্ধ — পর্বঃ৭৫(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
( ভায়োলেন্স যুক্ত⚠️)
মৃদু তুষারপাত হচ্ছে। প্যালেসের বাঁদিকের ঘন জঙ্গলের আদ্যোপান্তে দাঁড়িয়ে আছে দু-ভাইবোন। বহুদিন পর ভাইয়ের বুকখানি ফিরে পেয়ে কান্নায় মুষড়ে পড়ছে মাহি। দুহাতে যথাসম্ভব শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে নিজের রোদ ভাইকে। এ যেন দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ফিরে পাওয়া কাঙ্ক্ষিত একটুকরো সুখ।
হুডির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শ্যামসুদর্শনের বেড়ালচোখ দুটোও অজান্তেই বারবার ভিজে উঠছে। ছোট্ট বোনটাকে তুলোর ন্যায় বুকে আগলে নিয়ে তার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। ক্ষণকাল বাদেই নীরবতা ভেঙে মোটা কণ্ঠে শুধাল,
“কেমন আছিস, বুড়ি?”
প্রতুত্তর দেওয়ার বদলে মুখ হাঁ করে কেঁদে উঠল মাহি। খামচে ধরল ভাইয়ের হুডির পেছনের অংশ। কান্নায় জড়িয়ে আসা কণ্ঠে আওড়াল,
“ভালো! তোমরা কেমন আছো, ভাইয়া? আম্মু, আব্বু, বড় আব্বু, বড় মা, মেজো আব্বু, কাকাই, কাকিয়া—ওরা সবাই কেমন আছে, রোদ ভাই? তুমি... তুমি এখানে কী করে এলে? কীভাবে জানলে আমি এই প্যালেসে আছি?”
শক্ত ঢোক গিলল ডাক্তার সাহেব। বোনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে ক্ষীণ স্বরে প্রতুত্তর করল,
“মায়াঙ্ক বলেছে।”
মায়াঙ্কের নাম শুনতেই কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ ফুটলো মাহি'র। হতবিহ্বল ভাবস্রোতে ধীরে ধীরে আলগা করল ভাইকে জড়িয়ে রাখা হাতের বাঁধন। পরক্ষণেই তার বুক থেকে মাথা তুলে ঘাড় উঁচিয়ে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কমান্ডার মায়াঙ্ক?”
নিঃশব্দে ওপর-নিচ মাথা নাড়ায় রৌদ্র। পরক্ষণেই সতর্ক দৃষ্টিতে একবার আশপাশটা পরখ করে নিল সে। পেছনে ঘন জঙ্গল, সামনেই প্যালেসের সুউচ্চ টাওয়ার! রাতের বিদঘুটে অন্ধকারেও প্যালেসের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। রৌদ্র যথেষ্ট বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান পুরুষ। পরিস্থিতির প্রতিকূলতা আগেভাগে আঁচ করতে পেরে, তক্ষুনি বোনের নরম কবজি আঁকড়ে জঙ্গলের দিকে পা বাড়াল সে।
এমন আকস্মিকতায় ভড়কে গেল মাহি। তবুও ভাইকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করায়, নির্দ্বিধায় এগোলো তার সঙ্গে। কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ থেমে গেল রৌদ্র। মাহিকে নিয়ে আড়াল হয়ে দাঁড়াল অন্ধকারে। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ মাহি! ভাইয়া এসেছি তোকে নিতে। চল আমার সঙ্গে!”
বলেই টেনে ধরল মাহি'র নরম কব্জিসন্ধি। পাদু’টো অগ্রসর হতেই আচমকা পেছনে পড়ল টান। তৎক্ষনাৎ থমকে দাঁড়ালেন ডাক্তার সাহেব। সন্দিগ্ধতায় কপাল কুঁচকে ঘাড় বাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করতে পারলোনা মাহি। গলার কাছটা হুট করেই ধরে এলো তার। চোখদুটোর পর্দায় আনমনে ভেসে উঠল মুগ্ধের সুশ্রী মুখখানা! তাকে ছেড়ে চলে যাবার সাধ্যি আছে তার?
মাহি ঢোক গিললো অলক্ষ্যে। মাথাটা নত করে ক্ষীণ কন্ঠে জবাব দিলো —
“ আর ক'দিন আগের পরিস্থিতি থাকলেও বোধহয় হাসতে হাসতে তোমার সঙ্গে চলে যেতাম ভাইয়া। কিন্তু এখন...এখ নআমার পক্ষে চলে যাওয়া সম্ভব না ভাইয়া।”
সহসা ভ্রু গোটালো রৌদ্র! গম্ভীর মুখ অভিব্যক্তিতে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কিন্তু কেনো? এখন কি সমস্যা?”
কয়েকমুহুর্ত নির্বাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো মাহি। মনে মনে বাঁক সাজাতে ব্যস্ত সে। অদূরের ঘন গাছগাছালির আড়াল থেকে ছিটকে আসা আলোর ছটায় মৃদুভাবে দৃশ্যমান তার লুকায়িত হরিণা চোখদুটো। সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সন্দিগ্ধ গলায় পুনরায় বলে উঠল রৌদ্র,
“ তুই কি আমার কাছে কিছু লুকচ্ছিস, মাহি? কেনো যেতে চাচ্ছিস না আমার সাথে?”
কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল মাহি'র! ঘেমে উঠল হাত-পা। খানিকক্ষণ দ্বিধায় জড়িয়ে অবশেষে দৃঢ় কন্ঠে বলেই বসল,
“ কজ...কজ..আ'ই লাভ হিম, ভাইয়া! আ'ই লাভ হিম মোর দ্যান মা'ই লাইফ। যাকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব, তাকে ছেড়ে কি করে চলে যাবো বলো?”
