দেখতে দেখতে চলে গেলো আরো কয়েকটি মাস। তৃধা আগের থেকে নিজেকে সামলে নিয়েছে বহুগুন বেশি। হয়তো আগের মতো কিশোরি চাঞ্চল্য আর তার মনে নেই। তবে মুখ গোমরা করেও থাকে না। মেধাবী ছাত্রী হওয়ায় ডাক্তারি পরার সুজোগটা পেয়েই গেলো। ভর্তি হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজে.....
তৃধার দাদু মোজাম্মেল খানের খুব ইচ্ছে ছিলো তার মেয়ে অথবা ছেলে ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু তার ছেলে অল্প বয়সে রাজনীতিতে জরিয়ে ছিলো , পরবর্তীতে রাজনীতি ছেড়ে সরকারি চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। অতঃপর তার একমাত্র ভরশা ছিলো মেয়ে। কিন্তু তার মেয়ে প্রাইভেট হসপিটালে চান্স পায়। তাই তাকে আর ভর্তি করা হলো না সেখানে। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে।
জাই হোক তৃধা ছোটো বেলা থেকে বহুবার তার দাদুর মুখে এই কথাগুলো শুনেছে। তখন সে আদো আদো কন্ঠে বলতো দাদু তুমি চিন্তা করো না আমি আছি না তোমার ছোট বউ আমি একদিন অনেক বড়ো ডাক্তার হবো। তারপর তোমার জ্বর মাপবো...
মোজাম্মেল খান হাসতেন। মূলত বাবার স্বপ্ন পূরন করতেই মেঘ নিজের ছেলেকে ডাক্তারি পরিয়েছেন। তৃধা ছোটোবেলার কথাটি এভাবে সত্যি করতে পারবে সেটা কেউই ভাবতে পারেনি।
আহিয়ান এখনো আগের মতো সকাল ৮টায় কল দিয়ে বাড়ির সকলের সাথে কথা বলে। তৃধা চায় না বলে আহিয়ানও কারো কাছে তৃধাকে নিয়ে প্রশ্ন করে না।
দুজনের কথা হয় না প্রায় ৬টি মাস কেটে গেছে। তৃধা ভালো রেজাল্ট করেছে বলে তার বড়ো পাপা আবির তাকে ফোন গিফট করেছিল। তাই আহিয়ার সাথে মাঝে মধ্যে কথা হয়। আহিয়া প্রায়ই বলে ভাইয়ার ফোন নাম্বার দেই ভাইয়ার সাথে একটু কথা বল। কিন্তু তৃধা প্রতিবার নির্বাক হয়ে থাকে এই কথার কোনো উওর দেয় না। রিহান চেষ্টা করছে নিজের ব্যাবসা দার করানোর। ওর আব্বু রাকিব বার বার বলেছে তাদের ব্যাবসায় জোগ দিতে। তার পরীবর্তে একটামাত্র ছেলে হিসেবে তাকেই এসবের দায়ভার নিতে হবে। রিহান বলেছে এটা নিয়ে পরে ভাবা জাবে আপাদতো সে নিজেকে প্রমান করতে চায়।
রিহান যখন প্রথম শুনেছিলো তার কাজিন জুই লাইব্রেরিতে কাজ করা মেহেদি নামের এক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জরিয়েছে তখন মেয়েটাকে বড়ো ভাই হিসেবে অনেক ধমকিয়েছে। কিন্তু তার কিছু দিন পরথেকে তাকে আর কিছুই বলতো না। ওর ভাব সাব দেখে মনে হচ্ছে ও জুইকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট করছে।
ভোরের আলো ছুটতে না ছুটতেই জানালা দিয়ে হালকা সূর্যের আলো ছড়িয়ে পরেছে। দেয়াল আর মেঝেতে হালকা সোনালি আভা তৈরি করেছে।
বাগানের গাছপালা গুলো এখনো অলস ভাবে ঘুমান্ত অবস্তায় পরে আছে
যাইহোক তৃধা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (DMC) এর MBBS এর প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ওর স্বপ্ন ও একদিন সুনাম ধন্য Gynecologist হবে।
মহিলাদের শারীরিক ও মানষিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চায় সে। অন্যের কস্ট কমিয়ে সে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চায়। আর সবচেয়ে খুশির বিষয় হচ্ছে জুইও তার সাথে চান্স পেয়েছে। দুই পরিবারের কেউই ভাবতেও পারেনি ওদেরমতো দুই চঞ্চল পাখি যে এতো ভালো রেজাল্ট করবে কেউই ভাবতেও পারে নি
পাতার ডগায় শিশিরের বিন্দুটা জেনো ভাষছে।
খান বাড়ির কিচেনে সকালের নাস্তার তৈরির তোর জোর চলছে। একটু পরেই সবাই নাস্তা করে বেরিয়ে জাবে। তাই তাড়াহুড়ো ওনেক।
আবির ফজরের নামাজ পড়ে একটু ঘুমিয়েছিলো। হঠাৎ ফোনের রিংটনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। চোখটা লেগে হিয়েছিলো মাএই কিন্তু ফোনের শব্দে একটু বিরক্ত হলো বটে। পিটপিট করে চোখ খুলে দেখলো ছেলের নাম্বার। আহিয়ান তো সকাল আটটায় কল দেয় ভাবতে ভাবতে কল রিসিভ করলো দেখলো আহিয়ান ও আহিয়া একসাথে বসে আছে। এর মধ্যেই ফোনের ওপাস থেকে আহিয়া চিল্লাই বলে উঠলো
Happy birthday papa....
