ফন্ট সাইজ:
থিম:
মির্জা সায়ান মুগ্ধ

৮০তম পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস মিথিলা

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ _ পর্বঃ৭৪(খ)

#jannatul_firdaus_mithila

দুর্বার গতিতে শহরের রাজপথ চিরে ছুটে চলেছে মাফিয়া বিস্টের বিশাল গাড়িবহর। সারি সারি বিলাসবহুল গাড়ির পেছনে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রকাণ্ড চারটি ট্রাক। ট্রাকগুলোর ভেতর বোঝাই করে রাখা হয়েছে অসংখ্য লাল গোলাপ।

বহরের মাঝামাঝি থাকা বিশালাকার লিমুজিনের পেছনের আসনে সগৌরবে বসে আছে মাফিয়া বিস্ট। কোলের ওপর খোলা ল্যাপটপ। এক হাত মুখের সামনে তুলে রেখে পর্দায় নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। সেখানে ভেসে উঠেছে মাহি'র ঘরের দৃশ্য।

কখনো পুরো ঘরময় আপনমনে হেঁটে বেড়াচ্ছে তার চঞ্চলা চড়ুইটা, কখনো-বা শাড়ির আঁচল ধরে কোমর দুলিয়ে নেচে উঠছে আনমনে। হাতের চুড়িগুলো রিনরিন করে বাজছে। আধভেজা চুলে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে একসময় জানালার পাশের কাউচটায় গিয়ে বসল অষ্টাদশী। ঠিক তখনই তুলতুলে আদুরে খরগোশ ছানাটা কোত্থেকে যেন ছুটে এসে চড়ে বসল তার কোলে।

রমণী বড্ড খুশি হলেও এমন কাণ্ডে যারপরনাই বিরক্ত হলো মাফিয়া বিস্ট। মুহূর্তেই কপালে ফুটে উঠল একাধিক বিরক্তির ভাঁজ। শক্ত হয়ে উঠল চোয়ালের রেখা, মুষ্টিবদ্ধ হলো হাতদুটো। ল্যাপটপের পর্দায় ভেসে থাকা আদুরে পোষ্যটার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁত খিঁচে বিড়বিড় করল,

“বা*স্টার্ড! কত বড় সাহস ওর! যখন-তখন আমার প্রোপার্টির কোলে চড়ে বসে! তোর বাপের রাজত্ব না-কি রে বান্দীর ছেলে?”

ওপাশে মাহি'র চোখেমুখে উপচে পড়ছে আনন্দের দীপ্তি। পরম মমতায় খরগোশটাকে বুকে আগলে নিয়ে নরম গালটায় টপাটপ কয়েকটা চুমু এঁকে দিল সে। আদুরে কণ্ঠে আওড়াল,

“এখনো ঘুমাওনি কেন, কিউটি? মাম্মামকে মিস করছিলে বুঝি?”

কানের ভেতর গুঁজে রাখা এয়ারপডে কথাগুলো ভেসে আসতেই মুগ্ধের মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে উঠল। কটমট করে উঠল দাঁত। চাপা স্বরে ফের বিড়বিড় করল সে,

“মাম্মাম? তাও আবার এই চিপকু বাস্টা**র্ডটার? হোয়াট ননসেন্স!”

মাহি তখনো পশমি ছানাটাকে আদর করতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর কিউটিকে কোলে নিয়েই এগিয়ে গেল মখমলি বিছানার দিকে। পা দুটোয় হঠাৎ জোর দিয়ে ধপাস করে পিঠ এলিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়, মুহূর্তেই তুলোর মতো নরম বিছানার অতলে ডুবে গেল রমণীর ক্ষুদ্র তনু। আবেশে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে। দুহাতে খরগোশ ছানাটাকে আদর করতে করতে উপুড় হয়ে শুলো পরক্ষণে। কিউটি তক্ষুনি সুযোগ বুঝে তার নরম হাতদুটোর বাঁধন ছিঁড়ে পালালো সামনের দিকে। তবে ছোটার বদলে দিয়ে বসল এক ডিগবাজি! দৃশ্যটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল মাহি। আনমনে হাঁটু দুটো ভাঁজ করে কোমরের কাছে তুলে আনতেই পায়ের ওপর থেকে সরে গেল শাড়ির আবরণটুকু। সহসা দৃশ্যমান হলো মায়াবিনীর ফর্সা, কোমল পায়ের ত্বক।

ব্যস! এতটুকুতেই কুপোকাত কুখ্যাত মাফিয়া বিস্ট!ল্যাপটপের পর্দায় দৃশ্যটা দেখামাত্রই অস্থির হয়ে উঠল তার তনুমন। উত্তপ্ত নিশ্বাসে ভারী হয়ে এলো বুক। হাঁসফাঁস করতে করতে এক টানে গায়ের কালো ওভারকোটটা খুলে ফেলল সে। ব্যস্ত হাতে পরপরই শার্টের ওপরের বোতামগুলো খুলে অনাবৃত বুকের ওপর হাত বুলোতে লাগলো অনবরত। তার গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে শুকনো ঢোক। অস্থির আঙুলগুলো ইতোমধ্যেই শক্ত করে চেপে ধরেছে ল্যাপটপের কিনারা। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে, সিক্ত জিভের ডগায় ভিজিয়ে নিচ্ছে শুকনো অধরকোণ।

পর্দার ওপাশে নির্বিকার মাহি তখনো তার আদুরে খরগোশ ছানাটাকে নিয়ে মেতে আছে। আর সেই মাতামাতিতেই অজান্তে সরে গেছে তার শাড়ির আঁচল, অনাবৃত হয়েছে রমণীর কোমরের বেশ খানিকটা অংশ। মাখনরঙা পিঠখানি থেকে চুলের আবরণ সরে যেতেই সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান হলো তার মসৃণ পিঠের ত্বক। কেবল সরু সুতোর মতো একটি ফিতায় কোনোমতে আটকে আছে ব্লাউজটা।

এহেন দৃশ্য দেখেই ধৈর্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেল মাফিয়া বিস্ট। তৎক্ষনাৎ কোলের ওপর থেকে ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে, পায়ের ওপর পা চেপে বসল সে। ধারালো দাঁতের রুক্ষ পরশে চেপে ধরল অধরকোণ! সাপের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দ তুলছেন মাফিয়া বিস্ট, শক্ত ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,

“ওহ, ফা'ক! সব দেখিয়ে দেখিয়ে আমায় মেরে ফেল, বান্দীর মেয়ে! ওহ...”

