#আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে
#ফারজানা_মনি
#সিজন_৩
#পর্বঃ৫
আবির আবারো সকলের দিকে তাকিয়ে
বলা শুরু করলো: তোমরা সবাই প্রস্তুতি
নাও.. আগামী পরশুদিন আমরা সবাই
একসাথে সাজেক যাচ্ছি। তৃধা যেই না
আরেকটা চিৎকার দিয়ে বলবে হুররে...
ঠিক তখনই চোখ গেল আহিয়ানের গম্ভীর
মুখে, মুহূর্তেই তৃধা রানী ঠোঁটে এক আঙুল
চেপে বসে রইল। মেঘ আবিরের গ্লাসে
পানি ঢালতে ঢালতে বলল: কিন্তু সবাই
কি এত অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে
যেতে পারবে? তাছাড়া মিম ও ফুপিদের তো
এখনো জানানো হয়নি। এমনকি মিম তো
জানেই না আমরা দেশে ফিরেছি।
এবার তানভীর খেতে খেতে বলল: বনু
তুই এত চিন্তা করিস না.. যেখানে ভাইয়া
আর আমি আছি সেখানে কোন কাজ পড়েই
থাকবে না। আমি আর ভাইয়া বাড়ি ফেরার
সময় ফুপির বাড়িতে গিয়েছিলাম সেখান
থেকে সবকিছু বলে মিমের সাথে দেখা
করে পরেই বাড়িতে ফিরেছি।
আহিয়া খুশিতে গদোমদো হয়ে বলল:
মিম ফুপি জানে আমরা যে দেশে ফিরেছি?
তানভীর মৃদু হেসে বলল: হ্যাঁ জানে । এবার
আহিয়া একটু মন খারাপ করে বলল:
ফুপিকে নিয়ে কেন আসলেনা? তানভীর
ভাগ্নির মাথায় এক হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল:
মন খারাপ করো না মা.. তোমার আরিফ
চাচ্চু বাড়িতে নেই, তাই মীম আসেনি তবে
আরিফের সাথে ফোনে কথা হয়েছে।
আরিফ মিম ও ঊষাকে নিয়ে আগামীকালই
আসবে । এবার আহিয়া খুশিতে বলল:
wow.. that's great. ঊষাকে তো
সামনাসামনি দেখাই হয়নি।
গত ১২ বছরে সকলের জীবনেই অনেক
পরিবর্তন ঘটেছে বিয়ের শুরুতে মিমের
বেবি কনসিভ করতে না চাইলেও, দীর্ঘ
১০ বছর পর আরিফ ও মিমের ফুটফুটে
একটি মেয়ে সন্তান হয়। আরিফ তার মেয়ে
বলতে পাগল তাছাড়া জান্নাত ও আসিফের
মেয়েও অনেক বড় হয়ে গেছে। তৃধা ও
জান্নাতের মেয়ে জুঁই একই গার্লস
কলেজে পড়ে। অন্যদিকে আইরিনের
বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছে ।এখনো
সন্তান নেয়নি তারা। আইরিনকে বড় এক
বনেদি পরিবারে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যৌবনের শুরুতে রাদিফের সাথে তার
একটা ভালো বন্ধুসুলভ সম্পর্ক থাকলেও
সময়ের বিবর্তনে তা কালচে রূপ ধারণ
করেছিল । তাই এই এক জীবনে রাদিফ
ও আইরিনের প্রেমটা অপূর্ণই রয়ে গেল।
বর্তমান..
মেঘ তানভিরের উদ্দেশ্যে বলল ওরা
সবাই যাবে তো? তানভীর জবাবে বলল:
হ্যাঁ, সবাই যাবে ।শুধু ফুপি আর ফুপা বাদে।
মেঘ বলল: কেন?