এর মধ্যে আহিয়ানো বলে উঠলো
Many many happy returns of the day...
আহিয়ান ও আহিয়া একসাথে চিল্লাইয়া বলে উঠলো হ্যাপি বার্থে পাপা।।আবির চমকিত হলো সেতো ভুলেই গিয়েছিলো আজকে তার জম্মদিন ১০ই অক্টোবর। আজ বললে ভুল হবে বংর কোনবছরি তার মনে থাকে না । প্রতিবছর তার ছেলেমেয়ে এবং বউ মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আজকে তো তার বউ এব্যাপারে কিছু বললো না। জাইহোক ছেলেমেয়ে গুলো যে দূরে থেকেও মনে রেখেছে এটাই অনেক। এর মধ্যে রুমের দরজায় কেউ টোকা দিলো আবির ভেতরে আসার অনুমতি দিলেই তৃধা ভেতরে ডুকেই একটি ফুলের বুকে দিয়ে বললো....
Happy birthday boro papa...
ঠিক তখনি প্রবেশ করলো আদিবা তার হাতে একটা গোলাপ সামনে গিয়েই বললো happy birthday to you
আবির হাসলো চার ছেলেমেয়েকে একসাথে পেয়ে।
আদিবাকে জোর করে কোলে নিয়ে চুমু দিলো। তৃধা এতোক্ষন লক্ষ করে নি আহিয়ান ও আহিয়া ভিডিও কলে আছে। আহিয়ার কন্ঠ সুনে ফোনের দিকে তাকালো দেখলো তৃধা তাকিয়েছে বলে আহিয়ান সরে গেছে। এখন শুধু আহিয়াকেই দেখা জাচ্ছে। তৃধা খানিকটা মন খারাপ করে মুখ বাকালো। আবির খুশি মনে তিন মেয়ের সাথে গল্প করা শুরু করলেন।
এমন সময় তানভির দৌড়ে এসে হাপাতে হাপাতে বললো
ভাইয়া তুমি শেষ..... আজকে তুমি শেষ.......!!
আবির প্রথমত আবাক হলো তারপর বিরক্ত হলো তানভীরের দুস্টামি দেখে। তারপর তানভীর জানলো সে দুস্টামি করছে না।মেঘ আবিরের উপরে ভয়ংকর ভাবে ক্ষেপেছে। সে জেনো আর রুমের বাহিরে না জায়। আবির বুঝলোনা সকাল সকাল তার মেঘবতির রাগের কারন। তাই কৌতুহল বশত নিচে যেতে যেতে আহিয়ার কল কেটে দিলো। তানভীর বার বার বলেছে নিচে জেনে না যায়। নিচে গিয়ে নিজের কপালে যেনো নিজেই দিঃখ টেনে না আনে।
কিন্তু আবির শুনলো না। তার মতে সকাল সকাল মেঘ রেগে জাওয়ার মতো তেমন কিছু করেনি সে। দুই পাপার পিছু পিছু তৃধাও গেলো নিচের দিকে আসলে দেখা দরকার ব্যাপারটা কি....
আবির ড্রয়িং রুমে জেতে জেতে সুনতে পেলো কিচেন রুমে কেউ হাড়ি পাতিল ও থালা বাসুনের সাথে মারামারি করছে। মনে হচ্ছে এই মারামারিতে আর কিচেন রুম থাকবে না। আবির দ্রুপ ছুটলো সেদিকে। আবির এগিয়ে গিয়ে দেখলো বন্যা ও রাই কিচেন রুমের বাইরে দারিয়ে আছে। আর মেঘ এমন ছুরাছুরির কাজ করছে। আবির অবাক হলো: সামনে আগিয়ে গিয়ে বললো: সকাল সকাল এতো গাংচুর কিসের? কি নিয়ে এতো রেগে আছো বলো আমাকে?
