#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৭৬(খ)
#jannatul_firdaus_mithila
রাতের শেষ প্রহর গুনতে অপারগ এক রূঢ় মানবের ঘন নিশ্বাসের ঝাপটা! বলিষ্ঠ দেহখানা তার দরদরিয়ে ঘামছে। আবেগের চরম জোয়ারে দুর্বলতার অসীম ছোঁয়া থাকা সত্ত্বেও অটল তার পাহাড়সম দেহসৌষ্ঠব। শক্ত পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কক্ষের ঠিক মাঝখানে। মাথার ওপর ঝুলন্ত ঝাড়বাতি! হলদেটে টিমটিমে আলোয় চকচক করছে তার সর্বাঙ্গ। দেহসৌষ্ঠবে কাপড়ের ছিটেফোঁটাও নেই! বাঁ হাতে কোমর আঁকড়ে, ডান হাতের মধ্যমা ও তর্জনীর মাঝে চেপে রেখেছে জ্বলন্ত সিগার। মাঝেমধ্যে ফুঁক দিচ্ছে তাতে।
পেছনের মখমলি গোলাকার বিছানাটিতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে মায়াবিনী অষ্টাদশী। অচেতন তার রূপ, নিঃশ্বাসের গতি বড্ড ক্ষীণ। বিছানার শুভ্র চাদরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ছোপ ছোপ র*ক্তের দাগ। তার মসৃণ দেহসৌষ্ঠবে কোনোমতে ছড়িয়ে আছে শাড়ির আলগা আবরণটুকু। তাতেও ঢাকা পড়েনি স্পর্শকাতর অঙ্গের বহিঃপ্রকাশ!
কক্ষের একপাশে হাঁ-খোলা জানালা! শো শো করে ধেয়ে আসছে শীতল বাতাস। বাতাসের তালে তালে উড়ে আসছে তুষারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো। তাতেও খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই মাফিয়া বিস্টের। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টেনে ধীরলয়ে এগোচ্ছে অদূরের কালোরঙা পিয়ানোটার দিকে। সামনেই একখানা ছোট্ট টুল! গম্ভীর মুখে সেখানে বসেই তার শক্তপোক্ত আঙুলগুলো ছোঁয়াল পিয়ানোর চাবিতে। মুহূর্তেই টুংটাং শব্দে চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগল ঘরের অভ্যন্তরীণ নীরবতা। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে রেখে ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকাল অদূরের বিছানায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা মানবীর পানে। মেয়েটার সুশ্রী মুখমণ্ডলের সে কী বিধ্বস্ত অবস্থা! যেন কোনো এক যুদ্ধে পরাজিত বিধ্বস্ত সৈনিক সে। রূঢ় মানবের চাহনি বড্ড নির্লিপ্ত। সেখানে আফসোস রয়েছে না-কি হিং স্র রাগ, তা যেন বোঝার জো নেই।
মেয়েটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে সিগারটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে আঙুলের ভাঁজে চেপে ধরল সে। পরপরই বুঁজল দুচোখ। মুহূর্তখানেক বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস টানতেই তার কল্পনার মানসপটে হুট করে ভেসে উঠল — তার সম্পূর্ণ অতীত জুড়ে কব্জা করে বসে থাকা এক অতিপরিচিত অপ্সরার সুশ্রী মুখ। যিনি চাঁদনী রাতে উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসে আছেন, তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছোট্ট এক নাবালক! সে-কি নাদুসনুদুস গায়ের গড়ন বাচ্চাটার। ফোলা ফোলা দু'টো গাল। মায়ের কোলে পরম শান্তিতে মাথা রেখে গুনছে আকাশের তারা! মাঝেমধ্যে খিলখিল করছে আপনা-আপনিই। মা তার গাইছে গান। হাঁটু সমান ঘন কালো কেশরাশিতে বিনুনি গাঁথতে গাঁথতে সুরেলা কোকিলা কন্ঠে গাইছে —
“ কন্যার চিরল বিরল চুল
তাহার কেশে জবা ফুল..(২)
সেই ফুল পানিতে ফেইলা
কন্যা করল ভুল....”
অপ্সরার ওমন সুরেলা কণ্ঠের গান শুনে চাঁদও বোধহয় লজ্জায় বারংবার ঢেকে নিচ্ছে মুখ! ছোট্ট নাবালক তারা গোনা বাদ দিয়ে মনোযোগ দিয়েছে মায়ের গানে। নিজেও বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে মায়ের সঙ্গে। হঠাৎই কী মনে করে বড্ড উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল বাচ্চাটা!
“আম্মা! আমি বড় হয়ে তোমার মতো খুব ভালো গান গাইব, দেখে নিও! তারপর সবাই তোমার মতো আমারও খুউব প্রশংসা করবে।”
ছেলের মুখে ওমন অলক্ষুণে কথা শুনে মুহূর্তেই রঙ পাল্টে গেল অপ্সরার সুশ্রী মুখমণ্ডলের। অত ভালো গানের সুরটা আটকে গেল গলার কাছে! ভয়ার্ত ভাবস্রোতে তক্ষুনি ঢোক গিললেন তিনি। তড়িঘড়ি করে ছেলের মাথাটা নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে, কপট রাগী কণ্ঠে শুধালেন,
“চুপ! একদম চুপ। খবরদার, ওই অলক্ষুণে কথাটা দ্বিতীয়বার আর কখনো মুখে আনলে তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব, অধীর! এই গান... এই কণ্ঠ, এই নাচ! এগুলো অভিশপ্ত!”
কাঁপছেন অপ্সরা। বাচ্চা অধীর বোধহয় ভড়কে গেল মায়ের ওমন অজানা শঙ্কা দেখে। তড়িঘড়ি করে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিল নিজের মাথাটা। ছোট্ট কপালখানিতে গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ টেনে আওড়াল,
“আমি গান গাওয়ার কথা বললেই তুমি এত রেগে যাও কেন, আম্মা? তুমিও তো কত ভালো গান গাও। জানো? মা বলেছে, আমার কণ্ঠ নাকি ভীষণ ভালো! তিনি এ-ও বলেছেন, আমি নাকি একদিন খুব বড় গায়ক হবো। কলকাতায় ফিরলে তিনিই আমায় নিয়ে যাবেন আর্ট...”
বাকিটা আর শেষ করতে পারল না অবোধ বাচ্চাটা। তার আগেই গালের চামড়ায় বসল এক বিশাল চপেটাঘাত! যার অভিঘাতে নিমিষেই মুষড়ে গেল তার সকল চঞ্চলতা। ফোলা ফোলা গোলাপি ঠোঁটদুটো উল্টে ফুঁপিয়ে উঠল সে। সম্মুখে বসে থাকা রমণীর বুকটা বুঝি ধক করে উঠল ছেলের ওমন কান্না দেখে। তবুও চোখেমুখে তীব্র বিষাদের যন্ত্রণার ছাপ ফুটিয়ে, শক্ত হাতে ছেলের চোয়াল আঁকড়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন তিনি।
“কতবার বলেছি, ওই মুখে গানের নাম নিতে না! কতবার বলেছি, কলকাতা ফিরে যাবার কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করতে না! এতবার বারণ করা সত্ত্বেও কেন তুই আমার কোনো কথা শুনিস না, অধীর? কেন শুনিস না তোর আম্মার কথা? আমার বুকটা খালি করে চলে যাবার এত তাড়া কেন তোর? ওরা তো সময় হলে তোকে নিয়েই যাবে। আমি... আমি তখন শত বাধা দিয়েও হয়তো...”
ক্রন্দনরত অপ্সরার কথার মাঝেই আকস্মিক বিঘ্ন ঘটল উঠোনের মাঝে হুটহাট ধেয়ে আসা কয়েকটি কালো গাড়ির হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দে। মুহূর্তেই কথা ভুলে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। পাঁচটা কালো গাড়ি সারিবদ্ধভাবে থামল উঠোনের এক কোণে। ধীরে ধীরে গাড়িগুলো থেকে বেরিয়ে এল সাতজন স্বল্পপরিচিত মানব। যাদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হতেই তৎক্ষণাৎ ছেলেকে নিজের পেছনে লুকিয়ে ফেললেন ভয়ার্ত রমণী। ছেলে তার বড্ড চতুর! মায়ের আঁচলের ফাঁক গলিয়ে ঠিকই তাকিয়ে রইল লোকগুলোর দিকে।
বলিষ্ঠ পাহাড়সম তিনজন ভিনদেশি পুরুষ! দামি স্যুট-ব্যুট পরনে তাদের। অন্য একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ছিমছাম গড়নের লোক। ভীষণ ময়লা তার গায়ের রং। মুখটা ঢেকে রাখা একটা সফেদ রঙের রুমাল দিয়ে। আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে আরও তিনজন। তাদের মুখ অস্পষ্ট। কয়েকজন ভিনদেশি লোক গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসেই আওড়াল,
“কথা আছে! ভেতরে আসুন।”
রমণী ঢোক গিললেন। ত্বরিত ছেলের দিকে শরীর ঘুরিয়ে থমথমে কণ্ঠে শুধালেন,
“অধীর! তুই মাঠে যা... ওদিকে ক্যাম্প বসানো পুলিশ লোকগুলোকে চিনিস না? কাল যাদের সঙ্গে দেখা হলো! তাদের গিয়ে বলবি—ওরা এসেছে। যা... যা!”
অধীর মাথা নাড়াল। তক্ষুনি ছোট ছোট পা চালিয়ে ছুটে গেল উঠোনের উল্টোপাশ দিয়ে। ততক্ষণে সেই স্বল্পপরিচিত সাতজন এগিয়ে এসেছে রমণীর ধারে। কেউ একজন রমণীর পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে শুধালেন,
“কাকে আসতে বললেন? রুশদী'স সিগনোরা?”
★
গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে প্রাণপণে ছুটে আসছে ছোট্ট অধীর। তার শরীরজুড়ে অসংখ্য আঁচড় ও ক্ষতের দাগ। পরনের জামাটার কয়েকটি অংশ ছিঁড়ে ফেটে একাকার। হাঁটু দুটির চামড়া ছিলে গেছে। তবুও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। হন্তদন্ত পায়ে ছুটে চলেছে সে।
মেঠোপথ পেরিয়ে বাঁশঝাড়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল মিঠুন কাকার গরু রাখার ছনের ঘরটা। সেটার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ পায়ের পাতায় বিঁধল কোনো ধারালো কাঁটা। অস্ফুটে ককিয়ে উঠে মাঝপথেই থেমে গেল অধীর। পায়ের পাতা উল্টে কাঁটাটা বের করার চেষ্টা করতেই আচমকা ছনের ঘরের আধভাঙা জানালা গলে ভেসে এল কারও অস্ফুট গোঙানির শব্দ। সহসাই ভূতের ভয়ে আঁতকে উঠল বাচ্চাটা। তবুও অদম্য কৌতূহলের টানে অজান্তেই পা বাড়াল সেদিকে।
ছনের ঘরটার খিড়কির বেহাল দশা। অবস্থানটাও বড্ড নিচুতে। অধীরের ছোট ছোট পা দুটো তবুও হাঁটু ভেঙে দাঁড়াল জানালার সামনে। উৎসুক দৃষ্টিতে ভেতরে উঁকি দিতেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল বাচ্চাটার। বিস্ফারিত হয়ে গেল চোখদুটো। চোখের সামনে খড় বিছানো মেঝেতে পড়ে আছে তার অপ্সরার মতো মায়ের ন*গ্ন দেহ। চারপাশে অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পরনের কাপড়গুলো। মুখভর্তি ঠাসা খড়ের স্তূপ। যার কারণে চিৎকারের বদলে কণ্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে কেবল গোঙানির শব্দ। দুজন মানুষরূপী হায়েনা শক্ত হাতে চেপে ধরে রেখেছে রমণীর তুলতুলে পা দুটো। আরও দুজন অবস্থান করছে তার হাতের কাছে। আর তাদের মাঝখানে সেই নিকৃষ্ট পাশবিকতায় লিপ্ত মানুষটা—যাকে খোদ অধীর কিছুক্ষণ আগেই খুঁজতে বেরিয়েছিল! পুরো ক্যাম্প তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি যেই এসআই তায়েফ এহসানকে অথচ তিনিই কি না নিজের পৈশাচিক লালসা চরিতার্থ করতে ব্যস্ত অধীরের মায়ের ওপর! লোকটার চোখেমুখে উপচে পড়ছে কামুকতা। দৃষ্টিতে পা-শবিক উন্মত্ততা। দৃশ্যটা আর সহ্য করতে পারল না ছোট্ট অধীর। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে যে-ই না চিৎকার জুড়বে ওমনি পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা চেপে ধরল তার মুখ! বাচ্চাটার নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে যেন! চোখদুটো অঝোরে ঝরাচ্ছে অশ্রু। অন্তকোণের তীব্র ব্যথায় ছটফটাচ্ছে তার ক্ষুদ্র দেহ! বুকটা বোধহয় তখনো ডেকে যাচ্ছে —
“ আম্মা!”
সহসাই কল্পনার দেয়াল টপকে বাস্তবে ফিরে এলেন মাফিয়া বিস্ট! ধীরলয়ে খুললেন চোখদুটো! না কাঁদার ফলে চোখদুটো কেমন লাল হয়ে গিয়েছে তার। মুখখানায় চাপা যন্ত্রণার তীব্র উপস্থিতি! ঠোঁটের কোণে আচমকা একটুকরো হৃদয় নিঙড়ানো ব্যথাতুর হাসি ঝুলিয়ে পুনরায় ঘাড় বাকিয়ে তাকাল অদূরের অচেতন মানবীর পানে। কয়েকমুহুর্ত নির্বাক থেকে পরক্ষণেই বিড়বিড়িয়ে শুধালো —
“ অথচ, তোকে মে'রে ফেলাটা আমার জন্য ন্যায় হলেও আমার অন্তর তোকে বাঁচিয়ে রাখার প্রস্তাব জুড়ে আমার সঙ্গেই দিনের পর দিন অন্যায় করে যাচ্ছে!”
রূঢ় মানবের আঙুলগুলো ততক্ষণে পিয়ানোর চাবিতে স্পর্শ করল। মাহি'র পানে তাকিয়ে থেকে দক্ষ করুণ কন্ঠে আচমকা সুর তুললো —
“ কন্যার চিরল বিরল চুল
তাহার কেশে জবা ফুল..(২)
সেই ফুল পানিতে ফেইলা
কন্যা করল ভুল....
কন্যা ভুল করিস না(২)
আমি ভুল করা কন্যার লগে
কথা বলবো না....!”
থামলো মুগ্ধ! তক্ষুনি ঠোঁটের কোণে দাঁত বসিয়ে বুজঁল দু-চোখ। নীরব যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে আবারও অস্ফুটে আওড়াল,
“ আক্ষেপ? অতঃপর...চরিত্রহীন বাপের সেই মেয়েকে নিজের মনের সবটা জুড়ে স্থান দিয়েছি, যার মুখের দিকে তাকালে আজও নিজের মায়ের বিধ্বস্ত মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে!”
__________________________________________
তুষারাবৃত ঘন জঙ্গলের ঠিক মধ্যিখানে অবস্থিত একটুকরো স্বর্গ, যা মনস্তার প্যারাডাইস হিসেবে খ্যাত। সেখানে প্রথমবার পা রাখতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া বোকা মানবীর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল রূঢ় মানব! দিনের পর দিন তার সকল ঔদ্ধত্য, দম্ভ দেখতে দেখতে অজান্তেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল বোকা চড়ুই। একটা সময় মনও দিয়ে বসেছিল! অন্ধ হয়েছিল রূঢ় পুরুষটির ভালোবাসায়। তবে হঠাৎই এক অভিশপ্ত দমকা হাওয়া এসে পুনরায় চোখ খুলে দিয়েছে রমণীর। বুঝিয়ে দিয়েছে—হিংস্ররা কখনো ভালোবাসার পাত্র হয় না।
যাকে একটা মুহূর্ত না দেখতে পারলে ক'দিন আগেও নিশ্বাস আটকে যেত মাহির, আজ সেই প্রিয় মানুষটাই হয়ে উঠেছে তার বড্ড অপ্রিয়! তার হিংস্র রূপ, তার দম্ভ, তার সকল বাঁধনহীন ঔদ্ধত্যে ঘৃণায় জমে গিয়েছে তার অন্তঃকোণ। গভীর ঘুমের অতলে ডুবে থেকেও কল্পনার মানসপটে ভেসে ওঠা রূঢ় মানবের মুখখানি দেখে ঘৃণায় নাক-মুখ কুঁচকে যাচ্ছে তার। চোখদুটো বুজে রেখেই বিছানার চাদরের দুপাশ আঁকড়ে ছটফটাচ্ছে সে। ঘামছে অনবরত!
