#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৭৫(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
“ বিস্ট...দেখুন তোহ, বেচারা বাইকটা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল কি-না! আপনার যা জোর, হয়েও যেতে পারে। দেখুন, দেখুন! আরেহ চেক করুন না, অসভ্য লোক!”
মাহি'র এমন আজগুবি বকবকানিতে চোয়াল শক্ত হবার বদলে অধর বাঁকিয়ে হেসে ফেলল মাফিয়া বিস্ট। অদ্ভুত এক দৈবাৎ শক্তির ভারে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে দু-হাত বাঁধলো বুকের কাছে। ফুল-ফেস হেলমেটের ডার্ক ভিসরটা ওপরে তুলে রাখা, ফলে দৃশ্যমান তার তীক্ষ্ণ বাদামি চোখদুটো। যা আপাতত নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে রমণীর পেলব মুখপানে। তার চঞ্চলা চড়ুইটার যতো বোকাসোকা কথাবার্তা! কথায় কথায় গাল ফোলানোতে সে কী সৌন্দর্য নিহিত, খিলখিল হাসির মাঝে নেই বিন্দুমাত্র ছলনা। এই সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের জন্যই বোকা মানবীটা বোধহয় আজ রুশদী কিংডমের অত্যন্ত নিকৃষ্ট রাজার রাণী! রুশদীর একমাত্র দূর্বলতা!
রূঢ় মানবের চোখদুটো যখন মাহি-তে নিবদ্ধ, ঠিক তখনি ওপরের জানালার কাছ থেকে পুনরায় খেঁকিয়ে উঠল মাহি।
“ কী হলো? ওভাবে ঘাড় উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? আমার কি রূপ বেরিয়েছে নাকি? ওভাবে চোখ দিয়ে আমাকে না গিলে, বরং বাইকটা চেক করুন, বিস্ট! আপনাকে দিয়ে বেচারা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে, সেই খুশিতে পুরো প্যালেসে মিষ্টি বিলাতে হবে তো! কত কাজ আমার!”
তৎক্ষণাৎ মুগ্ধের ওষ্ঠাধরে ছড়িয়ে পড়ল এক চিলতে মনোমুগ্ধকর হাসির রেশ। চড়ুইটার মস্তিষ্কে আদৌ বুদ্ধি নামক বস্তুর অস্তিত্ব আছে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান সে! মিটমিটে হাসির তোড়ে বাদামী ঠোঁটদুটো তার, খানিক নড়চড় করতেই অদূর থেকে ভেসে এলো রমণীর কৌতুহলী কন্ঠ,
“ আপনি হাসছেন নাকি, বিস্ট?”
সহসাই সুশ্রী মুখমণ্ডল থেকে হাসি হাসি ভাবটা উবে গেল মুগ্ধের। তার চিরাচরিত গম্ভীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এমন হাসি-হাসি ভাবস্রোত বড্ড বেমানান যেন। পরক্ষণেই নিম্নাধর দাঁতে চেপে হাসিটুকু আড়াল করল সে। মুখাবয়বে কপট গাম্ভীর্যের ছাপ টেনে গমগমে গলায় শুধালো,
“ স্টপ ইয়োর ফা'কিং বুলশিট গ্লুপায়া!”
“ আমি আবার কখন বুলশিট কথাবার্তা বললাম? যা সত্য তা বলতে গিয়ে পিছুপা হবার কোনো মানে নেই। আমিতো সবাইকে বলব, আপনার মতো একটা রাশিয়ান দামড়া নিজের উত্তেজনা সামলাতে না পেরে, নির্জীব একটা বাইককে প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দিয়েছে! ছিহঃ ছিহঃ এ কোন অকাল দেখতে হলো। আচ্ছা হে কি মে আন্ধি হুহ!”
বাকরুদ্ধ বনে গেল মুগ্ধ! অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কয়েকপল। মেয়েটা কি তার সঙ্গে মজা করছে? তার সামনে, স্বয়ং মাফিয়া শ্যাডো মনস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে হুটহাট এতো ফটফট করছে কি করে? মুগ্ধ চোয়াল শক্ত করল এপর্যায়ে। অন্তঃকোণে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো নিয়ে এলো ঠোঁটের ডগায়, দাঁত খিঁচে বলল,
“ মুখ সামলে কথা বল, বেয়াদব! মুখে যা আসছে, তাই বলে যাচ্ছিস! আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলার এতবড় স্পর্ধা দিয়েছে কে তোকে?”
ঠোঁট উল্টায় মাহি! মুখের সামনে হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার ন্যায় ভং ধরে, হামি টানলো মেকি! ভনিতাহীন কন্ঠে প্রতুত্তর ছুড়ঁল,
“ আমার হাজবেন্ড! মির্জা সায়ান মুগ্ধ।”
আচমকা থতমত খেয়ে বসল মাফিয়া বিস্ট! জিভের ডগায় রমণীর উদ্দেশ্যে দু'টো গালি এলেও পরক্ষণেই তা আওড়ে দিলো নিজের ওপর। দৃষ্টি নামিয়ে চিড়বিড় কন্ঠে বিড়বিড় করল,
“ ব্লা'ডি হেল! তুলতে তুলতে একদম মাথায় তুলে ফেলেছি, ঘাড়ত্যাড়াটাকে!”
“ বেইব!”
জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসা রিনরিনে নারী কণ্ঠস্বরটা কর্ণগোচর হতেই, না তাকানোর পণ করেও সুদর্শনের বেহায়া মনখানা উসকে উঠল একপলক তাকানোর দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায়। খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে অবশেষে আড়চোখে তাকাল সে। ব্যস! অমনি রমণীর অধরকোণে লেগে থাকা মুচকি হাসির তীরে বিদ্ধ হলো তার বক্ষপিঞ্জর!
এদিকে জানালার পাশে কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত রাখল মাহি। অধরে মিষ্টি হাসির রেখা টেনে আনমনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল বাইকটার ওপর। মুহূর্তেই তার অবচেতন মনের কোণে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল বহুদিনের এক সুপ্ত ইচ্ছে। খানিক দ্বিধায় জড়িয়ে বলল,
“ জানেন বিস্ট? আমার না...বাইকে চড়ে রাতের শহর ঘুরে দেখার ভীষণ ইচ্ছে! তবে...”
হুটহাট থেমে গেল মাহি। অথচ তার ওমন কথায় থমকায় মুগ্ধ! থমকায় রূঢ় মানবের সকল অগ্নিসম অভিব্যক্তি। দৃষ্টিতে শীতলতা লেপ্টে, ভারিক্কি গলায় আওড়ায় সে,
“ তবে?”