অষ্টাদশীর এমন উত্তরে মুহূর্তেই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো রৌদ্রের মস্তিষ্কে! বিস্ময়াবিষ্ট দৃষ্টিজোড়া ক্রমশ প্রসারিত হয়ে উঠল তার। কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হওয়া মেয়েটার কথাগুলো যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। অথচ অবিশ্বাসের সমস্ত দেয়াল ভেদ করে সেই স্বগতোক্তিই অনবরত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধের তিক্ততায় কপালের শিরাগুচ্ছ দপদপ করে উঠছে ক্রমশ। চোয়াল শক্ত করে আচমকা ক্ষুব্ধতায় চেপে ধরল মাহি'র সুকোমল কন্ঠনালীর ডগা! মাহি হকচকালো না। সে যে বেশ জানতো — নিজ অত্যাচারীকে ভালোবাসার পরিণাম তাকে আজ নাহয় কাল ঠিকই ভোগ করতে হবে।
রৌদ্র জোর বাড়াচ্ছে না হাতের। সন্তানের মতো বোনটার কোমল মুখপানে দৃষ্টিজোড়া একটুখানি ঘুরতেই এক ঝটকায় হাতের বাঁধন আলগা করে ফেললো সে। পরপরই দুহাতে খামচে ধরল নিজ মাথাটা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ হোয়াট দ্য হেল আর ইউ সেয়িং, মাহি? তুই জানিস তুই কি বলছিস? কোন সাহসে ঐ বে*জন্মা কীটটাকে ভালোবাসার কথা বলছিস তুই?”
থামলো রৌদ্র। পরক্ষণেই ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো কাঁদতে থাকা মাহি'র দিকে। আবারও দাঁত কিড়মিড় কন্ঠে শুধালো,
“ তোর লজ্জা করলো না ঐ কথাটা মুখে আনতে? যে-ই জানো*য়ারের কারণে তুই আজ পরিবারহারা, যে-ই রাস্কেলটার কারণে সেজো আব্বু আজ-ও মৃ-তপ্রায় অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে, যে তোকে রোজ একটু একটু করে তিল তিল যন্ত্রণায় ছটফট করিয়েছে, তাকে ভালোবাসিস বলছিস? হ্যাভ ইউ গন ক্রেইজি? এতোটা নির্লজ্জ না হয়ে তুই যদি আজ আত্ম-হ-ত্যা করে ম'রেও যেতি, তা-ও হয়তো আমার এতোটা আফসোস থাকতো না মাহি। আমি অন্তত বাড়ি ফিরে বলতে পারতাম — তায়েফ এহসানের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে, মাহিরা এহসান! শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য নিজেকে শেষ করেছে!”
ভাইয়ের এহেন কটুবাক্যে জর্জরিত রমণীর অন্তঃকোণ! বাঁধভাঙা কান্নায় আঁটকে যাচ্ছে নিশ্বাস। রৌদ্র অস্থির! ক্ষিপ্রতায় মুষ্টিবদ্ধ করেছে হাত। আচানক নতমুখী মেয়েটার পানে এগিয়ে এসে খামচে ধরল তার চুলের গোছা। এক ঝটকায় মাহি'র মুখখানা উঁচিয়ে তুলে কটমট কন্ঠে বলল,
“ মাহি! মাহি এক্ষুণি বল — তুই আমাকে যা বলেছিস তা সব মিথ্যে। বল মাহি...বল ওগুলো সব মিথ্যে।”
অশ্রুর দমকে ঝাপ্সা রমণীর দৃষ্টিযুগল। খোদ মৃ-ত্যুসম যন্ত্রণার অভিমুখে দাঁড়িয়ে থেকেও মাথা নাড়ালো দু'ধারে। কান্নায় বিজড়িত কন্ঠে দৃঢ়ভাবে শুধালো —
“ পৃথিবীর সকল ভালো-খারাপের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাকে যেদিন থেকে নিজের ভেবেছি, ঠিক সেদিন থেকেই নিজের প্রতিটি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মূল্য স্বেচ্ছায় লিখে দিয়েছি তার নামে, রোদ ভাই। তাকে অস্বীকার করা মানে, বেঁচে থেকেও নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। হ্যাঁ, আমি মানছি ও আমার জঘন্যতম অত্যাচারী! মানছি ও একটা নির্দয়, পাষণ্ড, নিকৃষ্ট লোক। তবুও আমি একবার নয় বরং হাজারবার বলবো, শুধু তোমার সামনে নয় বরং পুরো পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে বলব — আমি ওকে ভালোবাসি! ভালোবাসি আমি আমার বিস্টকে। ভালোবাসি আমার বেপরোয়া পাগলপ্রেমিক— অধীর রায়'কে।”
কথাটা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সপাটে একখানা থাপ্পড়ের পরশে পিষ্ট হলো রমণীর তুলতুলে বাগালটা। দাঁতের সঙ্গে ঠোঁটের ত্বক ঘষে যেতেই ফেটে গেল অধরকোণ! তৎক্ষনাৎ এককোণ দিয়ে বেরিয়ে এলো উষ্ণ লোহু। মুহুর্তেই গাল বাঁকিয়ে জঙ্গলের আধ-ভেজা মাটিতে পড়ে গেল মাহি। মাথাটা ঘোরাচ্ছে তার। দৃষ্টি হয়েছে ঝাপ্সা। খানিক দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মানব সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। দু'হাত কোমরে ঠেকিয়ে দাঁত খিঁচে বলে যাচ্ছে,
“ আল্লাহর কসম! তুই যদি আমার র*ক্ত না হতি তাহলে এক্ষুণি তোকে জ্যা*ন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলতাম, বেয়াদব! ছিহ! এইটুকু বয়সে বড়ো ভাইয়ের সামনে নিজের নির্লজ্জতাগুলোকে জাহির করতে লজ্জা করলো না তোর? যেখানে তোর চলে যাওয়ার শোকে পা-গলপ্রায় পুরো এহসান পরিবার, সেখানে তুই কিনা...ছিহ!”
হেঁচকি তুলে কাঁদছে মাহি। তখনি রৌদ্র খানিকটা ঝুঁকে এসে আচানক খামচে ধরল মাহি'র ডান বাহু। মেয়েটাকে জোর করে উঠিয়ে এনে শক্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ চল! আরেকটা বাড়তি কথাও বলবি না। এক্ষুণি চল আমার সঙ্গে।”
কাঁদতে কাঁদতে সামান্য ঢোক গিললো মাহি। হাতের উল্টোপিঠে মুছে নিচ্ছে চোখমুখ! রৌদ্র পাদু’টো বাড়াতেই সে ফের বলে ওঠে,
“ এখান থেকে বেরুনোর কোনো পথ নেই, রোদ ভাই! এখানকার পুরো শহর, শহরের প্রতিটি অলি-গলি বিস্টের নজরদারিতে বন্দী!”
থমকে দাঁড়াল রৌদ্র! ধীরলয়ে বাঁকাল ঘাড়। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ আর কি কি জানিস ওর সম্বন্ধে?”
নাক টানলো মাহি! নতমুখেই জবাব দিলো,
“ অনেকটাই!”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল রৌদ্র। আচমকা ছেড়ে দিলো মাহি'র বাহু। খানিকক্ষণ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলো যেন কিছু একটা। পরপরই বলে উঠল,
“ এই প্যালেসে কে কে আছে?”
“ অনেকেই! সবাই বিস্টের বন্দী!”
ভ্রুজোড়া খানিক কুঁচকে নিলো রৌদ্র। সহসা বুকের কাছে বাঁধল দু'হাত। সন্দিহান কন্ঠে আওড়াল,
“ তুই সত্যিই ওকে ভালোবাসিস?”
পরপর মাথা ঝাঁকায় বোকা মানবী। রৌদ্রের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবদ্ধ তার মুখ। বিচক্ষণী পুরুষ হুট করেই এগিয়ে এলো আরও একপা। মেয়েটার গালে রাখলো হাত। এবার বড্ড শান্ত গলায় শুধালো সে,
“ তুই যাকে ভালোবাসিস, তুই চাস না তোর পুরো পরিবারও তাকে পছন্দ করুক?”
বোকা মানবী তক্ষুনি দৃষ্টি উঁচাল। অনবরত মাথা নাড়িয়ে ভেঙে আসা কন্ঠে আওড়াল,
“ অবশ্যই চাই ভাইয়া।”
মাস্কের আড়ালে বাঁকা হাসলো রৌদ্র।
“ তাহলে তুই এটাও জানিস, পাপকে ঘৃণা করা গেলেও পাপীকে ঘৃণা করা যায় না। দেখ মাহি, মুগ্ধ ব্যক্তি হিসেবে কেমন তা আমরা না জানলেও আশা করি তুই এতদিনে জেনে গিয়েছিস। না জানলে অবশ্য ওকে ভালোবাসতি না। সে যাইহোক, ও যেসব কাজকর্মগুলো করে সেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য এলার্মিং, ডিস্টার্বিং, রাইট?”
হতবুদ্ধির ন্যায় মাথা দোলায় মাহি। রৌদ্র আবারও বিজ্ঞ কন্ঠে বলে ওঠে,
“ তাহলে তোর উচিত ব্যক্তি মুগ্ধকে ঐসব পাপের সাম্রাজ্য থেকে বের করে নিয়ে আসা।”
হতভম্ব মাহি! বিস্মিত কন্ঠে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“ সেটা কিভাবে?”
“ সিম্পল! সবার আগে পাপের শাখা-প্রশাখা কাটতে হবে, তারপর গোড়া। মায়াঙ্কের মুখ থেকে যতটুকু শুনলাম, তাতে বুঝতে পেরেছি — মুগ্ধের একটা সাইকোপ্যাথিক অবসেশন রয়েছে। অর্থাৎ, শত্রুর দূর্বলতাদের নিজের বন্দী বানানোর অবসেশন। এটাকে যদি কোনোভাবে প্রতিহত করা যায় তাহলে...আশা করি, ওর পাপের জগৎ কিছুটা হলেও সংকুচিত হবে।”
ঢোক গিললো মাহি। যেন গিলছে রোদ ভাইয়ের সবগুলো কথা। এরইমধ্যে রৌদ্র ফের বলে ওঠে,
“ শোন মাহি! তুই যেহেতু বলেছিস তুই ওকে ভালোবাসিস, তাহলে আমি বলব — একমাত্র তুই-ই পারবি মুগ্ধকে ওসব কালো জগৎ থেকে বের করে আনতে।”
“ কিভাবে এসব করবো ভাইয়া?”
আচমকা স্থির হয়ে গেলেন ডাক্তার সাহেব! মাহি'র গাল থেকে হাত নামিয়ে দু'হাত বাঁধল বুকের কাছে। অতঃপর সময় নিয়ে বলল,
“ মায়াঙ্ক বলল — এই প্যালেসে না-কি একটা গুপ্ত পথ রয়েছে! তুই যেভাবেই পারিস ওটা আগে খুঁজে বের কর। তারপর সে-ই গুপ্তপথের রাস্তাটা ভাইয়াকে জানাবি। বাকিটা নাহয় আমি সামলে নিবো।”
“ এতে আমার বিস্টের কোনো ক্ষতি হবে না তো, রোদ ভাই?”
রমণীর বিচলিত কন্ঠে অবাক না-হয়ে পারলোনা রৌদ্র। তবুও নিজের গম্ভীর অভিব্যক্তি ধরে রেখে, এগিয়ে এসে বোনের মাথাটা আলতো করে জড়িয়ে ধরল নিজের বুকের সনে। ক্ষীণ কন্ঠে বলল,
“ আমি নিজের পরিবার এবং পরিবারের মানুষের জন্য বরাবরই স্বার্থপর, বুড়ি! তোর কোনো ক্ষতি হোক তা আমি কোনোদিন চাইবো না। না চাইবো — তোর সুখের উল্লাসে কারো অভিশপ্ত নজর পড়ুক। তোর যেখানে সুখ, আমি সেটাই করবো। ওকে?”
ভাইয়ের বুকে পড়ে আলতো হাসলো মাহি। হাতদুটো উঠিয়ে যেইনা রোদকে জড়িয়ে ধরবে অমনি প্যালেসের ওয়াকওয়ে ধরে ধেয়ে এলো একের পর এক দ্রুতগামী যানের গর্জন। মুহূর্তেই চারপাশের নীরবতা চূর্ণবিচূর্ণ করে উঠল ইঞ্জিনের বিকট শব্দে। মাহি ভড়কে গেল। তক্ষুনি ভাইয়ের কাছ থেকে সরে এসে দাঁড়ালো জঙ্গলের আদ্যোপ্রান্তে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ হঠাৎ করে এতো এতো গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আসছে কোত্থেকে? বিস্ট না চলে গিয়েছিল? ও আবার...”
হঠাৎই রমণীর মনে পড়ে গেল সিসিটিভি ক্যামেরার কথা। তৎক্ষনাৎ পাদু’টো ছুটিয়ে এনে আড়াল হয়ে দাঁড়াল বড়ো ওক গাছটার পেছনে। ঘাড় উঁচিয়ে সন্ধানী চোখে প্যালেসের সুউচ্চ টাওয়ারের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই থমকে গেল সে। অদূরের টাওয়ারের শীর্ষে জ্বলজ্বল করছে সিসিটিভি লাইভ ক্যামেরার লাল টকটকে বাতিটা। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সর্বাঙ্গ জমে গেল রমণীর। কাঁপতে লাগলো অনবরত! মস্তিষ্কে বেজে উঠল,
“ শেষ! সব শেষ। বিস্ট হয়তো দেখে ফেলেছে সব। শেষ!”
পরপরই মাহি ঘুরে দাঁড়াল পেছনে। রৌদ্রকে ছুটে আসতে দেখেই তক্ষুনি দু'হাতে আগলে নিলো পথ। ভয়াতুর কন্ঠে তাড়া দিয়ে বলতে লাগলো,
“ বিস্ট চলে এসেছে ভাইয়া। এক্ষুণি এখান থেকে পালাও ভাইয়া। যেখানে পারো চলে যাও, তবুও দয়া করে পালাও।”
কপাল গোছালো রৌদ্র! সন্দিগ্ধ কন্ঠে আওড়াল,
“ ও কি টের পেয়ে গিয়েছে, আমি এসেছি?”
ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। পরপর ঘাড় বাকিয়ে সর্তক দৃষ্টিতে তাকায় পেছনে। পুনরায় ভয়ার্ত কন্ঠে ভাইকে বলে ওঠে,
“ আ'ম শিওর, ও তোমার খবর পেয়ে গিয়েছে ভাইয়া। এই প্যালেসের চারিদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো। তুমি... তুমি ভুলেও মুখ খুলবে না ভাইয়া। চলে যাও, চলে যাও প্লিজ।”
শুনলো না রৌদ্র! বরং এগিয়ে এসে হাত রাখলো বোনের মাথায়। ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে, মোটা কন্ঠে শুধালো
“ তোকে ছাড়া চলে যেতে মন মানছেনা, মাহি!”
মাহি উদ্বিগ্ন বড্ড! একবার ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাচ্ছে, আরেকবার তাকাচ্ছে ভাইয়ের দিকে। তার অতশত অনুনয় দেখেও অনড় রৌদ্র। শেষমেশ আর না পেরে ভয়াতুর রমণী পায়ে পড়ল ভাইয়ের। দু'হাতে পাদু’টো জড়িয়ে ধরে কাতর কন্ঠে আওড়াল,
“ “তোমার দুটো পায়ে ধরছি, রোদ ভাই! চলে যাও এখান থেকে। আমার বিস্ট—যেখানে সে আমাকে স্পর্শ করে যাওয়া সামান্য ধুলোকণাটুকুও সহ্য করতে পারে না, সেখানে লাইভ ক্যামেরায় ভেসে ওঠা এমন একজন আগন্তুক, যে কি-না আমাকে স্পর্শ করেছে, তাকে সে কোনোদিনও বাঁচিয়ে রাখবে না। নির্দয়ভাবে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, ভাইয়া! সে যতই তুমি আমার বড় ভাই হও না কেন, ও আমার ব্যাপারে ভীষণ ইনসিকিউরড! তাই বলছি, চলে যাও এখান থেকে। এটা ওর সাম্রাজ্য! যে সাম্রাজ্যে ওর অনুমতি ছাড়া একটা গাছের পাতা নড়বারও সাধ্যি নেই। সেখানে তুমি এসেছো, ওর অনুমতি বিনে। না না, তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি বোধহয় অপরাধবোধেই অর্ধেক ম-রে যাব!”
রৌদ্র ধাতস্থ হলো। শক্ত ঢোক গিলে আওড়াল,
“ তাহলে তুইও চল আমার সঙ্গে। তোকে এখানে একা রেখে গেলে ও নিশ্চয়ই আমার জন্য তোর ক্ষতি করে বসবে। এতে ম*রলে দু-ভাইবোন একসঙ্গে ম*রব।”
এহেন কথার পিঠে অস্থির মানবী ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল,
“ নাহ, আমার বিস্ট আমার কোনো ক্ষতি করবে না,রোদ ভাই! হয়তো একটু রাগের মাথায় বকাবকি করবে, তবে বিশ্বাস করো। ও আমার কোনো ক্ষতি করবে না। তুমি চলে যাও ভাইয়া। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার পরিবারের কি হবে, বলো? তোমার সানশাইনের কি হবে ভাইয়া? যাও...চলে যাও এখান থেকে। চলে যাও! আমি বিস্টকে আটকাবো। যেভাবেই হোক আমি ওকে আটকাবো। তুমি যাও।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রৌদ্র পা ছাড়ালো বোনের নরম হাতদুটো থেকে। পরপর নিজেও হাঁটু ভেঙে বসল তার মুখোমুখি। হুডির পকেটে হাত গুঁজে খানিকবাদেই বের করে আনলো একখানা চিরকুট! তা মাহি'র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বলল,
“ সেজো আব্বু দিয়েছিল আসার সময়। বারবার বলেছিল — যেভাবেই হোক, তোর কাছ অব্ধি যেন পৌঁছে দিই।”
চঞ্চলা চড়ুই থমকে গেল। আধো অন্ধকারে কম্পিত হাতে চিরকুটটা নিয়ে নিলো হাতে। পরক্ষণেই তা মেলে ধরে সংকুচিত দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখল — সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রাখা,
“— আমার মা! মাহি...
আব্বু তোমায় ভীষণ ভালোবাসি, জানো তো? তবে কখনো এমন সুযোগ কিংবা পরিস্থিতি আসেনি যেখানে আমি তোমাকে ঘটা করে জানাতে পারবো কথাগুলো। যাকগে, তুমি ভালো আছো তো মা? আমি জানি, তোমার কষ্ট হচ্ছে। জানি ঐ জানো*য়ারটা রোজ তোমার ওপর অত্যাচার করে। কিন্তু মনে রেখো, ওর ধ্বংস খুব সন্নিকটে।
আমি খুব তাড়াতাড়ি ঐ নরক থেকে তোমাকে বের করে আনবো মা। তারজন্য পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেতে হলেও, আমি তা-ই যাবো। মনে রেখো, বাবা তোমায় খুব ভালোবাসে মা। খুব ভালোবাসে।”
কান্নাগুলো আর আঁটকে রাখতে পারলোনা মাহি। ভগ্নদশায় আচমকা মাথা ঠেকালো রৌদ্রের বুকে। কান্না জড়িয়ে আসা কন্ঠে হাউমাউ করে আওড়াল —
“ আ'ই লাভ ইউ টু! আ'ই লাভ ইউ দ্য মোস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। আ'ই লাভ ইউ... মোস্ট!”
একজোড়া ব্যুট পরিহিত ব্যস্ত দাম্ভিক কদম হুট করেই থমকে গেল জঙ্গলের আদ্যোপ্রান্ত হতে দু'হাত দুরত্বে এসে। থমকে গেল তার সকল রূঢ় অভিব্যক্তি। চিরচেনা দুর্বোধ্য পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হৃদয়টায় যেন হুট করেই বিদ্ধ হলো একখানা বিষাক্ত, তীক্ষ্ণ তীর। রিং পড়া কানদুটোয় যেন এখনো বেজে চলেছে রমণীর বলা স্বগোতক্তি!
“ আ'ই লাভ ইউ দ্য মোস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!”
যতবার কথাগুলো কানে বাজছে ঠিক ততোবার মস্তিষ্কে যেন পেরেক ঠুকছে কেউ। টুপির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বাদামী চোখদুটো র*ক্তবর্ণ ভাব ধরেছে। চকচক করছে অশ্রুরা! শত বারণ উপেক্ষা করেও আজ বুঝি তারা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে অক্ষিকোটর। দৃষ্টিপট ঝাপ্সা হলেও অদূরের দৃশ্যটা সাক্ষাৎ মৃ ত্যুসম যন্ত্রণা উপলব্ধি করাচ্ছে রূঢ় মানবকে। তার প্রিয়তমা-আহ না ওটা? ওটা তার চঞ্চলা চড়ুই না? কার বুকে নিজের সুখ খুঁজছে ও? কার বিরহ পরবর্তী সুখে নিজেকে রাঙিয়ে ভালোবাসা জাহির করছে ও? কার জন্য করছে ওমন আর্তনাদ?
দাম্ভিক রূঢ় মানব, স্বয়ং রুশদী কিং আজ প্রথমবারের জন্য উপলব্ধি করছেন — তার হৃদয়টা ফেটে যাচ্ছে! এ-ই বুঝি তীব্র যন্ত্রণায় হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবে তার। অজান্তেই ডানহাতটা তার উঠে এসে খামচে ধরল বুকের বাঁপাশ। চারপাশে বাধ্য অনুচরদের ঢল, তা স্বত্বেও সর্বস্ব হারা বিধ্বস্তের ন্যায় প্রথমবারের মতো হাঁটু জোড়া ভেঙে এলো তার। এক ঝটকায় দম্ভে ভরা অহংকারী মনস্টার ধুম করে বসে পড়লেন জমিনে। মুহুর্তেই আঁতকে ওঠেন সবাই। ক'হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা এডউইন এবার ছুটে এলো। তৎক্ষনাৎ একহাতে মনস্টারের বাহু আঁকড়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“ মনস্তার! হোয়াট হ্যাপেন্ড টু ইউ।”
কথাটা মনস্টারের কানে গেল কি-না কে জানে! তবে অদূরে হাঁটুগেঁড়ে রোদ ভাইয়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রাখা মাহি'র কানে স্পষ্ট গেল কথাটা! মুহুর্তেই সম্বিতে ফিরলো সে। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো রৌদ্রের কাছ থেকে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে ভাইকে তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ ভাইয়া! ভাইয়া পালাও।”
রৌদ্র আর না করলো না। তক্ষুনি উল্টোপথে ছুটলো সে। মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল অন্ধকারে। চঞ্চলা চড়ুই তক্ষুনি শরীর ঘোরালো। ভয়ে ভয়ে সামনে তাকাতেই অবলোকন হলো — বিস্টের ওমন ভগ্নদশা। মাহি ভড়কে গেল। তার ছলছল দৃষ্টিজোড়া আপাতত নিবদ্ধ মুগ্ধের ঝাপ্সা দৃষ্টিযুগলে। বুকটা কেমন হুট করেই ধ্বক করে উঠল তার। পরপরই সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো নিজ ব্যক্তিগত পুরুষটার কাছে।
রমণীর ছোট্ট পাদু’টোর সে কী গতি। এক দমকা হাওয়ার ন্যায় ক্ষণকাল বাদেই আছড়ে পড়ল মুগ্ধের প্রশস্ত রুক্ষ বক্ষভাঁজে। দু'হাতে যথাসম্ভব পাহাড়সম লোকটাকে আঁকড়ে ধরার প্রয়াস জুড়ে, দৃঢ় কন্ঠে আওড়াল মাহি,
“ বিস্ট! বিস্ট, ট্রাস্ট মি আমি আপনাকে ধোঁকা দেইনি। আমি এমন কিচ্ছু করিনি যেটাতে আপনি কষ্ট পাবেন! আমি কোনো ভুল করিনি বিস্ট! আপনি এভাবে ভেঙে পড়বেন না, বিস্ট!”
মুগ্ধ কি শুনলো? তার চোখদুটোর কোটর বেয়ে তক্ষুনি নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা নোনাজল। কাতরতার প্রবল দাবদাহে জরাজীর্ণ তার বুক, মেয়েটার উষ্ণ পরশে প্রশমিত হচ্ছে ব্যথাগুলো। তাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে পারলে বোধহয় স্বস্তি মিলবে তার। তাইতো বলিষ্ঠ হাতদুটো উঠিয়ে এনে যে-ই না রমণীর ক্ষুদ্র দেহটা আঁকড়ে নিবে ওমনি কর্ণকুহরে ফের বেজে উঠল — মাহি'র বলা কিছুক্ষণ আগের কথাটা। মুহুর্তেই রূঢ় মানবের মুখ অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট পরিবর্তন নেমে এলো। চোয়ালের রেখা হলো শক্ত! দৃষ্টিতে অগ্নি ছড়িয়ে আচমকা শক্ত হাতে খামচে ধরল রমণীর চুলের গোছা। সঙ্গে সঙ্গে ককিয়ে ওঠে মাহি। চুলের গোড়ায় হাত বাড়িয়ে নাক-মুখ কুঁচকে তাকালো রূঢ় মানবের পানে। পরক্ষণেই আঁতকে উঠে সে! আবারও ঐ রাক্ষুসে ভাব ধরেছে মুগ্ধ! থরথর করে কাঁপছে তার চোয়াল। মাহি ঢোক গিললো। তক্ষুনি হিং স্র কন্ঠে বিকট হুংকার ছুঁড়লেন মনস্টার!
“ এডউইন! এডউইন, গো ইনটু দ্য জাঙ্গল অ্যান্ড ব্রিং দ্যাট বাস্টার্ড টু মি।”
চকিতে দৃষ্টি ফেলল মাহি। আতঙ্কে জর্জরিত হয়ে আওড়াল,
“ ব-বিস্ট!”
সহসাই রমণীর তুলতুলে চোয়াল বরাবর আঘাত হানলো রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত থাবা! অতঃপর নিজ বলিষ্ঠ পাদু’টোয় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রমণীকেও দাঁড় করালো নিজের সঙ্গে। মাহি কাঁপছে! পায়ের পাতায় দিয়ে রেখেছে ভর। তখনই মুগ্ধ জোর বাড়ালো হাতের। ক্ষুব্ধ কন্ঠে গর্জন তুলে আওড়াল,
“ হু ওয়াজ দ্যাট ব্লা'ডি এসহোল, বান্দীর মেয়ে?”
ঢোক গিলছে মাহি! থেমে থেমে আওড়াচ্ছে,
“ বি-বিস্ট! বিস্ট...আপনি আগে শান্ত হোন। আমি..”
অশান্ত মনাব শান্ত থোড়াই হবে! সে উল্টো রমণীর চুলের গোছা বড্ড টেনে ধরে উচাঁল তার মুখ। হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আ'ম জাস্ট আস্কিং হু ওয়াজ দ্যাট ফা'কিং বাস্টা'র্ড?”
“ কেউ না! কেউ না, বিস্ট। তাকে আমি চিনি না। সত্যি.. চিনি না।”
বাঁকা হাসলো রূঢ় মানব! মুহুর্তেই কটমট শব্দ তুললো তার দাঁত কপাটি। আজ আর নিজের হিং স্র রূপটা দমিয়ে রাখতে পারলো না সে। এক ঝটকায় তার নরম চোয়ালটা ছেড়ে দিয়ে, গাল বরাবর সপাটে বসালো এক চড়! যার তীব্র অভিঘাতে তৎক্ষনাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মাহি। ছিলে গেল হাত-পায়ের চামড়া! খানিকবাদেই তার পানে ধেঁয়ে এলো মুগ্ধ! পুনরায় রমণীর চুলগুলো মুঠোয় চেপে, মুখ ঠেকালো তার কান বরাবর। চোখদুটো ছলছল করছে মুগ্ধের, রাগের তোড়ে থরথর করছে চোয়াল। বজ্রকঠিন হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ চিনিস না? চিনিস না ঐ কু***বাচ্চাটাকে? না চেনা স্বত্বেও তার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিলি, কেনো? কিসের অভাব দিয়েছিলাম তোকে আমি? আমাকে মানুষ থাকতে দিলি না কেন, বান্দীর মেয়ে? এই তোর আমাকে দিয়ে হয়না? হয়না.. তোর আমাকে দিয়ে কু****বাচ্চা? খাটে-ঘাটে কোন জায়গায় কমতি রেখেছি তোর? কোন জায়গায় কমতি রেখেছি তোর, উত্তর দে!”
ব্যথায় কাতরাচ্ছে মাহি! মুগ্ধ ততক্ষণে দিশেহারা। আচমকা মাহি'কে ছেড়ে দিয়ে উম্মাদের মতো ঘুরে এসে অভিমুখে দাঁড়াল সে। শক্তপোক্ত হাতদুটোর আঁজলায় রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানা তুলে ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,
“ কার বুকে মাথা রেখে বুক ভাসাচ্ছিলি, বান্দীর মেয়ে? আমার..আমার... ”
বলতে বলতেই দু'হাতের বলিষ্ঠ জোরে একটানে গায়ে সেঁটে থাকা কালো রঙা শার্টটার সবগুলো বোতাম টেনেহিঁচড়ে খুলে ফেলল সে। অতঃপর নিজের লোমহীন পেটানো বক্ষ ভাঁজ রমণীর সামনে উম্মুক্ত করে দিয়ে পা-গলের মতো আওড়াল,
“ আমার..আমার এই বুকটা কি যথেষ্ট ছিলো না তোর মাথা রাখার জন্য? যদি কম পরেই থাকতো তাহলে একটাবার নাহয় মুখ ফুটে বলতি, বুকটা চিরে আরও অনেকখানি জায়গা করে দিতাম তোকে। তাও অন্তত তুই শুধু আমার থাকতি! কি করলি তুই এটা? কি করলি, বল না? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে কেনো? ঐ জানো**বাচ্চা উত্তর দে...কি করলি তুই এটা?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কাঁদছে মাহি। উম্মাদটার হাত থেকে ভাইকে বাঁচাতে আপাতত চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। তাই তো মুখ বুঁজে সহ্য করে যাচ্ছে সব! মুগ্ধের বুঝি মেজাজ খিচঁল। আবারও রমণীর সুকোমল কন্ঠনালীর ডগায় আঘাত হেনে চিড়বিড় কন্ঠে শুধালো,
“ কে ছিল ওটা? আন্সার মি, বান্দীর মেয়ে! হু ওয়াজ দ্যাট ফা'কিং বাস্টা'র্ড?”
এতক্ষণে অধর নাড়ালো মাহি!
“ আমি আপনাকে বলতে পারবোনা, বিস্ট। আ'ম সরি! আ'ম সরি-হ!”
ব্যস! এটুকুতেই রূঢ় মানবের উত্তপ্ত মস্তিষ্কে ঘি ঢালার কাজ হলো যেন। রাগের পারদ ফেটে গেল অলক্ষ্যে! রমণীর তুলতুলে গালে আরেকবার চড় বসাতেই গাল বাঁকিয়ে হেলে পড়ল মাহি। পরক্ষণেই ঘাড়ের ত্বকে অনুভূত হলো রুক্ষ থাবা। ক্ষুদ্র মুখখানা তার, রূঢ় মানবের হাতের ইশারায় আবারও ওপরে উঠছে। পরপরই তার নরম ওষ্ঠপুট ওষ্ঠাধর করল নির্দয় পুরুষ। নিজের সকল রাগের ঝাঁঝ যেন ঐ দু'টো তুলতুলে অধরযুগলের ওপর ঝাড়ছে সে। ধারালো দাঁতের তীক্ষ্ণ পরশে পিষ্ট হচ্ছে অধরত্বক। জিভে মুহুর্তেই স্বাদ লেগেছে একপ্রকার ক্ষারীয় তরলের। জ্বলছে এবার তারা!
মাহি কাঁদছে! ওষ্ঠের ব্যথায় ছটফট করছে ক্রমশ। নিশ্বাস আঁটকে আসার যোগাড়। অথচ রূঢ় মানবের সেসবে তোয়াক্কা নেই! টানা বিশ মিনিটের রুক্ষ নির্যাতনে ফ্যাকাশে করে ছাড়লো মায়াবিনীর গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ওষ্ঠজোড়া। পরপরই ঘাড়ের ত্বক খামচে, ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে শুধালো মুগ্ধ,
“ ছলনাময়ী, বান্দীর মেয়ে! ভুলে গিয়েছিস আমি কে? ভুলে গিয়েছিস আমার আরেকরূপ? বেয়াদবের বাচ্চা, যার ঠোঁটদুটোর সিক্ত স্পর্শে রাঙিয়েছিস নিজের সর্বাঙ্গের প্রতিটি সুপ্ত কোণ, অথচ তার সঙ্গে ছলনা করার আগে একবারও বুক কাঁপলো না তোর? একবারও কাঁপলো না, বান্দীর মেয়ে?”
অধর নাড়াবার সাধ্যি নেই মাহি'র। এটুকুতেই ফুলে বালিশ হয়েছে বেচারা দু'টো। গভীর ক্ষততে জরাজীর্ণ! ততক্ষণে এডউইনেরসহ কয়েকজোড়া ব্যস্ত কদম জঙ্গলের পথ থেকে ধেয়ে এলো। আচমকা এক অজ্ঞাত হুডিপরা যুবকের ঘাড় ধরে তাকে এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলা হলো মনস্টারের অভিমুখে। মাহি আঁতকে উঠে তৎক্ষনাৎ! মুগ্ধ ধীরলয়ে বাঁকালো ঘাড়। অভিমুখে পড়ে থাকা আগন্তুকের মাস্কের ওপর দিয়েই মুখে রুমাল চেপে রাখা। হাতদুটো বাঁধা পিছমোড়া করে। সে ছটফট করছে! বলিষ্ঠ তার দেহ।
মুগ্ধ দম্ভের সাথে উঠে দাঁড়াতেই উদ্বিগ্ন মাহি তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে মুগ্ধের পাদু’টো। বহুকষ্টে অস্ফুটে আওড়ায়,
“ মুগ্ধ, প্লিজ! প্লিজ লিভ হিম।”
সহসা দাঁত কিড়মিড় করে উঠল মুগ্ধ! মেরুদণ্ড সামান্য বাঁকিয়ে আবারও চেপে ধরল মাহি'র চুলের গোছা। তাকে জোরপূর্বক দাঁড় করিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ প্লিজ? আর ইউ বেগিং মি ফর হিম? আর ইউ, বি'চ? আমার সামনে দাঁড়িয়ে আরেকজনের জন্য চোখের পানি ফেলার দুঃসাহস দেখাচ্ছিস? আবার আমাকে রিকুয়েষ্টও করছিস? ওলে লে লে! দ্যান লিসেন টু মি, বি'চ! ফা'ক ইউ এন্ড রিকোয়েস্ট। আগে এই বাস্টা*র্ডের চ্যাপ্টার ক্লোজ করি, তারপর তোরটা দেখছি! রিমেম্বার, এবার আর তোকে হাতে নয় খাটে মা'রব কু***”
নির্দয়ের এহেন হুংকারে স্তম্ভিত মাহি! ক্ষণকাল বাদেই তাকে ছেড়ে দিয়ে আগন্তুকের দিকে এগিয়ে গেল মুগ্ধ। বলিষ্ঠ পায়ে আগন্তুকের পিঠে ব্যুটজুতো মারিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো,
“ কতদিন ধরে চিনিস তোরা একে-অপরকে? কতদিন? তাড়াতাড়ি বল, সে অনুযায়ী টুকরো টুকরো করবো তোকে।”
আগন্তুক কাতরাচ্ছে! ব্যথায় গোঙাচ্ছে আধো আধো স্বরে। মাহি তৎক্ষনাৎ ভাইকে বাঁচানোর প্রয়াস জুড়ে আওড়াল,
“ না! না। উনি আমার কেউ না, বিস্ট! আমি উনাকে চিনি না। আমি সত্যিই জানি না উনি কে।”
তক্ষুনি এক অদ্ভুত দৈবাৎ শক্তির ভারে ঘাড়টা কাত হয়ে গেল রূঢ় মানবের। সাইকোর ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল মাহি'র পানে। আগন্তুকের পিঠ থেকে পা নামিয়ে, মাহি'র পানে এগোতে এগোতে ভয়ানক শান্ত গলায় শুধালো,
“ সত্যিই ও তোর কেউ না?”
দু'ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। মুগ্ধ বাঁকা হাসলো তা দেখে। আবারও বলল,
“ ও যেহেতু তোর কেউ না তাহলে ঐ বাস্টা'র্ডের বেঁচে থেকে কি লাভ? মে'রে ফেলি ওকে, কেমন?”
আঁতকে উঠে মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাতেই চোয়াল শক্ত করে হুংকার ছুঁড়ল মুগ্ধ।
“ এডউইন! আমার তলোয়ার দে।”
দু'জন বাধ্য অনুচর এগিয়ে এসে তড়িঘড়ি করে আগন্তুককে উঠে বসালো হাঁটুতে ভর দিয়ে। এডউইন ছুটে এসে রূঢ় মানবের হাতে বাড়িয়ে দিলো ধারালো চকচকে তলোয়ারটা। মাহি'র পানে দৃষ্টি তাক করে রেখেই তলোয়ারটা হাতে নেয় মুগ্ধ। অতঃপর কদম পিছিয়ে এগোলো আগন্তুকের দিকে। মাহি দিকবিদিকশুন্যের ন্যায় ছুটতে চাইলো অমনি এডউইন পথ আগলে দাঁড়াল তার। মাহি এবার চিৎকার জুড়ল,
“ নো, বিস্ট! নোওওওও।”
শুনলো না মুগ্ধ। নত ঘাড়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা আগন্তুকের ঘাড়ের ওপর এক ঝটকায় বসিয়ে দিলো তলোয়ারটা। মুহুর্তেই চোখের সামনে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল একটা তরতাজা প্রাণের গর্দানটা। ছটফটাতে লাগলো মাথা বি-হীন সম্পূর্ণ দেহটা!
রূঢ় মানবের পায়ের কাছে মাথাটা ঠেকতেই তিনি কেমন নির্দয়ের ন্যায় মাথাটা পা দিয়ে একপ্রকার ফুটবলের মতো ছুঁড়ে ফেলল মাহি'র পায়ের দিকে। মাহি স্তব্ধ! ধপ করে বসে পড়ল জমিনে। চোখের সামনে ভাইয়ের মাস্ক পরা বিচ্ছিন্ন মাথা! তা দেখে ঝাপ্সা হলো তার চোখ। কন্ঠ ফুঁড়ে বোধহয় অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
“ ভাইয়া!”
চলবে.....মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