ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৭৯তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ _ পর্বঃ৭৪(ক)(রি-আপলোডেড)

#jannatul_firdaus_mithila

⚠️ সম্পূর্ণ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উম্মুক্ত। শুধুমাত্র মেইন লিড চরিত্রটুকুকে সাজাতে যতটুকু প্রয়োজন ছিলো, ততটুকুই লেখা হয়েছে। ⚠️

★

পাহাড়ি পথ! রাতের ধু-ধু অন্ধকারে আশপাশ পরখ করার উপায় নেই তেমন। পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথ বেয়ে, হাতে মাঝারি আকারের একটি টর্চলাইট নিয়ে নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলেছে গম্ভীরমুখো এডউইন। তার সম্মুখেই ভীত মাহি। হাতদুটো বুকের কাছে জড়সড়ভাবে বেঁধে রেখে, অনিচ্ছায় হেলে-দুলে ওপরে উঠছে সে। পথিমধ্যে দুপাশের গভীর জঙ্গল থেকে ধেয়ে এলো হিংস্র জন্তুদের মড়াকান্নার মতো স্বর। আচম্বিতে হকচকিয়ে উঠল ভয়ার্ত রমণী! ত্রস্ত থেমে গেল তার ব্যস্ত পদযুগল। তার দেখাদেখি পায়ে রুখ টানল এডউইন। টর্চলাইটের আলোকশিখাটুকু মাহির দিকে নিক্ষেপ করে গম্ভীর, সন্দেহী কণ্ঠে শুধাল,

“মুনবার্ড? হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

তড়াক ঘাড় বাঁকাল মাহি! আশ্চর্য! মেয়েটার চোখেমুখে স্পষ্ট পরিবর্তন। এতক্ষণকার ভয়ের ছাপটুকু উবে গিয়ে সেখানে এবার ফুটে উঠেছে একরাশ সন্দিগ্ধতা! খানিকটা শক্ত ঢোক গিলে পা দুটো নামিয়ে আনলো এক ধাপ নিচে। অতঃপর বুকের কাছে দুহাত বেঁধে সংশয়াকুল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ঁল—

“আপনি আমাকে মুনবার্ড ডাকলেন কেন, এডউইন?”

এহেন আকস্মিক প্রশ্নে মুহূর্তেই মুখাবয়বে অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল এডউইনের। আলোর বিপরীতে থাকা দুটো ভিন্ন রঙের চোখের মণিতে খেলে গেল ক্ষীণ বিস্ময়, পরক্ষণেই সেখানে জমাট বাঁধল দ্বিধার ছায়া। রমণীর বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া অবিচল তার দিকে। যার অভিঘাতে ইতস্ততা বেড়ে গেল এডউইনের। চটজলদি আড়াল করল নিজের দ্বিধাজড়িত দৃষ্টিদ্বয়। ক্ষণিকের অস্বস্তিতে তীব্রভাবে জড়িয়ে গিয়ে আমতা-আমতা করে আওড়াল,

“ভুল করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে, কুইন!”

“ভুল মানুষের একবার হয়, মিস্টার এডউইন! বারবার নয়। আপনি এ নিয়ে আমাকে বারোবার মুনবার্ড বলেছেন। এর নেপথ্যের কারণটা কী, জানতে পারি? তাছাড়া... মনস্টার কি জানে, আপনি আমায় এ নামে ডাকেন?”

তক্ষুনি আঁতকে উঠল এডউইন। পা দুটোর শক্ত হাড় যেন কাপড়ের আবরণ ভেদ করেই স্পষ্ট কেঁপে উঠল তার। শক্ত ঢোক গিলে ঠোঁটে ঠোঁট চাপল সে, পরপরই দুপাশে নাড়াল ঘাড়। বোকা মানবী আজ বড্ড বুদ্ধিমতী! মুখাবয়ব গম্ভীর রেখে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে, পরমুহূর্তেই শরীর ঘুরিয়ে অভিমুখে পা বাড়াল সে, গম্ভীর কণ্ঠে বলে গেল,

“আমি কেবল আমার হাজবেন্ডের দেওয়া নিকনেমস শুনতে অভ্যস্ত, মিস্টার এডউইন! তিনি ছাড়া অন্য কারও দেওয়া নিকনেম শুনলে গা জ্বালা ধরে আমার। সো, নেক্সট টাইম আমাকে এসব উদ্ভট নামে ডাকার আগে এ বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন। নতুবা একজন বাধ্য স্ত্রীর মতো নিজের অসুবিধার কথাগুলো হাজবেন্ডের কানে তুলে দিতে খুব একটা সময় নেব না আমি।”

টর্চলাইটের মৃদু আলোকছটা অনুসরণ করে এগিয়ে চলল মাহি। কথার সে কী তেজ তার! এডউইন কেমন হতভম্ব বনে গেল তার ওমন কথাগুলো শুনে। অন্তঃকোণে ততক্ষণে ভাবনার উদয় হলো—মেয়েটা কি তবে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান বুঝে নিতে শিখে গেল?

★

পাহাড়ের চূড়ায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা স্বচ্ছ কাচের দেয়ালে মোড়ানো বিলাসবহুল পেন্টহাউজটা যেন দূর থেকে আকাশ ছুঁয়েছে। চারপাশের স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের ওপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে উড়ন্ত মেঘেরা, পায়ের তলায় অতল খাদ!

চারতলাবিশিষ্ট গ্লাস হাউজটির তৃতীয় তলার সম্পূর্ণ ফ্লোরজুড়ে বিস্তৃত মাফিয়া শ্যাডো মনস্টারের বোর্ড মিটিং রুম। মেঝেতে বিছানো গাঢ় ধূসর মার্বেল, ছাদজুড়ে পরিমিত আলোকসজ্জা! সুবিশাল এ কক্ষটি মাঝ বরাবর বিশাল এক দেয়াল দিয়ে দুভাগে বিভক্ত। একাংশের ঠিক মাঝবরাবর রাখা দীর্ঘ, কালো ওবসিডিয়ান পাথরের কনফারেন্স টেবিল, যার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো অগণিত চামড়ার চেয়ার। অপরাংশের সম্পূর্ণ দেয়ালজুড়ে সাঁটানো রাশিয়ার বিশাল মানচিত্র। যার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে লাল কালির চিহ্ন, পিন আর পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য লাল সুতোয় ফুটে উঠেছে অপরাধজগতের জটিল নেটওয়ার্ক। সেই দেয়ালের ঠিক সামনে রাখা বিশাল কালো মার্বেলের টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গোপন নথিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, ছবির স্তূপ আর রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বিস্তারিত তথ্য।

পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে থাকা কক্ষটির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকধারী অগণিত অনুচর। প্রত্যেকের মাথা অবনত, দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। কারও মুখে টুঁ শব্দটি নেই, কারোর সাহসও হচ্ছে না সামান্য নড়েচড়ে দাঁড়ানোর। অদূরের দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন মাফিয়া বিস্ট। শক্ত চোয়ালে দক্ষ কৌশলীর ন্যায় মস্তিষ্কে ছক আঁকছেন পরবর্তী জটিল পদক্ষেপের। পরনে তাঁর একখানা ঢিলেঢালা কালো ট্রাউজার, সঙ্গে ধূসর রঙের ফিনফিনে পাতলা শার্ট। শার্ট বেচারাটা বড্ড আঁটসাঁট হয়ে আটকে আছে রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ দেহের সঙ্গে। এই বুঝি ছিন্নভিন্ন হয়ে, তারপর দম নেবে বেচারা শার্টটা!

সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ কনফারেন্স কক্ষটিতে যখন থমথমে পরিবেশ বিরাজমান, ঠিক তখনই কক্ষের প্রবেশদ্বারে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল মাহি। গম্ভীর মুখে দুহাত বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাঁজ করা। অন্যদিকে, প্রবেশপথের পাশের দেয়ালে ভয়ে পিঠ সেঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন! ভয়ার্ত ঢোক গিলে চাপা স্বরে মাহিকে পুনরায় সতর্ক করে দিয়ে বলে উঠল,

“সিগনোরা... প্লিজ ডোন্ট গো দেয়ার। নাহলে মনস্টার আমায় মেরে ফেলবে!”

শুনল মাহি! অথচ তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে গাল বাঁকিয়ে হাসল কেমন বাঁকা। কোনোরূপ কালবিলম্ব না করে নিজেও চাপা স্বরে বলে উঠল,

“মারুক! হু কেয়ারস?”

পরক্ষণেই নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করল রুশদীর রানি। এদিকে, তার বলে যাওয়া বাক্যের পিঠে হতবিহ্বলের ন্যায় তাকিয়ে রইল এডউইন। ভয়ে সর্বাঙ্গ দরদরিয়ে ঘামছে তার। মনে মনে ঢোক গিলে শুধাচ্ছে,

“এই দুজন মিলে একদিন নির্ঘাত আমাকে প্রাণে মেরে ছাড়বে! ওহ জিসাস, প্লিজ সেভ মি ফ্রম মনস্টার!”

★

“কালকের মধ্যেই মস্কোর টুইন টাওয়ার শপিংমলে অ্যাটাক করবি! ঠিক সেই ম্যাপ অনুসরণ করবি, যেভাবে আমি সাজিয়েছি। গট ইট?”

“ইয়েস, মনস্টার!”

সমস্বরে গর্জে উঠল অনুচরদের কণ্ঠস্বর। মুহূর্তেই তাদের সম্মিলিত প্রতিধ্বনিতে ভারী হয়ে উঠল সুবিশাল কক্ষের পরিবেশ। জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় দেয়ালমুখী হলো মাফিয়া বিস্ট। বিশাল মানচিত্রটির ওপর নিবদ্ধ তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। দীর্ঘ আঙুলের অগ্রভাগ বুলিয়ে লাল সুতোয় চিহ্নিত স্থানগুলো পরখ করে নিতে ব্যস্ত সে। ঠিক তক্ষুনি স্বচ্ছ কাচের ঝকঝকে মেঝের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে এলো একজোড়া কোমল রমণীচরণ।

সামান্য সেই পদধ্বনিতেই কক্ষের নিস্তব্ধতায় কেমন অদ্ভুত পরিবর্তন নেমে এলো। চারপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অনুচরদের কপালে মুহূর্তেই ফুটে উঠল বিস্ময় আর সংশয়ের সুস্পষ্ট ছাপ। তাদের দৃষ্টি প্রথমে পরস্পরের মুখে ঘুরে বেড়াল এক-আধবার, অতঃপর ধীরে ধীরে নিবদ্ধ হলো আগন্তুকের অভিমুখে। পলকের ব্যবধানে দৃষ্টিপটে রুশদী কিংডমের সিগনোরা ধরা দিতেই প্রত্যেকের মেরুদণ্ডের হাড় বেয়ে নেমে গেল এক অদৃশ্য আতঙ্কের শীতল স্রোত!

সঙ্গে সঙ্গে অবনত হয়ে এলো প্রত্যেকের দৃষ্টি। একযোগে ভাঁজ হয়ে গেল অগণিত হাঁটু। ভারী বুটের ধুপধাপ শব্দে ক্ষণিকের জন্য মুখরিত হয়ে উঠল কক্ষের নিস্তব্ধতা। আচমকা চারপাশে ঘটে যাওয়া এমন ধুপধাপ শব্দের আধিক্য কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই থেমে গেলেন মাফিয়া বিস্ট! তাঁর বিচক্ষণী আলাপচারিতায় ছেদ ঘটতেই ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেল চোয়াল। কপালের মধ্যিখানে কুঞ্চিত হলো বিরক্তির গভীর রেখা। দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধে টগবগ করতে থাকা মাফিয়া বিস্ট ঝট করে পিছু ফিরলেন। কণ্ঠনালি চিরে বেরিয়ে এলো তাঁর সেই ভয়ানক হুংকার,

“হোয়াট দ্য ফা*ক আর ইউ গাইজ ডু—”

বাকিটুকু জিভের ডগায় আটকে গেল তাঁর। যেন থমকে গেছে হৃৎস্পন্দন! ক্রোধের দাবানলে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা চোখদুটোয় আচমকাই নেমে এলো এক চিলতে শীতলতা। অদূরে দুহাত বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মায়াবিনী। তার চোখেমুখে বড্ড নির্বিকার অভিব্যক্তি, যেন এ মুহূর্তে তার চেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই এখানে!

কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল মুগ্ধ! মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার সূক্ষ্মভাবে পরখ করে নিল রমণীটিকে। প্রথমে চোখের ভুল ভাবলেও এবার তা সুস্পষ্ট হতেই তৎক্ষনাৎ নিজের মুখাবয়বের সামান্যতম শীতল পরিবর্তনটুকু অলক্ষ্যে লুকিয়ে ফেললেন মাফিয়া বিস্ট। পুনরায় রপ্ত করলেন নিজের চিরপরিচিত রুক্ষতা। তক্ষুনি মায়াবিনীর ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাক করলেন বেচারা গার্ডদের ওপর। অতঃপর হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলেন,

“স্ট্যান্ড আপ, বাস্টা*র্ডস!”

আদেশটুকু উচ্চারিত হওয়ামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়াল সবাই। প্রত্যেকের দৃষ্টি তখনো অবনত, শরীরী ভাষায় স্পষ্ট আনুগত্যের ছাপ।

এদিকে মাফিয়া বিস্টের ক্রোধ যেন ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অথচ যে রমণীর আকস্মিক উপস্থিতি তাঁর সমস্ত মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে, তার দিকে দ্বিতীয়বার ভুলেও দৃষ্টিপাত করলেন না তিনি। বরং নিজের ভেতরে জমে ওঠা সমস্ত বিরক্তি নিরীহ গার্ডদের ওপর ঝারতে লাগলেন,

“হোয়াট দ্য ফা*ক ইজ শি ডুয়িং হিয়ার?”

তৎক্ষণাৎ কক্ষজুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। কেউ মুখ তুলে তাকানোর দুঃসাহসটুকুও করল না। এহেন নীরবতায় রূঢ় মানবের চোখদুটো মুহূর্তেই সংকীর্ণ হয়ে এলো। আবারও গর্জে উঠলেন,

“কে এনেছে ওকে এখানে? আন্সার মি, ইউ স্কা***উন্ড্রেলস! আদারওয়াইজ, আই'ল শ্যুট এভরিওয়ান!”

সহসা আঁতকে উঠল সকলে। প্রাণভয়ে তড়িঘড়ি করে সমস্বরে বলে উঠল,

“উই ডোন্ট নো, মনস্টার!”

উত্তরটুকু পছন্দ হলো না অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যালেক্সের। বিচক্ষণ যুবকের চোখেমুখে স্পষ্ট সন্দেহ। তৎক্ষণাৎ সংশয় নিয়ে এগিয়ে গেল প্রবেশদ্বারের অভিমুখে। দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে প্রথমে বামদিকে তাকাল, সেদিকে কেউ নেই। পরবর্তীতে ডানদিকে তাকাতেই দেখল—ভয়ে দেয়ালের সঙ্গে নাক-মুখ ঢেকে সিঁটিয়ে আছে এডউইন। পারলে দেয়ালের ভেতরেই ঢুকে পড়ে! মুহূর্তেই অ্যালেক্সের প্রতিশোধপরায়ণ মনটা কেমন নেচে-কুঁদে উঠল খুশিতে। আচমকা শক্ত হাতে খামচে ধরল এডউইনের কোটের কলার। এরূপ আকস্মিক কাণ্ডে ভড়কে গেল এডউইন। হকচকিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই অ্যালেক্স বাঁকা হেসে বলে উঠল,

“হেই, বাস্টা*র্ড! হোয়াই আর ইউ স্ট্যান্ডিং হিয়ার? ভেতরে আয়, মনস্টারের সাইকি আজ তোকে আয়েশ করে চিবোবে। আয়, আয়!”

সাইকির নাম শুনতেই ভয়ে সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল এডউইনের। তৎক্ষণাৎ চাপা স্বরে অনুনয়-বিনয় জুড়ে দিলো বেচারা,

“নো, নো, নো, অ্যালেক্স! ডোন্ট ডু দ্যাট, বাডি। দেখ... আমি না থাকলে তোকে খোঁচাবে কে বল? আমি না থাকলে তোর লাইফে থ্রিল থাকবে,হ্যাঁ? প্লিজ ডোন্ট ডু দ্যাট! এবারের জন্য ছেড়ে দে।”

অ্যালেক্সের এতে ভ্রুক্ষেপ নেই। গাল বাঁকিয়ে তক্ষুনি এডউইনকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল কক্ষে। ভনিতাহীন কণ্ঠে বলতে লাগল,

“যা বলার মনস্টারকে বলিস।”

এডউইন বেচারা ভয়ে দিশাহারা! মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আচমকা তাকে একপ্রকার উচ্ছিষ্টের ন্যায় ছুড়ে ফেলা হলো মনস্টারের সামনে। ঘটনার আকস্মিকতায় তাল সামলাতে না পেরে বেচারা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। ওমনি পেছন থেকে অ্যালেক্স বলে উঠল,

“ও এনেছে, মনস্টার!”

সহসা রূঢ় মানবের অগ্নিদৃষ্টিযুগল আছড়ে পড়ল এডউইনের ওপর। ভয়ে তক্ষুনি দুহাত সম্মুখে এনে জোড় করে আমতা-আমতা করতে লাগল এডউইন। তন্মধ্যে শোনা গেল মনস্টারের বজ্রকঠিন হুংকার!

“এডউইন! ইউ বাস্টা*র্ড! তোকে বারণ করা সত্ত্বেও কোন সাহসে ওকে এখানে এনেছিস? ইউ...!”

বলতে বলতেই ক্ষিপ্রতায় সম্মুখের টেবিলের ওপর থেকে একখানা বন্দুক হাতে তুলে নিলো মুগ্ধ। এডউইনের পানে তাক করে ট্রিগারের ওপর আঙুল রাখতেই এতক্ষণকার নির্বিকার রমণী এবার মুখ খুলল,

“এডউইনকে মা+রবেন কেন? এডউইন আমাকে আনেনি, বরং আমিই জোর করে এডউইনকে আমার সঙ্গে এখানে এনেছি।”

আচম্বিতে ক্রোধের আগুনে খানিকটা ভাঁটা পড়ল মুগ্ধের। তবুও ঝাঁঝ কমল না বুঝি। চিড়বিড়িয়ে এডউইনকে ফের ধমকে বলল,

“তোকে জোর করেছে বলেই ওকে নিয়ে আসতে হবে, রা**স্কেল?”

এডউইন থরথর করে কাঁপছে। মাহি'র বোধহয় আর ভালো লাগছে না এরূপ চিৎকার-চেঁচামেচি। সে তৎক্ষণাৎ দুপা এগিয়ে এসে ঘরভর্তি গার্ডদের উদ্দেশে শুধাল,

“গার্ডস... লিভ দিস রুম। আ'ই ওয়ান্না স্পেন্ড সাম কোয়ালিটি টাইম উইথ মাই ডিয়ারেস্ট হাবি!”

অভ্যন্তরে হোঁচট খেল মুগ্ধ! সহসা ভ্রুকুটি করে আড়দৃষ্টে তাকালো মেয়েটার পানে। বাইরে থেকে ধরে রাখল নিজের চিরচেনা দুর্বোধ্য রূপ। মাহি'র নজর নিজের দিকে পড়ার আগেই তড়িঘড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যত্র। গার্ডদের উদ্দেশে পুনরায় রুক্ষ স্বরে পরপর বলল,

“ডোন্ট ইউ গাইজ ডেয়ার টু লিভ! আ'ম নট ফিনিশড টকিং ইয়েট!”

পা দুটো অল্প একটু নাড়াতে গিয়েও পথিমধ্যে থেমে গেল সকলে। অমনি রমণীর মেজাজ খিচেঁ গেল। কপাল কুঁচকে ঝাঁঝ দেখিয়ে শুধাল,

“গার্ডস... আই সেইড গেট আউট, এভরিওয়ান!”

এবার আর রক্ষে নেই কারও। স্বয়ং রুশদীর সিগনোরার আদেশ, যা অমান্য করলে মনস্টার নির্ঘাত ঘাড় নেবে। তাই তো সকলে সমস্বরে বাধ্য কন্ঠে বলে উঠল,

“ওকেই, সিগনোরা!”

পা বাড়াল সবাই। সকলের এমন ঔদ্ধত্য দেখে যারপরনাই মহাবিরক্ত হলেন মাফিয়া বিস্ট। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েই আবারও হুংকার ছুড়লেন,

“স্টপ দেয়ার, বাস্টা*র্ডস! আমি যেতে বলেছি তোদের?”

দ্বিধায় জড়িয়ে গেল বেচারা গার্ডগুলো। এবার কার কথা শুনবে? বোকার মতো একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে ব্যস্ত সবাই। এরই মধ্যে মাহি আবারও আদেশ ছুড়ঁল,

“আমি বলেছি, সবাই এক্ষুনি বের হোন। নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু। আমার হাজবেন্ডকে চেনেন তো? আমার কথা অমান্য করার চেষ্টা করে শুধু শুধু নিজেদের গর্দান হারাতে চাইবেন না নিশ্চয়ই!”