আহত হাসলো মাহি! তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি ঝুঁকিয়ে দু'ধারে আলতো করে নাড়ালো মাথা। ক্ষীণস্বরে জবাব দিলো,
“ কিছু না।”
মুহুর্তেই মুখমণ্ডল কঠোর হয়ে গেল মুগ্ধের। ইচ্ছেপূরণকারী এক দৈত্যের ন্যায় তৎক্ষণাৎ তৎপর হয়ে উঠল রমণীর দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে। গলা উঁচিয়ে শক্ত কন্ঠে ডাকল,
“ সিগনোরা-হ!”
চকিতে চোখ তুলে তাকাল মাহি। অপরদিকে, নির্বিকার চিত্তে হেলমেটের আবরণখানা সরিয়ে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করতে ব্যস্ত মুগ্ধ। খানিকবাদেই দৃশ্যমান হলো তার সুশ্রী মুখমণ্ডল। ঘাড় সমান বাবরিছাঁটা বাদামী চুলগুলো আজ উম্মুক্ত, হেলমেট খুলতেই এলোমেলো হয়ে ছিটকে এসেছে মুখের ওপর। গ্লাভস পরা ডানহাতটা দিয়ে চুলগুলো আলগোছে পেছনের দিকে ঠেলে দিলো মুগ্ধ। পুনরায় ঘাড় উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করল রমণীর পানে।কোনরূপ ভনিতা না করে শক্ত চোয়ালে শুধালো,
“ পাঁচমিনিট সময় দিচ্ছি, সিগনোরা-হ! ক্লজেট থেকে কমফোর্টেবল কিছু গায়ে জড়িয়ে, পছন্দমতো স্নিকার্স পরে চলে আয়।”
“ কিন্তু...”
মায়াবিনীর হকচকান কন্ঠে ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ। হাতের কব্জি উল্টে স্মার্ট-ওয়াচের দিকে দৃষ্টি তাক করে রাখা তার।
“ ইয়োর টাইম স্টার্টস নাউ!”
ভড়কে গেল মাহি। ঠোঁটের ডগায় আঁটকে গেল বাঁক। জানে, লোকটাকে বলেও আর লাভ নেই। তাইতো তড়িঘড়ি করে ছুটলো সে!
★
বরাদ্দকৃত সময় পেরিয়েছে মিনিট সাতেক আগেই। অথচ দ্য গ্রেট রুশদী কিং আজ স্বয়ং বাইকে হেলান দিয়ে ধৈর্যসহকারে অপেক্ষারত নিজ প্রেয়সীর, যিনি বরাবরই সময়ের অপচয় ঘৃণা করেন! কব্জিতে বাঁধা স্মার্টওয়াচটা বারংবার সময়ের অগ্রগতি জানান দিয়ে যাচ্ছে, যা ক্রমেই বিরক্তি বাড়াচ্ছে তাঁর। একপর্যায়ে অসহ্য বিরক্তিতে কব্জি থেকে একটানে ঘড়িটা খুলে ছুড়ে ফেললেন দূরে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে ঘাড় ফেরাতেই আচমকা থমকে গেল তাঁর দৃষ্টিজোড়া। অদূর থেকে ছুটে আসছে চঞ্চলা চড়ুই। পরনে কালো ড্যানিম জিন্স, সঙ্গে পরেছে ফুলহাতা কালো লেদার জ্যাকেট! একজোড়া আরামদায়ক সাদারঙের স্নিকার্সে বড্ড মানিয়েছে তার পাদু’টো, মাথার ওপর সাদা-কালো মিশেলের ফিটিং হেলমেট।
দ্রুত পায়ে বাইকের দিকে এগিয়ে আসতেই দুহাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাতে লাগলো মাহি। হাঁপিয়ে ওঠা কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,
“ সময়..সময়মত এসেছি না? খুব বেশি ওয়েট করিয়েছি আপনাকে?”
স্তম্ভিত রূঢ় মানব! বিমুগ্ধ তার দৃষ্টি। কাঠ পুতুলের ন্যায় মাথাটা সামান্য কাত করে আওড়াল,
“ নো, ইট'স ওকে!”
ক্ষণকাল বাদেই ধাতস্থ হলো মাহি। শিরদাঁড়া সটান করে অভিমুখে তাকাতেই এক বলিষ্ঠ হেঁচকা টানে ক্ষুদ্র দেহটা তার এগিয়ে এলো বড্ড। পরমুহূর্তেই রূঢ় মানবের দাম্ভিক ছোঁয়ায় রাঙা হলো বদন। হেলমেটের আড়ালে হরিণা চোখদুটো বিস্ময় নিয়ে তাকাতে গেলেই সম্মুখ থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের হাস্কিস্বর!
“ বেইব! এলিই যখন, তখন সঙ্গে করে ফায়ার ব্রিগেড আনলি না কেন?”
ভড়কে গেল মাহি! সন্দিগ্ধ তার কন্ঠ!
“ ফায়ার ব্রিগেড? কিসের ফায়ার ব্রিগেড? আগুন লেগেছে কোথায়?”
বলেই এদিক-ওদিক তাকালো বোকা মেয়েটা। ওমনি নির্মেদ কোমরে টান পড়ল ভীষণ। হকচকিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই মুগ্ধ ফের বলে,
“ এই আগুন সেই আগুন না রে রোজি-হ! এই আগুন কেবলমাত্র তোকে জ্বালানোর আগুন! যা আপাতত আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বইছে।”
যুবকের মোটা মোটা কথাগুলো বড্ড অনায়াসে বোধগম্য হলো মাহি'র। ওমনি হেলমেটের অন্তরালে ঢেকে থাকা পেলব মুখখানায় ছেয়ে গেল লজ্জার আভাস। মুগ্ধ ঘাড় ঝোঁকালো এপর্যায়ে। ফিসফিসিয়ে শুধালো,
“ চল বেইব! আজ তোকে রাতের সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহরটা ঘুরিয়ে আনি।”
তৎক্ষনাৎ আঁতকে উঠে মাহি। মানসপটে হুট করেই ভেসে উঠল মুগ্ধের সঙ্গে প্রথম বাইক রাইডের ভয়ংকরতম স্মৃতিগুলো। শঙ্কিত চিত্তে তক্ষুনি রূঢ় মানবের দৃঢ়বন্ধন থেকে মুক্তি পাবার আশায় মোচড়াতে লাগল শরীরটা। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে আওড়াল,
“ মাথা খারাপ আমার, যে আপনার মতো ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের সঙ্গে বাইক রাইডে যাবো? একবার গিয়ে জন্মের শিক্ষা হয়েছে। সে যাত্রায় বেঁচে ফিরতে পেরেছি তাই ভাগ্য। ছাড়ুন আমায়, যাবো না আমি আপনার সঙ্গে!”