তানভীর: ফুপির হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে
তাই সে দূরে কোথাও যেতে পারবে না।
এতক্ষণে সকলের কথা শুনে আলী
আহমেদ খান নীরবতা ভেঙে আবিরের
উদ্দেশ্যে বলল : আবির তোমাদের প্ল্যানটা
ভালো কিন্তু আমি আর তোমার আম্মু
যাচ্ছি না। তোমরা সকলে যাও আনন্দ করো।
আবির খানিকটা ভ্রু কুঁচকে বলল: কেন
আব্বু ? চলুন না সবাই একসাথে যাই..
ভালো লাগবে..
এবার মেঘ এসে আলি আহমেদ খান কে
বলল: চলেন না আব্বাজান, সবাই একসাথে
গেলে অনেক মজা হবে।
কিন্তু আলী আহমেদ খান জানালেন: এই
বয়সে তাদের এত জার্নি শরীরের জন্য
অনেক ক্ষতিকর। আলী আহমেদ খানের
কথা শুনে এবার মোজাম্মেল খান, ইকবাল
খান ,হালিমা খান ও আকলিমা খান
একসাথে জানালো তারা কেউই যাচ্ছে
না এবারের ট্রিপে যেন পরিবারের বাকিরা
যায়।
আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল: কি আর
করার.. গুরুজনদের যেখানে অসুবিধা হবে
সেখানে তাদের জোর না করাই উত্তম।
মেঘ ও বন্যার খানিকটা মন খারাপ হয়ে
গেল । সেটা দেখে মোজাম্মেল খান মেয়ে
ও ছেলের বউকে কথা দিলেন, অন্য এক
সময় তারা পুরো পরিবার মিলে ঢাকার
মধ্যেই কোথাও ঘুরতে যাবে। এই কথা
শুনে মুহূর্তেই সকলের চেহারার হাসি
ফুটে উঠলো।
সুন্দর মনোমুগ্ধকর একটা সকাল। সূর্যিমামা
চারদিকে আলো ছড়িয়ে তার কাজ সমাপ্ত
করায় ব্যস্ত ।আহিয়ান আজ সকাল সকাল
বের হবে বলে ঠিক করেছে। অনেকগুলো
বছর পেরিয়ে গেছে ছোটবেলার বন্ধুদের
সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে কথা ও
দেখা সাক্ষাৎ হয় না। আহিয়ান শাওয়ার
সেরে এসে পড়ল বিপত্তিতে। তার লাগেজটা
রুমের কোথাও নেই। গতকাল সন্ধ্যায়
তৃধার রুম ছেড়ে তাড়াতাড়ি আসার সময়
লাগেজটা নিজের রুমে আনতে ভুলেই
গেছে। এখন টাওয়াল পরা অবস্থায়
কিভাবে যাবে তৃধার রুমে ...
আহিয়ানের পাশের রুমটাই তৃধার। কিন্তু
একটা মেয়ের রুমে হঠাৎ এভাবে ঢোকা
মোটেও সভ্যতার লক্ষণ নয়। কি আর
করার.. যেতেই হবে ভেবেই হাঁটা দিল
তৃধার রুমের দিকে। দরজায় কয়েকবার
টোকা দিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোন
সাড়াশব্দ এলো না। আহিয়ানের হাতের
হালকা ধাক্কায় রুমের দরজাটি খুলে গেল।
দরজা খোলা দেখে আহিয়ান ভাবল, রুমের
ভেতর কেউ নেই। তাই স্বাচ্ছন্দে ভেতরে
ঢুকে এগিয়ে গেল লাগেজটির দিকে।
লাগেজ হাতে পেছনে ঘুরতেই নজর গেল
বিছানার দিকে । সেখানে এলোমেলো হয়ে
বাচ্চাদের মত ঘুমিয়ে আছে তৃধা। ঘুমের মধ্যে
মেয়েটাকে অনেক মায়াবী লাগছে।
এলোমেলো চুলগুলো কিছুটা ছড়িয়ে
ছিটিয়ে আছে চেহারায় ।গোলাপি ওষ্টযুগল
নিঃশ্বাসের উঠানামায় মৃদু মৃদু কাপছে।
আহিয়ান লাগেজটা ছেড়ে দিয়ে এক পা
দু পা করে এগিয়ে গেল সেদিকে। হালকা
ঝুঁকে তাকালো তৃধার মায়াবী আদলে।
