#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৭০(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
“ নিচে দুটো পার্সেল এসেছে! একটা এলেক্সের জন্য আরেকটা আপনার জন্য। তাড়াতাড়ি আসুন, সিগনোরা!”
রমণীর সিক্ত চোখদুটো কান্না ভুলে বিস্মিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। তুলতুলে হাতের মুঠোয় দলাই-মলাই হচ্ছে ভিন্টেজ পেপারের চিঠিখানা। দুয়ারপানে দাঁড়িয়ে মেইড হাঁপাচ্ছে ভীষণ। তাড়াহুড়োয় ফেলছে না পলক! স্তব্ধ মাহি'র হরিণা চোখদুটো এতক্ষণে পলক ফেলল বুঝি। যার অভিঘাতে কোমল কপোলে টুপ করে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা নোনাজল! অন্তঃকোণে জমাটবদ্ধ উদ্বিগ্নতার ভার মুহুর্তেই ছড়িয়ে গেল সর্বাঙ্গে, চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই হন্তদন্তের ন্যায় মেঝেতে দু-হাত ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় বিচলিত মায়াবিনী। দিকবিদিকশুন্যের ন্যায় ঝড়ো হাওয়ার বেগে পা ছুটলো তার। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অনড় মেইড ত্রস্ত পিছিয়ে নিলেন কদম। সিটিয়ে গেলেন দুয়ারপানে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের সনে!
★
চারপাশের সমস্ত নীরবতার কাঁটাতারের অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে, উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঊর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে নামছে মাহি। হোঁচট খেতে গিয়ে নিজেকে সামলাচ্ছে বারংবার। পাদু’টো সিঁড়ি ছেড়ে মেঝে ছুঁতেই থমকে গেল চঞ্চলা চড়ুই! থমকাল তার মুখ অভিব্যক্তি। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিজোড়া অভিমুখে তাক হয়েছে তার। ক'হাত দুরত্বেই গ্রাউন্ড ফ্লোরের মেঝেতে পড়ে আছে বিশাল এক কার্টুন। যার ওপরে একখানা নোট চেপে রাখা। গম্ভীর মুখো এলেক্স দাঁড়িয়ে আছে দু'হাত দুরত্বে। তার সম্মুখেও একখানা ছোট বক্স। তা খুলে দেখতে রীতিমতো দ্বিধাদ্বন্দে জড়িয়েছে সে।
মাহি দ্বিধাগ্রস্ত! টলমল কদমে এগিয়ে এলো ধীরলয়ে। আগত কার্টুনটার সন্নিকটে পা থামিয়ে, কম্পিত হাতদুটো বাড়ালো সে। কাঁপতে কাঁপতে কার্টুনের ওপরে চেপে রাখা নোটটা আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে বার করে এনে, দ্বিধাবোধে খুলল পরপরই। ওমনি দৃষ্টিপটের সম্মুখে ভেসে উঠল লাল কালিতে লিখে রাখা,
“ টু মা'ই ফা'কিং গ্লুপায়া!”
সহসা বাকরুদ্ধ বনে গেল মাহি। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে একমুহূর্ত চেয়ে রইল নোটখানার দিকে। পরিচিত এরূপ সম্বোধনটুকু যেন মুহূর্তেই তার বিচক্ষণ মস্তিষ্কের সুপ্ত ভাবনাগুলোকে উসকে দিলো বেশ। সঙ্গে সঙ্গে বিচলিত কায়দায় এগিয়ে এসে ব্যস্ত হাতে কার্টনের গায়ে জড়িয়ে থাকা কাগজের মসৃণ আবরণটুকু ছিন্নভিন্ন করে ছিঁড়ে ফেলল মাহি। তৎক্ষনাৎ উন্মোচিত হলো সফেদ রঙের একটি বিশালাকার বাক্স। তা পরোখ করতেই বুকটা কেমন মুচড়ে উঠল রমণীর। হাতদুটো কাঁপছে থরথর করে, অথচ ব্যাকুল মনটা যেন অধীর আগ্রহে তাকে তাড়া দিয়ে চলেছে—বাক্সটি খুলে দেখার জন্য।
অবশেষে মনের সেই ব্যাকুলতার কাছেই হার মানলো মাহি। ধীর অথচ সতর্ক হাতে বাক্সটির ঢাকনা তুলে ধরল সে। পরমুহূর্তেই উন্মোচিত হলো বাক্সের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সামগ্রীগুলো। নাম না জানা হাজারো ডার্ক চকলেটের প্যাকেট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অতোবড় বাক্সটার ভেতর। আর সেগুলোর ঠিক মাঝখানে, পরম যত্নে রাখা একখানা কালো রঙা জর্জেট শাড়ি! মাথার ওপর ঝুলতে থাকা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতির হলদেটে আলোয় চিকচিক করছে শাড়িটার গা! হতভম্ব মাহি ধীরলয়ে হাত বাড়িয়ে শাড়িটা তুলে আনলো অতিব সন্তর্পণে। কোমল শাড়িটার গায়ে হাত বুলাতেই মুগ্ধতায় কপালের চামড়া শিথিল হয়ে এলো তার। কম্পিত অধরযুগলের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো —
“ হোয়াই ডিড ইউ সেন্ড দিস টু মি, বিস্ট?”
_________________________________________
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে সুবিখ্যাত ক্যাসিনো — দ্য আননোন গেম চেঞ্জার! যেথায় সাধারণের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ঢুকবে তারাই — যাদের রয়েছে বিপুল অর্থ। এখানে কেউ কেউ আসে নিজের ভাগ্য পরোখ করতে, তো আবার কেউ কেউ আসে — নিজের অতিমাত্রার লোভে পড়ে সর্বস্ব খোয়াতে।
কালো স্যুট-ব্যুট পরিহিত এক ভদ্রলোক বড্ড ব্যতিব্যস্ত ভঙ্গিতে সদ্য গাড়ি থামালেন ক্যাসিনোর অভিমুখে। ব্যস্ত হাতে গাড়ির চাবিটা কোনরকম মুঠোয় পুরে, হাতে একখানা কালো রঙের মোটা ব্রিফকেস নিয়ে বেরোলেন তিনি। কনক্রিটের শক্ত আবরণে আচ্ছাদিত জমিনে মর্মর শব্দ তুলে ছুটছেন ক্যাসিনোর সুবিশাল প্রবেশদ্বারের অভিমুখে। যেথায় আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়সম বলিষ্ঠদেহী দু'জন গার্ড! ভদ্রলোক তাদের পানে এগোতেই হাত বাড়িয়ে পথরোধ করলেন তারা। গম্ভীর মুখে কোরিয়ার ভাষায় উচ্চারণ করলেন —
“পাসকার্দু জুসেয়ো।”
(পাসকার্ড দিন আগে।)
যত্রতত্র পা থামিয়ে, পকেটে হাত ঢোকালেন ভদ্রলোক। খানিকবাদে হাতের মুঠোয় করে একখানা মোটা কাগজের কার্ড বার করে এনে বাড়িয়ে দিলেন গার্ডের দিকে। চিন্তায় কপাল ঘামছে তার! দুরুদুরু করে কাঁপছে বুক। সম্মুখের গার্ড দু'জন কার্ডটাকে খানিক পরোখ করে পরপর গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ যাও!”
সহসা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ভদ্রলোক! বিচলিত কদমে ছুটলেন প্রবেশদ্বার দিয়ে। মুহুর্তেই দৃষ্টিগোচর হলো —কৃষ্ণাভ আভিজাত্যের বুকে সোনালি জৌলুশের এক অপরূপ সাম্রাজ্য! বহিরাবরণে প্রাচীন রাজপ্রাসাদের আদল হলেও অভ্যন্তরে আধুনিক বিলাসিতার নিখুঁত সংমিশ্রণ। তিন তলা নিয়ে গঠিত সুবিশাল ক্যাসিনোটির প্রশস্ত অঙ্গন পুরোটাই গেমিং ফ্লোর!
ভদ্রলোক ভীত-সন্ত্রস্ত কদমে এগোচ্ছেন। ঘাড় বাকিয়ে তাকাচ্ছেন চারপাশে, যেখানে টেবিলে টেবিলে সকলে মেতে উঠেছে মৃ ত্যু সমতুল্য দাবা খেলায়! কোথাও রুলেটের চাকা ঘুরছে আপন ছন্দে, কোথাও আবার পোকার টেবিল ঘিরে জমেছে উচ্চবিত্ত জুয়াড়িদের আসর। প্রত্যেকটি সবুজ ফেল্টে মোড়ানো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাস আর বহুমূল্য চিপসের স্তূপের দিকে নিবদ্ধ অসংখ্য দৃষ্টি। ডিলারদের ক্ষিপ্র আঙুলে তাসের পর তাস উল্টে যাচ্ছে। প্রতিটি চালের সঙ্গে কারও ভাগ্য প্রসন্ন হচ্ছে, কারও-বা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে সাজানো সাম্রাজ্য।
ভদ্রলোক হাঁটতে হাঁটতে আচমকা পা ছোটালেন দোতলার প্রশস্ত সিঁড়ির পথে। যত সিঁড়ি এগোচ্ছেন, ততই ঢোক গিলছেন তিনি। পুরো ক্যাসিনোজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে মৃদু জ্যাজ সংগীত। গ্রাউন্ড ফ্লোরের সম্পূর্ণ একপাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজাত বার-কাউন্টারে কর্মরত গোটাকতক লোক। নিজেদের সুকৌশল দক্ষতায় ঝাঁকাচ্ছেন ককটেইলের গ্লাস! কেউ কেউ টুংটাং শব্দ তুলছেন গ্লাসে বরফের টুকরো ফেলে।
ঘর্মাক্ত ভদ্রলোক ততক্ষণে দোতলায় উঠেছেন! ভীত চাহনিতে কদম বাড়িয়ে এগোচ্ছেন প্রশস্ত কাঠের করিডর দিয়ে। নিষিদ্ধ প্রহরাবেষ্টিত এ অংশে রয়েছে একাধিক একান্ত ব্যক্তিগত স্যুট। ভারী ওক কাঠের প্রতিটি দরজার ওপারে বোধহয় বরাবরের ন্যায় আজও বসে উচ্চপদস্থ ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক জুয়াড়ি আর অপরাধজগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। যারা এখানকার কোটি কোটি টাকার বাজির পাশাপাশি অতি সন্তর্পণে চালিয়ে যায় — নিজেদের ব্যবসায়িক সমঝোতা, ক্ষমতার দরকষাকষি আর শত্রু-মিত্রের হিসাবনিকাশ!
ক্যাসিনোর তিনতলায় সকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ! দোতলার শেষপ্রান্ত, তিনতলার আদ্যোপ্রান্তে সর্বদা নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে বেশকিছু গার্ড। যাদের উপস্থিতি ডিঙিয়ে ওদিকে যাওয়ার সাধ্যি দেখানো নিতান্তই মৃ ত্যুকে স্বাগত জানানো।
ভয়ার্ত ভদ্রলোক এতক্ষণে একখানা প্রাইভেট হাই-রোলার স্যুটের অভিমুখে এসে পা থামালেন। আলতো করে হাত বাড়িয়ে দুয়ারপানে ধাক্কা দিতেই বোধগম্য হলো — দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ! সহসা কপাল গোছালেন ভদ্রলোক। ঘাড় সামান্য ঝুঁকিয়ে দু-আঙুল দিয়ে ঠকঠক শব্দে কড়াঘাত করলেন তিনি! একবার, দুবার, পরপর চারবার! ক্ষণকাল পেরুতেই আচমকা স্যুটটির দুয়ার খুলে গেল। ভদ্রলোক দিশাহীনের ন্যায় ভেতরে প্রবেশ করতে গেলেই অভ্যন্তরে হোঁচট খেলেন মাঝপথে! যেই দেখলেন — তার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন একজন দক্ষ স্লাট। আবেদনময়ী পোশাকে আবৃত তার মাখনরঙা দেহখানি, উর্ধাঙ্গ বস্ত্রহীন! সেদিকে একপলক তাকিয়ে সহসা নজর ঝোঁকালেন ভদ্রলোক। চিড়বিড় কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ গেট লস্ট ফ্রম মা'ই আ'ই সাইট, ইউ স্লা**ট!”
অপরূপা হাসলো ঠোঁট পিষে। চলে যাবার বদলে এগিয়ে এসে আচমকা চেপে ধরল ভদ্রলোকের ঘাড়! নিজ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে লোকটার মুখখানা নিজ মুখের দিকে এগিয়ে আনতে ব্যস্ত সে! এতেই যেন মেজাজ চটে গেল ভদ্রলোকের। তক্ষুনি এক ঝাড়ি দিয়ে নিজেকে অপরূপার হাত থেকে ছাড়িয়ে, রমণীর তুলতুলে গালে সপাটে বসালেন এক চড়। মুহুর্তের অতর্কিত আক্রমণের অভিঘাতে তৎক্ষনাৎ অদূরের মেঝেতে ছিটকে পড়ল বেচারি। নাক-মুখ ফেটে র**ক্ত বেরুচ্ছে তার।
ভদ্রলোক হিসহিসিয়ে যাচ্ছে অনবরত! ক্ষুব্ধ দৃষ্টি সম্মুখে তাক করে ক্রুদ্ধ কন্ঠে শুধালো,
“ কতবার বলেছি তোমাকে? এসব স্লা**দের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় আমাকে ডাকবে না!”
অদূরের মখমলি কাউচের ওপর পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন কেউ। যার মুখটা অস্পষ্ট স্যুটের লালচে আলোর উপস্থিতিতে। ভদ্রলোকের কথাগুলো গায়ে না মেখে, পায়ের ওপর পা নাড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে প্রতুত্তরে কেবল বললেন ,
“ টাকা এনেছো?”
তৎক্ষনাৎ হাতে থাকা কালোরঙা স্যুটকেসটা সম্মুখের টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেললেন ভদ্রলোক। কোমরের পিঠে দু'হাত ঠেকিয়ে চিড়বিড়িয়ে শুধালেন,
“ দিস ইজ ফর দা লাস্ট টাইম, ওকে? এ নিয়ে সত্তরটা বাজি হেরেছো তুমি! আর কতগুলো হারার পর থামবে, হ্যাঁ? নিজের যা যা ছিলো সব তো হারলে! এবার অন্তত থামো!”
এহেন কথায় গা করলেন না অন্ধকারে বসে থাকা লোকটি। বরং পাশ হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট হতে একখানা সিগার তুলে চেপে বসলেন ঠোঁটের ভাঁজে! পরক্ষণে তাতে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে টানলেন এক জোরালো নিঃশ্বাস! ক্ষণকাল বাদে গমগমে গলায় শুধালেন,
“ এই ক্যাসিনোর তিন-তলায় কি এমন আছে, জানো উইলিয়াম?”
ভ্রু গোটায় ভদ্রলোক খ্যাত উইলিয়াম। পরপর মাথা নাড়িয়ে শুধায়,
“ না!”
বাঁকা হাসলো অন্ধকারের লোকটা। আচমকা মাথাটা কাউচের গায়ে এলিয়ে ভারিক্কি গলায় বলতে লাগলো,
“ পুরো তিনতলা জুড়ে একটিমাত্র কক্ষ! যা অবশ্য অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা। কালো ও সোনালি রঙের সংমিশ্রণে সাজানো সেই কক্ষের বিশাল কাচঘেরা দেয়াল থেকে দৃশ্যমান হয় পুরো গেমিং ফ্লোর। কক্ষের মধ্যস্থলে স্থাপিত রয়েছে কালো চামড়ার একটি রাজকীয় আসন! যে আসনের অধিকারীকে আজ অব্ধি কেউ স্বচক্ষে দেখেনি। শুনেছে কেবল নাম! নামটা জানো তো না-কি?”
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল উইলিয়াম! এগিয়ে এসে গা এলিয়ে বসল অন্যপাশের কাউচটায়। ধীরকন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ ইয়াহ! আ'ই নো — দ্যাট'স এডওয়ার্ড ড্যানিয়েল। দ্য কিং অফ অল দ্য গ্রেট ক্যাসিনোস, দ্য মোস্ট সাকসেসফুল রিয়েল এস্টেট টাইকুন!”
“ ব্যস! এটুকুই জানো? আর জানো না?”
কপালে সন্দিগ্ধতার ভাঁজ গাঢ় হলো উইলিয়ামের। শঙ্কিত কন্ঠে আওড়াল,
“ আরও কিছু বাকি আছে না-কি?”
তক্ষুনি নড়েচড়ে বসল অপ্রকাশিত মানব! দু-আঙুলের ভাঁজে সিগারেটটা চেপে রেখে উৎসুক কন্ঠে বলে উঠল,
“ আরেহ! তুমি তো তাহলে তার সম্বন্ধে কিছু জানোই না। তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য কোনো একটি শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সাউথ কোরিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি, এমনকি বেইজিংয়ের অভিজাত শহরগুলোতে সমানতালে রয়েছে তার বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্ট, সুবিশাল রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য, আন্তর্জাতিক শিপিং ও লজিস্টিকস, অভিজাত রেস্তোরাঁ ও নাইটক্লাবের চেইন, বহুমুখী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, আর দুর্লভ ও উচ্চমূল্যের গাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা প্রিমিয়াম অটোমোবাইল ব্যবসা!যেদিকে টাকার পাহাড় দেখবে, সেদিকেই তার আধিপত্য বিস্তৃত! নামি-দামী দেশের মূখ্য শহরগুলোর ব্যস্ততম প্রান্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা তার বিলাসবহুল হোটেলগুলো থেকে শুরু করে সমুদ্রপথে ছুটে চলা বিশাল কার্গো জাহাজ, আকাশছোঁয়া বাণিজ্যিক ভবন থেকে অভিজাত নাইটক্লাবের ঝলমলে আলো — সবকিছুই অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা, যা দিয়ে গড়ে উঠেছে তার গোটা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। অর্থ যেখানে ঘোরে, সেখানে কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত তার নাম। স্ট্রেঞ্জ না?”
উইলিয়াম কপাল কুঁচকে তাকাল ফের। প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ স্ট্রেঞ্জ হবে কেনো?”
লোকটা হাসলো বোধহয়। এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা শূন্য গ্লাসটায় ভকভক করে ঢেলে নিলো খানিকটা মাদকীয় তরল। অতঃপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে, ঠোঁটের ডগায় বাড়িয়ে প্রতুত্তর করল,
“ ইউ আর সো ইডিয়ট, উইলিয়াম! যেখানে সাধারণ একজন উচ্চবিত্ত তার ব্যাবসা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নিতে পারে না, আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংস্টার অর মাফিয়াদের জন্য! সেখানে বছরের পর বছর “ দ্য আননোন এডওয়ার্ড ড্যানিয়েল ” নামক এক বিজনেস টাইকুন তার ব্যাবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে উইদাউট এনি হ্যাসেল! ইজ নট ইট উইয়ার্ড? তারচেয়েও বড়ো কথা, তাকে আজ অব্ধি কেউ দেখেইনি। এমনটা কেনো হয়? সে কী কাউকে ভয় পায়? না-কি নিজেকে সকলের সম্মুখে উম্মুক্ত করতে ভয় পায়? না-কি এর পেছনেও রয়েছে কোনো এক বিশাল রহস্য? আচ্ছা... এমনটা নয়তো, তার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারোর খুব ভালো জানাশোনা রয়েছে? এমনটা হতেও তো পারে, তাই না?”
ভাবুক হলো উইলিয়াম। সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ যাইহোক, ওসব নিয়ে তুমি এতো মাথা ঘামাচ্ছো কেনো? আর বারবার কেনো নিজের সর্বস্বটা লুটিয়ে দেবার জন্য এখানে আসো খেলতে?”
“ কজ...আ'ই ওয়ান্না ক্যাচ হিম। আ'ই ওয়ান্না ক্যাচ এডওয়ার্ড ড্যানিয়েল।”
“ জাস্ট বিকজ অফ — ওর জন্য দ্য মোস্ট কম্পিটেবল সিআইডি অফিসার মেহমেত রায়ান, আই মিন টু সে ‘তুমি’ চাকরি হারিয়েছো বলে?”
উইলিয়ামের বাঁকা কন্ঠে এবারে চোয়াল শক্ত করল মেহমেত! তক্ষুনি এগিয়ে এসে আচমকা শক্ত হাতে চেপে ধরল বেচারার চোয়াল। এহেন অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব উইলিয়াম! বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই সম্মুখ হতে ভেসে এলো মেহমেতের চিড়বিড় কন্ঠ!
“ জাস্ট শাট ইয়োর মাউথ, উইলিয়াম! ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু আটার দিস ওয়ার্ড এগেইন।”
ভড়কায় উইলিয়াম! যত্রতত্র মাথা নাড়ায় সে। তা দেখে এক ঝটকায় তার চোয়াল ছেড়ে দিলো মেহমেত। খানিকটা পিছিয়ে এসে টেবিলের ওপর থেকে টাকার স্যুটকেসটা তুলে নিলো হাতে। অতঃপর ঠোঁটের ভাজেঁ সিগারেট চেপে, উম্মুক্ত পেটানো দেহখানি ছড়িয়ে পা বাড়ালো দরজার অভিমুখে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে আসে উইলিয়ামের শান্ত কন্ঠস্বর!
“ মেহমেত! এখনো সময় আছে, ড্যানিয়েলকে নিয়ে ভাবা বন্ধ করো। নয়তো এখন যা যা অবশিষ্ট আছে, তাও একদিন হারাতে হবে তোমার!”
থামল না মেহমেত! ফ্লোরে পড়ে থাকা রমণীকে পা দিয়ে ডিঙিয়ে চলে গেল খানিকটা দুরত্বে। কেবল বলে গেল,
“ ভবঘুরেদের কোনোকিছু হারানোর ভয় থাকে না উইলিয়াম!”
___________________________________________
“ আর কতক্ষণ বসিয়ে রাখবেন মিস্টার? হোয়্যার ইজ হি? আই ওয়ান্ট টু মিট হিম। তাড়াতাড়ি ডাকুন তাকে।”
একখানা চকার বোর্ডের একপাশে বসে চিড়বিড়িয়ে বাক্যগুলো ঝাড়লেন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট — টলি মার্কস। গোলগাল মুখখানায় তার সে কী রাগান্বিত ভাবস্রোত। কপাল কুঁচকে হাতে গুটি নিয়ে বসে আছেন মহাশয়! তার ঠিক অভিমুখে বসে আছে গম্ভীর মুখো এডউইন। প্রতিক্রিয়াহীন অভিব্যক্তিতে গুটি চালছে দক্ষতায়। তা দেখে গা জ্বালা বোধহয় বহুগুনে বেড়ে গেল মার্কসের। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ছ্যাৎ করে বলে ওঠেন,
“ হেই ইউ! আমার কথা কানে যাচ্ছে না আপনার? নিজেকে কী মনে করেন আপনি?”
গম্ভীর মুখো মানব তথা এডউইন গাল বাঁকায় এবার। দৃষ্টি চকার বোর্ডে ঠেকিয়ে, গমগমে গলায় বলে ওঠে —
“ যা আজ অবধি নিজেকে ভাবার যোগ্যতা হয়ে ওঠেনি আপনার, তাই মনে করি নিজেকে!”
সহসা রাগের পারদ আকাশ ছুঁয়ে গেল মার্কসের। এক ঝটকায় বসার চেয়ার হতে উঠে দাঁড়িয়ে, পা দিয়ে ঠেলে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো চেয়ারটা! অতঃপর অগ্নিদৃষ্টে তাকাল এডউইনের পানে। দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ ডু ইউ থিংক আ'ম আ ফুল? আপনি জানেন আমি কে? জানেন আমি এমুহূর্তে আপনাদের সঙ্গে কী কী করতে পারি?”
মুহুর্তেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তুলল এডউইন। বসে থাকা চেয়ারে পরপর গা এলিয়ে, পায়ে তুললো পা। বড্ড দাম্ভিকতার সঙ্গে জানতে চাইলো,
“ তা বলুন শুনি, আপনি কতভাবে বা** ছিঁড়তে পারেন।”
তেতেঁ ওঠে মার্কস! ঠোঁটের কোণে আচমকা এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ টেনে, খানিক ঝুঁকে এসে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে,
“ আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড়ো বড়ো মাফিয়া, গ্যাংস্টারদের দের সঙ্গে প্রায়শই ব্রেকফাস্ট, ডিনার কিংবা লাঞ্চ করি আমি! সো আশা করি আপনি বুঝতেই পারছেন... আমার চেনা-পরিচিতি ঠিক কতটা বৃহৎ!”
শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে ঠোঁট পিষে নিঃশব্দে হাসতে লাগল এডউইন! তা দেখে মহাবিরক্ত হলেন মার্কস। কপালখানি কুঁচকে আবারও খেঁকিয়ে উঠলেন,
“ হোয়াই আর ইউ লাফিং? আপনি জানেন? আমার একটা চুটকিতে আপনি এবং ঐ...আননোন এডওয়ার্ড ড্যানিয়েল — আপনাদের সঙ্গে ঠিক কি কি হতে পারে! আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই মাফিয়াদের কাছে যদি একবার আপনাদের খোঁজ দিয়ে দিই, তাহলে আর বেঁচে ফিরতে হবে না আপনাদের!”
এপর্যায়ে নিজের উপচে পড়া হাসিটা আর দমিয়ে রাখতে পারলোনা বেচারা এডউইন! হো হো করে হেসে উঠল মার্কের মুখের ওপর। এহেন কান্ডে বেচারা হতভম্ব মার্কস, ভুলে গেল সকল বাকবিতন্ডা! হতবাক চোখে তাকিয়ে থাকতেই, হাসি আঁটকে কোনমতে আওড়ায় এডউইন,
“ সো...আপনার চেনাজানা মাফিয়াগুলো কি দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের চাইতেও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন? তা একটাবার মাফিয়াদের বাপের সঙ্গে দেখা করবেন না, মিস্টার?”
চমকে উঠে মার্কস! ঘাবড়ে গিয়ে অজান্তেই পেছালো কদম। ছোটখাটো মাফিয়াদের চেনে সে, তাও আবার ব্যাবসায়ীক উদ্দেশ্যে। তাই বলে রুশদী কিংয়ের সঙ্গে দেখা করবে সে? যার সঙ্গে দেখা করা মানে স্বয়ং মৃ ত্যুকে আলিঙ্গন করা! অজান্তেই সর্বাঙ্গ কাঁপছে মার্কসের। কাঁপতে কাঁপতে কোনমতে আওড়াল,
“ মা-মানে?”
কথাটা জিভ খসানো মাত্রই সুবিশাল কক্ষের দুয়ার হতে ভেসে এলো — এক অপরিচিত দাম্ভিক কন্ঠ!
“ মানেটা নাহয় আমি-ই বুঝিয়ে দিই, বাস্টার্........”
চকিতে দৃষ্টি ফেলল মার্কস! থমকে গেল পরমুহূর্তেই। অদূর হতে এগিয়ে আসছে এক ভয়ংকর আভিজাত্যে মুড়িয়ে থাকা পাহাড়সম লোক! যার পরনে কেবল কালোর আভিজাত্য! মাথার ওপর বড়ো গোলাকার টুপির আদলে আড়াল হয়েছে তার মুখ। তারওপর কালো রঙা ফুল-কভারড মাস্কে ঢেকে আছে পুরো মুখমণ্ডল!
মার্কস ঢোক গিললো ভয়ে ভয়ে। ভীতসন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে কদম পেছাতেই আচমকা কার্পেটের সনে বেঁধে গেল তার পা। নাক-মুখ কুঁচকে পরক্ষণেই উচ্ছিষ্টের ন্যায় ঠাঁই পেল মেঝেতে! তড়িঘড়ি করে চোখ খুলে যেই না সম্মুখে তাকাল ওমনি দৃষ্টিপটে আবদ্ধ হলো — সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবটি। কালো গ্লাভসাবৃত ডান হাতে তার শোভা পাচ্ছে ম্যাট-ব্ল্যাক পিস্তলটি! যার ধাতব নল আপাতত তাক করা মার্কসের পানে। প্রাইভেট হাই-রোলার স্যুটের ঝাড়বাতি থেকে বিচ্ছুরিত লালচে আলোর আভায় ঝলসে উঠছে ব-ন্দু-কটির কৌণিক ধাতব অবয়ব। বেচারা মার্ক কেমন ঘাবড়ে গিয়ে শুধালো,
“স্যার! স্যার, ইফ ইউ ওয়ান্ট, উই ক্যান টক অ্যানাদার ওয়ে!”
লম্বা আঙুলে অস্ত্রটির গ্রিপ অনায়াসে আঁকড়ে ধরে রুশদী কিং, গোলাকার টুপির আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল আচমকাই মার্কসের অভিমুখে স্থির করল সে। কালো মাস্কের আড়ালে ঢাকা পিয়ার্সিং করা বাদামি অধরযুগলের এক কোণে বাঁকা হাসির ক্ষীণ রেখা ফুটিয়ে, গমগমে কণ্ঠে শুধাল,
“দিস ইজ দ্য অনলি ওয়ে আই ক্যান টক, ব্লাডি অ্যাসহোল!”
মাফিয়া বিস্টের রুক্ষ কণ্ঠধ্বনি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ভয়ে শিউরে উঠল লোকটা। আতঙ্কে বিবর্ণ মুখে অনুনয় জানানোর অভিপ্রায়ে অধরযুগল মেলতে যাবে, অমনি সম্মুখ থেকে অবিরাম গু-লি-বর্ষণ শুরু করল মাফিয়া বিস্ট!
নির্দয় ভঙ্গিতে একনাগাড়ে পিস্তলের সমস্ত গু-লি লোকটার বুক বরাবর বর্ষণ করে চলেছে সে। প্রতিটি গু--লির বিকট শব্দে প্রাইভেট স্যুটের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে যেন। ঠিক তখনি পেছন থেকে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসতে লাগল আরেকজন। হাতে তার একখানা চকচকে ধারালো ছুরি। শিকারির মতো সতর্ক পদক্ষেপে আক্রমণের উপযুক্ত মুহূর্ত খুঁজছে সে। কিন্তু বিধিবাম! অসাবধানতাবশত তার পা আটকে গেল মেঝেতে পড়ে থাকা একটি খালি বিয়ারের ক্যানের সঙ্গে। মুহূর্তেই ধাতব ক্যানটির গড়িয়ে পড়ার শব্দে নীরবতা ভেদ হলো। ওমনি থেমে গেল মাফিয়া বিস্টের গু-লিবর্ষণ।
এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল তার সুঠাম অবয়ব। অতঃপর নিঃশব্দে ঘাড়টা সামান্য কাত করল সে। পিছু দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আর অপেক্ষা করল না। তৎক্ষণাৎ ছুরিখানা উঁচিয়ে মাফিয়া বিস্টের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো বেচারা, তবে বালাই ষাট! আক্রমণকারীর অভিপ্রায় পূর্ণ হওয়ার আগেই পাহাড়সম রূঢ় মানবটি এক ঝটকায় খানিকটা পেছনে সরে গেল। পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎগতিতে শরীর ঘুরিয়ে, কোনো রকম বাক্যব্যয় না করেই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আক্রমণকারীর ছুরিধারী হাতের কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল সে। মোচড় দিয়ে ভেঙে দিল কব্জিসন্ধিটা!
মুহূর্তেই গগনবিদারী আর্তচিৎকারে ফেটে পড়ল লোকটা। যন্ত্রণায় ছুরিখানা হাত থেকে খসে পড়তে না পড়তেই মাফিয়া বিস্টের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁত কিড়মিড় করে আহত লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে, হিংস্র হায়েনার মতো তার হাত থেকে ছুরিখানা ছিনিয়ে নিল সে।
খানিক দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা এডউইন এবার দিকবিদিকশুন্য! নিচের গেমিং রুমজুড়ে মানুষের ঢল, কেউ এদিকটায় ঘটে যাওয়া কান্ড টের পেয়ে গেলে বাঁধবে আরেক বিপত্তি! তাছাড়া সে যে আগ বাড়িয়ে মনস্তারের হাত থেকে শিকার কেঁড়ে নেবার দুঃসাহস দেখাবে, তার ও তো দুঃসাধ্য নেই! গম্ভীর মুখো এক-আধবার এদিক-ওদিক নজর ঘুরিয়ে চাইলো। ওমনি তার বিচক্ষণ মস্তিষ্কে কড়া নাড়ল আরেক বিচক্ষণী বুদ্ধি! সে তক্ষুনি নিজ পকেট হাতড়ে বার করল ফোন, অতঃপর ডায়াল করল — অতিপরিচিত এক প্রাইভেট নম্বরে।
★
মখমলি বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আছে মাহি! ছলছলে চোখদুটো বুঁজে রেখেছে আনমনে। গায়ে কোনমতে শাল জড়িয়ে রাখার ন্যায় জড়িয়ে রেখেছে মুগ্ধের পাঠানো শাড়িটা! এরইমধ্যে আচমকা তার সকল নিস্তব্ধতার ঘোরে কাটিয়ে বহুল কাঙ্খিত একখানা কল চলে এলো এন্টিক ফোনটায়। মুহুর্তেই তব্দা খেয়ে বসল মাহি। চকিতে দৃষ্টি ফেলল ঘাড় বাকিয়ে। একমুহূর্ত স্তব্ধ থেকে পরমুহূর্তেই চাতকের ন্যায় তুলে নিলো ফোনটা। তা ওপাশ থেকে টের পেতেই যত্রতত্র ফোনটা টেবিলের ওপর লাউড দিয়ে রেখে দিলো এডউইন! কদম হটিয়ে সরে দাঁড়াল খানিক দুরত্বে।
এদিকে, ক্ষিপ্র হাতে অস্ত্রটির ধারালো ফলক আহতের চোখ বরাবর তাক করতেই যাবে মাফিয়া বিস্ট, ওমনি এক হাত দূরত্বে টেবিলের ওপর অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনখানা থেকে ভেসে এল তার বহুল পরিচিত কণ্ঠস্বর!
“বিস্ট!”
থেমে গেল হিং স্র মাফিয়া মনস্টার। মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল তার ছুরিধরা হাত। যেন এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সমস্ত হিং স্রতা এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে এল তার অবয়বে। ক্ষণকাল আগেও যে দৃষ্টিতে জ্বলছিল র-ক্তপিপাসু উন্মত্ততা, সেই দৃষ্টিতেই আচমকা নেমে এল এক পশলা স্নিগ্ধতা। কঠিন চোয়ালের পেশিগুলো শিথিল হয়ে পড়ল তার। পিয়ার্সিং করা বাদামি অধরযুগল সামান্য ফাঁক হতেই সেখান থেকে অস্ফুটে নিঃসৃত হলো একখানা শব্দ—
“প্রিয়তমা-আহ!”
উদ্বিগ্ন মায়াবিনী স্পষ্ট শুনলো সে ডাক! বুকটা মুহুর্তেই দ্রিম দ্রিম শব্দে কেঁপে উঠতে লাগল যেন। প্রশান্তির ছায়ায় মুখ হা করে নিশ্বাস টানলো মাহি, আবারও ডাকলো!
“ বিস্ট....”
সহসা লোকটাকে ছেড়ে দিলো মুগ্ধ! উম্মাদের ন্যায় ছুটে এসে খাবলে নিলো ফোনটা। কানের পাশে ঠেকিয়ে কেমন অশান্তের ন্যায় আওড়াল,
“ সিগনোরা-হ! আর ইউ ওকে সিগনোরা-হ?”
কাঁদছে মাহি! ফোঁপানো কান্নার স্বরটুকু গিলে নেবার বড্ড প্রয়াস তার মাঝে। তবে বিধিবাম! নির্দয়টা ঠিক টের পেয়ে গেল সে কান্নার স্বর। একমুহূর্ত নীরব থেকে আচানক গমগমে গলায় শুধালো,
“ কাঁদছিস কেনো? কেউ বকেছে? না-কি স্বামী ম-রে-ছে তোর?”
“ আপনার মুখে ছাই পড়ুক!”
রমণীর ঝাঁঝালো প্রতুত্তরে নীরবে ঠোঁট পিষলো মুগ্ধ। আওড়াল,
“ তাহলে ফ্যাচ ফ্যাচ করছিস কেনো?”
হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলো মাহি। মোটা কন্ঠে বলে,
“ আপনি আমাকে ঐ গানের সুর কেনো পাঠালেন?”
“ শাড়িটা পাঠিয়েছি সেটা দেখিসনি?”
“ দেখেছি তো! তারপরও কেনো....”
“ এমনিতেই পাঠালাম! ইচ্ছে হলো তাই।”
দম খিঁচল মাহি। নাক টেনে আওড়াল,
“ কবে ফিরবেন?”
“ যদি না ফিরি?”
আঁতকে উঠে মাহি! ত্রস্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আওড়ায়,
“ কেনো ফিরবেন না আপনি? কি এমন করেছি আমি? আমাকে আর ভালো লাগছে না আপনার তাই না?”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ! অধর কামড়ে আওড়ায়,
“ না! লাগছেনা।”
বুকটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল মাহি'র! কেঁদে উঠল ফের।
“ মেরে ফেলুন! মেরে ফেলুন আমায়! তবুও আপনার এই বিরহযন্ত্রণায় আর জর্জরিত করবেন না, বিস্ট! পাগলপ্রায় হয়ে যাচ্ছি আমি। ফিরে আসুন আমার কাছে। কথা দিচ্ছি—এবার ফিরে এলে স্বেচ্ছায় নিজের সমগ্র অস্তিত্ব আপনার অস্তিত্বের সঙ্গে বিলীন করে দেব!”
সহসা গম্ভীর হলো মুগ্ধ! ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ ভয় লাগবে না আমাতে বিলীন হতে?”
“ আপনার মতো নির্দয়কে উম্মাদের ন্যায় ভালোবাসতে যখন ভয় লাগেনি, তাহলে বিলীন হতে কেমন ভয়?”
রমণীর এরূপ ভনিতাহীন প্রতুত্তরে প্রশান্তির হাসি টানল মুগ্ধ। সহসা শরীর ঘুরিয়ে পেছনে ঘুরতেই আচমকা একখানা ধারালো ছুরি এসে সজোরে আঘাত হানলো তার পেট বরাবর! মুহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। থমকে গেল পরিবেশ। রূঢ় মানবের হাতের মুঠো হতে অবহেলায় মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল ফোনটা! তার পাশেই ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে লাগল তাজা লহু!
চলবে...
( কাল সবচেয়ে বড়ো সারপ্রাইজ দিবো আপনাদের! আই প্রমিস।)