কপাল গোছায় মুগ্ধ। মুখাবয়ব জুড়ে কঠিন ভাবস্রোত টেনে বলল,
“ডোন্ট বি সো আনরোম্যান্টিক, রোজি-হ! ভালোয় ভালোয় বলছি, বাইকে ওঠ। নয়তো বাইকটা এবার তোর ওপরে উঠবে। সো… চয়েস ইজ ইয়োরস!”
হঠাৎ থেমে গেল মাহি'র মোচড়ানো। ঘাড় উঁচু হলো পাহাড়সম লোকটার দিকে তাকাতে গিয়ে। ফাঁপা ঢোক গিলে ক্ষীণ কন্ঠে শুধালো,
“ ডিসিশন ফাইনাল তাহলে?”
“ অফকোর্স বেইব!”
এমন নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল মাহি। জোরপূর্বক নিজেকে ছাড়িয়ে পাদু’টো সম্মুখে বাড়াতে তৎপর হয়ে বলল,
“ ঠিক আছে। একটু ওয়েট করুন! ”
“ আবার কোথায় যাচ্ছিস, সিগনোরা-হ?”
থামলো মাহি! ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে জবাব দিলো —
“ নিজের ডেথ সার্টিফিকেটে সাইন করতে। শত হলেও, আপনার মতো একটা রাশিয়ান পাগ'লা ঘোড়ার সঙ্গে বাইক রাইড নামক মরণফাঁদে স্বেচ্ছায় যেতে হচ্ছে, পরবর্তীতে নিজের ডেথ সার্টিফিকেটে সই করার সুযোগ পাই কি না পাই! সেক্ষেত্রে আর রিস্ক নিতে চাচ্ছিনা।”
হতবিহ্বল ভাব ধরল মুগ্ধ! একমুহূর্ত লাগলো সেই ভাবটুকু কেটে যেতে। পরপরই দাঁত খিঁচে, শক্ত হাতে কোমর আঁকড়ে ধরল মাহি'র। এক হেঁচকায় টেনে এনে বসালো বাইকের ওপর। এহেন অতর্কিত কান্ডের অভিঘাতে হতভম্ব মাহি। অধর নাড়াবে তার আগেই, তার কোমরের দু'পাশে বাইকের ওপর হাত ঠেকিয়ে বড্ড ঝুঁকে এলো মুগ্ধ। চিড়বিড় কন্ঠে বলল,
“ তোর কি মনে হয় না? তুই ইদানীং বড্ড বেশি পাকনা হয়ে গেছিস, দেড়ব্যাটারী!”
অলক্ষ্যে গাল বাঁকায় মাহি। পাদু’টো শূন্যে ঝোলাতে ঝোলাতে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“ আমি মোটেও দেড়ব্যাটারী না, আপনিই বরং একটা রাশিয়ান দৈত্য!”
চোখদুটো তৎক্ষনাৎ সরু করে নিলেন মাফিয়া বিস্ট। একমুহূর্ত স্থির থেকে পরক্ষণেই চলে এলেন নিজ আসনে। সেখানে বসতে বসতে গমগমে গলায় হুকুম ছুঁড়লেন,
“ যতটা সম্ভব ততটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরবি! খবরদার, পড়ে গেলে মে'রে ফেলব তোকে!”
তক্ষুনি অভিমানে গাল ফুলে উঠল মাহি'র। লোকটা আদরও করবে, আবার ইনিয়েবিনিয়ে বকাও দিবে! এ কেমন আদর? লাগবে না এমন আদর তার। অভিমানের তোড়ে ভুলেও ধরলোনা মুগ্ধকে। মুগ্ধ একমুহূর্ত নির্বাক হয়ে দেখলো তা। পরক্ষণেই বাইকের ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে রাফলি একটা টান বসাতেই হঠাৎ সামনের দিকে অনিচ্ছায় ছিটকে এলো মাহি। আচমকা ক্ষুদ্র দেহটার তাল সামলাতে না পেরে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধকে। বেয়াদবটা বোধহয় অলক্ষ্যে হাসলো তা দেখে! দু'হাতে থ্রাটল ঘোরাতে ঘোরাতে দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ যখন-তখন আমার মতো হ্যান্ডসাম দেখলে গায়ের ওপর পড়ে যেতে ইচ্ছে করে, তাই না রোজি-হ? ইশশ্! কি নির্লজ্জ তুই।”
দাঁত খিঁচল মাহি! তক্ষুনি মুঠো শক্ত করে ধুম করে একটা ঘুষি দিয়ে বসল মুগ্ধের পিঠ বরাবর। চিড়বিড় কন্ঠে বলল,
“ চুপ করুন, অসভ্য লোক!”
____________________________________________
শহরজুড়ে জারি হয়েছে কঠোর লকডাউন। জনমানবহীন প্রধান সড়কটির দু’ধারে সারি সারি গাড়ির দীর্ঘ মিছিল থমকে আছে বহুক্ষণ ধরে। চারপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। মনস্টারের অনুচরদের কঠোর প্রহরা ডিঙিয়ে একটি গাড়িও মূল সড়কের দিকে এগোনোর অনুমতি পাচ্ছে না। অথচ এই মূল সড়কের সঙ্গেই আশেপাশের সকল ছোট-বড় শহরগুলোর যোগসূত্র। হুট করে কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়া কেন এভাবে রাস্তা আঁটকে দেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে সন্দেহ এবং কৌতূহলের শেষ নেই যাত্রীদের! তবে কেউই আগ বাড়িয়ে সাহস দেখালেন না বিষয়টা খতিয়ে দেখার। তাছাড়া দেখাবেনই বা কি করে? অদূরে প্রহরায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনদের পোশাকের গায়ে যে গোটা গোটা অক্ষরে দিয়ে রাখা — Shadow Monster's সিগনেচার সাইন!
রাত্রির প্রথম প্রহর কেবল শেষ হলো বলে! ঠিক তখনি, মনস্টারের বাধ্য অনুচরেরা নিজেদের অস্ত্র উঠিয়ে তাক করলেন প্রত্যেকটি গাড়ির দিকে। উচ্চকণ্ঠে আদেশ ছুঁড়লেন,
“ এভরিওয়ান, হেড ডাউন। মনস্তার ইজ কামিং!”
মনস্টারের আগমনী সংকেত পাওয়া মাত্রই প্রত্যেকে গাড়ির ভেতরে ঝুঁকিয়ে ফেললেন নিজেদের মাথা। বাধ্য অনুচরেরা নিজেরাও শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। ততক্ষণে জনশূন্য রাজপথের বুক চিরে হঠাৎ ধেয়ে বাইকের ভ্রুম ভ্রুম শব্দ। খানিকবাদে মূল সড়কে বড্ড দাপটের সাথে আগমন ঘটল দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের বইকটার!