একটু দূর থেকে তানভীর ও আদি মিট মিট হাসছে।
আবিরের কন্ঠ পেয়ে মেঘ এগিয়ে এলো তারপর রাগে কাপতে কাপতে বলল : বার্থডে বয় এখানে কি করে ! তাকে তো মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখার কথা। আবির বুঝলো না মেঘের এই রাগের কারন তবে এটুকু বুঝেছে জে মেঘের মনে আছে আজ তার জন্মদিন। বিয়ের আগে থেকে এই পরযন্ত এই মেয়েটা কখনো ভুলে নি আবির নিষিধ করলেও সুনে নি। যাই হোক সে হিসেবে আজকে মেঘের মুখ দিয়ে মধু ঝরার কথা। কিন্তু সব কিছু এতো নিম পাতার মতো তেতো লাগছে কেনো।
আবির মেঘকে সামলাতে বলল: এতো মিস্টি মুখ দিয়ে এতো তেতো কথা কিভাবে বের হচ্ছে আহিয়ার আম্মু?
মেঘ রেগে তেরে এসে বলল: আপনার মিস্টি কথা বলার মানুষের অভাব আছে... যে আমাকে এতো মিস্টি কথা বলতে হবে। অফিসে গিয়ে আপনি এসব করেন আহিয়ার আব্বু ছিঃ ছিঃ ছিঃহ!!
আবির ভরকে গেলো তারপর তানভীর কে জিজ্ঞেস করলে তানভীর একটা শয়তানি হাসি দিলো....
এর মধ্যে আবিরের ফোনটা বেজে উঠলো আবির দেখলো রাকিব কল দিয়েছে। সে রিসিভ করলো না কেটে দিলো। রাকিব আবার কল দিলো আবির ভাবলো
জরুরি কোনো কারনে ফোনে করেছে তাই কল রিসিভ করলো ফোন রিসিভ করতেই রাকিবের কন্ঠ...
কিরে বন্ধু সকাল সকাল বার্থডে সারপ্রাইজ কেমন লাগছে! বউ কি খুন্তি দিয়া পিটাইছে নাকি চ্যারা কাঠ দিয়া....?
আবির বুঝলো না সকাল সকাল বন্ধুদের এতো রসিকতার কারন। একদিকে বউ অন্য দিকে বন্ধু মেজাজটা প্রচন্ড গরম হইতাছে। রাগে কটমট করে রাকিবের উখদ্দের বলল: কি করেছস সালা বউ এমন চেতছে কে?
শুধু অফিসের কয়েকটা মেয়ে তোর বাড়ির ঠিকানা চাইছিলো বার্থডে গিফট পাঠাবে বলে তাদের ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি.....
আবির এবার ভয়ংকর রেগে গেলো রাগে ফুসতে ফুসতে বললো : সালা অফিসে একবার আসি তোর বেয়াদবি ছুটাবো। রিয়া এখনো সুন্দর আছে ওর জন্য একটা ছেলে দেখতাছি অপেক্ষা কর...!!
রাকিব হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিলে অতঃপর আবির তানভীরের সামনে গিয়ে রাগি কন্ঠে বলল: এসব আমাকে আগে বলিসনি কেনো বেয়াদব? কে কি পাঠিয়েছে দেখি.....
তানভীর হাসতে হাসতে দূরে দিকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। আবির তাকিয়ে দেখলো অনেকগুলো ফুলের বুকে। সে এগিয়ে গেলো সেদিকে....
প্রতিটা ফুলের বুকেতেই আছে একএকটা চিরকুট। আবির একটা চিরকুট হাতে নিতেই পেছন থেকে মেঘ ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলে উঠলো.....
আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে স্যার, আপনি এখনো কতোটা ইয়াং, Happy birthday sir আপনার যৌবন বুড়ো কাল পরযন্ত থাকুক।
ওই চিরকুটটা নিচে ফেলে আরেকটা চিরকুট হাতে নিলো। এবারো ভাগ্য হলো না পড়ার মেঘ নিজেই বলে দিলো....
Happy birthday কল্পনার পুরুষ। আপনাকে ধরতে পারবো না ছুতে পারবোনা জেনেও আপনাকে চাই।
আবির খুক খুক করে কেশে উঠলো। আবির চিরকুট না পরেও কানে শুনে নিলো। তারমানে মেঘ আগেই সবগুলো চিরকুট পরে নিয়েছে। তাইতো এতো রাগারাগি। এই রাকিব বেয়াদবটা মনে হয় সংসার ভেঙেই ছারবে। তানভীর পাসে দারিয়ে মিটমিট হেসে বলল: ভাইয়া নিশ্চই এই মেয়েগুলোর আজকের পর থেকে আর চাকরি থাকবে না....
আবির রাগে ফুসতে ফুসতে বললো: কার কি হবে তা জানি না। তবে সবার আগে ওই রাকিব বেয়াদবকে শায়েস্তা করবো। ওর কথা শুনে ড্রয়িং রুমের সকলে অগোচরে হাসছে।
তাদের আর বুঝতে বাকী রইলো না এই মেয়েদের বাড়িড় ঠিকানা কে দিয়েছে।