________________________________________

রাতের শেষ প্রহর!

“মনস্টার প্যারাডাইসের” সুবিশাল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে দুর্বার গতিতে ভেতরে প্রবেশ করছে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ির বহর। বহরের পেছনে ধীর অথচ ভারী গর্জনে এগিয়ে আসছে প্রকাণ্ড চারটি ট্রাক। ট্রাকগুলোর চাকার ঘর্ষণ আর ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জনে নিমিষেই মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ।

বিশালাকার লিমুজিনটি থামতেই নতমুখে এগিয়ে এলেন দু’জন গার্ড। গাড়ির দরজা খুলতে উদ্যত হতেই, তাদের সুযোগ না দিয়ে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে এলেন শ্যাডো মনস্টার। তাঁর এমন আকস্মিক তৎপরতায় গার্ড দু’জন তৎক্ষণাৎ দু’দিকে সরে দাঁড়ালেন। অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার অবকাশটুকুও নেই মাফিয়া বিস্টের। গাড়ি থেকে নেমেই উল্টো দিকে ছুটলেন তিনি। সে কী ব্যস্ত তার পদধ্বনি!

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকগুলোর পেছনে গিয়ে উপস্থিত হলেন মাফিয়া মনস্টার। ইতোমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে ট্রাকের বিশাল দরজাগুলো। আর অমনি চারপাশ ছেয়ে গিয়েছে গোলাপের মাদকতাময় মিষ্টি সুবাসে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য গোলাপের সম্মিলিত সৌরভ।তাতেও পাত্তাহীন রূঢ় মানব, ভীষণ অধৈর্য হয়ে বলিষ্ঠ বাহুদ্বয় প্রসারিত করলেন তিনি। অতঃপর ট্রাকের ভেতর থেকে টেনে বার করে নিলেন — বিশালাকার একগুচ্ছ গোলাপ। মুহুর্তের ব্যবধানে তা নিজ বলিষ্ঠ, চওড়া কাঁধে তুলে নিতেই আশেপাশে গুঞ্জে উঠল চাপা শো-রগোল।রুশ গার্ডদের কয়েকজন দ্রুত এগিয়ে এলেন। নিজেদের আনুগত্যের প্রমাণ দিতে, মনস্টারের কাঁধে থাকা সুবিশাল ফুলের তোড়াটি নিয়ে নিতে চাইলেন তারা, ওমনি মাঝপথে থমকে গেল তাঁদের পদক্ষেপ। কর্নকুহরে ভেসে এলো মাফিয়া বিস্টের ক্ষিপ্র হুংকার!

“হোপ! দিস ইজ ফর মা’ই সিগনোরা!”

মুহূর্তেই যেন পাথর হয়ে গেলেন সকলে। পরক্ষণেই নড়েচড়ে সরে গেলেন পথ হতে। ততক্ষণে চওড়া কাঁধে ওপর বিশালাকার একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে এগিয়ে চললেন নির্দয় মানব। বড্ড নির্লিপ্ত ভঙ্গিমা তার মুখমণ্ডলে। পায়ের গতি সচল, অধরকোণ ছুঁক ছুঁক করতেই তড়িঘড়ি করে পকেটে হাত গুঁজে একখানা সিগার বার করলেন তিনি। ক্ষণকাল বাদেই তা ঠোঁটের ভাঁজে চেপে ধরে লাইটার ধরালেন শেষভাগে। নাক দিয়ে সিগারের কলুষিত ধোঁয়াগুলো ছাড়তে ছাড়তে চাপা কন্ঠে আওড়ালেন,

“ ওহ রোজি-হ! আ'ম কামিং... ”

___________________________________________

রাতের শেষ প্রহরেও দু-চোখে ঘুম নেই মাহি'র। তারমধ্যে হাটখোলা জানালার বাইরে থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্ণের তীব্র গর্জন! সব মিলিয়ে হুট করেই অস্থিরতা জেঁকে ধরেছে তাকে। অবোধ মনের কোণে বারবার প্রশ্ন জাগছে —

“ এতো রাতে কে এলো প্যালেসে? বিস্ট তো বলেছিল, সকাল হবার আগে ফিরবেনা। তাহলে...”

ভাবনার ঘোরটা হুট করেই ভেঙে গেল মাহি'র। নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্রপথ দিয়ে ভোস-ভোস করে গোলাপের মিষ্টি সৌরভ প্রবেশ করতেই সজাগ হলো তার বিচক্ষণি মস্তিষ্ক। সন্দিগ্ধতায় কুঁচকে গেল কপালের চামড়া। কৌতুহলবশত তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে দুয়ারপানে তাকায় মাহি। নাহ! সেদিকে কেউ নেই। কিন্তু.. ঘ্রাণটাতো সেখান থেকেই আসছে।

মাহি'র সন্দেহাকুল মন! তৎক্ষনাৎ ছুটলো ঘরের দুয়ারপানে। দরজার বাইরে মুখ বার করে ঘাড়টা বামদিকে ঘোরাতেই থমকে গেল রমণী! বিস্ময়াবহে চোখদুটো যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো তার। বিস্মিত কন্ঠফুড়ে বেরিয়ে এলো,

“ বিস্ট! আপনি?”