মাহি'র জন্য আজ প্রথমবার বাইকের গতি বড্ড কমিয়ে এনেছে সে। তবুও মায়াবিনীর কাছে তা যেন খুব বেশি। পেছন থেকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে মুগ্ধের পেট। চোখদুটো কুচকে মুখ লুকিয়েছে মুগ্ধের বলিষ্ঠ পিঠের আড়ালে। কিছুটা পথ এগোতেই হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
“ বিস্ট! আরেকটু আস্তে চালান না!”
কপাল গোছালো মুগ্ধ! অনিচ্ছায় আরও খানিকটা কমিয়ে দিলো বাইকের গতি। তাতেই যেন সাহস ফিরে পেল মাহি। ধীরে ধীরে মুগ্ধের পেট থেকে হাতের বাঁধন আলগা করে দিতেই দেহে লাগলো দোল! বহুদিনের সুপ্ত ইচ্ছে থেকে আজ হঠাৎ এক ঝটকায় সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো দু’হাত দু’দিকে প্রসারিত করে, বাতাসের তালে তালে দুলতে লাগলো মাহি। বাইকের গতির তীব্রতায় আজ আর ভয় লাগছে না তাঁর। বরং পাখির মতো উড়তে চাওয়ার উচ্ছ্বাসে আচমকা বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
“ আ'ই লাভ ইউ, মনস্টার! আই লাভ ইউ মোর দ্যান মা'ই লাইফ! আ'ই লাভ ইউ সো মাচ, মা'ই ব্লাডিবিস্ট! ডু ইউ লাভ মি, বিস্ট? টেল মি, ডু ইউ লাভ মি অধীর রায়?”
রমণীর এহেন উচ্ছ্বাসে ঠোঁট পিষে হাসলো মুগ্ধ। বাইকের সামনের আয়নায় চোখ রাখতেই দৃশ্যমান হলো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উচ্ছল রমণীটির প্রতিবিম্বে। হাতদুটো দক্ষতার সনে থ্রাটল ঘোরাচ্ছে তার, অথচ চোখদুটো একমনে দেখে যাচ্ছে মাহি'কে। খানিকক্ষণ বাদেই আপনমনে বিড়বিড় করল মুগ্ধ,
“ এন্ড আই ডু মোর দ্যান ইউ কুড এভার ডু, প্রিয়তমা-আহ!”
____________________________________________
রাতের বুক চিরে বাইক রাইডে কখন যে ভোরের আগমনী বার্তা এসে পৌঁছে গেছে ধরণীতে, সেদিকে খেয়াল নেই রুশদী প্রেমিকযুগলের। চারপাশে তখনো আবছা অন্ধকারের আবরণ। নিস্তব্ধতা ভেদ করে প্যালেসের সুবিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরের প্রশস্ত ওয়াকওয়ে ধরে ছুটে চলল মুগ্ধের বাইকটা।
পেছন থেকে মুগ্ধকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে মাহি। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে যেন চঞ্চলা চড়ুইয়ের সমস্ত চঞ্চলতা উধাও। অবশেষে প্যালেসের সম্মুখদ্বারের সন্নিকটে এসে থামল বাইকখানা। অথচ নড়াচড়ার নামটুকুও নেই ক্লান্ত মাহি'র। তার ওমন নিস্তব্দতা দেখে থ্রটলের ওপর হাত রেখেই আলতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকাল মুগ্ধ। মৃদু স্বরে ডাকল,
“বেইব?”
প্রতুত্তরে মাহি'র কণ্ঠে ভেসে এলো কেবল অস্ফুটস্বর,
“হুম!”
অধরকোণে মৃদু হাসি ফুটল মুগ্ধের। স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
“উই'আর হোম, বেইব!”
কথাটা কর্ণগোচর হতেই ধীরে ধীরে শিথিল হলো মুগ্ধকে ঘিরে রাখা মাহি'র হাতের বাঁধন। তৎক্ষনাৎ বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল মুগ্ধ। অতঃপর মুহূর্তের বিলম্ব না করে একহাতে পাঁজাকোলে তুলে নিলো প্রেয়সীকে। আকস্মিকতায় সামান্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই দু’হাতে মুগ্ধের বলিষ্ঠ গলাটা আলতো করে জড়িয়ে ধরল মাহি। ক্লান্ত মুখখানা নিশ্চিন্তে এলিয়ে দিলো তার কাঁধে। খানিকক্ষণ মৌন থাকতেই হুট করে দুষ্টুমি ভর করল মায়াবিনীর মাথায়। চটপট মুখ তুলে, মুগ্ধের ক্লিনশেভড গালের ভাঁজে আঙুল বুলিয়ে দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ হেই হেন্ডসাম! দ্য মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার, চলুন প্রেম করি!”
প্রেয়সীকে বুকে আগলে নিয়ে প্যালেসের সম্মুখদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন মাফিয়া বিস্ট। অমনি রমণীর দুষ্ট কন্ঠের বিপরীতে হাসলেন বাঁকা। শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ তাই না-কি বেইব? প্রেম করবা? তাহলে চলো.. বেডে যাই। আমার আবার বেডে না গেলে প্রেম প্রেম ফিল আসে না। ইউ নো দ্যাট রাইট?”
ঠোঁট কামড়ে হাসছে মাহি। তক্ষুনি কপট সর্তক ভাবভঙ্গি ধরে ক্ষীণ করল কন্ঠস্বর,
“ নাহ! আমার হাজবেন্ড আশেপাশেই আছে। ধরা পড়ে গেলে প্রবলেম হবে। তাই এখানেই প্রেম করব! চলুন, শুরু করুন। মিষ্টি করে কথা বলুন আমার সঙ্গে।”
রমণীর কথাটা শেষ হতে না হতেই দুষ্ট কন্ঠে আওড়াল মুগ্ধ,
“ ওসব লুকোচুরি প্রেম-পিরিতি আমাকে দিয়ে হবে না-রে চাশমিস! দরকার পড়লে তোর হাজবেন্ডের সামনেই তোর সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করব! তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে হ্যাংকি প্যাংকি করব। প্রয়োজন পড়লে তাকে লাইভ শিখিয়ে দিবো, কিভাবে তোকে স্যাটিসফাইড করতে হয়! ওকে?”
লজ্জায় পড়ার বদলে অবাক হলো মাহি! তক্ষুনি দু'হাতে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধের গাল। জোরপূর্বক নিজের দিকে মুগ্ধের সুশ্রী মুখটা ঘুরিয়ে এনে বলতে লাগলো,
“ এতো সাহস আপনার? আমার স্বামীর সামনে এসব করবেন? চেনেন আমার স্বামী কে?”
কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফুটলো রূঢ় মানবের। চোয়াল হলো শক্ত!
“ কোন জায়গার তিসমার খাঁ তোর বা*লছিড়ুঁ হাজবেন্ড, শুনি? যাকে চিনতে হবে আমার?”
আলতো হাসে মাহি। মুখ বাড়িয়ে নিজ গালটা আলতো করে ঘষে দিলো মুগ্ধের গালের সনে। ফিসফিসিয়ে শুধালো,
“ লোকে তাকে শ্যাডো মনস্টার বলে ডাকে,কেউ কেউ রুশদী কিং-ও বলে। কেউ আবার অধীর রায় বলে।”
“ আর তুই কি বলে ডাকিস?”
যুবকের সন্দিগ্ধ প্রশ্নে গভীর হলো মায়াবিনীর দৃষ্টি। কন্ঠে এলো প্রগাঢ়তা।
“ আমার ব্লাডিবিস্ট! মির্জা সায়ান মুগ্ধ!”
তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সংকুচিত হলো মুগ্ধের। কপট রাগী কন্ঠে আওড়াল,
“ তোর দেখছি সাহস কম নয়, রোজি-হ! আমার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাজবেন্ডকে ‘ আমার ’ বলে ডাকছিস!”
মাহি আবারও মুখ লুকলো মুগ্ধের বলিষ্ঠ কাঁধে। ভনিতাহীন কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ কি আর করব বলুন, পাগলটাকে ভালোবেসে ফেঁসে গেছি যে!”
সহসা হাতের বাঁধন দৃঢ় করল রূঢ় মানব। চড়ুইয়ের কানের কাছে ঠেকালো মুখ! হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ ওহ আচ্ছা! এ বাত। না থাক, সমস্যা নেই। দিনের বেলা নাহয় হাজবেন্ডকে ভালোবাসিস, আর রাতের বেলা — আমাকে! তারপর দু'জন একসঙ্গে বেড ভাঙবো, ওকে বেইব?”
লজ্জালু ভঙ্গিতে হেসে ওঠে মাহি। মুগ্ধের পাদু’টো অগ্রসর। গ্রাউন্ড ফ্লোরের এলিভেটরে ঢুকেই তিনি আঙুল চাপলেন বোতামগুলোয়। এলিভেটরের দুয়ার তখনো খোলা। ক্লান্ত মাহি'র হুট করে আবার কি হলো কে জানে! তক্ষুনি জোরপূর্বক নেমে গেল মুগ্ধের কোল থেকে। দু'হাতে আলতো করে খুলে নিলো মাথার হেলমেটটা। মুগ্ধও একইভাবে খুলে নিলো নিজের হেলমেট। অতঃপর দু-প্রেমিকযুগলের তিতিক্ষায় ভরা দৃষ্টিজোড়া একে-অপরের পানে গভীরভাবে নিবদ্ধ রইলো কিছুক্ষণ। অধৈর্য্য বেপরোয়া যুবকটার ধৈর্য্যসীমা বড্ড কম। এলিভেটরের দুয়ার প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার আগেই এক হেঁচকায় রমণীর নরম কোমরটা টেনে আনলো নিজের কাছে। ভীষণ অধৈর্য্য হয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে আচমকা আঁকড়ে ধরল মায়াবিনীর কোমল ওষ্ঠাধর! মাহি বাঁধ সাধল না। নিজেও ডুবলো বেপরোয়া যুবকের লাগামহীন উন্মত্ততায়।
★
এলিভেটর স্টাক্ড! অথচ এলিভেটরের ভেতরে নিজেদের লাগামহীন উন্মত্ততায় ভেসে বেড়াচ্ছে তারা। রমণীর দশা বড্ড এলোমেলো। সিল্কি চুলগুলো যেন নিখাঁদ কোনো পাখির বাসা। অন্যদিকে, ক্ষ্যাপাটে লোকটা উম্মাদ বনেছে। রমণীর তুলতুলে দেহটা তুলে রেখেছে কোলে। পড়ে যাবার ভিন্ন আশঙ্কায় ভয়ার্ত মাহি'র দু-পা গিয়ে ঠেকেছে রূঢ় মানবের নির্মেদ, ভি-শেইপের কোমর ঝাঁক বরাবর।
উন্মত্ততায় ডুবে মাহি'র সুকোমল কন্ঠনালীর ত্বকে মুখ ডুবিয়েছে মুগ্ধ। ধারালো দাঁতের রুষ্ট ছোঁয়ায় কোমল ত্বকের চামড়ায় নিজের রূঢ় উপস্থিতির ছাপ ছাড়ছে সুনিপুণভাবে। মাহি পা-গলপ্রায়! আবেশে দু-চোখ বুঁজে কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াচ্ছে,
“ আ'ই... আ'ই লাভ ইউ, বিস্ট! প্লিজ..টেল মি, ইউ লাভ মি টু!”
শক্ত ঢোক গিললো মুগ্ধ! ঘামছে তার সর্বাঙ্গ! সোজাসাপ্টা প্রতুত্তর দেবার বদলে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“মাই ফা'কিং হার্ট বিটস ফর ইউ, সিগনোরা-হ! ইজন্ট দ্যাট এনাফ ফর ইউ?”
__________________________________________
সময় বয়ে চলে নিজস্ব ছন্দে। দেখতে দেখতে রুশদী দম্পতির খুনসুটিময় দাম্পত্যের এক মাস পূর্ণ হতে বাকি আর মাত্র তিন দিন। এই ক’দিনেই মুগ্ধের পেন্টহাউজে পাকাপাকিভাবে ঠাঁই হয়েছে মাহি'র। রুশদী'স সিগনোরা বলে কথা, তার সামান্যতম আবদার পূরণেও চারপাশে সদা প্রস্তুত অগণিত মেইড। আর মুগ্ধ? প্রেয়সীকে আগলে রাখার ক্ষেত্রে যেন ভুলেই বসেন — তিনি দ্য গ্রেট রুশদী কিং ওরফে মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার। চঞ্চলা চড়ুইয়ের নিখুঁত যত্নে রাখছেনা একটুখানিও ত্রুটি। ইদানীং ভাব নিচ্ছেন এমন, যেন নিজ পায়ে দু’কদম হাঁটতে গেলেও চোট পেয়ে বসবে মেয়েটা! পারেনা যখন-তখন তুলোর বস্তার ন্যায় প্রেয়সীকে কাঁধে তুলে হাঁটতে।
★
আজ আকাশটা বড্ড মেঘাচ্ছন্ন! অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কাজে স্পেনের উদ্দেশে রওনা দেবে মুগ্ধ। সেই সুবাদে পেন্টহাউজের বোর্ড মিটিং রুমে বসে এডউইন ও অ্যালেক্সের সঙ্গে জরুরি কিছু বিষয়ে শলাপরামর্শে মত্ত সে। সামনের মার্বেলের টেবিলজুড়ে ছড়ানো প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আলোচনায় উঠে আসছে ব্যবসায়িক নানা হিসাব-নিকাশ। ঠিক তখনি, কোনো রকম আগাম বার্তা কিংবা অনুমতির তোয়াক্কা না করে গটগটিয়ে বোর্ড মিটিং কক্ষে প্রবেশ করল মাহি।
প্রেয়সীকে দেখামাত্রই থেমে গেল রূঢ় মানবের সকল আলোচনা। এডউইন ও অ্যালেক্স পরস্পরের দিকে একপলক তাকিয়ে, যথাতথা নত মুখে কক্ষ ত্যাগ করল। রুশদী কিংয়ের ব্যক্তিগত পরিসরে রুশদী'স সিগনোরার আগমন যে কখনোই অনধিকার প্রবেশ বলে গণ্য হয় না! তা তারা ভালোই জানে।
এদিকে, মাহি'কে দেখে নিজ আসনে সামান্য নড়েচড়ে বসল মুগ্ধ। কপালটায় সূক্ষ্ম সন্দেহের ভাঁজ টেনে গভীর দৃষ্টিতে আপাদমস্তক পরোখ করল রমণীকে। অতঃপর গম্ভীর অথচ পরিচিত সুরে ডেকে উঠল,
“ সিগনোরা-হ!”
কোনো প্রত্যুত্তর নেই মাহি'র! নীরবে পা বাড়িয়ে এগিয়ে এলো সে। মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তিত অভিব্যক্তি নেই, চোখেমুখে চিরচেনা চঞ্চলতার লেশমাত্রও অনুপস্থিত। এমন নীরব, গম্ভীর রমণীকে দেখে মুগ্ধের সংশয়ের শেষ নেই। সে কাছে আসা মাত্রই আর মুহূর্তকাল অপেক্ষা না করে, বলিষ্ঠ বাহুর একটিমাত্র টানে মাহি'কে নিজের ঊরুর ওপর বসিয়ে নিলো মুগ্ধ। অতঃপর রমণীর থুতনিতে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে মুখখানা সামান্য উঁচু করে তুলতেই তার মন খারাপগুলো ধরা খেলো যেন। দুর্ধর্ষ মাফিয়া সম্রাটের কঠিন মুখাবয়বে মুহূর্তেই নেমে এলো এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কন্ঠেও ছুঁয়ে গেল তার রেশ!
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড লেডিবাগ? মন খারাপ কেনো তোর? কিছু লাগবে?”
আলতো করে দু'ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। তা দেখে আবারও অস্থির কন্ঠে আওড়াল মুগ্ধ!
“ কেউ কিছু বলেছে আমার চড়ুইকে?”
এবারেও নিঃশব্দে মাথা নাড়ায় মাহি! মুগ্ধের অস্থিরতা বাড়লো বৈ কমলো না। তক্ষুনি চোয়াল শক্ত করে দাঁত খিঁচতেই যাবে ওমনি রমণীর রিনরিনে কন্ঠ প্রবেশ করল তার কর্ণকুহরে।
“ মাথাটা সকাল থেকে ঘোরাচ্ছে, বিস্ট!”
মুহুর্তেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মুগ্ধের মাথার ওপর। ব্যাকুলতায় উচ্চ হলো কন্ঠ!
“ হোয়াট? সকাল থেকে মাথা ঘোরাচ্ছে আর তুই আমায় এতক্ষণে বললি? চল...চল..প্যালেসে চল। এক্ষুণি সব ডক্টরদের তুলে নিয়ে আসবো প্যালেসে।”
যুবকের এমন উদ্বিগ্নতায় হঠাৎ করেই মেজাজ খিচঁল মাহি'র। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটিয়ে আওড়াল,
“ আরেহ! সামান্য মাথা ঘোরানোর জন্য ডক্টরদের তুলে আনতে হবে কেন? তা সেরে যাবে একটু শুয়ে থাকলে। আমার আসলে মাথা ঘোরানোর চাইতেও ভীষণ বমি বমি পাচ্ছে!”
হাসফাস বেড়ে গেল মুগ্ধের! রমণীর ক্ষুদ্র অসুস্থতার কথা শুনে উদ্বিগ্নতায় কাঁপছে তার চোয়াল। তক্ষুনি দু'হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে,
“ এডউইন! এডউইন!”
এক ডাকেই ছুটে এলো এডউইন। নতমুখে দুয়ার পানে দাঁড়াতেই রূঢ় মানব গর্জে উঠলো,
“ তাড়াতাড়ি প্যালেসে ডক্টরদের তুলে নিয়ে আয়। আমার রোজি-হ অসুস্থ!”
তৎক্ষনাৎ মুগ্ধের বুক থেকে মাথা তুললো মাহি। অনিহায় নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
“ না না! ডক্টর লাগবেনা, বিস্ট। আমার..আমার কেন যেন ইদানিং দূর্বল লাগে নিজেকে। অথচ আমি সারাক্ষণ শুয়ে-বসে থাকি। তারপরও কেন এমন লাগছে বুঝতে পারছিনা।”
আবারও অস্থিরতার মাত্রা বাড়লো মুগ্ধের। উম্মাদের ন্যায় হাত চাপলো মাহি'র দুগালে।
“ কেন, কেন? দূর্বল লাগছে কেন? ঠিকঠাক মতো খাচ্ছিস না তুই?”
মুখ নামালো মাহি। গাল ফুলিয়ে বলল,
“ কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করে না, বিস্ট!”