ঠিক তখনই বদ্ধ চোখের পাতায় হুট করেই ভেসে উঠল এক অযাচিত দৃশ্য। যা মুহূর্তেই স্তম্ভিত করে দিল বোকা মানবীকে।
সে দেখছে, ওই যে! কল্পনার মানসপটে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে ছোট্ট এক আদুরে শিশুর সুশ্রী মুখমণ্ডল। চেরি ব্লসমের গার্ডেনে এক বলিষ্ঠ মানবের কাঁধে চড়ে হাঁটছে সে। কী সুন্দর! দেখতে যেন একেবারে জীবন্ত পুতুলের মতো। ফোলা ফোলা গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা দুটো গাল, গাঢ় বাদামি রঙের উজ্জ্বল চুল! তার চেয়েও নজরকাড়া—বাচ্চাটার সমুদ্রনীল দুটো চোখ।
বাচ্চাটা কেমন খিলখিলিয়ে হাসছে দেখো! কার কাঁধে চড়ে আছে সে? হো হো করে কীসব আওড়ে চলেছে। বোকা মানবী বড্ড চেষ্টা জুড়ল লোকটাকে দেখার। কয়েক মুহূর্ত পর হুট করেই লোকটা পেছন ফিরে তাকাল। অমনি দেখা গেল—সে যে আর কেউ নয়, স্বয়ং নির্দয় মাফিয়া বিস্ট! যার নির্দয়তার অভিঘাতে কেঁপে ওঠে গোটা শহর, সেই লোকটাই কি না একটা বাচ্চার সঙ্গে নিজেও বাচ্চা হয়ে গিয়েছে! কী সুন্দর, চমৎকার হাসছে! আদুরে আহ্লাদে যেন মাথায় তুলে নিতে চাইছে বাচ্চাটাকে। রূঢ় মানব বাবুটাকে কোলে নিয়েই তাকিয়ে আছে মাহির পানে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ টেনে তার দিকে আঙুল তাক করে বাবুটাকে বলে যাচ্ছে,
“টেল মি—হু ইজ শি, আম্মা?”
ছোট্ট পুতুলপ্রাণটা আঙুল মুখে রেখেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। চটজলদি রূঢ় মানবের কাঁধে মুখ গুঁজে আধো আধো বুলিতে আওড়াল,
“মাম... মাম... মাম্মাহ!”
ঘুমের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎই ছিন্ন হলো স্বপ্নের ঘোর। অজানা এক আতঙ্কে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল মাহি। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন তান্ডব তুলতে মত্ত, কণ্ঠনালিতে আটকে যাচ্ছে দীর্ঘশ্বাস। কয়েক পলক নির্বাক বসে থেকে চাপ বাড়ালো মস্তিষ্কে। কি দেখল সে? কে ছিলো ঐ বাচ্চাটা? তাকে ওভাবে মাম্মা ডাকলো কেনো?
ভাবতে ভাবতেই অসার হয়ে এলো রমণীর হাত-পা! বড্ড অতিষ্ঠ ভাবস্রোতে এদিক-ওদিক চোখ বুলোয় সে। ঘামে জবজবে অবস্থা শরীরটার। তা নিয়েই মার্বেলের তকতকে মেঝেতে পা নামালো অষ্টাদশী। মুহুর্তেই সর্বাঙ্গ কেমন শিরশিরিয়ে উঠল তার। এক অদ্ভুত ব্যথায় কড়মড় করে উঠল সর্বাঙ্গের হাড়! মাহি থমকে গেল। বিহ্বলিত ভঙ্গিতে বিছানার দুপাশে হাত চেপে কয়েকমুহুর্ত বসে রইল চুপচাপ। ঠিক তখনি, বড়সড় একখানা খাবার ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে কক্ষে প্রবেশ করল মিলা। আনমনা দৃষ্টি অভিমুখে নিক্ষেপ করতেই সহসা থমকে গেল সে। দুয়ারপানে দাঁড়িয়ে হতভম্বের ন্যায় অস্ফুটে আওড়াল,
“ মুনলাইট?”
তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মাহি। মিলা হাতের ট্রলিটি একপাশে রেখেই তড়িঘড়ি ছুটে এল তার কাছে। মাহিকে যারপরনাই বিস্মিত করে দিয়ে আচমকাই দুহাঁটু মেঝেতে গেড়ে বসল সে। পরমুহূর্তেই আকস্মিক ব্যাকুলতায় আঁকড়ে ধরল মাহি'র হাত দুটো। উৎকন্ঠা নিয়ে আওড়াল —
“ কখন উঠলে, মুনলাইট?”
হতভম্ব মাহি কপাল কুঁচকে জবাব দিলো,
“ এইতো, কিছুক্ষণ আগে!”
উদ্বিগ্ন মিলার ব্যাকুলতা কমলো না বোধহয়! তক্ষুনি দু'হাতে জড়িয়ে ধরল মাহি'র গলা। পিঠ আঁকড়ে খানিক ফোপাঁতে ফোপাঁতে আওড়াল,
“ এবারে তোমার অবস্থা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, মুনলাইট! পুরো প্যালেসে গুঞ্জন উঠেছিল তুমি বোধহয় আর বাঁচবে না। আমি...আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো মাহি'র। জোরপূর্বক নিজেকে ছাড়ালো মিলার দৃঢ়বন্ধন থেকে। সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ কেনো? কি হয়েছিল আমার?”
ফাঁপা ঢোক গিলছে মিলা। ত্বরিত নামালো দৃষ্টি! বিচক্ষণী মায়াবিনী কিছু একটা আঁচ করতে পেরে ক্ষীণ কন্ঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“ এবার কতদিন সেন্সলেস ছিলাম? তিনদিন? না-কি দু'দিন? না-কি এরও বেশি?”
কথাটার রেশ শেষ হতে না হতেই নতমুখে জবাব দিলো মিলা —
“ ১৬দিন!”
অগত্যা গম্ভীর হয়ে গেল মাহি! খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে ফোঁস করে ফেলল নিশ্বাস। অতঃপর গম্ভীর কন্ঠেই বলল,
“ বাহ! ভালো তো। আমার দেখছি অর্ধেকটা জীবনই যাবে সেন্সলেস অবস্থায় কাটাতে কাটাতে!”
রমণী ওঠার প্রয়াস চালালো। মিলা আগ বাড়িয়ে ধরতে গেলেই সহসা হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধল মাহি। নিজ প্রচেষ্টায় পা খুঁড়িয়ে ক-কদম হাঁটতেই পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“ তা..বললে না তো! আমার কি এমন হয়েছিল যার জন্য পুরো প্যালেসে আমার ম'রার গুঞ্জন অব্ধি উঠেছিল?”
মিলা কাচুমাচু করছে জবাব দিতে! ওদিকে কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে ভ্রু গোটায় মাহি। দু'টো কদম ফের সম্মুখে বাড়াতেই আচমকা তলপেটে কেমন তীব্র ব্যথা অনুভুত হলো তার। বিষিয়ে উঠতে লাগলো পরবর্তী প্রতিটি ক্ষণ! পাদু’টোর তলে কেমন চপচপে ভাব হচ্ছে মনে হচ্ছে। যেন কোনো তরলে লেপ্টে গিয়েছে তার পা। মাহি বিস্ময় নিয়ে ঘাড় ঝোঁকাল। পরক্ষণেই আঁতকে উঠল ভয়ে!
তার পায়ের তল ভেসে যাচ্ছে লোহুর উপস্থিতিতে। পাদু’টো থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল রঞ্জক তরল!
চলবে......