রমণীর কন্ঠে উপচে পড়া হতবাকতা ধরা দিলেও তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই মাফিয়া বিস্টের। বরং তার ব্যস্ত পাদু’টো এক অদ্ভুত ক্ষমতাবলে থেমে গিয়েছে ক-হাত দুরত্বে। বাদামী চোখদুটো গভীরভাবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে আপাদমস্তক পরোখ করতে ব্যস্ত। একহাতে ধরে আছে কাঁধ বোঝাই করে রাখা টকটকে লাল গোলাপের বিশাল এক তোড়া, অন্যহাতটার মুঠোয় বন্দী জ্বলন্ত সিগারটা। মেয়েটার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই সিগারটা মুঠোয় চেপে ধরেছে মুগ্ধ। রুক্ষ মুঠোর চামড়াটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই আগুনের ফুলকিতে জ্বলতে ব্যস্ত, অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন সে। পাদু’টোয় খানিকবাদেই গতি টেনে সামনে এগোতেই হতভম্ব রমণী নিজেকে ধাতস্থ করতে তৎপর হলো। একপা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধের মুখোমুখি। অধর নাড়িয়ে যেই না কিছু আওড়াবে অমনি নিজের রুক্ষ মুঠো থেকে সিগারটা অলক্ষ্যে ছুড়ে ফেলে, মায়াবিনীর তুলতুলে ওষ্ঠপুটের চামড়ায় বৃদ্ধা আঙুল ঘষতে লাগলো মুগ্ধ। দৃষ্টিতে আচ্ছন্নতা লেপ্টে হাস্কিস্বরে শুধালো,

“ হোয়াই ডিড ইউ ওয়্যার আ সারি, গ্লুপায়া?”

কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল মাহি'র। অস্থিরতায় পরপর পলক ঝাপটে থেমে থেমে আওড়াল,

“ না মানে...এমনিতেই।”

খানিক থেমে একবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে নিজেকে পরোখ করল মাহি। পরপরই আবারও সন্দেহাকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ উমম.. এভাবে শাড়ী পরেছি বলে খুব বাজে দেখাচ্ছে আমায়?”

যুবকের দৃষ্টি গাঢ়। পলক ঝাপটে “ হ্যা ” বোধক উত্তর দিলো ক্ষীণ। তাতেই আধার ছেয়ে গেল অষ্টাদশীর পেলব মুখখানায়। গালদুটো ফুলে উঠল অভিমানে। ত্বরিত পা হটিয়ে সরে যেতে তৎপর হয়ে শুধালো,

“ ঠিক আছে, খুলে ফেলছি তবে!”

আচানক নির্মেদ কোমর বরাবর এক জোরালো হেঁচকা টান বসাতেই রমণীর চলন্ত পাদু’টো থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ভড়কে গিয়ে ঘাড় বাঁকাবে তার আগেই মায়াবিনীর কানের কাছে মুখ ঠেকলো রূঢ় মানবের। ক্ষণকাল পেরুতেই ফিসফিসিয়ে হাস্কিস্বরে আওড়াল সে,

“ মা'ই ফা'কিং রোজি-হ বিউটি! শাড়িটা একা একা পরতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়েছে তোর। থাক না, তোকে আর কষ্ট করে খুলতে হবে না। এটুকু কষ্ট নাহয় সানন্দে আমাকেই করতে দে। কাম...”

মুহুর্তেই শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল মাহি'র। ঘেমে উঠল হাত-পা! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে মিনমিন করতে লাগলো চঞ্চলা চড়ুই,

“ ইয়ে..মানে!”

বাক্যটা অধর খসতে না খসতেই ফের এক শক্তপোক্ত হাতের জোরালো টানে হকচকিয়ে উঠল মাহি। পরক্ষণেই নিজেকে আবিষ্কার করল মুগ্ধের অন্যকাধটায় ঝুলে থাকা অবস্থায়! সহসা চমকে গিয়ে বলে উঠল,

“ আপনার না মিটিং ছিলো? তাহলে হুট করে এতরাতে চলে এলেন যে?”

মুগ্ধ এগোচ্ছে কক্ষে। এককাঁধে পুতুল রমণী, আরেককাঁধে গোলাপগুচ্ছ! তবুও নির্লিপ্ত কন্ঠে প্রতুত্তর করল,

“ গরম লাগছিলো, তাই চলে এলাম!”

মাহি অবাক হলো ভীষণ। হতবাকতায় আনমনে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ বাইরে এতো ঘন তুষারপাত হওয়া স্বত্বেও আপনার গরম লাগছে? এটা কিভাবে সম্ভব? এতো গরম আসে কোত্থেকে আপনার? আশ্চর্য!”

কক্ষের মাঝামাঝি এসে দাঁড়াতেই কাঁধ হতে আলতো করে মেয়েটাকে নামিয়ে দিলো মাফিয়া বিস্ট। পরপর শরীর ঘুরিয়ে চলে গেল দরজার কাছে। একহাতে সুবিশাল দুয়ার কপাট বন্ধ করে দিয়ে, পিছু ঘুরতে ঘুরতে বাঁকা কন্ঠে শুধালো,

“ হ্যান্ডসাম বডি হলে এই এক জ্বালা, মিসেস অধীর রায়! যখন তখন গরম লাগে।”

“ বেশি গরম লাগলে যান, গিয়ে শাওয়ার নিয়ে ফেলুন।”

মাহি'র চটপট কন্ঠ! তা শুনে অধরকোণে দাঁত বসায় মুগ্ধ। এগিয়ে এসে কাঁধ থেকে বিশালাকৃতির গোলাপগুচ্ছটা নামিয়ে, রমণীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাস্কিস্বরে বলল,

“ নিন মিসেস অধীর রায়! এবার যতো ইচ্ছে গোলাপ গাঁথুন আপনার খোঁপাতে। বাইরে আরও চারটে ট্রাক পড়ে আছে, সো নো টেনশন!”