কথাটা শুনতেই যেন তরতর করে রাগ বেড়ে গেল মুগ্ধের। ঘাড় বাকিয়ে অগ্নিদৃষ্টে তাকাল এডউইনের দিকে। একপ্রকার বজ্রকঠিন হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ এডউইন! ঐ শেফ বাস্টা'র্ডগুলোকে ধরে নিয়ে আয় এক্ষুণি! আজকে ওরা হবে আমার সুইটিদের খাবার। জানো***য়ারের বাচ্চাদের কতবড় সাহস, বিস্বাদ রান্না রাঁধে! যা আমার সিগনোরা খেতে পারছেনা। ওদের আন, সব-কয়টাকে ধরে গরম তেলে চু-বা-বো আমি! নিয়ে আয় ওদের।”
লোকটার এরূপ পাগলামিতে অতিষ্ঠ মাহি। হুটহাট মুড সুইং হচ্ছে তার। মেজাজ খিচেঁ আবারও বলল,
“ থামুন না বিস্ট! তারা খারাপ রাধঁছে না। আসলে আমারই কোনকিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। আমার ইদানীং.. শুধু টক খেতে ইচ্ছে করছে। টক জাতীয় কিছু একটা এনে দিন না, ক্ষুধা পেয়েছে আমার।”
তক্ষুনি উদ্বিগ্ন হলো রুশদী কিং। প্রেয়সীর আবদার মেটাতে তৎপর সে।
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ! এক্ষুণি আনছি। টক জাতীয় কি খাবে আমার চড়ুইটা? সব নিয়ে আসবো আমি। দরকার পড়লে গাছসহ তুলে নিয়ে আসবো, তারপরও আমার চড়ুইয়ের জন্য সব টক জাতীয় ফল নিয়ে আসবো, ওকে? আমি যাচ্ছি, এইতো আমি যাচ্ছি!”
বলেই মাহিকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হলো মুগ্ধ। কিন্তু মাঝপথেই থমকে গেল সে। বিচক্ষণ মস্তিষ্কে আচমকা উঁকি দিল ভিন্ন এক আশঙ্কা। ক্ষণকাল ঘাড় বাকিয়ে প্রেয়সীর মুখপানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে। অতঃপর আকস্মিকই বলিষ্ঠ হাতে আলতো করে আঁকড়ে ধরল মাহি'র চোয়াল। মুগ্ধের এমন আকস্মিক আচরণে ভড়কে গেল রমণী। মুগ্ধ তখন সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল—
“ তোর শেষ ওভুলেশনের সময়টা ছিল বারো দিন আগে। পিরিয়ড হওয়ার কথা আগামী মাসের তিন তারিখ, অর্থাৎ এখনও ছয় দিন বাকি। তোর ওভুলেশনের সময় আমি তোকে যে কন্ট্রাসেপ্টিভ পিলস দিয়েছিলাম, সেগুলো ঠিকমতো খেয়েছিলি তো?”
মুহুর্তেই বিস্ফোরিত হলো মাহি'র চোখ! ঢোক গিললো শক্ত। কল্পনার মানসপটে হুট করেই ভেসে উঠল সেদিনগুলোর কথা। মুগ্ধ কাজের চাপে সেবার ঠিকমতো নিজ হাতে খাবার এবং ঔষধগুলো খাইয়ে দেইনি তাকে। যার দরুন অভিমানে নাক ফুলিয়ে খাবার এবং ঔষধগুলো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল রমণী। পরপর তিনদিন খায়নি ঔষধগুলো!
কথাগুলো মনে পড়তেই চোরের মতো কাচুমাচু করতে লাগলো মাহি। সম্মুখের সন্দিগ্ধ মানব বলিষ্ঠ হাতে সামান্য জোর বাড়িয়ে পুনরায় ক্ষুব্ধ কন্ঠে শুধালো,
“ কথার উত্তর দে, সিগনোরা! ডিড ইউ হেভ দ্যাট পিলস?”
ভীতসন্ত্রস্ত মাহি তৎক্ষণাৎ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল, যা মুহূর্তেই প্রশমিত করল রূঢ় মানবের উত্তপ্ত রুক্ষতা। আলগোছে তার চোয়াল ছেড়ে আসন ছাড়তে উদ্যত হতেই মুগ্ধের বুকের টি-শার্টের খানিকটা খামচে ধরল মাহি। থমকে দাঁড়াল মুগ্ধ। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতেই মাহি আক্ষেপমাখা সুরে আওড়াল,
“ কবে একটু স্বাভাবিক হবেন, বিস্ট? কবে আমরাও বাদবাকি সাধারণ কাপলদের মতো সুন্দর করে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে সংসার করতে পারব? বলুন না বিস্ট..আদৌও আপনার সঙ্গে আমার সংসার হবে তো? আপনি হয়তো আন্দাজও করতে পারবেন না বিস্ট, আপনার সঙ্গে পরিপূর্ণ সংসার করার লোভ আমার ঠিক কতখানি।”
মায়াবিনীর এহেন আক্ষেপ যেন তীরের ফলার ন্যায় বিদ্ধ হলো মুগ্ধের অন্তঃকোণে। জ্বলতে লাগলো বুক। তৎক্ষনাৎ নিজ আসনে বসে আলতো করে বুকের সনে জড়িয়ে ধরল মাহি'র ক্ষুদ্র মাথাটা। পিঠের ত্বকে হাত বুলিয়ে কোমল কন্ঠে শুধালো,
“ আমরা তো সংসার করছি, সিগনোরা-হ!”
মুগ্ধের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ফোপাঁচ্ছে মাহি। হেঁচকি তুলে বলছে,
“ এগুলোকে পরিপূর্ণ সংসার বলে না, বিস্ট! আমি চাই আপনার পুরো সময়ের অর্ধেকটা শুধুমাত্র আমার নামে থাকুক। আমি চাই, সাধারণ মানুষের মতো আপনার আমার সংসার হোক। এসব অতিরিক্ততা, বাড়াবাড়ি আমার আর ভালো লাগে না।”
মুগ্ধ নির্বাক হয়ে শুনলো সব। ধীরলয়ে রমণীর পিঠে হাত বুলিয়ে আচমকা শুধালো,
“ সত্যিই আমার সঙ্গে সংসার করতে পারবি, সিগনোরা-হ?”
তক্ষুনি রুক্ষ বুক থেকে মাথা তুললো মাহি। খামচে ধরল মুগ্ধের বুকের একাংশ। বড্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“ পারবো! বেশ পারবো।”
আলতো হাসে মুগ্ধ। চঞ্চলার মাথার ওপর শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,
“ ফাইন! ফিরে এসেই তাহলে তোর আর আমার সংসার হচ্ছে, চাশমিস। কিভাবে, কি কি করবি তা নাহয় লিষ্ট করে রাখিস, হুম? তোর মন মতো করে তোর সঙ্গে সংসার করলে আর কোনো আক্ষেপ থাকবেনা তো, আমার চড়ুইয়ের?”
অবিশ্বাস্যতা জেঁকে ধরল মাহি'কে। খানিকবাদে ছলছলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে, সন্দিহান কন্ঠে আওড়াল,
“ সত্যি তো? পরে আবার ভুলে যাবেন না তো কথাটা? আমায় ছুঁয়ে কথা দিন।”
বলেই মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতটা নিজ মাথার ওপর টেনে আনলো মাহি। মুগ্ধের দৃষ্টি নিষ্পলক! কন্ঠে বড্ড গাম্ভীর্যের ছাপ,
“ তোকে ছুঁয়ে আজ অব্ধি মিথ্যে বলেছি বলে মনে পরছেনা, চাশমিস! যাকগে, স্পেন থেকে ফিরে এলেই তোর আর আমার সংসার হবে। একটা ছোট্ট সংসার!”
প্রসন্ন হাসলো মাহি। কিয়তক্ষন নীরব থেকে আলগোছে নেমে গেল মুগ্ধের কোল থেকে। পাদু’টো সামান্য বাড়িয়েছে মাত্র, অমনি আবার কি মনে করে ঘুরে দাঁড়াল মাহি। হুট করে বলে উঠল,
“ না গেলে হয়না, বিস্ট!”
নথিপত্রে বুলতে থাকা আঙুলগুলো হুটহাট থেমে গেল মুগ্ধের। পেছনের আসনটায় পরক্ষণেই এলিয়ে দিলো গা। ধীরলয়ে মাহি'র পানে বাহাতটা বাড়িয়ে, শান্ত গলায় শুধালো,
“ তুই না বললে, যাবো না!”
চঞ্চলা চড়ুইয়ের মন বিশাল। তক্ষুনি মুগ্ধের কাছে ছুটে এসে বিজ্ঞ কন্ঠে আওড়াল,
“ না থাক! যান আপনি। না গেলে তো আবার সংসার করবেন না।”
না চাইতেও হেসে ফেলল মুগ্ধ। মাহি'কে একহাতে জড়িয়ে, তার বুকে পরম শান্তিতে রাখল মাথাটা। ক্ষীণস্বরে বলল,
“ সে নাহয় যাবো...বাট নাউ আ'ম হাংরি!”
★
সময় গড়ালো.....
স্পেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন মাফিয়া বিস্ট। ব্যক্তিগত বিলাসবহুল প্রাইভেট জেটটি ইতোমধ্যেই টেক অফ করেছে। অথচ সুবিশাল আকাশপথ পেরিয়ে গন্তব্যের দিকে ধাবিত হওয়া মানুষটির সমস্ত মনোযোগ জুড়ে কেবলই তার ব্যক্তিগত নারীর অস্তিত্ব! বিমানের গুঞ্জন ছাপিয়ে তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রেয়সীর ভাবনা। যেন মাইলের পর মাইল দূরত্বও তাকে মাহি'র চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অক্ষম।
★
প্যালেসের নিজস্ব কক্ষটিতে নিঃসঙ্গ বসে আছে মাহি। জানালার পাশের নরম কাউচটায় শরীর এলিয়ে দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বহুদূরের আকাশপানে। তার বুকচিরে ক্ষণে ক্ষণে বেরুচ্ছে দীর্ঘ নিশ্বাস। ঠিক তখনি, কোথা থেকে যেন একটা সাদা কবুতর উড়ে এসে বসল জানালার কার্নিশে। আকস্মিক তার উপস্থিতিতে চমকে উঠল মাহি। বিস্ফারিত চোখে তাকাল পাখিটার দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল তার। এই প্যালেসের আসার পর থেকে এর আগে কোনদিন কবুতর দেখেনি সে। তাহলে আজ হঠাৎ এই কবুতর এলো কোত্থেকে?
সংশয়ভরা দৃষ্টিতে কবুতরটার দিকে আরেকটু ভালো করে নিরীক্ষণ চালালো মাহি। ওমনি দৃষ্টিতে আঁটকে গেল অদ্ভুত এক দৃশ্য। কবুতরটার পায়ে সরু করে পেঁচিয়ে বাঁধা রয়েছে এক টুকরো কাগজ! সহসা ভ্রু কুঁচকে গেল মাহি'র। কৌতূহল জাগল মনে, সঙ্গে অজ্ঞাত এক আশঙ্কাও। কাগজটার দিকে হাত বাড়িয়েও থমকে গেল সে। কিছুক্ষণ দ্বিধান্বিত হয়ে বসে থেকেও কৌতুহল কমাতে না পেরে অতঃপর মনের সমস্ত সংশয় একপাশে সরিয়ে,ধীর হাতে আঁকড়ে ধরল পাখিটাকে। কাঁপা কাঁপা আঙুলে তার পা থেকে খুলে নিল কাগজের টুকরোটা।
ছোটো একটা কাগজ! বোধহয় কিছু একটা লেখা তাতে। একহাতে পাখিটাকে ধরে রেখেই কাগজটা খুললো মাহি। তক্ষুনি থমকালো তার অভিব্যক্তি! কেঁপে উঠল সর্বাঙ্গ। ভড়কানো দৃষ্টিতে বারকয়েক কাগজটার দিকে চোখ বুলিয়ে পরক্ষণেই ছুটলো সে। দিশাহীনের ন্যায় ছুটলো কক্ষের বাইরে।
★
বাইরে মৃদু তুষারপাত! গায়ে একখানা পাতলা শাল জড়িয়ে প্যালেসের বামদিকের ঘন-জঙ্গলের অভিমুখে অগ্রসর মাহি। কিছুটা পথ এগোতেই আচমকা অন্ধকার থেকে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত এসে খামচে ধরল তার নরম কব্জিসন্ধি। সহসা আঁতকে উঠে মাহি! বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই পরোখ হলো — কালো হুডিপরা এক অজ্ঞাত যুবক। পুরোপুরি অজ্ঞাত নয় সে। কেননা তার বেড়াল চোখদুটোর ছলছলে দৃষ্টিজোড়া যে সুস্পষ্টভাবে দেখছে মাহি।
মাহি কাঁপছে! কাঁপছে তার কন্ঠস্বর। অজ্ঞাত যুবক আচমকা পরম স্নেহে রমণীর মাথাটা নিজের বুকের সনে চেপে ধরল। মমতার আবেশে একের পর এক স্নেহময় চুমু একে দিলো মাহি'র মাথার ওপর। ক্ষীণস্বরে শুধালো,
“ বুড়ি!”
কেঁদে উঠে মাহি! হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল যুবককে। অতঃপর কান্নায় জুড়িয়ে আসা কন্ঠে কোনমতে আওড়াল,
“ ভাই...রোদ..রোদ ভাই! আমার রোদ ভাই।”
★
প্রেয়সীর ভাবনায় হঠাৎ অস্থির লাগছে মুগ্ধের। তক্ষুনি ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে অপেন করল প্যালেসের সিসিটিভি ফুটেজ। মুহুর্তেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখে থমকে গেল সে। তার প্রাণভোমরা, তার প্রিয়তমা-আহ! এক কালো হুডিপরা আগন্তুকের বাহুডোরে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। আগন্তুক পা*গলের মতো চুমু খাচ্ছে তার কপালে। অথচ তার প্রেয়সী নিজেকে ছাড়াতে চাইছে না মোটেও।
চলবে....