শক্ত ঢোক গিলল বেচারারা। তৎক্ষণাৎ মাথা ঝুঁকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে আওড়াল,

“নো, নো, সিগনোরা। আমরা যাচ্ছি...”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই অদূর থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের আরেক গর্জন,

“ইউ ব্লা*ডি অ্যাসহোলস! আমার কথা অমান্য করার সাহস আসে কোত্থেকে তোদের? প্রাণের ভয় নেই?”

দ্বিধাগ্রস্ত বেচারাগুলো এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। নতমুখেই মিনমিনে স্বরে বলে উঠল,

“বাট, মনস্টার... আপনার সিগনোরা বেরিয়ে যেতে বলেছেন।”

“আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও ওর কথা শুনতে হবে কেন তোদের?”

যুবকের ক্ষিপ্ত কণ্ঠ। তাতে অন্যরা কেঁপে উঠলেও দমল না মাহি। বরং গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের অভিমুখে দাঁড়াল। ভনিতাহীন কণ্ঠে শুধাল,

“যার কথা খোদ মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার শুনতে বাধ্য, তার কথা অমান্য করার দুঃসাহস দেখানোর দুঃসাধ্য থোড়াই করবে তারা!”

থমকে গেল সকলে! থমকাল রূঢ় মানবের অভিব্যক্তিও। শক্ত ঢোক গিলতেই তাঁর নিখাদ সৌন্দর্যের অধিকারী গলার উঁচু হাড়টা ভীষণভাবে নড়েচড়ে উঠল। মাহি বেহায়ার ন্যায় তাকিয়ে রইল সেদিকে। মুগ্ধকে এখনো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই যেন সাহস বাড়ল তার। আবারও সকলের উদ্দেশে বলল,

“মাত্র এক মিনিট সময় দিচ্ছি আপনাদের! বেঁচে থাকতে চাইলে এর মধ্যে ঘর ছাড়ুন, নয়তো দুই মিনিট পর পৃথিবী! চয়েজ ইজ ইয়োরস।”

আর দাঁড়াল না কেউ। তৎক্ষণাৎ হুড়োহুড়ি লেগে গেল সবার। অ্যালেক্স তবুও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভাবল—এই বুঝি মনস্টার তাদের আটকাবে। অথচ বালাই ষাট! এমন কিছু ঘটলই না। উপায়ান্তর না পেয়ে অ্যালেক্সও খানিক পরে বেরিয়ে গেল।

কক্ষ এবার বড্ড নীরব! মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুজন। মাহি'র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুগ্ধের পানে নিবদ্ধ থাকলেও মুগ্ধের দৃষ্টি নত আজ। সে যেন আজ ভীষণভাবে লুকাতে চাইছে নিজের বাঁধভাঙা আবেগগুলো। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ থাকায় ফুলে উঠেছে সব ক'টি রগ। মাহি আলতো হাসল। আরেকটু এগিয়ে এসে দুপায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। অতঃপর ঘাড় উঁচিয়ে ক্ষীণ স্বরে শুধাল,

“বিস্ট? ও বিস্ট? তাকাবেন না আমার দিকে? আমায় দেখতে কি ভীষণ পচা লাগছে?”

নিঃশব্দে অবোধ বালকের ন্যায় দুদিকে মাথা নাড়লেন মাফিয়া বিস্ট। দৃষ্টি এখনো নত! মাহি'র অধরযুগল প্রশস্ত হলো তা দেখে। পরপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ ডান হাতের মুঠোটা।

“কাল ওভাবে আমায় একা ফেলে ছুটে চলে গেলেন কেন?”

“আমি তোর কাছে থাকা মানেই তোর স্বাস্থ্যের ক্ষতি, চশমিস!”

যুবকের নির্লিপ্ত প্রত্যুত্তর। তা শুনে থমকে গেল মাহি। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার পানে। পরক্ষণেই বিনা দ্বিধায় বলে উঠল,

“তাই বলে আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে? আপনি কি জানেন, আপনি আমার কাছে না থাকলে... আমার স্বাস্থ্যের অবনতি না ঘটলেও মনের অবস্থার ঠিকই অবনতি ঘটে।”

এবার চোখ তুলে তাকাল মুগ্ধ। টকটকে দৃষ্টিজোড়ায় মেয়েটাকে বন্দী করে শান্ত অথচ নিরেট কণ্ঠে শুধাল,

“তুই আমার সামনে থাকলে আমার মাইন্ড ঠিক থাকে না, প্রিয়তমা-আহ!”

সহসা ঠোঁট কামড়ে হাসতে লাগল মাহি। কপট ভাব নিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে আওড়াল,

“তাহলে এমন নড়বড়ে মাইন্ড নিয়ে ঘুরেফিরে আমার কাছে আসেন কেন? কে বলে আপনাকে আসতে?”

দাম্ভিক রূঢ় মানবের মুখের অভিব্যক্তিটুকু ধরাছোঁয়ার বাইরে। এক পা এগিয়ে এসে নিঃশব্দে ঘুচিয়ে দিলো নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব। ঘাড়টা বড্ড ঝুঁকিয়ে এক হাতের হেঁচকা টানে আচমকা টেনে আনল রমণীর নির্মেদ, বাঁকানো কোমর। গভীর কণ্ঠে বলল,

“যার আমাকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, আমি না চাইলেও তার হৃদয় বলে কাছে আসতে! কী? মিথ্যে বললাম?”

অধরকোণ প্রশস্ত হলো মাহি'র। নাকের ডগার ওপরের দিকে এসে থেমে থাকা চশমাটা বড্ড জ্বালাচ্ছে বুঝি তাকে। একটুখানি ওপরে তোলার চেষ্টায় যেই না আঙুল বাড়াবে, অমনি তার আঙুলটা ধরে ফেলল মুগ্ধ। মায়াবিনী অবোধ ভীষণ। বোধগম্যহীনের ন্যায় তাকিয়ে থাকতেই বাঁকা হাসল মুগ্ধ। আচমকা বাঁকা কণ্ঠে বলে উঠল,

“এইটুকুন একটা চশমিস হয়ে কিছুক্ষণ আগে এত সাহস দেখালি কী করে, হুম?”

আলতো হাসল মাহি! কোমল হাতদুটো উঁচিয়ে রূঢ় মানবের গলা জড়িয়ে ধরতে চাইলেই ঘাড় ঝোঁকাল মুগ্ধ। এক হাতের জোরালো শক্তিতে মানবীর ক্ষুদ্র দেহখানি উঁচিয়ে তুলতেই মাহি তার গলা জড়িয়ে বলে উঠল,

“মনস্টারের সিগনোরা বলে কথা! সাহস না থাকলে থোড়াই চলবে!”

এহেন কথায় ঠোঁট পিষল মুগ্ধ। চোখদুটোতে দুষ্টুমির ভার! কিয়তকাল ঠোঁট কামড়ে কি যেন একটা ভাবলো সে। আচমকা দুষ্ট কন্ঠে বলে উঠল,

“ তখন যেন কি বলছিলি? রিয়েলি ইউ ওয়ান্ট টু স্পেন্ড সাম কোয়ালিটি টাইম উইথ ইয়োর ডিয়ারেস্ট হাবি?”