আলতো স্পর্শ করল মেয়েটার চোখের
বড় বড় পাপড়িতে। তারপর হালকা ফু
দিল কপালে অবহেলায় পড়ে থাকা
চুলগুলোতে । মুখের উপর গরম নিঃশ্বাস
অনুভব হতেই তৃধা হালকা নড়েচড়ে চোখ
মেললো। উঠে বসে পুরো রুমে এক নজর
তাকালো। দেখল পুরো রুমে কোথাও কেউ
নেই । হঠাৎ চোখ গেল ঘড়ির দিকে, সকাল
৯ টা বাজে। এটা দেখার পর তৃধার চোখ
তো কপালে ওঠার উপক্রম। চোখ বড় বড়
করে একবার তাকিয়ে দেখে দৌড় দিল
ওয়াশরুমের দিকে। ঝটপট ফ্রেশ হয়ে
একেবারে রেডি হয়ে নিল কলেজের জন্য।
ব্যাগ কাঁদে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে
লক্ষ্য করল একবার ড্রয়িং রুমের সকলের
দিকে। আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল
খান ,ইকবাল খান ও তানভীর সকাল
সকাল নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে গেছেন ।
বাকিরা এখন নাস্তা করছে। মেঘ , রাই
ও বন্যা রান্নাঘরে। নিজের মামমাম কে
রান্না ঘরে দেখে তৃধা নাস্তা না করে চোরের
মত বেরিয়ে যাচ্ছিল কলেজের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু আহিয়ানের চোখে তা খুব সহজেই ধরা
পড়ে গেল। আহিয়ান হালকা শয়তানি হেসে
বন্যার উদ্দেশ্যে জোরে বললো: মামুনি
একটু এদিকে এসো তো । বন্যা কিচেন
থেকে বেরিয়ে আহিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল;
তোর কি কিছু লাগবে আহিয়ান? আহিয়ান
তৃধার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল: হ্যাঁ
আমায় আরেকটা ডিম পোচ করে দাও
প্লিজ.. ঠিক তখনই বন্যার চোখ গেল
প্রধান ফটকের দিকে। তৃধা ছুটে বেরিয়ে
যাচ্ছিল কলেজের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ মায়ের
ডাকে থমকে দাঁড়ালো । চোখ বন্ধ করে
ঘুরে সকলের দিকে ফিরল।
"চোখ খোল" মায়ের ধমক শুনে তৃধা হঠাৎ
কেঁপে উঠে চোখ মেললো। প্রথমেই নজর
পড়লো মায়ের রাগী মুখ, তারপর নজর গেল
একটু দূরে আহিয়ানের দিকে। যে মিটিমিটি
হেসে পরোটা মুখে দিচ্ছে। তৃধা রাগে কটমট
করে সেদিকে তাকালো।
ঐ পিছনে কি? আমার দিকে তাকা..
মায়ের ধমকে তৃধা থতমত খেয়ে তাকালো।
বন্যা: তোকে আর কতবার বলতে হবে ..
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়বি,
তারপর পড়তে বসবি, ঠিক আটটায়
তোর পাপার সাথে নাস্তার টেবিলে থাকবি।
তৃধা একটু ইতস্তত করে বলল: না মানে
মামমাম.. কাল থেকে উঠবো, আজকে
সজাগ পাইনি।
বন্যা: ছিহ তৃধা.. এই একই কথা আর
কতদিন বলবি? প্রতিদিনই তো বলিস
কাল থেকে উঠবো। আহিয়ান খাওয়া
শেষ করে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে
এগিয়ে এসে বলল: থাক মামুনি আজকের
জন্য ছেড়ে দাও। বলেছে তো কাল থেকে
ভালো হয়ে যাবে।
বন্যা রাগে কটমট করতে করতে বলল:
ও.. প্রতিদিন একই কথা বলে..
আহিয়ান মুখটাকে একটু অসহায় ভাব করে
বলল : থাক মামুনি পিচ্চি মানুষ..
আরেকবার সুযোগ দাও।
তৃধা আহিয়ানের দিকে রাগী দৃষ্টি নিয়ে
তাকিয়ে মনে মনে বলল: বিদেশি বাদর..
জুতো মেরে গরু দান করা হচ্ছে তাই না😡😡
নাস্তা খেয়ে বের হ.. মায়ের কথায় তৃধার
ভাবনাচূত হলো।
তৃধা জানালো: সে খাবেনা তার এখন
সময় নেই। ইতিমধ্যে আহিয়ান তৃধাকে
পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেছে। তৃধাও তাড়াতাড়ি
বেরিয়ে গেল। তার অনেক লেট হয়ে যাচ্ছে ।
তৃধাকে দেখামাত্রই ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি
বের করতে গেলেন। তৃধা গাড়ির অপেক্ষা
করছে। ঠিক তখনই আবিরের নীল রঙের
বাইকটি নিয়ে বাড়ির গ্যারেজ থেকে বেরিয়েছে আহিয়ান। পরনে তার কালো শার্ট ইন করা।
সুঠামদেহি আহিয়ানের হাতের কব্জিতে কালো
চকচকে একটা নতুন ঘড়ি। চোখে সানগ্লাস।
তৃধা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহিয়ানের
যাওয়ার দিকে। মনে মনে বলল : ফর্সা বাঁদর
টাকে কালো শার্টে হেব্বি লাগছে। হঠাৎ
গাড়ির হর্নের শব্দে তৃধা সেদিকে তাকালো।
দেখলো ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা
করছে ।এবার তৃধাও চলল কলেজে উদ্দেশ্যে।
বেলা ১১ টা ।
খান বাড়িতে এসে পৌঁছালো আরিফ , মিম
ও ঊষা। মিম তো ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল
মেঘ কে। দুই বোনের সেকি কান্না। মনে
হচ্ছে দুইজন দুইজনকে কত যুগ পরে
দেখেছে। আরিফ গিয়ে একে একে সকল
বয়োজৈষ্ঠদের সাথে কুশল বিনিময় করল।
ঊষা তো এসেই আহিয়ার কোলে চড়ে বসে
আছে। সেটা দেখে আদিবার কি যে কান্না।
রাই কিছুতেই তাকে সামলাতে পারছে না।
অবশেষে আহিয়া একসাথে দুইজনকে
কোলে নিয়ে সোফায় বসে আছে।
মিম মেয়েকে আহিয়ার কাছে রেখে
আরিফকে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় নিজের রুমে গেল। আকলিমা খান এখনো মেয়ের রুম টাকে আগের মতই গুছিয়ে রাখেন। এই রুমটাতে মিমের থাকা হয় না বহু বছর। আরিফ তাকে কখনো খান বাড়িতে এসে দুই তিন দিন বেড়াতে দেয় না। বিশেষ প্রয়োজন পড়লে সকালে দিয়ে যায় এবং যত রাতই হোক অফিস ছুটির পর আবার নিয়ে যায়।
এসব নিয়ে মিম অভিমান করেছে অনেক। কিন্তু কোন লাভ হয়নি কখনো। আরিফের একটাই কথা " তোমাকে ছাড়া রাতে আমার ঘুম আসে না"
প্রথম প্রথম মিম একটু রাগ দেখালেও এখন আর কিছু বলে না। জানে এই ছেলেটা পাগল.. তার জন্যই তো পাগল। আবিরের কথায় আরিফ অফিস থেকে দশ দিনের ছুটি নিয়েছে। তাই মিমের মন খুশি করার জন্য একদিন আগেই এসেছে। কাল এই বাড়ি থেকেই সকলের সাথে তারা সাজেক যাবে।
মিম লাগেজ থেকে একটা থ্রি পিস বের করতে ছিল চেঞ্জ করার জন্য। সেই সময় পেছন থেকে আরিফ এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদে মাথা রাখলো। মিম একটু মুচরামুচরি করলো ছোটার জন্য। কিন্তু আরিফের শক্তপোক্ত পুরুষালী হাতের সাথে কি সে শক্তিতে পারবে.. কিছুক্ষণ চেষ্টা করে সে নিজেই থেমে গেল।
আরিফ মৃদু হাসলো। তারপর বলল: ম্যামের শক্তি শেষ?
মিম রাগী কন্ঠে বলল: ছাড়ুন তো.. কেউ চলে আসবে..
ঠিক তখনই কারো কাশিতে দুইজন দরজার দিকে তাকালো। দেখলো রাই হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
আরিফ মীমকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। রাই একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল: ডিস্টার্ব করলাম না তো দুলাভাই?
এই কথা শুনে মিম ড্রেসগুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল চেঞ্জ করতে। আরিফ এক আঙুল দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল: একটু একটু..
রাই হাসলো। হাসিমুখে ভেতরে প্রবেশ করে নাস্তা দিয়ে গেল।
বেলা প্রায় ২ টা..
বাহিরে প্রচুর রোদ উঠেছে আজ। সূর্যের কড়া তাপে মানুষের জীবন যাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে
রাকিবের ছেলে রিহান, মাইশার ছেলে মৃদুল, আহিয়ান এবং এলাকার দুই ছোটবেলার বন্ধু নির্জন ও অলক একসাথে বসে একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। আহিয়ানের খবর পেয়ে রিহান , মৃদুল , নির্জন ও অলক এসেছে দেখা করতে। সেই ছোটবেলায় শেষ দেখা। তারপর ভিডিও কল ছাড়া আর দেখা হয়নি। এত বছর পর বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার পর পুরনো স্মৃতি, পরিবার, ভবিষ্যৎ সব নিয়ে আলোচনা করতে করতে প্রায় দুপুর গড়িয়েছে। আহিয়ান ঠিক করেছে আজ সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফিরবে না। অবশ্য বাড়িতে সে তার মাম্মাকে সব জানিয়েই এসেছে। সকাল থেকে এই চায়ের দোকানেই আড্ডায় মজে আছে। রিহান সকলের উদ্দেশ্যে বলল: দোস্ত এবার মনে হয় আমাদের লাঞ্চ করা উচিত।
ওর কথা শুনে বাকি চার বন্ধুও সম্মতি দিল। আহিয়ান উঠে গেল দোকানদার কে চায়ের বিল পরিশোধ করতে।
বাকি চার বন্ধু হাসি ঠাট্টায় মত্ত।
বিল পরিশোধ করে পেছনে ফিরতেই আহিয়ানের চোখ গেল একটু দূরের রাস্তায়। সেখানে কয়েকটা ছেলে দুইটা কলেজ পরুয়া মেয়েকে ডিস্টার্ব করছে।
একটা ছেলে তো একটা মেয়ের চুলের বেনি ধরে রীতিমতো টানাটানি করছে। আবার মাঝে মাঝে হাত ধরেও টানছে। আহিয়ান ব্রু কুচকে সেদিকে তাকিয়ে আছে। কেন জানি মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু এই এলাকার কোন মেয়েকে তো তার চেনার কথা না। আর তার নিজের বাড়ির মেয়েরা তো এভাবে রাস্তাঘাটে চলাফেরাও করে না।
আহিয়ান দিদ্বাদ্বন্দ্ব নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে মৃদুল ডাকছে। আহিয়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেল। কিছু একটা খেয়াল করতেই আহিয়ান দৌড়ে গেলো রাস্তার দিকে। আহিয়ানের দৌড় দেখে রিহান, মৃদুল, নির্জন ও অলক ছুটলো তার পিছু পিছু।
ওদের পাঁচ বন্ধুকে এইভাবে দৌড়ে আসতে দেখে ছেলেগুলো সব উল্টো রাস্তায় দৌড় দিল। আহিয়ান মেয়েগুলোকে ক্রস করে ছেলেগুলোর পেছনে দৌড়ালো। ভাগ্যবশত একটাকে হাতের কাছে পেয়েও গেল। ছেলেটাকে রাস্তায় ফেলে নাকে মুখে ইচ্ছা মতো ঘুশি দিল। ছেলেটার হাতটাকে মুছরাতে মোছরাতে বলল: তোর সাহস কত বড় তুই ওর হাত ছুঁয়েছিস 😡😡 তোকে তো আজ আমি মেরেই ফেলবো।
ইতিমধ্যেই ওর বন্ধুরা এগিয়ে এসেছে। দেখল রাস্তার একপাশে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে তৃধা ও তার ক্লাসমেট সোহানী। ওরা তারপর আবার এগিয়ে গেল সামনে। আহিয়ান এখনো ছেলেটাকে মারছে। ছেলেটার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেছে। আশেপাশের কিছু লোকও জমে গেছে। কেউ আহিয়ান কে থামাতে পারছে না। ওরা চারজন দৌড়ে গিয়ে আহিয়ান কে জাপটে ধরল। আহিয়ান হাপাচ্ছে আর রক্ত লাল চোখে তাকিয়ে আছে রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটির দিকে।
আশেপাশের লোক এর মাঝেই জেনে গেছে ওই ছেলেটির অপরাধ। তবুও মানবতায় খাতিরে হসপিটালে নিয়ে যেতে চাইলে রিহান তাদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিল বলল ওই ছেলেটার ট্রিটমেন্ট করাতে।
আহিয়ান কিছু একটা মনে পরতেই ছুটে গেলো পিছনে।
দেখল, তৃধা মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান ধমক দিয়ে বলল: তোর এখানে কি? রাস্তায় কি করছিস তুই? কলেজ ছুটির পর বাড়িতে না গিয়ে এখানে কি করছিস ?তৃধা কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে চিৎকার করে বলে উঠলো: Ans দে damat....
কিন্তু তৃধা এতক্ষণের ভয় ও অস্থিরতায় নিজেকে সামলাতে না পেরে ছুটে গিয়ে আহিয়ানকে জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেদে দিল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে কাঁদতে কাঁদতে বলল: আহিয়ান ভাই.. ওই ছেলেগুলো আমার বেনি ধরে টেনেছে, আমার হাত ধরেছে। আপনি আমায় বাড়ি নিয়ে চলুন প্লিজ।
আহিয়ান চুপচাপ চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। সে জানে এখন তৃধাকে যতই কিছু জিজ্ঞাসা করুক। তৃধার থেকে আশানুরূপ কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। আহিয়ান তৃধাকে নিজের বুক থেকে সোজা করে দাড় করিয়ে , চোখের পানি মুছে চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিল।
এদিকে রিহান , মৃদুল, অলক, নির্জন ও সোহানি নিরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছে। অলক মৃদুল কে খোঁচা মেরে বলল: এই দুইটার ঘটনা কিরে? মৃদুল আউচ শব্দ করে বলল: আমি কি জানি.. নির্জন মিটিমিটি হেসে বলল: ডাল মে জরুর কুচ কালা হে..
রিহান নির্জন এর উদ্দেশ্যে গালি দিয়ে বলল: শালা তুই দেখতেও কালা.. তোর চিন্তাভাবনাও কালা.. তাই সবকিছুতেই কালা খুজিস..
নির্জন রিহানের উদ্দেশ্যে রাগী কন্ঠে বলল: I am not কালা I am dangerous শ্যামলা। যেটা দেখে তোর মত কতগুলো মাঙ্গের নাতির বইনেরা ক্রাস খায়।
এবার মৃদুল নির্জনের কাঁধে চাপর দিয়ে বলল: কিরে মামা, ভুইলা গেছোস আমাদের আশেপাশে দুইটা মেয়ে আছে। মুখের জবান সামলা।
আহিয়ান বন্ধুদের দিকে এক নজর তাকিয়ে রিহান কে বলল: দোস্ত, তৃধার বান্ধবীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কর। আমি তৃধাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। আজ আর একসাথে লাঞ্চ করা হবে না। আগামীকাল তো ট্যুরে দেখা হচ্ছেই। তারপর অলক ও নির্জন কে উদ্দেশ্য করে বলল: তোরা গেলে অনেক ভালো লাগতো। পারলে চেষ্টা করিস।
নির্জন বলল: সরি দোস্ত.. সামনে পরীক্ষা। বাড়ি থেকে এলাও করবে না।
তারপর রিহান সোহানিকে পৌঁছে দিতে গেল। আর বাকি তিনজনও যার যার মত চলে গেল। তৃধা এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান চুপচাপ তৃধার হাত ধরে হাটলো রাস্তার ওই পারে রাখা তার বাইকের দিকে।
তৃধাও বাধ্য মেয়ের মত আহিয়ানের সাথে গেল। আজ আর বেশি কোন কথা বলে আহিয়ান কে রাগালো না।
তৃধাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আহিয়ান বাইক ঘুরিয়ে নিয়ে আসলো সামনে। তারপর তৃধার সামনে একটা হেলমেট ধরে বলল: এটা পড়ে, উঠে বস...
কিন্তু এখনো তৃধা নিচের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা আজ বড্ড বেশি ভয় পেয়েছে ওকে দেখলেই বোঝা যায়। এবার আহিয়ান আর কথা বাড়ালো না। তৃধার মুখটা একটু উপরে তুলে হেলমেটটা যত্ন সহকারে পরিয়ে দিল। তারপর বলল: সাবধানে উঠে বস।
তৃধা চুপচাপ বাইকে উঠে বসলো।
আহিয়ান বাইকের মিররের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল: কাঁপাকাঁপি বন্ধ করে ধরে বস।
তৃধা এবার আলতো করে আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখল।
বাইক চলল অজানা গন্তব্যে। এই পথ এই রাস্তা তৃধা
কিছুই চিনে না। এমন কি এটা বাড়ির রাস্তাও না। তবুও আজ কিছু বলল না। ছোটবেলা আহিয়ানের রাগি চেহারা অনেক দেখলেও আজকের আহিয়ান কে যেন সে নতুন দেখছে।
হঠাৎ বাইক ব্রেক করায় তৃধা আহিয়ানের কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরল। আহিয়ান মিররে এক নজর দেখেও কিছু বলল না। চুপচাপ পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে দিলো।
আহিয়ান: আসসালামু আলাইকুম মাম্মা।
মেঘ: অলাইকুম আসসালাম.. তুই কোথায়? দুপুরে কিছু না খেয়ে এই রোদের মধ্যে কোথায় ঘুরছিস?
আহিয়ান গলার স্বর একটু নিচু করে বলল: আমি খেয়ে নিব মাম্মা.. আর তোমাকে তো গতকালকেই বলেছি আজ ফিরতে আমার লেট হবে।
মেঘ: হ্যাঁ বলেছিস, খেয়েছিস কিনা জানতেই কল দিয়েছি..
আহিয়ান: আমি খেয়ে নিব. আর শোনো মাম্মা...
মেঘ: হ্যাঁ বল.. কিছু বলবি?
চলবে...
ফলো করুন