অন্তকোণে হোঁচট খেল মাহি। চকিতে দৃষ্টি ফেলল সম্মুখে। ভড়কানো কন্ঠে বলেই বসল,

“ আপনি কি করে জানলেন, আমি খোঁপায় গোলাপ গাঁথতে চেয়েছিলাম? আপনিতো এখানে ছিলেন না।”

বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। মেয়েটার মুখের ওপর ঝোঁকালো নিজের মুখ! দৃষ্টিতে মোহগ্রস্ততা লেপ্টে, ভরাট কন্ঠে জবাব দিলো —

“ আমি তোর কাছে থাকি কিংবা দূরে, মনে রাখিস — আমার কালদৃষ্টি সর্বদা তোকে ঘিরেই থাকে। যা থেকে মৃ*ত্যুর আগে লুকনো অসম্ভব, পিচ্চি!”

হতবুদ্ধিকর ভাব ধরে তাকিয়ে রইলো মাহি। বোকার ন্যায় হাতদুটো বাড়িয়ে ধরতে চাইলো ফুলের তোড়াটা, কিন্তু বালাইষাট! অতবড় গোলাপগুচ্ছটা ধরা তো দূর, দু'হাতে নাগালই পেলো না বোকা মানবী। শেষমেশ অতিষ্ঠ হয়ে দু'হাত ভরে নিয়ে নিলো কতগুলো টকটকে গোলাপ। বাকিগুলোর দিকে তাকিয়ে, মন খারাপের সুরে বলল,

“ এতগুলো ফুল একসঙ্গে কেন আনলেন, বিস্ট? আমার তো অল্প ক'টা হলেই চলতো।”

“ বাট..আমিতো অল্পই এনেছি সিগনোরা-হ!”

যুবকের এহেন নির্বোধ প্রতুত্তরে আকাশ ভেঙে ধরণীতে পড়ল মাহি। চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে আওড়াল,

“ চারটা ট্রাকভর্তি করে গোলাপ আনাটা অল্প? তাহলে বেশি আনার হলে কি করতেন বিস্ট? প্লিজ, এখন আবার বলে দিবেন না — তখন পুরো পৃথিবীর ফুল তুলে নিয়ে আসতেন।”

“ তুই চাইলে সব তুলে নিয়ে আসতে দুবারও ভাববোনা, বিউটি!”

ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল মাহি। জানতো, বেপরোয়া লোকটার উত্তর এমনই হবে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাতভরা গোলাপগুলো নিয়ে এগিয়ে চললো মেক-আপ ভ্যানিটির দিকে। মেকি অতিষ্ঠ ভাবস্রোত দেখিয়ে বলল,

“ আপনাকে নিয়ে না..আর পারলাম না আমি। কবে একটু স্বাভাবিক মানুষের মতো কর্মকাণ্ড করবেন আপনি, হুম? একটা ড্রেস লাগলে তুলে আনেন গোটা-শপিংমল, একটা ফুল চাইলে তুলে আনেন ট্রাকভর্তি করে ফুল! বলি...আর কতো পাগলামি করবেন আপনি?”

যুবক প্রতুত্তরহীন। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দু'হাত পকেটে গুঁজে, এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মেক-আপ ভ্যানিটির আয়না ঘেঁষে। খোঁপা বাঁধতে ব্যস্ত মাহি'র পানে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হঠাৎ হাস্কিস্বরে বলে উঠল,

“ খুলেই রাখ না! এতে আমার সুবিধে হবে।”

ভড়কে গেল মাহি! নির্বোধের মতো তাকিয়ে রইলো কয়েকপল। যুবকের নিস্পৃহ গোছের বাক্য শুনে বোধগম্যহীন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ সুবিধা? আমি চুল খুলে রাখলে আপনার কিসের সুবিধা?”

বিনিময়ে কেবল ঠোঁট পিষে হাসলো মুগ্ধ। অধরের ডগায় বাঁক নেই অথচ দু'ধারে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো — কিছু না।

মাহি-ও ওসব নিয়ে খুব একটা ভাবলোনা। প্রায় খোঁপা করে নেওয়া চুলগুলো পুনরায় বাঁধনহারা করতে করতে বলল,

“ আপনার না গরম লাগছে? তাহলে যান! গিয়ে একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে ফেলুন। আ'ই থিংক, দ্যাট উই'ল গিভ ইউ সাম প্লেজার।”

দু-পকেট থেকে হাত বার করল মুগ্ধ। ধীরলয়ে খুলতে লাগলো শার্টের সবগুলো বোতাম। মোহগ্রস্ত দৃষ্টিতে রমণীর পানে তাকিয়ে শুধালো,

“ আপাতত সারারাত পুলে ডুবে থাকলেও গরম কমবে না আমার। অন্যকিছু ট্রাই করতে হবে।”

“ আবার কি ট্রাই করবেন?”

কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ঁল মাহি। মুগ্ধ বাঁকা হেসে ব্যস্ত হাতে গা থেকে খুলে ফেলল শার্টের আবরণ! মুহুর্তেই অনাবৃত হলো রূঢ় মানবের লোমহীন পেটানো দেহখানি। উদরের ছ'টিপেশীর আগাগোড়ায় ঘামের উপস্থিতি স্পষ্ট চক্ষুগোচর! বলিষ্ঠ বাহুদ্বয় সামান্য নড়চড় করতেই বক্ষের ধারের মাংসল পেশীগুলো নড়েচড়ে উঠল ভীষণ। মুহুর্তেই গলার কাছে নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহি'র। চোখদুটো টেনেহিঁচড়ে সরাতে চাইলেও বেহায়া দু'টো আজ জোট বেঁধেছে! সরছেই না কোনমতে। মুগ্ধ যেন আরও আশকারা পেয়ে গেল এসবে। তক্ষুনি এগিয়ে এসে চট করে একহাতে পাঁজাকোলে তুলে নিলো চঞ্চলা চড়ুইকে। মুখের কাছে মুখ রেখে, তখনকার ছোঁড়া প্রশ্নের পিঠে হিসহিসিয়ে জবাব দিলো,

“ দেখাচ্ছি! তার আগে আয়, তোকে শাড়ী খুলতে একটু হেল্প করি। তোকে এসবে দেখে গরম বাড়ছে আমার, চাশমিস!”

লজ্জায় গালদুটো জ্বলতে লাগলো মাহি'র। গলার কাছে চিবুক নামিয়ে মিনমিনে স্বরে আওড়াল,

“ লাগবেনা, আমি নিজেই...”

“ ওহ শাট আপ, মা'ই ফা'কিং রোজি-হ! আমি থাকতে তোর কেন খোলাখুলির কষ্ট করতে হবে শুনি? পরার দায়িত্ব তোর কিন্তু খোলার দায়িত্ব আমার ওকেই? আর আমি আমার দায়িত্ব পালনে সদা তৎপর! শত হলেও পরোপকারী মানুষ বলে কথা।”

গাল বাঁকায় মাহি। মুখটা যথাতথা অন্যত্র ঘুরিয়ে মুখ ঝামটি দিয়ে শুধায়,

“ ইশশ্! কতোবড় পরোপকারী ভন্ড লোক রে আমার! লাগবে না আপনার হেল্প। নামান আমাকে নিচে!”

ততক্ষণে মখমলি বিছানার কাছে এগিয়ে এসেছে মুগ্ধের পাদু’টো। আচমকা মেয়েটাকে একপ্রকার তুলোর বস্তার ন্যায় ছুঁড়ে ফেলল বিছানার কোলে। এহেন কান্ডে হকচকিয়ে ওঠে মাহি। কপট রাগ নিয়ে সামনে তাকাতেই, মুগ্ধ কেমন নাটকীয় ভং ধরে শুধালো,

“ বাট হোয়াই, সিগনোরা-হ? তুই তো জানিস, আমার কতবড় একটা দয়ার শরীর। তোর কষ্ট দেখতে পারিনা। এই দেখ! তুই কষ্ট করে শাড়ি খুলবি এটা ভাবতেই আমার চোখদুটো এবং পাখিটা লাফাচ্ছে! ইশশ্... কত কষ্ট! আয়, আয়... আমিই নাহয় খুলে দিই।”

হতবিহ্বল মাহি, মুগ্ধ তার ওপর ঝুঁকে আসতেই সে কেমন দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,

“ মানুষ যে ঠিক কতটা জঘন্যরকমের নির্লজ্জ, বেশরম হতে পারে, তা আপনাকে না দেখলে হয়তো বুঝতামই না!”

রমণীর শাড়ির আচলখানা ধীরলয়ে কাঁধ হতে গড়িয়ে নামছে রূঢ় মানবের ধীরস্থির হাতের টানে। মায়াবিনীর কাঁধ ততক্ষণে অনাবৃত, সেথায় নিজ রুক্ষ অধরযুগলের ছাপ বসাতেই শিউরে ওঠে মাহি। কুপোকাত হওয়ার পূর্বলগ্নে, রূঢ় মানবের হাস্কিস্বর পৌঁছাল তার কর্ণকুহরে,

“ বাই দা হেল ইন দ্য মনস্টার'স ওয়ে, থ্যাংকস ফর ইয়োর কমপ্লিমেন্ট,রোজি-হ!”

★

অনুভূতির সাগরে উথাল-পাতাল ঢেউয়ের তালে তালে ক্ষণে ক্ষণে অস্তিত্বের তীরে আছড়ে পড়ছে চঞ্চলা চড়ুই! বেপরোয়া যুবকের লাগামহীন উন্মত্ততার সঙ্গে তাল মেলাতে এখনো অনভ্যস্ত সে। আজ অন্তরঙ্গতার প্রতিটি গভীর ছোঁয়ায় আগের মতো অতটা ভয়ডর না থাকলেও লজ্জায় যেন নিশ্বাস আটকে আসছে তার। আর তাতেই যেন স্নায়ুতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে থমকে যাচ্ছে মাহি।চোখের পাতায় লজ্জা আর ক্লান্তির মিশেল ঘনিয়ে আসতেই আরো একবার কেঁপে ওঠে সে। যুবকের দক্ষ ছোঁয়ায় মুহূর্তেই তার অধরের ফাঁক গলে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে একটুকরো শীৎকার। তাতেই যেন আরো এক ধাপ উন্মাদ হয়ে ওঠে মাফিয়া বিস্ট।

নিজের দুষ্টুমি অব্যাহত রেখেই রমণীর উদরের ত্বকে স্পর্শ করতেই টের পেল, মাহি তেমন একটা নড়াচড়া করছে না। অমনি রমণীর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য থেকে মুখ তুলে তাকাল রূঢ় মানব। সিক্ত ওষ্ঠে জিভ বুলিয়ে সন্দিগ্ধ কণ্ঠে আওড়াল,

“রোজি-হ! আছিস? নাকি আবারও টাল হয়ে গিয়েছিস?”

কথাটা শেষ হতেই মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিলো মাহি। লজ্জাকে আপাতত চুলোয় তুলে রেখে খেঁকিয়ে উঠল,

“চুপ করুন, নির্লজ্জ লোক!”

বাঁকা হাসল মুগ্ধ! ধীরলয়ে উঠে এসে নিজের ভার ছাড়লো রমণীর ওপর। তারপর মেয়েটাকে ইচ্ছে করে জ্বলাতন করতে, দেখিয়ে দেখিয়ে জিভের ডগা বুলিয়ে নিলো নিজের সিক্ত ওষ্ঠপুটে। তক্ষুণি মাহি নাক-মুখ কুঁচকে অন্যদিকে মুখ ফেরাতেই মুগ্ধ নিচু, হিসহিসে কণ্ঠে বলে উঠল,

“রোজি-হ! হোয়াই ইউ টেস্ট লাইক বাটার?”

গলার কাছে নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহি'র! লজ্জায় কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুনোর যোগাড়। তক্ষুনি দু'হাতে লোকটার রুক্ষ বক্ষভাঁজে ইচ্ছেমতো চাপড় বসিয়ে, দাঁত খিঁচে শুধালো,

“ অসভ্য, বেয়াদব লোক! মুখ সামলান আপনার।”

অলক্ষ্যে বাঁকা হাসছে মুগ্ধ। ধীরলয়ে হাত উঠিয়ে আনলো রমণীর তুলতুলে গালের ভাঁজে। অতঃপর সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

“ সিগনোরা-হ!”

তাকাল মাহি। সে কী ক্রুদ্ধতা সেই দৃষ্টিতে! মুগ্ধ এবার বিজ্ঞ বড্ড। হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ আজ যা কিছু হয়ে যাক, জ্ঞান হারাস না ওকে? তুই জ্ঞান হারিয়ে ফেললে আমি ফিল পাই না! ”

সহসা কপালের চামড়া কুঁচকে গেল মাহি'র!

“ প্রথমবার ৩দিন অজ্ঞান ছিলাম, তা আজকের পর কয়দিনের জন্য আমায় অজ্ঞান করে রাখার প্ল্যান আছে আপনার শুনি?”

নিম্নাংশের অধরকোণে দাঁত বসালো মুগ্ধ। গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধালো,

“ দ্যাট ওয়াজ ইয়োর ফার্স্ট টাইম, রোজি-হ! আ'ই ওয়াজ সো জেন্টেল বাট...”

“ জেন্টেল?”

আচমকা চিৎকার করে উঠল মাহি। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কয়েকপল! পরমুহূর্তেই নিজের হতভম্বতা কাটিয়ে উঠতে সন্দিহান কন্ঠে বলে উঠল,

“ আর ইউ সিরিয়াস বিস্ট? তিনদিন জ্ঞান ছিলো না আমার, তারপরও বলছেন আপনি জেন্টেল ছিলেন আমার সাথে?”

ঠোঁট উল্টায় মুগ্ধ! বলে,

“ হ্যাঁ! আ'ই ওয়াজ সো জেন্টেল, রোজি-হ! ইভেন আই ওয়াজ নট স্যাটিসফাইড।”

“ কি রাক্ষুসে ব্যাপার-স্যাপার রে বাবা! এই সরুন, সরুন। আপনি তো আমায় মে'রে ফেলবেন দেখছি!”

সরলো না মুগ্ধ। বরং দু'হাতে ঝাপটে ধরল মায়াবিনীকে। তার মাঝে ডুব দিতে দিতে ক্ষুব্ধ কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,

“ এটুকুতেই ম'রবি না এতো সহজে! তাছাড়া তুই ম'রলে আমায় সামলাবে কে?”

______________________________________

মখমলি গোলাকার বিছানাটার কাঠের কাঠামো থেকে ভেসে আসছে একের পর এক মড়মড় শব্দ! যেন আর কয়েক মুহূর্ত এমন চলতে থাকলেই নির্ঘাত ভেঙে পড়বে বিশালাকৃতির রাজকীয় খাটটা। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই মাফিয়া বিস্টের। নিজের উন্মত্ততায় চারপাশের পৃথিবীটাকেই যেন ভুলে বসেছে সে! মাহি অস্থির! চোখের কোটর বেয়ে গড়াচ্ছে নোনাজল। লজ্জা আর আতঙ্কে একাকার হয়ে, দূর্বল কন্ঠে প্রতিবাদ করল,

“ বিস্ট...”

সহসা মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা। কার্য বহাল রেখে মাহি'র কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ আর ইউ স্কেয়ার্ড দ্য বেড মাইট ব্রেক, হাহ?”

লজ্জায় চোখ মেলাতে পারলোনা মাহি। রূঢ় মানব ফের হাস্কিস্বরে বলে ওঠে,

“ সো হোয়াট, রোজি-হ? একটা খাটই তো! ভেঙে গেলে আরও হাজারটা কিনে দেব।”

“আপনি... আপনি একটা আ*স্ত পাগল, বিস্ট!”

উন্মত্ততার অভিলাষে কাঁপছে রূঢ় মানব। ঘর্মাক্ত তার সম্পূর্ণ দেহসৌষ্ঠব! শুকনো ঢোক গিলে, অধরকোণে জিভের ডগা ঠেলছে অনবরত। ঠিক তখনি, খাটের নিচ থেকে ভেসে এলো আরও একটা ভয়ংকর শব্দ।

“ কড়রর… মড়মড়!”

অতঃপর! অসহনীয় কার্যক্রম আর সইতে না পেরে বেচারা খাটটা ভেঙে পড়ল পরমুহূর্তেই। সঙ্গে সঙ্গে দু'টো প্রাণ একে-অপরের সনে লেপ্টে থেকে তলিয়ে গেল গহীনে। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় মাহি'র চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। তার ক্ষুদ্র দেহটা বড্ড আলতো করে নিজের দেহের আড়ালে আগলে রেখেছে মুগ্ধ। ফলস্বরূপ, ব্যথা পায়নি তার চঞ্চলা চড়ুই! তবুও হতবাকতায় মগ্ন হয়ে ফাঁপা ঢোক গিলে কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,

“মুগ্ধ! এটা আপনি কি করলেন? আপনি... আপনি..একটা আস্ত দৈত্য, মুগ্ধ!”

এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না মাফিয়া বিস্ট। পরক্ষণেই অট্টহাসিতে কেঁপে উঠল তার বুক। সে কী চমৎকার তার হাসি! যেন মুক্ত ঝরবে সে হাসি থেকে। মাহি বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো কেবল। মুগ্ধ সময় নিয়ে হাসি থামালো। ধীরেসুস্থে রমণীর ওপর থেকে উঠে এসে, পরপরই একটানে মায়াবিনীকে তুলে নিলো নিজ কোলে। ভয়ার্ত মাহি ঢোক গিলতেই সে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ওহ, সিগনোরা-হ! যেখানে প্রথম হ্যাংকি-প্যাংকিতে গোটা একটা বাসের অস্তিত্ব শেষ করে ফেলেছি, সেখানে এটা তো সামান্য একটা খাট! না ভাঙলে থোড়াই টের পাবি, তোর হাজবেন্ডের গরম ঠিক কতখানি।”

কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুনোর যোগাড় মাহি'র। চোখদুটো নত হতেই আচমকা তার পিঠ ঠেকলো কক্ষের তকতকে দেয়ালের সনে। তড়িঘড়ি করে রূঢ় মানবের কোমর জড়িয়ে ধরতেই সশব্দে বাঁকা হাসে মুগ্ধ! মাহি ভীত-সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে এবার বলেই বসল,

“ এবার ছেড়ে দিন, বিস্ট! আ'ম ঠু টায়ার্ড।”

মুখটা বড্ড নামিয়ে আনলেন মাফিয়া বিস্ট! রমণীর কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ বাট আ'ম হাংরি...রোজি-হ!”

_________________________________________

বিকেলের ম্লান আলোয় ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে আকাশ। দিনের অবসন্নতা মেখে চারপাশে নেমে এসেছে এক অলস নিস্তব্ধতা। অথচ চঞ্চলা চড়ুইয়ের ঘুম ভাঙলো কি-না এতক্ষণে!

ধীরেধীরে চোখের পাতা মেলে তাকালো মাহি। কয়েক মুহূর্ত ঘোরলাগা দৃষ্টিতে ছাদের দিকে চেয়ে রইল সে। মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঘুমের রেশ তখনো জড়িয়ে আছে। তবে পরক্ষণেই চারপাশের অপরিচিত পরিবেশে কপাল কুঁচকে এলো তার। এ তো তার নিজের কক্ষ নয়! তাহলে সে এখন কোথায়?

প্রশ্নটা মনে জাগতেই ধীরেসুস্থে উঠে বসার চেষ্টা করল বোকা মানবী। খানিক নড়েচড়ে বসতেই সমগ্র শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অসহ্য ব্যথার অনুভূতি। যেন শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধি প্রতিবাদ জানিয়ে উঠল একযোগে। দাঁতে দাঁত চেপে ধীরে ধীরে বিছানার কিনারায় সরে এলো সে। অতঃপর মেঝেতে পা নামিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই — এক অদ্ভুত ব্যথার জেরে ভারসাম্য হারিয়ে সোজা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল মায়াবিনী। বিস্মিত ভঙ্গিতে তক্ষুনি নিজের দিকে তাকাল সে, পাদু’টোয় হঠাৎ করে কি হলো? হাঁটতে পারছেনা কেনো সে?

অবোধ প্রশ্নে জর্জরিত হতেই তার মস্তিষ্কের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল গতরাতের একের পর এক দুঃসাহসিক মুহূর্ত। বেপরোয়া যুবকটার লাগামহীন পাগলামি, তার দুষ্টুমিভরা কণ্ঠস্বর, আর সেই নির্লজ্জ বাঁকা হাসি! মুহূর্তেই লজ্জায় কান থেকে গাল অবধি টকটকে লাল হয়ে উঠল মাহি'র। নিজেরই ভাবনার অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গিয়ে দুহাতে মুখ ঢাকতে উদ্যত হলো সে। অমনি মাঝপথেই দৃষ্টি আটকে গেল বাঁ হাতের ওপর। হাতটায় ক্যানুলা!

বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল মাহি। পরমুহূর্তেই যেন সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। দূর্বল হয়ে পড়ায় লোকটা বোধহয় আবারও স্যালাইন দিয়েছে তাকে। লাগামহীন পাগলামির বিপরীতে তার ওমন ছোটখাটো যত্নগুলোর অভিঘাতে অস্বস্তি কমতে শুরু করল রমণীর। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে, কোনোমতে নিজেকে সামলে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে।

★

শাওয়ারের শীতল জলের ধারা শরীরে জমে থাকা ক্লান্তি কিছুটা প্রশমিত করলেও, সর্বাঙ্গে ব্যথার রেশটুকু রয়ে গেল যথারীতি। শাওয়ার সেরে সদ্য বেরিয়ে এলো রমণী। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে রেখে পরনের পোশাক ঠিক করে নিলো আলগোছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনমতে এগোলো কক্ষের বাইরে।

তিনতলার সুবিশাল করিডোরের শেষপ্রান্তের কক্ষ থেকে বেরুলো মাহি। কপালে সন্দিগ্ধ ভাঁজ লেপ্টে ধীরলয়ে পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে দাঁড়াতেই যাবে অমনি পেছন থেকে ভেসে এলো সুপরিচিত একটি কন্ঠস্বর!

“ এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছো কেন তুমি? কি হয়েছে তোমার পায়ে?”

চট করে পেছন ফিরলো মাহি। সন্দিগ্ধ দৃষ্টি গিয়ে মুহুর্তেই আছড়ে পড়ল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরু এবং মিলার পানে। প্রশ্নটা বোধহয় নিরু করেছে, মেয়েটা কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এগিয়ে আসছে মাহি'র নিকট। সন্দিগ্ধ কন্ঠে আবারও জিজ্ঞেস করল,

“ কি হয়েছে তোমার পায়ে?”

কথা আঁটকে গেল মাহি'র! লজ্জায় পড়ল অস্বস্তিতে। ঠিক তখনি, তাকে এহেন লজ্জার অতলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে সেখানে আগমন ঘটল ডক্টর হায়া'র। পারস্য সুন্দরী এগিয়ে এসেই দাঁড়াল মাহি'র পাশে। নিরুর উদ্দেশ্যে দুষ্ট কন্ঠে বলল,

“ কি আর হবে? মনস্টার কাছে থাকলে বেচারির কি আর ঠিকঠাক মতো হাঁটাচলা করা সম্ভব? তাছাড়া... জিম করে যা বডি বানিয়েছেন রুশদী কিং, তা সামলাতেই তো বেচারির আত্মা উড়ে যাবার কথা। সেখানে ও তো এখনো বেঁচে আছে। এটাই বা কম কিসের?”

লজ্জায় হাসফাস করে উঠল মাহি! নিরুর অন্তঃকোণে চোট লাগল ভীষণ। ধরে এলো কন্ঠ। ছলছল দৃষ্টিজোড়া মাহি'র পানে তাক রেখে মোটা কন্ঠে শুধালো,

“ তোমার আর অধীর দা'য়ের মাঝে...সবকিছু হয়ে গিয়েছে?”

নিরুর মুখ থেকে কথাটা ছিনিয়ে নিলো হায়া। নিজেই দুষ্ট কন্ঠে বলতে লাগলো,

“ হয়ে গেছে কি-না, এ আবার কি কথা, বাঙালি মেয়ে? কিছু না হলেই কি আর সেবার ৩ দিনের জন্য, আর এবার ২দিনের জন্য অজ্ঞান থাকে বেচারি?”

“ ২দিন? আমি আবারও ২দিন সেন্সলেস ছিলাম?”

মাহি'র হকচকান কন্ঠে উপস্থিত তিন রমণীই স্তম্ভিত। হায়া মিটমিটিয়ে হাসলেও মিলা গম্ভীর! নিরু দৃষ্টি ঝুঁকিয়ে আড়াল করতে চাচ্ছে নিজ অশ্রুগুলো। হায়া কিছুক্ষণ মিটমিটিয়ে হেসে অতঃপর ডানহাতের দু-আঙুল উচিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“ হাহ! ২দিন। ২য় ছক্কায় আপনি ২দিন সেন্সলেস ছিলেন, রুশদী'স সিগনোরা! বলি...আপনি মানুষটাই বেশি দূর্বল? না-কি রুশদী বেশি রাফ? কোনটা?”

হাসফাস বেড়ে গেল মাহি'র। তৎক্ষনাৎ শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াল সে। কুঁচকান দৃষ্টিজোড়া হঠাৎ অদূরের গ্রাউন্ড ফ্লোরে নিবদ্ধ হতেই আচমকা দৃষ্টিপটে দৃশ্যমান হলো — রূঢ় মানবের সুশ্রী মুখমণ্ডল। যিনি আপাতত গ্রাউন্ড ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে মাহি'র পানে। চোখেমুখে উপচে পড়ছে দুষ্টমি! আচানক কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই ডানহাতের মধ্যমা আঙুলটা উঁচিয়ে দেখালো মুগ্ধ। অধরকোণে বেহায়া ভঙ্গিতে জিভ বুলিয়ে চোখ মা'রল মাহি'কে। মাহি ভড়কায়! দুষ্ট লোকটা ইশারায় বলে,

“ ফা'ক ইউ!”

মাহি দাঁত খিঁচল। চিড়বিড়িয়ে বলল,

“ অসভ্য!”

মুগ্ধ বাঁকা হাসলো এবার। একহাত চোয়ালের নিকট ঠেকিয়ে, আবারও চুমুর ভং দেখালো মেয়েটাকে। পরক্ষণে অন্যহাতের মধ্যমা এবং তর্জনীর দক্ষ ও দুষ্ট ভঙ্গিমা দেখিয়ে মায়াবিনীকে পুরোদস্তুর অপ্রস্তুত করে দিলো সে। মাহি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ল। তক্ষুনি সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যোত হতেই খোঁড়াতে লাগল তার পা। অসভ্য লোকটা ওসব দেখে এবার চেঁচিয়ে উঠল উচ্চকণ্ঠে,

“ সিগনোরা-হ! হোয়াই আর ইউ লিম্পিং? কি হয়েছে তোর?”

হুটহাট আকাশ ভেঙে পড়ল মাহি'র মাথার ওপর। দাঁত খিঁচল সঙ্গে! লোকটা কি অসভ্য! নিজে থেকে মেয়েটার এমন অবস্থা করে শেষে কি-না জিজ্ঞেস করছে — কি হয়েছে তার? মাহি আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। তক্ষুনি পা ছুটিয়ে চলে গেল নিজ কক্ষে।

_________________________________________

রাত আটটে বাজে বোধহয়!

মাত্র নিজের আগের কক্ষে ফিরে এসেছে মাহি। আবারও সুন্দর একটা রাজকীয় গোলাকার খাট বিছানো হয়েছে কক্ষে। দেখতেও দারুণ! রমণী চুপচাপ ভঙ্গিতে বসে আছে জানালার পাশের কাউচে। তাকিয়ে আছে আকাশপটে! ক্ষণকাল বাদেই তার হুঁশ ফিরলো — গার্ডেন থেকে ভেসে আসা বাইকের হর্ণে। তক্ষুনি সেদিকে নজর তাক করল মাহি। দেখল — নিজ কোয়াসাকি এইচটুআর বাইকটার ওপর বসে আছে মুগ্ধ। কালো লেদারের জ্যাকেটে আবৃত তার প্রশস্ত কাঁধ, ভেতরে বোধহয় পরা কালো বডি-ফিটিং টি-শার্ট, আর নিম্নাঙ্গে ডার্ক কার্গো প্যান্ট। হাতে কালো লেদার গ্লাভস, পায়ে ভারী বাইকার বুট! মাথায় ফুল-ফেস হেলমেট, যার গাঢ় ভাইজরের আড়ালে মুখাবয়ব সম্পূর্ণ আড়াল। গ্লাভস পরা ডানহাতটা উঁচিয়ে আচানক মাহি'র ধ্যান কেঁড়ে উচ্চকন্ঠে আওড়াল,

“ সিগনোরা-হ! কাম...”

কপাল গোছালো মাহি। সন্দিহান তার কন্ঠ!

“ কেন?”

তক্ষুনি দুষ্টমি ভর করল যুবকের মাথায়। আচমকা দু'হাতের আকারে ইশারায় রমণীকে বোঝালো — তাকে এনে বসাবে বাইকে, তার অভিমুখে। আর তারপর? অভিমুখে - পেছনে কোমর দোলাতে লাগলো অসভ্য লোক। মাহি ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল তা দেখে। এ নিয়ে দুবার ঘটল একই ঘটনা। প্রথমবার চুপ থাকলেও এবার মায়াবিনী চেচিয়ে বলল,

“ বিস্ট...দেখুন তোহ, বেচারা বাইকটা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল কি-না! আপনার যা জোর, হয়েও যেতে পারে। দেখুন, দেখুন! আরে চেক করুন না, অসভ্য লোক!”

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন