#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৭৭(ক)
#jannatul_firdaus_mithila
পায়ের নিচে মার্বেলের ঝকঝকে মেঝেটা লাল তরলে মাখামাখি হয়ে আছে! মেরুদণ্ড সামান্য বাঁকিয়ে সেদিকে দৃষ্টি ফেলতেই আঁতকে উঠল মাহি। বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েক পল তাকিয়ে থেকে কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“এগুলো...”
খানিকটা দূরে নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে মিলা। অস্থিরতায় ঘাম জমেছে তার কপালে, মুখমণ্ডলজুড়ে উৎকণ্ঠার ছাপ। মাহি ভীষণ ভীত! অজানা এক শঙ্কায় পা দুটো সামান্য টলে উঠতেই কক্ষে প্রবেশ করল ডক্টর হায়া। ব্যস্ত পারস্য সুন্দরীর হাতে মেডিক্যাল ট্রে। সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই অষ্টাদশীর করুণ অবস্থা চোখে পড়ল তার। মুহূর্তেই থমকে গিয়ে হকচকানো কণ্ঠে বলে উঠল,
“একি! তোমার জ্ঞান ফিরল কখন, ডিয়ার? আর ক্যাথেটার পরা অবস্থায় এভাবে শোয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে কেন?”
ভয়ার্ত মাহি ধীরলয়ে চোখ তুলে তাকাল। ততক্ষণে ব্যস্ত পায়ে তার কাছে ছুটে এসেছে হায়া। হাতের মেডিক্যাল ট্রে-টা জোর করে মিলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আলতো করে চেপে ধরল মাহির দুই কনুই।
“ইশশ! কী করলে তুমি, ডিয়ার! উঠে দাঁড়ানোর আগে অন্তত নিজের অবস্থাটা একবার দেখে নিতে। ক্যাথেটার পরা অবস্থায় কেউ এভাবে উঠে দাঁড়ায়, বলো?”
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে যত্ন করে মেয়েটিকে বিছানার কিনারায় বসিয়ে দিল সে। তক্ষুনি স্পর্শকাতর স্থানে মৃদু যন্ত্রণা অনুভূত হতেই নাক-মুখ কুঁচকে গেল মাহির। ব্যথায় খামচে ধরল হায়ার হাত দুটো। পারস্য সুন্দরী ধৈর্য ধরে তাকে বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসিয়ে, পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল উদ্বিগ্ন মিলার দিকে। কণ্ঠে বিরক্তি ঝরিয়ে বলল,
“ও হয়তো জানত না ওর কী অবস্থা। কিন্তু তুমি? তুমি তো জানতে, মিলা। তারপরও ওকে কীভাবে বিছানা থেকে নামতে দিলে?”
চোরের মতো কাচুমাচু করছে মিলা। লজ্জায় যেন ঘাড়টুকুও তুলতে পারছে না। হায়া দাঁত কিড়মিড়িয়ে আরও কিছু বলতে উদ্যত হলো, অমনি মাহির অস্ফুট গোঙানিতে থেমে গেল তার কথা।
“আহ...”
ত্বরিত ঘুরে এসে মাহির সামনে বসল হায়া। আলতো করে পা দুটো নিজের কাছে টেনে নিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে মিলাকে বলল,
“গিভ মি দ্যাট ট্রে!”
মিলা ছুটে এসে ট্রেটা বিছানার ওপর নামিয়ে রাখল। আর দেরি করল না হায়া। মুহূর্তেই হাতে স্যানিটাইজার স্প্রে করে ট্রে থেকে তুলে নিল হ্যান্ড গ্লাভস। সেগুলো পরতে পরতে ব্যথায় কাতরানো মেয়েটির দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“জাস্ট একটু ব্যথা হবে, ওকে?”
অতঃপর সতর্ক হাতে মাহি'র ক্যাথেটারের নলটি সরাতে উদ্যত হলো হায়া। মুহূর্তের জন্য তীব্র ব্যথায় নাক-মুখ কুঁচকে নিল মাহি। অস্ফুটে ব্যথাতুর শব্দ করে পরক্ষণেই ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল সে। হায়া স্বস্তির ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“গেট ওয়েল সুন, ডিয়ার!”
★
হাঁপাচ্ছে মাহি! পেটের ওপর টেনে রেখেছে পাতলা ব্ল্যাঙ্কেটের আবরণ। ক্যাথেটারের ঘর্ষণে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে এতক্ষণ যে র*ক্তপাত হচ্ছিল, তা-ও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে যেন। হায়া দক্ষ হাতে রমণীর শুশ্রূষায় ব্যস্ত। সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে মিলা।
কিছুক্ষণ পর ইতস্ততায় জড়ানো কণ্ঠে মাহি শুধাল,
“ডক্টর হায়া?”
“ইয়েস, ডিয়ার!”
আঙুলের ফাঁকে থাকা রক্তা**ক্ত গজগুলো ট্রেতে রাখতে রাখতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল পারস্য সুন্দরী। মাহি ঢোক গিলে পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছিল আমার?”
সহসাই থেমে গেল হায়ার কর্মরত হাত। মিলার মুখের অভিব্যক্তিও কেন যেন মুহূর্তেই বদলে গেল। দুজনেই নিঃশব্দে একবার পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। যেন কিছু একটা আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারা।মাহি উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি টেনে, থেমে থেমে আওড়াল হায়া,
“না, মানে... তেমন কিছু না, ডিয়ার। তুমি আসলে...”
“আপনারা কি আমার কাছে কিছু লুকাতে চাইছেন?”
এমন সন্দিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন শুনে কিছুটা ভড়কে গেল হায়া। আমতা-আমতা করে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই পাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল মিলা,
“কী লুকাব তোমার কাছে, মুনলাইট? সে সাধ্যি কি আমাদের আছে? যাই হোক, তুমি এখনো অনেক দুর্বল। এই অবস্থায় মস্তিষ্কে এত চাপ দিতে নেই! আমরা তোমাকে পরিষ্কার করে দিচ্ছি। এরপর বরং একটা হট বাথ নিয়ে নিয়ো। দেখবে, মন-মেজাজ সবটাই কেমন ফুরফুরে লাগছে!”
অগত্যা আর কথা বাড়াতে পারল না মাহি। পেটের ভেতর হাজারো প্রশ্ন উড়াউড়ি করলেও ঠোঁটের ডগায় এসে আটকে গেল তার কৌতূহল।
__________________________________________
ধূসর মেঘে ঢেকে গেছে সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশ। শীতল বাতাসের দাপটে অস্থির গাছপালা। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে মেঘের গর্জন জানান দিচ্ছে আসন্ন বৃষ্টির আগমনী বার্তা। বহুদিন পর বৃষ্টির দেখা পাচ্ছে মাহি! ঘরে মন টিকছে না তার। খোঁড়ানো পায়ে ধীরলয়ে কক্ষ থেকে বেরোতে গেলেই আচমকা দৃষ্টি আটকে গেল দরজার দুপাশে। মুহূর্তেই ভড়কে গেল মায়াবিনী! এতদিন দরজার দুপাশে মাত্র দুজন বলিষ্ঠদেহী সশস্ত্র গার্ড থাকলেও এখন পুরো করিডোরজুড়ে অসংখ্য গার্ডের অবস্থান। প্রতি এক হাত দূরত্বে দুজন করে দাঁড়িয়ে আছে। অদূরে রাইফেল হাতে নিঃশব্দে টহল দিচ্ছে আরও কয়েকজন।
রমণী এক পা কক্ষের বাইরে বাড়িয়েও পরক্ষণেই অস্বস্তিতে গুটিয়ে নিল। শুকনো ঢোক গিলে দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে, বামদিকে কৌতূহলী দৃষ্টি ফেলতেই ডানদিক থেকে ভেসে এলো অতিপরিচিত এক কণ্ঠস্বর—
“কী করছো, মুনলাইট?”
আচমকা আঁতকে উঠল মাহি। হকচকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তার সামনে এসে উপস্থিত হলো মিলা। মুখাবয়ব গম্ভীর।
“কিছু লাগবে?”
জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে খানিক বাদে জবাব দিল মাহি,
“আজ করিডোরজুড়ে এত গার্ডস কেন, মিলা?”
নিঃশব্দে মৃদু হাসল মিলা। বুকের কাছ থেকে হাত দুটো নামিয়ে আলতো করে ধরে ফেলল মাহির ডান হাত। অতঃপর ধীরলয়ে তাকে করিডোরে নিয়ে এসে ক্ষীণস্বরে শুধাল,
“শুধু আজ বলে নয়, মুনলাইট। গত ষোলো দিন ধরে পুরো প্যালেসেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশ্বাস না হলে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একটু উঁকি দিয়েই দেখো না।”
কৌতূহলী অষ্টাদশী তক্ষুনি মিলার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেল রেলিংয়ের কাছে। আগ্রহ নিয়ে খানিক উঁকি দিতেই বিস্ময়ে থমকে গেল সে। মিলার কথামতো সত্যিই পুরো প্যালেসজুড়ে টহল দিচ্ছে মনস্টারের বাধ্য অনুচরেরা। এক অদ্ভুত গুমোট নিস্তব্ধতায় মুড়ে আছে চারপাশ। অন্য সময় মেইডদের টুকটাক আওয়াজ ভেসে এলেও এখন সবটাই কেমন বিষণ্ন নীরব! সন্দিগ্ধতায় কপাল কুঁচকে তক্ষুনি ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল মাহি,
“প্যালেসে এত শান্তি কেন, মিলা? কী হচ্ছে এখানে?”
প্রতুত্তরে ঘাবড়ে গেল মিলা।
“কিছু না!”
“সত্যি?”
মাহির সন্দিগ্ধ কণ্ঠে আবারও নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মিলা। আর প্রশ্ন করল না মাহি। ভ্রুযুগল সামান্য কুঁচকে কক্ষের দিকে পা বাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,
“ঠিক আছে! কিছু না হলেই ভালো। আমার কিউটিকে নিয়ে আসো, মিলা। আমার অবর্তমানে বাচ্চাটা নিশ্চয়ই গুমরে ম*রছে।”
কিউটির প্রসঙ্গ উঠতেই হকচকিয়ে উঠল মিলা। মুহূর্তেই তার মুখমণ্ডলে নেমে এল একরাশ ভয়ের ছাপ! অলক্ষ্যে ভীতসন্ত্রস্ত ঢোক গিলে আমতা-আমতা করে আওড়াল,
“কিউটি?”
সহসা পা থামাল মাহি। কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“হ্যাঁ! আমার কিউটি! কেন? এক দিনেই ওকে ভুলে গেলে নাকি?”
তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না মিলা। কেবল অস্থির হাতে নিজের আঙুলগুলো কচলাতে লাগল।
“আসলে... মুনলাইট! কিউটি...”
বুকটা হঠাৎই ধক করে উঠল রমণীর। অজানা আশঙ্কায় পরমুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল তার কণ্ঠ।
“মিলা? আমার কিউটি কোথায়?”
ঘাড় নুইয়ে রেখেছে মিলা। মুখে ব্যথাতুর ছাপ স্পষ্ট! এদিকে তার প্রতিটি নীরবতাই কাঁটার মতো বিঁধছে মাহির অন্তঃকরণে। টলমল পায়ে খানিক এগিয়ে এসে আচমকা দুহাতে খামচে ধরল মিলার বাহু। তাকে সামান্য ঝাঁকিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে আওড়াল সে,
“কথা বলছো না কেন, মিলা? কোথায় আমার কিউটি সোনা? বলো, কোথায় আমার আদুরে বাচ্চাটা?”
“ও... ও... আর নেই, ম-মুনলাইট!”
সহসা থমকে গেল মাহি। স্তব্ধ হয়ে গেল তার সমগ্র অভিব্যক্তি। হতবিহ্বলতায় মিলার বাহু থেকে আলগা হয়ে এলো শক্ত আঙুলগুলো। দৃষ্টি হয়ে উঠল ঝাপসা। কথাগুলো যেন বিষাক্ত তিরের ফলার মতো বিদ্ধ হলো তার কোমল অন্তঃকরণে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসতেই ফাঁক হয়ে গেল অধর। হাঁপরের মতো লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে কম্পিত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ক-কী ব-বললে?”
অলক্ষ্যে কাঁদছে মিলা। নতমুখেই ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল,
“কিউটি... তোমার কিউটি সোনা আর নেই, মুনলাইট! চেরি ব্লসম গার্ডেনে ওকে দাফন করা হয়েছে!”
দুঃখের পাহাড় যেন নিমিষেই ভেঙে পড়ল মাহির মাথায়। কানের পাশে হচ্ছে ভোঁ ভোঁ শব্দ। অজান্তেই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুধারা। এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত—এভাবে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে কাটিয়ে পরক্ষণেই উদ্ভ্রান্তের মতো হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে দিল রমণী। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল বারান্দার মেঝেতে। তার হৃদয়বিদারক কান্নায় কেঁপে উঠল চারপাশ। টহলরত মনস্টারের অনুচরেরা ঘাবড়ে গেলেও সাহস করল না এগিয়ে আসার। ক্রন্দনরত মিলা নিজেও পারল না মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে। কাঁদতে কাঁদতেই পরক্ষণে হাঁটু গেড়ে বসল মাহি'র সামনে।
মাহি কাঁদছে! পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদছে সে। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে থেমে থেমে আওড়াচ্ছে,
“হু? হু ডেয়ারড টু কিল মাই বেবি? হু ডেয়ারড...”
খানিক ঢোক গিলল মিলা। নাক টেনে অস্ফুটে শুধাল,
“দ্যাট ইজ মনস্টার! হি শ্যট ইয়োর কিউটি।”
মুহূর্তেই কান্না থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মাহি। বিধ্বস্ত মুখে অস্ফুটে আওড়াল,
“মনস্টার?”
ওপর-নিচ মাথা নাড়ল মিলা, “হু!”
এবার ঠোঁট ভেঙে আবারও কেঁদে উঠল মাহি। সর্বহারার মতো এক পলকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিলো বহুগুণে। তার এমন করুণ দশা দেখে বুক ভেঙে আসছে মিলারও। হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলেই আচমকা ঝটকা মে*রে তার হাত দুটো সরিয়ে দিল মাহি। কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল,
“ডোন্ট... ডোন্ট টাচ মি! ডোন্ট টাচ মি। অল অফ ইউ আর মার্ডারার।”
মিলা বুঝি বাক্রুদ্ধ। নতমুখে চুপচাপ বসে রইল কিয়তক্ষন। কান্নারত মাহি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল ততক্ষণে। মিলা ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাতেই দেখল, দুপায়ে ভর দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো করিডোর ধরে ছুটে যাচ্ছে সে। মিলা তক্ষুনি কণ্ঠ উঁচিয়ে ডাকল,
“মুনলাইট! ওয়েট!”
শুনল না মাহি। খোঁড়ানো পায়ে ছুটতে গিয়েই আচমকা তলপেটে ভীষণ চাপ অনুভব করল সে। নাক-মুখ কুঁচকে পায়ের গতি সামলাতে দুহাতে চেপে ধরল তলপেট। অধরে দাঁত বসিয়ে কোনোমতে অসহ্য ব্যথাটুকু সহ্য করে আবারও ছুটতে শুরু করল।
পথিমধ্যে অদূর থেকে ছুটে আসছিল হায়া। মাহি তার দিকে ফিরেও তাকাল না। কাঁদতে কাঁদতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে হায়া সন্দিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ডিয়ার? এ অবস্থায় এভাবে ছুটে যাচ্ছো কোথায়?”
জবাব দিল না মাহি। কেবল উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেল। হায়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। কয়েক মুহূর্ত পর ঘাড় ঘুরিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মিলার দিকে তাকাল। পায়ে গতি বাড়িয়ে তার কাছে এসে নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ও এভাবে কোথায় ছুটল, মিলা? কী বলেছো ওকে তুমি?”
“হায়া! মুনলাইট জানতে পেরে গেছে কিউটির বিষয়ে।”
আঁতকে উঠল হায়া। অস্থির কণ্ঠে পরপর প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“হোয়াট দ্য হেল! ও কী করে জানল কিউটির বিষয়ে? আর তুমি... তুমি ওকে সবটা খুলে বলেছ তো, মিলা? বলেছো তো, কিউটি কীভাবে মা-রা গেছে?”
নিঃশব্দে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল মিলা। ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল,
“বলেছি!”
_________________________________________
বেপরোয়া বাতাসের তালে অস্থির চারপাশ! ক্রন্দনরত চঞ্চলা চড়ুইয়ের পদক্ষেপও বড্ড অস্থির। বাতাসের দমকে বারংবার ছিটকে যাচ্ছে এদিক-ওদিক। উড়ছে তার এলোমেলো চুলসহ, পরনের কাপড়! সেদিকে অবশ্য ভ্রুক্ষেপহীন মাহি। লাল হয়ে আসা চোখদুটো দিয়ে তাকিয়ে আছে অদূরে, চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে।
চেরি ব্লসম গার্ডেনের একপ্রান্তে ছোট্ট একটি সমাধিক্ষেত্র। মাটির ওপর এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে ক'দিন আগে খোঁড়া মাটির চিহ্ন। মাথার কাছে সাদা মার্বেলের ছোট্ট একটি ক্রুশ, তার গায়ে খোদাই করা কয়েকটি গোটা গোটা অক্ষর। যেখানে রাশিয়ান হরফে লিখে রাখা — কিউটি সোনা! কবরের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গোলাপি চেরি ফুলের অসংখ্য পাপড়ি। অস্থির বাতাসে ডাল থেকে খসে পড়া পুষ্পদলগুলো কখনো কবরের ওপর, কখনো-বা স্যাঁতসেঁতে ঘাসের বুকে আশ্রয় নিচ্ছে অকপটে। অথচ প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ আয়োজনেও বিন্দুমাত্র প্রশান্তি নেই মাহি'র। বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো সে। খোঁড়ানো পায়ের প্রতিটি টান যেন শরীরের চেয়েও বেশি ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে তার ভেতরটাকে। চোখের সামনে সমাধিটি স্পষ্ট হতেই থমকে দাঁড়াল রমণী। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক চেয়ে রইল কবরের দিকে। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো কেমন যেন দলা পাকিয়ে উঠল কণ্ঠনালিতে। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল বারকয়েক।
ধীরে ধীরে বিধ্বস্তের ন্যায় কবরের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মাহি। কম্পিত দু'হাতে আঁকড়ে ধরল সমাধির একপাশ। ঘোলাটে দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভগ্নকণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ কিউটি-হ!”
বলতে বলতেই কবরের ওপর কপাল লুটিয়ে দিলো রমণী, মুহুর্তেই বুকের ভেতরকার সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল তার। এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা কান্নাগুলো হঠাৎ করেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো। কান্নার দমকে কাঁধদুটো থরথর করে কেঁপে উঠতেই, আঙুলগুলো মুঠোবদ্ধ হয়ে চেপে ধরল কবরের পাশের নরম ঘাস। কান্না বিজড়িত কন্ঠে শুধালো,
“ কেন? আমাকে একা করে কেন চলে গেলে কিউটি? এই কারাগারটায় তুমি বিনে আমার আপন বলতে তো কেউ ছিল না, কিউটি! তাহলে কিভাবে পারলে আমাকে রেখে চলে যেতে?”
হুহু কান্নার শব্দ বাড়ছে মাহি'র! বাতাসের অস্থির ঝাপটায় বাগানের চেরি ফুলগুলো নিমিষেই ঢেকে দিচ্ছে তার ক্ষুদ্র তনু। কান্নার একপর্যায়ে কানদুটোয় যেন হুট করেই বেজে উঠল মিলার বলা শেষ কথাটি!
“ মনস্তার শ্যট ইয়োর কিউটি।”
তৎক্ষনাৎ কঠিন হয়ে গেল চঞ্চলার মুখ অভিব্যক্তি। চোখদুটো তখনো ঝরাচ্ছে অশ্রু! কবরের দু'পাশে শক্ত করে চেপে ধরে, নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে পুনরায় বুকভাঙা কাতর আর্তনাদে আওড়াল,
“ সব দোষ আমার! সব দোষ... আমার! একজন জঘন্য পুরুষকে ভালোবাসার মোহে আবদ্ধ করতে চাওয়াটাই ছিলো আমার এই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাপ, আর আমি অভাগী স্বেচ্ছায় সেই পাপের কলঙ্কে নিজেকে কলঙ্কিত করেছি।”
_____________________________________________
“একদিন তুইও আফসোস করবি, মুগ্ধ! আমি হতভাগা আজ তোকে অভিশাপ দিলাম — একটা সময় তুইও কাঁদবি। যতটুকু কান্না আজ আমার চোখ দিয়ে বেরুচ্ছে, তারচেয়েও বহুগুণ বেশি তোর চোখ দিয়ে বেরুবে একদিন। নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে নিজের কাছে আঁকড়ে রাখতে চেয়েও না রাখতে পারার যন্ত্রণায় কাঁদবি তুই! আমার মতো ছটফট করবি একদিন। বেঁচে থেকেও প্রতিনিয়ত সহ্য করবি মরণযন্ত্রণা! সেদিন বুঝবি—প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্টটা ঠিক কতখানি! সেদিন তুই বুঝবি মির্জা সায়ান মুগ্ধ, বুঝবি তুই — জীবনের একমাত্র দূর্বলতায় কেউ আঘাত করলে ঠিক কতখানি গভীর ক্ষত হয় এই হৃদয়ে।”
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যভরা হাসি টেনে অদূরের সোফাটায় বসে আছেন মাফিয়া বিস্ট। সিগারেটে শেষবারের মতো একটা টান দিয়ে মুখভর্তি ধোঁয়া ছাড়ঁছে বড্ড দাম্ভিকতার সাথে। শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল,
“ যার মধ্যে মন বলতে কিছুই নেই, যার জীবনে দূর্বলতা নামক অভিশাপ নেই, তার হবে কষ্ট? সিরিয়াসলি? হোয়াট আ জোক কিডো!”
মুহুর্তেই রেহান নামক হতভাগার জলে ছলছল চোখদুটোর ভগ্নদৃষ্টির তীর একত্রে তাক হলো অভিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের পানে। ব্যথায় জর্জরিত মুখটাতে এবারে আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে ব্যথাতুর হাসির রেশ। অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে আহত রেহান আবারও চিৎকার দিয়ে বলে উঠল,
“ মন ছাড়া মানুষ হয় না মির্জা সায়ান মুগ্ধ! আজ তোর দূর্বলতা নেই তো কি হয়েছে? একদিন হবে! আমি দু'হাত তুলে রবের কাছে প্রার্থণা করছি, অতি শীঘ্রই তোর জীবনে এমন একজন আসবে, যে হবে তোর একমাত্র দূর্বলতা! যাকে হারানোর জন্য একদিন ঠিক আমার মতো কাতরাবি তুই! মনে রাখিস, রিভেঞ্জ অব নেচার বলেও একটা কিছু থাকে। আমার এই অভিশাপ একদিন ফলবেই, তুই একদিন কাঁদবি ঠিকই। সেদিন তোর দূর্বলতায় আঘাত হানবে সকলে, ঠিক যেভাবে তুই আঘাত করিস সবার ক্ষেত্রে। তুই কাঁদবি, সায়ান! তুই কাঁদবি! তোরও দুর্বলতা তৈরি হবে, হবেই হবে!”
“নোওওও! নোওওও!”
আকস্মিক এক আর্তচিৎকারে ঘুমের অতল থেকে ছিটকে জেগে উঠল মাফিয়া বিস্ট! কপালে তার মোটা ব্যান্ডেজ, তাতে জমাটবাঁধা র*ক্তের ছাপ স্পষ্ট। শুভ্র কাপড়ের কয়েক পরত আড়াআড়িভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার বলিষ্ঠ বক্ষদেশ ও ডান কাঁধজুড়ে। বুকের নিচ থেকে ডান বাহুর ওপরাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যান্ডেজের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে গাঢ় ট্যাটুর নকশা। শুভ্র কাপড়ের গায়ে লেগে আছে র*ক্তের ছোপ ছোপ দাগ। অস্থিরতায় তীব্র বেগে ওঠানামা করছে তার বক্ষপিঞ্জর। দরদর করে ঘাম ঝরছে সর্বাঙ্গ বেয়ে। অথচ ঘুমভাঙা চোখজোড়ায় এখনো লেগে আছে একরাশ আতঙ্কের ছাপ। কি দেখল সে? কেন দেখল অতীতের সেই দৃশ্য? কেন আজ এতগুলো দিন পর মাহি'র দুলাভাইয়ের দেওয়া কাতর অভিশাপগুলো তার কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠেছে? কেন, কেন, কেন?
অস্থিরতায় ঘামছে মাফিয়া বিস্ট। ঘর্মাক্ত মুখখানা মুছে নেওয়ার প্রয়াসে দুহাত তুলতেই ডান হাতে সূচালো এক অনুভূতি টের পেলেন তিনি। কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল বেডস্ট্যান্ডের পাশে ঝুলতে থাকা ব্লাড ব্যাগ ও স্যালাইনের নল, যা তাঁর শরীরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্যানোলার মাধ্যমে। মুহূর্তেই সুদর্শনের কপালে ফুটে উঠল বিরক্তির রেখা। তক্ষুনি এক টানে হাত থেকে ক্যানোলার সুই খুলে ফেলতেই ক্ষতস্থান দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এল র*ক্ত। ব্যথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না তিনি। বরং দুঃস্বপ্নের জের ধরে প্রেয়সীর চিন্তায় অস্থির হয়ে, আহত শরীরের তোয়াক্কা না করে উঠে বসলেন বিছানা থেকে। অসীম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়া স্বত্বেও আজ কেমন প্রথমবারের মতো আতঙ্কিত কন্ঠে আওড়ায় সে,
“ নো...নো! কিচ্ছু হবে না আমার দূর্বলতার! কিচ্ছু হতে দিবো না ওর। কেউ ছুঁতে পারবেনা আমার দূর্বলতাকে। কেউ নাহ!”
খানিক থামলো মুগ্ধ। পরক্ষণেই শুষ্ক ঢোক গিলে, আহত পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহটা টেনেহিঁচড়ে ছুটিয়ে আনমনে অস্থির হয়ে শুধালো,
“ সিগনোরা! সিগনোরা-হ! তুই আমায় কখনো ছেড়ে যাবি না তো? তুই আমাকে কখনো একা করে দিয়ে চলে যাবি না তো? দেখ..তু-তুই ছাড়া আমার কেউ নেই। ট্রাস্ট মি, তুই না থাকলে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাবো আমি, ম'রে যাবো প্রিয়তমা-আহ!”
পেন্টহাউজের নিস্তব্ধ করিডর দিয়ে উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটছে মুগ্ধ! তার ধুপধাপ পদধ্বনিতে কাঁপছে গোটা বারান্দাটা। সেই শব্দ ধ্যান কাড়লো করিডোরের আরেকপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখো এডউইনের। ভড়কে গিয়ে তক্ষুনি অন্য এক গার্ডের সঙ্গে চলতে থাকা জরুরী বাক্যলাপ মাঝপথে থামিয়ে ছুটে এলো সে। ছুটতে থাকা মনস্টারের পিছু নিয়ে উচ্চকণ্ঠে শুধালো,
“ মনস্তার! মনস্তার, হোয়্যার আর ইউ গোয়িং?”
তৎক্ষনাৎ জবাব দিলেন না রূঢ় মানব। ব্যস্ত পায়ে ছুটতে ছুটতে, দু'হাতে গায়ের ওপর জড়াচ্ছে পাতলা ফিনফিনে শার্টটা। ব্যাকুল এডউইন ফের গতি বাড়াল পায়ের। আচমকা এক অদ্ভুত ঔদ্ধত্য দেখিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল মনস্তারের। ভয়ার্ত ঢোক গিলে শুধালো,
“ মনস্তার! মনস্তার কোথায় যাচ্ছেন আপনি? প্লিজ, হেভ আ লুক এট ইয়োরসেলফ।”
সহসা চোয়াল শক্ত করে, এক হিং স্র থাবায় বেচারা এডউইনকে সম্মুখ থেকে ঝটকা মে'রে সরিয়ে দিলো মুগ্ধ! চিড়বিড় কন্ঠে বলল,
“ হু দ্য ফা**ক আর ইউ টু কোয়েশ্চন মি, বা*স্টার্ড?”
এহেন কান্ডের আকস্মিকতায় না ভড়কে ফের শরীরটা ঘুরিয়ে এনে মনস্টারের সামনে এসে দাঁড়ালো এডউইন! বিনীত কন্ঠে আওড়াল,
“ মনস্তার প্লিজ..ইউ্য আর নট ওকে! ফর গড স্যাক, এখন অন্তত একটু রেস্ট নিন।”
দাম্ভিক রূঢ় মানব সে-সবে কান দিলেন না। বরং গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বড় বড় কদমে এগোতে লাগলেন সম্মুখে। আনমনে তখনো বিড়বিড় করছেন,
“ সিগনোরা-হ! সিগনোরা-হ.. আ'ম কামিং!”
বিড়বিড়িয়ে বলা বাক্যগুলো বেশ শুনলো এডউইন। তক্ষুনি তার কপালের চামড়ায় ফুটে উঠল গোটাকতক অপ্রসন্নতার ভাঁজ! এগিয়ে এসে মনস্টারের পাশাপাশি পায়ের তাল অব্যহত রেখে গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ মনস্তার! মনস্তার আগে নিজের অবস্থাটা একটু দেখুন। তারপর নাহয় সিগনোরার কাছে যাবেন। তাছাড়া উনার জন্য এতো ব্যস্ত হতে হবে না আপনার, কেননা উনার জন্যই কিন্তু আপনার আজ এই হা..”
বাকিটা জিভ খসানোর পূর্বেই বেচারা এডউইনের কন্ঠনালী বরাবর আচমকা চেপে বসল মনস্টারের হিং স্র থাবা! মুহুর্তেই এক দৈবাৎ শক্তির ভারে তার পাদু’টো উঠে গেল শূন্যে, গলায় লাগল ফা***স! এডউইন ছটফাটাচ্ছে ভীষণ, অথচ সম্মুখের নির্দয় মানব কেমন চোয়াল শক্ত করে অগ্নিদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার পানে। ক্ষণকাল পেরুতেই হিং স্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে আওড়ায়,
“ জাস্ট হোল্ড ইয়োর টাং, বাস্টা'র্ড! হোয়াটএভার দ্য ফা*ক শি ইজ, শি'জ মা'ই ফা**কিং ওয়াইফ। সো, ডোন্ট ইউ ডেয়ার সে আ সিঙ্গেল ওয়ার্ড এগেইনস্ট হার। গট ইট, এসহোল?”
নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার উপক্রম এডউইনের। তক্ষুনি তাকে হাওয়ার বেগে একপ্রকার উচ্ছিষ্টের ন্যায় ছুঁড়ে ফেলল মুগ্ধ। অতঃপর হনহনিয়ে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে! ওদিকে এডউইন হাঁপাচ্ছে! নিঃশ্বাস টানছে হাঁপরের ন্যায়।
★
পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ! দক্ষ শিকারীর ন্যায় মাফিয়া বিস্টের খুব একটা সময় লাগলো না সে পথ পার করতে। টলমল কদমজোড়া বেগতিকভাবে ছুটিয়ে চেরি ব্লসম গার্ডেনে প্রবেশ করতেই দৃষ্টিজোড়া আচানক থমকে গেল তার। থমকে গেল অদূরের সমাধিফলকের ওপর লুটিয়ে থাকা ব্যাক্তিগত রমণীর পানে। মাত্র ক'টাদিনের জন্য সচক্ষে চঞ্চলাকে দেখতে না পারার আক্ষেপে ক্লান্ত সে, এতক্ষণে বুঝি চোখদুটো খানিক স্বস্তি পেলো। হৃদয়ে লাগলো দোলা। কদম জোড়া ধীরলয়ে এগোলো মায়াবিনীর পানে। বড্ড নিকটে এসে অস্ফুটে ডাকল,
“ প্রিয়তমা-আহ!”
সঙ্গে সঙ্গে কবরের ওপর থেকে মাথা তুললো মাহি। কান্নার দমকে ফুলে উঠেছে তার চোখদুটো, লাল হয়েছে সুশ্রী মুখমণ্ডল! মুগ্ধ আরও একপা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মেয়েটার পেছনে। ক্লান্ত কন্ঠে আবারও বলল,
“ হোয়াট আর ইউ্য ডুয়িং হিয়ার?”
মাহি পিছু ফিরলো না! কঠোর কন্ঠে জবাব দিলো,
“ নিজ মর*ণের অপেক্ষা!”
আচমকাই বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল রূঢ় মানবের। কামড়ে ধরল অধর!
“ আমার আগেই?”
“ প্রকৃতি চাইলে তা-ই সই! প্রকৃতির নীতি বলতেও তো কিছু একটা থাকে।”
রমণীর এরূপ মোটা কন্ঠে আহত হাসলো রূঢ় মানব। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ বিশ্বাসঘাতকদের মুখে নীতিবাক্য মানায় না! আমার ছলনাময়ী প্রিয়তমা-আহ!”
সহসাই বুক ভেঙে আসতে চাইলো মাহি'র। দু-অধরে ফাঁক বাড়িয়ে কপট ঝাঁঝিয়ে বলল,
“তাহলে কী আপনার মতো খু*নিদের মুখে মানায়?”
“ মানানো গেলেই মানায়।”
কপাল গোছালো মাহি! ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে শুধালো,
“কীভাবে মানাবে? আপনি যে একটা হিং স্র, জানো*য়ার!”
ক্লান্তিতে বারংবার জিভ দিয়ে অধর ঠেলছে মুগ্ধ। খানিক বিরক্ত হয়ে বলল,
“নতুন কিছু বল, চাশমিস!”
“ তাকে কেন মা*রলেন?”
মাহি'র কট্টর প্রশ্নের জবাবে রূঢ় মানব ব্যক্ত করলেন তার ভনিতাহীন প্রতুত্তর —
“ তোকে ছুঁয়েছে বলে!”
“ এভাবে কতজনকে মা'রবেন?”
“ যতজন তোকে ছোঁবে!”
“ আমার অঙ্গে স্পর্শ করা মানুষদের নাহয় নিজের হিং**স্রতার বশবর্তী হয়ে হ**ত্যা করবেন, কিন্তু... তাই বলে এই নিষ্পাপ প্রাণটার কী এমন অপরাধ ছিল?”
কিউটির কবরের দিকে আঙুল তাক করে প্রশ্ন ছুড়ঁল মাহি। মুগ্ধ ঘাড় বাকিয়ে দেখল একবার! পরক্ষণেই নির্লিপ্ত কন্ঠে জবাব দিলো —
“ অপরাধ থাকলে ওর জায়গা এখানে নয় বরং প্রাডার পেটে হতো!”
মুহূর্তেই রণমূর্তি ভাব ধারণ করল মাহি। শক্ত হয়ে এলো তার চোয়াল। কবরের পাশেই পড়ে আছে মাটি মেশানোর কাজে ব্যবহৃত একটি ধাতব বেলচা। লম্বা কাঠের হাতলটি শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে আচমকাই পিছু ঘুরে দাঁড়াল সে। পরক্ষণেই তা দিয়ে আক্রমণ করে বসল রূঢ় মানবকে। মুহূর্তেই বেলচার তীব্র আঘাত আছড়ে পড়ল মুগ্ধের প্রশস্ত বুকে। তবুও পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। সে দেখেছে মাহি'র বেলচা তুলে নেওয়া। চাইলে দক্ষ যোদ্ধার মতো অনায়াসেই সরে যেতে পারত,তবুও কেন যেন নিজেকে সরাল না মুগ্ধ।
ওদিকে মাহি আজ উন্মত্ত! দিশেহারার মতো একের পর এক জোরালো আঘাতে পিষ্ট করে চলেছে রূঢ় মানবের শরীর। আগে থেকেই গভীর ক্ষতে জর্জরিত মুগ্ধের শরীরটা নতুন আঘাতের অভিঘাতে আরও ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠল। সহসাই ব্যান্ডেজ ভেদ করে গলগল করে র*ক্ত ঝরতে শুরু করল তার শরীর থেকে। কালো শার্টের সঙ্গে রাতের অন্ধকার মিশে একাকার হয়ে থাকায় র*ক্তের সেই ছোপ অনায়াসে এড়িয়ে গেল উন্মত্ত রমণীর চোখ।
প্রেয়সীর উচ্চতা নিজের তুলনায় কম হওয়ায় তার পক্ষে আঘাত হানতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ দুহাঁটু মাটিতে গেড়ে বসে পড়ল মুগ্ধ। মাহি যেন এতে আরও সাহস পেয়ে গেল। হাতের বেলচাটি ছুড়ে ফেলে আচমকা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চড় বসাল মুগ্ধের সুশ্রী গালে। একটা, দুটো—পরপর অসংখ্য চড়!
যার গায়ে সামান্য টোকা দেওয়ার সাহস করলেও প্রাণ হারানো নিশ্চিত, আজ তার গায়েই একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে মাহি। তাও কী দুঃসাহস নিয়ে! অদূর থেকে একযোগে ছুটে আসা এলেক্স এবং এডউইন এরূপ অযাচিত দৃশ্য দেখে আকাশ থেকে পড়ল বোধহয়! বিস্ময় নিয়ে ক্ষণকাল তাকিয়ে থেকে যেই না এগিয়ে আসবে ওমনি তাদের পানে অগ্নিদৃষ্টে তাকিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়ল মাহি!
“ খবরদার! আর একপা এগোনোর দুঃসাহস দেখালে,আল্লাহর কসম, সবগুলোকে আজ জ*বাই করব আমি!”
এডউইন, এলেক্স এমন ধমকিতে না থমকালেও, মনস্টারের বাহাতের তর্জনীর অলক্ষ্য ইশারায় ঠিকই থেমে গেল পথিমধ্যে! এদিকে, ক্ষুব্ধ বাঘিনীর ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে মাহি। পা*গলের ন্যায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফের হাতে নিলো বেলচাটা। আবারও মুগ্ধের গায়ের ওপর জোরালো আঘাত হেনে কাঁদতে কাঁদতে আওড়াল,
“ জানো*য়ার! একটা জানোয়ারকে ভালোবেসেছি আমি। আপনার মতো একটা নির্দয়, জানোয়ারকে ভালোবেসে নিজের হাতে নিজের জীবনটা ধ্বংস করেছি আমি! ইউ্য ব্লা'ডি সাইকো! ইউ্য জাস্ট ফন্ড অব মা'ই বডি নাথিং এলস। কথায় কথায় নিজের হিং স্রতার প্রমাণ দেওয়া, কথায় কথায় আমার বাবাকে টেনে আমাকে কথা শোনানো, কথায় কথায় গা*লিগালাজ করা! আর এতকিছু সহ্য করার পরও আপনার মতো জানোয়ারকে মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে বিনিময়ে আমি কি পেলাম? জাস্ট আ লিটল বিট ফা'কিং ইন্টি*মেসি এন্ড ইয়োর বুলশিট টাইপ অফ সাইকোনেস! যেখানে আমার প্রতি বিন্দুমাত্র ভরসা নেই, আমার ভালোবাসার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান নেই, সেখানে আমাকে নিজের কাছে আঁটকে রেখে কি প্রমান করতে চান, অধীর রায়?”
থামল মাহি! হাঁপাচ্ছে ভীষণ। মুগ্ধের পলকহীন দৃষ্টি তার পানে নিবদ্ধ। মাহি অধর কামড়ে আবারও এগিয়ে এসে আচমকা চেপে ধরল মুগ্ধের চোয়াল। অতঃপর হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আম্মা! আম্মা! আম্মা! এক আম্মার জন্য নির্দয় হয়েছেন, মাফিয়া বিস্ট হয়েছেন, শৈশব হারিয়েছেন! হারিয়েছেন নিজের নির্মলতা! বারবার বলে গিয়েছেন আমার বাবা দোষী! সব..সবটা মেনে তারপরও আপনার মতো নির্দয়কে প্রাণভরে ভালোবেসে গিয়েছিলাম, মুগ্ধ! যেখানে নিজের পরিবার পরিজনদের উপেক্ষা করে আপনার হাত ধরে পড়ে আছি এই কারাগারে, সেখানে আপনি... নিজের চোখের দেখায় এতোটাই বিশ্বাসী ছিলেন যে আমাকে, আমার আপনার প্রতি নিখাঁদ ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে দু’সেকেণ্ডও ভাবেননি। এতোটাই ঠুনকো আপনার - আমার সম্পর্ক? এতোটাই ঠুনকো অধীর রায়?”
জবাব দিচ্ছে না মুগ্ধ! মাহি আবারও জ্ঞানহীনের ন্যায় আওড়াল,
“ অবশ্য দোষ আপনারও না! দোষ আপনার র*ক্তে! যেই র*ক্ত কাউকে বিশ্বাস করতে শেখায়নি। যেই র*ক্তের আগাগোড়ায় লেপ্টে আছে হিং স্রতা, লেপ্টে আছে কঠোরতা। সে-ই র*ক্তের অধিকারী হয়ে আপনি কীভাবে ভালো হবেন? আপনি আগেও একটা জানো*য়ার ছিলেন, একটা হিং স্র জন্তু ছিলেন! ভবিষ্যতেও তা-ই থাকবেন। নাথিং উই'ল বি চেইঞ্জড! আপনার মতো হিং স্র.. যে কি-না একটা আদুরে পৌষ্যকেও মে'রে ফেলতে দুবার ভাবেনি, সে কি করে অন্যের মমতা বুঝবে? একবার মুখ ফুটে বলেছিলেন — ইউ ওয়ান্ট টু বি দ্য বেস্ট হাজবেন্ড এন্ড দ্য বেস্ট ফাদার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড! হাহ..যে নিজের ওয়াইফ..ওপস সরি! আমিতো ভুলেই গিয়েছি, আমি কেবল আপনার বেড পার্টনার। যে আমাকেই বিশ্বাস করে না, সে কীভাবে হবে বেস্ট হাজবেন্ড? তাছাড়া যার মনের কোণে বিন্দুমাত্র মায়াদয়া নেই, সেই জানো*য়ার, হিং স্র জন্তুটা কীভাবে হবে বেস্ট ফাদার?”
আশ্চর্য! মাহি'র অতো কটুবাক্যে বিন্দুমাত্র হেলদোল না দেখানো রূঢ় মানব আচমকাই তার চোখের কোটর ভরিয়ে ফেলল শেষ কথাটায়! মাহি তবুও থামলো না। উগড়ে দিলো নিজের সকল ঝাঁঝ! আরেকবার সশব্দে মুগ্ধের গাল বরাবর চড় বসিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ যে হাত আমার কিউটিকে মে*রেছে, সেই হাতের মালিক ওরফে আপনার মতো জঘন্য মানুষ কখনো বাবা হবার যোগ্যতাই রাখে না, অধীর রায়! আমি খুব করে চাই, আমার গর্ভে কোনোদিন আপনার মতো নির্দয়ের অংশ না আসুক! কোনোদিন না আসুক!”
চলবে....