢ় মানবের আগ্রাসী ওষ্ঠপুটের বাঁধন হতে খানিক মুক্ত করতে চাইলেই বাঁধল আরেক বিপত্তি! বেয়াদব লোকটা তৎক্ষনাৎ ধারালো দাঁতের রুষ্টতায় পিষ্ট করে দিলো মানবীর নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুট। মুহুর্তেই তীব্র ব্যথায় গুঙিয়ে ওঠে মাহি। বেভুলার ন্যায় দু'হাতের তীক্ষ্ণ নখরের ডগাগুলো সঙ্গে সঙ্গে দাবিয়ে দিলো মুগ্ধের লোমহীন অর্ধউম্মুক্ত ফর্সা বক্ষে। তবে কান্ড দেখো! এতে পাহাড়সম লোকটার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। সে কেবল ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে মেয়েটার পানে। এতক্ষণ যাবত ধীরলয়ে মানবীর অধরজোড়ায় কর্তৃত্ব চালালেও এবার বড্ড রুক্ষ হলো রূঢ় মানবের পরশ। তা আর সইতে না পেরে তৎক্ষনাৎ গুঙিয়ে ওঠে মাহি,

“ উমমমম! উমমম।”

বিরক্তির শেষ নেই মুগ্ধের! মেয়েটার ওমন তীব্র বাধবিঘ্নে প্রসন্ন মনবিবাগে এক পশলা রাগের ঝাঁঝ লেপ্টে গেল তার। তক্ষুনি বিচ্ছিন্ন করল অধর যুগল। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, নিজ টকটকে বাদামী সিক্ত অধরজোড়ায় খানিক জিভের ডগা চালিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ ম'রে যাচ্ছিলি বেয়াদব? একটুখানি চুমুতেই ম'রে যাচ্ছিলি? আমায় না রাগালে শান্তি হয় না তোর তা-ই না?”

দু'হাত বুকের কাছে আঁটকে রেখে হাঁপাচ্ছে মাহি, টানছে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস! রূঢ় মানবের ওমন কিড়মিড় কন্ঠে আপাতত কিচ্ছু যায় আসে না তার। সে কেমন রয়েসয়ে ঢোক গিলে থেমে থেমে আওড়াল,

“ আরেকটু হলেই মে'রে দিচ্ছিলেন! এভাবে কেউ চুমু দেয়? এটাকে চুমু বললে নির্ঘাত চুমুকে অপমান করা হবে।”

সহসা কপালের ভাঁজ গাঢ় করল মুগ্ধ। দৃঢ় চোয়ালে নামালো বেশ খানিকটা তীক্ষ্ণতা। সুদর্শন মুখখানা মানবীর মুখের ওপর আরেকটু ঝুঁকিয়ে এনে গমগমে গলায় শুধালো,

“ তুই মনে হচ্ছে বেশ বড়ো মাপের চুমু স্পেশালিষ্ট হয়ে গিয়েছিস! তা..এতো পেঁকেছিস কবে থেকে শুনি?”

নতদৃষ্টিযুগলের ভারে অবনত হলো রমণীর নরম ঘাড়ের পেশী। ঘর্মাক্ত হাতের তালু দ্বয় একে-অপরের সনে বড্ড ঘষে যাচ্ছে সে। ধীরলয়ে যুবকের কোল থেকে উঠে যাবার প্রয়াস চালাতেই আচমকা দু'হাতে রমণীর পাতলা কোমর আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ। শক্ত মুখাবয়বে রাগের ছাপ ফুটিয়ে, কন্ঠে ঝাঁঝ লেপ্টে শুধালো,

“ হাউ ডেয়ার ইউ সিগনোরা!”

এরূপ বাক্যে কেঁপে ওঠে মাহি। তক্ষুনি বিভ্রান্তি নিয়ে তাকায় সুদর্শনের পানে। হতবিহ্বলের ন্যায় আওড়ায়,

“ আবার কি করলাম?”

“ তোকে আমি কোল থেকে উঠে যাবার অনুমতি দিয়েছি?”

আকাশ থেকে টপকালো মাহি। গাল বাঁকায় পরক্ষণে। চোখেমুখে বড্ড অতিষ্ঠ ভাবাবেগ ফুটিয়ে, অস্ফুটস্বরে আওড়াল,

“ কোল থেকে উঠতে গেলেও অনুমতি লাগবে? ইশশ্! কি বাজে দিনকাল এলো আমার।”

রমণীর অস্ফুটকন্ঠ! হেলিকপ্টারের তীব্র গর্জনের বিপরীতে যা কর্নধার হলো না রূঢ় মানবের। সে কেমন শক্ত চোয়ালে কটমট শব্দ তুললো খানিক। মাহি'র পানে কিয়তক্ষন চোখ পাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই দৃষ্টি ঠেকালো অদূরে। মেঘেদের রাজ্যে উড়ছে তার হেলিকপ্টার! কি সুন্দর স্মুদলি চলছে আকাশপথে। তবে এ যেন সহ্য হলো না বেপরোয়া, পাগলাটে মানবের। মুহুর্তেই তার চোখেমুখে নেমে এলো এক অদ্ভুত দুঃসাহসিকতার রেশ। আকাশপথে শান্ত পায়রার ন্যায় উড়তে থাকা আকাশযানটি পরমুহূর্তেই পাগলাটে রূঢ় মানবের খেলনা রূপে আবির্ভূত হলো। ডানহাতের কন্ট্রোল স্টিকে সামান্য চাপ দিতেই হেলিকপ্টারটি কেমন দ্রুততার সঙ্গে ওপরে উঠে গেল। সহসা ধ্বক করে উঠল রমণীর অন্তঃকোণ। হুটহাট বেগতিক টানে সম্মুখে হেলে পড়ল তার ক্ষুদ্র বদন, তা গিয়ে ঠাঁই পেলো মুগ্ধের রুক্ষ বক্ষে। রমণী ভীত-সন্ত্রস্ত কন্ঠে তক্ষুনি আওড়াল,

“ বিস্ট!”

কন্ঠটা বেশ শুনলো মুগ্ধ। ডানহাতের কন্ট্রোল স্টিকে ফের টান বসিয়ে, জিভ ঠেললো গালের ভাঁজে। শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে আওড়ে উঠল,

“ ইয়েস হটি!”

আতঙ্কে দু'হাত দিয়ে রূঢ় মানবের বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরেছে মাহি। ভয়ে কুঁচকে নিয়েছে দু-চোখ। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুধালো,

“ আস্তে চালান বিস্ট!”

তৎক্ষনাৎ অধর কামড়ে বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। আকাশের দিকে চেয়ে থেকে, দুষ্ট কন্ঠে প্রতুত্তর করল,

“ ওহ ফা'ক অফ বিউটি! ওসব উফফ! থামুন, আস্তে-ধীরে নামক শব্দ এখনো আমার ডিকশিনারিতে এখনো। যা এসেছে তার আগাগোড়ায় কেবল রাফনেস ভরপুর! তা... দেখবি না-কি একটু?”

ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ মাহি'র! অথচ লোকটার বেলাল্লাপনায় কমতি নেই একরত্তি। ভয়ার্ত মানবী তৎক্ষনাৎ প্রাণভয়ে মুখ লুকলো মুগ্ধের বক্ষভাঁজে। দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,

“ অসভ্যতামি বন্ধ করুন।”

এহেন বাক্যের অভিঘাতে সহসা কন্ট্রোল স্টিক হতে দু'হাত সরিয়ে আনে মুগ্ধ। উঁচিয়ে রাখে কাঁধের সন্নিকটে! মুখাবয়বে নির্বিকার ভাবস্রোত বজায় রেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধায়,

“ ওকে ফাইন! বন্ধ করলাম।”

হেলিকপ্টারটা এবার বড্ড এলোমেলো ভঙ্গিতে দুলছে। এ যেন মাঝি ছাড়া নৌকা! বোকা মানবী বুঝলো না এরূপ কান্ডের কারণ। সে কেমন অবোধের ন্যায় ধীরেসুস্থে মুখ উঠালো মুগ্ধের বক্ষভাগ হতে। পরমুহূর্তে যে-ই দেখল — মুগ্ধ হেলিকপ্টার উড়ানো রেখে দু'হাত উঠিয়ে বসে আছে, ওমনি দেহ খাঁচা হতে পরাণ পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবার উপক্রম বেচারির। বিস্ময়ে চোখ ছুঁলো কপাল। একমুহূর্ত হতভম্বতায় কাটাতেই পরক্ষণে রমণীর স্থির মস্তিষ্কে টনক নড়ল। অস্থিরতা জেঁকে ধরল তাকে। তৎক্ষনাৎ দু'হাতে মুগ্ধের বাহুদ্বয় চেপে ধরে দিকবিদিকশুন্য কন্ঠে আওড়াল,

“ ওরেএএএ! পাগললল। কি করছেন আপনি এসব? আমাকে মে-রে ফেলার হলে মাটিতেই মা'রতেন, শুধু শুধু ঢং করে আকাশে আনলেন কেনো? আরেহ! পাগলের সর্দার, হেলিকপ্টার উড়াতে না জানলে মুখ উঠিয়ে পাইলট ছাড়াই চলে এলেন কেনো? ওহ আল্লাহ রে! কোন পাগলের সঙ্গে আমি চলে এলাম খোদা। বড্ড ভুল করে ফেলেছি, ইয়া মাবুদ! আমার ঘাট হয়েছে এই পাগলের সাথে এসে। বেঁচে থাকলে আর কোনোদিন এই পাগলের সাথে আসবো না কোথাও। আর না! এই পাগল, এক্ষুনি হেলিকপ্টার উড়াবেন, নাকি আমার থোবড়াই দেখতে থাকবেন? কোনটা?”

হতভম্ব মুগ্ধ! বোকা মানবীর এ কোন রূপ দেখছে সে। মেয়েটা কি এই সামান্য ভয়ে পাগল হয়ে গেলো? মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ বলিষ্ঠ হাতদুটো নামিয়ে এনে কোমর আঁকড়ে ধরল রমণীর। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ভয় পাচ্ছিস?”

কাঁপছে মাহি! সেই সঙ্গে দুলছে তার ক্ষুদ্র বদন। কম্পিত কণ্ঠে প্রতুত্তর করল,

“ পাবো না বলছেন? এক্ষুণি কন্ট্রোলার টানুন। নয়তো দু'জনেরই পটল তোলার সময় হয়ে যাবে।”

ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত মৃদু হাসির টান বসলো মুগ্ধের। দৃষ্টিতে নামলো প্রগাঢ়তা। অস্থির রমণীর ক্ষুদ্র মাথাটা এদিক-ওদিক নড়ছে বড্ড। এই সুযোগে সে আলতো করে দুটো আঙুল ছোঁয়ালো রমণীর তুলতুলে চিবুকে। মুহুর্তেই অনড় হলো মাহি'র ঘাড়ের পেশী। ব্যাকুলতা ছাপিয়ে ভয়াতুর দৃষ্টিযুগল গিয়ে ঠেকল সুদর্শনের মুখপানে। তন্মধ্যে রূঢ় মানব কেমন ভনিতাহীন কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে,

“ এতো চিন্তা কিসের বেইব? ম-রলে তুই থোড়াই একা একা মরবি, তোর সঙ্গে কোম্পানি দেবার জন্য আমিওতো আছি। ম'রলে দু'জন একসঙ্গে ম*রব, বাঁচলেও সারাজীবন একসঙ্গে বাঁচব। কেমন?”

হুট করেই রমণীর সকল অস্থিরতা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রশান্তিতে ভরে গেল সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। অজান্তেই একপ্রকার বাধ্যতায় ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো বোকা মানবী। তা দেখে আলতো হাসলো মুগ্ধ। মুখটা সামান্য এগিয়ে এনে আলগোছে অধর ছোঁয়ালো মাহি'র মসৃণ ললাটে। হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ জাস্ট হোল্ড মি টাইটলি চাশমিস! আই’ম গনা শো ইউ সামথিং ট্রুলি অ্যাডভেঞ্চারাস।”

প্রশান্তির জালে আঁটকে আছে মাহি। গভীর আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে, দু'হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরল লোকটাকে। মাথা ঠেকালো মুগ্ধের বুকের ঠিক বাঁদিকে। ঠিক তখনি বাহাতের কন্ট্রোল স্টিকে জোরালো টান বসায় মুগ্ধ। মুহূর্তেই হেলিকপ্টারটি একদিকে তীব্রভাবে কাত হয়ে বাঁক নিলো। ভয়াতুর রমণীর দু'হাতের বাঁধন তৎক্ষনাৎ শক্ত হলো যেন। ভয়ে খিঁচে নিলো চোখমুখ। এরইমধ্যে কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ভরাট কন্ঠ!

“ আই'ম হিয়ার!”

শুনলো মাহি! বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে সামলানোর প্রয়াস চালালো বারকয়েক। কিছুদূর এগোতেই হেলিকপ্টারটির তলদেশে দেখা মিললো বিস্তীর্ণ সমুদ্রের। নীল জলের বুকের ওপর সাদা ফেনার রেখা, দূরে পাহাড়ের সারি! ভয়ে রূঢ় মানবের বুকে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা মায়াবিনী হুট করেই আড়দৃষ্টে সেথায় তাকালো একবার। ওমনি বিমুগ্ধতায় ছেয়ে গেল তার অন্তঃকোণ। মুগ্ধ কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,

“ মাশাআল্লাহ! কি সুন্দর!”

বাক্যদুয়েক বেশ কর্নধার হলো রূঢ় মানবের। সন্দিগ্ধতায় কুঁচকালো কপাল। রমণীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ ডু ইউ লাইক ইট বেইব?”

বিমুগ্ধতায় ডুবন্ত মাহি, তৎক্ষনাৎ ওপর নিচ নাড়ালো মাথা। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই রূঢ় মানব গতি টানলো উল্টো। বড্ড দক্ষ কৌশলে কন্ট্রোল স্টিক নাড়িয়ে হেলিকপ্টারটা নামিয়ে দিলো আরও নিচুতে। সমুদ্রের জল হতে হেলিকপ্টারের দুরত্ব এবার হাতেগোনা মাত্র। মায়াবিনী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো জানালার পানে। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীলাভ পানিতে থইথই করছে নাম না জানা অজস্র সামুদ্রিক প্রাণী। কি সুন্দর দেখতে তাদের! যে দৃশ্যের অপূর্বতায় একমুহূর্ত দিনদুনিয়া ভুলে গেল মাহি। মুগ্ধ এবার বেশ ধীরে ধীরে উড়াঁচ্ছে আকাশযানটি। সামনেই পাহাড়ের সারি। হেলিকপ্টারটি পাহাড়ের অভিমুখে এসে পৌঁছাতেই মুগ্ধ হঠাৎ হেলিকপ্টারটিকে দ্রুত ওপরে তুলে নিলো। এহেন কান্ডে যারপরনাই আঁতকে উঠে মাহি। নিঃশ্বাস আঁটকে গেল তার গলার কাছে। তড়িঘড়ি করে দুহাতে খামচে ধরল সুদর্শনের বলিষ্ঠ বুক। এতক্ষণের স্নিগ্ধ অনুভূতিতে এক পশলা ভয়ের বৃষ্টি এসে ঝপঝপিয়ে পড়তেই, প্রায় কেঁদে ফেলার ভং ধরল মাহি। আওড়াল,

“ আপনি একটু স্বাভাবিকভাবে হেলিকপ্টারটা চালাতে পারেন না?”

বাদামী ঠোঁটের কোণে আচমকা একখানা প্রশস্ত হাসির দেখা মিললো রূঢ় মানবের। কন্ঠে নামলো ভারিক্কি ভাবস্রোত!

“স্বাভাবিকভাবে চালালে তুই থোড়াই অ্যাডভেঞ্চারের টেস্ট পাবি! আমি চাই, আজকের এই জার্নিটা তোর সবসময় মনে থাকুক। অন্তত গালি দেবার জন্য হলেও মনে থাকুক। ”

না চাইতেও ফিক করে হেসে দিলো মাহি। আলতো স্বরে শুধালো,

“ ভাবছি, আপনার অ্যাডভেঞ্চারের চক্করে আমার প্রাণটাই না বের হয়ে যায়!”

সহসা কপাল গোছালো মুগ্ধ। দৃঢ় হলো চোয়াল,

“ এতো সহজে?”

মাহি প্রতুত্তর করলো না। বরং ধীরলয়ে ছেড়ে দিলো রূঢ় মানবকে। ঘাড়ের পেশী কুঁচকে আলগোছে চোখ তুলে তাকায় পরক্ষণে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেশ টেনে শুধালো,

“ হেভ ইউ ডান মিঃ বিস্ট? আমি কি এবার নিজের সিটে বসে এডভেঞ্চারটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারি?”

তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের বাদামী চোখদুটোর দৃষ্টি। গমগমে গলায় বলে উঠল,

“ আমাকে ছেড়ে দিলে ভয় লাগবে না?”

মৃদু হাসিটুকু প্রশস্ত হলো মাহি'র। ধীরে ধীরে মুগ্ধের কোল থেকে উঠতে উঠতে আওড়াল,

“ ছেড়ে দেবো? তাও আপনাকে? এতবড় সাধ্যি আপনি থোড়াই দিবেন আমায়! পরে না আমার ক্ষুদ্র প্রাণটা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়।”

বোকা মানবীর এরূপ উত্তরে দাম্ভিকতার অদৃশ্য স্তম্ভ আরেকটু উঁচু হলো মুগ্ধের। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো বাঁকা হাসির রেশ। তৎক্ষনাৎ হাস্কি স্বরে বলে উঠল,

“ যাক, দেরি হলেও বুঝেছিস।”

★

প্রায় বেশকিছুক্ষণ ধরে প্রশান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে মাহি। যার পুরোটা দায়ভার গিয়ে পড়ে রূঢ় মানবের ওপর। এখন মাথার ওপর থেকে এডভেঞ্চারের ভূত নেমেছে তাঁর। তাইতো স্বস্তিতে বাইরের দৃশ্যে মনোযোগী রমণী। কিছুটা পথ পাড়ি দিতেই আচানক ভ্রু-যুগল কুঁচকে এলো তার। যেই দেখল — আকাশপথের অর্ধেকটা বিভাজন হয়ে গিয়েছে অন্ধকার অতলে, আর বাকি অর্ধেকটা দিনের প্রকাশ্য আলোয় জ্বলজ্বল করছে। তাদের হেলিকপ্টার এগোচ্ছে অন্ধকার পথে। যেথায় মনে হচ্ছে রাত নেমেছে। বোকা মানবী চিনলো না সে পথ, চিনলো না জায়গার নাম। কৌতুহলের বশে হুট করেই জিজ্ঞেস করে উঠল,

“ ওদিকে কি রাত নেমেছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি বিস্ট?”

মুগ্ধ নির্বিকার! দক্ষ হাতে টানছে কন্ট্রোল স্টিক। পা বসে আছে প্যাডেলে। মানবী ঘাড় বাকিয়ে তাকালো একবার। লোকটাকে ওমন নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে ফের উৎসুক কন্ঠে শুধালো,

“ বলুন না! এটা কোন জায়গা?”

“ আলবেনিয়া!”

মুগ্ধের ছোট প্রতুত্তর। তা শুনেই কেমন উৎফুল্লতার সাথে লাফিয়ে উঠল মাহি। বড্ড প্রসন্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ সিরিয়াসলি? আমরা আলবেনিয়া যাচ্ছি? জানেন? আমি একটা বইয়ে পেয়েছিলাম — পৃথিবীর অন্যতম নির্জন আইল্যান্ড এই আলবেনিয়াতে রয়েছে। কয়েক বছর আগে না-কি ভূমধ্যসাগরে প্রকাণ্ড ভুমিকম্প হওয়ায় এখানে নতুন একটা দ্বীপ হয়েছে। কোন এক জৈনক প্রকৃতিপ্রেমী পুরো দ্বীপটাই কিনে নিয়েছিল। নামকরণ করেছিল নিজের মতো করে। পত্রিকাতেও এসেছিল তো। আমিতো প্রচুর ম্যাগাজিন ঘাটতাম। নামটা পড়েছিলাম একবার। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না, কি যেন নামটা....”

“ M-M আইল্যান্ড!”

রমণীর কথার পিঠে হুট করেই গম্ভীর প্রতুত্তর ছুড়ঁল রূঢ় মানব। তা কর্নধার হতেই আচানক ঘাড় বাঁকায় মাহি। হতবিহ্বলের ন্যায় বলে ওঠে,

“ ইয়েস! ইউ আর রাইট। M-M আইল্যান্ড। এ-ও শুনেছিলাম, তিনি না-কি তার জীবনে থাকা একমাত্র নারীর জন্য দ্বীপটা কিনেছেন। শেষ বয়সে এখানেই বাকিটা জীবন কাটাবেন বলে বসে আছেন। কত্তো সুন্দর চিন্তাভাবনা তাই না?”

গম্ভীর মানব নির্বিকার! কেবল তাকিয়ে আছে অদূরে। খানিকবাদে হুট করেই জিজ্ঞেস করে উঠল,

“ তোর পছন্দ হয়েছে?”

ভড়কায় মাহি। অবোধ্য স্বরে পরপরই শুধায়,

“ মানে? কী পছন্দ হওয়ার কথা বললেন?”

এপর্যায়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তা তার। যা সহজেই ভেদ করে দিলো রমণীর নরম হৃদয়টা। ধ্বক করে উঠল বুকের ভেতরটা। মাহি চাইলো চোখ সরাতে। তবে কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে আঁটকা পড়েছে সে। মুগ্ধ তখন গাঢ় কন্ঠে শুধালো,

“ এই যে! শেষ বয়সে একসঙ্গে নিজেদের আলাদা একটা দুনিয়ায় থাকার চিন্তাভাবনাটা।”

ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ ফুটলো মাহি'র। অজান্তেই লাজুকলতা ঝুঁকালো নিজ নেত্রদ্বয়। লাজুক হেসে অস্ফুটে আওড়াল,

“ তা ভালো লেগেছে বৈকি! তবে আমার ভালো লাগা, বা না লাগায় কি আসে যায়?”

“ যাকে ছাড়া একমুহূর্তও কাটবে না, তার কিছু না লাগায় চলবে?”

অবোধ মাহি! আজ রূঢ় মানবের সবগুলো কথা মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে তার। ত্বরিত চোখ তুলে বোধগম্যহীনের আওড়াল,

“ বুঝিনি!”

ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মুগ্ধ। ফের ঘাড় সোজা করে তাকালো সম্মুখে। বাহাতে কন্ট্রোল স্টিক চেপে রেখে, ডানহাত আলগোছে উঠিয়ে আনলো নিজ পরনের শার্টের গায়ে। একে একে ব্যস্ত হাতে সবগুলো বোতাম খুলতে খুলতে অস্ফুটে আওড়াল,

“ আরেকটু পরেই সব বুঝে যাবি।”

রূঢ় মানব কি বললো তা কর্ণকুহরে পৌঁছাল না মাহি'র। কেননা তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকেছে মুগ্ধের ব্যস্ত হাতের পানে। লোকটাকে ওমন বলাকওয়া ছাড়া পরনের শার্ট খুলতে দেখে শুকনো ঢোক গিলে মাহি। ত্রস্ত দু'হাতে সিট আঁকড়ে ভয়ার্ত কন্ঠে শুধালো,

“ একি! হেলিকপ্টার উড়ানো রেখে আপনি ওমন করে শার্ট খুলছেন কেনো?”

বাঁকা হাসলো মুগ্ধ! ত্বরিত ঘাড় বাকিঁয়ে বড্ড গভীর দৃষ্টিতে তাকালো মাহি'র পানে। চোখ দিয়ে আপাদমস্তক গিলে ফেলা যাকে বলে। রমণী ভড়কায় এসবে। মুগ্ধ ততক্ষণে অধর কামড়ে দেখে যাচ্ছে মানবীকে। হুট করেই মেয়েটাকে আরেকটু চমকে দিতে বলে ওঠে,

“ হ্যান্ডসাম বডি হলে এই এক জ্বালা বুঝলি! যখন-তখন চড়ুই দেখলে গরম বেড়ে যায়। উফফ! কি গরম। আয়, আয়, কাছে আয়! একটু বাতাস কর।”

বলেই একহাতে শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে দিলো মুগ্ধ। উম্মুক্ত করলো নিজ পেটানো আকর্ষণীয় বদন। সেদিকে চোখ পরতেই মাহি'র বেহায়া চোখদুটো যেন আঠার ন্যায় বসে গেল। তা আড়দৃষ্টে বেশ পরোখ করলো মুগ্ধ। সে কেমন বাঁকা হেসে একহাতে আচানক আঁকড়ে ধরল রমণীর ডান উরু। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল মাহি'র। মুগ্ধতার রেশ কেটে গেল নয়ন থেকে। কুঞ্চিত দৃষ্টিতে মুগ্ধের পানে তাকাতেই দেখে — মুগ্ধ কেমন অধর কামড়ে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে গিলে খাচ্ছে তাকে। তৎক্ষনাৎ নাক ফোলায় মাহি। ঝাঁঝিয়ে বলে,

“ চোখ সরান নির্লজ্জ লোক! আকাশ এদিকে নয়, ওদিকে! ওমন কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কি দেখছেন আপনি? আপনার মতলব তো ঠিক মনে হচ্ছে না।”

অধর কামড়ে রেখেই বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মানবীর উরু বরাবর চেপে রাখা রুক্ষ হাতটা আচানক বেপরোয়া ছন্দে পরশ লেপ্টাতে লাগলো গভীরভাবে। বোকা মানবী কেঁপে ওঠে এহেন স্পর্শে। এরইমধ্যে মুগ্ধ কেমন হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

“ বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার'স ওয়ে দেড়ব্যাটারী! আমার মতলব ভালো ছিলোই বা কবে? তাছাড়া তোকে দেখলে আমার মতলব এমনিতেও খারাপ হয়ে যায়। শুধু একবার কাছে এসে দেখ, ঠিক কতকিছু করি।”

ভয়ে কাঁপছে মাহি। তবুও কন্ঠায় ঝাঁঝের শেষ নেই।

“ সামনে তাকান বেহায়া লোক। হাতে কন্ট্রোলার টানুন তাড়াতাড়ি।”

মুগ্ধ নিস্পৃহ! হুট করেই তার নিশ্বাসের ওঠানামার গতি বড্ড জোরালো হলো। শুধালো,

“ হাতে নাহয় কন্ট্রোলার টানবো তবে...তোকে দেখে যে বহুকিছুতে কন্ট্রোল হারাচ্ছি, তার কী হবে?”

“ হেলিকপ্টার উড়ানো বাদ দিয়ে বসে বসে রঙ্গতামাশা করছেন?”

কথাটা শেষ হবার পূর্বেই বুঝি মুখগহ্বরে কথা সাজিয়ে বসে আছে রূঢ় মানব। ফটাফট শক্তহাতের আলতো থাবায় রমণীর চুলের গোছা খামচে ধরে টেনে আনলো তার ক্ষুদ্র মাথাটা। হাস্কি স্বরে বলে উঠল,

“ রঙ্গতামাশার দেখলিই বা কী? কোলে আয় এন্ড গিভ মি আ কিস, নয়তো বসে বসে দেখ — কিভাবে হেলিকপ্টার ক্র্যাশ হয়।”

আঁতকে উঠে মাহি! সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,

“ আপনি কি পাগল?”

“ কিস মি দেড়ব্যাটারী!”

নাক-মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। চুলের গোছা ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত থেকে আওড়ায়,

“ ছাড়ুন আমায়।”

এবারে প্যাডেল থেকেও পা সরিয়ে আনে মুগ্ধ। অন্যহাত উঠিয়ে আনলো মেয়েটার তুলতুলে গাল বরাবর। চোখেমুখে কেমন দিশাহীন ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে আওড়াল,

“ যা বলবি তা-ই করব! সব করব। বাট নাউ...গিভ মি আ কিস চাশমিস। আ'ম ক্র্যাভিং ফর ইউ'র লিপস সো ব্যাডলি।”

অতিষ্ঠ মাহি। না চাইতেও তাকালো লোকটার মুখপানে। ধীরলয়ে শুধালো,

“ জ্বালিয়ে ছাড়লেন আপনি আমাকে।”

হাসলো মুগ্ধ। বৃদ্ধা আঙুলে রমণীর তুলতুলে অধরযুগল স্লাইড করতে করতে শুধালো,

“ পোড়াই যদি হয় তোর ভাগ্য, তবে তোকে পোড়ানোর একমাত্র দায়ভার কেবল আমার হাতেই পড়ুক। আই প্রমিজ, তোকে জ্বালানোর ক্ষেত্রে আমি একটুও কার্পণ্য করবো না। উঁহু! একটুও না।”

___________________________________________

হলদেটে মাখনরঙা আলোয় জ্বলজ্বল করছে সুবিশাল মেহমান কক্ষটি। কক্ষের একপাশে বিছিয়ে রাখা বড়সড় রাজকীয় পালঙ্কের একপাশে গা গুটিয়ে বসে আছে নিরু। গায়ের ওপর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে একখানা মোটা ব্ল্যাঙ্কেট। বুকভাঙা আর্তনাদে কাঁদছে সে-ই গতরাত থেকে। অদূরের বাঁপাশের দেয়াল সংযুক্ত বিশালাকার জানালার অভিমুখে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। অনবরত টানছে মোটা সিগার। সুঠাম দেহ উম্মুক্ত তার, পরনে কেবল একখানা ঘিয়ে রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজার। অষ্টাদশীর বিরতিহীন কান্নায় বড্ড বিরক্ত সে। একপর্যায়ে আঙুলের ভাঁজে সিগার চেপে রেখে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো ক্রন্দনরত নিরুর পানে। চোখেমুখে এক আকাশসম বিরক্তি লেপ্টে তিক্ত কন্ঠে শুধালো,

“ এই মেয়ে এই! তোমার ফ্যাচ ফ্যাচ কান্না থামাও। আদৌও ছুঁয়েছি তোমায়? না ছুঁতেই যা শুরু করেছো, ছুঁয়ে দিলে না যেন কি করবে! চুপ করো বলছি।”

শেষটা বড্ড ধমকের স্বরে বলল এডউইন। সে-ই ধমকের অভিঘাতে কেঁপে ওঠে নিরু। বহুকষ্টে দু'হাতে নিজের মুখ চেপে আটঁকাতে চাইলো কান্নাগুলো। এতেও তেমন কাজের কাজ হলো না বোধহয়। গোঙানির শব্দ বড্ড প্রবল শোনালো এবার। এডউইন মহাবিরক্ত। তক্ষুনি ঠোঁটের ফাঁক হতে সিগারটা নামিয়ে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। অতঃপর রুক্ষ পায়ের তলায় বড্ড রুষ্টতার সনে সিগারটা পিষতে পিষতে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো নিরুর পানে। কটমট কন্ঠে আওড়াল,

“ সকাল হয়ে গেছে। আমি বের হচ্ছি ঘর থেকে! আমি চলে যাবার পর এমন একটা ভান ধরবে, যেন বোঝা যায় — লাস্ট নাইট আই স্লেপ্ট উইদ ইউ। পারলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটার ঢং করবে, আর ভুলেও যদি কারো কাছে সত্যিটা ফাঁস করেছো — দ্যান রিমেম্বার, আই উইল কি*ল ইউ। গট ইট?”

ভয়ার্ত ঢোক গিললো নিরু। ত্রস্ত ওপর নিচ ঝাঁকালো মাথাটা। গম্ভীর মুখো এডউইন এবার উল্টো ঘুরলো। গটগট পায়ে এগোলো সম্মুখের ডিভানের পানে। সেথায় পড়ে আছে তার অবহেলিত শার্ট। মানব তা উঠিয়ে এনে গায়ে জড়াতে গেলেই পেছন থেকে ভেসে এলো নিরু ভাঙা ভাঙা কন্ঠ!

“ আপনি আমাকে না ছুঁয়েও বদনাম করতে চাচ্ছেন কেনো?”

একমুহূর্ত থমকালো এডউইনের ব্যস্ত হাতদুটো। তবে সে-ই থমকানোর স্থায়িত্ব দীর্ঘ হলো না। তন্মধ্যেই গম্ভীর পুরুষ তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বড্ড অনিহা নিয়ে বলে ওঠে,

“ আমি যাকে-তাকে ছুঁই না। এডউইন স্যাবাস্টিয়ানের বেডে আসতে হলে যথেষ্ট যোগ্যতার প্রয়োজন, যার একাংশও তোমার মতো চিপকু মেয়ের নেই। সো..দ্যাটস ইট। তোমার সঙ্গে আমার একরাতের নাম জড়াচ্ছে এটাই তো তোমার সাত কপালের ভাগ্য! এরচেয়ে বেশি আর কি চাই?”

অপমানে সুশ্রী মুখখানা টকটকে লাল হয়ে গেল নিরুর। চোয়ালের পেশী হয়ে গেল শক্ত। এডউইনের জোরালো কদম দুয়ার পানে অগ্রসর হতেই নিরু কেমন ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে,

“ যেমন কৌটো, তেমন জল! যেখানে মনীবের মনের কোণে নেই বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ব সেখানে তার সাগরেদের কাছ থেকে মনুষ্যত্ব আশা করা বড্ড বোকামি বৈকি!”

সহসা থমকে গেল এডউইনের ব্যস্ত কদম জোড়া। ধীরলয়ে দৈবাৎ শক্তিতে বাঁকালো ঘাড়। কিয়তক্ষন বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিরুর পানে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই গা দুলিয়ে হেসে ওঠে এডউইন। হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে থাকাও যেন দায় তার জন্য। দু'হাতে কোমর আঁকড়ে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে গিয়ে সুঠাম গা এলিয়ে বসল ডিভানের কোলে। অদূরে পালঙ্কে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা অষ্টাদশী ঘৃণায় নাকমুখ কুঁচকে নিচ্ছে। সম্মুখের ফর্সা লোকটা সুদর্শন হলেও বড্ড ভয়ানক দেখতে। দু'টো চোখ দু’ধরনের। একটা সাধারণ মানুষের মতো হলেও অপরটা ভুতের মতো সাদা। মাঝখানে কেবল কালো রঙা পিউপিল! ডানপাশের কপাল থেকে শুরু করে পুরো আড়ভাবে লোকটার মুখের ওপর বসে আছে এক গভীর ক্ষত। সে-কি বিদঘুটে রূপ তার! এই রূপ দেখেই তো ভয়ে প্রথমদিন জ্ঞান হারিয়েছিল নিরু।

এডউইনের গা দুলানো হাসিতে খানিক রুখ পড়ল এবার। হঠাৎ করেই হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে তাকালো নিরুর পানে। হুটহাট এরূপ চাহনিতে ভড়কায় নিরু। আমতা আমতা করতে যাবে তার পূর্বেই এডউইন কেমন হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ যার নামের আগে পদবী বসেছে রাক্ষসের, তার কাছ থেকে মনুষ্যত্ব আশা করা বোকামি নয়, বরং পাপ! এমনি এমনিই তো তাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত — মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার বলা হয়না। তোমার মতো লক্ষাধিক রমণী, যারা ইতোমধ্যেই রাক্ষসের কাছ থেকে মনুষ্যত্বের আশা রাখার মতো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে অকালে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছে, তা কি তুমি জানো? তুমি আদৌও জানো — রুশদী কিং ঠিক কতটা নির্দয় এবং ভয়ানক?”

হতভম্ব নিরু! প্রতিক্রিয়াহীন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে। এডউইন হাসলো। তক্ষুনি পকেট হাতড়ে আরেকটা সিগার বের করে এনে গুঁজল ঠোঁটের ফাঁকে। পরক্ষণে লাইটার ধরিয়ে লম্বা এক টান বসিয়ে ফের আওড়াল,

“ মেয়েদের গগনবিদারী চিৎকার না শুনে পেট ভরে খেতে পারেন না মাফিয়া মনস্টার। এতোদিনে তার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে অগণিত রমণী, খাবার হয়েছে তার পোষ্যদের। তা কী জানতে?”

ভয়ার্ত ঢোক গিললো নিরু। তার চোখেমুখে একরাশ অবিশ্বাস্যের ছাপ! তা দেখে কেমন তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো এডউইন। সিগারের শেষভাগে বিশাল বড়ো টান বসিয়ে আবার গমগমে গলায় বলে উঠল,

“ বাট, দেয়ার ইজ ওয়ান থিং — এতো এতো রমণীর মৃ ত্যুর পরোয়ানা জাহির করা নির্দয় মাফিয়া মনস্টার, যার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে আর কেউ বেঁচে না ফিরলেও, বেঁচে ফিরেছে কেবল একজন! হু ইজ নান আদার দ্যান দ্য কুইন অফ দা রুশদী কিংডম — রুশদী'স সিগনোরা ওরফ মাহিরা এহসান। যার হাতে একগুচ্ছ কালো গোলাপের বদলে রুশদী দিয়েছে — গোটা অন্ধকার সাম্রাজ্যের অর্ধেকটা। যার কদম তলে সোনালী আভার জুতাের বদলে ঠাঁই পেয়েছে — রুশদীর সকল অহংকার! যে এখনো অজ্ঞ — রুশদীর আসল ব্যাক্তিত্বের সম্বন্ধে। যার চোখে স্বয়ং রুশদী কিং পর্দা ফেলে রেখেছে আলগা মুখোশের। পুরো পৃথিবীর সম্মুখে হার্টলেস মাফিয়া বিস্ট ঠিক কতটা জঘন্য তা প্রকাশ পেলেও, মুনবার্ড একমাত্র ব্যক্তি যার সামনে এখন অব্দি প্রকাশ পায়নি রুশদীর আসল রূপ। যে এখনো জানে না, যার হাতদুটোকে সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সেফেস্ট প্লেস ভাবে সেই হাতে ইতোমধ্যেই লেপ্টে আছে অগণিত নর-নারীর লোহুর পরশ। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং তাই না?”

নিরু বাকরুদ্ধ! অধীর দা সত্যিই এতো জঘন্য? অবশ্য কথাগুলো অবিশ্বাস করার কোনো মানে নেই, যেখানে সে নিজেই ভুক্তভোগী। নিরু তৎক্ষনাৎ নজর ঝোঁকালো। ধীরলয়ে বলে উঠল,

“ তারমানে কী দাঁড়ায়? অধীর দা ঐ মেয়েটাকে ভালোবাসে?”

গাল বাঁকায় এডউইন! বিরক্তি প্রকাশ করে আওড়ায়,

“ ভালোবাসা? হোয়াটস দ্যাট? মনস্টার ওসব ভালোবাসা /টালোবাসায় বিশ্বাসী নয়। মুনবার্ড তো তার টক্সিক অবসেশন! যেই অবসেশনের কারণে তিনি স্বেচ্ছায় অন্য নারীদের সান্নিধ্যে যেতে চেয়েও ফিরে এসেছে।”

কথাটা বোধগম্য হলো না নিরুর। তৎক্ষনাৎ কথার পিঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ মানে? অধীর দা'য়ের নারী আসক্তি রয়েছে?”

সহসা পায়ের ওপর পা তুললো গম্ভীর পুরুষ। দু'হাত এলিয়ে দিলো ডিভানের গায়ে। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে রেখে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ যার আগাগোড়া নারী বিদ্বেষে ভরপুর, সে হবে নারী আসক্ত? নারী আসক্ত হলে সে থোড়াই মেয়েদের নিজে ভোগ না করে অন্যদের বেডে পাঠাতো! তবে....মনস্টারের সকল নিয়মে একদিন বাঁধ পড়ল। সেদিন মুনবার্ড আর সিডকে একসঙ্গে দেখে ফেলেছিলো মনস্টার। নিজের ভোগ্যবস্তুতে অন্যের নজর দেখে মাথা ঠিক ছিলো না তার। মুনবার্ডকে যেমন শাস্তি দিয়েছে, তার ঠিক দ্বিগুণ দিয়েছে অন্যদের। তাতেও রাগ কমেনি তার। তাই যখন রাত গভীর হলো....

★ অতীত ★

“ এডউইন!”

অস্থির কায়দায় পুরো ঘরময় পায়চারি চালাচ্ছেন রূঢ় মানব। ঘামছেন অনবরত! উম্মুক্ত গায়ে ঘামের ছিটেফোঁটা একেকটা মুক্তর সাদৃশ। মনীবের এক ডাকে ত্রস্ত ছুটে এলো এডউইন। বাধ্যতায় অবনত করল ঘাড়। ধীরকন্ঠে যে-ই না কিন্তু আওড়াবে তার পূর্বেই শোনা গেল রুশদী কিংয়ের হিং স্র গর্জন!

“ মেয়ে রেডি কর! আই ওয়ান্না স্লিপ উইদ সামওয়ান।”

হকচকায় এডউইন! অবিশ্বাস্যের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মেঝের পানে। কি শুনলো সে? নারী বিদ্বেষী মনস্টার নিজে বলছে মেয়ে আনার কথা? এটাও কী সম্ভব? কানে ভুল শুনলো না তো সে? এডউইনের এহেন ভাবনার ডোরে হুট করেই চিড় ধরল রূঢ় মানবের বিকট হুংকারে।

“ কি বলেছি শুনিসনি? গো এন্ড ডু ইট ফাস্ট।”

ত্বরিত মাথা নাড়ায় এডউইন। প্রাণভয়ে ছুটলো ঘরের বাইরে। পুরো করিডর জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের উদ্দেশ্যে তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,

“ শহরের যত সুন্দরী ভা*র্জিন রয়েছে, ওদের তুলে নিয়ে আয়। ফার্স্ট টাইম মনস্টারের নারী ক্ষুধা পেয়েছে, মেক শিওর কোনো কমতি যেন না থাকে।”

হুকুম তামিলে মত্ত হলেন সকলে। যে যেভাবে পারলো ছুটলো। এডউইনও ছুটলো পরক্ষণে। এবার নারী পাবে কোথায়? মুনবার্ড তো সেন্সলেস!

★

সারিবদ্ধ আকারে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত রাশিয়ান রমণী। তন্মধ্যে সুন্দরীদের শীর্ষে অবর্তীন রমণী ক্যাসেলা। যার ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যে আবির্ভূত সকলে। তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে মনস্টারের জন্য। সুন্দরীর মুখাবয়বে হাসি নেই। জোরপূর্বক তুলে আনা হয়েছে তাকে। কেমন মনমরার মতো বসে আছে মেয়েটা! পাঁচজন মেইড মিলে অপ্সরার ন্যায় সাজাচ্ছে তাকে। ঠিক তখনি কক্ষের দুয়ার ঠেলে প্রবেশ করল এডউইন। হাতে একখানা সফেদ রঙা রুমাল তার। সে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রমণীর পেছনে। হাতে থাকা রুমালটা তড়িঘড়ি করে রমণীর চোখ বরাবর বেঁধে দিতেই আঁতকে উঠে রমণী। ভয়ার্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁতে গেলেই গম্ভীর মুখো এডউইন গমগমে গলায় বলে ওঠে,

“ উহুম! কোনো প্রশ্ন নয়। আপনি কোনো সাধারণের বেডে যাচ্ছেন না। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, আপনাকে যার বেডে পাঠানো হচ্ছে তিনি লোকমুখে — মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার নামে পরিচিত। আশা করি, নামটা নিশ্চয়ই শুনেছেন।”

নাম শুনেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে ক্যাসেলা। দু'হাত জোর করে অনুনয় জুড়ে বলে,

“ নো, প্লিজ নো। প্লিজ ছেড়ে দিন আমায়। আমি মরতে চাই না।”

এডউইন বিরক্ত এসবে। কপাল কুঁচকে রমণীর চোখদুটো বেঁধে দিয়ে ফের আওড়াল,

“ নিজের সর্বোচ্চ এবং সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন মনস্টারকে প্রসন্ন করতে এবং খেয়াল রাখবেন, ভুলেও যাতে চোখ থেকে কাপড় না সরে। নয়তো কিছু হওয়ার আগেই ম*রবেন আপনি।”

চলবে....

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৩(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

“ নিজের সর্বোচ্চ এবং সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন মনস্টারকে প্রসন্ন করতে এবং খেয়াল রাখবেন, ভুলেও যাতে চোখ থেকে কাপড় না সরে। নয়তো কিছু হওয়ার আগেই ম*রবেন আপনি।”

ভীতসন্ত্রস্ত রমণী ঢোক গিললো পরপর। বাধ্যকৃত অন্ধত্ব অনিচ্ছায় বরণ করে অশ্রু ঝরালো নিঃশব্দে। তার মাখনরঙা টকটকে গায়ের রঙ! ভয়ের চোটে নীলচে রূপ ধরেছে তা। কন্ঠার সন্নিকটে আঁটকে আছে বাক। তটস্থ ভয়ার্ততায় রমণীর তুলতুলে কদম জোড়া আঁটকে আছে জমিনের সনে। ঠিক তখনি একখানা রুক্ষ হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল ক্যাসেলার নরম কনুই! এরূপ অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় রাশিয়ান সুন্দরী। হকচকান কন্ঠে তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে ওঠে,

“ কে? কে?”

আফ্রিকান নারী মেইডটি বড্ড গম্ভীর। বড়ো রুষ্টতায় সুন্দরীর কনুইটা একপ্রকার টানতে টানতে এগোতে লাগলেন দুয়ার পানে। প্রতুত্তরে মৌনতা অবলম্বন করতেই ভীত ক্যাসেলা ফের তটস্থ কন্ঠে শুধালো,

“ কথা বলছেন না কেনো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”

“ যমের কাছে।”

মেইডের গুরুগম্ভীর ছোট উত্তর! তা কর্নধার হতেই অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ ক্যাসেলার। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো তার বাঁচার আকুতি - মিনতি। অথচ রমণীর এহেন আকুতিভরা কন্ঠে বিন্দুমাত্র হেলদোল হলো না কারো। বরং এডউইনের হুকুম তামিলে তারা কেমন নির্দয়ের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল রমণীকে।

___________________________________________

মনস্টার প্যারাডাইসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘প্রাইভেট স্যুইট’! ক্যাসেলের বাঁ-দিকের সুউচ্চ টাওয়ারে অবস্থিত এই কক্ষটি বহু বছর ধরেই অব্যবহৃত। ধুলো আর নৈঃশব্দ্যের আস্তরণে ঢাকা কক্ষটিতে রূঢ় মানবের এক আদেশেই আজ বহুবছর পর পুনরায় জ্বলে উঠেছে আলো। পুরোদমে সাজানো হয়েছে মন্সটারের মনমতো।

সুবিশাল কক্ষটির ঠিক মধ্যভাগে ঝুলে আছে গোলাকার এক বিছানা। যার মখমলি কোলের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে ক্যাসেলা। অঝোর ধারায় সেই কখন থেকে কেঁদে চলেছে সুন্দরী। চোখদুটো রুমালের বন্ধনে আবৃত থাকায় চারপাশের সকল দৃশ্য এক অন্ধকারে নিমজ্জিত তার নিকট। এরইমধ্যে কক্ষের দুয়ার পানে খট করে শব্দ হলো আচমকা! কেউ বোধহয় ঢুকছে কক্ষে। মুহুর্তেই অশুভ সংকেতে তটস্থ হয়ে গেল ক্যাসেলা। সিটিয়ে গেল ভয়ে! মনস্তার এসেছে না-কি? এবার কি তবে সত্যিই মরণ হবে তার? ভয়ে জর্জরিত ক্যাসেলা, ফুপিয়ে উঠল ফের। ঠিক তখনি, একজোড়া দাম্ভিক কদম ধীরলয়ে প্রবেশ করল কক্ষে। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ কক্ষে ছড়িয়ে গেল মনমাতানো এক পুরুষালী কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এরূপ সুবাসে এতক্ষণে নিশ্চয়ই এক-আধবার মোহিত হতো ক্যাসেলা, তবে আজ যে পরিস্থিতি বড্ড ভিন্ন।

নেশার ঘোরে সামান্য টলছে রূঢ় মানবের দাম্ভীক পদক্ষেপ। এক হাতে তার অর্ধভর্তি হুইস্কির বোতল, অন্য হাতে জ্বলছে মোটা সিগার। সুদর্শনের মুখাবয়বে রাগের গাঢ় ছাপ স্পষ্ট। ললাটের চামড়া গুটিয়ে একাকার অবস্থা! অন্তঃকোণের অবাধ্য দহনে পুড়ছে মাফিয়া বিস্ট। ইগোর সন্নিকটে অবচেতন মনকে জোরপূর্বক চুপ করে বসিয়ে রেখেছে এককোণে। চোখদুটো কিঞ্চিৎ কুঁচকে বোতলের মুখে ঠোঁট ছোঁয়ালো মাফিয়া মনস্টার। নির্বিকার ভঙ্গিতে গিলতে লাগলো অগণিত ঢোক। তবুও থামলো না তার ব্যস্ত পদযুগল। ধীর অথচ ভারী পায়ে এগিয়ে চলল অদূরে বসে থাকা সুন্দরীর দিকে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো — এখন পর্যন্ত একটিবারের জন্যও চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের অধিকারীনির পানে দৃষ্টি তুলে তাকালো না রূঢ় মানব। দাম্ভিকের পাহাড়ে ঘেরা বলিষ্ঠ ঘাড়টা বারংবার ঘোরাচ্ছে এদিকওদিক। চাইছে বোধহয় দৃষ্টি লুকতে। তার পাদু’টো শূন্যে ঝুলন্ত বিছানার সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন অজান্তেই ধ্বক করে উঠল মনস্টারের। মুহুর্তেই হতবুদ্ধির ন্যায় জমে গেল সে। ত্বরিত বাহাত উঁচিয়ে আনলো বুকের কাছে। জায়গাটা কেমন জ্বলছে মনে হচ্ছে! না, না, ঠিক জ্বলছে না, কেমন অদ্ভুত একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। সহসা দাঁত খিঁচল মুগ্ধ। নিজ দেহের এহেন হুটহাট পরিবর্তনে বড্ড বিরক্ত সে। সাপের ন্যায় ফুঁসতে ফুঁসতে আগালো রমণীর পানে। ডানহাতে থাকা প্রায় শূন্য হুইস্কির বোতলটা আচানক মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে, হাত উঁঠিয়ে এনে খামচে ধরল ভীতসন্ত্রস্ত রমণীর চুলের গোছা। চোখদুটোয় মহা তিতিবিরক্ততা লেপ্টে ঠেকিয়ে রাখলো অন্যত্র। চিড়বিড় করতে করতে ক্যাসেলার ক্ষুদ্র মাথাটা নিজ মুখের বড্ড সন্নিকটে এগিয়ে এনে হিং স্র কর্মে লিপ্ত হবার পায়তারা জুড়লো রূঢ় মানব। ভুবনমোহিনীর তুলতুলে দেহ হতে ভেসে আসা মনমাতানো সুগন্ধির সংস্পর্শে এসে যেখানে যেকোনো পুরুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য, সেখানে রূঢ় মানবের সঙ্গে ঘটে গেল আরেক কান্ড! ক্যাসেলার ক্ষুদ্র মাথাটা কাত করে তার ঘাড়ের ত্বকের কাছে মুখ এগোতে উদ্যোত হতেই আচানক খিঁচে রাখা চোখদুটোর পাতায় ভেসে উঠল মাহি'র নির্মল মুখখানা। তৎক্ষনাৎ থমকে গেল মুগ্ধ! থমকে গেল তার হৃৎস্পন্দন। যত্রতত্র চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে সম্মুখে তাকাতেই যে-ই দেখল — অক্ষিপুটের সম্মুখে অন্য এক নারী ওমনি গা গুলিয়ে উঠতে শুরু করল মুগ্ধের। দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের এই প্রথমবার বমি বমি ভাব ধরল মনে হচ্ছে। অবচেতন মনের উর্ধ্বে গিয়ে করতে চাওয়া উদ্ভট কর্মের মাশুল হিসেবে কাঁপতে লাগলো তার সর্বাঙ্গ। এলোমেলো হলো দৃষ্টি! ক্যাসেলার চুলের গোছায় আঁটকে রাখা শক্ত মুঠো ক্রমশ ঢিলে হতে লাগলো রূঢ় মানবের। নেশায় বুঁদ ভাবস্রোত বহু আগে কেটে যেতেই হাসফাস বাড়লো তার। আনমনে আরেকবার ভুবনমোহিনীর পানে তাকাতেই এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা মুগ্ধ। তক্ষুনি ভীত-সন্ত্রস্ত রমণীর গায়ের ওপর ভকভক করে উগরে দিলো ব-মির ধারা। এরূপ অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব ক্যাসেলা। কি থেকে কি হচ্ছে তা নিয়ে ভাবার প্রয়াসে মত্ত থাকতেই রূঢ় মানব এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মানবীর চুলের গোছা। পাহাড়সম দেহটার অভ্যন্তরে উত্থাপিত অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে সরে গেল বিছানার কাছ হতে। কয়েক কদম পেছাতেই আঁচানক গায়ের ভারে মেঝেতে ঢুলে পড়ল মুগ্ধ। নিজেকে ধাতস্থ করবার পূর্বেই ফের উগরে দিলো পেটে যা ছিলো তা। মেঝেতে পড়ে থেকে দূর্বলের ন্যায় হাঁপাতে হাঁপাতে তক্ষুনি হুংকার ছুঁড়ল মাফিয়া বিস্ট!

“ এডউইন! এডউইন!”

দরজার সন্নিকটে কান পেতে দাঁড়িয়ে ছিলো এডউইন। তন্মধ্যে মনস্টারের ওমন বিকট হুংকারে ভড়কায় সে। হতভম্বের ন্যায় তক্ষুনি ঘুরে তাকালো দরজার পানে। আনমনে বিড়বিড়িয়ে শুধালো,

“ হোয়াট দা হেল! চিৎকার দেবার কথা কার, আর চিৎকার দিচ্ছে কে?”

সন্দিগ্ধতায় আঁটকে গিয়েছে এডউইন। পরক্ষণে তেমন কালবিলম্ব না করে দু'হাতে দুয়ার ঠেলে প্রবেশ করল কক্ষে। আনমনে দৃষ্টিযুগল সম্মুখে নিবদ্ধ করতেই চমকে উঠে এডউইন। অদূরের মেঝেতে এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে আছে মাফিয়া বিস্ট, কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ! টু স্টেজ ক্লিন ফ্রিক ওসিডিতে আক্রান্ত মানবের সম্পূর্ণ গায়ে ওমন ময়লার উপস্থিতি দেখে যারপরনাই হতবাক সে! তৎক্ষনাৎ বোধহীনের ন্যায় মনস্তারের পানে ছুটলো গম্ভীর মুখো। এগিয়ে এসে ধপ করে হাঁটু গেঁড়ে বসল পরমুহূর্তেই। হকচকানো কন্ঠে আওড়াল,

“ হোয়াট হ্যাপেন্ড টু ইউ মনস্তার? আর ইউ ওকে?”

একহাতে বুক ডলছে মুগ্ধ! মুখ হা করে নিচ্ছে শ্বাসপ্রশ্বাস। চোখদুটো তার বুঁজে রাখা বহুক্ষণ ধরে। এডউইনের কথার পিঠে কেবল থেমে থেমে শুধালো,

“ প-পানি দে এডউইন। পানি দে!”

ত্রস্ত ছুটে গেল এডউইন। অথচ রূঢ় মানব বসে আছে ঠায়। তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠেছে ভীত রমণীর নির্মল মুখখানা। সে কেমন গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে দেখো! চোখদুটোতে চিকচিক করছে নোনাজল। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই বাঁধহীন অস্থিরতায় ধুঁকে ম'রতে আরম্ভ করল রূঢ় মানব। চোখের পাতা বদ্ধ থাকলেও চোয়ালের পেশি টানটান করে দাঁত খিঁচে শুধালো,

“ ধরিনি রে কু-***বাচ্চা। ছুঁইনি আমি কাউকে। এ্যাই বান্দীর মেয়ে চোখ নামা। চোখ নামা জানোয়ারের বাচ্চা, চোখ নামা!”

হাতে পানিভর্তি গ্লাস। উদ্বিগ্নতায় ছুটে এসে পানিভর্তি গ্লাসটা এগিয়ে দিতে গেলেই মুগ্ধের ওমন বিড়বিড়ানো দেখে কপাল গোছালো এডউইন। হতভম্বের ন্যায় একপল তাকিয়ে থেকে পরক্ষণে ডাকলো মনস্তারকে।

“ মনস্তার? মনস্তার?”

তক্ষুনি চোখ খুললো মুগ্ধ! অশ্রুসজল অদৃশ্য অগ্নির প্রকোপে রক্তিম হয়ে উঠেছে তার বাদামী চোখদুটো। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই ঘাবড়ে গেল এডউইন। ভয়ার্ত আবহে কেঁপে উঠল বেচারা। কম্পিত হাতে পানির গ্লাসটা এগিয়ে ধরে রাখতেই চোয়াল শক্ত করল মুগ্ধ। হাওয়ার বেগে উঠে দাঁড়ালো পরমুহূর্তে। বড্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে পা ছোটালো দুয়ার পানে। হিং স্র কন্ঠে চিড়বিড়িয়ে বলে গেল,

“ কন্ট্র্যাক্ট পেপার রেডি কর এডউইন!”

থামলো এডউইন। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফুটিয়ে, পায়ে গতি টেনে পরপর গমগমে গলায় শুধালো,

“ কিসের মনস্তার?”

“ আমার বিয়ের!”

মুহুর্তেই মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অনুভূত হলো এডউইনের। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল তার ব্যস্ত পদযুগল। মুখাবয়বে একরাশ হতবাকতা ফুটিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় জিজ্ঞেস করল,

“ কিন্তু...বিয়েটা কার সঙ্গে মনস্তার?”

ব্যগ্র গতিতে এগোচ্ছে মুগ্ধ। তন্মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা এডউইনের এহেন কন্ঠে সহসা ঘাড় বাঁকায় রূঢ় মানব। দাঁত খিঁচে হিং স্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ আমার বান্দীর মেয়ের সঙ্গে।”

________________________________________

দু'ঘন্টা পেরুনোর পথে। তারপরও ওমন তীব্র স্নোফলে বরফ ঠান্ডা পানিতে দক্ষ সাঁতারুর ন্যায় সাঁতার কাটছে রূঢ় মানব। তার ফর্সা বলিষ্ঠ বদন ইতোমধ্যেই লালচে আভায় ছেয়ে গিয়েছে। গায়ের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে তীব্র ঠান্ডার প্রকোপে। ভারী স্নোফলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাতাসের ঝাপটা। ছাঁদের দুয়ার পানে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে এডউইন। গায়ে জড়িয়েছে মোটা একটা ওভারকোট। তাতেও বুঝি ঠান্ডা কমছে না তার। বেচারা জড়োসড়োভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্মুখে একপা বাড়াতে গেলে দুপা পিছিয়ে যাচ্ছে আপনা-আপনি। তবুও প্রাণভয়ে সম্মুখে অগ্রসর সে। কাঁপতে কাঁপতে কয়েক কদম এগিয়ে এসে কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,

“ মনস্তার! পেপার'স আর রেডি।”

তৎক্ষনাৎ পানির গভীর হতে মাথা তুললো মুগ্ধ। তাকালো বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টে। ধীরলয়ে ছোট ছোট বরফ টুকরো বলিষ্ঠ দেহের ভারে মাড়িয়ে উঠে এলো সুইমিংপুল হতে। তার সিক্ত ট্রাউজার হতে ঝপঝপিয়ে বইছে পানি। তা নিয়েই নির্বিকার ভঙ্গিতে এগোলো মুগ্ধ। তন্মধ্যে গম্ভীর এডউইন কেমন সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ মনস্তার! মেয়েটাকে কি করব?”

“ বেসমেন্টে ফেলে দিয়ে আয়!”

আঁতকে উঠে এডউইন! সহসা ভড়কানো কন্ঠে বলে ওঠে,

“ কিন্তু ওতো এখনো জীবিত মনস্তার।”

সম্মুখে অগ্রসর পাথুরে মানব নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,

“ সো হোয়াট?”

উপযুক্ত উত্তর পেলো না এডউইন। লোকটা এমন নির্দয়, সে জানে। তারপরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করার মানে নেই কোনো। বেচারা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে এগোলো নিজ কর্মে।

★

টিমটিমে নীলাভ আলোয় জ্বলজ্বল করছে সপ্তদশীর কামরা। আহতাবস্থায় বিছানায় কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে সে। সম্পূর্ণ মুখাবয়বে ক্ষতের স্পষ্ট উপস্থিতি। অদূরে বিছানার দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। গা উদোম তার, ত্বকে পানির ছিটেফোঁটা স্পষ্ট। সিক্ত বাবরিছাঁটা বাদামি চুলগুলো হতে চুইয়ে পরছে পানি। নির্দয়ের একহাতে একখানা ধারালো চাকু, অন্যহাতে কন্ট্র্যাক্ট পেপার। অচেতন মানবীর পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে এগোলো সে। ঘুরে এসে দাঁড়ালো রমণীর মাথার কাছে। অতঃপর আচমকা নিজ ডানহাতের তালুতে চাকুর তীক্ষ্ণ গা ছোঁয়াল মুগ্ধ। মুহুর্তেই তাজা লহুর ধারা বেরিয়ে এলো সেখান থেকে। অথচ রূঢ় মানবের মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র ব্যথার ছাপ নেই। সে ধীরলয়ে হাত বাড়ালো। বোকা মানবীর নিশ্চল ডানহাতের বৃদ্ধা আঙুলটা আলতো করে নিজ লহুতে ডুবিয়ে রঞ্জিত করে নিলো গাঢ় ভাবে। পরক্ষণে মাহি'র অজান্তেই মেয়েটার বৃদ্ধা আঙুলখানা কন্ট্রাক্ট পেপারের সইয়ের জায়গায় চেপে ধরল মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে ফোঁটালো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। কার্যসিদ্ধি শেষে রূঢ় মানব কেমন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাল অচেতন মায়াবিনীর পানে। কন্ঠে বড়ো রহস্যময় ভাবস্রোত টেনে শুধালো,

“ কংগ্রাচুলেশনস বান্দীর মেয়ে! শেষ... তোর আজাদী শেষ। এবার থেকে তুই আমার হলি। পুরোদমে আমার হলি!”

★ বর্তমান ★

অতীতের একাংশ আওড়াতে গিয়ে বাঁকা হাসির টানে অধর প্রশস্ত এডউইনের। পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছে বেগতিক কায়দায়। ওদিকে তার ওমন বাক্যালাপে হতবাকতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে নিরু। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটার পানে। নিজেকে খানিক ধাতস্থ করে আচমকা ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ অধীর দা যে এতোটা নির্দয় পাষণ্ড — তা যদি কোনোদিন মাহি জানতে পেরে যায় তখন? আপনার কি মনে হয়? ঐ নরম মনের মেয়েটা এতকিছু জানার পরও অধীর দা'য়ের সঙ্গে থাকতে চাইবে?”

সহসা ঘাড় কাত করল এডউইন। দৃষ্টি করল ক্ষুদ্র! মুখাবয়বে বড্ড শান্ত ভাব ঢেলে বিশাল আত্মবিশ্বাসের সাথে শুধালো,

“ আগে জানলে তো! এতদিনে যেহেতু জানতে পারেনি, আগেও জানতে পারবেনা। আমি জানতে দিবো না তাকে।”

বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে নিরুর। অজানা শঙ্কায় মাহি'র জন্য চিন্তা হচ্ছে বেশ। চিন্তিত চিত্তে হুট করেই এডউইনের পানে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি তাক করল সে। প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ কেনো করছেন এমনটা আপনি? ও-তো নিষ্পাপ! তাহলে কেনো ওর মতো নিষ্পাপকে জেনেশুনে মাফিয়া মনস্টার নামক রাক্ষসের জন্য উৎসর্গ হতে দিচ্ছেন? কেনো দিচ্ছেন আপনি?”

এবারে মুহুর্তব্যয়ে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এডউইন। দু'হাত তৎক্ষনাৎ ঢুকিয়ে নেয় পকেটে। অত্যন্ত গম্ভীর অথচ ভয়ানক কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে ওঠে,

“ রুশদী কিংডমের কিংয়ের জন্য শুধু একটা মাহিরা এহসান কেনো? দরকার পড়লে লক্ষাধিক মাহি'রা এহসানকেও উৎসর্গ করে দিবো আমি। প্রয়োজন পড়লে এই পৃথিবীর যতো মেয়ে আছে সবাইকে উৎসর্গ করে দিবো মনস্টারের পদতলে। এন্ড... আই উইল মেক শিওর অফ ইট।”

বলেই গটগটিয়ে কদম ছোটালো এডউইন। দাঁড়ালো না একপলও। এদিকে তার এহেন বাক্যবাণে জড়িয়ে জর্জরিত নিরু। আশ্চর্য! হুট করেই বুকের ভেতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। কাল পর্যন্ত যে-ই মেয়েটা ছিলো তার চিরশত্রু, আজ তার চিন্তাতেই হাসফাস করছে অষ্টাদশী!

********************************************

নির্বিঘ্নে আকাশের বুকচিরে এগিয়ে চলেছে মাফিয়া বিস্টের হেলিকপ্টারটি। কন্ট্রোলারে হাত ঠেকিয়ে রেখে এক-আধবার আড়দৃষ্টে পাশে তাকাচ্ছে মুগ্ধ। দেখছে — গাল ফুলিয়ে বসে থাকা মায়াবিনীকে। মায়াবিনীর অবনত দৃষ্টি! বারংবার দু'হাতে পরনের ছিঁড়ে ফাটা জামাটা ঢেকে রাখার দূর্বার প্রচেষ্টা, সবকিছুই কেমন নিরবে পরোখ করে যাচ্ছে বেহায়া লোক। তখনকার বেপরোয়া জোরজবরদস্তিতে বোকা মানবীর পরনের জামাটার সে-কি বেহাল দশা করেছে সে। এতে অবশ্য বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই রূঢ় মানবের মুখাবয়বে। সেথায় আছে কেবল একরাশ দুষ্ট ভাবস্রোত।

এদিকে, বোকা মানবীর নত দৃষ্টিযুগল আনমনে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো জানালার স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে। ওমনি অভ্যন্তরে খানিক হোঁচট খেলো মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো আরেকবার। আকাশ থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামছে তাদের হেলিকপ্টারটি। মুহুর্তেই মানবীর অক্ষিপুটের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একখানা দ্বীপ! এ যেন নীল সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা সবুজ কোনো পান্নাখণ্ড। চারদিক ঘিরে স্বচ্ছ নীল জল, তীরের কাছে যার রং ধীরে ধীরে আকাশি থেকে গাঢ় নীলে মিশে গেছে। কোথাও সাদা বালুর সরু সৈকত, কোথাও আবার কালচে পাথুরে পাহাড় সমুদ্রের বুক চিরে উঠে এসেছে তীরে। বোকা মানবী হতভম্ব! হতভম্বতায় বাকরুদ্ধ তার জিভের ডগা। হেলিকপ্টার যত নিচে নামছে, ততই সম্মুখের অবিশ্বাস্য দৃশ্য নজর কাড়ছে তার।

অদূরের দ্বীপের ঠিক মাঝখানে সবুজের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল সাদা প্রাসাদ। তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাগান। জলপাই-বন আর সরু পাথুরে পথগুলো কেমন নিখুঁত আঁকা নকশা ন্যায় জ্বলজ্বল করছে। মায়াবিনীর বিস্ময়বিষ্ট দৃষ্টিযুগল পশ্চিম প্রান্তে পড়তেই দেখল — চকচকে ব্যক্তিগত এক হেলিপ্যাড। তার পাশে পাহাড়ের ঢালে নেমে গেছে আলোকিত পথ, তার নিচে সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত মেরিনা কেমন মাথা উঁচিয়ে রেখেছে। সেথায় কয়েকটি বিলাসবহুল নৌযান নোঙর করে রাখা। দ্বীপের এক কোণে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে কাচে ঘেরা ছোট্ট একটি ভিলা। বোকা রমণী তৎক্ষনাৎ পাশ ফিরলো। হতভম্ব কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ আমরা এটা কোথায় এলাম বিস্ট? এই দ্বীপের নাম কী?”

রূঢ় মানব প্রতুত্তর করল না। গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলো সম্মুখে। কন্ট্রোল স্টিকে ধীরলয়ে টান বসিয়ে নামাচ্ছে হেলিকপ্টারটি। খানিকবাদে দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তের পাহাড়চূড়ায় নির্মিত ব্যক্তিগত হেলিপ্যাডে ধীরে ধীরে অবতরণ করালো কালো হেলিকপ্টারটি। আকাশযানের ঘূর্ণায়মান ব্লেডের তীব্র বাতাসে চারপাশের জলপাইগাছগুলো কেমন উন্মত্তের মতো দুলে উঠল। হেলিকপ্টারের চাকাগুলো মাটিতে স্পর্শ করতেই হেলিপ্যাডের চারপাশে বসানো ক্ষীণ সোনালি বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠল। এহেন কান্ডে বোকা মানবী তার হতভম্বতার সাগরে আরেকটু তলিয়ে গেল বোধহয়। জিভের ডগা বাকশূন্য রেখে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখল সব। আকাশযানের ঘূর্ণায়নমান ব্লেডের গতি ক্রমশ কমে এলো। এপর্যায়ে মুগ্ধ কেমন গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলো হেলিকপ্টার থেকে। পাশে বসে থাকা মাহি হকচকালো। লোকটা তাকে বের করবে না? সে-কি একা একা বসে থাকবে? এরূপ চিন্তায় মগ্ন মানবী, ত্রস্ত হাত বাড়িয়ে দুয়ার খুলতে চাইলেই একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা খুলে দিলো হেলিকপ্টারের দুয়ার। পরক্ষনে মেয়েটাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আলগোছে তাকে তুলে নিলো নিজ কোলে। মাহি স্তব্ধ! পড়ে যাবার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের কাঁধ। আনমনে দৃষ্টি ঠেকালো অদূরে।

হেলিপ্যাড থেকে শুরু হয়েছে কালো একখানা পাথরে বাঁধানো দীর্ঘ পথ। পথটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে গিয়েছে নিচে — সরাসরি দ্বীপের রাজকীয় প্রাসাদের দিকে। দুপাশে সারি সারি জলপাইগাছ আর ছাঁটা ল্যাভেন্ডারের ঝোপ। রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ পাদু’টো গটগটিয়ে এগোচ্ছে সে পথ ধরে। পথের নিচে লুকানো আলোয় পুরো পথটা রাতের অন্ধকারেও কেমন জ্বলজ্বল করছে। মাহি বড্ড বিমুগ্ধতার সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সব। বিস্ময়ে আকুল হয়ে অস্ফুটে ফের জিজ্ঞেস করে উঠল,

“ কোথায় যাচ্ছি?”

নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটায় মত্ত মুগ্ধ। একহাতে মানবীকে কোলে তুলে রেখে পরপরই প্রতুত্তর করল,

“ স্বস্তি পেতে।”

★

দ্বীপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সু-বিশাল প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছে ইতালিয়ান-আলবেনিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে। বাইরে থেকে এতক্ষণ প্রাসাদটাকে পুরোনো কোনো রাজপরিবারের দুর্গ মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই সবখানে আধুনিক বিলাসিতার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হতেই চোখদুটো ধাঁধিয়ে উঠল মাহি'র। তড়িঘড়ি করে রূঢ় মানবের কোলে থেকেই ঘাড় ঝুঁকিয়ে তাকালো মেঝেতে। কি সুন্দর তকতকে মার্বেলের মেঝে! মাথার ওপর অগণিত ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর বাদিকে সুবিশাল কাঁচের দেয়াল যা সমুদ্রের দিকে মুখ করে রাখা। প্রাসাদের এহেন সৌন্দর্যে আবিভূত মাহি। চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে সব। কিন্তু কাউকেই তেমন নজরে আসছে না তার। বাড়িতে কেউ নেই না-কি? কৌতুহলে প্রশ্নটুকু জিভের ডগায় এসে আচানক থেমে গেল মাহি'র। যে-ই দেখল রূঢ় মানব তাকে নিয়ে এগোচ্ছে ডানদিকের এক সুবিশাল কাঁচ-ঘেরা কক্ষে। যেথায় চারপাশে স্বচ্ছ আয়নার দেয়াল, অদূরে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা ম্যানিকুইন। যার গায়ে জড়িয়ে রাখা একদম অবিকল সিন্ড্রেলার ড্রেসের মতো ড্রেস। পুতুলের মতো সাজানো ড্রেসটির দিকে তাকিয়ে মাহির চোখ দুটো কেমন বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।

হালকা আকাশি আর রুপালি রঙের মিশেলে তৈরি গাউনটি কোমরের কাছে নিখুঁতভাবে আঁটসাঁট। বুকের ওপর সূক্ষ্ম ক্রিস্টালের কাজ, কোমর থেকে নিচে নামতেই গাউনটি কয়েক স্তরের নরম, স্বচ্ছ টিউলের পরতে পরতে ফুলে উঠেছে। প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝিলমিল পাথর।

গাউনটির সামনের অংশ যেমন কোমল, মার্জিত — কাঁধের ওপর থেকে তেমন নেমে এসেছে স্বচ্ছ রুপালি কাপড়ের সরু স্ট্র্যাপ। পেছনে রয়েছে লম্বা এবং হালকা ট্রেইল। বোধহয় হাঁটার সময় মেঝের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পিছলে যাবার জন্য দিয়ে রাখা। ড্রেসটির পাশে রাখা রয়েছে একজোড়া স্বচ্ছ ক্রিস্টাল হিল। আর তার ঠিক ওপরে ছোট্ট একটি রুপালি টিয়ারা। মানবীর চোখদুটোতে এবার বিস্ময় বাদ দিয়ে মুগ্ধতা ছড়ালো। এমন ড্রেস টিভিতে দেখেছে সে, তবে বাস্তবেও যে এমন মনোমুগ্ধকর ড্রেস হয় তা যেন কল্পনাতীত ছিলো তার। মুগ্ধ খানিকটা এগিয়ে এসে আচানক মেয়েটাকে আলতো করে নামিয়ে দিলো কোল থেকে। বিস্মিত মানবী ঘাড় বাকাঁনোর পূর্বেই রূঢ় মানব বড্ড গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,

“ ওয়্যার দিস!”

আচমকা মুগ্ধতার দেয়ালে চির ধরলো মাহি'র। ত্বরিত বিভ্রম নিয়ে তাকালো লোকটার পানে। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ হু?”

গভীর হলো মুগ্ধের দৃষ্টি। অধর খেললো এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ। ক্ষুদ্র মানবীর মুখের ওপর বলিষ্ঠ ঘাড়টা বড্ড ঝুঁকিয়ে এনে আলতো স্বরে আওড়াল,

“ বলেছি এটা পরে নে! আ'ই হেভ সামথিং ফর ইউ। আমি বাইরেই আছি। তাড়াতাড়ি চলে আসবি কেমন?”

বলেই মেয়েটাকে আর কিছু বলার ফুরসত না দিয়ে গটগটিয়ে উল্টো পথ ধরল মুগ্ধ। তবে মাঝপথেই কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে আচমকা ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। মুখাবয়বে দুষ্টুমির প্রলেপ লেপ্টে আচানক গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

“ ড্রেসটা একা একা পরতে পারবি? না-কি আমি হেল্প করব? কেননা এখানে তুই আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সো.... আসব না-কি খুলতে? ওপস, আই মিন টু সে পরাতে।”

ভড়কায় মাহি! লজ্জায় রাঙা হলো তার পেলব মুখখানা। ত্রস্ত ঘাড় ঝুঁকিয়ে লুকলো মুখ। কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,

“ নাহ! আমি পারবো?”

অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। পরক্ষণে সন্দিষ্ট কন্ঠে শুধালো,

“ সত্যি?”

ওপর নিচ নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকায় মাহি। তা দেখে অলক্ষ্যে গালের ভাঁজে জিভ ঠেললো অসভ্য লোক। আচমকা শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে শুধালো,

“ ইউ হেভ অনলি টেন মিনিটস। এরমধ্যে না হলে — আমি এসে খুলে... ওপস, পরিয়ে দিবো কেমন?”

লজ্জায় কানদুটো গরম হয়ে গেল মাহি'র। নিঃশব্দে খানিক মাথা কাত করল মানবী। রূঢ় মানব একপলক তাকিয়ে থেকে পরক্ষণে গটগটিয়ে চলে গেল বাইরে। তা আড়দৃষ্টিতে পরোখ করে স্বস্তিতে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মাহি। ধীরলয়ে ফের তাকালো সম্মুখের রাজকীয় ড্রেসটার দিকে। ড্রেসটা পরলে কেমন দেখাবে তাকে? কোনো রূপকথার গল্পের রাজকন্যার মতো? না-কি রানীর মতো?

__________________________________________

হাতের রোলেক্স ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক শব্দ বাজছে। জানান দিচ্ছে সময়ের অনুমান! সমুদ্রের বালুময় তীরে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ, ফুঁকছে সিগার। ক্ষনে ক্ষনে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার দাম্ভিক কদম জোড়া। বাদামী চোখদুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া অদূরের আকাশপটে নিবদ্ধ। ঠিক তখনি রূঢ় মানবের অন্তঃকোণে হুট করেই ধ্বক করে উঠার মতো বহু পরিচিত এক অনুভূতি জেগে উঠল। কোনরূপ বাক্য বিনিময় ছাড়াই রূঢ় মানবের মনে হলো — তার সিগনোরা এসেছে। সেই নিরব অনুভুতির অভিঘাতে দৈবাৎ শক্তিতে বলিষ্ঠ ঘাড়খানা বাঁকালো মুগ্ধ। ওমনি তার আনমনে দৃষ্টিজোড়া থমকে গেল একদিকে। থমকে গেল তার হৃৎস্পন্দন। সর্বাঙ্গের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল মুহুর্তেই। নিঃশ্বাসের গতি আঁটকে গেল ঠায়। আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা জ্বলন্ত সিগারটা জ্বলছে অবিরত। যেকোনো সময় ছ্যাক দিয়ে বসবে রূঢ় মানবের রুক্ষ আঙুলদ্বয়ে। অথচ সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে মানবের। সে-তো থমকেছে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সিন্ড্রেলার পোশাক পরিহিত মায়াবিনীকে দেখে তার হৃৎস্পন্দনের গতি কয়েকটা হারিয়েছে ইতোমধ্যেই। মাহি জড়তায় জর্জরিত! সুবিশাল ড্রেসটা নিয়ে ওতোদূর থেকে নির্বিঘ্নে হেঁটে এলেও, এবার এহেন বালুময় পথে হাঁটতে গিয়ে বড্ড বেগতিক দশায় পড়তে হচ্ছে তার। তাইতো দাঁড়িয়ে থেকে বারংবার ইতস্ততায় কচলাচ্ছে হাত। ধীরলয়ে ঘাড় উঁচিয়ে আনমনে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের পানে তাকাতেই লজ্জায় পড়ল মাহি। লজ্জায় পড়ল লোকটার ওমন গভীর দৃষ্টি দেখে। চটজলদি নজর অন্যত্র সরাতে উদ্যোত হতেই বেখেয়ালিবশত মুগ্ধের হাতের পানে দৃষ্টি ঠেকল মাহি'র। একি! লোকটার আঙুল পুড়ছে। সিগারের জ্বলন্তে স্পর্শে ধোঁয়া উড়ছে তার হাত থেকে। তবুও সে হাত থেকে সিগারটা ফেলছে না কেনো? মাহি উদ্বিগ্ন! তৎক্ষনাৎ হাত উঁচিয়ে মুগ্ধের উদ্দেশ্যে আওড়াল,

“ বিস্ট! হাত থেকে সিগারটা ফেলুন।”

পলক পড়ছে না মুগ্ধের। সেই সঙ্গে কথাটা কানে গেলো কি-না কে জানে! সে কেমন আগের ন্যায় তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। মাহি উপায়হীন এমুহূর্তে। তক্ষুনি দু'হাতে পরনের গাউনটা যথাসম্ভব উঁচু করে ছুটলো লোকটার পানে। ঐটুকুন পথ অতিক্রম করতে বেশ সময় লাগলো তার। অবশেষে ছুটে এসে একটানে মুগ্ধের আঙুলের ভাঁজ হতে ফেলে দিলো সিগারের বাদবাকি অংশটুকু। পরক্ষণে সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায় বড্ড ঝাঁঝ লেপ্টে আওড়াল,

“ কি সমস্যা আপনার? কখন থেকে বলছি সিগারটা হাত থেকে ফেলতে। ফেললেন না কেনো? সবসময় আমাকে জ্বালাতন করতে ভালো লাগে তাই না?”

মুগ্ধের দৃষ্টিতে পরিবর্তন নেই! সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে এক অবোধ্য বিমুগ্ধতা। মায়াবিনী কি বলছে তা শুনলো না সে। সে কেবল দেখল — মেয়েটার টকটকে গোলাপি ঠোঁটদুটো নড়ছে। গালদুটো পাকা টমেটোর ন্যায় লাল হয়ে উঠেছে। সরু নাকের ডগাটা কুটুমের রঙে রঙিন। বিমুগ্ধ মানব তক্ষুনি শক্ত হাতের জোরে একটানে মানবীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমরটা আঁকড়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল মাহি। রাগ করে দৃষ্টি ঘোরালো অন্যত্র। মুগ্ধ হাসলো নিরবে। আচানক মানবীর চোখের সম্মুখে আঙুল উঁচিয়ে তাক করল অদূরের আকাশপথে। সন্দিগ্ধ মাহি কপাল কুঁচকায়। আড়দৃষ্টিতে অনুসরণ করল লোকটার ইশারা। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১১টা ৫৮ মিনিট। মুগ্ধের ব্যক্তিগত দ্বীপের আকাশে হুট করেই নিভে গেল সমস্ত কৃত্রিম আলো। চারদিক মুহূর্তেই ডুবে গেল নীলচে অন্ধকারে। মাহি হতভম্ব! মুগ্ধের বাহুর নিরাপদ বেষ্টনীতে আঁটকে থেকে চেয়ে রইলো কেবল। ঠিক তখনি মাথার ওপর দূর আকাশে একটি আলোকবিন্দু জ্বলে উঠল মনে হচ্ছে। পরপর জ্বললো আরেকটি! মাহি'র সন্দিগ্ধতা বেড়ে গেল বহুগুণে। অথচ তার সকল সন্দিগ্ধতা বাড়াতে পরমুহূর্তেই আকাশের বুকে একসঙ্গে জ্বলে উঠল শত-শত আলোকবিন্দু। মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার আকাশের বিশাল ক্যানভাসজুড়ে সেই আলোগুলো নিজেদের অবস্থান বদলাতে শুরু করল। মাহি বিস্ময়ে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে আলোগুলো একত্রিত হয়ে বিশাল অক্ষরে ফুটে উঠল—

❝ HAPPY BIRTHDAY ❞

দৃশ্যটুকু অবলোকন হওয়া মাত্রই মাহি'র ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেল মনে হচ্ছে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টে দেখল তা। তৎক্ষনাৎ হাত বাড়িয়ে রমণীর ফাঁক হয়ে যাওয়া চোয়ালটা হাত দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে মৃদু হেসে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। ওদিকে, আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করতে থাকা প্রথম লাইনের নিচে আরও অসংখ্য আলো জ্বলে উঠল এবার। অক্ষরগুলো নিজেদের পাল্টে গিয়ে তৈরি করল অন্য একটি নাম—

❝ RUSHDI'S SIGNORA ❞

মাহিরার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল এবার। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার বুঝে গেল — আকাশের বিশালতায়, সমুদ্রের ওপরে, শুধুমাত্র তার জন্য জ্বলছে এই নাম। সে যেমন নিরব আইল্যান্ডে নিজ ঐকান্তিক মানুষটার নিরব বাহুবন্ধনে বিস্ময়টুকু উপভোগ করছে, অপরদিকে, বিশ্বের আঠারোটি দেশের আকাশেও একই দৃশ্য ফুটে উঠেছে একই সময়ে। উৎসুক জনতার ভীড় জমে গিয়েছে রাস্তায়। ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত রাস্তার মানুষগুলো নিজেদের কাজ থামিয়ে দিয়ে হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো আকাশপটে। লন্ডনের কোনো এক অ্যাপার্টমেন্টের জানালা খুলে গেল উৎসুকতায়। কেউ কেউ ক্যামেরাবন্দী করতে লাগলো — কোনো এক পাগল প্রেমিকের পাগলামির নিদর্শনকে। একই সঙ্গে — রোম, প্যারিস, দুবাই, নিউইয়র্ক এক শহর থেকে আরেক শহরে ছড়িয়ে পড়ল এহেন বিস্ময়কর ঘটনা। মানুষ যে যার শহর থেকেই মাথা তুলে দেখল, আকাশে জ্বলজ্বল করছে —

“ HAPPY BIRTHDAY RUSHDI'S SIGNORA ”

তবে উৎসুক জনতার ভীড়ে কেবল একটি গুঞ্জন — আন্ডারওয়ার্ল্ডের সুপরিচিত মাফিয়াও তবে প্রেমিক হয়ে উঠল? তাও আবার পাগল প্রেমিক? তারা কেউ জানে না এই অসম্ভব আয়োজন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু... কিন্তু পৃথিবীর আঠারোটি দেশের মানুষ একই সময়ে একই বিস্ময়কর বার্তার সাক্ষী হয়ে গেল যেন। শুধু কি তারা? কয়েক মিনিটের মধ্যেই তো বিশ্বের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে চলমান অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল। আচমকা চলমান অনুষ্ঠানে রুখ টেনে টিভির পর্দায় লাল ব্যানারে ভেসে উঠল—

❝ BREAKING NEWS ❞

“এই মুহূর্তে বিশ্বের আঠারোটি দেশের আকাশে একই সঙ্গে একটি বিশাল জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা দেখা যাচ্ছে। বার্তাটি হলো—‘HAPPY BIRTHDAY, SIGNORA’।”

থামলেন বিদেশী অ্যাঙ্কর। পরমুহূর্তেই বিস্মিত কণ্ঠে আবারও বলল,

“এটি কোনো সরকারি আয়োজন নয়। এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা এর দায় স্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই অভূতপূর্ব আয়োজনের পেছনে রয়েছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম রহস্যময় মাফিয়া'স কিংডমের কিং — রুশদী কিং। তবে কি এবার পাগল প্রেমীদের নামের তালিকার শীর্ষে নিজের নামটা স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করলেন রুশদী কিং?”

★

মাহি তখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বিস্মিত চোখদুটোর কোণ চিকচিক করছে অশ্রুর উপস্থিতিতে। আচমকা এক হেঁচকা টানে রমণীর ক্ষুদ্র বদনখানা ঘুরে গেল বেপরোয়া যুবকের দিকে। অশ্রুসজল চোখদুটো তুলে তাকানোর জো নেই তার, তার পূর্বেই এক আগ্রাসী কায়দায় একজোড়া রুক্ষ ওষ্ঠপুট নিজ উদ্যোগে মিলন ঘটালো রমণীর তুলতুলে অধরযুগলের সনে। রমণী আজ বাঁধ সাধল না। শুরুতে বড্ড জড়তায় জর্জরিত থাকলেও, ধীরলয়ে তার জড়তাটুকু মিলিয়ে গেল দমকা হাওয়ার তালে। নিজ তুলতুলে হাতদুটোর নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল বেপরোয়া যুবকের ভি-শেইপের কোমরের ঝাঁক। প্রায় বেশকিছুক্ষণের উম্মত্ত ওষ্ঠপুটের মিলনে অনিচ্ছায় বিচ্ছেদ ঘটালেন রূঢ় মানব। পরমুহূর্তেই রমণীর কপালের সনে ঠেকালো কপাল। বোকা মানবী চোখদুটো বুঁজে রেখেছে। হাঁপাচ্ছে বেশ! মুগ্ধ হাসলো। ভরাট কন্ঠে শুধালো,

“ হেপি বার্থডে সিগনোরা! আমার সিগনোরা।”

ভেজা চোখে আচমকা অধরজোড়া প্রশস্ত করল মাহি। তন্মধ্যে রূঢ় মানব ফের বলে উঠল,

“ মেক থ্রি উইশেস সিগনোরা!”

তৎক্ষনাৎ চোখদুটো খুলে তাকায় মাহি। মিলন ঘটায় লোকটার বাদামী চোখদুটোর সনে। সামান্য ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,

“ কেনো?”

অধর কামড়ে হাসল জনাব। আলতো করে দু'হাতে আঁকড়ে ধরল মায়াবিনীর পেলব মুখখানা। ধীরকন্ঠে ফের বলল,

“ তোর বার্থডে উইশ ফুলফিল করা আমার দায়িত্ব সিগনোরা। সো...টেল মি। হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?”

বোকা মানবী অপ্রস্তুত হলো। নজরে বিলকুল ব্যাঘাত না ঘটিয়ে আচমকা বলে বসল,

“ যা চাইবো দিবেন?”

ওপর নিচ মাথা ঝাঁকায় মুগ্ধ। তা দেখে মৃদু হাসে মাহি। তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে,

“ আমার প্রথম উইশ — আমি চাই আপনি আমাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করুন। দ্বিতীয় উইশ — আমি চাই আগামী সাতদিন আপনি শুধু আমার থাকুন। কোনো মাফিয়া বিস্ট নয় শুধুমাত্র আমার মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে। আমি শুধু আপনাকে চাই — মির্জা সায়ান মুগ্ধ। শুধু আপনাকে। বলুন, পূরন করবেন আমার এই উইশ দু'টো?”

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন