#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৪(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“ আমার প্রথম উইশ — আমি চাই আপনি আমাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করুন। দ্বিতীয় উইশ — আমি চাই আগামী সাতদিন আপনি শুধু আমার থাকুন। কোনো মাফিয়া বিস্ট নয় শুধুমাত্র আমার মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে। আমি শুধু আপনাকে — চাই মির্জা সায়ান মুগ্ধ। শুধু আপনাকে। বলুন, পূরণ করবেন আমার এই উইশ দু'টো?”
থমকায় রূঢ় মানব! থমকায় তার মুখ অভিব্যক্তি। বোকা মানবীর হুটহাট চেয়ে বসা আবদার গুলো খুব একটা মনে ধরেনি তার। সুশ্রী মুখমণ্ডলে ফুটেছে চরম অসন্তোষের ছাপ! ক্ষণকাল বাদেই ললাটের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ পরিলক্ষিত হলো রূঢ় মানবের। দৃঢ় চোয়ালটা তার শক্ত হয়ে গেল আরও। তৎক্ষনাৎ মানবীর উৎসুক দৃষ্টিজোড়া হতে নজর সরিয়ে এনে তাক করল অন্যত্র। মাহি হতভম্ব তার এরূপ প্রতিক্রিয়ায়! সন্দিগ্ধ দৃষ্টিযুগল উঁচিয়ে সুদর্শনের পানে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ টের পেলো — তার পাতলা কোমর বরাবর এতক্ষণ যাবত আঁকড়ে ধরে রাখা যুবকের শক্তপোক্ত হাতখানা কেমন ধীরে ধীরে আলগা হচ্ছে! ক্ষণ প্রবাহে রূঢ় মানবের হাতের জোরালো বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হলো মায়াবিনীর ক্ষুদ্র বদন। রমণী হতবিহ্বল! নরম পাদু’টো তার জামার ভারে খানিক টলতে টলতে পিছিয়ে গেল একটুখানি দুরত্বে। রূঢ় মানব তক্ষুনি শক্তমুখে দু'হাত গুঁজল পকেটে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে, দাঁতে তুললো কটমট শব্দ! খাঁড়া, নিখুঁত নাকের ডগাটা বড্ড ফুলিয়ে, সাপের ন্যায় হিসহিসিয়ে আচমকা রমণীকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যোত হলো মুগ্ধ। দাম্ভিক কদমজোড়া খানিকটা এগোতেই আচানক পেছন থেকে একজোড়া নরম তুলতুলে হাত মুহুর্তেই খাবলে ধরল তার শক্ত বাঁহাতের কব্জি। তৎক্ষনাৎ থেমে গেল রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল। বলিষ্ঠ ঘাড়টা দাম্ভিকতার পরশে একটাবার পিছুও ফিরলো না তার। এতে বুঝি বড্ড আহত হলো সদ্য অষ্টাদশে পা রাখা মায়াবিণী। কিছুক্ষণ আগ অব্ধি উপচে পড়া খুশিতে জ্বলজ্বল করতে থাকা তার স্নিগ্ধ মুখাবয়বে হুট করেই নেমে এলো — এক রাজ্যসম অন্ধকার। টকটকে গোলাপি অধরজোড়া খানিক উল্টে মায়াবিনী তক্ষুনি ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,
“ দু'হাত ভরে পূর্ণতার সুখ এনে হঠাৎ অর্ধেকটা দিয়ে বাকিটা ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন?”
প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় দৃঢ়, রূঢ় মানব কেমন পাহাড়ের ন্যায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টিজোড়া বড্ড তীক্ষ্ণতায় আবির্ভূত। রমণীর তুলতুলে হাতদুটোর বাঁধন হতে নিজ রুক্ষ হাতখানা সরিয়ে নেবার মোটেও তাড়া নেই তার মাঝে। বরং মানবীর ওমন ভগ্ন কন্ঠে শুনেও নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বোকা মানবী খানিক হাসফাস করে উঠল এবার। হাতদুটোর তুলতুলে বাঁধন যৎসামান্য দৃঢ় করে এগিয়ে এলো একপা। পাহাড়সম লোকটার পিঠ বরাবর অনবদ্য দৃষ্টি ঠেকিয়ে ফের আওড়াল,
“ আপনি বলেছিলেন — আমি যা চাইব, তাই দিবেন বিস্ট। বলেছিলেন আপনি আমার তিনটে উইশ পূরণ করবেন। যদি পূরণ করবার সাধ্যি নাই-বা থাকতো, তাহলে মিথ্যে আশা দেখালেন কেনো? দু-চোখ ভর্তি রূপকথার স্বপ্ন দেখিয়ে হুট করেই ভাঙিয়ে দিলেন ঘুম। তারওপর ওমন নির্দয়ের মতো পিঠ দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন?”
এবারেও নিশ্চুপ মুগ্ধ! মুখাবয়বে দৃঢ়তা অবলম্বন করে, কন্ঠার নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারী উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে শক্ত ঢোক গিললো সে। পিছু দাঁড়িয়ে থাকা মায়াবিনীর চোখদুটো ছলছল। গভীর দৃষ্টে এখনো তাকিয়ে আছে রূঢ় মানবের পিঠের দিকে। আত্মোপলব্ধি জরাজীর্ণ তার কোমল হৃদয়। অবচেতন মনের কোণে কেবল উত্থাপিত হচ্ছে একটিবাক্য!
“ নির্দয়রা কি তবে সত্যিই নিজেদের খোলস পাল্টাতে অপারগ?”
শুকনো ঢোক গিললো মাহি। ধীরলয়ে এগিয়ে এলো আরও দুপা। অতঃপর জরাজীর্ণ কোমল হৃদয়ের ভগ্নতার ভারে আচমকা ক্ষুদ্র বদনখানিতে বেশ দূর্বলতা টেনে, দু'হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতটা। আলগোছে সেথায় মাথা ঠেকিয়ে ছলছল চোখজোড়া বুজঁল মাহি। সঙ্গে সঙ্গে পলকের ঝাপ্টায় মায়াবিনীর চোখের কার্নিশ বেয়ে টুপ করে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা নোনাজল। তা নিঃশব্দে গড়ালেও, সম্মুখের নির্দয়ের কনক্রিটের আস্তরণে ঢেকে থাকা হৃদয়টা বুঝি বেশ টের পেলো তা। কেমন অজান্তেই বুকের খাঁচায় মোচড়ে উঠল বেয়াদব অঙ্গটা। হৃদয়ের হুটহাট চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত রূঢ় মানব, তৎক্ষনাৎ কপাল গুছিয়ে দাঁত বসালো অধরের কোণে। তন্মধ্যে মায়াবিনী মুখ খুললো। কি করুণ তার কন্ঠ!
“ আমায়...একটু নিজেকে হারাতে দিন না মুগ্ধ। একটু ভুলতে দিন ‘ আমিটা-কে ’। একটু ভুলতে দিন আপনার- আমার মাঝে থাকা সকল বাঁধাবিপত্তিকে। ভুলতে দিন — আপনার করা সেই সকল হিং স্রতাগুলো, যা বারংবার ক্ষত-বিক্ষত করেছে আমায়। আপনি বলেছিলেন, আপনি আমায় আপনার প্রতি দূর্বল করেই ছাড়বেন। বলেছিলেন — এই আমার চোখে আপনি নিজের জন্য কাতরতা এনেই ছাড়বেন। তবে আজ আমি বলছি মুগ্ধ! নিজে থেকে বলছি, আমিও দূর্বল হতে চাই। হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি দূর্বল হতে চাই ঐ মির্জা সায়ান মুগ্ধের প্রতি — যার সঙ্গে প্রথম দর্শনে আমি কিশোরী মনে মুগ্ধতার ছোঁয়া লেগেছিল। আমি ঐ মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার নামক মানুষটাকে ঘৃণা করি আমি মুগ্ধ, ঘৃণা করি তার হিং স্রতা। কিন্তু .. সেই ঘৃণার একছিটেও পারছিনা মির্জা সায়ান মুগ্ধের প্রতি আনতে। আমি দূর্বল মুগ্ধ! চাচ্ছি আরও দূর্বল হতে। যতোটা দূর্বল হলে পুরো জগৎ-সংসারের সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে কারো মায়ায় জড়ানো যায়, ঠিক ততোটা।
আমি খুব করে চাচ্ছি মুগ্ধ, আপনার - আমার তিক্ত অতীতটা ভুলিয়ে আবারও দ্বিতীয়বারের মতো মন থেকে আপনার প্রতি দূর্বল হতে। এবার আর কোনো ছলনা নয়, নয় কোনো মোহদ্বন্দতা। খুব করে চাচ্ছি — আপনার বেপরোয়া ভালোবাসার রঙে নিজেকে একটুখানি রাঙাতে। খুব করে চাচ্ছি — আপনার চোখদুটোতে হিং স্রতার বদলে আমার জন্য, কেবলমাত্র আমার জন্য উন্মত্ততা দেখতে। জানি তো, আজ নয়তো কাল আপনি ঠিক নিজের চিরচেনা খোলসে ফিরবেন। আমি জানি আপনি রুশদী কিং, জানি আপনি হিং স্র! কিন্তু তারপরও আমি লোভী মানুষ। খুব বেশি না, মাত্র সাতটাদিন! আমি খুব সময় চাইবো না। আপনার দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে আমায় আর মাত্র সাতটাদিন দিয়ে দিন। আমি বিষন্ন, অন্তরের দোলাচালে না পারছি আগাতে, আর না পারছি পেছাতে। অন্তত আমাকে এহেন দোলাচল থেকে মুক্তি দিন মুগ্ধ, আগামী সাতদিন আপনার সকল হিং স্র ভুলে গিয়ে, আপনি কেবল আমার থাকুন। আমায় খুব করে আপনাকে অনুভব করবার সুযোগটুকু দিন।”
কাঁদছে মাহি! হু হু করে ভাঙছে নয়নের সকল জমানো বাঁধ। ধীরে ধীরে সিক্ত করে দিচ্ছে রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ বাহুটা। অথচ এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তায় নির্বিকার মুগ্ধ! মায়াবিনীর কান্নার মাঝেই আচমকা জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিলো নিজ বলিষ্ঠ বাহুটা। হুট করেই কান্না থেমে গেল মাহি'র। সিক্ত চোখদুটোয় তার ভর করল একরাশ শূন্যতা। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টে সম্মুখে তাকিয়ে রইল সে। রূঢ় মানব কেমন গটগটিয়ে চলে যাচ্ছে দু'হাত পকেটে গুঁজে। তাকাচ্ছে না একটাবারও। রমণী বুক কাঁপছে এবার। অদ্ভুত এক শূন্যতা মুহুর্তেই গ্রাস করল তাকে, দূর্বল করে দিলো পাদু’টোর শক্ত হাড়! ধীরে ধীরে টলতে টলতে রমণী হুট করেই হাঁটু ভেঙে ধপ করে বসে পড়ল জমিনে। চোখদুটোতে এক আকাশসম কাতরতা ঢেলে চেয়ে রইল মাহি। লোকটা ক্রমশ দৃশ্যপটের আড়াল হচ্ছে। একপর্যায়ে পুরোপুরি আড়াল হতেই বুকভাঙা আর্তনাদে ভেঙে পড়ল মাহি। কাঁদতে কাঁদতে দু'হাতে ঢেকে নিলো নিজ ক্ষুদ্র মুখখানা। মনে মনে বিড়বিড়ালো,
“ তাহলে হিং স্রতা আর আমার মাঝে আপনি হিং স্রতাটাকেই বেছে নিলেন মুগ্ধ! আবারও ভুল প্রমাণ করলেন আমায়। আপনার প্রতি দূর্বল হতে চাওয়াটা তবে আমার গোটা এক জীবনের অপূর্ণতা। আপনাকে, কেবল মির্জা সায়ান মুগ্ধকে নিজের করে পেতে চাওয়াটা কী আমার সবচেয়ে বড়ো লোভ মুগ্ধ? এটা কী আমার খুব বড়ো লোভ?”
নিজ মনের কোণে উত্থাপিত প্রশ্নের কাঙ্ক্ষিত উত্তর অজানা মানবীর। ফোলা ফোলা ড্রেসটার ওপর ভর দিয়ে কেঁদে যাচ্ছে একমনে। পাশেই গর্জন তুলছে সায়র! মাথার ওপর টিমটিমে তাঁরাভর্তি খোলা আকাশ। দূর থেকে একনজর মায়াবিনীকে পরোখ করলে মনে হবে — এ যেন রূপকথার এক রাজকন্যা! নিজ রাজকুমারের বিরহে সৈকতের বালুর ওপর বসে বসে কাঁদছে। ক্ষণকাল কতটুকু পেরুলো কে জানে! তন্মধ্যে আচানক অদূর হতে মায়াবিনীর কর্ণকুহরে ভেসে এলো এক সুপরিচিত ভরাট কন্ঠ!
“ হেই চাশমিস!”
ত্বরিত কান্না থামালো মাহি। কোনরূপ কালবিলম্ব না করে তড়াক মুখমণ্ডল হতে সরালো হাত। বিভ্রমে জর্জরিত আখিঁদ্বয় একযোগে অদূরে তাক করতেই থমকায় সে। অভ্যন্তরে হোঁচট খেল বেশ বড়সড়। অদূরে দু'হাত কালো রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। পরনে তার সেই প্রথম পরিচয় কালে পরিহিত কালো রঙা টেঙ্ক-টপটা। মাথাভর্তি বাবরিছাঁটা সিল্কি চুলগুলোর একাংশ, সেদিনের মতো এখনো পেছনে রাবারের বাঁধনে আঁটকে রাখা। সুদর্শনের ফর্সা কপালটা সেদিনের মতোই ঢেকে আছে এলোমেলো চুলের বাহারে। বলিষ্ঠহাতদুটোর ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলস, বাদামী চোখদুটোর সেই একইরকমের স্থির দৃষ্টি! আই ভ্রো-তে পিয়ার্সিং নেই, ঠোঁটের কোণে সর্বদা বসিয়ে রাখা রিংটা এখন অনুপস্থিত। অষ্টাদশীর চোখদুটো স্থির হয়ে গেল যেন। কার্নিশ ভরে উঠল ফের। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যেন সেই মির্জা সায়ান মুগ্ধ, যাকে প্রথম দেখেছিল সে। ঠিক একই বেশভূষা, একইরকম গভীর চাহনি, একইরকম দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি! মাহি'র পলক ফেলার জো নেই। ক্ষুদ্র মুখখানায় তার অবিশ্বাসের ভাবস্রোত স্পষ্ট। ঠিক তখনি অদূরে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন মুখ খুললো। রমণীর পানে গভীর দৃষ্টিদ্বয় নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাক করে রেখে, ভারিক্কি গলায় শুধালো,
“ ফার্স্ট মিটিংয়ে আমায় দেখে ভয় পেয়ে দূরে সরে গিয়েছিলি চাশমিস। কথা অবধি বলিসনি! আজ-ও কী সেদিনের মতো আমায় দেখে ভয় পেয়ে পালাবি?”
থামলো মুগ্ধ! পরপরই হতবাক রমণীর অভিমুখে নিজ বলিষ্ঠ বাহুদ্বয় প্রশস্ত করে হাস্কি স্বরে ফের আওড়াল,
“ কাছে আয় ঘাড়ত্যাড়া! পূরণ করে নে তোর করা প্রথম উইশটা। ওঠ, ওঠ চাশমিস! একটাবার স্বেচ্ছায় জড়িয়ে ধরবি না তোর মির্জা সায়ান মুগ্ধকে?”
রূঢ় মানবের শেষ বাক্যটুকু কর্নধার হতেই থমকে গেল মায়াবিনীর সমগ্র সত্তা। চোখদুটো পলক ফেলতে ভুলে গেল যেন। অন্তঃকোণে চলছে তোলপাড়। সেই তোলপাড়ের অভিঘাতে মুষড়ে যাচ্ছে রমণী। শত ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে একটুকরো শান্তির ঝলক পেতেই সিক্ত চোখদুটো চকচক করে উঠলো তার। পরক্ষণেই আর কোনোরূপ দ্বিধায় জড়ালো না সে। সিক্ত চোখদুটো মোছার বিন্দুমাত্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করেই তৎক্ষনাৎ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মানবী। অধরকোণে এক চিলতে প্রাপ্তির হাসি টেনে, দু'হাতে আঁকড়ে ধরল পরনের ড্রেসটা। পরপরই অশ্রুসিক্ত আঁখিজোড়া মেলে ঝড়ের বেগে ছুটলো মানবী। দিশাহীন কায়দায় ছোটালো পাদু’টো। পথিমধ্যে সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী জুতোজোড়া বড্ড জ্বালালো তাকে। ছোটার ফাঁকে আচানক একখানা খুলে থেকে গেল বালুময় ভূবনে। অষ্টাদশী সেদিকে তোয়াক্কা করল না। ঠিক যেন এক রূপকথার রাজকন্যার ন্যায় নিজ বহুদিনের প্রতীক্ষিত আশ্রয়ের কাছে ফিরে যাবার প্রয়াসে ছুুটছে সে।
মধ্যকার পাঁচ দুরত্বের কাঁটাতারের অপেক্ষাটুকু খানিকবাদে স্বেচ্ছায় গ্রাস করলো মাহি। জমাটবদ্ধ সমস্ত অভিমান, সমস্ত বাঁধ বিপত্তি — সবকিছু ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুগ্ধর প্রশস্ত রুক্ষ বুকে। এক দমকা হাওয়ার বেগে একখানা তুলতুলে ক্ষুদ্র বদন নিজ বদনে পরশ ছোঁয়াতেই আর একমুহূর্তও দেরি করলো না মুগ্ধ। বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের দৃঢ় বন্ধনে মুহূর্তেই আগলে নিলো তার অঘোষিত সমগ্র অস্তিত্বকে। আকস্মিক আবেগের টানে রমণীর ক্ষুদ্র বদনখানি বুকের সঙ্গে আরও নিবিড় করে টেনে নিয়ে, অনায়াসে মানবীর পাদু’টো মাটি থেকে তুলে নিলো রূঢ় মানব। সহসা শূন্যে ঝুলে রইল রমণীর তুলতলে কদম জোড়া। পরিতৃপ্তিতে ক্ষীণ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো সুদর্শনের অধর ফুঁড়ে। ললাটে নামলো স্বস্তির পরিতুষ্টি। চোখদুটো আবেশে বুঁজে নিয়ে, হাতের বাঁধন দৃঢ় করল মুগ্ধ। সুযোগ থাকলে এক্ষুণি বোধহয় মায়াবিনীকে ঢুকিয়ে ফেলতো নিজ বক্ষপিঞ্জরের খাঁচায়। মায়াবিনীও কম যায় না! তুলতুলে দু'হাতে বলিষ্ঠের ঘাড়টা বড়ো শক্ত করে পেঁচিয়ে, মুখ গুঁজেছে কাঁধের ত্বকে। মুহুর্তেই নিজের সমস্ত ভয়, সমস্ত সংকোচগুলো এক নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিলো মাহি। কম্পিত কণ্ঠে বড়ো জোর দিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ মুগ্ধ! আ-আমার মু-মুগ্ধ!”
সুদর্শনের ঠোঁটের কোণে সহসা ফুটে উঠল এক দুর্লভ, বিজয়ী হাসি। যেন এতদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটুকু ছুঁয়ে ফেলেছে সে। দৃঢ় বাহুবন্ধনে নিজ চাশমিসকে আগলে রেখে নত হলো তার মুখ। অধরে বাড়লো দুরত্ব! এক অদেখা অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে কেউ বুঝি হাতছানি দিচ্ছে তাকে। সে-ই হাতছানিটুকুকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করল মুগ্ধ। বুকের ভেতর অস্থির হৃদস্পন্দন নিয়ে রমণীকে বড্ড শক্ত করে জড়িয়ে রেখে, প্রথমবারের মতো নিজ খোলস থেকে বেরিয়ে এসে বড়ো কাতর কন্ঠে আওড়াল,
“ আ-আমায়...আমায় কখনো ছেড়ে যাস না চাশমিস! তোর বিরহ আমার সহ্য হবে না। ম'রে যাবো আমি! সত্যি... ম'রে যাবো আমি। আমার এই দুর্বিষহ জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি তুই, আমার বেঁচে থাকার কারণও। যেদিন আমার কাছ থেকে আমার বেঁচে থাকার কারণ সরে যাবে, আমি সেদিন স্বেচ্ছায় মৃ ত্যুকে আলিঙ্গন করব।”
আঁতকে উঠে মাহি। তড়াক জোরপূর্বক রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ বাঁধন হতে মুখ তুলে চাইলো সে। তাকালো সুদর্শনের লাল হয়ে যাওয়া মুখপানে। মুহুর্তেই বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল তার। অস্থিরতায় তৎক্ষনাৎ তুলতুলে দু'হাতে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধের রুক্ষ দু-গাল। মুগ্ধ অনিমেষ দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। মাহি মৃদু হাসলো। মুখটা বড্ড এগিয়ে এনে রূঢ় মানবের ললাটতটে আলতো করে ছুঁইয়ে দিলো ঠোঁট। আবেশে চোখদুটো বুঁজে এলো মুগ্ধের। দৃঢ় হলো বাহুদ্বয়ের বেষ্টন। মায়াবিনী অধর সরালো না। সেথায় ছুঁয়ে রেখেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কন্ঠে আওড়াল,
“ হুঁশশ! এসব বলতে নেই। এই যে, আমি আছি তো! আর কোনোদিন ছেড়ে যাবো না আপনাকে। কোনোদিন না। যার অস্তিত্ব মিশে যাচ্ছে আমার অন্তরে, তাকে ফেলে কোথায় যাবো আমি? এতবড় সাধ্যি আমার থোড়াই হবে।”
অধরজোড়া সামান্য ছড়ালো মুগ্ধের। চোখদুটো ধীরলয়ে সরালো নিজেদের পর্দা। হাতদুটোর নিবিড় আলিঙ্গনের বেষ্টনে মায়াবিনীকে আগলে রেখে হুট করেই ক্ষীণ কন্ঠে আওড়াল,
“ সত্যি যাবি না তো?”
মাহি অধর সরায় এবার। মুহুর্তব্যয়ে ভেজা আঁখিদ্বয় তাক করে সুদর্শনের পানে। ঠোঁটের কোণে একটুকরো মিষ্টি হাসির রেশ ঝুলিয়ে আচমকা নিজ সরু নাকের ডগাটা এগিয়ে এনে, আলতো করে ঘষে দেয় মুগ্ধের নাকের সনে। ধীর স্বরে প্রতুত্তর করে,
“ যাবো না, যাবো না, যাবো না। আমার মুগ্ধকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাবো না।”
এতক্ষণে প্রশান্তির সুখে অধরজোড়া বড্ড প্রশস্ত হলো মুগ্ধের। রমণীও হাসলো খানিক। ধীরলয়ে মুখ সরিয়ে এনে আলতো স্বরে ফের আওড়াল,
“ চলুন!”
মুহুর্তেই সন্দিগ্ধতা ছড়ালো মুগ্ধের কন্ঠে,
“ কোথায়?”
মায়াবিনী চটজলদি উল্টোদিকে তর্জনী তাক করলো। বড্ড উচ্ছ্বসিত কন্ঠে শুধালো,
“ একসঙ্গে রাতের আকাশ দেখতে! চলুন না।”
রসকষহীন কাঠখোট্টা মানবের এসবে মন ধরে না। তবুও তার চোখেমুখে নেই বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ। বরং মায়াবিনীর আবদার শিরোধার্যে তুলে, মেয়েটাকে কোলে নিয়েই বাড়ালো পা। খানিকটা এগিয়ে এসে বালুময় প্রান্তরে দাঁড়াতেই মাহি চেঁচিয়ে উঠল,
“ দাঁড়ান, দাঁড়ান! এখানেই নামান।”
হুট করেই পায়ে রুখ টানলো মুগ্ধ। ঘাড়টা সামান্য কাত করে চাইলো মাহি'র পানে। গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ আমার কোলেই থাক না।”
মানবী তা মানতে নারাজ। একপ্রকার গো ধরে বলল,
“ নাহ! আমায় নিচে নামান। কোলে উঠে আকাশ দেখায় থোড়াই মজা আসবে। নামান তাড়াতাড়ি।”
মুগ্ধ উপায়হীন! মেয়েটার সম্মুখে গম্ভীরপনা চলছে না তার। তাই তো কেমন বাধ্য প্রেমিক পুরুষের ন্যায় মানবীকে নামিয়ে দিলো কোল থেকে। মাহি তক্ষুনি ছুটে গেল একপা। বড়ো আশা নিয়ে বসার জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে পেয়ে উচ্ছ্বসিত সে, তবে পরমুহূর্তেই নিজ পরনে অতো সুন্দর দামী ড্রেসটা দেখে মুখটা কালো হয়ে গেল মাহি'র। বালুর ওপর বসলে ড্রেসটা যদি খারাপ হ'য়ে যায় তখন? মন খারাপের আবহে মায়াবিনী চিবুক নামালো কন্ঠার নিকট। ঠিক তখনি দু'টো রুক্ষ আঙুল আচমকা ছুঁয়ে দিলো মাহি'র নরম চিবুকের ত্বক। নিজস্ব জোরে মেয়েটার মুখটা খানিকটা উঁচিয়ে তুলে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল মুগ্ধ,
“ কি হয়েছে? মন খারাপ করলি কেনো?”
বিষন্ন মাহি! ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে তাকালো নিজ পরনের জামার পানে। বড্ড আফসোসের সাথে প্রতুত্তর করল,
“ ভেবেছিলাম আপনার কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখব আর গল্প করব, তবে এই বালুতে বসলে ড্রেসটা নষ্ট হয়ে যাবে তো।”
“ সো হোয়াট?”
কথার পিঠে মুগ্ধের এহেন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে ভড়কায় মাহি। আমতা আমতা করে যে-ই না কিছু আওড়াতে যাবে, তার পূর্বেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল মুগ্ধের ভরাট অথচ দাম্ভিক কন্ঠ!
“ টাকার বিছানায় ঘুমানো মানবীর, খুচরো পয়সার চিন্তা করে লাভ নেই। একটা গেলে হাজারটা আনবো! তোর কাজ শুধু যেটা ভাল্লাগবে সেটার দিকে একবার চোখ তুলে তাকানো, দ্যাট'স ইট। সো ওসব বুলশিট নিয়ে মাথা ঘামাবি না। আয়!”
বলেই হতভম্ব মাহি'র নরম হাতের কব্জিসন্ধি আঁকড়ে টান বসালো মুগ্ধ। মেয়েটাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, নিজে গিয়ে বসলো বালুময় জমিনে। পরপরই অষ্টাদশীর কব্জিসন্ধিতে হেঁচকা টান বসিয়ে মেয়েটাকে একপ্রকার আছড়ে ফেলল নিজ রুক্ষ বক্ষের ওপর। ঘটনাপ্রবাহে হতবিহ্বল মাহি। খানিকক্ষণ লাগলো নিজেকে ধাতস্থ করতে। তন্মধ্যে মুগ্ধ কেমন ভারিক্কি গলায় বলে ওঠে,
“ তোকে আজ কেমন কেমন যেন লাগছে!”
ত্বরিত চোখদুটো তীক্ষ্ণ করল মাহি। ধীরলয়ে রূঢ় মানবের বুক থেকে সরে এসে আলতো করে মাথা রাখলো তার কোলে। অতঃপর দৃষ্টিজোড়া উঁচিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কেমন কেমন?”
অধর কামড়ে হাসল মুগ্ধ। আলতো করে আঙুল চালালো মায়াবিনীর চুলের ভাঁজে। ধীরকন্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ স্ট্রং ভো-দকার সাথে দুই পেগ কড়া হুইস্কি সামান্য ঝাঁকিয়ে উইদ লাইম সোডা মেশালে যেমন লাগে। ঠিক তেমন! উফফ...হোয়াট আ সে*ক্সি কম্বিনেশন।”
অবোধ্যের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মাহি। লোকটার কথায় হাসবে না মুখ কুঁচকাবে, তা নিয়ে পড়ল বড্ড সন্দিগ্ধতায়। একমুহূর্ত স্থবির থেকে পরক্ষণেই কপাল কুঁচকে আওড়াল,
“ স্বাভাবিকভাবে প্রশংসা করলে জাত যায় আপনার তাই না?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মাহি'র চুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ সম্ভবত ইয়েস!”
________________________________________
চারপাশে সায়রের মৃদু গর্জন! বড্ড দূরে সাগরপাখির ডাক আর বালুকাবেলায় ছড়িয়ে থাকা সকালের নরম স্নিগ্ধতায় প্রজ্বলিত আশপাশ। সমুদ্রের নোনা বাতাসের অভিঘাতে ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল অষ্টাদশীর বদ্ধ আঁখিদ্বয়ের পাপড়ি। গভীর নিদ্রায় সামান্য ছেদ পরতেই কপাল কুঁচকে গেল তার। একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে ধীরলয়ে খুললো চোখদুটো। নিবুনিবু দৃষ্টে তাকালো সমুদ্রের পানে। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক তার সজাগ হতে মিনিট খানেক নিলো বোধহয়। এরইমধ্যে ক্ষুদ্র বদনখানায় খানিক নড়চড় হলো মানবীর। আচমকা বোধ হলো — তার মাথার নিচে বালির নরম স্পর্শ নেই। বরং তার বদলে রয়েছে উষ্ণ এবং দৃঢ় কোনো এক আশ্রয়। বিস্মিত মানবী তক্ষুনি পলক তুলে চাইলো ওপরে। মুহুর্তেই দৃষ্টিপটের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো সুদর্শনের সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। কেমন অপলক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। তার বাদামী চোখদুটো গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ডানহাতের আঙুলগুলো এখনো চলছে মায়াবিনীর চুলের ভাঁজে। তার বদৌলতে প্রখর দিনের আলো মাহি'র মুখে এসে পড়েনি একটুও। সে যে নিজের শরীরটাকেই আলোর বিপরীতে ছায়ার প্রাচীর বানিয়ে রেখেছে।
ঘুমজড়ানো চোখে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল মাহি। বোকার ন্যায় অস্ফুটে শুধালো,
“ কখন উঠলেন?”
সুদর্শনের মুখ অভিব্যাক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে। দৃষ্টিতে প্রগাঢ়তা নামিয়ে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ যেখানে বন্ধ হয়নি চোখের পাতা, সেখানে নতুন করে জেগে উঠার প্রশ্ন নেহাৎ তাচ্ছিল্য বৈকি!”
আকাশ থেকে পড়ল মাহি। হতবাকতার অতল সমুদ্রে গলা অব্ধি ডুবে গিয়ে, তড়াক উঠে বসল শোয়া ছেড়ে। শরীর ঘুরিয়ে বিস্ফোরিত গলায় বলে উঠল,
“ কী বললেন? আপনি সারারাত ঘুমাননি? কেনো ঘুমালেন না আপনি?”
রূঢ় মানবের মুখাবয়বে ক্লান্তির নামমাত্র ছাপ নেই। সেথায় রয়েছে একরাশ বিমুগ্ধতা। আলগোছে একহাত বাড়িয়ে এনে, রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানার ওপর আছড়ে পড়া অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে শুধালো,
“ তোকে দেখতে দেখতে কখন সকাল হয়ে গেল, তা টের পাইনি!”
যুবকের নির্লিপ্ত উত্তর। তা শুনে হতভম্ব মাহি। কী অদ্ভুত মানুষ! কাউকে সারারাত ভরে দেখার মতো কি আছে? বোকা মানবী মুখ গোমড়া করল। মুগ্ধের হাতে ভর দিয়ে ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ালো কোনরকমে। এরইমধ্যে মানবী টের পেলো তার পেট ডাকছে। পেটের ভেতর গুড়গুড় করছে ইঁদুরগুলো। অষ্টাদশী তৎক্ষনাৎ রূঢ় মানবের উদ্দেশ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ঘুরতে চাইলো, ঠিক তখনি তার ক্ষুদ্র মুখখানা হুটহাট ধাক্কা খেলো রূঢ় মানবের ইস্পাত-দৃঢ় বক্ষের সনে। এরূপ অতর্কিত আঘাতের অভিঘাতে খানিক টলতে গেলেই মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতখানা আলগোছে আগলে নিলো রমণীকে। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে আচমকা শুধালো,
“ কী খাবি?”
হতবিহ্বল মাহি ত্বরিত হতবুদ্ধির ন্যায় তাকালো মুগ্ধের পানে। তার মুখাবয়বে হতবাকতার ছাপ স্পষ্ট। সন্দিহান গলায় অস্ফুটে আওড়াল,
“ আপনি কি করে বুঝলেন আমার ক্ষুধা পেয়েছে?”
মুগ্ধ প্রতুত্তর করল না। বরং মায়াবিনীকে একহাতের বলিষ্ঠ জোরে কোলে তুলে নিয়ে পা বাড়ালো ক্যাসেলের দিকে। অথচ মাহি এখনো উত্তরের অপেক্ষায়। লোকটা থামছে না বলে হুট করেই টেনে ধরলো শার্টের কলার। পরপর ব্যস্ত কন্ঠে শুধালো,
“ হেই ওয়েট...আলাদীনের জিনি!”
থামলো মুগ্ধ! এক আকাশসম বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো মাহি'র পানে। কেমন তিক্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ ওয়েট! হোয়াট ডিড ইউ সে? ইউ সেইড আলাদীনের জিনি? হোয়াদ্দা ফা'ক ইজ দিস দেড়ব্যাটারী? নামের অভাব পড়েছে ডাকার জন্য? কিসব উদ্ভট নাম এসব! আমার মতো হ্যান্ডসামকে দেখতে কোন জায়গা দিয়ে জিনিদের মতো লাগে?”
মাহি মুখ টিপে হাসলো। কিছুক্ষণ আগ অব্ধি ইচ্ছে ছিলো না লোকটাকে জ্বালাবার। তবে এবার তার দুষ্টু মনে উত্থাপিত হলো এক অভিনব দুষ্টুমির কৌশল। মানবী কপট ভাব টানলো মুখাবয়বে। তৎক্ষনাৎ দু'হাত উঠিয়ে আলগোছে ছুঁয়ে দিলো মুগ্ধের রুক্ষ গালদুটো। কপট নাটকীয় ভাবভঙ্গিতে বলল,
“ আশ্চর্য! ফা'ক ফা'ক করার কি আছে? যা সত্যি তা-ই তো বললাম। আপনি ইদানীং আলাদীনের জিনি হয়ে উঠেছেন আমার জন্য। আমার একমাত্র পার্সোনাল জিনি! চেরাগ না ঘষেও যার কাছে কিছু আবদার করলে তা চোখের পলকে হাজির হয়ে যায়। তো বলুন এবার? আপনি হলেন না আমার আলাদীনের জিনি?”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো মুগ্ধ। একমুহূর্ত স্থবির নয়নে রমণীর পানে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই দৃষ্টি সরালো অন্যত্র। কন্ঠে ফোঁটালো এক অদ্ভুত যন্ত্রণার ছাপ।
“ উহুঁ! ভুল বললি। আলাদীনের জিনির তো ঠাঁই পাওয়ার মতো একটা চেরাগ ছিল, আমার তো তাও নেই!”
বোকা মানবীর অন্তঃকোণে আঘাত হানলো বাক্যটুকু। জোরালো উপলব্ধিতে বুঝে গেল মুগ্ধের কথার গভীরার্থ। তক্ষুনি দু'হাতের আলতো জোরে বলিষ্ঠের সুদর্শন মুখখানা নিজের দিকে ঘোরালো মাহি। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ ফুটিয়ে, বড্ড আস্বস্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ কে বললো নেই? এই যে, আমি আছি না? আমি আপনার চেরাগ হবো, আর আপনি আমার রাশিয়ান দৈত্য! হয়ে গেল না একটা পারফেক্ট আলাদীনের জিনি কম্বো? তো বলুন, ইজ নট ইট কুল বিস্ট? ওপস সরি...মুগ্ধ।”
দৃষ্টিজোড়ায় প্রশান্তির ছাপ ফুটলো মুগ্ধের। ভ্রূদ্বয় কুঁচকে এলো সামান্য। অধরের কোণে দাঁত বসিয়ে, বলিষ্ঠ হাতের জোরে মেয়েটাকে আরেকটু এগিয়ে এনে কপালের সনে ঠেকালো কপাল। মাহি নিশ্চুপ! কোনরূপ তাড়া দেখালো না সরে যেতে। কয়েক মুহুর্ত নিজেদের নিশ্বাস প্রশ্বাস মাপলো তারা। পরক্ষণেই মধ্যকার নীরবতা কাটিয়ে মুগ্ধ কেমন ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ কতদিন রবি আমার?”
মায়াবিনী চোখ বুজঁল। ধীর কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ শেষ নিশ্বাস অবধি। চলবে?”
“ উঁহু!”
দু'ধারে মাথা নাড়ায় মুগ্ধ। তা উপলব্ধ হতেই শঙ্কায় কপাল গোছায় মাহি। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কেনো? এরচেয়ে বেশি যে আমার সাধ্যি তে নেই।”
এপর্যায়ে দৃষ্টি স্থির হলো মুগ্ধের। কন্ঠে নামলো দৃঢ়তা!
“ কে বলেছে নেই? পরপারেও তুই আমার থাকবি, আর আমি তোর! পৃথিবীর এটুকু সময়ের সান্নিধ্যে আমার পোষাবে না। এক্ষেত্রে আমি ভীষণ লোভী!”
চলবে.......
#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৬৪(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
“ কে বলেছে নেই? পরপারেও তুই আমার থাকবি, আর আমি তোর! পৃথিবীর এটুকু সময়ের সান্নিধ্যে আমার পোষাবে না। এক্ষেত্রে আমি ভীষণ লোভী!”
কী নিখাঁদ বাক্য! যেন প্রতিটি শব্দের পেছনে একেকটা তীক্ষ্ণ তীর সংযুক্ত। রমণীর কোমল হৃদয়ে যা বিদ্ধ হলো পরক্ষণেই। কর্ণকুহরে বাক্যযুগল পৌঁছাতেই স্তব্ধ হলো তার চারপাশ। স্তব্ধতার নিস্তব্ধতায় কিছুক্ষণ নির্বাক রইল তার জিভের ডগা। আবেশে আচ্ছাদিত ছলছল চোখজোড়া ধীরলয়ে নজর তাক করল সম্মুখের সুদর্শনের মুখপানে। সুদর্শন কপালে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ! আবেশের ভারে বুঁজেছে দু-চোখ। রমণী একমুহূর্ত ঠায় তাকিয়ে রইলো মুগ্ধের পানে। পরপরই তার আঁখিদ্বয়ের কার্নিশ ভরে উঠল বেহায়া আবেগের বশবর্তী হয়ে। ধীরলয়ে দৃষ্টি নামিয়ে চোখের পলক ফেলতেই যেই না চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুটি গড়িয়ে পড়ল কোটর ছাড়িয়ে, ওমনি রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের তালুখানা আলগোছে নিজেকে সপে দিলো মানবীর অশ্রুফোঁটার পদতলে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি। বিস্ফোরিত নেত্রে ঘাড় উঁচাতেই দৃশ্যমান হলো — সুদর্শনের গম্ভীর মুখখানা। সে কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজ ডানহাতের তালুতে পড়ে থাকা অশ্রুবিন্দুর দিকে। যেন খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে সে। খানিকবাদে রমণীকে বড্ড অবাক করে দিয়ে বলিষ্ঠ ঘটালো আরেক কান্ড। আচমকা নিজ হাতের উম্মুক্ত তালুটা টেনে এনে ঘষতে লাগল নিজ রুক্ষ বক্ষভাঁজে। মুখাবয়বে চরম অসন্তোষের ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,
“ স্বেচ্ছায় এই কাজ আর কখনো করতে যাস না চাশমিস! তোর চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে কেবলমাত্র আমার অসহ্য আদরের সংস্পর্শে এলে। তোর সর্বাঙ্গে আমার হুটহাট বেপরোয়া বিচরণ যখন মাত্রাতিরিক্ততা ছাড়াবে তখন কাঁদবি তুই। আমায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি রূপে সপে দিয়ে অশ্রু ঝরাবি তুই! তা বিনে অন্য কখনো চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরানোর দুঃসাহস করিস না মেয়ে, নয়তো তোর এহেন ঔদ্ধত্যভরা দুঃসাহসের জন্য তোর চোখদুটো থেকে অশ্রু ঝরানোর কারণটাকে বিনাবাক্যে পৃথিবীর বুক থেকে উপড়ে ফেলব আমি। মাইন্ড ইট!”
ভড়কায় মাহি! বিস্ফোরিত রূপ ধরল তার চোখদুটো। হতভম্বের ন্যায় অধর নাড়িয়ে উচ্চারণ করল —
“ মুগ্ধ! আপনি আবারও শুরু করলেন আপনার হিং স্রতা? আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন,আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন — আগামী সাতদিন আপনি পুরোপুরি আমার হয়ে অর্থাৎ শুধুমাত্র মির্জা সায়ান মুগ্ধ হয়ে থাকবেন। কোনো মাফিয়া মনস্টার না!”
আচানক বাদামী অধরজোড়ার কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো মুগ্ধের। মানবীকে তুলে রাখা শক্তপোক্ত হাতখানায় বাড়ল জোর। বলিষ্ঠ পাদু’টোয় গতি টেনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে ভনিতাহীন কন্ঠে শুধালো,
“ ডোন্ট ফরগেট মিসেস অধীর রায় — আমার নাম পাল্টালেও স্বভাব, চরিত্র কিন্তু আজীবন একই থাকবে।”
নাক ফুলিয়ে সশব্দে নিশ্বাস ফেলল মাহি। গালদুটো মুহুর্তেই ফুলে হয়ে গেল পটকা মাছের মতো। এদিকে, আড়দৃষ্টে মায়াবিনীর গাল ফোলানো বড্ড উপভোগ করছে মুগ্ধ। কয়েকপল পেরুতেই আচমকা গমগমে কন্ঠে আওড়াল,
“ হাগ মি!”
তড়াক ঝাঁঝ দেখিয়ে অন্যত্র মুখ ঘোরালো মাহি। বলিষ্ঠের কোলে থেকেই হাতদুটো বুকের কাছে বেঁধে নিলো শক্ত করে। তুলতুলে গালের ভাঁজে হাওয়া ঢুকিয়ে খেঁক খেঁক করে শুধালো,
“ পারব না! যান।”
কথাটা বলতে দেরি, অথচ ঝড়ের বেগে একজোড়া রুক্ষ ওষ্ঠপুট মুহুর্তেই রমণীর তুলতুলে ডানগালে নিজেদের ডুবিয়ে দিতে দেরি করল না। এরূপ হুটহাট আক্রমণে অভ্যন্তরে ভড়কালো মাহি। তবুও বাইরে থেকে যথাসম্ভব গাল ফুলিয়ে রইলো সে। রুক্ষ অধরযুগল ক্ষণকাল বাদেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করল মায়াবিনীর মসৃণ কপোল হতে। ভারিক্কী কন্ঠে শুধালো,
“ হাগ মি চাশমিস! আদারওয়াইজ, খুব খারাপ কিছু হয়ে যাবে কিন্তু।”
ধীরলয়ে আড়দৃষ্টিতে তাকালো মাহি। নজর ঠেকালো মুগ্ধের গুরুগম্ভীর সুদর্শন মুখপানে। দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই চৌকস করে নিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় আওড়াল,
“ কি খারাপ করবেন শুনি? বড়জোর কয়েকটা শক্ত চুমু বাড়িয়ে দিবেন, এইতো?”
তৎক্ষনাৎ অধরকোণে দাঁত বসায় মুগ্ধ। বলিষ্ঠ ঘাড়টা বেশ ঝুঁকিয়ে, মুখটা এগিয়ে আনলো মাহি'র বড্ড কাছে। মাহি নড়লো না, না সরালো ঘাড়! ততক্ষণে মুগ্ধের তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়া আলতো করে পরশ ছোঁয়ালো মাহি'র তুলতুলে নরম অধরযুগলের সনে। হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ উহুঁম! এবার আর গোটাকয়েক শক্ত চুমুতে কাজ হবে না আমার! কজ আ'ম হাঙ্গরি ফর ইউ। ধরলে একেবারে খেয়ে ফেলব!”
শুকনো ঢোক গিললো মাহি! মুগ্ধের ওষ্ঠপুটের গায়ে অধর ছুঁইয়ে রেখে অতিষ্ঠ কন্ঠে পরপর আওড়াল,
“ রাক্ষস একটা!”
বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। পায়ের গতি সচল রেখে ভনিতাহীন কন্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ চিনতে বড্ড দেরি করে ফেললি রে দেড়ব্যাটারী। বড্ড দেরি!”
___________________________________________
কাজান; রাশিয়া!
শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, তুষারে ঢাকা নির্জন প্রান্তরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে কু-পরিচিত গ্যাংস্টার নিকোলাসের বিলাসবহুল “ ঘোস্ট ” মেনশন। বাড়ির চারপাশে অগণিত দেহরক্ষীরা যখন কড়া নজরদারিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনি ম্যানশনের অত্যন্ত বিলাসী কক্ষটি এহেন দিনের আলোয় মেতে উঠেছে কিছু বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিশাল কক্ষটিতে দিনের আলো অস্পষ্ট। কক্ষের প্রতিটি জানালার গায়ে ভারী মখমলের পর্দা টেনে রাখা, চারপাশে দামি সুগন্ধির তীব্র ঘ্রাণ! ওমন আবছা আলোর ভেতর কয়েকজন রমণীকে ঘিরে বসে আছেন মেনশনের অধিপতি — নিকোলাস! সে-কী উশৃংখল কর্মকাণ্ড নারীলিপ্সুকের! আশেপাশে তার চারজন ভিন্ন দেশী সুন্দরী শয্যাসঙ্গীনি, কোলে ওপর বিশৃঙ্খল কায়দায় বসিয়ে রেখেছে কমবয়সী এক অর্ধন*গ্ন তরুণীকে। তরুণীর মাখনরঙা উম্মুক্ত সর্বাঙ্গে অবাধ্যের ন্যায় বিচরণ করছে নিকের রুক্ষ, নির্দয় হাতদুটো। চোখেমুখে তার সে-কি বেপরোয়া লালসা আর বিকৃত আত্মতৃপ্তির ছাপ। নিজ হাতদুটোর বেহায়া কর্মকাণ্ড বহাল রেখে, ঘাড় বাকিয়ে তক্ষুণি পাশে বসে থাকা পারস্য সুন্দরীর টকটকে র*ক্তি*ম ওষ্ঠপুটের ওপর দখলদারিত্বে মত্ত হলো নিক। তীব্র আচ্ছন্নতায় একে একে প্রতিটি রমণীকে উশৃংখল মোহজালে আঁটকে নিলো একপর্যায়ে। সকলের অভিমুখে কোলে বসিয়ে রাখা রমণীর সুকোমল রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কন্ঠায় সজোরে আকঁড়ে ধরে হুংকার ছুঁড়ল,
“ পুট মি ইন, ইউ বি'চ!”
লালসার বেড়াজালে মোহিত তরুণী তৎক্ষনাৎ উদ্যোত হলো মনীবের হুকুম তামিলে। সদ্যোগে মধ্যকার দূরত্বটুকু তমসায় মিলিয়ে দিলো রমণী। খানিকবাদে নিজেদের বিশৃঙ্খল ঘনিষ্ঠতার অশালীন মুহূর্তে কক্ষের আবহ করে দিলো বড্ড ভারী! নিক অস্থির! বলিষ্ঠ দু'হাতের বন্ধনে আঁটকে থাকা ভিন্ন সুন্দরীদের বড্ড কাছে টেনে এনে, মুখ গুঁজল অন্যের তুলতুলে বক্ষে। ঠিক তখনি, আবদ্ধ কামরার দুয়ারে কড়া নাড়ানোর শব্দ হলো বেশ। ওপাশ থেকে খানিকবাদে ভেসে এলো, গ্যাব্রিয়েলের সুউচ্চ কন্ঠ!
“ বস? আই নিড টু টক টু ইউ। ইট'স ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট!”
ঘনিষ্ঠতার কাল মুহুর্তে আবির্ভূত নিক। ভারী উষ্ণ নিশ্বাস ক্রমাগত ফেলতে ফেলতে হুট করেই গলা উচিঁয়ে বলে উঠল,
“ কাম ইন বাস্টা'র্ড! কাম ইন।”
অনুমতি পাওয়া মাত্রই সবেগে দরজার নব ঘুরিয়ে দুয়ার খুললো গ্যাব্রিয়েল। আনমনে কক্ষে প্রবেশ করতেই দৃষ্টিযুগল মালিকের পানে আঁটকে গেল তার। পরক্ষণেই কপাল গুটে গেল খানিক বিরক্তিতে। যদিও এ দৃশ্য নতুন নয় তার নিকট, তবুও মাঝেমধ্যে হিংসাপরায়ন মনটা বড্ড কু কু করে তার। আজও তাঁর ব্যাতিক্রম নয়। গ্যাব্রিয়েল তক্ষুনি নজর ঝুঁকিয়ে এগিয়ে এলো দু-কদম। খানিক গম্ভীর সুরে আওড়াল,
“ গতকাল রাতের নিউজ দেখেছেন বস?”
উত্তেজনার ভাবাবেগে দাঁতে দাঁত চাপছে নিক। দৃষ্টিযুগল উন্মত্ত তরুণীর পানে ঠেকিয়ে রেখে অস্ফুটে প্রতুত্তর করল,
“ না-হ! ওহ..কেনো, কি হয়েছে? উমম!”
“ গতকাল রাতে রুশদী কিং ওরফে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার প্রথমবারের মতো নিজের আকাশছোঁয়া ক্ষমতার একটুখানি শোডাউন দেখিয়েছে।”
তড়াক উত্তেজনার ভূত মাথা থেকে নেমে গেল নিকের। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো গ্যাব্রিয়েলের পানে। কটমট কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ হোয়াট ডু ইউ মিন?”
গ্যাব্রিয়েল নজর তুললো না। বরং হাতদুটো পিছমোড়া করে টেনে রেখে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ আই মিন টু সে — গতকাল রাত ঠিক ১২টার সময় মনস্তার তার সিগনোরাকে বার্থডে উইশ করেছে, তাও কোনো যেন-তেন ওয়ে-তে নয়। বরং স্যাটেলাইট প্রজেকশনের মাধ্যমে একইসাথে ১৮টা দেশের আকাশপটে শো করিয়েছে বার্থডে উইশ। এরমানে বুঝতে পারছেন বস? মনস্তার... ”
“ হেভ আ ওয়াইফ! হোয়াদ্দা ফা'ক! মনস্তার বিয়ে করল কবে? কে এই সিগনোরা? আন্সার মি বাস্টা'র্ড!”
ঠান্ডা মাথার খু*নি গ্যাব্রিয়েল। বড্ড শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো নিকের পানে। ধীরকন্ঠে প্রতুত্তরে বলে,
“ যেখানে আজ অব্দি মনস্তারের মুখটাই দেখা হলো না, সেখানে তার ওয়াইফকে দেখা কিংবা তার সম্বন্ধে কিছু জানা তো বিলাসিতা, বস!”
সহসা দাঁত খিঁচল নিক। এক আকাশসম রাগের তোড়ে আচমকা কোলের ওপর বসিয়ে রাখা তরুণীকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে দিলো নিজ কোল হতে। পরমুহূর্তেই চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়ায় নিক। তার নীলাভ চোখদুটো কেমন লাল হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে! ফর্সা মুখশ্রীতে রাগের ছাপ স্পষ্ট। গজগজ করতে করতে একহাতে কোমর হতে টেনে আনলো আন্ডারওয়্যারটা। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শুধালো,
“ দ্যাট ব্লা'ডি এসহোল! প্রথমে দিলো গার্লফ্রেন্ডের প্যারা, এখন দিচ্ছে ওয়াইফের প্যারা। বাস্টা'র্ড একটা! গ্যাব্রিয়েল! গাড়ি বের কর।”
গম্ভীর গ্যাব্রিয়েল এখনো বেশ শান্ত। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকা নিক যে-ই না তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যোত হলো, ঠিক তখনি ভরা মজলিসে বিস্ফোরিত বাক্য ছুড়ঁল গ্যাব্রিয়েল!
“ বস! ডোন্ট ইউ থিংক, কয়েকদিন আগে ড: দামিয়ান যেই মেয়ের কথা বলে গিয়েছিল, সেই বর্তমানে মনস্তারের ওয়াইফ!”
সহসা থমকে গেল নিক! থমকে গেল তার ব্যস্ত পদযুগল। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক এবার জোর দিলো গ্যাব্রিয়েলের বাক্যে। কিছু একটা উপলব্ধ হতেই রয়েসয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটলো নিকের। দৈবাৎ শক্তিতে ঘাড়টা বাঁকালো পরক্ষণে। হাত উঁচিয়ে গ্যাব্রিয়েলের কাঁধ চাপড়ে এক অদ্ভুত গাঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ ইফ ইউ আর রাইট, দ্যান উই শ্যুড কংগ্রাচুলেট মনস্তার। দামিয়ান যেই স্কেচটা দিয়ে গিয়েছিল ওটা বের কর। আমি এবার আমার স্টাইলে মনস্তারকে কংগ্রাচুলেশনস জানাবো। শত হলেও তিনি রুশদী কিং! তারজন্য তো এতটুকু করাই যায়।”
বলেই অধর কোণে উত্থাপিত পৈ শা চি ক হাসিটুকু গাঢ় করল নিক। ধীরলয়ে পা বাড়ালো দুয়ারপানে। পেছন থেকে কেবল বলে গেল,
“ এতো ভালো খবর দেওয়ার জন্য থ্যাংকস গ্যাব্রিয়েল। যা, আগামী দু'ঘন্টার জন্য এখানে থাকা সবগুলো বার্ড তোর। হেভ ফুল্লি ফান উইদ দ্যাম।”
___________________________________________
ফ্রেশ হয়ে সদ্য ঘর থেকে বেরোল মাহি। বোকা বোকা দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো চারপাশ! গতকাল রাতের আধো আলোয় প্রাইভেট আইল্যান্ডের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ক্যাসেলটির পুরোটা ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ মিলেনি তার। এখন যে দেখবে, তারও তো সুযোগ নেই! পেটের ভেতর ছোঁচা ইঁদুরগুলো যা করছে না। পারছেনা ছুটে বেরিয়ে আসতে ভেতর থেকে। ক্ষুধার্ত রমণী তৎক্ষনাৎ পা ছোটালো। দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে এসে দাঁড়াল প্রশস্ত গ্র্যান্ড সিঁড়িটির মাথায়। সিঁড়িটি দোতলার হলঘর থেকে সরাসরি নেমে গিয়েছে নিচতলার বিশাল লিভিং স্পেসে। চকচকে সাদা মার্বেলের ধাপ, দু'পাশে গাঢ় কাঠের কারুকার্যখচিত রেলিং আর মাঝ বরাবর ঝুলে থাকা বিশাল ক্রিস্টাল ঝাড়বাতির আলোয় প্রতিটি ধাপ মৃদু ঝিলমিল করছে।
আশপাশে এক-আধবার নজর বুলিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো মাহি। অতবড় বাড়িটা কেমন খা খা করছে জনমানবহীনতায়। হুট করেই বুকের ভেতরটা ভয়ে মোচড় দিয়ে উঠল মাহি'র। ঢোক গিললো পরপর। ব্যস্ত কদমে নিচতলায় পা রাখতেই রমণীর নাসারন্ধ্রে কোত্থেকে থেকে যেন ভেসে এলো মশলা আর ভাজা মাখনের মন মাতানো গন্ধ। একে-তো ক্ষুধার তীব্রতা, তারওপর ওমন খাবারের সুগন্ধি! মুহুর্তেই পেটের ক্ষুধারা বুঝি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল মাহি'র। অবচেতন মনের কোণে বাড়লো কৌতূহল। সুবাসের উৎস অনুসরণ করে এগোতে এগোতে একপর্যায়ে এসে থামল প্রশস্ত কিচেনের দরজার কাছে। উৎসুকতায় দুয়ারের দেয়াল টপকে নিঃশব্দে সম্মুখে উঁকি দিতেই—স্থির হয়ে গেল তার দৃষ্টিযুগল। থমকে গেল হৃৎস্পন্দন! সম্মুখে বিশাল এবং অত্যাধুনিক রান্নাঘরের দ্বীপাকৃতি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুদর্শন পুরুষ। উদোম ঊর্ধ্বাঙ্গে দক্ষের ন্যায় রান্নায় ব্যস্ত সে।
দৈত্যের ন্যায় দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ শরীরটা যেন এমুহূর্তে মাহি'র দৃষ্টিপটে কোনো এক দক্ষ কারিগরের হাতে বানানো শ্রেষ্ঠ মার্বেলের ভাস্কর্য। মানবের প্রশস্ত কাঁধ থেকে সরু কোমরের দিকে নেমে আসা মেদহীন ভি-শেপের গড়ন, কোমরের সামান্য নিচে বড্ড অহমিকায় ঝুঁলে আছে ট্রাউজারের অংশটুকু। বাবরিছাঁটা বাদামী চুলগুলো তার পেছনে টেনে ঝুঁটি বেঁধে রাখা। কয়েক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে দোল খাচ্ছে! রান্নার উষ্ণতায় কপাল আর ঘাড়ের সন্নিকটে হালকা ঘামের চিকচিকে আভা। এমুহূর্তে লোকটার সৌন্দর্যে যতটা না মোহিত অষ্টাদশী, তারচেয়েও বেশি হতবাক লোকটার দক্ষ কর্মকাণ্ডে। এক হাতে সে ফ্রাই প্যান সামলাচ্ছে, অন্য হাতে মশলা ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্য চুলোয় জাল হতে থাকা খাবারটায়। কি সুন্দর অবলীলায় দু'হাতে রান্না করে চলেছে সে। মায়াবিনী অবাক হয়ে দেখলো লোকটাকে। প্রতিটি নড়াচড়ার সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সুদর্শনের শক্ত পেশিগুলোর ওঠানামা। রমণীর নারীমন হুট করেই বড্ড আবিভূত হলো মনে হচ্ছে। বিমুগ্ধতায় ছেয়ে গেল পেলব মুখখানা। চোখের পাতা বেহায়ার ন্যায় রইলো অনড়। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলছে তার কন্ঠা! মাহি হুট করেই টের পাচ্ছে — কিচেনের উষ্ণতার চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে তার আপন কপোলজোড়ায়। ক্ষণকাল বাদে একবার চাইলো দৃষ্টি সরিয়ে নিবে, তবে তা আর হলো কই?
রান্নার ফাঁকে মুগ্ধ এক হাতে ফ্রাই প্যান সামলে অন্য হাতে কাঠের চামচ দিয়ে খাবার নেড়ে দিল আরেকবার। চামচের তীক্ষ্ণ ধাক্কায় খাবারের ওপর থেকে বাষ্পীভূত উষ্ণ বাষ্পটুকু মুহুর্তেই এসে ছুঁয়ে দিলো রূঢ় মানবের লোমহীন উম্মুক্ত বুক। অবাধ্য চুলে লেপ্টে থাকা কপালের কাছে জমে থাকা ঘামের ক্ষুদ্র বিন্দুটি তক্ষুণি গড়িয়ে নেমে গেল কানের পাশ বেয়ে ঘাড়ের দিকে। এতটুকু দৃশ্যই যেন এক আকাশসম অস্বস্তি বাড়িয়ে দিলো রমণীর। নিজের অজান্তেই আবারও ঢোক গিলল সে। ঠিক তখনি, এক দমকা হাওয়ার ন্যায় সম্মুখ হতে ভেসে এলো রূঢ় মানবের গমগমে কন্ঠ!
“ আই নো আ'ম হ্যান্ডসাম! তাই বলে ক্ষুধার জ্বালায় আমাকেই ওভাবে চোখ দিয়ে গিলে খেতে হবে না-কি?”
মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল মাহি'র। লজ্জা এবং অস্বস্তির মিশেলে ঝাঁঝিয়ে উঠল গালদুটো। ওদিকে, মুগ্ধের চামচ চালানো হাতটা থেমে গেল হঠাৎ। অদৃশ্য ইন্দ্রিয়ের টানে ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকায় সে। তক্ষুণি তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া আচমকা গিয়ে ঠেকলো কিচেনের দরজার ফাঁকে। এরূপ দৃষ্টির সম্মুখীন হতেই লজ্জালু রমণী থমকে গেল ফের। এক অদ্ভুত অসারতায় পারলোনা চোখ সরাতে। বেহায়ার সব বাঁধন ভেঙে হা করে চেয়ে রইল লোকটার দিকে। মুগ্ধ হাসলো! ধারালো দাঁতের তলায় অধরের নিম্নাংশ টেনে বড্ড দুষ্ট ভঙ্গিতে হাসলো। রমণীর বুকের ভেতরটা আচমকাই ধ্বক করে উঠল তা দেখে। লোকটা কী তবে আগে থেকেই টের পেয়ে গিয়েছিল তার উপস্থিতি? এহেন ভাবাবেগে ভীষণ লজ্জায় পড়লো মাহি। তড়িঘড়ি করে নামিয়ে নিলো চোখ। ওদিকে, সুদর্শন যুবক আর কালবিলম্ব করল না। চুলের পেছনের ঝুঁটিটা একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিয়ে, অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কড়াইয়ের আঁচ কমিয়ে দিল আলগোছে। তারপর শরীর ঘুরিয়ে কোমর ঠেকালো কাউন্টার টপের গায়ে। দু'হাত বড্ড রসিকতায় বুকের কাছে বেঁধে, গমগমে গলায় শুধালো,
“ কাছে আয়!”
ঢোক গিললো মাহি! জড়তায় আঁটকে গেল তার পাদু’টো। চেয়েও পারলোনা একচুল আগাতে। মুগ্ধ বোধহয় বুঝলো রমণীর জড়তা। তাইতো কেমন দুষ্ট ভঙ্গিতে ঘাড় কাত করে আওড়াল,
“ স্বেচ্ছায় আসবি? না-কি আমি নিজের মতো করে টেনে নিয়ে আসবো?”
এহেন ঠান্ডা হুমকিতে জমে গেল রমণীর অন্তঃকোণ। সামান্য কম্পিত বদনে কোনরকম দ্বিধায় এগোলো তার পাদু’টো। সময় নিয়ে যুবকের একহাত দুরত্বে পায়ের গতি থামাতেই আচমকা বলিষ্ঠের শক্তপোক্ত হাত এসে বিনাবাক্যে আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম বাঁকানো কোমর। অতঃপর জোরালো এক হেঁচকা টানে তাকে নিয়ে এলো নিজের বড্ড কাছে। রমণী ইতস্তত! লজ্জালু মুখটা ঠেকেছে মুগ্ধের উম্মুক্ত রুক্ষ বক্ষভাঁজে। পরক্ষণে কর্ণকুহরে হুট করেই ভেসে এলো মুগ্ধের দুষ্ট কন্ঠ!
“ আমাকে চোখ দিয়ে গিলে খেয়ে মজা লেগেছে, চাশমিস?”
রমণী জবাব দিলো না। লজ্জায় গালদুটো র*ক্তিম হয়ে উঠেছে তার। বেয়াদব ছেলেটা তক্ষুণি সামান্য ঝুঁকে এলো মেয়েটার মুখের দিকে। চোখেমুখে তখন নিছক দুষ্টুমি।
“ রান্না শিখবি? আমি কিন্তু একজন গুড মাস্টার!”
মাহি একবার চাইলো — মুখের ওপর না করে দিতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনে এলো,
“ লোকটা সেই কখন থেকে একা একা কাজ করছে। খানিকটা সৌজন্যতাবোধ বলতেও তো কিছু একটা থাকে না-কি?”
এহেন ভাবাবেগে কোনোরকমে মাথা কাত করল মাহি। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই মুগ্ধর হাসিটা এবার আরও প্রশস্ত হলো। এক ঝটকায় তুলোর সাদৃশ মানবীকে টেনে এনে দাঁড় করালো কাউন্টারের সম্মুখে। অতঃপর নিজে দাঁড়ালো তার পিছু। ছোট্ট পিচ্চি মেয়েটা তার বুক সমান। হাতদুটো বড্ড ছোট! ছ'ফুট চার ইঞ্চির দৈত্যটা বেশ ঝুঁকে এলো এবার। কিন্তু ওমাহ! তাতেও বুঝি হচ্ছে না তার। দাঁড়ানোর ভঙ্গি বেগতিক হওয়ায় তৎক্ষনাৎ কপাল গুছিয়ে তাকালো একবার আশপাশে। ওমনি খুঁজে পেলো একখানা ছোট টুল। তা পা দিয়ে টেনে এনে আচমকা রমণীকে একহাতে সামান্য তুলে টুলটার ওপর দাড়ঁ করালো রাশিয়ান দৈত্যটা। এরূপ কান্ডে অলক্ষ্যে মিটমিটিয়ে হাসছে মাহি। সাধে কী আর সে লোকটাকে রাশিয়ান দৈত্য বলে?
মুগ্ধের এবার স্বস্তি মিললো খানিক। সামান্য ঝুঁকে এসে রমণীকে বলল,
“ লেট'স স্টার্ট!”
বুঝলোনা মাহি। অবোধ্যের ন্যায় কপালের চামড়া গোটাতেই আচানক দু'হাতের ওপর পরশ পেলো প্রগাঢ়। কাঁধ হতে ধীরলয়ে নামছে দুটো খড়খড়ে রুক্ষ হাতের গোটাকতক আঙুল। প্রগাঢ় স্পর্শে ধীরে ধীরে কাপড়ের ওপর দিয়েই ছুঁয়ে দিচ্ছে রমণীর তুলতুলে হাতদুটোর মোলায়েম ত্বক। মুহুর্তেই কর্পূরের ন্যায় সকল জমাটবদ্ধ স্থিরতা হাওয়া উড়ে গেল মাহি'র। অস্থিরতায় কেঁপে উঠল তার বুক। ওদিকে যুবকের অধরকোণে বক্রহাসি স্পষ্ট! ধীরলয়ে রমণীর হাতের ওপর দিয়ে হাতদুটো গড়িয়ে এনে আচমকা মাহি'র আঙুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে দিলো সবগুলো আঙুল। মুহুর্ত ব্যয়ে রমণীর হাতদুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে এসে কাউন্টার থেকে কাঠের কারুকার্যময় খুন্তিটা তুললো মুগ্ধ। মাহি'র হাত দিয়েই খুন্তিটা বাড়ালো প্যানের দিকে। ধোঁয়া ওঠা শূন্য ফ্রাই প্যানে খুন্তিটা প্রায় ছুঁই ছুঁই, ওমনি রমণীর উম্মুক্ত কাঁধের ত্বকে আচমকা অধর বসালো বেপরোয়া যুবক। মুহুর্তেই শীরঁদাড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে এলো অষ্টাদশীর। লজ্জাবতী পাতার ন্যায় তড়িঘড়ি করে গুটিয়ে নিলো মুখ। মুগ্ধ থামলো না! সিক্ত অধরযুগলের অসংগত ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিলো মেয়েটার নরম কাঁধের ত্বক। শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় অষ্টাদশীর হাতখানা চেপে রেখে আচমকা ছুঁইয়ে দিলো উদরের চামড়া। ফের কেঁপে ওঠে মাহি। অজানা ভয়ে ত্বরিত কুঁচকে নেয় নাক-মুখ। এতে থোড়াই কাজের কাজ হলো। মেয়েটাকে আরেকটু ভেঙে দিতে রূঢ় মানব এবার এগোলেন আরও দুপা। তৎক্ষনাৎ রমণীর কাঁধের কোমল ত্বকে ধীরলয়ে পরশ ছোঁয়ালো নিজ উষ্ণ জিহ্বার! মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে কেঁপে ওঠে মাহি। তিরতির করে কম্পিত অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ থেমে যান, মুগ্ধ!”
এরূপ বাঁধে থামলো না মুগ্ধ! বরং সিক্ত জিভের কার্য চালালো অবাধ্য। রমণী এখন বড্ড ভঙ্গুর। পাদু’টোর শক্ত হাড়ে অসারতা নেমেছে তার। এক্ষুণি বুঝি ভেঙে বসিয়ে দিবে মাটিতে। রূঢ় মানব নিঃশব্দে টের পেলো তা। ত্বরিত দু'হাতে রমণীকে পেছন থেকে বড্ড নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে, নাকমুখ ঠেকালো মায়াবিনীর ঘাড়ের ত্বকে। মাহি'র চোখদুটো এখনো বন্ধ। নিশ্বাস ক্রমশঃ ভারী হচ্ছে তার। মুগ্ধ তখন হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“ ইউ আর লাইক আ বাটার বিউটি, অ্যান্ড আই’ম দ্য ফ্রাইং প্যান। যার উষ্ণতার সান্নিধ্যে এলে ক্ষনিকেই গলে যেতে বাধ্য তুই। বল এবার, আমাদের কম্বিনেশনটা জোসস না?”
না চাইতেই অধর প্রশস্ত হলো মাহি'র। একমুহূর্ত পরম স্বস্তিতে ঘাড় এলিয়ে রাখলো বলিষ্ঠের বক্ষভাঁজে। ক্ষীণস্বরে আচমকা শুধালো,
“ সম্মুখে মির্জা সায়ান মুগ্ধ হলে, আমি মানবী অগণিতবার স্বেচ্ছায় গলতে বাধ্য!”
অধরজোড়া ক্ষনিকেই প্রসারিত হলো মুগ্ধের। ধীরলয়ে মাহি'র ঘাড়ের ত্বকে আলতো করে বসালো দাঁত। মাহি ত্রস্ত মুখ কুঁচকায়, তবে মুখে টুঁ-শব্দটিও করলো না এবার। যেন স্বেচ্ছায় চাইছে লোকটার উন্মাদনা সহ্য করতে। খানিকবাদে হুট করেই তার কী হলো কে জানে! সে কেমন রসিকতার ভান ধরে আওড়াল,
“ শুনুন!”
দাঁত সরালো মুগ্ধ। ক্ষীণকন্ঠে বড্ড বাধ্যের ন্যায় প্রতুত্তর করল,
“ হুম!”
মাহি আবেশে মৃদু হাসলো। চোখদুটোর পর্দা সরিয়ে পরপর বলল,
“ আমি না, সাঁতার পারিনা! তবে সমুদ্রে নামার বড্ড শখ আমার।”
রমণীর ঘাড়ের ত্বকে নাক ঘষছে মুগ্ধ। হাতের বাঁধন বেশ জোরালো। কথার পিঠে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভরাট কন্ঠে জবাব দিলো,
“ ইট'স ওকে! আমি আছি তো।”
মাহি হাসলো। চোকজোড়া খানিক নাড়াতেই আচমকা দৃষ্টি ঠেকল চুলোয় রান্না হতে খাবারের পানে। আচমকা মুখটা ভার হয়ে এলো তার। বড়ো মন খারাপের সুরে আওড়াল,
“ আমি রাঁধতেও পারিনা।”
কথাটা শেষ হবার প্রায় পরমুহূর্তেই মাহি'কে একটানে পেছনে ঘুরিয়ে আনে মুগ্ধ। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় রমণী। তড়িঘড়ি করে কম্পিত আঙুলে খামচে ধরে মুগ্ধের উম্মুক্ত বক্ষের চামড়া। হকচকানো দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকানোর পূর্বেই চিবুকে ঠেকলো বলিষ্ঠের রুক্ষ আঙুল। তার জোরে মুখটা সামান্য উঁচিয়ে সুদর্শন কেমন দৃঢ় কন্ঠে ফটাফট আওড়াল,
“ আমি বেঁচে থাকতে আমার রাণীর কষ্ট করে রাঁধতে হবে কেনো? আমি আছি না? তুই জাস্ট হুকুম করবি! রেঁধে মুখে তুলে দেবার দায়িত্ব আমার।”
মাহি'র গালভরে গেল হাসিতে। পরম স্বস্তিতে তক্ষুনি দু'পায়ের পাতায় ভর দিয়ে, আলগোছে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ ঘাড়। মুগ্ধ মানবীর এহেন প্রচেষ্টা দেখে বড্ড ঝুঁকিয়েছে কাঁধ। মাহি এবার ভীষণ অধিকারবোধে ক্ষীণ কন্ঠে আওড়াল,
“ সো মা'ই আনওয়েলকাম কন্ট্র্যাক্ট হাজবেন্ড! লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি! আমার কিন্তু হুটহাট লেট-নাইট হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করে।”
গভীর হলো মুগ্ধের দৃষ্টি। বলিষ্ঠ হাতদুটো ঘোষণার পূর্বে আলগোছে আঁকড়ে ধরল রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমর। দৃঢ় কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ ডোন্ট ওয়ারি মিসেস অধীর রায়! আমার রাত জাগার অভ্যেস আছে।”
অন্তর্মুখী আজ বড্ড উচ্ছ্বসিত। দৃষ্টিতে প্রগাঢ়তা নামিয়ে আচানক সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ উমমম..আরেকটা কথা! আপনি যেন কার?”
এহেন কথার পরিপ্রেক্ষিতে তৎক্ষনাৎ মেয়েটাকে একহাতে পাঁজা কোলে তুলে নিলো মুগ্ধ। চোখে রাখলো চোখ। ভারিক্কি গলায় উত্তর ছুড়ঁল,
“ আমার চাশমিসের।”
প্রশান্তিতে অন্তর ছেয়ে গেল মাহি'র। খানিক হাসার মাঝে হুট করেই হাত রাখলো মুগ্ধের গালে। কপালের চামড়ায় একটুখানি ভাঁজ টেনে সন্দিষ্ট গলায় শুধালো,
“ এই যে আপনি আমায় যখন-তখন হুটহাট কাঁধে তুলে নেন, কোলে তুলে নেন! আচ্ছা, আপনার কী কষ্ট হয় না?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মুখটা রমণীর মুখের বড্ড নিকটে এগিয়ে এনে হালকা কামড় দেবার ভং ধরল সে। হাস্কি স্বরে প্রতুত্তরে বলল,
“ নিজ অস্তিত্ব এবং পৃথিবীর সমস্ত ভার এক কাঁধে বহন করার মতো শক্তি, সামর্থ্য এবং যোগ্যতা — সবটাই তুলনার চেয়ে বেশি রয়েছে মির্জা সায়ান মুগ্ধের। সো, ইউ ডোন্ট নিড টু ওয়ারি অ্যাবাউট দ্যাট বিউটি! ইন দ্যাট কেস, জাস্ট ফোকাস অন মি।”
চলবে.....