এতটুকুতে বোধহয় লজ্জারা এসে ভীড় জমালো রমণীর নাকের ডগায়। দৃষ্টি ঝুঁকে গেল আপনা-আপনি। আমতাআমতা স্বরে আওড়াল,

“ আমি তো এমনিই...”

“ ওহ, জাস্ট ফা'ক অফ, বেইব! ইফ ইউ'আর সো ডেস্পারেট ফর মি, দেন কাম... লেট মি কুল ইউ ডাউন!”

হতবিহ্বল মাহি! তন্মধ্যে তুলোর সদৃশ মেয়েটাকে এক হাতে কোলে তুলে মার্বেলের টেবিলটার পানে এগোলো মুগ্ধ। খানিকবাদে তাকে আলতো করে টেবিলের ওপর বসিয়ে পেছনের শুদ্ধ চামড়ার চেয়ারটা সামান্য এগিয়ে এনে, সেখানে গা এলিয়ে বসল নিজে। ঘাড়টা সামান্য কাত করে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে আপাদমস্তক পরখ করতে লাগল মেয়েটাকে। মাহি সিঁটিয়ে গেল তার ওমন দৃষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে। কোমল পা দুটো টেবিলের একপাশ দিয়ে ঝুলছে তার। তড়িঘড়ি করে তা গুটিয়ে আনতে চাইলেই আচমকা তার উরুর কোমল ত্বকে খামচে ধরলেন রূঢ় মানব। গভীর কণ্ঠে শুধালেন,

“রোজি-হ!”

এই নামটা শুনলে এক অদ্ভুত শিরশিরানি বয়ে যায় রমণীর সর্বাঙ্গে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ধীরে ধীরে লজ্জার আবেশে ডুবছে সে। আলতো দৃষ্টি তুলে তাকাতেই মুগ্ধ কেমন ভনিতাহীন কণ্ঠে বলে উঠল,

“ওপেন ইয়োরসেল্ফ, মাই ফা*কিং রোজি-হ বিউটি!”

নির্বোধের ন্যায় তাকিয়ে রইল মাহি। সন্দিগ্ধ গলায় বোকার মতো জিজ্ঞেস করল,

“মানে?”

ঠোঁটের কোণে অধর বসালেন মাফিয়া বিস্ট। নিজের নির্লজ্জতার সকল সীমা লঙ্ঘন করে আচমকা রমণীর দুপাশে টেবিলের ওপর হাত ঠেকিয়ে তাকে আবদ্ধ করলেন নিজ বলিষ্ঠ দেহের আড়ালে। অতঃপর কোনো রকম ভনিতা না করে মাহির কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে শুধালেন,

“ডোন্ট ইউ নো হাউ টু ওপেন ইয়োরসেল্ফ? নো প্রবলেম! আই'ল শো ইউ, রোজি-হ!”

বলেই মায়াবিনীর কালো স্কার্টের আবরণে আঙুল ছোঁয়ালেন রূঢ় মানব। তাঁর স্পর্শে মাহি অপ্রস্তুত হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এলো দু'জনার মধ্যকার অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। রূঢ় মানবের বেহায়া হাতটার রুক্ষ আঙুলের ডগাগুলোর অভিনব পরশ, চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে রমণীর লজ্জার দেয়াল! যার অভিঘাতে অদক্ষ রমণী লজ্জায় কুঁকড়ে গেল মুহুর্তেই। ক্ষুদ্র দেহটা তৎক্ষণাৎ নড়েচড়ে উঠতেই আচমকা এক আগ্রাসী ভঙ্গিতে তার চুলের গোছা আলতো করে খামচে ধরলেন রূঢ় মানব। ক্ষুদ্র বদনখানি নিজের অভিমুখে টেনে এনে হিসহিসিয়ে শুধালেন,

“শশশশ! ডোন্ট মুভ।”

কণ্ঠা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল মাহি'র। বেপরোয়া যুবকের বেলাল্লাপনায় বারংবার লজ্জালু অনুভূতির তীরে বিধ্বস্ত অবস্থায় অজান্তেই আছড়ে পড়ছে সে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আটকে রাখতে চাইছে নিজের প্রতিটি অস্ফুট ধ্বনি! ওদিকে মুগ্ধের মোহগ্রস্ত দৃষ্টিজোড়া অবিচল। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় কাঠ হয়ে যাওয়া অন্তঃকোণে ছেয়ে যাচ্ছে আচ্ছন্নতার ঝড়। নিজ উম্মত্ত কর্মকাণ্ডে অবিচল সে। অবিচল তার কৌশলী ঢেউ!

অষ্টাদশীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ছে এবার। অস্থিরতায় কাঁপছে ক্ষুদ্র তনুটা। আচমকা নিজ অজান্তেই অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো খানিকটা গোঙানির স্বর। সঙ্গে বেরোল,

“বিস্ট... প্লিজ স্টপ! আ'ম... আ'ম...”

থোড়াই শুনলো রূঢ় মানব! বরঞ্চ আরেকটু ঝুঁকে এলো মেয়েটার ওপর। কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে বড্ড ফিসফিসিয়ে শুধালো,

“ এতো তাড়াতাড়ি? আরেন্ট ইউ ইনজয়িং ইট বেইব?”

অধরে অধর চেপে বসে আছে মাহি! কাঁপছে থরথর করে। আচানক এক তীব্র জোয়ারে অস্থিরতার অতল সমুদ্রের তীরে অনিচ্ছায় আছড়ে পড়ল মায়াবিনীর সকল অস্তিত্বটুকু। মুহুর্তের ব্যবধানে দূর্বলতা ধরা দিলো ক্ষুদ্র তনুতে। যার ভার সামলাতে না পেরে, সদ্য কর্তিত কলমিলতার ন্যায় অষ্টাদশী হুট করেই গড়িয়ে পড়ল টেবিলের গায়ে। মুগ্ধ বাঁধ সাধল না। ধীরলয়ে সরে এলো রমণীর কাছ থেকে। স্থির দৃষ্টি তার পানে নিবদ্ধ রেখে, অধরকোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে ধীরলয়ে গা এলিয়ে বসল পেছনের চেয়ারটায়। পরক্ষণেই বাঁকা কণ্ঠে শুধাল,

“বেইব...”

লজ্জিত ঢোক গিলল মাহি! হাঁপাচ্ছে ভীষণ। জিভ ঠেলে অধরকোণ আলতো করে ভিজিয়ে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে তাকাল অদূরে। মুগ্ধের কাত হওয়া দৃষ্টির পানে নিবদ্ধ তার চোখ। দেখল — আর্দ্রতায় দ্রবীভূত রূঢ় মানবের বাম বাহুর কনুইটা ঠেকিয়ে রাখা চেয়ারের হাতলে। মাহি'র নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল আবারও। চোখদুটো সরাতে চাইলেই আচমকা সম্মুখ থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের দুষ্ট কণ্ঠ,

“ক্লিন মি আপ নাউ, বেইব!”

“পারব না আমি, অসভ্য লোক!”

ঝাঁঝিয়ে উঠল মাহি। তা দেখে ঠোঁট পিষলেন মাফিয়া বিস্ট। কপট রাগ নিয়ে বললেন,

“তুই আসবি? নাকি আমি আসব?”

চকিতে দৃষ্টি ফেলল মাহি। ভয়ে তৎক্ষণাৎ দুর্বল তনুটা উঠিয়ে বসল। অমনি তার ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আবদ্ধ হলো নিজ অশোভন দশা, স্কার্টের অনাবৃতে দৃশ্যমান তার মসৃণ পাদু’টো। তৎক্ষনাৎ আরেকদফা লজ্জায় জড়িয়ে গেল সে। তড়িঘড়ি করে লজ্জার আবরণটুকুতে নিজেকে লুকিয়ে যে-ই না সামনে তাকাবে ওমনি হোঁচট খেল মাহি। মুগ্ধের আচ্ছন্ন দৃষ্টিজোড়া অনড় তার বেহায়া দৃশ্যে। দৃষ্টি যেন সরছেই না। ত্বরিত লজ্জায় হাসফাস করে উঠল মাহি। তখনি মুগ্ধ কেমন ভরাট কন্ঠে বলে ওঠে,

“ রোজি-হ!”

শুকনো ঢোক গিলে মাহি। দৃষ্টি লুকিয়ে হাতে চাপলো হাত। তার এহেন কান্ডটারই যেন সুযোগ নিলো বেহায়া লোকটা। হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা টিস্যুর বক্সটা মাহি'র পানে ঠেলে দিয়ে বাড়াল বা- হাতখানা! আদেশক্রমে বলল,

“ ক্লিন মি আপ, বেইব!”

উপায়ান্তর নেই বোকা মানবীর। লজ্জায় মরিমরি দশা হওয়া সত্ত্বেও কম্পিত হাতে কয়েকটা টিস্যু নিয়ে নিল নিজ হাতে। দৃষ্টি নুইয়ে রেখে দাঁত খিঁচে শুধাল,

“ আপনার মতো স্বভাব - চরিত্রের মানুষদের বাংলায় কি বলে জানেন?”

সহসা অন্যহাতে রমণীর ঝুলন্ত পা-টা একটানে নিজ বুকের বাঁপাশে ঠেকালেন বেপরোয়া মানব। এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি। ত্বরিত দৃষ্টি উঁচাতেই দেখল — তার পায়ের কোমল ত্বকে সশব্দে চুমু খাচ্ছেন মাফিয়া বিস্ট। সেথায় অধর ছুঁইয়ে রেখেই হাস্কি স্বরে বলে ওঠে,

“ কি বলে? সে*ক্সি, হট এন্ড হ্যান্ডসাম নিশ্চয়ই?”

গাল বাঁকায় মাহি! কপট রাগ নিয়ে বলে,

“ উহুম! তাদেরকে পিওর লু**চ্চা ব্যাটাছেলে বলে!”

হেসে ফেলল মুগ্ধ। রমণী যেমন টিস্যু হাতে রূঢ় মানবের কাজে মত্ত , রূঢ় মানবও তেমন মত্ত হলেন নিজ দুষ্টুমিতে। ডানহাতের বেহায়া পরশে মায়াবিনীর পায়ের কোমল ত্বক রাঙাতে রাঙাতে, আচমকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন সম্মুখে। সন্দিগ্ধতায় চাপা কণ্ঠে আওড়ালেন,

“বেইব? হোয়াই ডাজ ইয়োর ফেস লুক সো ডাল? আর ইউ হাংরি, বেইব?”

প্রত্যুত্তর করল না মাহি। তা দেখে বেয়াদব লোকটা তাকে আরেকটু জ্বালাতন করতে উদ্যত হলো,

“ইফ ইউ আর হাংরি, দ্যান ইউ ক্যান ইট মি। আ'ই ওন্ট মাইন্ড, বেইব... লিটারেলি আ'ই ওন্ট মাইন্ড। ইন দ্যাট কেস... বল, কোথা থেকে খাওয়া শুরু করবি? ওপর থেকে নাকি নি—”

তক্ষুনি বেহায়া যুবকের মুখের ওপর টিস্যুসহ হাত চেপে ধরল মাহি। ভড়কে যাওয়া কণ্ঠে চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল,

“চুপ করুন! চুপ করুন... আপনি কিন্তু দিনদিন মাত্রাতিরিক্ত নির্লজ্জ হচ্ছেন, বিস্ট। আপনি দেখছি আপনার কথার লজ্জাতেই মে**রে ফেলবেন আমায়!”

ঠোঁট টিপে হাসছে বোধহয় মুগ্ধ। অন্য হাতে আলতো করে রমণীর হাতখানা চেপে ধরে নামিয়ে আনলেন নিজের মুখের ওপর থেকে। ফের দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“ইউ আর সো ফা*কিং হট, রোজি-হ!”

তেঁতে উঠল মাহি। দাঁতে দাঁত চেপে আবারও চিড়বিড়িয়ে উঠল সে,

“এই খবরদার... খবরদার, নির্লজ্জ লোক! আপনার বলা এই উদ্ভট নামের অর্থ না বলা পর্যন্ত আমাকে দ্বিতীয়বার এ নামে ডাকবেন না।”

গভীর হলো মুগ্ধের দৃষ্টি। সামান্য দূরত্ব বাড়ল দু-অধরের মাঝে। ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থেকে হঠাৎ বলে উঠল,

“তুই সত্যিই জানতে চাস এর অর্থ?”

ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল মাহি। তৎক্ষণাৎ দুষ্টুমিতে ভরে উঠল মাফিয়া বিস্টের মুখমণ্ডল। ফের চেয়ার থেকে উঠে এসে ঝুঁকে এলেন মেয়েটার ওপর। অতঃপর চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে শুধালেন,

“ইট রিফার্স টু আ কালার হুইচ ইজ পিঙ্কিশ।”

নির্বোধ রমণীর মাথায় তৎক্ষণাৎ ঢুকল না বাক্যটা। বোধগম্যহীনের ন্যায় সম্মুখে ঝুঁকে থাকা নির্লিপ্ত মানুষটার অভিমুখে তাকাতেই দেখল—সিক্ত জিভ ঠেলে নিজের অধর ভেজাচ্ছে মুগ্ধ। হুট করেই বলা কওয়া ছাড়া চোখ মে'রে বসল মেয়েটাকে। মাহি ভড়কে গেল তা দেখে। মুগ্ধ আর সময় নষ্ট করল না। তক্ষুনি মাহি'র একহাত চেপে, হাতের ডগায় বসিয়ে দিলো আলতো কামড়। মুহুর্তেই নাক-মুখ কুঁচকে নিলো মাহি। চেঁচাবে, তার আগেই হাতের ওপর থেকে দাঁত সরায় মুগ্ধ। পরমুহূর্তে চোখের ইশারায় রমণীকে দেখতে বলে হাতটা। মাহি অবোধের ন্যায় তাকাল সেদিকে। ততক্ষনে কর্ণকুহরে ফের ভেসে এলো মুগ্ধের হাস্কি স্বর!

“ আ'ই লাভ দিস কালার...হুইচ মিনস রোজি-হ!”

পরপরই মুখ বাড়িয়ে রমণীর ঠোঁটে রাখল ঠোঁট! হিসহিসিয়ে আবারও বলল,

“ ইউ আর মাই ফা*কিং রোজি-হ বিউটি!”

এতক্ষণে বোধহয় একে একে দুয়ে দুয়ে মেলাতে সক্ষম হলো মাহি। মস্তিষ্কজুড়ে লজ্জারা টনক নাড়তেই চড়াও হতে চাইল সে। ওমনি তার ওষ্ঠপুট দখল করে নিলেন রূঢ় মানব! অভিলাষে টেনে ধরলেন তাদের।

★

---

রাত বাড়ছে ক্রমশ! দীর্ঘ চুম্বনের আবেশ কাটিয়ে একে-অপরের ঘনঘন নিশ্বাসের পালাক্রম মাপতে ব্যস্ত প্রেমিকযুগল। কপালে ঠেকিয়ে রেখেছে কপাল! মাহির দু-চোখ বন্ধ। তার গালদুটোয় শোভা পেয়েছে মুগ্ধের রুক্ষ হাতদুটো। হাঁপানোর একপর্যায়ে সে হুট করেই মেয়েটাকে বলে উঠল,

“রাতে তোর কাছে থাকতে পারব না, সিগনোরা! আ'ই হ্যাভ টু গো সামহোয়্যার। তোকে প্যালেসে দিয়ে আসব। আজ আমার জন্য অপেক্ষায় থাকিস না, ওকেই?”

তড়াক করে চোখ খুলল মাহি। শঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,

“কেন? কোথায় যাবেন আপনি? না... এত রাতে কোথাও যেতে হবে না আপনার।”

আলতো হাসল মুগ্ধ। ঠোঁট ছোঁয়াল রমণীর ফোলাফোলা গালদুটোয়। পরক্ষণেই আবারও আলতো স্বরে বলল,

“আ'ই হ্যাভ সাম ওয়ার্ক, সিগনোরা! যেতে হবে আমার।”

মাহি'র চোখদুটো ছলছল! সেখানে যেন রূঢ় মানবকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। মুগ্ধ দেখলেন, তবুও আজ গললেন না কেন যেন। বরং নিজেকে শক্ত রেখে এক ঝটকায় রমণীকে তুলে নিলেন কাঁধে। গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

“গোমড়ামুখে স্বামীকে বিদায় দিতে নেই, মিসেস অধীর রায়!”

★

---

রাত দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট!

মাফিয়া বিস্ট প্যারাডাইস ছেড়েছে ঘণ্টা তিনেক আগে। তার ক্ষণিকের বিরহে আবারও জরাজীর্ণ মাহি। জানালার ধারের কাউচে মুখ গোমড়া করে বসে আছে সে। ঘুম ধরা দিচ্ছে না চোখের পর্দায়। শরীরটাও বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে এ মুহূর্তে! গায়ে একটুখানি পানি ছোঁয়াতে পারলে বোধহয় অস্বস্তি খানিকটা কমত তার।

বেশ কিছুক্ষণ নীরব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে অবশেষে মাহি এসে প্রবেশ করল ক্লজেটে। এত এত কাপড়ের স্তূপ! কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবে, কে জানে! মাহি হাঁটতে লাগল সুবিশাল ক্লজেটের মাঝপথে। ঠিক তখনই তার দৃষ্টিজোড়া হঠাৎ থমকাল—অদূরের কাচঘেরা দেয়ালের ওপাশে থাকা একখানা দক্ষিণ ভারতীয় স্টাইলের শাড়ির দিকে। মুহূর্তেই রমণীর অন্তঃকোণে জেগে উঠল একটুখানি সুপ্ত ইচ্ছে! যার পরিপ্রেক্ষিতে শাড়িটার পানে হাত বাড়াল সে।

★

মস্কো সিটির আকাশচুম্বী ভবনগুলোর সারির মাঝে বরফশীতল ঔদ্ধত্য নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিশতলাবিশিষ্ট—দ্য অবসিডিয়ান টাওয়ার। বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর, যার পুরোটাই স্বয়ং রুশদী কিংয়ের! আজ এর পঁচিশতম তলায় বসতে চলেছে অপরাধজগতের গোপন বোর্ড মিটিং। যে সভার কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত স্বয়ং রুশদী কিং।

অবসিডিয়ান টাওয়ারের পঁচিশতলার পুরো ফ্লোরজুড়েই বোর্ড মিটিংয়ের আয়োজন! সুবিশাল টেবিলের চারপাশের অসংখ্য চেয়ারে দাম্ভিকতা নিয়ে বসে আছেন রাশিয়াসহ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন দেশের মাফিয়া ও গ্যাংস্টার বসেরা। প্রত্যেকের সামনে অকশন ফাইল। ফ্লোরের একপাশের সম্পূর্ণ দেয়ালজুড়ে বিশাল এক প্রজেক্টরের পর্দা। সেখানে নিজ চিরচেনা দুর্বোধ্য রূপে দৃশ্যমান রুশদী কিং। ত্রিশতলার সম্পূর্ণ ফ্লোরজুড়ে বানানো তাঁর ব্যক্তিগত আরামকক্ষ! সেখানে বসেই লাইভে যোগ দিয়েছেন তিনি। সকলে যখন নতমুখে উৎসুক, ওমনি সুবিশাল প্রজেক্টরের পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে এলো রুশদী কিংয়ের গম্ভীর, বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর।

“নাচাত আউকৎসিওন!”

(স্টার্ট দ্য অকশন!)

মুহূর্তেই নড়েচড়ে বসলেন বোর্ড মিটিং রুমে উপস্থিত একদল দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার ও মাফিয়া। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল চাপা গুঞ্জন। অতঃপর কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে একজন হাত উঁচিয়ে গমগমে কণ্ঠে হাঁক ছাড়লেন,

“1 Million US Dollars for one shipment!”

কথাটা শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে আরেকজন হাত তুলে পাল্টা দর হাঁকলেন,

“1.5 Million Dollars!”

শুরু হয়ে গেল দর হাঁকাহাঁকির প্রতিযোগিতা। একের পর এক চড়া দামে নিলামে উঠতে লাগল প্রতিটি শিপমেন্টের মাদকদ্রব্য ও অবৈধ অ**স্ত্রের চালান। আর গোটা আয়োজনের নেপথ্যে নিজের চিরচেনা দুর্বোধ্য অবয়বে নির্বিকার বসে রইলেন রুশদী কিং।

বিশালাকৃতির রাজকীয় আসনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন তিনি। মাথার ওপর গোলাকার টুপির আড়ালে আংশিক ঢাকা মুখাবয়ব। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল স্থির হয়ে আছে সম্মুখের সুবিশাল পর্দায়। অথচ দুই কর্ণকুহরে গুঁজে রাখা এয়ারপডসে শুনে চলেছেন বড্ড কাছের মানুষটার সকল বাক্যালাপ।

অকশন প্রায় শেষের দিকে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর উদ্দেশ্যে হাত তুললেন রূঢ় মানব। এই বুঝি তাঁর বজ্রকঠিন কণ্ঠে উচ্চারিত হবে শেষ আদেশ! কিন্তু মুখ খোলার ঠিক আগমুহূর্তেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো এক পরিচিত গানের সুর—

“Chuttamale chuttesandhi...”

মুহূর্তেই টুপির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কপালখানির চামড়া আপনা-আপনি কুঁচকে গেল তাঁর। মাঝআকাশে থেমে গেল আদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওঠানো হাতখানা। এয়ারপডসে তখনো মৃদু অথচ স্পষ্টভাবে বেজে চলেছে গানের সুর। তার সঙ্গে মিশে আছে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ।

পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনে মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইলেন রুশদী কিং। অতঃপর পরোয়া করলেন না সম্মুখের প্রজেক্টরের পর্দার ওপাশে উপস্থিত একঝাঁক দুর্ধর্ষ মাফিয়ার, না-ইবা চলমান অকশনের। সমস্ত কাজকর্ম একপ্রকার চুলোয় তুলে দিয়ে সম্মুখের ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রুত আঙুল চালালেন তিনি। কয়েকটি ক্লিকের পরই চালু করলেন নিজের প্রিয়তমার কক্ষের লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ।

পরক্ষণেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটা। ল্যাপটপের সঙ্গে সংযুক্ত সুবিশাল প্রজেক্টরের কল্যাণে সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল ব্যক্তিগত বোর্ডরুমের দেয়ালজোড়া পর্দায়। আর তাতেই যেন নিমেষে বদলে গেল রুশদী কিংয়ের সমস্ত অভিব্যক্তি।

দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে, মেকআপ ভ্যানিটির সামনে দাঁড়িয়ে টুকটাক সাজগোজে ব্যস্ত তাঁর চঞ্চলা চড়ুই। আজকের সাজে খানিকটা ভিন্নতা এনেছে মেয়েটা। দক্ষিণ ভারতীয় ঢঙে পরেছে শাড়ি, খোলা চুলগুলো পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে কোমর অবধি। কক্ষজুড়ে মিউজিক সিস্টেমে উচ্চস্বরে বেজে চলেছে প্রিয় কোনো গান। আর সেই গানের তালে তালে ঠোঁটে লিপস্টিকের রং বুলিয়ে, হাত-পা ছুড়ে আপনমনে নেচে চলেছে রমণী।

নাচের ভঙ্গিতে কোথাও সামান্য আড়ষ্টতা নেই, নেই কারও সামনে নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার তাগিদ। নিজের ছোট্ট জগতে সে একেবারেই স্বাধীন, একেবারেই বেপরোয়া। আর সেই দৃশ্যই মুগ্ধ হয়ে দেখছেন স্বয়ং রুশদী কিং। যার উপস্থিতিতে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় দুর্ধর্ষ অপরাধীদের আসর, সেই ভয়ংকর মানুষটির অধরকোণে আজ অজান্তেই খেলা করছে এক চিলতে হাসি। কখনো মৃদু হাসছেন, কখনো-বা ঠোঁটের কোণ কামড়ে ধরে দমিয়ে রাখছেন মুখে ফুটে ওঠা প্রশ্রয়মাখা মুগ্ধতা।

ওদিকে অকশন ইতিমধ্যে শেষ। বোর্ডরুমে উপস্থিত প্রত্যেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে প্রজেক্টরের পর্দার ওপাশে বসে থাকা রুশদী কিংয়ের দিকে। সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁর চূড়ান্ত রায়ের। অথচ যার একটি আদেশের অপেক্ষায় গোটা বোর্ডরুম নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে, সেই মানুষটির মনোযোগই যেন অন্য কোথাও!

কয়েক মুহূর্তের অস্বাভাবিক নীরবতার পর গম্ভীর মুখে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের প্রজেক্টর-পর্দার দিকে তাকাল এডউইন। পর্দায় ভেসে ওঠা রুশদী কিংয়ের অমনোযোগী দৃশ্যটি চোখে পড়তেই সন্দিগ্ধতায় কুঁচকে এলো তার কপাল। মুহূর্ত কয়েক নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বিড়বিড় করল সে—

“রুশদী কিংয়ের আবার কী হলো? মনোযোগ কোথায় তার?”

সন্দেহটা ক্রমশ ঘনীভূত হলো। পরিস্থিতির রহস্য উদ্‌ঘাটনের আশায় আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করল না এডউইন। দ্রুত পায়ে বোর্ডরুমের বাইরে বেরিয়ে ছুটল নিজের মনিবের খোঁজে।

★

মুগ্ধের সমস্ত ধ্যানজ্ঞান তখনো নিবদ্ধ হয়ে আছে পর্দার ওপাশে নাচতে থাকা মাহি'র ওপর। হঠাৎ নাচতে নাচতে থেমে গেল মাহি। কেন যেন নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে রইল সে। অতঃপর আয়নায় খোলা চুলগুলো দেখে ঠোঁট উল্টে আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলে উঠল,

“ইশশ্! কয়েকটা টকটকে লাল গোলাপ থাকলেই না, কী সুন্দর একটা খোঁপা বাঁধতে পারতাম! এখন এই অসময়ে গোলাপ পাব কোথায়?”

সামান্য একটি আক্ষেপ। নিতান্তই তুচ্ছ, সাধারণ একটি ইচ্ছা। অথচ সেই কথাটুকুই যেন তীরের ফলার মতো গিয়ে বিঁধল রূঢ় মানবের মস্তিষ্কে। মুহূর্তেই নিভে গেল তার অধরকোণের মৃদু হাসি। তার জায়গায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল সেই চিরপরিচিত বেপরোয়া উন্মত্ততা। তার সিগনোরা ফুলের জন্য আক্ষেপ করবে? সিরিয়াসলি?

ভাবনার পরক্ষণেই আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রুশদী কিং। গটগট পায়ে এগিয়ে চললেন দরজার অভিমুখে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার সামনে এসে উপস্থিত হলো এডউইন। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল বেচারা, কিন্তু শব্দ উচ্চারণের আগেই রুশদী কিংয়ের বজ্রকঠিন আদেশে থমকে যেতে হলো তাকে।

“শহরের যতগুলো দোকানে লাল গোলাপ আছে, সবগুলো আগামী আধঘণ্টার মধ্যে প্যালেসে নিয়ে আয়, এডউইন!”

নির্বাক হয়ে গেল এডউইন। চোখেমুখে ফুটে উঠল অবিশ্বাস আর হতভম্বতা। নিজের আকাশসম বিস্ময় সামলে তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠল সে,

“বাট, মনস্টার... আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আপনার তো মিটিং—”

“জাস্ট ফা*ক অফ দ্যাট মিটিং, এডউইন!”

ধমকে উঠলেন রুশদী কিং। তাঁর কণ্ঠের তীব্রতায় মুহূর্তেই বাকিটুকু গিলে ফেলল এডউইন। তবু শেষ চেষ্টা হিসেবে অসহায় কণ্ঠে বলে উঠল,

“বাট, মনস্টার... ইটস অ্যাবাউট টু হান্ড্রেড মিলিয়ন ডলারস!”

কথাটা গায়ে মাখলেন না বেপরোয়া যুবক! বরং বলিষ্ঠ দেহের প্রকাণ্ড ধাক্কায় কাঁপিয়ে তুললেন দরজার কপাট। সেই সঙ্গে বাতাসের তালে ভেসে এলো তাঁর চূড়ান্ত রায়—

“আই ডোন্ট ফা*কিং কেয়ার অ্যাবাউট দ্যাট!”

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন